Skip to main content

কবি শহীদ কাদরীকে নিয়ে আমার লেখালেখি || তিন

শহীদ কাদরীর শেষ সাক্ষাৎকার

কাজী জহিরুল ইসলাম 


 

দীর্ঘ ৩১ বছর বিরতির পর ২০০৯ সালে কবি শহীদ কাদরীর চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও” প্রকাশিত হয়। এরপর পেরিয়ে গেছে আরও ৭ বছর। এই সাত বছরে তিনি আর মাত্র ৪টি কবিতা লিখেছেন। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ উত্তরাধিকার” প্রকাশিত হয় ১৯৬৭ সালেদ্বিতীয় বই তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা” বের হয় ১৯৭৪ সালে এবং তৃতীয় গ্রন্থ কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই” বের হয় ১৯৭৮ সালে। এ যাবত রচিত কবিতার সংখ্যা ১৪৫টি। ১৯৪২ সালের ১৪ আগস্ট কোলকাতার পার্কসার্কাসে জন্মপুরো শৈশব কাটে এই শহরেই। দাদা ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট আমিরুদ্দিন আহমাদ কাদরীপিতা স্টার অব ইন্ডিয়া পত্রিকার সম্পাদকপরবর্তিতে ইন্ডিয়ান সেন্ট্রাল জুট কমিটির ডাইরেক্টর জেনারেলখালেদ ইবনে আহমাদ কাদরী। এইরকম পারিবারিক ঐতিহ্যে কোলকাতার পার্কসার্কাসে পরিপুষ্ট হয় তাঁর শৈশব। দেশ বিভাগের পর নানান টানাপড়েন পার হয়ে ১৯৫২ সালে চলে আসেন ঢাকায়। ৫৩ সালে প্রথম কবিতা পরিক্রমা” লিখেন। শুরু হয় তার কবি জীবন। আজীবন বোহেমিয়ানআড্ডাবাজ শহীদ কাদরী লিখেছেন কম কিন্তু তার প্রতিটি কবিতা প্রস্তর খন্ডের মতো সুদৃঢ়যেন একেকটি যুগ নির্মাণের ইঙ্গিত। শহীদ কাদরীর বৃষ্টি বৃষ্টি” কবিতাটি নিয়ে আবদুল মান্নান সৈয়দ বলেন, “বাংলা কবিতায় বৃষ্টি নিয়ে তিন ধারার কবিতা রচিত হয়েছে। একটি ধারার জন্ম দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরঅধিকাংশ কবি এ ধারায়ই লিখেন। দ্বিতীয় ধারার জন্ম দেন অমিয় চক্রবর্তী আর তৃতীয় ধারাটির প্রবর্তন করেন শহীদ কাদরী। 

 

রাজত্বরাজত্ব শুধু আজ রাতেরাজপথে-পথে

বাউন্ডুলে আর লক্ষ্মীছাড়াদেরউন্মুলউদ্বাস্তু

বালকেরআজীবন ভিক্ষুকেরচোর আর অর্ধ-উন্মাদের

বৃষ্টিতে রাজত্ব আজ। রাজস্ব আদায় করে যারা,

চিরকাল গুণে নিয়ে যায়তারা সব অসহায়

পালিয়েছে ভয়ে।

 

বন্দনা ধরেছে – গান গাইছে সহর্ষে

উৎফুল্ল আঁধার প্রেক্ষাগৃহে আর দেয়ালের মাতাল প্ল্যাকার্ড,

বাঁকা-চোরা টেলিফোন-পোলদোল খাচ্ছে ওই উঁচু

শিখরে আসীনউড়ে-আসা বুড়োসুড়ো পুরোন সাইনবোর্ড 

তাল দিচ্ছে শহরের বেশুমার খড়খড়ি

কেননা সিপাইসান্ত্রী আর রাজস্ব আদায়কারী ছিল যারা,

পালিয়েছে ভয়ে। 

 

পালিয়েছে মহাজ্ঞানীমহাজন মোসাহেবসহ

অন্তর্হিত,

বৃষ্টির বিপুল জলে ভ্রমণ-পথের চিহ্ন

ধুয়ে গেছেমুছে গেছে

কেবল করুণ কটা

বিমর্ষ স্মৃতির ভার নিয়ে সহর্ষে সদলবলে

বয়ে চলে জল পৌরসমিতির মিছিলের মতো

নর্দমার ফোয়ারার দিকে, - ’

