চৈতন্যের ঘর
|| কাজী জহিরুল ইসলাম ||
কোলকাতায় আছে কফি হাউস, ঢাকায় পঞ্চাশ/ষাটের দশকে শহীদ কাদরীরা গড়ে তুলেছিলেন বিউটি বোর্ডিং। এরপরে নব্বুইয়ের দশকে শাহবাগ কেন্দ্রিক লেখক আড্ডা গড়ে উঠলেও তেমন কোনো রেস্টুরেন্ট বা চা/কফির দোকান কেন্দ্রিক আড্ডা গড়ে ওঠেনি। হয়ত হয়েছিল কিন্তু সেইভাবে তা ব্র্যান্ডেড হয়নি। রাগীব আহসানের রেখায়নকে ঘিরে ষাট/সত্তরের দশকে অবশ্য লেখক, কবি, শিল্পী, সাংবাদিকদের একটি আড্ডা ঢাকায় গড়ে উঠেছিল। সেখানে আহমদ ছফা, আবিদ আজাদ, শিহাব সরকার, মাহবুব হাসানসহ অনেকেই নিয়মিত যেতেন। লন্ডনের হোয়াইট চ্যাপেলে বা নিউ ইয়র্কের জ্যাক্সন হাইটসে বাঙালিদের আড্ডা জমে ওঠে বটে তবে কোনো রেস্টুরেন্ট কেন্দ্রিক কবি-সাহিত্যিকদের আড্ডা গড়ে উঠেছে এমন খবর পাইনি। গত চার বছর ধরে আমি এবং কবি মাহবুব হাসান জ্যামাইকার কিং কাবাবে বসে চা-সিঙ্গারা খাই, অনেকেই আমাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন এইসব আড্ডায়। তবে আমি না থাকলে মাহবুব ভাই যেমন একলা বোধ করেন, মাহবুব ভাই না থাকলেও আমি একলা বোধ করি। শহীদ ভাইয়ের মৃত্যুর পরে প্রকৃতপক্ষে শিল্প-সাহিত্য নিয়ে, বিশেষ করে কবিতা নিয়ে, মন খুলে কথা বলার মানুষ এই শহরে পাই না বললেই চলে। এমন না যে তেমন বোধসম্পন্ন মানুষ নেই, কিন্তু সকলেরই নানান রকমের হিসাব নিকাশ থাকে, খোলা মনের মানুষের বড়ই অভাব। অগত্যা আমরা দুজনই শেষ পর্যন্ত। আজ মাহবুব ভাইয়ের কাজ ছিল। তিনি রাতে কাজ করেন, ফেরেন ভোরে, তো আজ আর আড্ডাটা হচ্ছে না। মুক্তি আমাকে সন্ধ্যায় বলে, বাইরে যাবে না? আমি বলি, না, মাহবুব ভাই আজ কাজে। হঠাৎ সন্ধ্যা সাতটায় মাহবুব ভাইয়ের ফোন। জহির আপনি কই? আমি তো বাসায়, আপনি? হিলসাইডে, কিং কাবাবে চলে আসেন। কিং কাবাব, শব্দ দুটি শুনলেই আমি অস্থির হয়ে উঠি। আপনি কাজে যাননি? গিয়েছি, আবার ফিরেও এসেছি।
আমি পাঁচ মিনিটের মধ্যেই তৈরী হয়ে শীতের রাতে কবি-বন্ধুর ডাকে ছুটে যাই। এই ডাক উপেক্ষা করার সাধ্য আমার নেই।
চায়ের অর্ডার দিয়ে আমরা আড্ডার ঝাঁপি খুলে বসি। এই রেস্টুরেন্টের মেয়েগুলিও প্রথম প্রথম বিউটি বোর্ডিংয়ের কর্মচারীদের মতো কাব্যরসহীন ছিল। এক কাপ চা নিয়ে আর কতক্ষণ বসে থাকবেন? এমন মুখ ঝামটা এখন আর আমাদের খেতে হয় না। ওরা বুঝে গেছে, এরা মানুষ না, ভিন্ন জাত, এই জাতের নাম কবি, এদের অপমান বোধ নেই, বাণিজ্য বোধ নেই, বৈষয়িক বোধ নেই, এদের কাছে জাগতিক লাভ-লোকসানের মূল্য বড়ই কম। মাহবুব ভাই আজকাল হাইকুর অনুকরণে বাংকু নাম দিয়ে ছোটো ছোটো কবিতা লেখার চেষ্টা করছেন। এরকম বেশ কিছু পড়ে শোনালেন।
