আবদুল্লাহর বাড়ি দিল্লি জেনে শেখ হাসিনা উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলেন
[লেখক, সাংবাদিক, অনুবাদক আনোয়ার হোসেইন মঞ্জুর সাক্ষাৎকারের পঞ্চম পর্ব আজ প্রকাশ করা হলো। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কবি কাজী জহিরুল ইসলাম।]
জহিরুলঃ আপনি অনেক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সাক্ষাৎকার গ্রহন করেছেন। কার কার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এবং সাক্ষাৎকার গ্রহনকালে তাদের দলীয় পদ-পদবী এবং সরকারে কী অবস্থান ছিল?
মঞ্জুঃ বাংলাদেশের সকল প্রধান, মাঝারি ও ছোট রাজনৈতিক দলের শীর্ষ ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার গ্রহণের সুযোগ হয়েছে আমার। তাদের মধ্যে বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনা, সাবেক রাষ্ট্রপতি খন্দকার মুশতাক আহমেদ, সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ, সাবেক প্রধানমন্ত্রী আতাউর রহমান খান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী মিজানুর রহমান চৌধুরী, সাবেক প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর আহমেদ উল্লেখযোগ্য। তবে তাদের মধ্যে শুধু কাজী জাফর আহমেদের সাক্ষাৎকার গ্রহণের সময় তিনি সরকারের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। খন্দকার মুশতাক ও এরশাদের সাক্ষাৎকার নিয়েছি তাদের ক্ষমতা থেকে অব্যহতি গ্রহণের পর। শেখ হাসিনা, আতাউর রহমান খান ও মিজানুর রহমান খানের সাক্ষাৎকার নিয়েছি তাদের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে। এছাড়া অন্যান্য উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক নেতার মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমীর অধ্যাপক গোলাম আজম ও আব্বাস আলী খান, জাসদের সভাপতি মেজর (অব) এম এ জলিল ও আসম আবদুর রব, সিপিবির সভাপতি কমরেড মনি সিং ও কমরেড ফরহাদ আহমদ, মুসলিম লীগের সভাপতি খান এ সবুর, ন্যাপের সভাপতি অধ্যাপক মুজাফফর আহমেদ, ওয়াকার্স পার্টির রাশেদ খান মেননের সাক্ষাৎকার নিয়েছি একাধিকবার।
জহিরুলঃ শেখ হাসিনা, হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ, গোলাম আযম, এই তিনজন দলীয় প্রধানের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। একজন শীর্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সাক্ষাৎকার গ্রহনের আগে যে ধরনের প্রস্তুতি নিতে হয়, নিজের অভিজ্ঞতা থেকে তা ব্যাখ্যা করুন। কখনো কি মনে হয়েছে প্রস্তুতির ঘাটছি ছিল বলে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে বা সাক্ষাৎকার আশানুরূপ হয়নি?
মঞ্জুঃ প্রত্যেকের সাক্ষাৎকার গ্রহণের আগে ব্যাপক প্রস্তুতি নিতে হয়েছে। খ্যাতিমান ব্যক্তিদের সম্পর্কে একজন রিপোর্টারের মোটামুটি সবই জানা থাকে। কারণ প্রতিনিয়ত তাদের সাথে সাক্ষাৎ ঘটে। অনেক সময় ঘনিষ্ট হয়ে ওঠাও সম্ভব হয়। আপনি যে তিনজনের নাম উল্লেখ করেছেন তাদের খুটিনাটি বিষয়ও জানা ছিল। তবে অনেক রিপোর্টার আছেন বা আমাদের বন্ধুদের মধ্যেও ছিলেন, যারা উপস্থিতভাবে সাক্ষাৎকার নেয়ার চেষ্টা করতেন। এর ফলে অনেক সময় যার সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন, তিনিই রিপোর্টারকে পাল্টা চ্যালেঞ্জ করে বসতেন যে