(বৃষ্টিবৃষ্টি – কাব্যগ্রন্থঃ উত্তরাধিকার - শহীদ কাদরীর কবিতাপৃষ্ঠা ১২)

 

এই কবিতার জন্মকথা কবি শহীদ কাদরী জানান এভাবে, ‘এক ঝড় ঝঞ্ঝার দিনে বাসায় আটকা পড়ে গেলাম। বাইরে বের হওয়ার কোনো উপায় নেয়। তখন কাগজ কলম নিয়ে লিখতে শুরু করি। কবিতাটি এক টানেই লিখে ফেলি। পরে আল মাহমুদ এসে হাজির। দোস্ত সমকালের জন্য কবিতা দেও। আমি বলিকবিতাতো নাই, একটা খসড়া আছে। আল মাহমুদ কবিতাটি পড়ে বলেন,  এটাই চলবে। বলেই খাতা থেকে ছিঁড়ে নিয়ে চলে যায়। আমার কাছে কোনো কপিও রাখিনি

 

-    শামসুর রাহমানওতো আপনার বন্ধু ছিলেন। কবিতা নিয়ে অনেক আলোচনা হতো আপনাদের মধ্যে। এই কবিতা সম্পর্কে তিনি কিছু বলেছিলেন?

-    ছাপা হওয়ার আগেতো শামসুর রাহমান দেখেই নি। ছাপা হওয়ার পরে একদিন বলেনবাংলা ভাষায় এভাবে বৃষ্টির কবিতা আর কেউ লিখেনি।

-    শহীদ ভাই৩১ বছর পরে আপনার চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ বের হলোএতো দীর্ঘ সময় কেন নিলেন

-    আমারতো বই বের করার কোনো ইচ্ছেই ছিল না। জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত জোর করলো। আমি বলিআমার কাছেতো কোনো কবিতা নেইবই হবে কি দিয়েতখন তোমার ভাবি একটি থলে নিয়ে এলো। খুঁজে টুজে ওর মধ্যে কিছু কবিতা পাওয়া গেল। এভাবেই চতুর্থ বইটা হয়ে গেল। জ্যোতির জন্যই বইটা হয়েছে। ও জোর না করলে হতো না।

-    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার প্রতিটি কবিতা রচনার তারিখ এবং স্থান লিখে রেখেছেনপরবর্তীতে অনেকেই এটা করেছেন কিন্তু আপনার কোনো কবিতার রচনাকাল বা রচনার স্থান পাওয়া যায় না। এটা কি আপনি সচেতনভাবেই এড়িয়ে গেছেন?

-    আমি যে কবিতার বই বের করবো এমন কোনো ইচ্ছেতো ছিল না। এজন্যই তারিখ টারিখ আর দেই নি। প্রথম বইটা শামসুর রাহমান আর আল মাহমুদ জোর করে বের করে দিল। ওদের চাপেই ওটা করেছিলাম। দ্বিতীয় বইটাও বন্ধু বান্ধবরা জোর করে করে দেয়। তৃতীয় বইটা করার ইচ্ছে আমার মধ্যে তৈরী হয়েছিল। দেশ ছেড়েতো চলেই যাচ্ছিভাবলাম যাওয়ার আগে কবিতাগুলোকে একসাথে করে একটা বই রেখে যাই। মনটা খুব খারাপ ছিল। সেই সময় ঢাকা ছেড়ে চট্টগ্রাম চলে গেলেই তুমি শেষ। কেউ আর তোমার কথা মনে রাখবে না। কত কবি কর্মসূত্রে ঢাকার বাইরে যাওয়ার কারণে হারিয়ে গেছে তখন। খুব খারাপ একটা সময় যাচ্ছিল ঢাকার সাহিত্যাঙ্গনে। কেবল কাঁদা ছোড়াছুড়ি চলতো।  দুজন মানুষ শুধু আমাকে বলেছিলআমি যেন দেশ ছেড়ে না যাই। একজন কবি রফিক আজাদ আর অন্যজন মাহমুদুল হক বটু। এই দুজন অনুরোধ করেছিলযেও না। চলে গেলেই হারিয়ে যাবে। 

-    আপনার দ্বিতীয় বইয়ের শিরোনাম কবিতাটি, ‘তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা’, এর অংশবিশেষ সুর করে গেয়েছেন সুমন চট্টোপাধ্যায়মানে কবীর সুমন। আপনি কি আগে থেকে জানতেন?

