Skip to main content

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জুর সাক্ষাৎকার || অষ্টম পর্ব ||

[লেখক, সাংবাদিক, অনুবাদক আনোয়ার হোসেইন মঞ্জুর সাক্ষাৎকারের অষ্টম পর্ব আজ প্রকাশ করা হলো। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কবি কাজী জহিরুল ইসলাম।]    


 দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ বাসস-কে অকার্যকর করেছে 

– মঞ্জু 


 

জহিরুলঃ আপনি ফেলোশিপ নিয়ে দিল্লীতে ছয়মাস ছিলেন, ব্যক্তিগত আগ্রহ এবং পেশাগত অভ্যাসের কারণে কাছে থেকে দেখার/বোঝার চেষ্টা করেছেন ভারতের এবং উপমহাদেশের রাজনীতি। আমরা দেখি ভারতের রাজনীতিতে গায়ক, নায়ক, লেখক, সাংবাদিকের আবির্ভাব ঘটে সব সময়ই এবং তারা রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও রাখেন। বাংলাদেশে এই ধারা খুব সম্প্রতি শুরু হলেও আমাদের জনপ্রিয় খেলোয়াড়, শিল্পীরা নিজেদের অর্থনীতি সমৃদ্ধ করা ছাড়া রাজনীতিতে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেন না। এমন কি ধর্ষণ, অন্যদেশকে ট্রানজিট প্রদান, উপর্যুপরি সড়ক দূর্ঘটনা, পরিবেশ ধ্বংসকারী কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্প ইত্যাদি ইস্যুতেও তারা নীরব। অথচ তাদের জনপ্রিয়তা এবং রাজনীতি সম্পৃক্ততা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত, যা ভারতে দেখা যায়। বিষয়টি যদি আপনার মতো করে ব্যাখ্যা করেন। 

মঞ্জুঃ দিল্লিতে আমার অবস্থানকালকে আমি নানা দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করি। প্রথমত উপমহাদেশের রাজনীতি এবং বিশেষ করে পার্লামেন্টারি ব্যবস্থা ও সাংবিধানিক বিকাশের ওপর নিবিড় পড়াশোনা করা এবং দ্বিতীয়ত এসব বিষয় সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের লোকজনের সাথে ঘনিষ্টভাবে মেলামেশা ও মতবিনিময়ের সুযোগ লাভ। এ সময়ে ভারতের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ হয়নি। ক্লাস ও পেপার তৈরির কাজে ব্যতিব্যস্ত থাকতে হয়েছে। আমাদের ক্লাস নিতেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চতর আইন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংবিধান ও আইন বিভাগের শিক্ষক, ভারতীয় পার্লামেন্টের উর্ধতন কর্মকর্তাবৃন্দ। অনেক সময় লোকসভা ও রাজ্যসভার সেক্রেটারী জেনারেলদ্বয় এবং আইন মন্ত্রণালয়ের সচিবের সাথেও আমাদেরকে মতবিনিময় করতে হয়েছে। বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ঘটনাকে কেন্দ্র করে তখন রাজনৈতিক পরিস্থিতি বেশ জটিল ছিল এবং সকল প্রধান দলের রাজনীতিবিদরা তা নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। ভারত বিশাল এবং বৈচিত্রপূর্ণ ও বৈপরত্যেভরা একটি দেশ। রাজনীতিতে এই বৈচিত্রের সমন্বয় সাধনের জন্যও নিরন্তর চেষ্টা চালাতে হয় এবং এজন্য দেশটির সংবিধান প্রনেতারা শুরু থেকেই সে সুযোগ সৃষ্টি করেছেন। ভারতীয় পার্লামেন্টের উচ্চ কক্ষ, যা ‘রাজ্যসভা’ নামে পরিচিত, সেই রাজ্যসভার সদস্য সংখ্যা ২৫০ জন। কোনো সময়ে এই সংখ্যা কম হলেও ২৫০ এর বেশি হওয়ার সুযোগ নেই। রাজ্য বিধান সভাগুলো রাজ্যসভার সদস্যদের নির্বাচন করে পাঠান। ১২ জন সদস্য মনোনয়নের এখতিয়ার সম্পূর্ণভাকে রাষ্ট্রপতির উপর। শিক্ষা, বিজ্ঞান, শিল্প, সাহিত্য, সমাজসেবাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রেখেছেন এমন জনপ্রিয় ব্যক্তিদের তিনি রাজ্যসভায় মনোনয়ন প্রদান করেন, যারা ৬ বছর পর্যন্ত রাজ্যসভার সদস্য থাকেন। যে নামগুলো আমাদের অতি পরিচিত পৃত্থিরাজ কাপুর, লতা মুঙ্গেশকর, তারাশঙ্কর ব্যানার্জি, মৃণাল সেন, শাবানা আজমী, জাভেদ আখতার, নার্গিস, বৈজয়ন্তীমালা, হেমামালিনী, খুশবন্ত সিং, কুলদীপ নায়ার, রেখা, হরিবংশ বচ্চন, এম এফ হোসেন, স্যাম বেনেগাল, শচীন টেন্ডুলকরসহ আরো অনেকে রাষ্ট্রপতির মনোনয়ন পেয়ে রাজ্যসভায় প্রতিনিধিত্ব করেছেন। এর বাইরে নির্বাচনে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেও অনেক চলচ্চিত্রাভিনেতা, সাংবাদিক, লেখক লোকসভায় নির্বাচিত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ধর্মেন্দ্র, রাজেশ খান্না, অমিতাভ বচ্চন, মিঠুন চক্রবর্তী, গোবিন্দা হার্টথ্রব অভিনেতা ছিলেন।  অভিনেত্রীরাও পিছিয়ে নেই, হেমামালিনী, জয়াপ্রদা, স্মৃতি ইরানি, মুনমুন সেন, উর্মিলা, মৌসুমী, শতাব্দী রায় সরাসরি নির্বাচন করেছেন। কখনো জয়ী হয়েছেন, কখনো হননি। কিন্তু তারা রাজনীতিতে সক্রিয়। দক্ষিণের রাজ্যগুলোতে খ্যাতিমান অভিনেতা-অভিনেত্রী এমজি রামাচন্দ্রণ, এনটি রামা রাও, জয়াললিতা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। সাংবাদিকদের মধ্যে এমজে আকবর, অরুণ সুরি, শশী থারুরসহ আরো অনেকে নির্বাচিত হয়েছেন, মন্ত্রীত্ব করেছেন কেউ কেউ। আরো অনেক খ্যাতিমান ভারতীয়, রাজনীতিবিদ নন, কিন্তু পার্লামেন্টে নির্বাচিত হয়েছে সে তালিকা দীর্ঘ। এক কথায় ভারতে প্রায় সকল পেশার মানুষ রাজনৈতিক নেতৃত্বে এগিয়ে এসেছেন এবং জনগণের প্রতিনিধিত্ব করছেন। দিল্লিতে আমি প্রথমে উঠি নিজামুদ্দিন এলাকায়। এটি শুধু মুসলিম প্রধান এলাকাই নয়, এই এলাকায় রয়েছে নিজামুদ্দিন আউলিয়ার মাজার, বিশ্ব তবলীগ জামাতের হেড কোয়ার্টার, সম্রাট হুমায়ুনের সমাধি, মির্জা গালিব একাডেমী ইত্যাদি। কংগ্রেস প্রধান এলাকা এবং এই এলাকার লোকসভা সদস্য অভিনেতা রাজেশ খান্না। মুসলিম ভোটারদের অত্যন্ত প্রিয়ভাজন। তার নির্বাচিত হওয়ার ঘটনাও উল্লেখ করার মত। ১৯৯১ সালের লোকসভা নির্বাচনে তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিজেপির এলকে আদভানি। ফলাফলে দেখা গেল রাজেশ খান্না দেড় হাজারের কিছু বেশি ভোটে আদভানির কাছে হেরেছেন। তিনি বেঁকে বসেন। আদভানির বিরুদ্ধে ভোট জালিয়াতি ও কারচুপির অভিযোগ আনেন। আদভানিকে এ অভিযোগ নিয়ে পদত্যাগ করতে হয়। ১৯৯২ সালে শূন্য আসনে উপনির্বাচন ঘোষণা করা হলে আবারও রাজেশ খান্না কংগ্রেস প্রার্থী হিসেবে লড়েন। এবার আদভানি প্রার্থী হননি। তার পরিবর্তে বিজেপির প্রার্থী ছিলেন অভিনেতা শত্রুঘ্ন সিনহা। রাজেশ খান্না ২৫ হাজারের বেশি ভোটে তার প্রতিদ্বন্দ্বীকে হারিয়ে লোকসভার সদস্য নির্বাচিত হযেছিলেন। 

বাংলাদেশেও রাজনীতিবিদের বাইরে ভিন্ন পেশার খ্যাতিমানদের জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করার দৃষ্টান্ত  রয়েছে, কিন্তু তা একেবারেই নগন্য। বর্তমান জাতীয় সংসদে একজন সেরা ক্রিকেটার মাশরাফি, পেশাদার সাংবাদিক শফিকুর রহমান নির্বাচিত হয়েছেন। প্রথম জাতীয় সংসদে সাংবাদিক এবিএম মুসা, মইনুল হোসেন, দ্বিতীয় জাতীয় সংসদে খন্দকার আবদুল হামিদ নির্বাচিত হয়েছিলেন। এভাবে আপনি সব সংসদেই ভিন্ন পেশার দু’একজন পাবেন, যারা সংসদে প্রতিনিধিত্ব করেছেন, মন্ত্রীত্ব করেছেন। বাংলাদেশের পার্লামেন্ট এক কক্ষ বিশিষ্ট এবং নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা ছাড়া সংসদের সদস্য হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ব্যতিক্রম রয়েছে শুধু সংরক্ষিত নারী আসন, সেক্ষেত্রেও দলীয় বিবেচনাই প্রধান। রাজনৈতিক দলগুলো এমন কোনো ব্যক্তিকে মনোনয়ন দেয় না, যার হেরে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে অথবা উদয়াস্ত রাজনীতিতে সক্রিয়, ছাত্রজীবনে দলের পক্ষে মাস্তানি করে প্রতিপক্ষ দলের নেতাকর্মীদের মারধোর করে ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়ন করেছেন, মামলার আসামী হয়ে পালিয়ে বেড়িয়েছেন, জেলে গেছেন, পুলিশের লাঠিপেটা খেয়েছেন এমন ব্যক্তিরাও তার এলাকায় হুট করে দলের পক্ষ থেকে নবাগত কাউকে মনোনয়ন দিলে তা মেনে নিতে পারেন না। অতএব অন্য কোনো পেশার লোক যদি রাজনীতিতে সক্রিয় না থাকেন তাহলে তাদের পক্ষে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ কম। কিন্তু পেশাজীবীদেরও প্রয়োজন হয় রাজনীতিবিদদের এবং সেজন্য দলীয় সরকারগুলো তাদের চামচা পেশাজীবীদের ছোট ছোট দেশের রাষ্ট্রদূত এবং অন্যান্য দেশে বাংলাদেশ দূতাবাসে প্রেস মিনিষ্টার, কালচারাল মিনিষ্টার, বিভিন্ন সংস্থার চেয়ারম্যান, মহাপরিচালক, রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদের সদস্যসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের পরিচালক পদে মনোনয়ন দেয়। প্রায় প্রতিটি পেশার কিছু লোক এ কারণে বড় বড় দলের শীর্ষ নেতাদের সুনজরে থাকার চেষ্টা করেন। 

