শূন্য হুইলচেয়ার
কাজী জহিরুল ইসলাম
আজ ২৩ আগস্ট ২০১৬। গতকাল হঠাৎ শহীদ কাদরী গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে নর্থশোর লঙ আইল্যান্ড জুইশ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তিনি এখন নিবিড় পরিচর্যা ইউনিটে আছেন। সারা গায়ে নানান রকম নল, যন্ত্রপাতি লাগানো। গতকাল মুখে মাস্ক লাগানো ছিল। আজ মাস্ক খোলা হয়েছে। মুখোশ খুলে কবি যেন কারামুক্ত মানুষের মতো উচ্ছল হয়ে উঠেছেন। রাত তখন সাড়ে আটটা। একমাত্র তার স্ত্রী নীরা কাদরী ছাড়া আর কেউ নেই ৫১৯ নম্বর কেবিনে, কবির পাশে। গতকাল ছিল দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড়, আজ প্রায় জনশূন্য। হায়, মানুষের আবেগ কত তাড়াতাড়ি থিতিয়ে যায়। আমার সঙ্গে আমার স্ত্রী মুক্তি। আমাদের জন্য ভালোই হলো, কবি-সান্নিধ্যের সবটুকু আমরাই উপভোগ করতে পারবো।
কেমন আছেন শহীদ ভাই? প্রশ্নটি যেন আমার ঠোঁট থেকে বেরুতে চায় না। আমিতো দেখতেই পাচ্ছি। অসুস্থ মানুষকে এই প্রশ্ন করা যেন তাকে খানিকটা আঘাত করা। যখন বাসায় ছিলেন, হুইল চেয়ারে, সপ্তাহে তিন দিন ডায়ালাইসিস, তখনো, কেমন আছেন জিজ্ঞেস করলে বলতেন, ‘এই প্রশ্নটা আর করো না’। তবুও করতে হয়, সৌজন্যতা, আমরাতো সৌজন্যতাবোধের জন্যে ইচ্ছের বিরুদ্ধে কত কিছুই করি।
- আইডেন্টিফাই করতে পেরেছে কিছু?
- মাত্রতো বাঁচাইল। মাত্রতো আমারে বাঁচায়া তুলল মিয়া।
- এরা কি ঠিকঠাকমতো ডায়ালাইসিস করতে পেরেছে গতকাল?
- না মিয়া, দেখোনো।
তিনি তার বাঁ হাত বাড়িয়ে দেন। দেখি কব্জি এবং কনুইয়ের মাঝখানে বোয়াল মাছের পেটির মতো ফুলে আছে।
- গত ১৪ বছরে কোনোদিন ডায়ালাইসিস করতে গিয়ে পেইন হয় নাই। আর কাল সারাক্ষণ হাতে ব্যাথা হয়েছে।
- শহীদ ভাই, কবিতার মতো কিছু বলেন। অসুস্থ অবস্থায় কবি যা বলেন, তা কবিতা হয়ে যায়।
- তাই নাকি? দৃষ্টি বদলে যায়, বুঝলা, কম বয়সের দৃষ্টি, মধ্য বয়সের দৃষ্টি আর পরিণত বয়সের দৃষ্টি......
কথা পুরোপুরি স্পষ্ট নয়, দুয়েকটি শব্দ বুঝতে কষ্ট হয়, তবুও তিনি বলছিলেন। এইটুকু বলতেই নার্স চলে আসে। কপালের ব্যন্ড ঠিক করে দেয়। কোনো একটি যন্ত্রের ব্যাটারী ফুরিয়ে গেছে, সেটি রিপ্লেস করে। আমাদের আলোচনায় ছেদ পড়ে। এরপর দেড় ঘণ্টা কথা বলি কবির সঙ্গে। সেই সব আলাপচারিতার খণ্ড খন্ড অংশ থেকে কিছু কথা তুলে এনে কাব্যিক ফর্মে সাজালে যা দাঁড়ায় তা হলোঃ
মানুষের দৃষ্টি ধীরে ধীরে বদলাতে থাকে
ক্রমশ বদলে যায়
কম বয়সের দৃষ্টি, মধ্য বয়সের দৃষ্টি
পরিণত বয়সে অন্যরকম হয়ে যায়
বুড়ো বয়সের দৃষ্টি ছিল বাহাদুর শাহ জাফরের
ছিল রবীন্দ্রনাথের
রুচী, পাঠাভ্যাস সবই বদলে যায়
সুলিখিত প্রবন্ধই এখন সুখপাঠ্য, কবিতায় আর হয় না এন্টারটেইনমেন্ট
একটা সময় ছিল, কান্ট গিলতে শুরু করি, এথিক্যাল সোশ্যালিজম
বোঝার-শেখার কি আকুতি, মুখ গুঁজে পড়ি থাকি লাইব্রেরির রো’তে
নাওয়া-খাওয়া সবই অগুরুত্বপূর্ণ
দান্তের দর্শনে কি কাটিনি সাঁতার?