এমন তথ্য তিনি কোথায় পেলেন। বাংলাদেশের মতো রাজনৈতিক সহনশীলতা ও শালীনতা বর্জিত দেশে কোনো রাজনৈতিক নেতাকে যে আক্রমণাত্মক প্রশ্ন করার সুযোগ নেই, তা অবশ্যই মনে রাখতে হবে। তা সত্বেও কারো সাক্ষাৎকার নেয়ার আগে তার সম্পর্কে বিস্তারিত জানা রিপোর্টারের জন্য জরুরী। যার সাক্ষাৎকার নেয়া হবে তার সাথে একটা সম্পর্ক গড়ে তুলে নেয়া প্রয়োজন, এমন একটি আবহ সৃষ্টি করা প্রয়োজন, যাতে সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী সম্পর্কে তার মধ্যে আস্থার সৃষ্টি হয়। মুখোমুখি হয়েই যদি কেউ সোজা প্রশ্নে চলে যান, তাহলে যে কারণে সাক্ষাৎকার নেয়া হচ্ছে তা ভেস্তে যেতে পারে। এমনকি রিপোর্টারের চেহারায় যদি বিরক্তি, অস্বস্থির ভাব ফুটে ওঠে তাতেও কাঙ্খিত ফললাভ বিঘ্নিত হবে। এখন তো সবকিছু রেকর্ড করা হয়, যা আমার সময়ে কমই ছিল। আমি অধিকাংশ সাক্ষাৎকার টুকে নিয়েছি। এক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হতো যে সাক্ষাৎকার দানকারীর প্রতিটি কথা তা প্রয়োজনীয় হোক বা না হোক তা লিখতে হবে। যদি তার মনে হয় রিপোর্টার তার কথাগুলোতে গুরুত্ব দিচ্ছেন না, তাহলে সাক্ষাৎকার হঠাৎ করেই স্বল্পস্থায়ী হয়ে যাবে। তার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে ও নোট নিতে হবে। আমি আগেই বলেছি, বাংলাদেশের মতো দেশে কোনো রাজনৈতিক নেতাকে আক্রমণাত্মক কোনো প্রশ্ন করার সুযোগ একেবারেই নেই। তবুও যদি কেউ সেই দু:সাহস করেন তাহলে হ্যাণ্ডবুক হিসেবে ইটালির খ্যাতনামা সাংবাদিক, ওরিয়ানা ফালাচির “ইন্টারভিউ অফ হিস্টরি” পড়ে নেয়া প্রয়োজন বলে আমি মনে করি। ওরিয়ানা ফালাচি মূলত বিশ্বনেতাদের সাক্ষাৎকার নিয়েই খ্যাতির অধিকারী হয়েছেন এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি আক্রমণাত্মক প্রশ্ন করেছেন। অনেক সময় তিনি বিপদেও পড়েছেন। তার মতে, একজন রিপোর্টার যখন তার অফিসে বসে রিপোর্ট লিখেন তখন তিনি অত্যন্ত সাহসী। কিন্তু ক্ষমতাসীন কোনো ব্যক্তির মুখোমুখি হয়ে তিনি আর সাহসী হয়ে উঠতে পারেন না। তাদের পক্ষে এমন প্রশ্ন করা সম্ভব নয় যে, “জনাব, আপনি যেহেতু একজন একনায়ক, আমরা সবাই জানি, আপনি দুর্নীতিগ্রস্থ। আপনি কী মাত্রায় দুর্নীতিপরায়ন?” কিন্তু অবাক ব্যাপার যে ফালাচি রাষ্ট্রপ্রধান, রাজা এবং গেরিলা নেতাদের পর্যন্ত মুখ খুলতে বাধ্য করেছেন। এজন্য তিনি যে কৌশলগুলো অবলম্বন করেছেন তা সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী রিপোর্টারদের জানা আবশ্যক। ফালাচির আরেকটি গুন ছিল তিনি অন্তরঙ্গ হয়ে ওঠতে পারতেন। এই গুনও একজন সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী সাংবাদিকের থাকা জরুরী।
জহিরুলঃ শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকার গ্রহনের সময়কাল, পরিপ্রেক্ষিত এবং উল্লেখযোগ্য হাইলাইটস যদি বলেন খুব ভালো হয়।