বাংলাদেশে কখনো গণতন্ত্রের চর্চা হয়নি। গণতন্ত্রের নামে বরাবর একনায়কতান্ত্রিক ব্যবস্থাই বলবৎ ছিল এখনো আছে। এককভাবে ভূমিকা রাখার কোনো সুযোগ বাংলাদেশে নেই। এমনকি আপনি যদি নিজের উদ্যোগে কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন, দেশে বিদেশে আপনার ব্যক্তিগত যোগাযোগের কারণে তহবিল সংস্থান করে সকল আইন অনুসরণ করে জনগণের সেবায় কিছু করতে চেষ্টা করেন, অল্পদিনের মধ্যে আপনার সেবাকর্মের পেছনের উদ্দেশ্যনিয়ে সংশয় পোষণ করা হবে, আপনার প্রতিষ্ঠানে প্রভাবশালী দলের লোক নিয়োগের জন্য চাপ দেয়া হবে এবং আপনি তাদের কথামত না চললে আপনার কাজে পদে পদে বাধা সৃষ্টি করা হবে। অতএব যাদের দেশ হিতকর জনকল্যাণের আগ্রহও থাকে তারা পিছিয়ে থাকেন। ভারতকে ট্রানজিট প্রদান, বেপরোয়া সড়ক দূর্ঘটনা, কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্পের কারণে সুন্দরবনের বিনাশ হওয়া আশঙ্কা, ধর্ষণের মতো অপরাধের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কণ্ঠের চেয়ে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা বেশি সোচ্চার। ক্ষমতাসীন দল সবসময় এ ধরনের সংস্থাকে তাদের স্বার্থবিরোধী কাজে লিপ্ত বলে বিবেচনা করে। যেহেতু তারা রাজনৈতিক সমর্থন লাভ করে না, অতএব তাদের কণ্ঠ রাজপথ পর্যন্তই সীমিত থাকে। 

জহিরুলঃ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বেশ ক'জন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। আপনি, মালয়েশিয়ার সাবেক উপপ্রধান ও ভারপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী এবং বর্তমান বিরোধী দলীয় নেতা আনোয়ার ইব্রাহীম, সৌদি সামাজিক সংস্থা মুতামার আলম আল ইসলাম এর প্রধান মোহাম্মদ হারাকান ও ড. আবদুল্লাহ ওমর নাসিফসহ আরো অনেকের ইন্টারভিউ করেছেন। এইসব সাক্ষাৎকার গ্রহনের সময় ভাষা কি অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে? নানান দেশের ক্ষমতাধর মানুষের সান্নিধ্য কেমন উপভোগ করেছেন? আমাদের দেশের রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সাথে তাদের উল্লেখযোগ্য কোনো গুণগত পার্থক্য চোখে পড়েছে? 

মঞ্জুঃ মালয়েশিয়ার বর্তমান বিরোধী দলীয় নেতা, পিপলস জাস্টিস পার্টির প্রেসিডেন্ট আনোয়ার ইব্রাহিম আশির দশকের প্রথম দিকে যখন তার দেশে একজন জনপ্রিয় যুব নেতা তখন আমি দু’বার তার সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছি। ওই সময়ে বাংলাদেশের ইসলামী সংগঠনগুলোর আমন্ত্রণে তিনি প্রায়ই ঢাকায় আসতেন এবং বিভিন্ন ইসলামী সভা-সমাবেশে অতিথি হিসেবে আমন্ত্রিত হতেন। ‘আবিম’ নামে পরিচিতি ‍মুসলিম ইয়ুথ মুভমেন্ট অফ মালয়েশিয়ার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন তিনি। এর আগে তিনি ন্যাশনাল ইউনিয়ন অফ মালয়েশিয়ান মুসলিম স্টুডেন্টস এর প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তরুণ বয়সেই তিনি আরও কয়েকটি জাতীয় ও আঞ্চলিক সংগঠনের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন। আপনার হয়তো মনে আছে হংকং থেকে ‘এশিয়া উইক’ ও ‘ফার ইস্টার্ন ইকনমিক রিভিউ’ নামে আন্তর্জাতিক মানের দুটি সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন প্রকাশিত হতো। দুটি ম্যাগাজিনের প্রকাশনাই বন্ধ হয়ে গেছে। আশির দশকে দুটি ম্যাগাজিনে কিছুদিন পরপরই আনোয়ার ইব্রাহিমের ওপর কভার স্টোরি প্রকাশ করা হত। আমি বিস্ময় বোধ করতাম। কিন্তু ঢাকায় তার একাধিক বক্তৃতা শোনার পর ও তার সাক্ষাৎকার নেয়ার পর মনে হয়েছে যে তিনি হ্যামিলনের বংশীবাদকের বাঁশীর সুরের মত তার কথা যাদুতে মানুষকে তার প্রতি আকৃষ্ট করার মত প্রতিভাধর। ১৯৭৫ সালের পর সৌদি আরব বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। এরপর ঢাকায় সৌদি দূতাবাস চালু করা হয় এবং সৌদি পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলাদেশে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ইসলামী তৎপরতা গতি লাভ করে। সম্ভবত ১৯৮০ সালে গাজীপুরের মৌচাকে ন্যাশনাল স্কাউট ট্রেনিং সেন্টারে সৌদি আরব ভিত্তিক ওয়ার্ল্ড এসেম্বলি অফ মুসলিম ইয়ুথ এর একটি আঞ্চলিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় এবং প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সম্মেলন উদ্বোধন করেন। আনোয়ার ইব্রাহিম ওই সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন। সম্মেলনস্থলেই আমি তার সাক্ষাৎকার নেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করি এবং পরদিন সকালে তিনি আমাকে তার হোটেলে যেতে বলেন। তিনি হোটেল পূর্বাণীতে ওঠেছিলেন। পরদিন সকালে আমি হোটেলে তার রুমে যাই, একসাথে নাশতা করি।  আমার নির্দিষ্ট কিছু প্রশ্ন ছিল। তিনি সবগুলো প্রশ্ন একসাথে করতে বলেন। তিনি একসাথে উত্তর দেবেন। উত্তরের প্রেক্ষিতে যদি কোনো সম্পুরক প্রশ্ন আসে সেগুলো তার উত্তরের পর জানাতে বলেন। আমি প্রশ্নগুলো করি, তিনি দু’একটা পয়েন্ট কাগজে টুকে নিয়ে বলতে শুরু করেন। আগে তার যে কয়েকটি বক্তৃতা শুনেছি, সেগুলো ছিল রাজনৈতিক নেতার জ্বালাময়ী বক্তৃতা, ছন্দময় কথামালা। কিন্তু আমার প্রশ্নের উত্তর দিলেন শিক্ষকের মত। মালয়েশিয়াকে আধুনিক রাষ্ট্রে পরিণত করার ব্যাপারে তার স্বপ্ন, মুসলিম বিশ্বের অনৈক্য দূর করার জন্য তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, মুসলিম বিশ্বের প্রতি পাশ্চাত্যের বৈরী মনোভাব দূর করার কৌশল নির্ধারণে মুসলিম দেশগুলোর করণীয় সম্পর্কে তিনি বলে যাচ্ছিলেন। খেই হারিয়ে ফেলতে পারি বলে কথার মাঝে প্রশ্ন করতে চেষ্টা করলে হাতের ইশারায় তিনি আমাকে থামিয়ে দেন। এভাবে প্রায় এক ঘন্টা কথা বললেন তিনি। আমি টেপ রেকর্ডার নিয়ে গিয়েছিলাম, কাজেই কথা ধারণ করতে অসুবিধা হয়নি। তিনি থামলে আমি কয়েকটি সম্পুরক প্রশ্ন করি। তিনি সেগুলোরও উত্তর দেন। আমার দৃঢ় ধারণা জন্মে আনোয়ার ইব্রাহিম মালয়েশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ একজন নেতা হতে যাচ্ছেন। পরের বছর তিনি ঢাকায় এলে আমি আবারও তার সাক্ষাৎকার নেই। 

সাংবাদিকতার ওপর একটি প্রশিক্ষণে অংশ নেয়ার সুযোগ পেয়ে ১৯৮৩ সালে আমি তিন মাসের জন্য তদানীন্তন পশ্চিম বার্লিনে যাই। জার্মানির প্রবীণ সাংবাদিক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ছাড়াও বিভিন্ন দেশের খ্যাতিমান সাংবাদিকরা আমাদের প্রশিক্ষক হিসেবে আসতেন। মালয়েশিয়া থেকে এলেন ‘এশিয়া উইক’ এর ডেভিড লেজারাস। এক সপ্তাহ আমাদের ক্লাস নিয়েছেন তিনি। এসময় আমি তাকে প্রশ্ন করেছিলাম যে এশিয়া উইক ও ফার ইস্টার্ন ইকনমিক রিভিউ আনোয়ার ইব্রাহিমকে এতটা কভারেজ দেয় কেন। তিনি তখন মালয়েশিয়ার মূল ধারার রাজনীতিতে পা রেখেছেন। আমি যে আনোয়ার ইব্রাহিমের সাক্ষাৎকার নিয়েছি সেকথাও তাকে বলি। ডেভিড লেজারাস বলেন, তুমি দেখে নিয়ো, আনোয়ার ইব্রাহিম মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী হবেন। এই বয়সেই তিনি ক্যারিশম্যাটিক নেতা হয়ে উঠেছেন। মালয়েশিয়া আমাদের সবচেয়ে বড় মার্কেট। তার ওপর কভার স্টোরি করলে ম্যাগাজিনের কাটতি বেড়ে যায়, যা অন্য কারো কভারেজ দিয়ে হয় না। তাছাড়া তিনি যে জনপ্রিয় তা অস্বীকার করার উপায় নেই। শুনে আমার ভালো লাগে। আনোয়ার ইব্রাহিমের সাথে পরিচয় থাকার কারণে আমি সবসময় তার খবর রাখার চেষ্টা করেছি।

প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদের আহবানে ১৯৮২ সালে আনোয়ার ইব্রাহিম ক্ষমতাসীন দল ইউনাইটেড মালয় ন্যাশনাল অর্গানাইজেশনে যোগ দেন। তাকে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী করা হয়। এরপর তিনি যুব ও ক্রীড়া, কৃষি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন এবং ১৯৮৬ সালে তাকে শিক্ষা মন্ত্রী করা হয়। পরবর্তী ধাপ উপপ্রধানমন্ত্রী বলে ধারণা করা হচ্ছিল। ১৯৯১ সালে তাকে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব দেয়া হয় এবং ১৯৯৩ সালে মাহাথির মোহাম্মদ তাকে উপপ্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করেন। ১৯৯৭ সালে তাকে ভারপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে ন্যস্ত করে মাহাথির দুই মাসের ছুটি কাটান। কিন্তু নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে মাহাথিরের সাথে তার সম্পর্কের অবনতি ঘটতে শুরু করে। ১৯৯৮ সালে মাহাথির তাকে মন্ত্রীত্ব থেকে অপসারণ করেন তার বিরুদ্ধে সমকামের অভিযোগ এনে ১৯৯৯ সালে গ্রেফতার ও বিচারে তাকে কারাদন্ড প্রদান ও নির্বাচনের অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। কারামুক্তি ও নির্বাচনে অযোগ্যতার মেয়াদ শেষে তিনি নির্বাচিত ও বিরোধী দলের নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন। দ্বিতীয় সমকামের অভিযোগে পুনরায় তাকে পাঁচ বছরের দণ্ড দেয়া হয় এবং রাজকীয় ক্ষমায় তিনি কারামুক্ত হওয়ার পর পুনরায় নির্বাচিত হয়ে বর্তমানে বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আমি এখনো বিশ্বাস করি আনোয়ার ইব্রাহিম একসময় মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর পদ অলংকৃত করবেন।

