Skip to main content

কবি শহীদ কাদরীকে নিয়ে আমার লেখালেখি || চার

এই এলো আশ্বিন 

কাজী জহিরুল ইসলাম 

 

২০০৪ এর আগস্ট মাস। আমি তখন জাতিসংঘের ঢাকা অফিসে কাজ করি। একটি কর্মশালায় যোগ দিতে এসেছি নিউইয়র্কে। নিউইয়র্ক উদীচী পরিচালনা করেন সংস্কৃতিকর্মী এম ই চৌধুরী শামীম এবং দিলারা খান রূপা। এখানকার সবাই এই দম্পতিকে একত্রে রূপা-শামীম নামেই চিনতো বেশী। শামীম ভাই আমার স্কুলের বন্ধু সোহাগ ও স্বপনের বড় ভাইআমরা একই পাড়ায় বড় হয়েছি। তার পুকেপ্সির বাসায়ই উঠি। ওখান থেকে একশ মাইল পথ মেট্রো নর্থ এ চড়ে হাডসনের তীর ধরে রোজ সকালে ম্যানহাটনে আসি আবার সন্ধ্যায় ফিরে যাই। কোনো কোনোদিন বাঙালীসঙ্গ-লোভে রাতে আবার ফিরে আসি জ্যাক্সন হাইটসে। একদিন সন্ধ্যায় জ্যাক্সন হাইটসে হাঁটাহাঁটি করছিশামীম ভাই বলেনতোমার জন্য একটি সারপ্রাইজ আছে। তিনি আমাকে একটি বাঙালী রেস্টুরেন্টে নিয়ে যান। দেখি ওখানে বসে আছেন কবি শহীদ কাদরী। তখন তিনি ওয়াকারে ভর দিয়ে হাঁটতেন। শহীদ ভাইকে দেখে আমার শরীর কাঁপছে। যেদিন থেকে কবিতাই আরাধ্যগ্রোগ্রাসে গিলেছি তাঁর কবিতাসেই প্রবাদপ্রতীম মানুষটির সামনে আমি দাঁড়িয়ে আছি! নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছি না। আমি নিজের পরিচয় দিয়ে ভয়ে ভয়ে বললামআমিও কবিতা লেখার চেষ্টা করি। শহীদ ভাই আমাকে যুগপৎ অবাক করে দিয়ে বলেন, “আমি তোমার নাম শুনেছি।” ব্যাসএইটুকু শুনেই গর্বে আমার বুক দশ ইঞ্চি উঁচু হয়ে গেল। 



 

শহীদ ভাইয়ের সামনে এক তরুণ বসে আছেন। তিনি খুব গুরুত্ব দিয়ে আমাকে বললেন, “এসো তোমার সাথে পরিচয় করিয়ে দিই। ও খুব ভাল কবিতা লেখে। আমি এই কবির কোনো কবিতা এর আগে পড়িনিনামও শুনিনি। খানিকটা সন্দেহের দৃষ্টিতে শহীদ ভাইয়ের দিকে তাকালাম। তিনি এবার বেশ জোর দিয়ে বললেন, “নিউ ইয়র্কের কবিদের মধ্যে ও এখন সবচেয়ে ভালো লেখে।” 

 

