Skip to main content

কবি শহীদ কাদরীকে নিয়ে আমার লেখালেখি || দুই

শহীদ কাদরীর কবিতায় শরৎজন্মঋতু 

কাজী জহিরুল ইসলাম 


[১৯৪২ সালের ১৪ আগস্ট শহীদ কাদরী জন্মগ্রহণ করেন, ২০১৬-র ২৮ আগস্ট তিনি মৃত্যুবরণ করেন। আগস্ট কাদরী চর্চার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সময়। তাই তাকে নিয়ে আমার লেখাগুলো এই মাসেই ব্লগে তুলে দিচ্ছি।] 

শহীদ কাদরী মূলত নাগরিক কবি। ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী কোলকাতা শহরে জন্ম এবং এই শহরেই কেটেছে প্রাক-কৈশোরের কিছুটা সময়। দেশ ভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকা শহরে অভিবাসনতিন দশক এই শহরে অবস্থানঅতঃপর বার্লিনলন্ডনবোস্টন হয়ে নিউইয়র্কে বসবাস স্বভাবতই তাকে একজন পরিপূর্ণ নাগরিক কবি করে তোলে। প্রকৃতপক্ষে গ্রামীন জীবনের স্বাদ গ্রহণ বা অভিজ্ঞতা অর্জনের কোনো সুযোগই তিনি পান নি। যে কারণে তার কাব্যভাষাটিও হয়ে উঠেছে শহুরে। তিনি নিজেই বলেছেন, ‘কাব্যভাষা তৈরীর জন্য অভিজ্ঞতা লাগেবই পড়ে নিজস্ব কাব্যভাষা তৈরী হয় না।’ তাই তার কবিতায় শরৎ এসেছে নাগরিক দ্যোতনা নিয়ে। 

 


এ যাবৎ প্রকাশিত শহীদ কাদরীর কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা চারটিঃ উত্তরাধিকার”, “তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা”, “কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই” এবং আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও। নিউইয়র্কে অবস্থানকালীন সময়ে প্রবাসে রচিত কবিতাগুলো নিয়ে প্রকাশিত হয় আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও। অন্য তিনটি গ্রন্থের কবিতাগুলো তিনি রচনা করেন দেশ ছাড়ার আগেই অর্থাৎ ১৯৭৮ সালের মধ্যেই। এই চারটি গ্রন্থে সন্নিবেশিত কবিতার সংখ্যা ১৪১টি। এর পরে তিনি আরো চারটি কবিতা লিখেন। প্রথমটি ছাপা হয় প্রথমে কালি ও কলম’-এ এবং পরে জেলখানাহীন পৃথিবীর আন্দোলন যারা করেন সেই স্বপ্নশিকারীদের সংকলন স্বপ্নজট’-এ। শহীদ কাদরী নিজেই স্বপ্নজটে পুনর্মুদ্রণের জন্যে কবিতাটি দেন। সম্প্রতি আরও দুটি কবিতা কালি ও কলম’-এ এবং একটি কবিতা প্রথম আলো’-র ঈদ সংখ্যা ২০১৬-তে ছাপা হয়। সব মিলিয়ে তার কবিতার সংখ্যা ১৪৫টি।  এই ১৪৫টি কবিতার মধ্যে সরাসরি শরৎ কথাটি তেমন আসেনি বললেই চলে। কিন্তু শরতের আবহ তিনি তৈরী করেছেন ১৯টি কবিতায়। এই রচনায় সেই ১৯টি কবিতা নিয়ে আলোচনা করবো এবং খোঁজার চেষ্টা করবো কবি শহীদ কাদরীর শরৎ ঋতুকে। 

 

বাংলাদেশ ষড়ঋতুর দেশ। চারটি প্রধান ঋতু গ্রীষ্মশরৎশীত ও বসন্ত ছাড়া আমাদের আরো দুটি বাড়তি ঋতু আছেবর্ষা ও হেমন্ত। প্রকৃতপক্ষে বর্ধিত গ্রীষ্মই বর্ষা এবং বর্ধিত শরৎই হেমন্ত। একত্রে শরৎ এবং হেমন্তের যে রূপ আমরা ষড়ঋতুর দেশে অবলোকন করি প্রায় সেই বৈশিষ্ট্যই যে সময়টাতে পরিলক্ষিত হয় পৃথিবীর অন্যান্য দেশে সেই সময়কালকে ইংলিশরা বলেন অটাম এবং আমেরিকানরা বলেন ফল। আমরা যখন কবিতায় ধবল জ্যোৎস্নার কথা বলিশিশিরস্নাত শিউলির কথা বলি কিংবা পাতা ঝরার বর্ণনা পাঠ করি তখনি আমাদের চোখের সামনে ফল বা শরৎ-হেমন্ত ভেসে ওঠে। বিষয়টি নিয়ে কথা বলি কবি শহীদ কাদরীর সাথে। জানতে চাইশরৎ আপনার কবিতায় কিভাবে এসেছেতিনি নিজের স্মৃতিশক্তির ওপর খানিকটা অভিমানসুলভ দোষ চাপিয়েই বলেন, ‘আজকালতো আর কিছুই মনে থাকে না। তবে যতদূর মনে করতে পারি আমি সেইভাবে শরৎঋতু নিয়ে কবিতা খুব একটা লিখিনি। হ্যাঁএকটি কবিতার কথা মনে পড়ছে, “বোধ”, এই কবিতাটিতে আমি শরৎকে এনেছি। দেখা যাক সেই কবিতাটিতে তিনি কি লিখেছেন।

 

শালিক নাচে টেলিগ্রাফের তারে,/ কাঁঠালগাছের হাতের মাপের পাতা/ পুকুর পাড়ে ঝোপের ওপর আলোর হেলাফেলা/ এই এলো আশ্বিন,/ আমার শূন্য হলো দিন/ কেন শূন্য হলো দিন?/ মহাশ্বেতা মেঘের ধারে-ধারে/ আকাশ আপন ইন্দ্রনীলে ঝলক পাঠায় কাকে?/ ছাদে-ছাদে বাতাস ভাঙে রাঙা বৌ-এর খোঁপা/ এই এলো আশ্বিন,/ আমার শূন্য হলো দিন/ কেন শূন্য হলো দিন?/ শিউলি কবে ঝরেছিল কাদের আঙিনায়/ নওল-কিশোর ছেলেবেলার গন্ধ মনে আছে?/ তরুণ হাতের বিলি করা নিষিদ্ধ সব ইস্তেহারের মতো/ ব্যতিব্যস্ত মস্তো শহর জুড়ে/ এই এলো আশ্বিন,/ আমার শূন্য হলো দিন/ কেন শূন্য হলো দিন?” (কবিতাঃ বোধকাব্যগ্রন্থঃ কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই)  

 

বোধ’ কবিতাটি কবি শহীদ কাদরী সত্তরের দশকের অনুজপ্রতিম কবি মাহবুব হাসানকে উৎসর্গ করেছেন। এই কবিতায় আমরা একটি হতাশার চিত্র পাইপাতা ঝরা-কালের মতোযা আমাদের অবশ্যই শরতের কথা মনে করিয়ে দেয়। তিনি খুব সুস্পষ্টভাবেই কবিতায় একটি সুনির্দিষ্ট মাসের কথা উল্লেখ করেছেন যা শরৎকে প্রতিনিধিত্ব করে। এই কবিতায় কবি শহীদ কাদরী দিন শূন্য হবার কথা বলেছেনদিন ফুরানোর ঘন্টাধ্বনি তিনি শুনতে পাচ্ছেনযেমনি করে শরৎ পাতা ঝরিয়ে দিয়ে বৃক্ষকে শূন্য করে ফেলে। উল্লেখ করার মতো হচ্ছে, ‘আমার শূন্য হলো দিন’ এই পঙক্তিটির পরে প্রতিবারই তিনি আরো একটি প্রশ্নবোধক পঙক্তি লিখেছেন, ‘কেন শূন্য হলো দিন?’ এই প্রশ্নের মধ্যে রয়েছে খেদক্ষোভহতাশা। দিন ফুরানো’ তিনি মেনে নিতে পারছেন না। কবিতো তখন যুবক ছিলেন। তাহলে দিন ফুরানো’ নিয়ে তার এতো আক্ষেপ কেনপ্রকৃতপক্ষে কবি অন্য এক ভবিতব্যের ঘন্টাধ্বনি শুনতে পাচ্ছিলেন। দেশ ছাড়ার ঘণ্টাধ্বনি। ছেলেবেলায় মাকে প্রায়শই বলতে শুনতাম, ‘ছেড়ে যাওয়া আর মরে যাওয়া একই কথা।’ আজকের উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে হয়ত একথা সেইভাবে প্রযোজ্য নয়তবে সত্তুরের দশকের শেষেতখনকার ঢাকা শহরের প্রেক্ষাপটেছেড়ে যাওয়া মৃত্যুর মতোই বেদনাবিধুর ছিল। এটিই কবি শহীদ কাদরীর কবি জীবনের প্রথম পর্বের সর্বশেষ বা প্রায় সর্বশেষ কবিতা। বিষয়টি তিনি আঁচ করতে পেরেছিলেন যে তাঁর কবি জীবনের প্রায় যবনিকাপাত ঘটতে যাচ্ছে। এরপর দীর্ঘ দীর্ঘ বিরতি। প্রায় তিন দশক পরে মাত্র ৩৬টি কবিতা নিয়ে ২০০৯ এ প্রকাশিত হয় আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও। সেইদিক থেকে শুধু দেশ ছেড়ে যাওয়াই নয়যেন তিনি বুঝতে পেরেছিলেন তার কবি জীবনের দিনও শূন্য হতে চলেছে। কবি শহীদ কাদরীর ব্যক্তি জীবন থেকে বের করে এনে এই কবিতাটি বিশ্লেষণ করলেও আমরা এটিকে একটি সার্থক কবিতা বলতে পারি। এই কবিতায় আশ্বিনের আবির্ভাব মানুষের দিন ফুরানোর ঘণ্টাধ্বনি হিশেবে পরিস্ফুট হয়েছে সার্থকভাবেই। 