-    হ্যাঁআমি জানতাম। আমি তখন বোস্টনে থাকি। সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায় বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। একদিন টেলিফোন করে বলেনসুমন এই কবিতাটিকে সুর করে গাইতে চান। এভাবেই গানটি হয়।

-    শহীদ কাদরী নামটি শোনামাত্রই আজকের তরুণরা আওড়াতে শুরু করে, ‘বন্য শূকর খুঁজে পাবে প্রিয় কাদা/ মাছরাঙা পাবে অন্বেষণের মাছ/ কালো রাতগুলো বৃষ্টিতে হবে শাদা/ ঘন জঙ্গলে ময়ূর দেখাবে নাচ/প্রেমিক মিলবে প্রেমিকার সাথে ঠিকই/ কিন্তু শান্তি পাবে না পাবে না পাবে না।  এই কবিতার এতো ব্যাপক জনপ্রিয়তার পেছনে কি ছয় মাত্রার মাত্রাবৃত্তের দ্যোতনা কিছুটা কাজ করেছেকখনো কি ভেবেছেন?

-    জনপ্রিয়তা নিয়ে আমি কখনোই ভাবিনি। জনপ্রিয়তা একটা ফালতু বিষয়। নাআমি মনে করি না মাত্রাবৃত্তের কারণে পাঠক এটা পছন্দ করে। বাংলা ভাষায় ছয় মাত্রার মাত্রবৃত্তের কবিতা ভুরি ভুরি আছে। শামসুর রাহমানেরও অনেক আছে। শোনো জহিরএই জনপ্রিয়তার কোনো দাম নেইবুঝলা। এক সময়তো শহীদ কাদরীর কথা উঠলে লোকেরা তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা’ শুনিয়ে দিত। জনপ্রিয়তা একটা মিস্ট্রি। কখন যে কি জনপ্রিয় হয়ে যায় বলা মুশকিল।   

-    আপনার কবিতায় সামরিক অনুষঙ্গ প্রচুর এসেছে। গ্রেনেড’, ‘ট্যাঙ্ক’ ‘গোলন্দাজ’ ‘সাব-মেরিন’, ‘সাঁজোয়া বাহিনী’, ‘সাইরেন’, ‘বেয়োনেট’, ‘ক্যাপ্টেন’ এই শব্দগুলো শুধুমাত্র একটি কবিতা স্কিৎসোফ্রেনিয়া’-তেই এসেছে। এমনি প্রচুর শব্দ দেখি আপনার কবিতা জুড়ে। কোনো সামরিক সখ্য বা বৈরীতা থেকে কি?

-    আমার এক কাজিন ছিলেন পাকিস্তান আর্মিতেডাক্তার শাহানু। শাহানু ভাইকে একাত্তরে পাকিস্তানীরা গুলি করে মেরে ফেলে। এটা একটা কারণ হতে পারে। আর মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতো সবসময় মাথায় ছিলোই।

-    আপনার কবিতায় অনেক ফুলের কথা এসেছেতবে বারবারই যে ফুলটি এসেছে তা হলো চন্দ্রমল্লিকা। চন্দ্রমল্লিকাই কি আপনার প্রথম পছন্দ?