মদ-সিগারেটেও কৈশোরক নেশা ছিল, ছিল আড্ডাবাজি চায়ের টেবিলে
একদিন শামসুর রাহমান বলেন,
‘উঠে আসুন, না হলে কবিতা চলে যাবে’
তবু উঠে আসিনি। আড্ডায় আড্ডায় সম্পূর্ণ করেছি কৈশোর।
দৃষ্টি বদলে যায় জহির, বুঝলে কবি
করো, মন যা চায় তোমার, লিখো যা লিখতে ইচ্ছে করে,
মনের আনন্দের জন্যে করে যাও...
যদি রেখে যেতে চাও দাগ, খোঁজো ভার্জিন পথ
যে পথে এখনো পড়ে নি পা কোনো কবির,
বুঝলে, দৃষ্টি বদলে যায়, গেছে।
এক পর্যায়ে কবির স্ত্রী নীরা কাদরী বেশ সজোরে নার্সকে ডাকেন, ডায়াপার বদলে দিন। শহীদ ভাই সাথে সাথে বলেন, “নো নো, আই অ্য্যম ফাইন”। ভাবি হাসেন। আমরাও হাসি। আমি জানি শহীদ ভাই চাচ্ছেন না এই আড্ডায় কোনো ছেদ পড়ুক। রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে কিছু একটা বলতে গিয়ে থেমে গেলেন। ‘না থাক। এসব আর বলতে চাই না। এক কথা বলে শামসুর রাহমানের সাথে আমার সম্পর্ক নষ্ট হয়ে গেল’। আমি একটু মজা করি, ‘রবীন্দ্রনাথের সাথে সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।’ মুক্তি এবং নীরা ভাবি দুজনই আমার ওপর ক্ষেপে যায়। ‘রবীন্দ্রনাথের লক্ষ লক্ষ ভক্ত আছে। ওরা ক্ষেপে যাবে। কি দরকার?’। আমি চুপ হয়ে যাই। শহীদ ভাই হাসেন। কি নির্মল সেই হাসি। ‘শোনো মিয়া, তোমারে অন্য একটা গল্প বলি। এক লোক দিল্লীর সরাইখানায় গেল মদ্যপানের জন্য। নোংরা জামা কাপড় দেখে তাকে সেখান থেকে বের করে দেয়। এভাবে সে তিনটি সরাইখানায় যায়। তিন জায়গা থেকেই তাকে বের করে দেয়। তখন সে হাঁটতে হাঁটতে গ্রামের দিকে চলে যায়। এক নির্জন স্থানে গিয়ে দেখে একটা মসজিদ। কোনো লোকজন নেই। নিঃসঙ্গ মসজিদ দেখে লোকটি বলে, খোদার অবস্থাও আমার মতো?’
