Skip to main content

লাল বাতির অনুশাসনের চেয়েও ভয়ঙ্কর

একা 

|| কাজী জহিরুল ইসলাম ||   


একসঙ্গে কাজ করতে করতে আমি খুব নিবিড়ভাবে রাগীব আহসানকে পর্যবেক্ষণ করছি। আমার মনে হচ্ছে তিনি একাকিত্বপ্রিয় একজন মানুষ। নিঃসঙ্গতাকে বেশ উপভোগ করেন। নিউ ইয়র্কের শিল্প-সাহিত্যের জায়গাটি বেশ ভাইব্রেন্ট। মানের দিক থেকে অনেকে নাক সিটকালেও আমি তা করি না, আমার মনে হয় এখানে বেশ ক’জন উঁচু মানের শিল্পী, যন্ত্রী, কবি, সাংবাদিক, লেখক, অনুবাদক, অভিনেতা, সংবাদপাঠক, আবৃত্তিশিল্পী আছেন। তাঁদের প্রায় সকলের সঙ্গেই আমার সখ্য গড়ে উঠেছে, শিল্পসঙ্গ আমি সর্বদাই উপভোগ করি।

রাগীব আহসানও হয়ত করেন কিন্তু তাকে আমি অনেকের ভিড়ে দেখি না। তাকে বরং আমার নিভৃতচারীই মনে হয়। আড্ডা দিতে পছন্দ করেন না যে তা নয়, আড্ডা দিতে পছন্দ করেন তবে খুব প্রিয় কিছু মানুষের সাথে, যাদের সাথে তিনি সহজ এবং অকপট। পৃথিবীর অনেক বড় বড় সৃজনশীল মানুষই ভিড় এড়াতে চেয়েছেন, তাদের মধ্যে মিশরের নোবেলজয়ী লেখক নাগীব মাহফুজের কথা বলি। তাকে এক পশ্চিমা সাংবাদিক, কিছুটা খোঁচা দিয়েই, জিজ্ঞেস করেছিলেন, আপনি তো মুসলমান, তো এখনো হজ্বে যাননি কেন? এটা না ফরজ? তিনি মৃদু হেসে বলেছিলেন, আমি ভিড় পছন্দ করি না। অন্য কারণও থাকতে পারে, হয়ত তিনি বিমানে চড়তে ভয় পেতেন। আমাদের কবি আবদুল মান্নান সৈয়দ বিমানে চড়তে খুব ভয় পেতেন। নাগীব কিন্তু তার সারা জীবনে মিশরের বাইরে কোথাও যাননি। এমন কি নোবেল পুরস্কার আনতেও সুইডেনে তার মেয়েকে পাঠিয়েছিলেন। এর একটি ব্যাখ্যা অবশ্য তিনি দিয়েছেন, তিনি এক নারীর প্রেমে আকন্ঠ ডুবে আছেন, অন্য কোনো নারীর দিকে চোখ তুলে তাকাবার কোনো অবকাশই নেই। সেই নারীর নাম মিশর। তিনি বলেন, মিশর এতো সুন্দর আর এতো বড় যে আমার এই ক্ষুদ্র জীবনে আমি এর রূপ দেখেই শেষ করতে পারবো না। তার ক্ষুদ্র জীবন ৯৪ বছরে প্রলম্বিত হয়েছিল। 

নাগীব থেকে এবার রাগীবে ফিরে আসি, কায়রো থেকে নিউ ইয়র্ক। একদিন রাগীব ভাই আমাকে বলেন, আমি নর্থ ক্যারোলাইনায় চলে যেতে পারি। 

আমি তখন গাড়ি চালাচ্ছি। সাংবাদিক, অনুবাদক আনোয়ার হোসেইন মঞ্জুকে নামিয়ে দিয়ে আমরা দুজন ফিরছিলাম। তখন ইয়র্ক কলেজ পেরিয়ে লিবার্টি এভেন্যুর সিগন্যালে। লাল বাতির অনুশাসনের চেয়ে ভয়ঙ্কর লাগে তাঁর নর্থ ক্যারোলাইনায় চলে যাবার কথাটি। লাল বাতির চেয়েও লাল। আমি বলি, 

না, না, আপনি নর্থ ক্যারোলাইনায় কেন যাবেন। নিউ ইয়র্কের এই আড্ডা, বন্ধু, হৈ চৈ, আপনি ওখানে পাবেন? 