-    আমার মা চন্দ্রমল্লিকা ফুল খুব ভালবাসতেন। মায়ের ভালোবাসাই আমাকে প্রভাবিত করেছে। আমার কবিতায় অন্য ফুলের নামও এসেছে। তবে একথা ঠিক যে চন্দ্রমল্লিকা বেশি এসেছে এবং এটাই আমার সবচেয়ে প্রিয় ফুল। আর সচেতনভাবেই আমি গোলাপকে এড়িয়ে গেছি। সাহিত্যে গোলাপের অতি ব্যবহারের কারণেই এর প্রতি আমি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছি।

-    কোনো নির্বাসনই কাম্য নয়’ এই কবিতায় আপনি বলেছেন, ‘কোনো নির্বাসনই কাম্য নয় আর/ ব্যক্তিগত গ্রাম থেকে অনাত্মীয় শহরে/ পুকুরের যৌথ স্নান থেকে নিঃসঙ্গ বাথরুমে’ আবার আরেক জায়গায় লিখেছেন, ‘জীবনের ওপারে কোনো অন্তহীন কফিনে/ এই যে নির্বাসন/ আমার কাম্য নয় আর,/ কোনো নির্বাসনই কাম্য নয়। শুধু দেশান্তরী হওয়া নয়প্রিয় পরিবেশ ছেড়ে যাওয়া সকল অবস্থানই নির্বাসনএমনকি মৃত্যুও। মাইগ্রেশনকে আপনি নেতিবাচকভাবে দেখেছেন। কিন্তু সুপ্রাচীনকাল থেকেই মানুষ মাইগ্রেট করছেএক স্থান থেকে অন্য স্থানেউপযুক্ত পরিবেশের খোঁজে। আপনি কেন নেতিবাচকভাবে দেখছেন?

-    শোনো জহিরতোমাক একটা কথা বলি। নেতিবাচকতাই সহজাত। এই যে প্রকৃতিপ্রকৃতিও নেতিবাচক। ইতিবাচক আসলে কিছুই না। আমরা এই পৃথিবীকে আমার বলে আঁকড়ে ধরতে চাই কিন্তু প্রকৃতি ঝড়জলোচ্ছ্বাসসুনামী দিয়ে আমাদের ধ্বংস করে দেয়। প্রকৃতি কখনোই বলে না তুমি আমার। চেনা পরিবেশ ছেড়ে অন্য কোথাও অবস্থান করার নামই নির্বাসন। বিষয়টাইতো নেতিবাচক। সর্বশেষ নির্বাসন হলো কফিন। এক অনন্ত অচেনা পরিবেশ। ভিন্ন পরিবেশ কখনোই আপন হয় না। তোমাকে একটা গল্প বলি। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ লন্ডনে গেলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের শাখা খুলতে। ওখানকার বাঙালীরা তাকে বলেআমরা বাংলা বইয়ের বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র কেন করবোআমরাতো ব্রিটিশ। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ তখন ওদেরকে জিজ্ঞেস করলেনআপনারা ব্রিটিশব্রিটিশরা কি মনে করে যে আপনারা ব্রিটিশ

-    আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও’ গ্রন্থের প্রথম কবিতা স্বতন্ত্র শতকের দিকে’ এর জন্মের পেছেন একটি মজার গল্প আছে। গল্পটি কি একটু বলবেন?

-    তুমিতো জানোই। বাংলা ১৪০০ সালে নিউ ইয়র্কের কবিরা একটি সংকলন বের করবেওটার নামও দিয়েছে তাঁরা ১৪০০ সাল। তো আমাকে একদিন টেলিফোন করলো কাজী ফয়সাল আহমদ। আমি তখন বোস্টনে থাকি। বললো সংকলনের জন্য একটা কবিতা দিতে হবে। আমি বললামকবিতা লিখতে খরচ আছে। একটি কবিতা লিখতে হলে আমাকে দুপ্যাকেট সিগারেট খেতে হয়এক কাপ কফি খেতে হয়। আমার কাছে ভাল কলম নেইএকটি কলম কিনতে হবেকাগজ কিনতে হবে। ভদ্রলোক মনে হয় একটু ভয় পেয়ে গেলেন। বললেনআমাকে কি করতে হবেআমি তখন বললামআপনি এক কাজ করুন। আমাকে দুকার্টন সিগারেট পাঠিয়ে দিন। আমার কাছে কলমও আছেকাগজও আছে আর কফিচিনি সবই আছে। শুধু সিগারেট ফুরিয়ে গেছে। তো ওই ১৪০০ সাল-এর জন্য কবিতাটি লিখেছিলাম।

-    বিশ্ব কবিতার সাথে তুলনামূলক বিচারে বাংলা কবিতা খুব কি পিছিয়ে আছেবাংলা কবিতা খুব কি দুর্বল?