১৯৮০ সালের শেষ দিকে আমি সৌদি আরবের একজন প্রবীণ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতার সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছি, যিনি মুতামার আলম আল ইসলামী বা ওয়ার্ল্ড মুসলিম কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তাঁর পুরো নাম মনে নেই। বেশ দীর্ঘ নাম। তবে নামের শুরুতে মোহাম্মদ ও শেষে হারাকান ছিল। তিনি সৌদি রাজ পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। মুতামার আলম আল ইসলামী এটি একটি রাষ্ট্রীয় সংস্থা, যে সংস্থার সৃষ্টি হয়েছিল ১৯২৬ সালে ওই সময়ের সৌদি বাদশাহ আবদুল আজিজের উদ্যোগে। মক্কায় বিশ্ব মুসলিম নেতৃবৃন্দের এক সম্মেলনে এটির গোড়াপত্তন হয় এবং মুতামার এর দ্বিতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় জেরুসালেমে ১৯৩১ সালে। এরপর দীর্ঘদিন পর্যন্ত সংস্থাটির কার্যক্রম স্থিমিত বা বন্ধ ছিল। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মুতামার আলম আল ইসলামীকে পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় এবং তার মৃত্যুর পর পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী সংস্থাটিকে কার্যকর করার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখেন এবং ১৯৪৯ সালে দেশটির তখনকার রাজধানী করাচিতে বিশ্বের মুসলিম নেতৃবৃন্দের এক সম্মেলনে সংস্থাটি পুনরুজ্জীবিত হয়। এ সংস্থাই পরবর্তী অর্গানাইজেশন অফ ইসলামিক কোঅপারেশন (ওআইসি) গঠনে অবদান রাখে। ১৯৭৮ সালে তখনকার বার্মা, আজকের মিয়ানমার সরকার, রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর নির্যাতন শুরু করলে প্রথমবারের মত বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা মুসলিম নাফ নদী পেরিয়ে টেকনাফে চলে আসে। তাদের ত্রাণ ও পুনর্বাসনের কাজ করা বাংলাদেশ সরকারের জন্য খুব সহজ ছিল না। অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থা তাদের সাহায্যার্থে এগিয়ে আসে। তবে সবচেয়ে বড় আকারে সহায়তা আসে মুতামার আলম আল ইসলামীর সহযোগী মক্কাভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা রাবিতাত আলম আল ইসলামী (ওয়ার্ল্ড মুসলিম লীগ) থেকে। এই সংস্থাটি বিশেষ করে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের চিকিৎসার পুরো দায়িত্ব পালন করে। এছাড়া আটকে পড়া পাকিস্তানিদের চিকিৎসা সেবা দানেও তারা ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে ক্লিনিক ও হাসপাতাল স্থাপন করে। এই সূত্রেই মুতামার আলম আল ইসলামী প্রধান ১৯৮০ সালে বাংলাদেশ সফরে আসেন। তার সফর বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সফর ছিল। তাকে রাষ্ট্রীয় অতিথির মর্যাদা দিয়ে রাখা হয়েছিল রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন মেঘনায়। আমাকে তার সাক্ষাৎকার গ্রহণের দায়িত্ব দেয়া হলে আমি তার প্রটোকলের দায়িত্ব পালনকারী অফিসারের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তিনি আমাকে সৌদি দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। সৌদি দূতাবাসে যোগাযোগ করলে আমাকে জানানো হয় জনাব হারাকান আরবি ছাড়া অন্য কোনো ভাষা জানেন না। আমি সাক্ষাৎকার গ্রহণের আশা ছেড়ে দেই। এদিকে হারাকানের ঢাকা ত্যাগ করার সময় ঘনিয়ে এসেছে, তিনি প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন, সৌদি দূতাবাসে তার সম্মানে আয়োজিত রিসেপশন হয়ে গেছে। এরই মধ্যে বাংলাদেশে প্রথম সৌদি রাষ্ট্রদূত ফুয়াদ আবদুল হামিদ আল খতিবের সঙ্গে ঘনিষ্ট সম্পর্ক ছিল এমন এক ব্যক্তি আমাকে উদ্ধারের জন্য এগিয়ে আসেন। তিনি সৌদি রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে কথা বলার পর রাষ্ট্রদূত দোভাষি হিসেবে সাক্ষাৎকারে উপস্থিত থাকতে সম্মত হন। আমি দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে পড়ি। দোভাষির মাধ্যমে কখনো কথা বলিনি। আমার নিয়মিত সাংবাদিকতার মাত্র তিন বছর কেটেছে। তখনো ইংরেজি খুব ভালো বলতে পারি না। একজন রাষ্ট্রদূতের সামনে ভুল ও ভাঙা ইংরেজি বলবো ভেবে সংকোচ বোধ করছিলাম। সৌদি রাষ্ট্রদূতের কূটনৈতিক জীবন সম্পর্কে আগে থেকেই জানা ছিল। তার পিতা শেখ আবদুর হামিদ খতিব পাকিস্তানে প্রথম সৌদি রাষ্ট্রদূত ছিলেন এবং তাঁর দাদা ছিলেন মিশরে সৌদি রাষ্ট্রদূত। কূটনৈতিক ফুয়াদ আদুল হামিদ আল খতিব বাংলাদেশে আসার আগে পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র, নাইজেরিয়া ও তুরস্কে রাষ্ট্রদূতসহ বিভিন্ন কূটনৈতিক দায়িত্ব পালন করেছেন। এক কথায় তিনি ডাকসাইটে একজন কূটনীতিক। বিব্রতভাব ও দ্বিধা সংকোচ সত্বেও নির্ধারিত সময়ে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন মেঘনায় উপস্থিত হলাম। রাষ্ট্রদূত আগে থেকেই উপস্থিত ছিলেন। আমাকে স্বাগত জানালেন। রাষ্ট্রদূত মিশুক, খোলামেলা স্বভাবের মানুষ। আগেও অনেক অনুষ্ঠানে দেখেছি মানুষের সাথে সহজে মিশতে। তাকে অনুসরণ করে দোতলায় ঠলাম। ড্রয়িং রুমে বসে ছিলেন মোহাম্মদ হারাকান। বেশ বয়স তার। মেদবহুল শরীরের কারণে হয়তো প্রকৃত বয়সের চেয়ে আরও বেশি বয়স্ক মনে হয়। সৌদিদের চেহারায় সাধারণত যেমন গাম্ভীর্য ও বিষন্নতা থাকে, হারাকানও তার ব্যতিক্রম ন। সালাম দিলাম। উত্তর দিলেন কিনা বোঝা গেল না। রাষ্ট্রদূতের সাথে আরবিতে কিছু কথা বলার পর রাষ্ট্রদূত বসলেন হারাকানের পাশে, আমি রাষ্ট্রদূতের পাশে। টেবিলে টেপরেকর্ডার রেখে প্রস্তুত হলাম। এক এক করে প্রশ্নগুলো করছিলাম। আমি ইংরেজিতে বলি, রাষ্ট্রদূত খতিব তা আরবিতে তরজমা করে হারাকানকে বলেন, হারাকান আরবিতে উত্তর দেয়ার পর রাষ্ট্রদূতের মাধ্যমে ইংরজিতে আমার কাছে উত্তর আসে। তার বাংলাদেশ সফরের প্রাথমিক উদ্দেশ্য রোহিঙ্গা মুসলিমদের ত্রাণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা। রোহিঙ্গাদের সমস্যা তিনি আগে থেকেই অবহিত। কারণ পাকিস্তান আমলে অনেক রোহিঙ্গা মুসলিম সৌদি আরবে গিয়ে বার্মায় তাদের প্রতি সরকারের বিমাতাসুলভ আচরণ সম্পর্কে অভিযোগ করেছে এবং মক্কায় বেশ কিছু রোহিঙ্গা পরিবার স্থায়ীভাবে বসবাস করছে। এবার সংকট শুরু হওয়ার পর আন্তর্জাতিক ও মুসলিম বিশ্বের উদ্যোগের পাশাপাশি মক্কায় বসবাসরত রোহিঙ্গা মুসলিমরা মোতামার আলম আল ইসলামীর কাছে আবেদন করেছেন রোহিঙ্গা মুসলিমদের সংকট নিরসনে সহায়তা করার জন্য। তিনি দেশে ফিরে গিয়ে সৌদি সরকারের সাথে এ ব্যাপারে আলোচনা করবেন এবং মোতামার এর পক্ষ থেকে বাংলাদেশে আগত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ত্রাণ পুনর্বাসনে যথাসাধ্য সাহায্য করা ছাড়াও মুসলিম বিশ্বের কাছে এ ব্যাপারে সহযোগিতার আহবান জানাবেন। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সাথে তাঁর আন্তরিকতাপূর্ণ ও ফলপ্রসু আলোচনা হয়েছে। বার্মায় রোহিঙ্গা মুসলিমদের সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য উদ্যোগ নিতে মোতামার আলম আল ইসলামীকে ভূমিকা রাখার জন্য প্রেসিডেন্ট জিয়া তাকে অনুরোধ জানিয়েছেন এবং হারাকান প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এ ব্যাপারে তার অবস্থান থেকে মুসলিম দেশগুলোর রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানদের কাছে আহবান জানানোর। আনুষ্ঠানিক কথাবার্তার বাইরে একটি শব্দও তিনি উচ্চারণ করেননি।

পরবর্তীতে, সম্ভবত ১৯৮৩ সালে আমি মুতামার আলম আল ইসলামীর আরেকজন কর্মকর্তার সাক্ষাৎকার গ্রহণ করি। সৌদি শিক্ষাবিদ, ফিলানথ্রপিষ্ট ড. আবদুল্লাহ ওমর নাসিফ। বর্তমানে তিনি মুতামার এর প্রেসিডেন্ট। আমার সাক্ষাৎকার গ্রহণের সময় তিনি ছিলেন বাদশাহ আবদুল আজিজ ইউনিভার্সিটির ভূতত্ব ও রসায়ন বিভাগের প্রফেসর ও সেবা সংস্থা রাবিতাত আলম আল ইসলামীর সেক্রেটারী জেনারেল  বাংলাদেশে রোহিঙ্গা মুসলিম শরণার্থী ও আটকে পড়া পাকিস্তানিদের চিকিৎসা সেবা দেয়ার উদ্দেশ্যে রাবিতাতের পক্ষ থেকে উখিয়া, ঢাকা ও পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থাপিত হাসপাতালগুলোর কার্যক্রম পরিদর্শন করতে এবং ঢাকায় মুসলিম দেশগুলোর শিক্ষা সংক্রান্ত কোনো সম্মেলনে অংশগ্রহণ করতে তিনি এসেছিলেন। তার সম্পর্কে আমাকে ধারণা দেয়া হয়েছিল যে তিনি সৌদি রাজ পরিবারের অতি ঘনিষ্ট, সৌদি সরকারের অনেক সিদ্ধান্ত গ্রহণে তার সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকে। তার সাক্ষাৎকারের দিনক্ষণ নির্ধারণের জন্যও সৌদি দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে তার রুমে নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত হই। উদারভাবে স্বাগত জানান। প্রচলিত সৌদি পোশাকেই ছিলেন তিনি। ওই সময় তার বয়স পঞ্চাশের নিচে। বয়সের কারণেই বোধ হয় মোহাম্মদ হারাকানের মতো গাম্ভীর্য নেই তার। হেসে হেসে োলামেলা কথা বলেন।

প্রথমে তাঁর জীবন সম্পর্কে জানতে চাই। তিনি হাইস্কুল পর্যন্ত জেদ্দায় পড়াশোনা করেছেন। রিয়াদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভূতত্ব ও রসায়নের ব্যাচেলর ও মাষ্টার্স করার পর যুক্তরাজ্যের লিডস ইউনিভার্সিটি থেকে ভূতত্বে পিএইচডি করে রিয়াদ বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাসিষ্ট্যান্ট প্রফেসর হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তীতে তার নিজ শহর জেদ্দায় অবস্থিত বাদশাহ আবদুল আজিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন এবং বাংলাদেশ সফরে আসার কিছুদিন আগেই প্রফেসর পদে উন্নীত হয়েছেন। আমি তাকে অভিনন্দন জানাই। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি স্কাউন্ট আন্দোলন, শিক্ষা বিস্তার ও মানব সেবামূলক  কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। বাংলাদেশের শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যাংকিং খাতেও তিনি অবদান রাখার চেষ্টা করবেন বলে জানান। সাক্ষাৎকারে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেন, তা হলো, সৌদি আরব উন্মুক্ত দেশ নয়, রক্ষণশীল দেশ। মুসলিম, অমুসলিম সকল দেশ সৌদি আরবকে একটি কট্টর দেশ মনে করে। আমরা রক্ষণশীল, একথা সত্য। আমরা আমাদের সমাজব্যবস্থা নিয়ে সন্তুষ্ট। আমরা এই গণ্ডি থেকে বের হতে চেষ্টা করলেও সহজে বের হতে পারবো না। কিন্তু আমরা ইতোমধ্যে যে শিক্ষা কাঠামো গড়ে তুলেছি তা আমাদের জাতীয় চাহিদার তুলনায় বেশি এবং বাংলাদেশসহ মুসলিম দেশসমূহ আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সাধারণ বিষয় ছাড়াও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ওপর পড়াশোনা করার জন্য আসতে পারে।  কিন্তু দু:খজনক হচ্ছে মুসলিম দেশগুলোর ছাত্ররা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ে পড়াশোনা করতে যায় পাশ্চাত্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে, এবং তারা সৌদি আরবে প্রধানত ধর্মীয় বিষয়ের ওপর পড়াশোনা করতে যায়। তিনি এ দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করার জন্য উচ্চ শিক্ষা গ্রহণে আগ্রহী বাংলাদেশের ছাত্রদের প্রতি আহবান জানান। 

