ময়ুখ চৌধুরীর কবিতা
|| কাজী জহিরুল ইসলাম ||
দাঁড়ালে পাথর হয়ে যাই/ আমি তাই হাঁটি/ অবিরাম পথের নেশায়/ পায়ের তলায় আঁকি মানচিত্র রক্তের রেখায়/ পদে পদে খানাখন্দ, কাঁটাঝোপ, ক্রোধান্বিত রোদ/ তবু/ পথের নেশায় পখ খুলে যায়/ খুলে যায় জানালায় ডানা/ সব দরজার সামনে মানুষের দেখা পেয়ে যাই/ আমি তাই হাঁটি/ দাঁড়ালে পাথর হয়ে যাই।
[কবিতাঃ দাঁড়ালে পাথর হয়ে যাই]
আমাদের চোখের সামনে একটি দৃশ্য ভেসে ওঠে। যখন বলেন ‘খুলে যায় জানালায় ডানা’ আমরা দেখি এক ভ্রমণপিপাসু মানুষকে, উড়ে উড়ে ঘুরে বেড়ানোর স্বপ্ন যার দুচোখে। তার এই পথচলাকে থামাতে চায় কত কিছু, খানাখন্দ, কাঁটাঝোপ, ক্রোধান্বিত রোদ। কিন্তু সুদৃঢ় প্রত্যয়ের মতো ‘পথের নেশায় পথ খুলে যায়’, কোনো বাঁধাই তাকে আটকাতে পারে না। একজন মানুষ যদি দৃঢ়প্রত্যয়ী হয়, তাকে বন্দি করা যায় না। তেমনি কোনো জাতির দৃঢ়সংকল্প সেই জাতিকে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করেই। কবিও দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ, তাই তিনি হাঁটেন, কেননা ‘দাঁড়ালে পাথর হয়ে’ যাবেন।
কবির চিন্তা কত কত জায়গায় যায়। একবার কবি শহীদ কাদরী আমাকে বলেছিলেন, ‘অপ্রচলিত বিষয় নিয়ে লেখ।’ কেন তিনি এটা বললেন? বললেন এজন্য যে স্বাতন্ত্র তৈরী করতে হবে, নিজের কবিতা লিখতে হবে। প্রচলিত বিষয় নিয়ে তো অনেকেই লিখেছেন, অপ্রচলিত বিষয় নিয়ে লিখলেই অন্যদের সাথে মিলে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। এই প্রয়াস আমি ময়ুখ চৌধুরীর কবিতায় দেখি। ‘পুতুলের বিয়ে’ কবিতায় তিনি লিখেন,
পুতুলের সঙ্গে পুতুলের বিয়ে।/ মালাপাতির সরঞ্জাম দিয়ে জবরদস্ত ভোজের আয়োজন।/ কলাগাছের মাংস/ ইটের মরিচ, ঘুণের পোস্তদানা, আরো অনেক কিছু।/ বিয়ে হয়ে গেল।/ পেয়ারাতলায় ঘরবাড়ি/ বিস্কুটপ্যাকেটের খাট, পাতার সবুজ বালিশ।/ সন্ধ্যার আগেই/ জামাই বউতে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেল।/ কারণ আর কিছুই নয়/ দু’ জনের কেউই ঝগড়া করতে জানে না।
দুটি কারণে আমি এই কবিতাটিকে আলোচনায় এনেছি। এই কবিতাটি গ্রামের বা অর্ধশহুরে শিশু-কিশোরদের পুতুল খেলা বা বউ/জামাই খেলার কথা মনে করিয়ে দেয়। দেখুন ‘কলাগাছের মাংস’, ‘ইটের মরিচ’, ‘ঘুনের পোস্তদানা’ ‘বিস্কুটপ্যাকেটের খাট’ এই ইনগ্রিডিয়েন্সগুলো কেমন জীবন্ত করে তোলে আমাদের শৈশবকে। অথচ কবিতায় এই বিষয়গুলো একেবারেই নতুন। আর অন্য যে বিষয়, যেটি এই কবিতার মূল লক্ষ, তা হচ্ছে, খানিকটা দুঃখ, খানিকটা ছন্দহীনতা, মানুষের জীবনে বড় দরকার। ‘সন্ধ্যার আগেই/ জামাই বউতে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেল।/ কারণ আর কিছুই নয়/ দু’ জনের কেউই ঝগড়া করতে জানে না।’