শহীদ ভাই পরদিন তাঁর বাসায় যাওয়ার আমন্ত্রণ জানালেন। গেলাম। বিশাল আড্ডা সেখানে। ঢাকা থেকে অনেকেই এসেছেন। হাসান ইমামশাহরিয়ার কবীরতারেক মাসুদ আরো অনেকে। একগাদা লোকে ঠাসা। এতোসব বিখ্যাত লোকের ভিড়ে আমিতো কেউ না। কিন্তু শহীদ ভাইয়ের আগ্রহ কেউ না”-এর প্রতি। পাশাপাশি দুটি সিঙ্গেল সোফায় আমরা দুজন বসেছিঅন্যরা একরকম দর্শক সারিতে। অনেকেই জায়গা না পেয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। কত কথা। কবি আল মাহমুদ তখন আমার খুব কাছের মানুষ। রোজই আমাদের দেখা হয়। হয় মাহমুদ ভাইয়ের বাসায়নয়ত আমার বাসায়। মাহমুদ ভাইয়ের সাথে আমার হাজারো ঘটনা/আড্ডার তাজা স্মৃতি। শহীদ ভাইকে নিয়ে কত কথা শুনেছি মাহমুদ ভাইয়ের কাছেফজল ভাইয়ের কাছেরফিক ভাইয়ের কাছে। সেসব শেয়ার করছি। শহীদ ভাই অনর্গল বলে যাচ্ছেন পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের তাদের সেই উত্তাল আড্ডার দিনগুলোর কথা। মন্ত্রমুগ্ধের মতো ঘর ভর্তি মানুষ শুনছে আমাদের কথা। এক পর্যায়ে পেছন থেকে ছুটে এলেন অভিনেত্রী লু্ৎফুন নাহার লতা। এসেই বলেন, “এই ভিড়ের মধ্যে কেউতো আর আপনার সাথে আমাকে পরিচয় করিয়ে দেবে নাতাই নিজেই এলাম পরিচিত হতে। শহীদ ভাই এই লোককে এতো গুরুত্ব দিচ্ছে যখন লোকটি নিশ্চয়ই বিশেষ কেউ হয়ে থাকবেলতা আপা হয়ত এই ভেবে সেদিন বিভ্রান্ত হয়ে থাকবেন। এভাবেই এই অখ্যাত আমি সেদিন নিউ ইয়র্কের আড্ডায় বাংলা ভাষার অন্যতম প্রধান কবির গৃহে বিখ্যাত হয়ে উঠেছিলাম। এই হলো কবি শহীদ কাদরী। ক্রমাগত জন্ম দিয়ে চলেন চমকপ্রদ সব ঘটনার। এবং সবসময়ই আমাদের মনে হয় ঘটনাগুলো খুব স্বাভাবিক নিয়মেই ঘটছে। 

 

১৯৭৮ সালে কবি শহীদ কাদরী তাঁর বোধ” কবিতায় বলেন, “এই এলো আশ্বিন/ আমার শূন্য হলো দিন। ৩৮ বছর পরেযখন আশ্বিন দরোজায় কড়া নাড়ছেতখনি তাঁর দিন শূন্য হলো। এটিও কি অতি স্বাভাবিক নিয়মে ঘটে যাওয়া তাঁর একটি চমকপ্রদ ঘটনা নয়?

 

হলিসউডনিউইয়র্ক। ৩০ আগস্ট ২০১৬।    

(সাপ্তাহিক বাঙালীতে প্রকাশিত)

Comments

Popular posts from this blog

অসাধারণ এই শিল্পীর জীবনের গল্প বড় করুণ

  [এই সময়ের অত্যন্ত প্রতিভাবান শিল্পী সারফুদ্দিন আহমেদ। বাড়ি পশ্চিমবঙ্গে। আর্ট কলেজে খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করেন ,  আর শুধু ছবি আঁকেন। নানান মাধ্যমে ,  নানান বিষয়ের ছবি। সারফুদ্দিন আহমেদের ছবি থেকে চোখ ফেরানো যায় না ,  আপনাতেই ওঁর নান্দনিক সৃষ্টিকর্মে দৃষ্টি আটকে যায় ,  কী জল রঙ ,  কী অ্যাক্রিলিক ,  কিংবা স্রেফ পেন্সিলের ড্রয়িং। এই গুণী শিল্পীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কবি কাজী জহিরুল ইসলাম। সাক্ষাৎকারটি এখানে উপস্থাপন করা হলো।]       ভারত আমাকে চোখ দিয়েছে ,  বাংলাদেশ দিয়েছে দৃষ্টি -     সারফুদ্দিন আহমেদ     কাজী জহিরুল ইসলামঃ  ব্যাক গ্রাউন্ডে তবলা বাজছে আপনি ছবি আঁকছেন কাচের ওপর।    এই যে বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে ছবি আঁকা, এই ছন্দটা ছবিতে কিভাবে ধরেন? আর কোনো শিল্পী ছবি  আঁ কার সময় যন্ত্রানুসঙ্গ ব্যবহার করেছেন?   সারফুদ্দিন আহমেদঃ   কাঁচ নয়,   এটি এক বিশেষ ধরনের কাপড়-নেট। এই নেটের উপরে বর্তমানে আমার এক্সপেরিমেন্ট চলছে।    জহিরুলঃ ও ,  ফেইসবুকে যখন ছবিটি দেখি কাচের মতো ...

