স্বপ্নের ঐশ্বর্য
|| কাজী জহিরুল ইসলাম ||
ছুটির দিন। লম্বা সময় ধরে ঘুমাবো। কিন্তু তার আর উপায় নেই। কানের কাছে নারী কন্ঠ। বেশ আত্মবিশ্বাসী কন্ঠ। ক্রমাগত কথা বলে যাচ্ছেন এক অপরিচিতা। আমি লাফ দিয়ে উঠি। কে তিনি? আমার স্ত্রী বলেন, রুবানা হক, শোনো কী বলছেন। রুবানা হক প্রয়াত ব্যবসায়ী আনিসুল হকের স্ত্রী। আমাদের কৈশোর-উত্তীর্ণ কালে আনিসুল হক ছিলেন আমাদের হিরো। টিভি উপস্থাপনায় অন্য এক আধুনিকতা নিয়ে হাজির হন তিনি। এরপর আমরা ধীরে ধীরে তার ব্যবসায়ীক সাফল্য, সাংগঠনিক সাফল্য দেখতে দেখতে বড় হই। খুব সাম্প্রতিককালে, আনিসুল হকের মৃত্যুর পর, কেউ একজন বলেছিলেন, তার স্ত্রী রুবানা হকও খুব ভালো কথা বলেন। কিন্তু রুবানা হকের কথা শোনার সৌভাগ্য আমার হয়নি। দুই যুগ ধরে দেশের বাইরে থাকার কারণে এই সময়ে স্টার হয়ে ওঠা অনেকের সম্পর্কেই আমার ভালো ধারণা নেই।
তার কথায় এমন কিছু ছিল যে আমার পক্ষে ঘুমিয়ে থাকা সম্ভব হয়নি। আমি মুক্তিকে বলি, প্রথম থেকে দাও, পুরো বক্তৃতাটা আমি শুনতে চাই। আমি পরপর দুইবার তার পুরো বক্তব্যটা শুনি, ফেইসবুকে শেয়ার করি, আমার ছেলেকে শোনাই এবং অনেককে শোনার জন্য ব্যক্তিগতভাবে অনুরোধ করি। তিনি হাস্যরসের মধ্য দিয়ে শুরু করেন, আমার বয়স পঞ্চান্ন, সামনের ফেব্রুয়ারিতে ছাপ্পান্ন হবে, নয় তারিখে, শুভেচ্ছা পাঠাবেন। শুরুতেই জানিয়ে দিলেন, তিনি কোনো সাধারণ বাঙালি নারী নন, বয়স আড়াল করার মতো নারীসুলভ ব্যক্তিত্বকে তিনি ছাড়িয়েছেন অনেক আগেই। বক্তব্যটি শুনে বুঝতে পারি একদল সম্ভাবনাময় তরুণ উদ্যোক্তার সামনে দাঁড়িয়ে তিনি কথা বলছেন। প্রতিটি শব্দে, বাক্যে ঝরে পড়ছে তার নিজের তারুণ্য। যদিও তিনি এক পর্যায়ে এও জানিয়ে দেন তার তিন সন্তানের বয়স যথাক্রমে ৩৬, ৩৩ এবং ২৭ বছর। কিন্তু তার নিজের তারুণ্য তাতে ম্লান হয়নি একটুও। এখনো তার মাঠ দেখলেই খেলতে ইচ্ছে করে, মতিউর রহমানকে দেখলেই সম্পাদক হতে ইচ্ছে করে, লেখক আনিসুল হককে দেখলেই লেখক হতে ইচ্ছে করে, উদ্যোক্তা হতে ইচ্ছে করে, আরো কতো কতো ইচ্ছে তার। ইচ্ছের হাজারো রঙিন ঘুড়ি এখনো তার স্বপ্নের আকাশে উড়ে বেড়ায় প্রতি মুহূর্তে। এই জায়গাটিতে তার সাথে আমার দারুণ মিল। আমার স্ত্রী এ নিয়ে অনেক কথা বলেন আমাকে, তোমার কৃষক হতে ইচ্ছে করে, বিজ্ঞানী হতে ইচ্ছে করে, লেখক হতে ইচ্ছে করে, সাংবাদিক হতে ইচ্ছে করে, বাবুর্চি হতে ইচ্ছে করে, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে ইচ্ছে করে, সিনেমা বানাতে ইচ্ছে করে, কী ইচ্ছে করে না? চট করেই মনে হলো, আমার জন্ম ফেব্রুয়ারির দশ তারিখে, আমরা তো একই রাশির মানুষ, কুম্ভরাশির জাতক-জাতিকারা সৃজনশীল মানুষ হবেন এটাই স্বাভাবিক। আমাকে খুব বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না জানার জন্য যে তিনি কবিতাও লেখেন।