 

প্রথম কাব্যগ্রন্থ উত্তরাধিকার” এর পাঁচটি কবিতায় আমরা শরতের আবহ দেখতে পাই। কবিতাগুলি হচ্ছেঃ বৃষ্টিবৃষ্টি’, ‘নশ্বর জ্যোৎস্নায়’, ‘মৃত্যুর পরে’, ‘জানালা থেকে’, এবং কবি-কিশোর। কোনো এক ঘন বর্ষণের দিনে কবি বৃষ্টিবৃষ্টি’ কবিতাটি লিখেছেন। যে অবিরাম বর্ষণের কথা এই কবিতায় এসেছে তা কালবোশেখীর বৃষ্টি নয়এই বৃষ্টি বর্ষার শেষে বা শরতের শুরুতেই দেখা যায়যার স্রোতধারায় ভেসে যায় ঘুঙুরের মতো বেজে সিগারেট-টিন/ ভাঙা কাঁচসন্ধ্যার পত্রিকা আর রঙিন বেলুন/ মসৃণ সিল্কের স্কার্ফছেঁড়া তারখামনীল চিঠি/ লন্ড্রির হলুদ বিলপ্রেসক্রিপসনশাদা বাক্স ওষুধের/ সৌখিন শার্টের ছিন্ন বোতাম ইত্যাদি সভ্যতার/ ভবিতব্যহীন নানাস্মৃতি আর রঙবেরঙের দিনগুলি। যদিও কবি শহীদ কাদরী আমাকে বলেছেন যে তিনি বর্ষাকালের এক দুর্যোগপূর্ণ দিনে এই কবিতাটি রচনা করেছেন কিন্তু কবিতাটিতে আমরা ভাদ্রমাসের তুমুল বর্ষণের আওয়াজ পাই। 

 

এক বর্ষণমুখর সন্ধ্যা-রাতের বর্ণনাযা অবধারিতভাবেই নাগরিকপ্রতিভাত হয়েছে এই কবিতায়। তুমুল এ বর্ষণ একদিকে যেমন সন্ত্রাসীর মতো জিম্মি করে রেখেছে নগরবাসীকেকেউ বেরুতে পারছে নাআবার অন্যদিকে চিরকালের নিয়ম ভেঙে এই বর্ষণরাত্রীর শহর নিজেকে খুলে দিয়েছে তাদের জন্যে যারা এ শহরে কখনোই রাজত্ব করার সুযোগ পায় না। আজ এই রাজপথএ শহর শুধু তাদেরই দখলে। সামন্তবাদী চিন্তা এবং স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সাম্যবাদী বিপ্লবেরখানিকটা যেন আগ্রাসীজয়গান এই কবিতায় দেখতে পাইঃ

 

রাজত্বরাজত্ব শুধু আজ রাতেরাজপথে-পথে/ বাউন্ডুলে আরলক্ষ্মীছাড়াদেরউন্মুলউদ্বাস্তু/ বালকেরআজীবন ভিক্ষুকেরচোর আর  অর্ধ-উন্মাদের/ বৃষ্টিতে রাজত্ব আজ। রাজস্ব আদায় করে যারা,/ চিরকাল গুণে নিয়ে যায়তারা সব অসহায়/ পালিয়েছে ভয়ে।/বন্দনা ধরেছে – গান গাইছে সহর্ষে/উৎফুল্ল আঁধার প্রেক্ষাগৃহে আর দেয়ালের মাতাল প্ল্যাকার্ড,/ বাঁকা-চোরা টেলিফোন-পোলদোল খাচ্ছে ওই উঁচু/ শিখরে আসীনউড়ে-আসা বুড়োসুড়ো পুরোন সাইনবোর্ড/ তাল দিচ্ছে শহরের বেশুমার খড়খড়ি/ কেননা সিপাইসান্ত্রী আর রাজস্ব আদায়কারী ছিল যারা,/ পালিয়েছে ভয়ে।/ পালিয়েছে মহাজ্ঞানীমহাজন মোসাহেবসহ/ অন্তর্হিত,/ বৃষ্টির বিপুল জলে ভ্রমণ-পথের চিহ্ন/ ধুয়ে গেছেমুছে গেছে/ কেবল করুণ কটা/ বিমর্ষ স্মৃতির ভার নিয়ে সহর্ষে সদলবলে/ বয়ে চলে জল পৌরসমিতির মিছিলের মতো/ নর্দমার ফোয়ারার দিকে, -’ (কবিতাঃ বৃষ্টিবৃষ্টি – কাব্যগ্রন্থঃ উত্তরাধিকার)

 

কবি শহীদ কাদরী ১৯৪২ সালের ১৪ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন কোলকাতার পার্কসার্কাসে। সেটি ছিল শুক্রবার১৩৪৯ বঙ্গাব্দের ১লা ভাদ্র। অর্থাৎ শরতের প্রথম দিন। ১০ বছর বয়সে চলে আসেন ঢাকায়। ১৯৫৩ সালেমাত্র এগার বছর বয়সেই, ‘পরিক্রমা’ শিরোনাম দিয়ে তিনি একটি কবিতা লিখে ফেলেন, যেটি ছাপা হয় মহিউদ্দিন আহমদ সম্পাদিত স্পন্দন’ পত্রিকায়। এরপর লিখেন, ‘জলকন্যার জন্য। সেটিও স্পন্দনেই ছাপা হয়। এভাবেই শুরু। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ উত্তরাধিকার” বের হয় ১৯৬৭ সালে। তখন তাঁর বয়স ২৫ বছর। এই গ্রন্থে অবশ্য প্রথম রচিত কবিতা দুটি সন্নিবেশিত হয় নি। উত্তরাধিকার” এ সংকলিত কবিতাগুলো কৈশোর এবং প্রথম যৌবনে রচিত হলেও ম্যাচিউরিটির কোনো অভাব নেই তাতে। একজন কবির বয়স যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয় এর প্রকৃষ্ঠ উদাহরণ কবি শহীদ কাদরী। এই গ্রন্থের কবিতাগুলোতে কোলকাতা এবং ঢাকা এই দুই নগর-জীবনের অভিজ্ঞতা বিধৃত হয়েছে। যে শরৎ আমরা পাই এ গ্রন্থের উল্লেখিত পাঁচটি কবিতায় তা এই দুই নগরের ৬৭ পূর্ব সময়কালকে প্রতিনিধিত্ব করে। কবিতাগুলোতে শরতের উপস্থিতি আছেতবে শরৎঋতু-বৈশিষ্ট্যের আবহে অবস্থান করেই তা কখনো বিপ্লবীকখনো মানবিক আবার কখনো স্বপ্নচারী হয়ে উঠেছে। 

 

নশ্বর জ্যোৎস্নায়” কবিতায় তিনি একটি সময়ের কথা বলেছেন যে সময় এখনো আসে নি। অর্থাৎ ভবিষ্যতের চিত্রকল্প। সেই ভবিষ্যৎ খুব দূরের নয়, ‘মধ্য বিশ শতকের। অর্থাৎ তাঁর কৈশোরকালেরই কোনো এক সময়। কবিতাটিতে তিনি যে চিত্রকল্প নির্মাণ করেছেন তা বাংলার শরৎ ঋতুরই ছবি। 

 

জ্যোৎস্নায় বিব্রত বাগানের ফুলগুলিঅফুরন্ত/ হাওয়ার আশ্চর্য আবিস্কার করে নিয়ে/ চোখের বিষাদ আমি বদলে নি’ আর হতাশারে/ নিঃশব্দে বিছিয়ে রাখি বকুলতলায়/ সেখানে একাকী রাত্রেবারান্দার পাশে/ সোনালী জরির মতো জোনাকীরা নক্সা জ্বেলে দেবে’,

 