আবদুল্লাহ ওমর নাসিফ পরবর্তী সময়েও প্রায়ই বাংলাদেশে এসেছেন ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালু, কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা প্রদান ও তহবিল সংস্থানের ব্যবস্থা করতে। সৌদি আরবে তিনি প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তিনি বাদশাহ আবদুল আজিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট পদে অধিষ্ঠিত হন, রাজতন্ত্র নিয়ন্ত্রিত সৌদি শুরা কাউন্সিলের ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তিনি মুসলিম ব্রাদারহুডের অন্যতম নেতা। তিনি যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন, সত্তরের দশকের শেষ দিকে ওসামা বিন লাদেনও সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। ১৯৮৮ সালে তিনি রাবিতা ট্রাষ্ট নামে একটি সেবা সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন, যে সংস্থার মাধ্যমে বিশ্বে ইসলামী সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোকে অর্থায়ন করা হতো বলে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দারা নিশ্চিত হন এবং ৯/১১ এ যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলার জন্য এই ট্রাষ্ট সন্ত্রাসীদের তহবিল যোগান দিয়েছে বলে তাদের একাধিক রিপোর্টে উল্লেখ রয়েছে এবং প্রতিটিতে ড. আবদুল্লাহ ওমর নাসিফের নাম রয়েছে। 

এছাড়াও আমি ওয়ার্ল্ড এসেম্বলি অব মুসলিম ইউথের প্রধান, তুরস্কের একজন শিক্ষামন্ত্রীসহ আরো অনেক বিদেশি ব্যক্তিত্বের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছি। সবার সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ দেয়ার প্রয়োজন নেই। শুধুমাত্র সৌদি আরবের মোহাম্মদ হারাকান ছাড়া আর কারো সাক্ষাৎকার গ্রহণে ভাষা কোনো অন্তরায় হয়নি। অন্য সবাই ইংরেজিতে বলেছেন। বিদেশি  তা প্রভাবশালী, ক্ষমতাধর বা সাধারণ মানুষ যে কেউ হোন না কেন যদি মন খুলে কথা না বলেন তাহলে আলোচনা উপভোগ্য হয়ে ওঠে না। এক্ষেত্রে শুধু হারাকান ব্যতিক্রম ছিলেন। অন্য সবাই আন্তরিকতার সাথে কথা বলেছেন। তাদের দেশে আমন্ত্রণ করেছেন। কিন্তু সাক্ষাৎকারের পর আমি কখনো কারো সাথে যোগাযোগ রাখার প্রয়োজন বোধ করিনি। আমাদের দেশের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সাথে বিদেশিদের মধ্যে পার্থক্য ছিল, আমাদের নেতারা বাগাড়ম্বর করেন, যা বিশ্বাস করেন না তাই বলেন, বিদেশিরা যা বিশ্বাস করেন তা বলেন। 

জহিরুলঃ বাসস- এর নিয়োগ সব সময়ই দলীয় বিবেচনায় হয়ে থাকে। আপনি বিএনপির আমলে নিয়োগ পেয়েছেন, আওয়ামী লীগের আমলে চাকরী হারিয়েছেন, এর মানে হচ্ছে আপনি বিএনপির লোক, এটা কি একজন সাংবাদিকের জন্য অপবাদ নয়? 

মঞ্জুঃ আপনি ঠিকই বলেছেন, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থায় (বাসস)  সবসময় রাজনৈতিক বিবেচনায় লোকজনকে নিয়োগ করা হয়ে থাকে। কখনো কখনো এর ব্যতিক্রম ঘটেছে, দেশ যখন সামরিক শাসনের অধীনে ছিল, বিশেষ করে সামরিক শাসকরা তাদের নিজস্ব দল গঠন করার আগের কিছু সময়ে। কিন্তু তখনো সামরিক শাসকের বা তাদের মন্ত্রীদের সুপারিশ অনুযায়ী তাদের পছন্দের সাংবাদিকদের নিয়োগ করা হয়েছে। তবে সে সংখ্যা নিতান্তই কম। স্বাধীনতার পর থেকেই বাসস- মূখ্যত আওয়ামী লীগ সমর্থক সাংবাদিক কর্মচারিদের প্রাধান্য ছিল। যখন যে সরকার ক্ষমতায় ছিল তারা এখানে প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদে তাদের পছন্দের কাউকে চুক্তিভিক্তিক রাজনৈতিক নিয়োগ প্রদান করেছে। তবে তার অবশ্যই সাংবাদিকতায় ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন হওয়ার বাধ্যবাধকতা আছে। চেয়ারম্যানের পদটি আলঙ্কারিক এবং সে নিয়োগও সরকার দিয়ে থাকে। চেয়ারম্যান হিসেবে অধিকাংশ সময় বরেণ্য শিক্ষাবিদদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে। অনেক সময় রাজনৈতিক নেতাকেও চেয়ারম্যান করা হয়েছে। প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদটি বাসস এ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পদ, বাসস এর কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। এজন্য কেউ কেউ ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজের আত্মীয় স্বজনকে নিয়োগ দিয়ে পদটিকে কলঙ্কিত করেছেন। একবার প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদে রাজনৈতিক নিয়োগ বিলম্বত হয়েছিল। অন্তবর্তী সময়ের জন্য সাধারণত তথ্য মন্ত্রণালয়ের কোনো যুগ্ম সচিবকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদে সাময়িক দায়িত্ব দেয়া হয়। কিন্তু কোনো কারণে একবার সরকার যুগ্ন সচিবকে দায়িত্বটি না দিয়ে বাসসের একজন সিনিয়র বার্তা সম্পাদককে প্রেষণে ভারপ্রাপ্ত প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব ন্যস্ত করেন। তিনি নোয়াখালি জেলার লোক ছিলেন। কয়েক মাসের জন্য বাসস এর সর্বোচ্চ পদটি পেয়ে তিনি তার সন্তানসহ পাঁচজনকে বাসস এ সাংবাদিক কর্মচারি হিসেবে নিয়োগ দেন। এর বাইরে আগে থেকে তার জামাতা বাসস এ নিয়োজিত ছিলেন। তার আগেও একজন বাসস এর প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন। তিনি খ্যাতনামা সাংবাদিক এবং একাধিক দৈনিক সংবাদপত্রের সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। আওয়ামী লীগের মনোনয়নে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। সরকারের মনোনয়নে জাতিসংঘের একটি সংস্থায় উর্ধতন কর্মকর্তা হিসেবে বিদেশে কাটিয়েছেন। দেশে একটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের প্রধান ছিলেন। বাসস ও সেই সরকারি প্রতিষ্ঠানে তার সন্তানসহ আত্মীয়স্বজনকে নিয়োগ দিয়ে তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছেন। তার বাড়িও ছিল বৃহত্তর নোয়াখালীতে। বাসস একটি বিধিবদ্ধ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। নিয়োগ করতে হলে একাধিক সংবাদপত্রে গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক। প্রায়শই বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়, কিন্তু তা নিয়োগ দেয়ার পর। নামকাওয়াস্তে ইন্টারভিউ হয়। ইন্টারভিউ বোর্ডে মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি থাকেন। প্রশ্ন করেন। কিন্তু নিয়োগপ্রাপ্ত কারো নিয়োগ ইন্টারভিউয়ের কারণে বাতিল হয়েছে এমন ঘটে না। আমাকে নিয়োগ দেয়ার ছয় মাস পর ইন্টারভিউ বোর্ডের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। 

চেয়ারম্যান এবং প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ বাসস বোর্ড অফ ডাইরেক্টর ১৩ সদস্যের। এর মধ্যে ঢাকার সংবাদপত্রগুলোর ৩ জন ও ঢাকার বাইরের ১ জন সম্পাদকসহ মোট ৪ জন সম্পাদক, বাসস এর সাংবাদিক কর্মচারিদের মধ্য থেকে ১ জন, চারটি মন্ত্রণালয় তথ্য, অর্থ, স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার ৫ জন ও তথ্য অধিদফতরের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা। 

বাসস এর প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে যদি বলতে হয়, তাহলে আপনাকে একটু পেছনের দিকে যেতে হবে। পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা এসোসিয়েটেড প্রেস অফ পাকিস্তান (এপিপি) এর পূর্ব পাকিস্তানে দুটি শাখা অফিস ছিল, একটি ঢাকায় এবং অপরটি চট্টগ্রামে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের জানুয়ারী মাসে এক সরকারী আদেশে এ সংস্থার নতুন যাত্রা শুরু হয় বাংলাদেশ নিউজ এজেন্সি নামে। পরে পাকিস্তানের একটি বেসরকারী বার্তা সংস্থা পাকিস্তান প্রেস ইন্টারন্যাশনাল (পিপিআই) এর ঢাকা অফিস, যা বাংলাদেশ প্রেস ইন্টারন্যাশনাল বা বিপিআই নামে চলছিল, সেটিকেও বাংলাদেশ নিউজ এজেন্সি বা বর্তমান বাসস এর সাথে একীভূত করা হয়। ১৯৭৯ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময়ে এক অধ্যাদেশ বলে বাংলাদেশ নিউজ এজেন্সির নতুন নামকরণ হয় বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) এবং একটি বিধিবদ্ধ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠিান হিসেবে বাসস এর পূর্ণাঙ্গ কাঠামোগত রূপ দেয়া হয়। দিনে দিনে এটি আরো বিকশিত  হয়। পরবর্তীতে ১৯৯৮ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারী বাসস এর বাংলা বিভাগ চালু করা হয়। বাংলাদেশের প্রিন্ট বা ইলেক্ট্রনিক  মিডিয়ার মধ্যে সম্ভবত এখনও বাসস এ সবচেয়ে বেশি সংখ্যক সাংবাদিক নিয়োজিত। প্রশাসনিক বিভাগ প্রায় সমসংখ্যক জনবল দ্বারা সমৃদ্ধ। বিশ্বের অনেক দেশের ছোট-বড় বহু সংখ্যক বার্তা সংস্থার সঙ্গে বাসস এর সংবাদ বিনিময় চুক্তি রয়েছে। বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায় বাসস এর প্রতিনিধি এবং ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, রংপুর, বগুড়া ও বরিশালে ব্যুরো অফিস ছাড়াও দিল্লিতে একটি অফিস রয়েছে। এত জনবল ও কাঠামোগত সুযোগ সুবিধা সত্বেও বাংলাদেশে সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে বাসস যে ভূমিকা পালন করতে পারত, শুধু রাষ্ট্রায়ত্ত্ব প্রতিষ্ঠান হওয়ার কারণেই বাসস কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা পালন করতে পারেনি বা পারছে না। প্রধান কারণ রাজনৈতিক বিবেচনায় লোক নিয়োগ। যখন যে দলের সরকার থাকে তখন সেই দলের সমর্থক সাংবাদিকরা কাজের ক্ষেত্রে উদাসীনতা প্রদর্শন করেন এবং বিরোধী দলের সমর্থক সাংবাদিকরা চাকুরিচ্যুতির সার্বক্ষণিক আতঙ্কে থাকেন। সরকারী দলের সাংবাদিকরা বিরোধী দলের সমর্থক সিনিয়র সাংবাদিকদের ডিঙিয়ে পদোন্নতি ও সুযোগ সুবিধা লাভ করেন। ফলে বঞ্চিতরা কাজের উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন এবং নিতান্ত চাকরি রক্ষার জন্য মুখ বুজে কাজ করে যান। বাসস এ অনেক দক্ষ ও যোগ্যতাসম্পন্ন সাংবাদিক থাকা সত্বেও এই রাজনৈতিক ও মানসিক দ্বন্দ্বের কারণে কখনো প্রতিষ্ঠানটির কাজে গতি আসেনি।