তার বক্তব্যে অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট ছিল, তার মধ্যে একটি হচ্ছে পরিবার। পরিবার আমাদের খুব বড় একটি শক্তি। তিনি তরুণদের বলেন, বাবা-মা হয়ত প্রথমে সব কিছুতেই না বলবে কিন্তু তাতে কী, বারবার বলতে হবে, আদর করতে হবে, জড়িয়ে ধরতে হবে। আমি আমার স্ত্রী, সন্তান, এবং ছোটো ভাই-বোনকে সব সময় এই কথাটি বলি। পরিবারের সবাই এক সাথে হয়ে গ্রুপ হাগ দেই। আমি এর নাম দিয়েছি পাওয়ার হাগ। কিছুক্ষণ আগেও আমার ব্যবসায়ী ছেলে ছুটে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলছে, আব্বু পাওয়ার দাও, সাথে সাথে ছোটো মেয়েও ছুটে এসে বলে, আমারও পাওয়ার লাগবে। বড় মেয়ে জল, অটিস্টিক শিশু, অন্য দুজনের মতো ও সেভাবে ছুটে আসে না। তখন আমি নিজেই ওকে ডেকে আনি, ওর মাকে ডেকে আনি, তারপর সকলে মিলে গ্রুপ হাগ দিয়ে নিজেদের রিচার্জ করি। রুবানা হক যখন বলছিলেন পরিবার হচ্ছে সবচেয়ে বড় শক্তি তখন আবেগে আমার দু'চোখ ভেজে। আমরা সবাই আনিসুল হক এবং রুবানা হকের সাফল্যের গল্প জানি। দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী দম্পতি। কিন্তু তিনি জানিয়ে দিলেন, আটমাইল পায়ে হেঁটে জামালপুরের একটি স্কুলে পড়তে যেতেন আনিসুল হক। ১৫ বছর বয়সে টিউশনি করে পড়ার খরচ যোগাতেন রুবানা হক। আনিসুল হক তার কর্মজীবনের শুরুতে ট্রাকের পেছনে চড়ে মাল নিয়ে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যেতেন। রুবানা হক খুব দৃঢ়তার সাথে যখন বলেন, বড় হবার জন্য বিত্তের দরকার নেই, দরকার স্বপ্ন। স্বপ্নই সবচেয়ে বড় শক্তি। বিত্তের সংজ্ঞাটাই নতুন করে লেখার কথা তিনি বলেন। আমিও তাই বলি, যার স্বপ্নের দিগন্ত যত বড় তিনি তত বিত্তবান।
আরো একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ কথা তিনি বলেন, কখনো বলবে না সময় নেই। সময়কে তুমি বাঁধবে তোমার মতো করে, সময় তোমাকে বাঁধবে না। কী অসাধারণ কথা এবং ঠিক আমার কথাটিই যেন শুনছি তার কন্ঠে। আমাকে অনেকে বলেন, এতো লেখেন, সময় পান কীভাবে? আমি হেসে জবাব দিই, হয়ে যায়। কেউ কেউ আমাকে ম্যাসেজ পাঠিয়ে বলেন, একটু ফোন করতে চাই, কখন ফ্রি আছেন। আমি বলি, সব সময় ফ্রি আছি, যখন ইচ্ছে ফোন দেবেন। হ্যাঁ, আমি অধিকাংশ সময় ফোন ধরি না। এর কারণ সময়ের অভাব নয়, কারণ হচ্ছে আমার ফোন মিউট থাকে। আমি খুব শব্দ সেন্সেটিভ। ফোনের রিংটোনসহ যাবতীয় শব্দ থেকে আমি দূরে থাকতে চাই। বাসায় কোথাও একটি পিন পড়লেও সেই শব্দ আমি পাই। এ নিয়ে আমার স্ত্রী ছেলে-মেয়েরা প্রায়শই আমাকে ক্ষেপাতে ছাড়ে না।
অসম্ভব আত্মবিশ্বাসী রুবানা হক একজন আস্তিক মানুষ, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন, সে কথাটিও জানাতে দ্বিধা করেননি। তার পুরো বক্তৃতাটি সততা, আত্মবিশ্বাস, কথা বলার শিল্প এবং অন্যকে অনুপ্রাণিত করার প্রাণশক্তিতে পূর্ণ ছিল। আমার খুব বেশি ভালো লেগেছে এজন্য যে আমি তার প্রতিটি কথার মধ্যেই আমাকে দেখতে পেয়েছি। তিনি বলেছেন, পরিবার হচ্ছে খুব বড় একটি শক্তি, স্বপ্ন হচ্ছে প্রধান বিত্ত, সময়কে আমি বাঁধবো, সময় আমাকে বাঁধবে না, অন্তহীন ইচ্ছের ডানা মেলে উড়বো, আমি সব কিছু হবো...
হলিসউড, নিউইয়র্ক। ৩০ নভেম্বর ২০১৯

Comments
Post a Comment