এই পঙক্তিগুচ্ছে যে চিত্রটি ভেসে ওঠে তা হলোবিদ্যুৎহীন এক শহরতলী থেকে ফিরে গেছে বর্ষার জল। জলাশয়ের পাড়ে মাথাচারা দিয়ে জেগে উঠেছে আম-জাম-বকুলের শাখাঅন্ধকার বাঁশঝাড়। রাতের প্রথম প্রহর। এক ঝাঁক জোনাকী মেলে দিয়েছে আলোর পশরা। কবি যখন বলেন, ‘চোখের বিষাদ আমি বদলে নি’ আর হতাশারে/ নিঃশব্দে বিছিয়ে রাখি বকুলতলায়/ সেখানে একাকী রাত্রেবারান্দার পাশে/ সোনালী জরির মতো জোনাকীরা নক্সা জ্বেলে দেবে’, তখন মুহূর্তেই জ্বলে ওঠে প্রত্যাশার আলো।   কবি আমাদের শোনান আশার বাণী। টলটল করবে কেবল এই নক্ষত্রের আলো-জ্বলা জল/ অপ্সরার ওষ্ঠ থেকে খসে-পড়া চুম্বনের মতো/ তৃষ্ণা নেভানোর প্রতিশ্রুতিতে সজল/ এই আটপৌরে পুকুরেই/ শামুক সাজাবে তার আজীবন প্রতীক্ষিত পাড়।

 

এই কবিতায় পাতা ঝরানো’ বা দিন ফুরানোর হতাশা নয় বরং শরৎ এসেছে প্রত্যাশার নতুন সূর্যোদয়েরএক রক্তিম ভোরের বার্তা নিয়ে। যেমন কবি ওয়াল্ট হুইটম্যান শরৎকে দেখেছেন ইতিবাচক ঋতু হিশেবে, ‘আমাকে শরতের বাগান থেকে পাকা এবং রসালো ফল এনে দাও।’ আমরা কবি শহীদ কাদরীকেও দেখি মূল্যবোধের সংস্কারকে পেছনে ফেলে নতুন দিনের প্রত্যাশায় শারদীয়া জ্যোৎস্নায় অবগাহন করতে কোনো এক শরৎ রাত্রীর বারান্দায়।

 

পরিত্যক্ত মূল্যবোধনতুন ফুলের কৌটোগুলো/ জ্বলজ্বলে মণির মতন সংখ্যাহীন জ্যোৎস্না ভরে নিয়ে/নিঃশব্দে থাকবে ফুটে মধ্য-বিশ শতকের ক্লান্ত শিল্পের দিকে চেয়ে/ এই মতো নির্বোধ বিশ্বাস নিয়ে আমি/ বসে আছি আজ রাত্রে বারান্দার হাতলচেয়ারে/ জ্যোৎস্নায় হাওয়ায়। (কবিতাঃ নশ্বর জ্যোৎস্নায় – কাব্যগ্রন্থঃ উত্তরাধিকার)

 

ভাঙা বর্ষা অন্দর-গ্রামেফসলের মাঠেদুয়ারে-উঠানেঝোপঝাড়ে জলবিহার শেষে বার্ধক্যের অমোঘ টানে ফিরে যায় নদীতেসমুদ্রে। বর্ষার শবদেহের ওপর উত্তুরে মিহি হাওয়ার টানে নেমে আসে বিষণ্ণ শরৎটুপটাপ ঝরে পড়ে লাল-হলুদ পত্র-পল্লবরাজী। এই হলো চিরায়ত শরৎদুঃখ ভারানত। যেন আমার কবরে আমি জ্বলন্ত শেয়াল/ সন্তর্পণে নাকে শুঁকে রাত্রির নিঃশব্দ মখমলে/ আমার টাটকা শব ফেরে যেন আমারই দখলে।’ কবিতার নাম মৃত্যুর পরে। এই কবিতার হৃদস্পন্দনে বেজে ওঠে মৃত বর্ষার শেষকৃত্যানুষ্ঠানের বিউগল আর যেন সেই শোকসভায় খুব সন্তর্পণে আগমন ঘটে এক বিষণ্ণ শরতের। কবিতাটিতে কবি শহীদ কাদরী কিছুটা আংগিক বদলের কাজ করেছেন। পয়ারে যোগ করেছেন অন্তমিল। 

 

রয়ে যাই ঐ গুল্মলতায়,/পরিত্যক্ত হাওয়ায়-ওড়ানো কোনো হলুদ পাতায়,/ পুকুর পাড়ের গুগগুলে,/ এক ফোটা হন্তারক বিষেযদি কেউ তাকে পান করে ভুলে,/ অথবা সুগন্ধি কোনো তেলের শিশিতে,/ মহিলার চুলে,/ গোপনে লুকিয়ে থাকি যেন তার ঘুমের নিশীথে/ অন্তত নিদেনপক্ষে এক লাফে পেরিয়ে দেয়াল/ পৌঁছে যেতে পারি যেন আমার কবরে আমি জ্বলন্ত শেয়াল/ সন্তর্পণে নাকে শুঁকে রাত্রির নিঃশব্দ মখমলে/ আমার টাটকা শব ফেরে যেন আমারই দখলে।/ বিঘ্নহীনরক্তমাংসে হাড়গোড় চেটেপুটে সবই খাওয়া হয়/ নিজেই বাঁচাতে যেন পারি ওহেনিজেরই নেহাৎ/ ব্যক্তিগত অপচয় (কবিতাঃ মৃত্যুর পরে – কাব্যগ্রন্থঃ উত্তরাধিকার)

 

ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বস্তুর মধ্যেপুকুরের গুগগুলেঝরাপাতায়যেখানে যেখানে মানুষ আঁকে তার পদচিহ্নবেঁচে থাকতে চায় মৃত্যুর পরেও। শুকিয়ে যাওয়াফিরে যাওয়া বর্ষার কথাই বারবার মনে পড়ে। শুকনো খালের তলানিতে কিছুই কি রয়ে যায় না মৃত বর্ষারএই শরতে

 

নোবেল বিজয়ী কথাসাহিত্যিক আর্নেস্ট হেমিংওয়ে শরৎকে বিষাদের ঋতু হিশেবেই দেখেছেনতার মতে, ‘এটাই স্বাভাবিক যে শরৎ-এ তুমি দুঃখভারানত হবে। প্রতি বছর জীবনের কিছু অংশ মরে যায় যখন গাছেরা পাতা ঝরায় এবং তাদের শাখাগুলো নগ্ন হয়ে পড়ে। নগ্ন ডালের ওপর দিয়ে বয়ে যায় শৈত্যপ্রবাহ এবং তারা উন্মুখ হয়ে থাকে এক ফালি রোদের জন্য। ত্রিশের দশকে বাংলা কবিতার অনুষঙ্গে যুক্ত হয় বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তাকবিরা আঁকতে শুরু করেন এমন চিত্রকল্প যার আড়ালে লুকানো কবিতার প্রাণভ্রমর। আধুনিক কবিতা হয়ে ওঠে তালাবদ্ধ ঘরে আটকে রাখা এক সুন্দরী তরুণীকিন্তু সেই ঘরের একমাত্র খোলা জানালা দিয়ে বিদ্যুচ্চমকের মতো চমকাচ্ছে তরুণীর রূপের ছটা। পাঠক চোখ রাখেন জানালায়দেখেন, ‘আঘাটার অপ্সরীবৃন্দ অপেক্ষায় স্পন্দিত হয়/ গল্পের হলদে পাতার বাগানে আর নেশা-পাওয়া হাওয়া/ আসে যেন ভ্রমরেরও আগে/ এবং বাউলের একতারার মত বেজে ওঠে চাঁদ,/ অমাবস্যায় গোলাপঝাড়ের মত পুঞ্জ পুঞ্জ জোনাকি/ ভয়ে রয় রাত্রির ময়দানগুলো জুড়ে;/ এবং যুগল পিদিমের মত মার চোখের আশ্বাসের আলোয়/ তরুণ ঘোড়ার পিঠে দ্রুত পেরিয়েছি শৈশবকৈশোর’ (কবিতাঃ জানালা থেকেকাব্যগ্রন্থঃ উত্তরাধিকার)। জানালা থেকে” কবিতার আরো কিছু অংশের উদ্ধৃতি দেওয়া যাকঃ

 

কিন্তু দৃষ্টিহীন আকাশ ক্রমে নেমে এল/ বিস্বাদে পীতাভ/ এবং গেঁথে রইল জানালার মরচে-পড়া সারি সারি শিকে/ যেন আমার মৃত অশ্বের ছাল টানিয়েছে কেউ/ অকরুণ রোদ্দুরে!/ আর আমি অপরিসর শয্যার চৌদিকে/ অস্তিত্বের সীমা টেনে/ দীর্ঘশ্বাসের কালো ফুলে সাজাবো স্মৃতির বাসর!/ নিঃসঙ্গতাকে যৌবনের পরম সুহৃদ জেনে/ তার সহোদরা কান্নার বাহুবন্ধে সঁপে দেবো/ স্বপ্নের সত্য আর সত্তার সার/ এবং আমার জানলা থেকে/ নিরুপায় একজোড়া আহত পাখির মত চোখ/ রাত্রিভর দেখবে শুধু    দূর দর-দালানের পারে/ আবছা মাঠের পর নিঃশব্দ ছিন্ন করে জোনাকির জাল/ ছুটে গেল যেন এক ত্রস্ত ভীত ঘোড়ার কঙ্কাল

 