বাসস এ আমার নিয়োগও রাজনৈতিক বিবেচনায় হয়েছিল, আমি তা অস্বীকার করবো না। বাসস এ যোগ দেয়ার আগে আমি দৈনিক বাংলার বাণীর বার্তা সম্পাদক ছিলাম। বাংলার বাণী ২০০১ সালের এপ্রিল মাসে বন্ধ হয়ে যায় এবং সবার সাথে আমিও বেকার হয়ে পড়ি। এসময় টেলিভিশন চ্যানেল এটিএন বাংলার হেড অফ নিউজ, বর্তমানে বসুন্ধরা গ্রুপের দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন সম্পাদক নঈম নিজাম আমাকে প্রস্তাব দেন এটিএন বাংলায় যোগ দেয়ার জন্য। প্রসঙ্গটি আমি আগের এক প্রশ্নের উত্তরেও বলেছি। নঈম নিজামের সঙ্গে আমার হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। তিনি আমাকে বেকার দেখতে চাননি। বয়সে ও পেশায় আমার জুনিয়র হওয়া সত্বেও আমার প্রতি তার আন্তরিকতার কারণে আমি তার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে দ্বিধা করি না। তিনি অত্যন্ত মেধাবী একজন সাংবাদিক এবং সকল মহলে তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।  এটিএন বাংলায় নিয়োগ চূড়ান্ত হলেও একই সময়ে তথ্যমন্ত্রী তরিকুল ইসলামের ঘনিষ্ট এক সাংবাদিক আমাকে বলেন বাসস এর নিউজ এডিটর পদের জন্য আবেদন করতে। আমি এটিএন বাংলার কথা বলে প্রথমে অনীহা প্রকাশ করলেও তিনি আমাকে বলেন যে স্বয়ং তথ্যমন্ত্রী আমাকে বাসস এ দেখতে চান। বিএনপির নেতাদের মধ্যে একমাত্র তথ্যমন্ত্রী তরিকুল ইসলামের সঙ্গেই আমার ঘনিষ্টতা ছিল। তিনি আমাকে পছন্দ করতেন। অতএব আমাকে বাসস এ আবেদন করতে হলো। বিএনপি সরকার বাসস এর প্রধান সম্পাদক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল সাংবাদিক নেতা আমানুল্লাহ কবীরকে। তিনি একতরফাভাবে আওয়ামী লীগ আমলে নিয়োগপ্রাপ্ত ৩৭ জন সাংবাদিক কর্মচারিকে বরখাস্ত করেন, যা একজন সাংবাদিক নেতার উচিত হয়নি। নিজের পছন্দের লোকজনকে নিয়োগ দিতে শুরু করেন। আমাকেসহ তথ্যমন্ত্রীর সুপারিশকৃত সাংবাদিকদের নিয়োগ দিতে টালবাহানা করছিলেন। আমি অত্যন্ত বিব্রত বোধ করি। এক পর্যায়ে তথ্যমন্ত্রী তাকে ধমকের সুরে বলেন আমাদের নিয়োগ চূড়ান্ত করে তাকে জানাতে। ধমকে কাজ হয়, আমাকেসহ আটজনকে তলব করে নিয়োগ দেয়া হয়। আমাকে নিয়োগ করা হয়েছিল ইংরেজি বিভাগের বার্তা সম্পাদক হিসেবে। আগে ইংরেজি সাংবাদিকতা করিনি। একটু দ্বিধাগ্রস্ত ছিলাম। বাসস এর বন্ধুরা সাহস দিলেন। আমানুল্লাহ কবীরের চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে নতুন প্রধান সম্পাদক হিসেবে যোগ দিলেন গাজীউল হাসান খান। আমাকে পদোন্নতি দেয়া হলো ডেপুটি চিফ নিউজ এডিটর হিসেবে। চিফ রিপোর্টার জহুরুল আলমকে চিফ নিউজ এডিটর পদে উন্নীত করায় চিফ রিপোর্টারের দায়িত্ব দেয়া হলো কামরুল ইসলাম চৌধুরীকে। কিন্তু বাংলাদেশ পরিবেশ সাংবাদিক ফোরামের চেয়ারম্যান হওয়ার কারণে কামরুলকে দু’এক মাস পরই পরিবেশ বিষয়ক সেমিনার, কনফারেন্সে অংশ নেয়ার জন্য বিদেশে যেতে হতো। কাজে বিঘ্ন ঘটছিল। গাজীউল হাসান খান আমাকে ডেকে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে চিফ রিপোর্টারের দায়িত্ব দেয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানালেন। আমার জন্য অস্বস্তিকর। কামরুল যে পরিবেশ সাংবাদিক ফোরামের চেয়ারম্যান, আমি সেই ফোরামের ভাইস চেয়ারম্যান। তদুপরি কামরুল তখন বিদেশে। কিন্তু গাজীউল হাসান খান নাছোড়বান্দা। চিফ রিপোর্টার হিসেবে আমাকে বাংলা ও ইংরেজি বিভাগের প্রায় ৪০ জনের অধিক  রিপোর্টারের প্রতিদিনের দায়িত্ব বন্টন, ঢাকার বাইরে বাসসের ৬টি ব্যুরো অফিস এবং প্রতিটি জেলার সংবাদদাতাদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা, রিপোর্টারদের ছুটি মঞ্জুর ও বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন তৈরির মতো বিভিন্ন ধরণের কাজ করতে হতো। প্রধান সম্পাদক হিসেবে গাজীউল হাসান খান মারদাঙ্গা গোছের ছিলেন। তিনি এখতিয়ার বহির্ভূতভাবে  তার সুবিধা বাড়িয়ে নিয়েছিলেন। পরবর্তী নির্বাচনে তার এলাকা থেকে বিএনপির নমিনেশন আশা করছিলেন। ছুটির দিনগুলোতে বাসস এর গাড়ি ড্রাইভার নিয়ে এলাকায় চলে যাচ্ছিলেন। এলাকা থেকে আওয়ামী পরিবারের দু’চার জনকে নিয়োগও দেন বাসস এ, যাতে এলাকায় তার সুনাম ও তার ওপর ভোটারদের আস্থা বাড়ে। তবে তার দ্বারা নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে সাজ্জাদ নামে একজন রিপোর্টার অত্যন্ত যোগ্য ও নিণ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করতো। গাজীউল হাসান খান কিছু জঞ্জাল পরিচ্ছন্ন করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন, কিন্তু তা সম্ভব ছিল না। ১৯৯৮ সালে বাংলা বিভাগ চালু করার আগে বাসস পুরোপুরি একটি ইংরেজি বার্তা সংস্থা ছিল। কিন্তু ইংরেজি না জানা লোকজনও বাসস এ তিন  দশকের বেশি সময় ধরে সাংবাদিকতা করেছে এবং সরকারি বেতন-ভাতার সুযোগ নিয়ে বুক ফুলিয়ে ঘুরেছে। এর শেষ নিদর্শন ছিল হাবিবুর রহমান নামে এক ব্যক্তি। বাসস এ যোগ না দিলে জানাই হতো না যে তিনি বাংলা ইংরেজি কিছুই জানেন না। তিনি পিপিআই এর ঢাকা অফিসের টাইপিষ্ট বা এ ধরনের কোনো কাজে নিয়োজিত ছিলেন। বিপিআই যখন বাসস এর সাথে একীভূত হয় তখন এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িতরা সাংবাদিকদের সাথে অসাংবাদিকদেরও সাংবাদিক হিসেবে দেখিয়েছিলেন। এই অসাধুতা আমাদের জাতীয় চরিত্রের বৈশিষ্ট। গাজীউল হাসান খান তাকে পদত্যাগ করতে বলেন। তার পদত্যাগ করার কোনো ইচ্ছে নেই। তাকে বাংলায় বিভাগে বদলী করেন। বাংলা বিভাগের দায়িত্বশীলরা অভিযোগ করেন তিনি শুদ্ধ বাংলাও লিখতে পারেন না। শুদ্ধ বাক্য অশুদ্ধ করেন। গাজীউল হাসান খান তাকে তলব করে কৈফিয়ত চান, হাবিবুর রহমান খান উত্তর দেন যে সারাজীবন তিনি ইংরেজি বিভাগে কাজ করেছেন, তাই বাংলাটা ঠিকমত পারেন না। গাজীউল হাসান খান বলেন, ঠিক আছে আমি তিন লাইন বাংলা লিখছি, আপনি ৩৩ বছরের বেশি সময় বাসস এর ইংরেজি বিভাগে আছেন; এই তিন লাইনের ইংরেজি করুন, এরপর ইংরেজি বিভাগেই থাকুন। তার তিনটি লাইন ছিল: ১. আমার নাম হাবিবুর রহমান, ২. আমি বাসস এর একজন সাংবাদিক; ৩. আমার বাড়ি মীরপুর। এই বাক্যগুলোর ইংরেজি করাও হাবিবুর রহমানের সাধ্যের বাইরে ছিল। আমি বাসস এ যোগ দেয়ার আগে অবসর নিয়েছিলেন আমিনুল ইসলাম বেদু নামে এক বার্তা সম্পাদক। তিনি নাকি বছরের পর বছর কাজই করতেন না। আরেকজন বার্তা সম্পাদক এরশাদুল হককে পেয়েছিলাম;  সময়ের ব্যাপারে তার হিসাব ছিল টনটনে। তিনি ঠিক কাঁটায় কাঁটায় তার ডিউটি আওয়ার শুরু হওয়ার সময় বাড়ি থেকে বের হতেন, এক ঘন্টা পর অফিসে পৌছতেন; লবিতে বসে বিশ্রাম নিয়ে, সিগারেট টেনে আরো আধা ঘন্টা পর ডেস্কে বসতেন। সময় নিয়ে নিউজ এডিট করতেন। ঘন্টাখানেক পর আবার সিগারেট টানতে লবিতে। এভাবে ঘন্টা তিনেক অফিসে থাকতেন তিনি। একটু বেশি থাকলে সর্বোচ্চ চার ঘন্টা। এরপর চলে যেতেন। তাকে সঠিক সময়ে অফিসে আসতে বা ডিউটি আওয়ার শেষ করে যেতে দেখিনি। তার বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ ছিল ময়মনসিংহে বাসস এর নামে বরাদ্দ দেয়া বাড়ি আত্মসাতের।  ১৯৭৫ এর আগস্ট মাসের পর কাদের সিদ্দিকী, বীর উত্তমের নেতৃত্বে গঠিত বাহিনীর ছোট ছোট গ্রুপ মেঘালয় সীমান্ত পেরিয়ে এসে অনেক স্থানে এলাকায় চোরাগুপ্তা হামলা চালাতো এবং এসব ঘটনা প্রায় নিয়মিত হয়ে দাঁড়িয়েছিল। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী  এই বাহিনীর বিরুদ্ধে তৎপর ছিল। এসময় তাকে ময়মনসিংহে বিশেষ দায়িত্ব দেয়া হয়। তিনি সেখানে যান। কিছুদিন পর তিনি ময়মনসিংহে বাসস এর একটি অফিস ও তার বসবাসের প্রয়োজনীয়তা দেখিয়ে বাসস এর পক্ষ থেকে একটি পরিত্যক্ত বাড়ি বরাদ্দ নেয়ার জন্য বাসসকে উদ্যোগ নিতে বলেন। জেলা প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ করে সুবিধাজনক স্থানে পরিত্যক্ত বাড়ি খুঁজে বের করেন। বাসস ব্যবস্থাপনা তাকেই বাসস এর পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসন বরাবর আবেদন করতে বলার পর তিনি আবেদন করেন এবং সরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য জেলা প্রশাসনের হেফাজতে থাকা বাড়ি বরাদ্দ পাওয়া কঠিন ছিল না। বাড়ি বরাদ্দ হয়, কিন্তু বাসস এর নামে নয়, তার ব্যক্তিগত নামে। ময়মনসিংহে তার অবস্থানের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর বাসসকে না জানিয়ে তিনি বাড়িটি বিক্রয় করে দেন। এ ধরনের কিছু লোক ছাড়া বাসস এ অনেক যোগ্যতাসম্পন্ন সাংবাদিককে পেয়েছি এবং তাদের সাথে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি বলে অহঙ্কার বোধ করি। মোফাখখারুল আনাম, সফিকুল করিম সাবু, ইহসানুল করিম হেলাল, আজিজুল ইসলাম ভূঁইয়া, আনিসুর রহমানসহ আরও অনেকের নাম বলা যায়।    