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জুর সাক্ষাৎকার || অষ্টম পর্ব ||

[লেখক, সাংবাদিক, অনুবাদক আনোয়ার হোসেইন মঞ্জুর সাক্ষাৎকারের অষ্টম  পর্ব আজ প্রকাশ করা হলো। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কবি কাজী জহিরুল ইসলাম।]          দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ বাসস - কে অকার্যকর করেছে  – মঞ্জু    জহিরুলঃ  আপনি ফেলোশিপ নিয়ে দিল্লীতে ছয়মাস ছিলেন, ব্যক্তিগত আগ্রহ এবং পেশাগত অভ্যাসের কারণে কাছে থেকে দেখার/বোঝার চেষ্টা করেছেন ভারতের এবং উপমহাদেশের রাজনীতি। আমরা দেখি ভারতের রাজনীতিতে গায়ক, নায়ক, লেখক, সাংবাদিকের আবির্ভাব ঘটে সব সময়ই এবং তারা রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও রাখেন। বাংলাদেশে এই ধারা খুব সম্প্রতি শুরু হলেও আমাদের জনপ্রিয় খেলোয়াড়, শিল্পীরা নিজেদের অর্থনীতি সমৃদ্ধ করা ছাড়া রাজনীতিতে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেন না। এমন কি ধর্ষণ, অন্যদেশকে ট্রানজিট প্রদান, উপর্যুপরি সড়ক দূর্ঘটনা, পরিবেশ ধ্বংসকারী কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্প ইত্যাদি ইস্যুতেও তারা নীরব। অথচ তাদের জনপ্রিয়তা এবং রাজনীতি সম্পৃক্ততা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত, যা ভারতে দেখা যায়। বিষয়টি যদি আপনার মতো করে ব্যাখ্যা করেন।  মঞ্জুঃ   দিল্লিতে আমার অবস্থানকালকে আমি নানা দিক থ...

কানের কাছে নারী কন্ঠ

  স্বপ্নের ঐশ্বর্য   || কাজী জহিরুল ইসলাম ||   ছুটির দিন। লম্বা সময় ধরে ঘুমাবো। কিন্তু তার আর উপায় নেই। কানের কাছে নারী কন্ঠ। বেশ আত্মবিশ্বাসী কন্ঠ। ক্রমাগ ত  কথা বলে যাচ্ছেন এক অপরিচিতা। আমি লাফ দিয়ে উঠি। কে তিনি ?  আমার স্ত্রী বলেন ,  রুবানা হক ,  শোনো কী বলছেন। রুবানা হক প্রয়াত ব্যবসায়ী আনিসুল হকের স্ত্রী। আমাদের কৈশোর-উত্তীর্ণ কালে আনিসুল হক ছিলেন আমাদের হিরো। টিভি উপস্থাপনায় অন্য এক আধুনিকতা নিয়ে হাজির হন তিনি। এরপর আমরা ধীরে ধীরে তার ব্যবসায়ীক সাফল্য ,  সাংগঠনিক সাফল্য দেখতে দেখতে বড় হই। খুব সাম্প্রতিককালে ,  আনিসুল হকের মৃত্যুর পর ,  কেউ একজন বলেছিলেন ,  তার স্ত্রী রুবানা হকও খুব ভালো কথা বলেন। কিন্তু রুবানা হকের কথা শোনার সৌভাগ্য আমার হয়নি। দুই যুগ ধরে দেশের বাইরে থাকার কারণে এই সময়ে স্টার হয়ে ওঠা অনেকের সম্পর্কেই আমার ভালো ধারণা নেই।  তার কথায় এমন কিছু ছিল যে আমার পক্ষে ঘুমিয়ে থাকা সম্ভব হয়নি। আমি মুক্তিকে বলি ,  প্রথম থেকে দাও ,  পুরো বক্তৃতাটা আমি শুনতে চাই। আমি পরপর দুইবার তার পুরো বক্তব্যটা শুনি ,  ফ...