নিস্তেজনিরুত্তাপ বর্ষার কঙ্কালকরোটির ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া শৈত্যপ্রবাহের মতো এক শীতলহতাশ শরৎ অবলোকন করি এই পঙক্তিগুচ্ছে। এক নিঃসঙ্গ পুরুষ উষ্ণতাহীন যৌবন গুটিয়ে পড়ে আছে অপরিসর শয্যায়। জানালায় আহত পাখির মতো একজোড়া চোখ। একই হতাশা কবি-কিশোর’ কবিতাটিতেও। নিঃস্বপ্ন আকাশে জ্যোৎস্না-লাগা/মেঘের ঝুলনা’ কিংবা চারদিকে কালো-মাথা তবু গোধূলিতে কী সুন্দর/ ওই সিন্ধুজল/ কেঁপে ওঠেতরঙ্গ ছড়ায় পরীদের গন্ধবাহী/ মন্থর হাওয়ায়’ বিষণ্ণ শরতের কথা মনে করিয়ে দিলেও এই কবিতাটিতে একটি আক্ষেপের চিত্রকল্প রচিত হয়েছে। এক বিশ্বাসঘাতকের হাত থেকে বেঁচে যাওয়া কোনো এক বন্ধুকে উদ্দেশ্য করেই কবি বলছেনঃ 

 

তুই শুধু বেঁচে গেলি বিভীষণ অন্যদের ছুঁলো/ নীলিমার উষ্ণ জরায়নে তিলে-তিলে জমে-ওঠা/ লালাভ স্পন্দন/ দ্যাখে নি কোথাও কেউকোনো লোককোনো বোকা চোখ/ বিশ শতকের শূন্য নিঃস্বপ্ন আকাশে জ্যোৎস্না-লাগা মেঘের ঝুলনা, -/ অলীকঅদ্ভুতহাস্যকরঃ এইমতো ঠাওরালো/ সকলেইসকলেই-/ তুই শুধু বেঁচে গেলি  বিভীষণ অন্যদের ছুঁলো!/ চারদিক কালো-মাথা তবু গোধূলিতে কী সুন্দর/ ওই সিন্ধুজল/ কেঁপে ওঠেতরঙ্গ ছড়ায় পরীদের গন্ধবাহী/ মন্থর হাওয়ায়/ ক্ষীণায়ু মোমের মতো ম্লান সূর্য-প্রয়াণের পর/ ককায় অপেক্ষমাণ পড়ে-থাকা স্তব্ধ পটভূমি/ স্বপ্নের উজ্জ্বল দাগে আকাঙ্ক্ষার কঠিন আঁচড়ে/ ভরে গেলো/ তুই শুধু বেঁচে গেলি,  বিভীষণ অন্যদের ছুঁলো

 

দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা”-র মাত্র তিনটি কবিতায় শরতের আবহ খুঁজে পাই। কবিতা তিনটি হচ্ছে স্কিৎসোফ্রেনিয়া”, “আইখম্যান আমার ইমাম” এবং একবার দূর বাল্যকালে। গ্রন্থটির প্রকাশকাল ১৯৭৪রচনাকাল ১৯৬৭ থেকে প্রকাশকাল অবধিঅর্থাৎ ৭ বছর। শহীদ কাদরী একজন বিরলপ্রজ কবিতাই তার একটি কাব্যগ্রন্থের জন্য পাঠককে অপেক্ষা করতে হয়েছে অনেক সময়। এই গ্রন্থের রচনাকালের মধ্যেই সংগঠিত হয়েছে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ। স্বভাবতই কবিতাগুলোতে মুক্তিযুদ্ধের দৃশ্যকল্প উপস্থাপিত হয়েছেবিধৃত  হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের আবেগপ্রত্যয় এবং ভয়াবহতা।  

 

 

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় উপন্যাস ওয়ার এন্ড পিস” এর রচয়িতা প্রখ্যাত রুশ লেখক লিও টলস্টয় শরৎকে বিষাদহতাশা ও অপ্রাপ্তির ঋতু হিশেবেই চিহ্নিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘ছবিটিকে পরিস্ফুট করে তোলার জন্য একজন চিত্রকরের যেমন আলো দরকারআমার ভেতরেও তেমনি আলো চাই যা আমি শরৎকালে যথেষ্ট পরিমাণ পাই না। শহীদ কাদরীকে বলতে শুনি, ‘একবার পেয়েছিলাম দূর বাল্যকালেকৈশোরে/ রাস্তার ফাটলে কিছু তরল জ্যোৎস্না’ (কবিতাঃ একবার দূর বাল্যকালেকাব্যগ্রন্থ-তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা)। সেই জ্যোৎস্না কবিকে পথ দেখিয়ে কতদূর নিয়ে গিয়েছিলতিনি কি সেই জ্যোৎস্না হারিয়ে ফেলেছিলেন? ‘জ্যোৎস্না জ্যোৎস্না বলে বারান্দায় দাঁড়ালে/ হুইসিল বাজিয়ে দৌড়ে আসবে পুলিশগর্জাবে খাকি জিপ!/ অথচ বদান্যতার অভাব নেই কোনোজ্যোৎস্নার জ্বলজ্বলে লাবণ্য/ আজীবন খুচরো পয়সার মতো পার্কেঘাসের ফাঁকে ফাঁকে/ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকে।/ শুধু যথার্থ হা-ঘরে যারাবেকারউপোসীতারাই তাকে নির্বিকারনোংরা আঙুলেবারবার খুঁজে পায়। একজন প্রকৃত মার্ক্সবাদী কবির মতো তিনি এবারও উপোসীবেকার কিংবা ভবঘুরেদেরই পাশেই দাঁড়ান। তিনি তবু দ্ব্যর্থহীন কন্ঠে উচ্চারণ করেননির্বিকারনোংরা আঙুলে তারাই বারবার জ্যোৎস্নাকে খুঁজে পায়। মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে আমাদের প্রত্যাশার জ্যোৎস্না যখন অমাবশ্যার প্রগাঢ় অন্ধকারে নিমজ্জিত তখনো কবি প্রত্যাশার আলো জ্বেলে রাখেন। যেমন শরতের পাতা ঝরা ন্যাড়া ডাল আবারো পত্রপুষ্পে ভরে উঠবে এই প্রত্যাশায় অপেক্ষমাণ বসন্তের পাখিরা। এই কবিতাটিতে তিনি একটি নতুন শব্দ হা-ঘরে’ ব্যবহার করেছেন। হা-ঘরে’ শব্দটিএই কবিতায় হা-ভাতে’-র অনুকরণেযার ঘর নেই কিন্তু ঘরের আকাঙ্ক্ষায় বিভোরহিশেবে এসেছে। আলজেরিয়ান-ফরাসী কবি আলবেয়ার কামুর কন্ঠে আমরা শুনি আরো অপটিমিস্টিক উচ্চারণ, ‘শরৎ আসলে আরেক বসন্তপ্রতিটি পাতাই তখন হয়ে ওঠে ফুল। 

 

স্কিৎসোফ্রেনিয়া” কবিতায় তিনি হেমন্তের বিবর্ণ পাতার মত’ ঝরে যাওয়া বর্ণমালাহীন শূন্যতায়’ বুনে যান মেটাফোরিক মুক্তিযুদ্ধ। এই কবিতায় টেবিলগুলো বিস্ফোরণ ঘটায়টাইপরাইটারগুলো গর্জে ওঠেমগজের মধ্যে ডুবে থাকে সাবমেরিনের সারি এবং সংবাদপত্রের শিরোনামগুলি ক্রমাগত বাজিয়ে চলে সাইরেন। সর্বত্রই তিনি শুনতে পান মুক্তিযুদ্ধের দামামা। 

 

চারদিকে বিস্ফোরণ করছে টেবিল,/ গর্জে উঠছে টাইপরাইটার,/ চঞ্চলমসৃণ হাতে বিশ্বস্ত সেক্রেটারীরা/ ডিক্টেশন নিতে গিয়ে ভুলে গেছে শব্দ-চিহ্ন,/ জরুরী চিঠির মাঝামাঝি/ জাহাঁবাজ ব্যাপারীর দীপ্ত জিহবা/ হেমন্তের বিবর্ণ পাতার মতো ঝরে গেছে/ বর্ণমালাহীন শূন্যতায়,-/ পেটের ভেতরে যেন গর্জে উঠছে গ্রেনেড,/ কার্বাইনের নলের মতো হলুদ গন্ধকঠাসা শিরা,/ গুনাগার হৃদয়ের মধ্যে ছদ্মবেশী গেরিলারা/ খনন করছে গর্তফাঁদদীর্ঘ কাঁটা বেড়া।/ জানু বেয়ে উঠছে একরোখা ট্যাঙ্কের কাতার,/ রক্তের ভেতর সাঁকো বেঁধে পার হলো/ বিধ্বস্ত গোলন্দাজেরা,/ প্রতারক কটা রঙহীন সাব-মেরিনের সারি/ মগজের মধ্যে ডুবে আছে,/ সংবাদপত্রের শেষ পৃষ্ঠা থেকে বেরিয়ে এসেছে/ এক দীর্ঘ সাঁজোয়া-বাহিনী/ এবং হেডলাইনগুলো অনবরত বাজিয়ে চলেছে সাইরেন।/ একটি চুম্বনের মধ্যে সচীৎকার ঝলসে গেল কয়েকটা মুখ,/ একটি নিবিড় আলিঙ্গনের আয়ুষ্কালে/ ৬০,০০,০০০ উদ্বাস্তুর উদ্বিগ্ন দঙ্গল/ লাফিয়ে উঠলো এই টেবিলেরপর;/ বেয়োনেটে ছিঁড়ে যাওয়া নাড়ি-ভুঁড়ি চেপে,/ বাম-হাতে রেফ্রিজারেটর খুলে পানি খেলো/ যে-লোকটাতাকে আমি চিনি (কবিতাঃ স্কিৎসোফ্রেনিয়াকাব্যগ্রন্থ-তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা)