২০০৬ সালে ২৮ অক্টোবর বিএনপির ক্ষমতা ছেড়ে দেয়ার দিনে ও পরবর্তীতে উদ্ভুত পরিস্থিতি পুরোপুরি আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণে চলে গিয়েছিল। বিএনপি আমলে বিভিন্ন সরকারী, আধা সরকারী, স্বায়ত্বশাসিত ও বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক বিবেচনায় যেসব নিয়োগ দেয়া হয়েছিল, তাদের জন্য নারকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো বাসসে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম এ জলিল প্রায় প্রতিদিন বিএনপি কর্তৃক রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগপ্রাপ্ত সাংবাদিকদের নামের তালিকা সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ে পাঠাতেন অবিলম্বে নিয়োগ বাতিল করার জন্য, যার একটি কপি বাসসেও আসতো। সংস্থাপন মন্ত্রণালয় বিলম্ব না করে নিয়োগগুলো বাতিল করে নামের তালিকা ফ্যাক্সে বাসসে পাঠাতো। আমাদেরকে এমএ জলিলের নিয়োগ বাতিল দাবীর তালিকা ও সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ বাতিল আদেশের তালিকা দু’টিই ইংরেজিতে অনুবাদ করে গণমাধ্যমে পাঠাতে হচ্ছিল। বাসসের প্রধান সম্পাদক হিসেবে গাজীউল হাসান খানের দু’বছরের চুক্তির মেয়াদ আগেই শেষ হয়েছিল। প্রধান সম্পাদক না থাকায় ম্যানেজিং এডিটর হিসেবে রবি ভাই নিয়মিত কাজগুলো করে যাচ্ছিলেন। চিফ রিপোর্টার হিসেবে এ সময় আমাকে প্রচুর খাটতে হচ্ছিল। কিন্তু সকলেই সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। ২০০৭ এর জানুয়ারীর এক সন্ধ্যায় অন্যদিনের চেয়ে একটু ব্যস্তভাবে জগলু ভাই নিউজ রুমে প্রবেশ করেই আমার রুমে এসে আমার দিকে একটি কাগজ এগিয়ে দিয়ে বললেন, “মঞ্জু, এটি একটু জলদি ছেড়ে দিন। ভেরি আরজেন্ট।” পড়ে দেখি বাসসের প্রধান সম্পাদক হিসেবে তার নিয়োগ আদেশ। সে রাতেই তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। সেনা সমর্থিত সরকারের কর্মকান্ড ও হম্বিতম্বিতেই বুঝা যাচ্ছিল যে, এ সরকারের মেয়াদ প্রলম্বিত হতে যাচ্ছে। অন্তবর্তী সময়ে কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া বিএনপি ও আওয়ামী লীগ উভয় দলের সমর্থক সাংবাদিকরা আমাকে চিফ রিপোর্টার হিসেবে পরবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত দায়িত্ব চালিয়ে যাওয়ার জন্য অনুরোধ জানালেও আমি পদত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিলাম। জগলু ভাইকে বলার পর তিনি বললেন, ‘ইউ ক্যারী অন। আই অ্যাম বিহাইন্ড ইউ।’ আমি আমতা আমতা করছিলাম। তিনি আবার বরলেন, ‘ইফ ইউ রিজাইন, ইট উইল বি কনসিডারড অ্যাজ ট্যান্টামাউন্ট টু ভায়োলেশন অফ মাই অর্ডার।’ আরো কয়েকদিন পর আমি চিফ রিপোর্টাদের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি চেয়ে পদত্যাগপত্র জমা দিলাম। দিন তিনেক পর জগলু ভাই ডাকলেন। জগলু ভাই বললেন, ‘আই বিলং নেইদার টু আওয়ামী লীগ নর টু বিএনপি এন্ড আই বিলিভ ইউ ডু নট হ্যাভ এনি প্রবলেম ওয়ার্কিং উইথ মি। ইফ ইউ ডু নট উইথড্র ইওর রেসিগনেশন লেটার, দ্যান আই হ্যাভ টু অ্যাকসেপ্ট ইট। বাট বিফোর দ্যাট, সাজেষ্ট মি, হু শ্যাল বি ইওর সাকসেসর?’ কাউকে প্রেফারেন্স দিয়ে নাম বলাটা সঠিক বিবেচনা করিনি জগলু ভাই নিজেই আজিজুল ইসলাম ভূঁইয়া ও সফিকুল করিম সাবুর মধ্যে কাকে চিফ রিপোর্টার করা ঠিক হবে, নিজেই ঝালিয়ে নিচ্ছিলেন। এরপর তিনি বললেন, ‘থ্যাঙ্ক ইউ ফর বিইং উইথ মি এন্ড কোঅপারেট মি ইন মাই ব্যাটল এগেনইষ্ট দ্য টাইড। ইউ উইল গেট অ্যান এপ্রিসিয়েশন লেটার ফ্রম ওর চিফ এডিটর এন্ড আই থিঙ্ক ইউ ডিজার্ভ ইট।’

২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট ক্ষমতায় আসে। প্রধান সম্পাদক হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন বাসস এর বিশেষ সংবাদদাতা ইহসানুল করিম হেলাল। আমানুল্লাহ কবীর যে ৩৭ জন সাংবাদিক কর্মচারিকে বরখাস্ত করেছিলেন তারা মামলায় জিতে আট বছরের বকেয়া বেতনসহ পুনরায় বাসস এ যোগ দেন। বিএনপি সমর্থক সাংবাদিকদের মধ্যে যাদের কাগজপত্রে ত্রুটি ছিল তাদেরকে ডেকে পদত্যাগ করতে বলা হয়। অনেকে পদত্যাগ করেন। অনেককে বরখাস্ত করা হয়। আমিও চাকুরিচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা করছিলাম। মানসিক চাপের মধ্যে থাকলেও আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় আসার প্রথম বছর ২০০৯ সাল নির্বিবাদে কাটালাম। ২০১০ সালের এপ্রিল মাসের শেষ দিকে আমি দুই সপ্তাহের ছুটি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আসি। মে মাসে দেশে ফিরে যাই। আমার ভোকাল কর্ডে একটি সিষ্ট ডেভেলপ করেছিল। ২০০৫ সালে পাঁচ মাসের ব্যবধানে কলকাতার এক হাসপাতালে দু’বার সার্জারির পরও সমস্যাটি আমাকে পীড়া দিচ্ছিল। যুক্তরাষ্ট্রে চিৎিকসা করানোর  ব্যাপারে আলাপ করে গিয়েছিলাম। তাছাড়া আমার মেয়ে পেনসিলভেনিয়ায় এক ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে একা কাটাচ্ছিল। আমি জুলাই মাসের শেষে ছুটি নিয়ে পুনরায় যুক্তরাষ্ট্রে আসি। ছুটির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই আমি ছুটি বৃদ্ধি করার জন্য আবেদন করি। কিন্তু ছুটির মেয়াদ বৃদ্ধি না করে আমাকে বরখাস্ত করা হয়। আমার দীর্ঘ বক্তব্য থেকে নিশ্চয়ই আপনি উপলব্ধি করতে পেরেছেন যে সাংবাদিকতার মতো একটি পেশায় দলীয় পরিচিতি সাংবাদিকতার মান ক্ষুন্ন করে এবং যোগ্য সাংবাদিকরা তাদের যোগ্যতা ও দক্ষতা অনুযায়ী দায়িত্ব পালনের সুযোগ পান না। আমি ব্যক্তিগতভাবে বিএনপির এক্টিভিষ্ট সাংবাদিক নই, বিএনপির কট্টর সমর্থক বলতে পারেন। আমি সবসময় চেষ্টা করেছি পেশাগত সততা বজায় রেখে দায়িত্ব পালন করতে। সকল মহলের সাথে সুসম্পর্ক রাখার চেষ্টা করেছি। সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে কোনো দল বা নেতার প্রতি পক্ষপাতিত্ব প্রদর্শন করিনি, বস্তুনিষ্ঠতাকেই বরাবর প্রাধান্য দিয়েছি। সে কারণে পেশাজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে বিপরীত রাজনৈতিক ধারার সংবাদপত্রে সুনামের সাথে কাজ করতে সক্ষম হয়েছি। 

জহিরুলঃ দেশ ছাড়ার মূল কারণ কি? কখন দেশ ছাড়েন, কেমন আছেন ভিন দেশে? 

মঞ্জুঃ দেশ ত্যাগ করে ভিন্ন দেশে আশ্রয় গ্রহণের ইতিহাস মানব সভ্যতার ইতিহাসের মতই প্রাচীন। ইতিহাসের সকল পর্যায়ে আপনি রাজা, বাদশাহ থেকে শুরু করে ধর্ম প্রচারক, সাধারণ মানুষকে তাদের জন্মভূমি ত্যাগ করার ঘটনা আপনি জানেন। কেউ দেশ জয় করার জন্য নিজ দেশ ত্যাগ করে দখল করা দেশকে নিজ আবাসে পরিণত করেছেন। কেউ জীবন রক্ষার জন্য বাধ্য হয়ে দেশ ত্যাগ করেছেন। কেউ বা নিজ দেশ থেকে বিতাড়িত হয়ে ভিন্ন দেশে চলে গেছেন। আদম-হাওয়া থেকে শুরু করতে পারেন। আল্লাহর আদেশ লঙ্ঘন করে বেহেশত থেকে তারা বিতাড়িত হয়েছিলেন।   এমনকি আমাদের শেষনবী মুহাম্মদের জীবন যখন তার জন্মভূমি মক্কায় বিপন্ন হয়ে ওঠেছিল তখন তিনি জীবনের নিরপত্তার জন্য মক্কা ত্যাগ করে মদিনায় হিজরত করতে  বাধ্য হয়েছিলেন। সাড়ে চৌদ্দশ বছর আগেও এটি সহজ ছিল না। প্রথমে তিনি তায়েফ গিয়েছিলেন, তায়েফের লোকজন তাকে আশ্রয় দিতে অস্বীকার করায় তিনি মদিনায় যান। তাদের মধ্যবর্তী আরো অনেক নবীকে জন্মভূমি ত্যাগ করতে হয়েছিল। ইব্রাহিমের কাছে আল্লাহর আদেশ আসে, “তোমার দেশ, তোমার জনগণ, তোমার পিতার বাসস্থান ত্যাগ করো এবং আমি তোমাকে যে ভূখণ্ড দেখাবো সেখানে যাও।” পঁচাত্তর বছর বয়সে তিনি জন্মভূমি ত্যাগ করে কেনান, বেথেল ও নেগেভে যান। ফারাও এর অত্যাচারে মূসাকে তার অনুসারীদের নিয়ে মিশর ত্যাগ করতে হয়েছিল। যিশু খ্রিষ্ট বা ঈসা যে নাজারেথ এ বেড়ে ওঠছিলেন সেখান থেকে চলে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল। আমাদের উপমহাদেশের রাজা বাদশাহদের নিজ নিজ রাজ্য ত্যাগ করার বহু ঘটনা রয়েছে; সেগুলো বাদ দিলেও জন্মভূমি ত্যাগের বড় ঘটনা পাবেন গৌতম বুদ্ধের ও পরবর্তীতে তার অনুসারী বৌদ্ধদের। ভারতে অত্যাচরিত হয়ে তাদেরকে দূর প্রাচ্যের দেশগুলোতে আশ্রয় নিতে হয়েছিল। আধুনিক যুগে উপমহাদেশ বিভক্ত হয়ে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দেশ ত্যাগের ঘটনা ঘটেছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে প্রায় এক কোটি লোককে ভারতে আশ্রয় নিতে হয়েছে। কাজেই মানুষের দেশ ত্যাগ করার ঘটনা নতুন কিছু নয়। 