“দিল খুশ হ্যায় মসজিদ কো বিরান দেখকার
মেরি তারহা খুদা কা ভি খানা খারাব হ্যায়”
নীরা ভাবীর ফোন আসে, আওলাদ ভাই ফোন করেছেন। তিনি কথা বলতে উঠে চলে যান। আমরা কবিতায় ফিরে আসি। ‘কবি হওয়ার কোনো ইচ্ছা আমার কোনোদিন ছিল না। বাংলা ভাষাইতো জানতাম না। উর্দু আর ইংলিশ জানতাম। একসময় খুব মার্ক্স পড়তাম। দিনের পর দিন লাইব্রেরীতে পড়ে থেকে কান্ট পড়েছি। তখন মনে হতো এথিক্যাল সোশ্যালিজম শিখতে হবে। আর এইসব পড়া-তো আর সাহিত্য পড়ার মতো না। সারাক্ষণ মাথার মধ্যে ওটাই থাকে। বুঝতে হবে না? কবিতা মাথায় ঢুকবে কখন? আড্ডাবাজি করতাম খুব, বুঝলা? শামসুর রাহমানরা উঠে চলে যেতেন, লিখতে বসে যেতেন। আমি আড্ডাতেই দিন কাটিয়ে দিতাম। শামসুর রাহমান আমাকে বলতেন, শহীদ, আড্ডা ছেড়ে উঠে আসুন, লিখতে বসুন, না হলে কবিতা চলে যাবে। আমি শুনি নি’।
শহীদ কাদরীর মধ্যে সবসময়ই রিজেকশন প্রক্রিয়া কাজ করতো। কোনো কিছুই সহজে গ্রহণ করতে পারতেন না। নিজেই একথা আমাকে বহুবার বলেছেন। এতো কম লেখা প্রসঙ্গে একবার খুব স্পষ্ট করেই বলেন, ‘আমার মধ্যে রিজেকশন প্রসেস কাজ করে খুব বেশি। গ্রহণ করার চেয়ে বর্জন করি বেশি’। সেই সঙ্গে তার আজন্ম আলস্যতো আছেই। আজও হাসপাতালে বসে বলছেন, ‘আর কি হবে এইসব লিখে-টিখে। আমার গুলোও কিছু হয় নি, কারোটাই কিছু হচ্ছে না’। আমি চুপ করে থাকি। তিনি কিছু একটা বুঝতে পারেন। বলেন, ‘জহির তুমি লেখো, নিজের আনন্দের জন্যে লিখে যাও। তবে একটা কথা তোমাকে বলি, যদি দাগ রেখে যেতে চাও, ভার্জিন পথ খুঁজে বের করো। যে পথে এখনো পা দেয় নি কোনো কবি। নতুন কিছু খুঁজে বার করো’।
বিছানা, হুইলচেয়ার এবং সোফা এই তাঁর বিচরণ ক্ষেত্র গত ১৪ বছর ধরে। সারাদিন সোফায় শুয়ে, আধশোয়া হয়ে বই পড়ছেন কবি শহীদ কাদরী। সোফার সামনে একটি কফি টেবিল, টেবিলের ওপর একগাধা বই আর নানান রকম ওষুধের প্যাকেট-শিশি। এই দৃশ্যই তাঁর ভক্তরা দিনের পর দিন দেখে আসছে। ‘শোনো মানুষের দৃষ্টি বদলে যায়, রুচী বদলে যায়। এখন আর কবিতা পড়তে ভাল লাগে না। কবিতায় আর এন্টারটেইনমেন্ট হয় না বরং প্রবন্ধ ভালো লাগে, সুলিখিত প্রবন্ধ পড়তেই এখন ভাল লাগে’।
হাসপাতালে যাওয়ার আগে আমি “দৈনিক প্রথম আলো” পত্রিকার জন্য একটি সাক্ষাৎকার নেই। সাক্ষাৎকারটি লিখে কিছু বিষয় নিশ্চিত হওয়ার জন্য ফোন করি তাকে। শারীরিক অবস্থা নিয়ে দুয়েক কথা বলার পর তিনি হঠাৎ করে বলেন, ‘তোমাক একটা কথা বলি। কথাটা আমি কাউকে বলিনি। নীরাকেও বলিনি। ইট’স পোয়েট টু পোয়েট’। আমি উৎকর্ণ হই, কি এমন গোপন কথা যা তিনি তাঁর স্ত্রীকেও বলেন নি। ‘শোনো, আমি মৃত্যুর গন্ধ পাচ্ছি’। সাথে সাথে আমি মৃদু ধমক দিই। বাদ দেন তো শহীদ ভাই, এসব কথা বলবেন না।