নশ্বর-অবিনশ্বরের দ্বন্দ্ব লক্ষ করলাম তার ছোটো ছোটো পঙক্তিগুলোতে। তিনি কম কথায় প্রতিকাশ্রয়ী কবিতার পক্ষে বেশ ওকালতি করছেন। ইমিগ্রেশন জটিলতার কথা, সাত বছরের প্রতীক্ষার কথা, স্বপ্ন আর স্বপ্নভঙ্গের কথা বলেন। এসব আমাদের রোজকার গল্প। গল্পের বয়স বাড়ে, দেখার দৃষ্টি বদলায়, স্বপ্নেরা প্রান্তিক হয়ে পড়ে কখনো কখনো।
আমিও কিছু ছোটো ছোটো লাইন পড়ে শোনাই। আধ্যাত্মিক চিন্তার স্ফুরণই বেশি। আমি বলি, 'গাছের ডালে সময় বেঁধে রাখি। একটু আরো থাকি?' মাহবুব ভাই বলেন, এই যে আরো একটু থাকার আকুতি, এই আকুতি তো আমাদের সকলেরই, সব জায়গায়। এই স্বপ্নের পরবাসে যাই যাই করেও যেতে পারছি না। তবে জানুয়ারিতে আমি চলেই যাবো। আমাকে আর কিছুই আটকাতে পারবে না।
আমি জানি জানুয়ারিতে মাহবুব ভাইয়ের ফেরা হবে না। মার্চে তার হেয়ারিং। একটি/দুটি নয়, এমন হাজার হাজার গল্প আছে এই আমেরিকায়, যাই যাই করেও পঁচিশ বছর পাড় করে দিচ্ছে মানুষ, যাওয়া আর হচ্ছে না। অনেকে দুই বছরের শিশুকন্যাকে রেখে এসেছেন, সেই কন্যা বড় হয়েছে, বিয়ে হয়েছে, কন্যার কন্যা হয়েছে কিন্তু তার ফেরা হয়নি।
আর এই যে আমাদের পৃথিবীকাল। এটাও কী এক দীর্ঘ পরবাস নয়? আরো একটু থাকি, এই আকুতি কার নেই!
মাহবুব ভাই বলেন, আজকাল আমার কাছে মনে হয় ছোটো একটি বা দুটি লাইনে খুব বড় একটি চিন্তাকে ফোল্ড করার নামই কবিতা। হঠাৎ আমার মনে পড়ে যায় কাজী আবু জাফর সিদ্দিকীর একটি ছোটো কবিতার কথা। হতে পারে এটিই পৃথিবীর সবচেয়ে ছোটো কবিতা। কবিতার শিরোনাম 'পুরুষের ব্যর্থ অহংকার’ কবিতাটি হচ্ছে, 'আমি স্বামী'। মাহবুব ভাই হঠাৎ সচকিত হয়ে বলেন, এটা জাফর ভাইয়ের কবিতা? আমি বলি, হ্যাঁ। দারুণ তো, আমি এই কবিতাটি নিয়ে লিখবো।
আমরা আবারো চায়ের অর্ডার দেই। এই শহরে শীতের রাত ঘন হয়। কিং কাবাবের অতিথিরা বাড়ি ফিরে যায়। আমরা ফিরি না। যেন বাড়ি আমাদের পকেটেই, সেল ফোনের কী-বোর্ডে। কবিতার পঙক্তিরাই তো কবির ঘরবাড়ি। একবার ফজল শাহাবুদ্দীন বলেছিলেন, আমরা সবাই একটি গ্রামের মানুষ, সেই গ্রামের নাম কবিতাগ্রাম। আমরা সেই গ্রামটি সাথে নিয়েই ঘুরে বেড়াই।
আমার একটি কবিতার দুটি লাইন বারবার মনে পড়ছে, 'ঘর থেকে তো বেরিয়ে এলাম, আবার কেন ঘর/ আকাশটা যার ছাদ হলো আজ কোন গৃহ তার পর'।
সেলফোন বেজে ওঠে। জাগতিক ঘরের ডাকে আমাদের উঠতেই হয়। এভাবেই কবির চৈতন্যের ঘর ভেঙে যায় শব্দের কোলাহলে, প্রতিদিন, প্রতিক্ষণ।
জ্যামাইকা। ২৪ নভেম্বর ২০১৯।

Comments
Post a Comment