 আমি দেশ ত্যাগ করেছি বলা ঠিক হবে না। বাধ্য হয়ে বিদেশে দীর্ঘদিন যাবত অবস্থান করছি। আত্ম-নির্বাসিত বলতে পারেন। ২০১০ সাল থেকে একটানা বিদেশে অবস্থান করার সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে আমি আরও অনেকবার বিদেশে এসেছি, অধিকাংশই পাশ্চাত্যের দেশে। কিন্তু উন্নত জীবন আমাকে আটকে রাখতে পারেনি। প্রথমত মায়ের কারণে, দ্বিতীয়ত দেশের কারণে। আমার মা যতদিন বেঁচে ছিলেন, বিদেশে এসে সারাক্ষণ মনে হয়েছে কবে দেশে ফিরে খাওয়ার পর হাত ধুয়ে মায়ের শাড়ির আঁচল দিয়ে হাত মুখ মুছবো। সেজন্য আমার কর্মসূচি শেষ হওয়ার সাথে সাথে দেশে চলে গেছি মায়ের আশ্রয়ে।  ১৯৮৮ সালে যখন প্রথম বার যুক্তরাষ্ট্রে আসি, তখন একা আসি। আমার পরিবার আমার সাথে যোগ দেয় এক মাস পর। ওই এক মাসে আমার ছয় বছর বয়সী মেয়ের একটি চিঠি পাই। চিঠিতে সে লিখেছিল, ‘আকাশে প্লেনের শব্দ শুনতে পেলেই দাদু বারান্দায় গিয়ে প্লেনের দিকে তাকিয়ে থাকে আর কাঁদে।’ আমি ভাত-পাগল ছিলাম, তিন বেলা ভাত খেতে হতো। আমার স্ত্রীর কাছে মা বার বার জানতে চায়, আমেরিকায় ভাত পাওয়া যায় কিনা।  আমার পক্ষে মা’কে ছেড়ে থাকা প্রায় অসম্ভব ছিল। ২০০২ সালে মা মারা যান। এরপর দেশ-বিদেশ কোনো পার্থক্য ছিল না। তবুও পেশার টানে দেশেই ছিলাম। বিদেশে অড জব করার কথা চিন্তা করতে পারতাম না। বাংলাদেশে আমার সর্বশেষ কর্মস্থল বাসস এ থাকাকালে ২০১০ সালে ছুটি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আসার পর আমার অনুপস্থিতিতে আমাকে  চাকুরিচ্যুত করা হলে আমি দেশে না ফিরে যুক্তরাষ্ট্রে রয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। এ সম্পর্কে আমি আগের এক প্রশ্নের উত্তরে বিস্তারিত উল্লেখ করেছি।  

আমার মেয়ে ২০০৯ থেকেই পাশ্ববর্তী সিটি ফিলাডেলফিয়ায় ছিল। আমি নিউইয়র্কে আসার পর সে ফিলাডেলফিয়া থেকে নিউইয়র্ক চলে আসে। আমরা একটি বাসা ভাড়া নেই। আমার ছেলে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে বিবিএ করছিল। ওর কোর্স শেষ না হলে আমার স্ত্রীর পক্ষে ঢাকা ছেড়ে আসা সম্ভব ছিল না। তবুও সে ছ’মাস পর পর নিউইয়র্ক এসে আমাদের সাথে দেখা করে গেছে। আমার ছেলের বিবিএ ফাইনাল পরীক্ষার পর সে ২০১৩ সালে ছেলেকে নিয়ে নিউইয়র্ক চলে আসে। অতএব আমাকে একা বিদেশে কাটানোর কষ্ট পোহাতে হয়নি। তবে দেশ ছেড়ে থাকার কষ্ট তো আছেই। মা-বাবার কবর জিয়ারত করতে পারি না। আপন মানুষের সাথে সাক্ষাৎ হয় না। কারো দু:খে শরীক হতে পারি না। দেশে যেসব ঘটনা ঘটছে তা প্রত্যক্ষ করতে পারি না। এসব দু:খবোধ ছাড়া আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি।  

জহিরুলঃ নিউইয়র্ক হচ্ছে প্রবাসী বাংলাদেশিদের একটি বড় জনপদ, এখানে বাঙালি সংস্কৃতির চর্চা বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গের পর সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে। বেশ কিছু বাংলা সংবাদপত্র, টেলিভিশন আছে। আপনি নিজেও একটি সংবাদপত্রের সাথে জড়িত আছেন। বাংলাদেশিদের দ্বারা পরিচালিত মিডিয়াগুলো কতটা পেশাদারিত্বের সাথে কাজ করছে? 

মঞ্জুঃ নি:সন্দেহে নিউইয়র্ক সিটি যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশিদের বড় জনপদ এবং বাঙালি সংস্কৃতির চর্চাও এখানে বেশি হয়। আমার মনে হয়, পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের চেয়েও বাংলাদেশিরা দেশীয় সংস্কৃতির চর্চা বেশিই করে। পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা আমাদের চেয়ে একটু সুবিধাজনক অবস্থায় আছে। তারা বৃহত্তর ভারতীয় পরিচিতির মধ্যে নিজেদেরকে খুঁজে পায়। তাছাড়া ভারতীয়রা যুক্তরাষ্ট্রে সেকেণ্ড জেনারেশনে প্রবেশ করেছে এবং সেকেণ্ড জেনারেশনের বড় অংশ মূলধারার সাথে মিশে গেছে। মূলধারার রাজনীতি করছে, কর্পোরেট হাউজে, হাইটেক ইন্ড্রাষ্ট্রিতে কাজ করছে। তারা ভারতীয় সংস্কৃতি চর্চা নিয়ে মাথা ঘামায় না। এসব বিচারে বাংলাদেশিরা অনেক পিছিয়ে আছে। তিন  দশক আগে নিউইয়র্ক সিটিতে এসে দেখেছি এই সিটিতে ভারতীয় ট্যাক্সিচালকরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, এখন বাংলাদেশি ট্যাক্সিচালকরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। আগে সাইডওয়াক ও সাবওয়ে ষ্টেশনগুলোর নিউজষ্ট্যান্ডগুলোর মালিক ছিল ভারতীয়, এখন অধিকাংশ নিউজষ্ট্যাণ্ডের মালিক বাংলাদেশি। ভারতীয়রা এই পর্যায় থেকে ওপরে ওঠে গেছে। বাংলাদেশিরা দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে। নতুন প্রজন্মের বাংলাদেশিরা মূলধারায় সম্পৃক্ত হচ্ছে। তা সত্বেও আমাদের মধ্যে ‘আইডেন্টিটি ক্রাইসিস’ রয়েছে। সেজন্য আমরা শেকড় আঁকড়ে রাখার প্রাণপণ চেষ্টা করছি। পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা নিউইয়র্কে কোনো বাংলা সংবাদপত্র প্রকাশ করে না। তাদের দ্বারা কোনো টেলিভিশন পরিচালিত হয় বলেও জানি না। বাংলাদেশিরা নিউইয়র্ক থেকে এক ডজনের বেশি বাংলা সাপ্তাহিক সংবাদপত্র প্রকাশ করছে। দুটি বাংলা টেলিভিশন চ্যানেল চালু রয়েছে। আমি নিজেও গত দশ বছর যাবত একটি সংবাদপত্রের সাথে জড়িত। এখানে মিডিয়ার পক্ষে পেশাদারিত্ব বজায় রাখা কঠিন ব্যাপার। বাংলাদেশী প্রবাসীর তুলনায় সংবাদপত্রের সংখ্যা বেশি। বিজ্ঞাপনের বাজার আরও ছোট। বাংলাদেশিদের বড় কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। এতোগুলো সংবাদপত্রকে আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। অতএব এখানে কোনো বাংলাদেশির পক্ষে পেশা হিসেবে সাংবাদিকতা গ্রহণ করে জীবিকার সংস্থান করা অসম্ভব ব্যাপার। যারা কাজ করেন তাদের অধিকাংশ সামান্য লোকবল নিয়ে কাজ করেন, সামান্য বেতন দেন। অতএব যারা কাজ করেন, তাদেরকে জীবিকার জন্য অন্য কোনো কাজ করতে হয়। যারা সংবাদপত্রগুলো পরিচালনা করেন, তাদেরকেও নানাভাবে কম্প্রোমাইজ করে চলতে হয়। এসব সীমাবদ্ধতা সত্বেও সংবাদপত্রগুলো বাংলাদেশি কমিউনিটির মধ্যে যোগাযোগ ও সেতুবন্ধনের কাজ করে যাচ্ছে। 

 

জহিরুলঃ আমরা প্রায়শই বলি প্রবাসীরা খুব আত্মপরিচয়ের সমস্যায় ভোগেন, নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বিষয়টি ব্যাখা করবেন কি? 

মঞ্জুঃ  আপনার আগের প্রশ্নের উত্তরে আমি এ সম্পর্কে আলোকপাত করেছি। আমরা যে শুধু বিদেশে এসে আত্মপরিচয়ের সমস্যার মধ্যে থাকি তা নয়, আমরা যখন দেশে থাকি তখনও আমরা আত্মপরিচয়ে সমস্যার মধ্যে থাকি। দেশে অবস্থানকালে আপনি নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন যে, ঢাকায় প্রতিটি জেলার পৃথক পৃথক সমিতি আছে। পাকিস্তান আমলে দুটি একটি জেলাভিত্তিক সমিতি ছিল। নব্বইয়ের দশক থেকে প্রতিটি বিভাগ ও জেলার সমিতি ছাড়াও অনেকগুলো উপজেলা সমিতি পর্যন্ত আছে। বিভিন্ন পেশাজীবীদেরও জেলাওয়ারী সমিতি আছে। এর কারণ, আমরা সর্বত্র আত্মপরিচয়ের সংকটের মধ্যে থাকি এবং কোনো সংগঠনের আশ্রয় নিয়ে সে সংকট কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করি। বিদেশে আত্মপরিচয়ের সংকট আরও বেশি। আমরা সহজে মূলধারায় প্রবেশ করতে পারি না। সে চেষ্টাও করি কম। অতএব প্রবাসীরা নিজেদের মধ্যেই নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য বিভিন্ন সমিতি, সোসাইটির আশ্রয় গ্রহণ করেন। নিউইয়র্ক সিটিতে অন্তত আড়াইশ অঞ্চল-ভিত্তিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও পেশাজীবী সংগঠন রয়েছে। কোনো কোনো জেলার একটি সমিতি ভেঙে চারটি হয়েছে; দুটি করে সমিতি প্রায় প্রতি জেলার। ব্রুকলিনের বাংলাদেশি অধ্যুষিত একটি এলাকায় মসজিদের কমিটি নিয়ে কলহের জের ধরে কাছাকাছি দূরত্বে চারটি মসজিদ হয়েছে। মন্দিরের কমিটি নিয়ে গোলযোগ সৃষ্টি হওয়ায় এক মন্দির থেকে দুটি মন্দির হয়েছে। পূর্ণকালীন ও খণ্ডকালীন সাংবাদিকসহ নিউইয়র্কে ৫০ থেকে ৬০ জন সাংবাদিক আছেন, প্রেস ক্লাব আছে তিনটি।  এর কারণ একটাই, কমিটির সভাপতি ও সেক্রেটারী হওয়া; অর্থ্যাৎ ছোট্ট একটি কমিউনিটিতে একটি পরিচয় নিয়ে টিকে থাকার চেষ্টা। 

আমি প্রথম যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলাম একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে। ক্যাম্পাস হাউজিংয়ে থাকতাম। পাশেই বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক ছোট্ট শহর। ছাত্রদের মধ্যে বিদেশি ছাত্র অনেক। কিন্তু শিক্ষক-কর্মচারি ও সিটির লোকজন সবই আমেরিকান। বাংলাদেশী একজনকেও পাইনি, এমনকি ভারতীয় খুব বেশি ছিল না। আমাকে আমেরিকানদের সাথে মিশতে হয়েছে এবং আমি তো কখনো হীনমন্যতায় ভুগিনি। আমেরিকানদের মধ্যে আন্তরিকতার অভাব দেখতে পাইনি। স্থায়ীভাবে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস শুরু করার পর আমি কখনো কোনো সংগঠনের আশ্রয় নিয়ে আত্মপরিচয় খুঁজতে চেষ্টা করিনি। কমিউনিটিতেও যে খুব মেলামেশা করি তাও নয়। একটি সংবাদপত্রের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে প্রেস ক্লাবের সদস্য হতে হয়েছিল, সেটিতেও ভাঙাভাঙি দেখে মন খারাপ হয়েছে। মনে হয় বিচ্ছিন্ন থাকাই ভালো ছিল।

  