অন্ত্যানুপ্রাস এই কবির বেশ পছন্দ। প্রায় কবিতাতেই হঠাৎ তিনি একটি/দুটি অন্ত্যানুপ্রাস ব্যবহার করে ফেলেন। পুরো কবিতা মিল দিয়েও লিখেছেন বেশ অনেক। ‘সভ্যতা ও আন্দামান-নিকবর’ তেমনি একটি কবিতা। এই কবিতাগুলো যখন পড়ি তখনই বুঝি ছন্দে, অনুপ্রাসে তিনি সিদ্ধহস্ত।
একজন দেহ মেলে অন্যজন চেটে খায় নুন
একজন দেয় জল অন্যজন তরল আগুন
বোঁটা থেকে ফুল ছিঁড়ে ফোটা ফোটা দুধ
দুয়ে মিলে পান করে তাঁরার বুদ্বুদ।
এই চারটি পঙক্তিতে নরনারীর চিরায়ত সঙ্গমদৃশ্য পরিস্ফুট হয়েছে। অন্য একটি কবিতা থেকে একটি চিত্রকল্পের উদ্ধৃতি দিই। ‘তখন সিলিং ফ্যান বোঝে – দু’ডানার পরী/ কী দুঃখে সংসার ছেড়েছিল’ [কবিতাঃ যদিও নদীর মতো]। একটি মেয়ে আত্মহননের পথ বেঁছে নিয়েছে, তা কবি প্রকাশ করলেন এমন নান্দনিকভাবে, এটিই কবির কাজ, কবির কলমবাজবৃত্তি।
‘ঠিকানাগুলো হারিয়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতেঃ কোলকাতা ১৯৭৮’ এই দীর্ঘ শিরোনামের কবিতাটিতে তিনি লিখেছেন, ‘যে ট্রামে যাবার কথা ছিল/ ছিনাল নদীর মতো কোমর বাকিয়ে চলে গেল’। মনে হল যেন পকেটে পয়সা নেই জেনে এক ছিনাল মাগী তার গতর বাকিয়ে চলে গেল ভিন্ন খদ্দেরের কাছে। কখনো কখনো প্রিয় শহরের সকল সৌন্দর্য ম্লান হয়ে যায় প্রিয় মানুষের অনুপস্থিতিতে। কবি তাই বলেন, ‘ইলোরা-ব্রততী ছাড়া এ শহর ঘন ঘোর মিছে।’ আরেকটি অসাধারণ উপমা, ‘অথচ এখন আমি পিপড়ে-লাগা পেস্ট্রির মতন/ ডবল ডেকার দেখি’। জনবহুল দেশে একটি ডবল ডেকার বাসে ওঠার জন্য শত শত মানুষ বাসটিকে ঘিরে ধরেছে। ঠিক যেন পেস্ট্রির গায়ে আটকে থাকা শত শত পিঁপড়ে। জনবহুল কোলকাতা শহরকে এই একই কবিতায় তিনি দেখেছেন এভাবে, ‘কোলকাতার ম্যাচবাক্সে কাঠির মতন লোকজন’।
নতুন নতুন উপমা এবং দৃশ্যকল্প তৈরীতে তিনি সিদ্ধহস্ত। তার সমসাময়িক কবিদের কেউ কেউ যখন কবিতায় গল্প বলে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন তখন তিনি মনোনিবেশ করেছেন ইঙ্গিতময় উপমা সৃষ্টিতে। এটি হয়ত তাকে সাধারণ পাঠকের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে কিন্তু কবিতায় শিল্পের যে দাবী, নতুন কিছু সংযোজন করার যে দাবী, তা তিনি মিটিয়েছেন।
কবি ময়ূখ চৌধুরীর উপমা/উৎপ্রেক্ষা এবং চিত্রকল্প তৈরী করার ক্ষমতা বুঝবার জন্য নিচে তার তিনটি কবিতা উপস্থাপন করছি।
সম্পর্ক
কতো নিশিপাখি
তারা ছিঁড়ে আনতে গিয়ে আজও ফিরে নাই।
আকাশের কালো গর্ত এ রকম খাদ্য ভালোবাসে,
এ কথা জেনেও তুমি উড়াল দিয়েছ।
কিন্তু মনে রেখো
এখনও কিছুটা রোদ তাকিয়ে রয়েছে বারান্দায়,
যেখানে তোমার দুঃখ প্রায়ই তুমি শুকোতে দিয়েছ।
ছেলেটা কোথায় গেলো
ছেলেটা কোথায় গেল, এখন দেখি না কেন তাকে?
বুক জুড়ে এ নগরে এতো লোকেদের ভীড়
পাখি-দম্পতিহীন বহুতল মানুষের নীড়,
তবু কেন সারাক্ষণ মনে হয় কী যেন কী নেই!