     

অধিকারবঞ্চিতনিপীড়িতনির্যাতিত এক জনপদের জনরোষ ভরা বর্ষার মতো উত্তাল। এরপর আসে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষঅধিকার আদায়ের সশস্ত্র সংগ্রামমুক্তিযুদ্ধ। যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশ স্বভাবতই শরতের শান্তস্নিগ্ধ রূপে আবির্ভূত হবেক্রমশ সমৃদ্ধির সোপানে পা রেখে এগিয়ে যাবে পত্রপুষ্পশোভিত বসন্তের দিকে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের প্রকৃত চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। 

 

আইখম্যানের মতো মুখ করে/ একজন ইমাম দাঁড়িয়েছেন মিনারের/ উঁচু মাইক্রোফোনে/ এবং চতুর্দিকে/ নক্ষত্রের মতো নিস্পাপ ক্লাবগুলো/ কেবল ঝকঝক/ চকচক করছে/ অ-ন-ব-র-ত। তখনকার প্রকৃত চিত্রটি ছিল, ‘শ্রাবণে খরা,/ আষাঢ়েও বালি জ্বলছে,/ টলে পড়ছে পাতার জলের মতো/ গ্রামগুলো নদীর ভেতর/ তিন চার দিন হলো ঘুম নেই,/ রাতেওহেঁটে বেড়াচ্ছি তবুও/ গুপ্তঘাতক-ভরা/ শহরের আনাচে কানাচে/তিন চার দিন হলো,/ একটা ছুরি খাওয়া কিশোর/ পুকুর-বসানো আংটির মতো পার্কে/ পড়েছিলো (তিন চার দিন হলো)/ দেয়ালে নতুন পোস্টার/ শাসাচ্ছে সবাইকে-/ আমাকেও,/ মনে পড়লো/ মাথার ওপর বি-৫২ বিমানের/ দিকে তাকিয়ে দৌড়ুচ্ছে তিনজন কিশোর/ - কিউবার একটা দুর্লভ কাগজে/ দেখেছিলাম হ্যানয়ের একটা ছবি/ মনে পড়লো/ র‍্যাপার জড়িয়ে ট্রেঞ্চে ছিলাম/ এইতো সেদিন ব্লাকআউটের রাত্রে-/ আমিও,/ মনে পড়লো/ ক্রাচে ভর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে/ একজন ফ্রিডম ফাইটার…” (কবিতাঃ আইখম্যান আমার ইমামকাব্যগ্রন্থঃ তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা)।

 

চার বছরের মধ্যেই১৯৭৮ সালেশহীদ কাদরীর তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই” বের হয়। ৩৫টি কবিতার মধ্যে আমরা শরতের আবহ খুঁজে পাই ৬টি কবিতায়। কবিতাগুলো হচ্ছে, “কেন যেতে চাই”, “কেন যেন বলছে”, “এবার আমি”, “যাই যাই”, “ধুসর জল থেকে”, এবং বোধ

 

“‘বোধ” নিয়ে আগেই বিস্তারিত আলোচনা করেছি। এখানে অন্য ৫টি কবিতার ওপর আলোকপাত করবো। কেন যেতে চাই” কবিতায় তিনি মানুষ যে আজন্ম স্বার্থপরপ্রকৃতির মতোইতা তুলে ধরেছেন। 

 

আমিতো তোমাদেরই দিকে যেতে চাই/ইন্দ্রনীল একটি মোহন আংটি/ প্রেমিকের কম্পমান হাত থেকে প্রেমিকার আঙ্গুলে যেমন/উঠে যেতে চায়,/ কিন্তু চাষাবাদবাণিজ্য এবং প্রতিযোগিতামূলক শিল্প/  ইত্যাদি বিষয় নিয়ে তোমরা ব্যস্তবড্ড বেশি ব্যস্ত।/ হরিণ-হননকামী ব্যাধের মাংসল মুঠো থেকে ছুটে-যাওয়া/ বল্লমের মতো তোমরা ব্যস্ত/ চিরচেনা বৃক্ষরাজিকে পল্লবশূন্য করার জন্য শীতের জটিল/ বিস্তারের মতো তোমরা ব্যস্ত/ যাত্রী নিয়ে ঘর-ফেরা নৌকোগুলো হরণ করার জন্য চোরাস্রোতে/ এবং ঘূর্ণিপাকের মতো তোমরা ব্যস্ত/ তোমরা ব্যস্ততোমরা ব্যস্ততোমরা ব্যস্ত,/ তোমরা বড্ড বেশি ব্যস্ত/ অথচ আমিতো আজীবন তোমাদেরই দিকে যেতে চাই।/ কেন যেতে চাই! (কবিতাঃ কেন যেতে চাইকাব্যগ্রন্থঃ কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই)

 

যখন বাংলাদেশের আকাশে বাতাশে শরতের উদারতা’, এবং যখন কবি শহীদ কাদরী বলেন, ‘আমিতো আজীবন তোমাদেরই দিকে যেতে চাই’ তখন তারই বন্ধুখুব কাছের মানুষকবি আল মাহমুদও প্রায় একই কথা বলেন ভিন্ন সুরে, ‘ইচ্ছা হয় না ঘরের ভেতর বসে থাকি সারা দিন/ কিন্তু বাইরে যাওয়ার ইচ্ছা টান লাগে সারা বুকে/ মনে হয় যেন আমার বক্ষে কান পেতে আছে কেউ,/ আজ সারা দিন হাওয়ার মাতম বইছে বাঁধন ছিঁড়ে’ (কবিতাঃ রূপকথা)। 

 

কবি শহীদ কাদরীর এক কাজিন ডাক্তার শাহানু যোগ দিয়েছিলেন তৎকালীন পাকিস্তান আর্মিতে। একাত্তরে পাক-আর্মিরা তাকে গুলি করে মেরে ফেলে। রক্তস্নাত একাত্তরের শরতে যেন পড়ে আছে তার লাশ। 

 

তোমার কালো চকচকে বুটের ভেতর/ এতক্ষণে কয়েক ইঞ্চি শিশির জমেছে,/ সর্বত্রগামী জ্যোৎস্না কুন্ডলী পাকিয়ে/ শুয়ে আছে বুটের গহ্বরে,/ ক্যাপ্টেনতোমাকে ত্যাগ করে দূরে পড়ে আছে/ তোমার বিহ্বল স্টেনগানতার চৌদিকে ঘাস-পোকার গুঞ্জন/ ................................/ টুপটাপ করে ঝরে পড়ছে তোমার চারদিকে/ শিশিরজ্যোৎস্নাটগরচাঁপা আর বকুল (কবিতাঃ কেন যেন বলছেকাব্যগ্রন্থঃ কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই)

 

সামরিক অনুষঙ্গ শহীদ কাদরীর কবিতায় বারবারই এসেছে। এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে কবি নস্টালজিক হয়ে পড়েন, ‘শাহানু ভাই খুব ভাল কেরাম খেলতে পারতেন। ওরা তাঁকে গুলি করে মেরে ফেলে। তাছাড়া মুক্তিযুদ্ধতো সব সময় মাথায় থাকেই। কিছু বন্ধু-বান্ধব এয়ার ফোর্সে ছিলএইসব মিলিয়েই সামরিক অনুষঙ্গগুলো আমার মধ্যে ভীড় করে যা কবিতায় এসেছে।

 

আজন্ম শহুরে এই কবি যদি হঠাৎ গ্রামে চলে যান তাহলে কি হবেফিরে এলে তার বন্ধুরা তাকে চিনতে পারবেনতোআসলে এই প্রশ্নটি আরও তির্যকএর লক্ষ্য আরও গভীরে। যখন শহীদ কাদরী নিজেই বলেন, ‘বুঝলা জহিরতখন এমন একটা সময় ছিলএকবার কেউ ঢাকার বাইরে গেলেই শেষ। কত কবি ঢাকার বাইরে চাকরী করতে গিয়ে হারিয়ে গেলো।

     