-    বাংলা কবিতা যে দুর্বল নয় তা প্রমাণ করেছে তিরিশের পাঁচ কবি। জীবনানন্দ দাশবুদ্ধ দেব বসুঅমিয় চক্রবর্তীবিষ্ণু দে আর সুধীন দত্ত। সুধীন দত্ত তাঁর কাব্যের মুক্তি” প্রবন্ধে বলেছেন, ‘বিশ্ব ব্রহ্মান্ড থেকে বীজ তুলে এনে রোপন করতে হবে। অর্থাৎ অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হবেপড়তে হবে। বাংলা ভাষায় বড় কবি বের হয়ে আসবে। নিজেদের সম্মন্ধে নিজেদের দৃষ্টি কখনো কখনো মেঘলা। আমরা কেউ ঠিক জানি না আমরা কোথায়। 

-    মডার্নপোস্ট মডার্নের পর সেদিন এক আর্ট গ্যালারীতে লেখা দেখলাম আফটার মডার্নিজম। এর পরে কি আসবেএলিয়েনিজম বলে কোনো মতবাদ আসবে কিকথাটা জাস্ট আমার মাথায় এলো। ধরুন এলিয়েনের দৃষ্টিতে পৃথিবীকে দেখাপার্থিব স্বার্থ যেখানে থাকবে না। মানুষের সম্পর্কস্বপ্নপ্রত্যাশা এইসবনিঃস্বার্থভাবে ভাবা। 

-    শোনো তরঙ্গ আসে তরঙ্গ চলে যায়। পোস্ট মডার্ন কি এনেছেআত্মায় বিশ্বাসআধ্যাত্মিকতাসুফিজমলোকজ ভাবনা। অধ্যাপকেরা এইসব করে বুঝলা। বই লেখার দরকার। এইসব খুঁজে খুঁজে বের করে আর একেকটা নাম দেয়। নতুন কিছু পায় না। ল্যন্ডস্কেপ কিছুটা বদলে যায় কালের প্রবাহে। নতুন টেকনোলজি আসেনতুন শব্দ যোগ হয়। চলমান জীবনের অভিঘাত থেকেইতো শিল্প সাহিত্য তৈরী হয়। চিরকাল তাই হয়ে এসেছে। সৈয়দ শামসুল হক লিখেছিল, ‘তিরিশ বছর ধরে বারবার বদলেছি নাম কিন্তু বদলাতে পারিনি হৃদয়। এলিয়েনিজমহ্যাঁ ভাল কথা বলেছো। সিনেমায়তো এসে গেছে। কবিতায়ও আসতে পারে। মানুষ মঙ্গলে যাচ্ছেওখানে গিয়ে বসবাস করবে। এগুলো নিয়ে সাহিত্য হবে কবিতা হবে। এগুলোই হবে এলিয়েনিজম। কোনো এক অধ্যপক একটা বই লিখে ফেলবেন। 

-    একটু পেছনে ফিরে যাই। চল্লিশের কবি আবুল হোসেন একটি আড্ডা করতেনসেই আড্ডায় আপনার ডাক আসে অনেক পরেএর কারণ কি?

-    কারণ আর কিছুই নাআমার খোঁজ পায় নি। শামসুর রাহমান নিয়মিতই যেতেন ওখানে। আমি জানতাম। আমাকে জানিয়েই যেতেন। কিন্তু কখনোই বলেন নি যে শহীদ আপনিও চলেন। প্রায় তিন/চার বছর ওখানে যাতায়াতের পর হঠাৎ একদিন শামসুর রাহমান আমাকে বলেন, ‘আবুল হোসেন আপনাকে ডেকেছেন। আমি গেলাম। তিনি আমাকে দেখে বলেনকবিআমিতো তোমার লেখা পড়লাম। এদ্দিন খেয়াল করিনি। এখন খেয়াল করেছি। এখন থেকে আর কোনো ভুল হবে না। আমাদের পত্রিকার জন্য লেখা দিওভাল টাকা পাবে।  

-    প্রায় একই রকমভাবে হঠাৎ একদিন ড. নীলিমা ইব্রাহীমের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন সম্ভবত।

-    না তিনি আমাকে চিনতেন। একদিন হঠাৎ বলে বসেনএই যে কবি শোনোআমি এই বছর তোমাকে বাংলা একাডেমী পুরস্কার পাইয়ে দেব। 

-    আপনিতো ফজল ভাইয়ের সাথে যৌথভাবে পান১৯৭২ সালে?