তিনি হাসেন। 

আমার তো এসব লাগে না। আমার যা লাগে তা হলো রঙ, ক্যানভাস, তুলি আর সিগারেট। খাওয়াও তেমন লাগে না, দিনে একবেলা কিছু একটা পেলেই হয়।

আমি তার নর্থ ক্যারোলাইনায় না যাওয়ার পক্ষে আরো বেশ কিছু যুক্তি দিই। 

ছেলেরা এখানে, ভাবী কি যেতে রাজী হবেন? 

আমি তো কাউকে নিয়ে যাব না। একাই যাব, একাই থাকবো।

চতুর্থ ছবিটি আঁকার জন্য তিনি আমার যে কবিতাটি বেছে নেন, তার নাম ‘একা একা’। কবিতা পড়ে নয়, শিরোনামের যে তালিকা পাঠিয়েছিলাম ম্যাসেঞ্জারে, তা দেখেই তিনি এটি ঠিক করেন। রাত তখন বারোটা। আমাদের মধ্যে ছবি নিয়ে নানান রকম কথা হচ্ছে। প্রায়শই আমরা বিখ্যাত চিত্রকরদের নিয়ে কথা বলি। তাদের শিল্পী জীবনের পাশাপাশি ব্যক্তিজীবনকেও টেনে আনি। গত ক’দিন ধরে কথা বলছি মাইকেলেঞ্জোলোকে নিয়ে। হঠাৎ তিনি বলেন, একা একা নামে একটি কবিতা আছে না আপনার? আমি বলি, হ্যাঁ, আছে তো। 

পরের ছবি এই কবিতা নিয়ে আঁকবো। 

একটু পর তিনি আবার ফোন করেন। 

তালিকাতে দেখছি আরো একটি কবিতা আছে, নাম ‘একা’।

হ্যাঁ, আছে। একই বিষয়ে দুটো, একটা বাদ দিয়ে দেব? 

তিনি একরকম চিৎকার করেই ওঠেন।

না, না, বাদ দিবেন না। আমি দুটোই রাখতে চাই। 

আপনি তো এখনো কবিতাগুলো পড়েননি। ভালো নাও লাগতে পারে।

লাগবে, আমি নাম শুনেই বুঝেছি। শোনাতে পারবেন?

এখন?

হ্যাঁ। 

দাঁড়ান দেখি।

আমি বাতি জ্বালাই। উঠে শেলফ থেকে বই খুঁজে আনি। কেউ আমার কবিতা শুনতে চাইলে আমি মাঝরাতে ঘুম থেকে উঠেও শোনাতে পারি। এ বিষয়ে আমার আগ্রহের কমতি কোনো কালেই ছিল না। আজও নেই। কিন্তু কবিতাটি খুঁজে পাচ্ছি না।

রাগীব ভাই, ‘একা একা’ খুঁজে পাচ্ছি না। তবে ‘একা’ কবিতাটি যে বইয়ে আছে সেটি পেয়েছি। 

পড়েন।

ছয় লাইনের ছোট্ট একটি কবিতা। লিখেছিলাম ১১ এপ্রিল ২০১৬ তারিখে। কবিতাটি ‘রাস্তাটি ক্রমশ সরু হয়ে যাচ্ছে’ গ্রন্থে আছে। বইটি ২০১৭-র মেলায় প্রকাশ করেছে সময় প্রকাশন। আমি পড়তে শুরু করি।

 

একা

 

নিঃসঙ্গ কবি

একা একা রান্না-খাওয়াএকা একা সবই

একা বৃষ্টিএকা আকাশএকা দূরের মাঠ

হঠাৎ আবার মধ্যরাতে একা গ্রন্থ পাঠ 

একা কষ্টসুখও একাএকার কারাবাস

একার সঙ্গে একার এমন যৌথ বসবাস।

 

তিনি কিছু বলেন না। চুপ করে থাকেন।

ঘুমিয়ে গেলেন নাকি রাগীব ভাই?