তারাতো আমার মতো পাৎলুনের পকেটে হাত রেখে/ অহঙ্কারের ভেতর হতশ্রী-হতচ্ছাড়া নয়। তাদের/ সোনালি খড়ের ভিটে আছেগভীর কুয়োতলা আছে/ খররৌদ্রে জিরোনোর জন্যে পাথর এবং চত্বর আছে। বটচ্ছায়া?/ সেতো আছেইবদ্যিবুড়োর মতো আদ্যিকাল থেকে,/ আর তাছাড়া সরপুঁটিমৌরলাধপধপে চিতল-/ এরাতো গ্রামেরই মানুষ!/ একবার গ্রাম থেকে আমি পকেট ভর্তি শিউলি/ এনেছিলাম (একা একা গন্ধ শুঁকেছি খুব ফিরতি ট্রেনে)। দ্যাখে নি,/ নাকেউ দ্যাখে নি – পুকুরের আড়াআড়ি/ হাঁটতে গিয়ে আড়চোখে গোলমোরের ডাল- হ্যাঁ তা-ও দেখেছি,/ ‘ওসবে আমার কিছু আসে যায় না হে’/ এখন আর জোর গলায় তা বলতে পারি না।/ আমি করাত কলের শব্দ শুনে মানুষ।/ আমি জুতোর ভেতর মোজার ভেতর সেঁধিয়ে যাওয়া মানুষ/ আমি এবার গাঁও – গেরামে গিয়ে/ যদি ট্রেন ভর্তি শিউলি নিয়ে ফিরি/ হে লোহা তামা পিতল এবং পাথর/ তোমরা আমায় চিনতে পারবে তো হে! (কবিতাঃ এবার আমিকাব্যগ্রন্থঃ কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই) 

 

কবিতাটিতে আমরা এক খেয়ালী শহুরে যুবককে দেখি শরতের এক ভোরে একাকী ছুটে গেছে দূরের কোনো শিশিরস্নাত গ্রামেশিউলির টানে। খেয়ালী যুবকের খানিকটা হেয়ালিও দেখি ক্রমান্বয়ে সভ্য হতে থাকা প্রস্তরতাম্র ও লৌহযুগের উত্তরসুরীদের প্রতিযখন তিনি ট্রেন ভর্তি করে শিউলির মতো স্নিগ্ধ এবং শুভ্র স্বপ্ন নিয়ে ফিরে আসেন এই আটপৌরে শহরে।  

 

শারদীয়া প্রভাবে শহীদ কাদরীকে আমরা প্রায়শই নস্টালজিক হয়ে পড়তে দেখি।

 

হাই তুলতে তুলতে যাই বটগ্রামে শিউলিতলায়/যেখানে দাঁড়িয়ে আমি কোনোদিন ফটোগ্রাফ তুলি নাই/হে আমার মোরগের চোখের মতন খুব ছেলেবেলা/ ........................................./ সে কি শিমুলের মতো উড়ে/ চলে গেছে শালবনেকন্ঠ তার মহুয়ায়/ মাদলের বোলেজন্মে-জন্মেঅন্য কোনো জন্মান্তরে/ জাগ্রত হবে না আরযদি হয়আজ তাই/ যা কিছু এড়িয়ে গেছিআড়ালে রেখেছি/ আমার নিজের মধ্যেকবিতার ক্লান্ত শব্দেবারবার/ ফিরিয়ে আনতে চাই। আজ আবার আমার/ ইচ্ছে হলো যাইএই রঙ-বেরঙের শার্টজামা-জুতো,/ মাছ থেকে মাছের আঁশের মতো কৌশলে ছাড়াই...যাই.../ একটি নতুন বীজ হয়েবকুল অথবা/ চামেলির ছদ্মবেশে এক্কেবারে শব্দহীন চলে যাই।’ (যাই যাইকাব্যগ্রন্থঃ কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই) 

 

হ্যারি পটার এন্ড দি ডেথলি হ্যালোজ-এ সাড়া জাগানো কল্পকাহিনী-লেখিকা জেকে রাওলিং তার কল্পরাজ্যে শরৎ-কে দেখেছেন ক্রিস্পি এবং সোনালি আপেল হিশেবে। তিনি বলেন, ‘সে বছর যেন হঠাৎই শরৎ এলো। সেপ্টেম্বরের প্রথম সকালটি ছিল একটি ক্রিস্পি এবং সোনালি আপেল। আর শহীদ কাদরী দেখেন বটগ্রামে শিউলিতলায় মোরগের চোখের মতো ছেলেবেলার শরৎ ঋতুকে। এই শহর মাছের আঁশের মতো। আঁশতো শরীরেরই অংশ। সেই আঁশ ছাড়িয়ে বকুল অথবা চামেলির ছদ্মবেশে এক্কেবারে শব্দহীন চলে যাওয়া যাবে কিকবিতাটি পাঠকের মনে এইসব প্রশ্নের জন্ম দেয়। 

 

১৯৭৮ সালে তিনি দেশ ছাড়েন। সিদ্ধান্ত হয়ে যাওয়ার পরে তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই” প্রকাশের চিন্তা করেন। শিরোনামটিই বলে দিচ্ছে ঈর্ষার আগুন জ্বলছিল আশে-পাশে। তার চলে যাওয়া নিয়ে তাই কোনো শোক নেইক্রন্দন নেই। এই গ্রন্থের কিছু কবিতা দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরে রচিত বলেই ধারনা করি। কেননা এই কবিতাগুলো তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে। যখন তিনি বলেন, “কোথাও না কোথাও ঠিক আছে/ নিজস্ব শিউলি আর চন্দ্রমল্লিকার কাছে” তখন আমরা বুঝে ফেলি এই নিজস্ব শিউলি বা চন্দ্রমল্লিকা তার একান্ত স্বপ্নের রৌদ্রকরোজ্জ্বল দিনযা তিনি কোথাও না কোথাও পাবেন এই প্রত্যাশায় পা বাড়ান স্বদেশের সীমান্তের বাইরে। অবশ্য পরবর্তী জীবনের কবিতাগুলোতে পরবাসকে তিনি নিষ্ঠুর নির্বাসন হিশেবেই চিহ্নিত করেছেন।

          

এই ভূবনেই জানাশোনা/ বিবসনা/কোথাও না কোথাও ঠিক আছে/ নিজস্ব শিউলি আর চন্দ্রমল্লিকার কাছে/ কোথাও না কোথাও ঠিক  আছে/নদীর ওপারে/ তার বাড়ি/ মধ্যে তার দারুণ ধুসর জল বয়ে যায় আড়াআড়ি/ নদীর ওপারে/ তার বাড়ি/ পালের সঙ্গে তার আড়ি/ চারিদিকে মোহনা ও খাড়ি/ এ ভুবনেই/ সে যে আছে/ তাই আমার খামার ফেলে আমি/ ধুসর এ জলে এসে নামি/ রাঙা ঐ জলে যাবো বলে/ ধূসর জল থেকে রাঙা জলে/ ধূসর জল থেকে রাঙা জলে’ (ধূসর জল থেকেকাব্যগ্রন্থঃ কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই)

 

এই কবিতাটিতে নির্বাসন বা মাইগ্রেশন যা-ই বলি না কেন তার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে। ছেড়ে যাবার কষ্ট আছেতার চেয়েও প্রবল স্বপ্ননতুন ভূখণ্ডের উজ্জ্বল প্রলোভন এবং তা রাঙা জলের মতো বর্ণিল। এই কবিতাতে তিনি বেশ কিছু অন্ত্যমিল ব্যবহার করেছেন যা পঞ্চাশের কবিরা পরিহার করবেন বলে পণ করেছিলেন। যদিও আল মাহমুদ প্রচুর অন্ত্যমিলের কবিতা লিখেছেন এবং এক পর্যায়ে শামসুর রাহমানও লিখেছেন। 

 

২০০৯ সালেসুদীর্ঘ ৩১ বছর পরে প্রকাশিত হয় আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও” কাব্যগ্রন্থটি। কবি তখন নিউ ইয়র্কেহুইলচেয়ারে। সপ্তাহে তিনদিন ডায়ালাইসিস তার প্রধান রুটিন। কথাশিল্পী জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের জোরাজুরিতে বইটি প্রকাশে সম্মত হন তিনি। সহযোগীতার হাত বাড়িয়ে দেন সাংবাদিক কৌশিক আহমেদ। এই গ্রন্থের ৩৬ টি কবিতার মধ্যে আমরা শরতের আবহ খুঁজে পাই ৬টি কবিতায়। কবিতাগুলো হচ্ছে সেই সময়”, “আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও”, “কক্সবাজারে এক সন্ধ্যায়”, “নিষিদ্ধ পল্লীতে”, “প্রবাসের পঙক্তিমালা”, ও মধ্যবয়স। 

 

সেই সময়” কবিতাটি নস্টালজিককবি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতির কথা মনে করছেন এভাবে,

                

                শ্রাবন তোমার/ শরীরে লিখেছে গল্প/ - তাঁর স্বাদ ভুলি নাই/

               শত্রুসেনার সতর্ক চোখ এড়িয়ে/ তুমি এসেছিলে/ তিনটে 

               রাস্তা পেরিয়ে/ বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে/ - ভুলি নাই/ সময়টা

               ছিল যুদ্ধের/ কারফিউ চতুর্দিকে/বোকাহাবা ও অবুঝদের/

               দলে মিশে গিয়ে আমরা/ জ্ঞানী বুদ্ধের/ বাণীর বদলে বন্দুক/

               নিয়েছি নির্দ্বিধায়/ - ভুলি নাই/ ক্রন্দন আর কল্লোল-ভরা/ 

               এলো স্বাধীনতাশান্তি/ এলো যুদ্ধশেষের ক্লান্তি/ তখন তোমাকে/

               বলি নি কি অপ্সরা/ সম্বল’ শুধু/ তোমার মুখের কান্তি/ কিন্তু

               তবুও দাও নি তো’ তুমি ধরা/ - ভুলি নাই

               (সেই সময়কাব্যগ্রন্থঃ আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও)