২২ তারিখ সকালে যখন জানলাম তিনি হাসপাতালে আমার ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো। তাহলে কি তিনি যা বলেছেন তা-ই ঘটতে যাচ্ছে? বিকেলের দিকে খবর পাই অবস্থা অবনতির দিকে। আমি অফিসে কাজ করতে পারছি না। হরহর করে জল আসছে চোখে। কি বিচ্ছিরি ব্যাপার, সহকর্মীরা কি ভাববে? টিস্যুতে চোখ মুছতে মুছতে আমি বাথরুমে যাই। কল ছেড়ে চোখে জল দিই, চোখ ধুই। অফিস কক্ষে আর ফিরে আসি না। বেরিয়ে পড়ি রাস্তায়। হাঁটতে হাঁটতে চলে যাই দুই ব্লক দূরে দাগ হ্যামারশোল্ড প্লাজার প্রশস্ত বুকে, অস্থির পায়চারী করতে থাকি। ফোন দিই বাচিক শিল্পী গোপন সাহাকে। আমার অস্থিরতার কথা বলি। গোপন আমাকে সান্তনা দেয়। আকার-ইঙ্গিতে বলি, আমি কিছু একটা জানি, খুব গোপন, যা আর কেউ জানে না। আমি গোপনকে কথাটা খুলে বলিনি কিন্তু গোপন বুঝতে পারে। তখনো আমার চোখে জল।
পরদিন হাসপাতালে গিয়ে তাকে এতো প্রাণবন্ত দেখে আমার শঙ্কা দূর হয়। দু’দিন পরে ভাবি জানায়, অবস্থা উন্নতির দিকে, আইসিইউ থেকে রুমে ট্রান্সফার করা হবে। আমাদের মুখে হাসি ফোটে। নিউ ইয়র্কের শিল্প-সাহিত্যের বাগানে হাসির ফুল ফোটে। আমরা তাঁর ঘরে ফেরার প্রতীক্ষায় থাকি।
রাত এখন দশটা। আমাদের মেয়ে জল একজন অটিস্টিক শিশু। আমরা না ফেরা পর্যন্ত ও ঘুমাবে না। আমাদের ফিরতে হবে। শহীদ ভাই তখনো কথা বলছেন। নীরা ভাবি বলেন, ‘শহীদ ওদের যেতে হবে। বাচ্চাকে ঘুম পাড়াবে’। শহীদ ভাই তখনো মজা করছেন। কোনো এক বিখ্যাত মানুষের গল্প বলছেন। তিনি কারো বাসায় গিয়ে বলছেন, ‘আমাকে একটু তাড়াতাড়ি যেতে হবে’। গৃহকর্তা তখন তাঁকে বললেন, ‘যাবেন? তাহলে তাড়াতাড়ি যান। আর দেরী করবেন না’। আমরা উঠতে উঠতে আবারো হাসি এবং হাসতে হাসতেই হাসপাতাল ছাড়ি। একজন আইসিইউর রোগীকে দেখে দর্শনার্থীরা হাসতে হাসতে বাড়ি ফিরছে এমন ঘটনা বোধ হয় এই হাসপাতালের নার্সরা এর আগে আর কখনো দেখেনি। ওরা অবাক হয়ে আমাদের দেখছে।
২৮ তারিখ সকালে আমরা তৈরী হয়েছি পেনসিলভানিয়ার একটি সাহিত্য-অনুষ্ঠানে যাব। হঠাৎ নীরা ভাবীর ক্ষুদে বার্তা। “Shaheed just past away this morning Sunday August 28”. আমার হাত থেকে ফোন পড়ে যায়। আমরা গাড়ি ঘোরাই, ছুটতে থাকি নর্থ শোর হাসপাতালে।
২৪৪ নম্বর রুমে শুয়ে আছেন কবি। কি নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছেন। ভাঙা ভাদ্রের সকালে, এই শোকের শহরে। ক’দিন পরেইতো আশ্বিন। কবি, সেই আটাত্তুরে বলেছিলেন, ‘এই এলো আশ্বিন/ আমার শূন্য হলো দিন”। সব কথা কি রাখতে হয় কবি?
নিউ ইয়র্কের শিল্প-সাহিত্যের তীর্থ ছিল যে হুইলচেয়ারটি, আজ তা শূন্য, একাকী গড়িয়ে যায়। এই শূন্যতার ভেতরে বেজে ওঠে সুমন চট্টোপাধ্যায়, “তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা”।
ম্যানহাটন, নিউইয়র্ক। ২ সেপ্টেম্বর ২০১৬।
(দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ – ৬ সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত)

Comments
Post a Comment