একদিন জল ছিল, কাজলের টান ছিল চোখে
একদিন বৃক্ষ ছিল, ফুল ছিল আঙুলের নখে
নদীতে জোয়ার এলে ডালপালা মেলে দিত নদী
জলের সখির সঙ্গে এসে যেত কতো মাছরাঙা!
এখন মাটির নিচে সমাহিত সেই সব মাছের কঙ্কাল
একদিন গাছ ছিল, শাখাপ্রশাখার হাতছানি পেয়ে এসেছিল পাখি
এখন মাছের কাঁটা ক্যাকটাস হয়ে গেছে বেলকনির টবে।
সংসারের খড়কুটো ঠোঁটে নিয়ে উড়ে এসেছিল, পেড়েছিল নীল ডিম,
ছেলেটার হাত ছুঁয়েছিল; শেফালির বোঁটায় রক্তিম
লজ্জাটুকু ছুঁয়ে দেখেছিল, ডুব দিয়ে দেখেছিল জলের আড়ালে মাছ, ঘাস,
শিমুলের লাল। সেগুন গাছের পাতা নেই আজ, বাটালির ফুলে
এখন পাখির খাটে ডিম পাড়ে ডানাহীন মেয়েমানুষেরা।
মেঘে নয় বিজ্ঞাপনে ঢেকে গেছে আমার আকাশ,
অনেক বাল্বের চাঁদ; এখন জ্যোৎস্নায় বুক হাতছানি দেয়
বহুতল-ভবনের ফাঁকে।
ছেলেটা কোথায় গেল! এখন দেখি না আর তাকে।
এখন রেলের বিটে ওড়ে না তো এক-আনার রূপচাঁদা ঘুড়ি,
মাদারবাড়ির বুড়ি মারা গেছে বহুকাল আগে। ছেলেটা কোথায় গেল
কে পাঠালো বনবাসে তাকে? নাকি নিজে নিজে কোনো ফড়িঙের
পিছু নিতে নিতে
উড়ে গেছে দূরে কোনো উত্তর পাহাড়ে নাকি চোখের আড়ালে
বড় হতে গিয়ে আজ বুড়ো হয়ে গেছে ! কে জানে কোথায় থাকে!
কেউ কি দিয়েছে দুঃখ তাকে?
রিকশার পেছনে ঝুলে গিয়েছিল নন্দনকানন; ফিরে এসে
মার্বেল হারানো কষ্টে বসেছিল রেলবিটে একা।
যদি কেউ পাও তার দেখা, তাকে বোলো,
এখন আকাশে মেঘ, উঠোনে বর্ষার জল; অপেক্ষায় থৈ থৈ ঘরে
রুলটানা কাগজের পৃষ্ঠা হাতে নিয়ে
নৌকা বানাতে গিয়ে নীলোফার ছেলেটাকে আজও খোঁজ করে।
দেখা
তখন বুঝিনি আমি হারিয়েছি, -- কী কী হারিয়েছি।
--জামার বোতাম থেকে শুরু করে ঘন দৃষ্টিপাত,
সর্বশেষ প্রতিশ্রুতি।
পেছনে তাকিয়ে দেখি দীর্ঘশ্বাস, সবুজের বিষন্ন ছায়ায়
রোদের করুণ হাসি, সর্বশেষ অতীত আমার।
ঝাউবনে লেগেছে বাতাস, দূরের সমুদ্রে ঢেউ, পাহাড়েও হাতছানি তার।
আয়নায় ধরেছি মেলে নিজ মুখ -- কেবল প্রচ্ছদ
পাণ্ডুলিপি চলে গেছে সমুদ্রের কাছে। খুঁজি তাকে বার বার,
নিজের মনের সঙ্গে একটু দেখাও আজ হলো না আমার।

গুণী কবি-সাহিত্যিকদের নিয়ে আপনার লেখাগুলো পড়ে, তাঁদের সম্বন্ধে অনেক কিছু জানতে পারছি। এই লেখাটি পড়ে ও বেশ ভালো লেগেছে।আপনার এই প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার অনুরোধ রইল।
ReplyDeleteখুবই ভালো লাগল। আমি চলমান করোনারুদ্ধ সময়ে ময়ুখ চৌধুরীর কাব্যগুলো পড়ছি। তুমুল জনপ্রিয় হতে পারে এমন প্রায় শ'খানেক কবিতা চিহ্নিত করেছি আমি।
ReplyDelete