জহিরুলঃ দেশের রাজনীতি প্রবাসে, এর ভালো-মন্দ দিকগুলো যদি একটু ব্যাখ্যা করেন।

মঞ্জুঃ  মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বিদেশে বসবাসকারী তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের বাসিন্দারা, বিশেষ করে যারা যুক্তরাজ্যে ও যুক্তরাষ্ট্রের বড় সিটিগুলোতে ছিলেন এবং যাদের অধিকাংশই ছিলেন ছাত্র, তারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত ও তহবিল সংগ্রহে অসামান্য ভূমিকা পালন করেন। তারা দলীয়ভাবে তা করেননি। অভিন্ন উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যে তারা নিজেদেরকে সংগঠিত করেছিলেন। তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে মূলধারার রাজনীতিবিদদের সঙ্গে দেনদরবার করেছেন। কিন্তু যখন থেকে বাংলাদেশিরা বিপুল সংখ্যায় বিদেশে যেতে শুরু করেছে তখন থেকে বিদেশে, তা যুক্তরাষ্ট্র হোক, যুক্তরাজ্য বা ইউরোপের অন্য কোনো দেশ হোক, বাংলাদেশের প্রধান শ্রমবাজার হিসেবে পরিচিত মালয়েশিয়া বা মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশ হোক – প্রতিটি দেশে বিএনপি, আওয়ামী লীগসহ প্রধান দলগুলোর শাখা-প্রশাখা রয়েছে। বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক দলের সংবিধান অনুযায়ী বিদেশে দলের শাখার অস্তিত্ব খুঁজে না পাওয়া গেলেও প্রতিটি দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে বিদেশে দলের কমিটিগুলোকে অনুমোদন দেয়া হয়। যারা বিদেশে দলগুলোর শাখার গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো পেতে চান তাদের নিকট থেকে অর্থও নেয়া হয়, এমন অভিযোগও আছে। তারা দলের নির্বাচনী তহবিলে মোটা অংকের অর্থ প্রদান করেন। দলগুলোর কেন্দ্রীয় নেতারা সফরে এলে দলের পক্ষ থেকে সংবর্ধনা প্রদান করা হয়। বিনিময়ে সরকারি দলের বিদেশি শাখার দায়িত্বশীলরা নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন নিশ্চিত করাসহ বিনিয়োগ সুবিধা লাভ করেন। 

আমার মনে হয়, মূলধারায় যুক্ত হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে না পারায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের অনেকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর পদ লাভের জন্য প্রতিযোগিতা করেন। তারা যদি তা না করে যিনি যে দেশে স্থায়ীভাবে অবস্থানের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সেই দেশের মূলধারার রাজনীতিতে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে চেষ্টা করতেন তাহলে বাংলাদেশি কমিউনিটির এবং ব্যাপক অর্থে বাংলাদেশের জন্য আরও বেশি অবদান রাখতে পারতেন। 

 জহিরুলঃ প্রথম প্রজন্মের বাঙালি লেখক, সাংবাদিক, শিল্পীদের মূলধারার সাথে খুব একটা যুক্ত হতে দেখা যায় না, এর কারণ কি ভাষার অন্তরায়, না দেশের মাটি ও সংস্কৃতির প্রতি গভীর টান? 

 মঞ্জুঃ  পাশ্চাত্যের দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে তুলনামূলকভাবে অল্প সময়ে অধিক সংখ্যক বাংলাদেশির সমাবেশ ঘটেছে। তাদের মধ্যে বেশির ভাগ বৈধভাবে অবস্থান করলেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রয়েছেন অবৈধভাবে। বৈধ ও অবৈধ নির্বিশেষে সবার মধ্যেই এমন কিছু ব্যক্তি রয়েছেন, যারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে পারদর্শী। লেখক, সাংবাদিক ও শিল্প প্রতিভাসম্পন্ন। এদেশে যারাই আসেন, তাদের প্রথম জীবনের ধকল কাটাতেই কয়েক বছর কেটে যায়। এসময়ের মধ্যে একটি অংশ যখন থিতু হন তখন তারা আগের প্রতিভা হয় হারিয়ে ফেলেন, অথবা অর্থের পেছনে ছুটে সৃজনশীল কিছু করার সময় পান না। শুধু যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার পেশা গ্রহণ করেছেন, তারা ছাড়া প্রথম প্রজন্মের আর কাউকে আপনি লেখক হিসেবে পাবেন না। তাদের লেখা মূখ্যত গবেষণাধর্মী, রাজনৈতিক ও সামাজিক বিশ্লেষণমূলক। প্রথম প্রজন্মের কেউ মূলধারার  সাংবাদিকতায় যুক্ত হননি। সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল সম্পর্কে যেহেতু আমি তেমন খোঁজখবর রাখি না, সেজন্য আমার জানা নেই যে কোনো বাংলাদেশি শিল্পী বা সাংস্কৃতিক কর্মী কেউ মূলধারায় জড়িত হয়েছেন কিনা। ভাষা অবশ্যই একটি অন্তরায়। আপনি লক্ষ্য করে থাকবেন যে, পঁচিশ-ত্রিশ বছর যাবত যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যাচেলর-মাষ্টার্স করেছেন; কিন্তু তারা কাজ চালানোর মত ইংরেজি বলতে পারলেও শুদ্ধ করে ইংরেজিতে একটি বাক্য বলতে পারেন না। আমি কাউকে ছোট করার জন্য একথা বলছি না। আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি। আপনি তো জানেন, জীবিকার তাগিদে সাংবাদিকতার পাশাপাশি আমাকে কিছু ইমিগ্রেশন অফিসে অথবা কোর্টে বা দুর্ঘটনার ঘটনায় বাংলাদেশিদের জন্য ইন্টারপ্রেটের বা দোভাষির কাজ করতে হয়। আমি অবাক হয়ে ভাবি, যারা বাংলাদেশের ষ্ট্যান্ডার্ডে যথেষ্ট শিক্ষিত, দীর্ঘদিন যাবত আমেরিকায় বসবাস করছেন, তারা কেন তাদের প্রথম অগ্রাধিকার হিসেবে ইংরেজি শিখেননি। ভাষার এই অন্তরায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিজের সৃষ্টি করা। এ অন্তরায় কাটিয়ে ওঠতে পারলে প্রথম প্রজন্মের মাটি ও সংস্কৃতির টান এখন যেমন আছে, তেমন থাকতো না বলেই আমার বিশ্বাস। 

জহিরুলঃ দেশের বাইরে থেকে লেখালেখি করেন উল্লেখ করার মতো এমন বাঙালি লেখক কে কে আছেন, তাদের সম্পর্কে যদি কিছুটা মূল্যায়ন করেন। 

মঞ্জুঃ  প্রবাসে যারা বাংলা সাহিত্য চর্চা করছেন তাদের সংখ্যা অনেক। আমি ব্যাপক অর্থে বাঙালি লেখকদের সম্পর্কে বলতে পারবো না। তবে বাংলাদেশি লেখকদের বোঝাতে চাইলে আমার মনে হয়, যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে যুক্তরাজ্যে  প্রবাসী লেখক সংখ্যা বেশি। আমি সবার নাম জানি না। যুক্তরাষ্ট্রে আসার পর আপনার বই ছাড়া অন্য কোনো প্রবাসীর বাংলা বই আমি পড়িনি। অতএব তাদের লেখার মূল্যায়ন করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। সাহিত্য চর্চায় আমার আগ্রহের ক্ষেত্র যেহেতু অনুবাদ, সেজন্য আমি প্রধানত ইংরেজি ভাষায় প্রাচ্যের সাহিত্যকর্ম পাঠ করার চেষ্টা করি। আপনার সাথে সখ্য, নৈকট্য ও আপনার বইয়ের প্রাপ্যতার কারণে আপনার প্রায় সব লেখাই পড়েছি। আপনি ভালো কাজ করছেন। সাহিত্যের প্রতিটি ক্ষেত্রে আপনি অবদান রেখে চলেছেন। প্রবাস জীবন আপনার সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে দেয়াল হয়ে দাঁড়ায়নি।

জহিরুলঃ আপনাকে ব্যক্তিগতভাবে কি দিয়েছে আর কি কেড়ে নিয়েছে এই প্রবাস জীবন?

মঞ্জুঃ  প্রবাস জীবন আমাকে নিরাপত্তা দিয়েছে; কিন্তু কেড়ে নিয়েছে আমার মায়ের কবর।

 



Comments

Popular posts from this blog

অসাধারণ এই শিল্পীর জীবনের গল্প বড় করুণ

  [এই সময়ের অত্যন্ত প্রতিভাবান শিল্পী সারফুদ্দিন আহমেদ। বাড়ি পশ্চিমবঙ্গে। আর্ট কলেজে খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করেন ,  আর শুধু ছবি আঁকেন। নানান মাধ্যমে ,  নানান বিষয়ের ছবি। সারফুদ্দিন আহমেদের ছবি থেকে চোখ ফেরানো যায় না ,  আপনাতেই ওঁর নান্দনিক সৃষ্টিকর্মে দৃষ্টি আটকে যায় ,  কী জল রঙ ,  কী অ্যাক্রিলিক ,  কিংবা স্রেফ পেন্সিলের ড্রয়িং। এই গুণী শিল্পীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কবি কাজী জহিরুল ইসলাম। সাক্ষাৎকারটি এখানে উপস্থাপন করা হলো।]       ভারত আমাকে চোখ দিয়েছে ,  বাংলাদেশ দিয়েছে দৃষ্টি -     সারফুদ্দিন আহমেদ     কাজী জহিরুল ইসলামঃ  ব্যাক গ্রাউন্ডে তবলা বাজছে আপনি ছবি আঁকছেন কাচের ওপর।    এই যে বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে ছবি আঁকা, এই ছন্দটা ছবিতে কিভাবে ধরেন? আর কোনো শিল্পী ছবি  আঁ কার সময় যন্ত্রানুসঙ্গ ব্যবহার করেছেন?   সারফুদ্দিন আহমেদঃ   কাঁচ নয়,   এটি এক বিশেষ ধরনের কাপড়-নেট। এই নেটের উপরে বর্তমানে আমার এক্সপেরিমেন্ট চলছে।    জহিরুলঃ ও ,  ফেইসবুকে যখন ছবিটি দেখি কাচের মতো ...

কানের কাছে নারী কন্ঠ

  স্বপ্নের ঐশ্বর্য   || কাজী জহিরুল ইসলাম ||   ছুটির দিন। লম্বা সময় ধরে ঘুমাবো। কিন্তু তার আর উপায় নেই। কানের কাছে নারী কন্ঠ। বেশ আত্মবিশ্বাসী কন্ঠ। ক্রমাগ ত  কথা বলে যাচ্ছেন এক অপরিচিতা। আমি লাফ দিয়ে উঠি। কে তিনি ?  আমার স্ত্রী বলেন ,  রুবানা হক ,  শোনো কী বলছেন। রুবানা হক প্রয়াত ব্যবসায়ী আনিসুল হকের স্ত্রী। আমাদের কৈশোর-উত্তীর্ণ কালে আনিসুল হক ছিলেন আমাদের হিরো। টিভি উপস্থাপনায় অন্য এক আধুনিকতা নিয়ে হাজির হন তিনি। এরপর আমরা ধীরে ধীরে তার ব্যবসায়ীক সাফল্য ,  সাংগঠনিক সাফল্য দেখতে দেখতে বড় হই। খুব সাম্প্রতিককালে ,  আনিসুল হকের মৃত্যুর পর ,  কেউ একজন বলেছিলেন ,  তার স্ত্রী রুবানা হকও খুব ভালো কথা বলেন। কিন্তু রুবানা হকের কথা শোনার সৌভাগ্য আমার হয়নি। দুই যুগ ধরে দেশের বাইরে থাকার কারণে এই সময়ে স্টার হয়ে ওঠা অনেকের সম্পর্কেই আমার ভালো ধারণা নেই।  তার কথায় এমন কিছু ছিল যে আমার পক্ষে ঘুমিয়ে থাকা সম্ভব হয়নি। আমি মুক্তিকে বলি ,  প্রথম থেকে দাও ,  পুরো বক্তৃতাটা আমি শুনতে চাই। আমি পরপর দুইবার তার পুরো বক্তব্যটা শুনি ,  ফ...