 

অক্ষরমাত্রিক ছন্দের কাজ এই কবিতাটিতে দেখি। পয়ারের সাথে ছয় মাত্রার মাত্রাবৃত্তের মিশেলে দারুণ একটা রিদম তৈরী হয়েছে। কোথাও কোথাও আবার খানিক অন্ত্যমিল যেমন এড়িয়ে/পেরিয়ে’ দুলুনিটাকে আরও সুখকর করে তুলেছে। 

 

মধ্য ম্যানহাটনে শরতের উতল হাওয়ায় যখন খুলে যায় কোনো উর্বশীর চুল কবির তখন মনে পড়ে যায় বাংলার বৈশাখী ঝড়ের কথা। এতেই প্রমাণ হয় একটি মুহূর্তের জন্যেও আসলে এই চিরপরবাসী কবির মন তার দেশ ছেড়ে অন্য কোথাও থাকেনি। 

 

তোমার জবার মতো চোখে রাঙা শ্রাবণের জল/ পালতোলা নৌকার মতন বাঁকাচোরা ঢেউয়ে ঢেউয়ে কম্পমান/ তোমার বিপদগ্রস্ত স্তন/ আমি ভাবতে পারিনি কোনোদিন এতো অসাধারণ আগুন/ প্রলয় এবং ধ্বংস রয়েছে তোমার চুম্বনগুলিতে!/ হে নবীনা,/ আমার তামাটে তিক্ত ওষ্ঠের ও অবয়বের জন্যে/ যেসব চুম্বন জমে উঠবে সংগোপনে,/ তাদের ওপর থেকে আমার স্বত্বাধিকার আমি ফিরিয়ে নিলাম/আমাকে শীতের হাওয়ার হাতে ছেড়ে দাও,/ স্বনির্বাচিত এই নির্বাসনে/ নেকড়ের দঙ্গলের মতো আমাকে ছিঁড়ে খাক বরফে জ্বলতে থাকা ঋতু/ শুধু তুমি,/ আমার সংরক্ত চুম্বনের অন্তর্লীন আগুনগুলোকে/ পৌঁছে দাও শ্রাবনে আষাঢ়ে রোরুদ্যমান/ বিব্রত বাংলায়,/ বজ্রে বজ্রে বেজে উঠুক নতজানু স্বদেশ আমার। (আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাওকাবতগ্রন্থঃ আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও)

 

জীবন সম্পর্কে বরাবরই হতাশ কবি শহীদ কাদরিবিষণ্ণ শরতের মতোই। তাইতো তিনি বলে ওঠেন

 

শূন্য সৈকতে তারা মাছের মৃত শরীরকে ধারণ করে/ অলৌকিক আভায় কী ভয়াবহ সৌন্দর্যে ও শূন্যতায়/ ঝলমল করছে সোনালি বালি।/ আমরা পৌঁছে গেছি – এমন এক নতুন/ শতকের দোরগোড়ায় যার ওপারে/ অচেনা সব রাজপথসমুদ্র সৈকত/ আর বালিয়াড়ি অপেক্ষা করছে/ কিন্তু আমি জানিশামসুর রাহমানআপনার কি আমার/ কিংবা ফজল বা/ আল মাহমুদের পদচিহ্ন পড়বে না সেখানে কোনোদিন।/ শুনুন/ আমার পিতা এই গ্রহের অরণ্যে এক দীর্ঘ দেবদারু,/ আমার মা কোনো এক উঠে যাওয়া বাগানের-/ শান্ত চন্দ্রমল্লিকা/ আর আমরা সবাই এখন শ্রাবন রাত্রীর হাওয়ার হাহাকার।/ আমরা কোথাও কেউ পৌঁছাব না। (কক্সবাজারে এক সন্ধ্যায়কাব্যগ্রন্থঃ আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও)

 

রাষ্ট্রব্যবস্থায় যখন সবকিছু নিষিদ্ধ হয়ে যায়কবির মনের অবস্থাটা তখন কি দাঁড়ায়? ‘খাওয়া নয়। দাওয়া নয়। শোয়া নয়। বসা নয়।/ দেখা নয়। চিৎকার-চাঞ্চল্য নয়......এমন কি/ ঝিঁঝিঁর শ্লোগান নয়ছায়াচ্ছন্ন বৃক্ষলতার নিচে/ নিষিদ্ধ হয়েছে সমাবেশ শালিকের। চলবে না/ দয়ালু মেঘের কাছে কোনো দাবী দাওয়া/ কেবল বৃষ্টির জন্যে। নাহাসি নাহৈ বা হুল্লোড়?/ তা-ও না। হ্যাঁসবসবসব বন্ধ-হাঁটাচলা,/ নড়াচড়া কিংবা যখন-তখনযত্রতত্র হাওয়ার মতো/ স্বাধীন বোকামি নিয়ে বয়ে যাওয়া। নিষিদ্ধহ্যাঁ সব/ নিষিদ্ধ এখানে- গানআজানআহ্বান/ এমন কি দম্পতি-রাত্রিতে প্রেমিকের লিঙ্গের উত্থান। যেন কার্ফিউ জারি হয়েছে। যে সময়ে বা যে প্রেক্ষিতেই কবি লিখুন না কেনসকল স্বৈরশাসকের গালেই এক মৃদু চপেটাঘাত এই কবিতা। 

 

কবি শহীদ কাদরীর প্রবাস জীবনের এক অনবদ্য কবিতা প্রবাসের পঙক্তিমালা। পুরো কবিতাটিই এখানে উপস্থাপন করছি-

 

দ্যাখোদ্যাখো কী চমৎকার একটা চড়ুই

কী দারুণ কিচিরমিচির করছে আজ মার্কিনী ভাষায় এই

মেঘভারানত

অন্তহীন দুপুরবেলায়! হে চড়ুই

আদলে – গঠনে অবিকল তুমি দেখতে বাঙালী চড়ুইদের মতন

তোমার মুখে কি মানায় বন্ধু শ্বেতাঙ্গের এই বিবর্ণবিদেশী

ভাষা?

বরং এদিকে এসোতোমাকে শেখাই

অ-আ-ক-খ

হে চড়ুই বলোবাংলা বলো।

বাংলাযার সব সোনা 

গচ্ছিত রেখেছি আমি

নদীর জলের শব্দেছলছল বয়ে যাওয়া স্রোতে

ইলিশ ও রোহিতের চোখেগীতবিতানের শ্লোকে শ্লোকে

আর বাতাসে  তরঙ্গ তোলা চিরচেনা মহিলার কালো চুলে,

চোখে ও চিবুকে।

হে কাকহে কালো কাক! হঠাৎ কোত্থেকে তুমি এলে

এই বর্ণবাদী দেশেতুমি জানোএ রাজ্যে অশ্বেতাঙ্গের মূল্য

নেই কোনো;

এখানে কিএ বিদেশে কেন?

যাওযদি পারোদাও উড়াল বাংলার দিকে

সেখানে মানাবে বেশ সিল্ক-মসৃণ তোমার কালো ডানা।

 

আফ্রিকাতে গেলেও আপত্তি নেই মোটে,

সে তো এশিয়ার সহদর – আমাদেরই ভাই

কিন্তু এ কী শুরু করলে তুমি আমার কার্নিশে!

 

এ কেমন বেকায়দা বেঢপ ধরনকেন এই চা-চা-চা,

টুইস্টহুপাহুপ নাচ।

কত্থক অথবা কথাকলি জানা নেই?

তাহলে মার্কিন নাগরিক তুমিহে কাক। তুমিও?

অথচ দেখতে শুনতে তুমি হুবহু বাঙালী

কৈ এবং মাগুর মাছের মতো কালো।

 

হে মেঘ! পুঞ্জ পুঞ্জ মেঘ। তুমিও ঠকাবে নাকি

হে নিরুদ্দেশগামী?