-    হ্যাঁওদের টাকা জমে গিয়েছিলতাই দুজনকে দেয় সে বছর। শোনো মিয়া পুরস্কারের প্রতি আমার কোনো মোহ ছিল না। কিন্তু টাকার দরকার ছিল। সিদ্দেশ্বরীতে বাসা নিয়েছিএখন ফার্নিচার কেনার টাকা নেই। তখনি পুরস্কারের টাকাটা পাই। ওটা দিয়ে ফার্নিচার কিনেছিলাম। ভাল একটা সোফা কিনেছিলাম। 

-    পঞ্চম বইয়ের জন্য কি প্রস্তুতি নিচ্ছেন?

-    চারটে কবিতা লেখা হয়েছে। ১৫টা হলেই পাঁচ নাম্বার বইটা করে ফেলবো।

 

২০০৪ সাল থেকে কিডনির অসুখে ভুগছেন কবি। এখন তাকে নিয়মিত সপ্তাহে তিনদিন ডায়ালাইসিস করতে হয়। এর পরেও নিরন্তর বাংলা কবিতা নিয়ে কাজ করছেন। একটি কবিতা সন্ধ্যা’ শিরোনামের একটি ত্রৈমাসিক কবিতার আড্ডা করেন তিনি। সেখানে বাংলাদেশের প্রখ্যাত কবিদের কবিতা পাঠ করা হয় এবং সেই সাথে উত্তর আমেরিকার নির্বাচিত কবিদের আমন্ত্রণ জানানো হয় তাদের স্বরচিত কবিতা পাঠ করার জন্য।  গত ১৪ আগস্ট ২০১৬ ছিল কবির ৭৫ তম জন্মদিন। কবিকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা। 

 

[নোটঃ সাক্ষাৎকার নেওয়া হয় ২০ আগস্ট ২০১৬ তারিখে। তিনি মৃত্যুবরণ করেন ২৮ আগস্ট এবং  দৈনিক প্রথম আলোতে এটি ছাপা হয় ৩১ আগস্টে। যেহেতু এটি কবির মৃত্যুর পরে ছাপা হয় তাই শেষ প্যারা এবং কিছু অংশ পরিবর্তন করে প্রকাশ করা হয়।]  

Comments

Popular posts from this blog

অসাধারণ এই শিল্পীর জীবনের গল্প বড় করুণ

  [এই সময়ের অত্যন্ত প্রতিভাবান শিল্পী সারফুদ্দিন আহমেদ। বাড়ি পশ্চিমবঙ্গে। আর্ট কলেজে খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করেন ,  আর শুধু ছবি আঁকেন। নানান মাধ্যমে ,  নানান বিষয়ের ছবি। সারফুদ্দিন আহমেদের ছবি থেকে চোখ ফেরানো যায় না ,  আপনাতেই ওঁর নান্দনিক সৃষ্টিকর্মে দৃষ্টি আটকে যায় ,  কী জল রঙ ,  কী অ্যাক্রিলিক ,  কিংবা স্রেফ পেন্সিলের ড্রয়িং। এই গুণী শিল্পীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কবি কাজী জহিরুল ইসলাম। সাক্ষাৎকারটি এখানে উপস্থাপন করা হলো।]       ভারত আমাকে চোখ দিয়েছে ,  বাংলাদেশ দিয়েছে দৃষ্টি -     সারফুদ্দিন আহমেদ     কাজী জহিরুল ইসলামঃ  ব্যাক গ্রাউন্ডে তবলা বাজছে আপনি ছবি আঁকছেন কাচের ওপর।    এই যে বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে ছবি আঁকা, এই ছন্দটা ছবিতে কিভাবে ধরেন? আর কোনো শিল্পী ছবি  আঁ কার সময় যন্ত্রানুসঙ্গ ব্যবহার করেছেন?   সারফুদ্দিন আহমেদঃ   কাঁচ নয়,   এটি এক বিশেষ ধরনের কাপড়-নেট। এই নেটের উপরে বর্তমানে আমার এক্সপেরিমেন্ট চলছে।    জহিরুলঃ ও ,  ফেইসবুকে যখন ছবিটি দেখি কাচের মতো ...