এবার তিনি হাসেন। আমার কেন যেন মনে হল তিনি কাঁদছেন। 

কবিতাটি আমাকে খুব চেনা এক অতীতে নিয়ে গেল। এটাই আঁকবো। এই শনিবারে।



‘একা’ কবিতার থিমের ওপর আঁকা রাগীব আহসানের ছবি 


কিন্তু শনিবারে আমাদের ছবি আঁকা হল না। আমরা বসলাম রোববারে। আমাদের সাথে যোগ দিলেন কবি মাহবুব হাসান। মাহবুব ভাই ক্যামেরায় থাকতে খুব পছন্দ করেন। তিনি বলেন, একটা ফেইসবুক লাইভ করেন। রাগীব ছবি আঁকছে আর আমরা কবিতা পড়ছি। লাইভ শুরু হয়। তুলি চলছে, দুই কবির কবিতা পাঠ, খুনসুটি, শিল্প-সাহিত্যের নানান অনুষঙ্গ নিয়ে আড্ডা। আমার স্ত্রী বাসায় নেই। তিনি শপিংয়ে। ছোটো মেয়ে নভো আমাদের জন্য চা বানিয়ে নিয়ে আসে। লাইভ চলতে চলতেই আমরা চায়ের কাপে চুমুক দিই। আমাদের সাথে লাইভে যোগ দেন পৃথিবীর নানান প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আমাদের বন্ধুরা। মনে হচ্ছে আমরা সকলে মিলে সারা পৃথিবী থেকে রঙ এনে তুলে দিচ্ছি শিল্পী রাগীব আহসানের হাতে, তিনি তা ছড়াচ্ছেন ক্যানভাসে। এতো মানুষের ভিড়ে থেকেও তিনি ক্যানভাসে ভাসিয়ে তুলছেন এক কবির, এক শিল্পীর, এক মানুষের একাকিত্ব।    

 

হলিসউড, নিউ ইয়র্ক। ২৪ জুলাই ২০১৮।   

Comments

  1. ভাবছি আপনার লেখায় আর কোন মন্তব্য করব না। কারণ আপনার লেখায় আমি যতটা অভিভূত, সেই তুলনায় আমার মন্তব্য গুলো খূব ফ্যাকাশে মনে হয়।

    ReplyDelete
    Replies
    1. মোটেও না। আপনার মকন্তব্য লেখাগুলোতে নতুন প্রাণ সঞ্চার করছে।

      Delete

Post a Comment

Popular posts from this blog

অসাধারণ এই শিল্পীর জীবনের গল্প বড় করুণ

  [এই সময়ের অত্যন্ত প্রতিভাবান শিল্পী সারফুদ্দিন আহমেদ। বাড়ি পশ্চিমবঙ্গে। আর্ট কলেজে খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করেন ,  আর শুধু ছবি আঁকেন। নানান মাধ্যমে ,  নানান বিষয়ের ছবি। সারফুদ্দিন আহমেদের ছবি থেকে চোখ ফেরানো যায় না ,  আপনাতেই ওঁর নান্দনিক সৃষ্টিকর্মে দৃষ্টি আটকে যায় ,  কী জল রঙ ,  কী অ্যাক্রিলিক ,  কিংবা স্রেফ পেন্সিলের ড্রয়িং। এই গুণী শিল্পীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কবি কাজী জহিরুল ইসলাম। সাক্ষাৎকারটি এখানে উপস্থাপন করা হলো।]       ভারত আমাকে চোখ দিয়েছে ,  বাংলাদেশ দিয়েছে দৃষ্টি -     সারফুদ্দিন আহমেদ     কাজী জহিরুল ইসলামঃ  ব্যাক গ্রাউন্ডে তবলা বাজছে আপনি ছবি আঁকছেন কাচের ওপর।    এই যে বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে ছবি আঁকা, এই ছন্দটা ছবিতে কিভাবে ধরেন? আর কোনো শিল্পী ছবি  আঁ কার সময় যন্ত্রানুসঙ্গ ব্যবহার করেছেন?   সারফুদ্দিন আহমেদঃ   কাঁচ নয়,   এটি এক বিশেষ ধরনের কাপড়-নেট। এই নেটের উপরে বর্তমানে আমার এক্সপেরিমেন্ট চলছে।    জহিরুলঃ ও ,  ফেইসবুকে যখন ছবিটি দেখি কাচের মতো ...