কাউকে বিশ্বাস নেই আর এই বিরূপ বিদেশে।

তবু বলিঃ যদি পারো,

হে নন্দিত মেঘ তুমি নেমে এসো

ঘন ও নিবিড় হয়েকরুণা ধারায় নেমে এসো

শ্রাবণে শ্রাবণে তুমিহে বন্ধু স্পন্দিত করে দাও

এই অফুরান পরবাস।

 

এই কবিতায় কাক চড়ুই এবং মেঘের উপমায় তিনি পরবাসকে চিত্রিত করেছেন। কত্থক বা কথাকলির বদলে যখন কালো কাক টুইস্ট ও হুপাহুপ নাচে তখন আমরা একটি অস্তিত্বহীনআইডেন্টিটি ক্রাইসিসে ভুগতে থাকা প্রজন্মকে চোখের সামনে দেখতে পাই। এটি সকল প্রবাসীর প্রতিদিনের দেখা দৃশ্য। তবুও হতাশ নন তিনি। শেষ পর্যন্ত সপ্রেম দৃষ্টিতেই তাকিয়েছেন জীবন ও প্রবাসের দিকে, ‘হে নন্দিত মেঘ তুমি নেমে এসো/ ঘন ও নিবিড় হয়েকরুণা ধারায় নেমে এসো/ শ্রাবণে শ্রাবণে তুমিহে বন্ধু স্পন্দিত করে দাও/ এই অফুরান পরবাস

 

পল্লীকবি জসীম উদদীনের শরতও বিরহী নারীর নয়নের জলে ভেজা। এখানেও আমরা বিচ্ছিন্নতা বা নির্বাসনের গন্ধ পাই। গণিতে গণিতে শ্রাবণ কাটিল,/ আসিল ভাদ্র মাস,/ বিরহী নারীর নয়নের জলে/ ভিজিল বুকের বাস

 

মিডল এইজ ক্রাইসিস বলে ইংরেজীতে একটি কথা প্রচলিত আছে । এই সময়ের নানান টানাপড়েনের একটি হলো পরপারের ডাক শুনতে পাওয়া। কেবলই মনে হয়হায়বেলা বুঝি যায়বুঝি ফুরিয়ে এসেছে দিন। দিন ফুরোনোর ঘণ্টাধ্বনি তিনিও বাজাতে চেয়েছেন মধ্যবয়স” কবিতাটিতে। সারাদিন বসে এসব কি ছাইপাঁশ,/ লেখালেখি করো তুমি!/ যদি পারো ভাই নতুন কবরখানায়/ কিনে রাখো কিছু ভূমি

 

কবি শহীদ কাদরী জন্মেছেন শরতের প্রথম দিনে। হয়ত সে কারণেই নিজের অজান্তেই তার কবিতায় শরতের বিষাদ ক্ষণে ক্ষণেই এসেছে। এই বিষাদের সুদীর্ঘ চাদর ফুঁড়ে প্রায়শই তারার ম্রিয়মান আলোর মতো ফুটে উঠেছে প্রত্যাশার প্রদীপ। সেই আলোয় আমরা সুস্পষ্টই দেখতে পাই শরতের স্নিগ্ধ মুখটিযেমন ইংলিশ কবি জন ডান বলেছেন, ‘কোনো বসন্ত বা গ্রীষ্ম নয়শরতের মুখ যেন ঈশ্বরের অপার অনুগ্রহঅনিন্দ্য সুন্দর।   

 

হলিসউডনিউ ইয়র্ক। ১৫ আগস্ট ২০১৬।

(মাসিক শব্দঘর – সেপ্টেম্বর ২০১৬ সংখ্যায় প্রকাশিত)

Comments

  1. উন্নত সভ্যতার বহমান স্রোতে, মানুষের জীবনে অর্থনৈতিক প্রসারের সাথে, বেড়েছে নৈতিক অবক্ষয়। গুণী মানুষদের স্মরণ এবং সম্মান করতে ভুলে যাচ্ছে মানুষ। এই সময়ে বাংলাদেশের খ্যাতিমান কবি শহীদ কাদরী কে নিয়ে এমন একটি স্মৃতিচারণ, নিঃসন্দেহে উন্নত মানসিকতার পরিচয় বহন করে। শ্রদ্ধাস্পদ কবি কাজী জহিরুল ইসলাম এর বদৌলতে প্রয়াত কবির অনেক অজানা তথ্য জানতে পারলাম।অসংখ্য ধন্যবাদ প্রিয় কবি ।

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

অসাধারণ এই শিল্পীর জীবনের গল্প বড় করুণ

  [এই সময়ের অত্যন্ত প্রতিভাবান শিল্পী সারফুদ্দিন আহমেদ। বাড়ি পশ্চিমবঙ্গে। আর্ট কলেজে খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করেন ,  আর শুধু ছবি আঁকেন। নানান মাধ্যমে ,  নানান বিষয়ের ছবি। সারফুদ্দিন আহমেদের ছবি থেকে চোখ ফেরানো যায় না ,  আপনাতেই ওঁর নান্দনিক সৃষ্টিকর্মে দৃষ্টি আটকে যায় ,  কী জল রঙ ,  কী অ্যাক্রিলিক ,  কিংবা স্রেফ পেন্সিলের ড্রয়িং। এই গুণী শিল্পীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কবি কাজী জহিরুল ইসলাম। সাক্ষাৎকারটি এখানে উপস্থাপন করা হলো।]       ভারত আমাকে চোখ দিয়েছে ,  বাংলাদেশ দিয়েছে দৃষ্টি -     সারফুদ্দিন আহমেদ     কাজী জহিরুল ইসলামঃ  ব্যাক গ্রাউন্ডে তবলা বাজছে আপনি ছবি আঁকছেন কাচের ওপর।    এই যে বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে ছবি আঁকা, এই ছন্দটা ছবিতে কিভাবে ধরেন? আর কোনো শিল্পী ছবি  আঁ কার সময় যন্ত্রানুসঙ্গ ব্যবহার করেছেন?   সারফুদ্দিন আহমেদঃ   কাঁচ নয়,   এটি এক বিশেষ ধরনের কাপড়-নেট। এই নেটের উপরে বর্তমানে আমার এক্সপেরিমেন্ট চলছে।    জহিরুলঃ ও ,  ফেইসবুকে যখন ছবিটি দেখি কাচের মতো ...

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জুর সাক্ষাৎকার || অষ্টম পর্ব ||

[লেখক, সাংবাদিক, অনুবাদক আনোয়ার হোসেইন মঞ্জুর সাক্ষাৎকারের অষ্টম  পর্ব আজ প্রকাশ করা হলো। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কবি কাজী জহিরুল ইসলাম।]          দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ বাসস - কে অকার্যকর করেছে  – মঞ্জু    জহিরুলঃ  আপনি ফেলোশিপ নিয়ে দিল্লীতে ছয়মাস ছিলেন, ব্যক্তিগত আগ্রহ এবং পেশাগত অভ্যাসের কারণে কাছে থেকে দেখার/বোঝার চেষ্টা করেছেন ভারতের এবং উপমহাদেশের রাজনীতি। আমরা দেখি ভারতের রাজনীতিতে গায়ক, নায়ক, লেখক, সাংবাদিকের আবির্ভাব ঘটে সব সময়ই এবং তারা রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও রাখেন। বাংলাদেশে এই ধারা খুব সম্প্রতি শুরু হলেও আমাদের জনপ্রিয় খেলোয়াড়, শিল্পীরা নিজেদের অর্থনীতি সমৃদ্ধ করা ছাড়া রাজনীতিতে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেন না। এমন কি ধর্ষণ, অন্যদেশকে ট্রানজিট প্রদান, উপর্যুপরি সড়ক দূর্ঘটনা, পরিবেশ ধ্বংসকারী কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্প ইত্যাদি ইস্যুতেও তারা নীরব। অথচ তাদের জনপ্রিয়তা এবং রাজনীতি সম্পৃক্ততা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত, যা ভারতে দেখা যায়। বিষয়টি যদি আপনার মতো করে ব্যাখ্যা করেন।  মঞ্জুঃ   দিল্লিতে আমার অবস্থানকালকে আমি নানা দিক থ...

কানের কাছে নারী কন্ঠ

  স্বপ্নের ঐশ্বর্য   || কাজী জহিরুল ইসলাম ||   ছুটির দিন। লম্বা সময় ধরে ঘুমাবো। কিন্তু তার আর উপায় নেই। কানের কাছে নারী কন্ঠ। বেশ আত্মবিশ্বাসী কন্ঠ। ক্রমাগ ত  কথা বলে যাচ্ছেন এক অপরিচিতা। আমি লাফ দিয়ে উঠি। কে তিনি ?  আমার স্ত্রী বলেন ,  রুবানা হক ,  শোনো কী বলছেন। রুবানা হক প্রয়াত ব্যবসায়ী আনিসুল হকের স্ত্রী। আমাদের কৈশোর-উত্তীর্ণ কালে আনিসুল হক ছিলেন আমাদের হিরো। টিভি উপস্থাপনায় অন্য এক আধুনিকতা নিয়ে হাজির হন তিনি। এরপর আমরা ধীরে ধীরে তার ব্যবসায়ীক সাফল্য ,  সাংগঠনিক সাফল্য দেখতে দেখতে বড় হই। খুব সাম্প্রতিককালে ,  আনিসুল হকের মৃত্যুর পর ,  কেউ একজন বলেছিলেন ,  তার স্ত্রী রুবানা হকও খুব ভালো কথা বলেন। কিন্তু রুবানা হকের কথা শোনার সৌভাগ্য আমার হয়নি। দুই যুগ ধরে দেশের বাইরে থাকার কারণে এই সময়ে স্টার হয়ে ওঠা অনেকের সম্পর্কেই আমার ভালো ধারণা নেই।  তার কথায় এমন কিছু ছিল যে আমার পক্ষে ঘুমিয়ে থাকা সম্ভব হয়নি। আমি মুক্তিকে বলি ,  প্রথম থেকে দাও ,  পুরো বক্তৃতাটা আমি শুনতে চাই। আমি পরপর দুইবার তার পুরো বক্তব্যটা শুনি ,  ফ...