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জুর সাক্ষাৎকার || অষ্টম পর্ব ||

[লেখক, সাংবাদিক, অনুবাদক আনোয়ার হোসেইন মঞ্জুর সাক্ষাৎকারের অষ্টম  পর্ব আজ প্রকাশ করা হলো। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কবি কাজী জহিরুল ইসলাম।]          দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ বাসস - কে অকার্যকর করেছে  – মঞ্জু    জহিরুলঃ  আপনি ফেলোশিপ নিয়ে দিল্লীতে ছয়মাস ছিলেন, ব্যক্তিগত আগ্রহ এবং পেশাগত অভ্যাসের কারণে কাছে থেকে দেখার/বোঝার চেষ্টা করেছেন ভারতের এবং উপমহাদেশের রাজনীতি। আমরা দেখি ভারতের রাজনীতিতে গায়ক, নায়ক, লেখক, সাংবাদিকের আবির্ভাব ঘটে সব সময়ই এবং তারা রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও রাখেন। বাংলাদেশে এই ধারা খুব সম্প্রতি শুরু হলেও আমাদের জনপ্রিয় খেলোয়াড়, শিল্পীরা নিজেদের অর্থনীতি সমৃদ্ধ করা ছাড়া রাজনীতিতে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেন না। এমন কি ধর্ষণ, অন্যদেশকে ট্রানজিট প্রদান, উপর্যুপরি সড়ক দূর্ঘটনা, পরিবেশ ধ্বংসকারী কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্প ইত্যাদি ইস্যুতেও তারা নীরব। অথচ তাদের জনপ্রিয়তা এবং রাজনীতি সম্পৃক্ততা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত, যা ভারতে দেখা যায়। বিষয়টি যদি আপনার মতো করে ব্যাখ্যা করেন।  মঞ্জুঃ   দিল্লিতে আমার অবস্থানকালকে আমি নানা দিক থ...

কানের কাছে নারী কন্ঠ

  স্বপ্নের ঐশ্বর্য   || কাজী জহিরুল ইসলাম ||   ছুটির দিন। লম্বা সময় ধরে ঘুমাবো। কিন্তু তার আর উপায় নেই। কানের কাছে নারী কন্ঠ। বেশ আত্মবিশ্বাসী কন্ঠ। ক্রমাগ ত  কথা বলে যাচ্ছেন এক অপরিচিতা। আমি লাফ দিয়ে উঠি। কে তিনি ?  আমার স্ত্রী বলেন ,  রুবানা হক ,  শোনো কী বলছেন। রুবানা হক প্রয়াত ব্যবসায়ী আনিসুল হকের স্ত্রী। আমাদের কৈশোর-উত্তীর্ণ কালে আনিসুল হক ছিলেন আমাদের হিরো। টিভি উপস্থাপনায় অন্য এক আধুনিকতা নিয়ে হাজির হন তিনি। এরপর আমরা ধীরে ধীরে তার ব্যবসায়ীক সাফল্য ,  সাংগঠনিক সাফল্য দেখতে দেখতে বড় হই। খুব সাম্প্রতিককালে ,  আনিসুল হকের মৃত্যুর পর ,  কেউ একজন বলেছিলেন ,  তার স্ত্রী রুবানা হকও খুব ভালো কথা বলেন। কিন্তু রুবানা হকের কথা শোনার সৌভাগ্য আমার হয়নি। দুই যুগ ধরে দেশের বাইরে থাকার কারণে এই সময়ে স্টার হয়ে ওঠা অনেকের সম্পর্কেই আমার ভালো ধারণা নেই।  তার কথায় এমন কিছু ছিল যে আমার পক্ষে ঘুমিয়ে থাকা সম্ভব হয়নি। আমি মুক্তিকে বলি ,  প্রথম থেকে দাও ,  পুরো বক্তৃতাটা আমি শুনতে চাই। আমি পরপর দুইবার তার পুরো বক্তব্যটা শুনি ,  ফ...