শিল্প কী?

  আমার শিল্পভাবনা || কাজী জহিরুল ইসলাম ||   যখন থেকে, জেনে বা না জেনে, লেখালেখির সঙ্গে জড়িয়েছি, তখন থেকেই এই বিতর্কের সঙ্গেও জড়িয়ে গেছি, শিল্পের জন্য শিল্প না-কী জীবনের জন্য শিল্প। এই বিতর্কের অবসান ঘটাতে হলে শিল্প কী তা উপলব্ধি করা দরকার। আমি খুব সতর্কতার সাথে  ‘ উপলব্ধি ’  শব্দটি ব্যবহার করছি,  ‘ জানা ’  দরকার বলছি না। আমি সাধারণত বিখ্যাত মানুষের উদ্ধৃতি দিয়ে কোনো ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই না। প্রবন্ধ লেখার প্রচলিত ধারা হচ্ছে তথ্য-উপাত্ত এবং বিখ্যাতদের সংজ্ঞার আলোকে কোনো ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করা। আমি এই ধারা থেকে বের হয়েই কিছু লিখতে চাই। আমি শুধু লিখতে চাই আমার উপলব্ধির কথা। এবং এ-ও বলি, আমার উপলব্ধির যেটুকু আপনার ভালো লাগে সেটুকুই আপনি নেবেন, আমি কোনো সংজ্ঞা তৈরী করতে চাই না যা অন্যদের গ্রহন করতে হবে। তবে আমি সকল বিখ্যাত মানুষের কথাই জানতে চাই, পড়তে চাই। তারা কী লিখেছেন, বলেছেন তা জানার আগ্রহ আমার রয়েছে। আরো সুস্পস্ট করে যদি বলি, আমি সকলকেই গ্রহণ করতে চাই, কিন্তু দেবার সময় শুধু আমারটাই দেব, আমার মত করে।  মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক (সৃজনশীল এবং মননশীল) ক্...

কাজী জহিরুল ইসলামের কবিতা || আবুল কাইয়ুম

কাজী জহিরুল ইসলামের কবিতা: জাতীয়-বৈশ্বিক মেলবন্ধন   || আবুল কাইয়ুম ||    কবি যদি হন বিশ্বপরিব্রাজক ,  তবে তিনি তো কবিতায় আঁকবেন তাঁর দেখা দুনিয়ার ছবি। বৃহত্ত্বকে আশ্লেষ করার পরিণামে স্বাভাবিকভাবে তাঁর মধ্যে জন্ম নেবে মানবিক মহত্ত্ববোধ ,  তা যে কাব্যাদর্শের লাঠিতে ভর করেই হোক। আশির দশক থেকে ক্রমবিকশিত কবি কাজী জহিরুল ইসলামের ক্ষেত্রেও একথা সত্যি । পর্যাপ্ত বিশ্বভ্রমণের অভিজ্ঞতায় আলোকিত হয়েছেন বলেই তিনি যে কোনো সঙ্কীর্ণতার উর্ধ্বে থেকে নিজেকে উদারনৈতিক মানবিক চৈতন্যে সংগঠিত করতে পেরেছেন ,  বিশ্বমানবতা ও বিশ্বশান্তির মন্ত্রে উজ্জীবিত রেখেছেন। তাঁর ব্যক্তিত্বে জড়ো হয়েছে বৃহত্তর সমষ্টিচেতনা ,  তাঁর প্রেম ও প্রার্থনা মানব কল্যাণের আশ্রয়ে গড়ে উঠেছে। তার লেখনীতে নানা দেশের মানুষের জীবন ,  সংস্কৃতি ,  প্রেম ,  ত্যাগ ও সংগ্রামের চালচিত্র কীভাবে উঠে এসেছে তা তাঁর কবিতার সংস্পর্শে না এলে বোঝা যাবে না। তাঁর  ‘ এল সালভাদর ’  শীর্ষক কবিতার কথাই ধরা যাক। এই অত্যুজ্জ্বল কবিতার মাত্র কয়টি বিস্ময়কর পংক্তিই শুধু এখানে তুলে ধরছি-    হণ্ডু...