পুড়ে যাচ্ছে দিল্লি
|| কাজী জহিরুল ইসলাম ||
দিল্লি পুড়ে যাচ্ছে হিংসার আগুনে
এ সময়ে যদি চুপ করে থাকি, আমি মানুষ না
মুদাসসির খানের রক্ত যদি এই জটিল বসন্তে
কবিতার শব্দ হয়ে না ফোটে, আমি মানুষ না
তাসলিন ফাতিমার অশ্রুবিন্দু যদি আমার কবিতাকে
না ভেজায়, আমি মানুষ না
যদি সতেরোতে পা রাখা টগবগে তরুণ
আমানের নিথর দেহ,
পঁচাশি বছরের বৃদ্ধা আকবরীর শেষ চিৎকার
আমার কবিতার ভিত কাঁপিয়ে না দেয় আমি মানুষ না।
একবিংশ শতাব্দীর উপমহাদেশ
আজও কী পুড়বে সাম্প্রদায়িকতার আগুনে?
এখনও কী ভিন্ন ধর্মাবলম্বীর
মৃতদেহের ওপর দাঁড়িয়ে নৃত্য করবে
তারই প্রতিবেশী, বন্ধু?
এই ভারতের জন্য অহিংস আন্দোলনের
ডাক দিয়েছিলেন গান্ধী?
এই ভারতের স্বপ্ন দেখেছিল ক্ষুদিরাম,
সূর্য সেন, ভগত সিং, সুভাস বসু?
এই ভারতের জন্যে কী লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ
‘আমি ব্রাত্য, আমি মন্ত্রহীন/সকল মন্দিরের বাহিরে/
আমার পূজা আজ সমাপ্ত হল/দেবলোক থেকে/ মানবলোকে’
মানবলোকে এ কোন দানব আজ
মানুষের রক্তে হোলি খেলে?
হিংসার কী নির্মম আগুন, পুড়ছে
মৌজপুর, জাফরাবাদ, ভজনপুর, কারাওয়াল নগর
পুড়ে যাচ্ছে দিল্লি, মিনার চূড়োয় পুড়ছে শান্তির আহ্বান।
"সবার উপরে মানুষ সত্য" কি তোমরা মুছে দেবে
মানুষেরই রক্তে এই একুশ শতকে?
কোন দিকে হাঁটছে সভ্যতা?
কোথায় সুবোধের কাল্লু
যে দাঙ্গার মাঠ থেকে নিজের কাটা হাত তুলে
ছুটে পালিয়েছিল
কাল্লু ফিরে এসো দিল্লিতে, দেখো আগুনের ভেতর
দাঁড়িয়ে আছে তোমার রোকসানা, ওকে বাঁচাও
রোকসানা না বাঁচলে বাঁচবে না ভারত।
কে ওখানে? কে থমকে দাঁড়ালো?
অন্ধকারে জ্বলে ওঠে উজ্জ্বল,
বিহ্বল দুটি চোখ, ছোটো-খাটো গড়ন, সুঠাম দেহ,
তেলতেলে কালো এক যুবক
স্বধর্মী দাঙ্গাবাজদের দিকে ছুঁড়ে দেয় একদলা থুতু
এরপর ছুটে যায় আগুনের লেলিহান শিখার ভেতর
প্রেমকান্ত বাঘেলের গায়ে তখন বাঘের শক্তি,
হৃদয় মানবতার অমিয়ধারায় ভেজা,
দুচোখে কষ্টের অশ্রু;
প্রেমকান্ত দেখে পুড়ে যাচ্ছে মা,
পুড়ে যাচ্ছে পিতা, পুড়ে যাচ্ছে ভাই, বোন,
আত্মজ, আত্মজা
না কোনো মুসলমান নয়, পুড়ে যাচ্ছে মানুষ,
আমারই সহোদর, সহোদরা, ভারত মাতার সন্তান
প্রেম ঝাঁপিয়ে পড়ে আগুনের ভেতর
একে একে বের করে আনে ছয়জনকে।
পুড়ে গেছে নিজের অর্ধেক দেহ।
হাসপাতালের শুভ্র বিছানার চেয়ে শুভ্র হাসি ছড়িয়ে
বলে প্রেমকান্ত বাঘেল, ‘মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই,
নহে কিছু মহীয়ান’।
এই তো সুবোধের কাল্লু
কাল্লু তোমরা সংখ্যায় বেড়ে ওঠো
একশ বিশ কোটি মানুষের রক্তের ভেতর ছড়িয়ে দাও,
‘সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার ওপরে নাই’।
হলিসউড, নিউইয়র্ক। ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০।

Comments
Post a Comment