মঞ্জুঃ শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকার গ্রহণ করি ১৯৮৩ সালের ডিসেম্বর মাসে। এ সাক্ষাৎকার বাংলাদেশের কোনো সংবাদপত্রের জন্য গ্রহণ করিনি এবং আমি একা এই সাক্ষাৎকার গ্রহণ করিনি। আমি তখন দৈনিক সংগ্রামের সিনিয়র রিপোর্টারের পাশাপাশি লণ্ডন থেকে প্রকাশিত একটি ইংরেজি মাসিক ম্যাগাজিন ‘অ্যারাবিয়া’র ঢাকাস্থ প্রতিনিধি ছিলাম। ওই সময় ঢাকায় ত্রয়োদশ ইসলামিক ফরেন মিনিষ্টার্স কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। এর আগে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বাংলাদেশে এতবড় আন্তর্জাতিক কোনো সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়নি এবং এ ধরনের আন্তর্জাতিক কোনো অনুষ্ঠানের উপযুক্ত জায়গাও ছিল না ঢাকায়। অতএব স্থান হিসেবে নির্বাচন করা হয় জাতীয় সংসদ ভবনকে। এ অনুষ্ঠান কভার করার জন্য বিশ্বের বহু দেশ, বিশেষ করে প্রতিটি মুসলিম দেশ থেকে সাংবাদিকরা ঢাকায় আসেন। লণ্ডন থেকে ‘অ্যারাবিয়া’র সহকারী সম্পাদক আসলাম আবদুল্লাহ কনফারেন্স কভার করতে আসবেন বলে আমাকে জানানো হয়েছিল। যথাসময়ে তিনি ঢাকায় আসেন এবং আমরা একসাথে কনফারেন্স কভার করি। ঢাকায় পৌঁছেই আসলাম আবদুল্লাহ জানান যে কনফারেন্স শেষে তিনি বাংলাদেশের বড় দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করতে চান। বিশেষ করে তিনি আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা, বিএনপির চেয়ারম্যান বেগম খালেদা জিয়া এবং সাবেক রাষ্ট্রপতি ও ডেমোক্রেটিক লীগের সভাপতি খন্দকার মুশতাক আহমেদের সাক্ষাৎকার গ্রহণে আগ্রহী, আমি যেন তাদের সাথে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে রাখি।
আসলাম আবদুল্লাহ ভারতীয় নাগরিক এবং তার সাথে আলোচনা করে জানতে পারি, সাংবাদিকতার সঙ্গে বলতে গেলে শৈশব থেকে তিনি জড়িত। কারণ তার পিতা মাওলানা মোহাম্মদ মুসলিম দিল্লি থেকে প্রকাশিত উর্দু দৈনিক মুসলিম এর সম্পাদক। এর আগে তিনি তাদের জন্মস্থান ভূপালে দৈনিক নাদিম এর সম্পাদক ছিলেন। শৈশবেই তিনি তাদের বাড়িতে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি শঙ্কর দয়াল শর্মা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী আইকে গুজরাল, খ্যাতনামা সাংবাদিক কূলদীপ নায়ারসহ অনেক রাজনৈতিক নেতা ও সাংবাদিককে আসতে দেখেছেন। দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সামাজিক বিজ্ঞানে ব্যাচেলর করার পর মাষ্টার্স ও পিএইচডি করার জন্য যুক্তরাজ্যে গেছেন। যেহেতু তার রক্তে সাংবাদিকতা রয়েছে, লণ্ডনে গিয়েও সাংবাদিকতাকেই পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছেন।
যাহোক ইসলামিক ফরেন মিনিষ্টার্স কনফারেন্স চলা পর্যন্ত আসলাম আবদুল্লাহ হোটেল পূর্বাণীতে ছিলেন। সেখান থেকে কনফারেন্স ভেন্যুতে সাংবাদিকদের যাতায়াত, খবর প্রেরণের বিশেষ ব্যবস্থা ছিল। কনফারেন্স শেষ হওয়ার পর মগবাজারে, আমার বাসার কাছেই, তার থাকার জায়গার ব্যবস্থা করেছিলাম, যাতে তার পরবর্তী কাজগুলো করতে সুবিধা হয়। পরবর্তী কাজ বলতে নেতৃবৃন্দের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা। বড় দলগুলোর শীর্ষ নেতারা দেশের কোনো সাংবাদিককে সাক্ষাৎকার দিতে তেমন আগ্রহবোধ না করলেও বিদেশি সাংবাদিকদের সাথে সাক্ষাতের ব্যাপারে উদার। সম্ভবত তৃতীয় বিশ্বের সর্বত্র একই চিত্র। লণ্ডন থেকে প্রকাশিত একটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ম্যাগাজিনের সাংবাদিকের জন্য অ্যাপয়েন্টমেন্ট ঠিক করতে বেগ পেতে হয়নি। আমার পক্ষে নেতাদের অ্যাপয়েন্টমেন্ট ঠিক করে দেয়া ছাড়া তার সাথে সব জায়গায় যাওয়া সম্ভব হয়নি। তবে আমি শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকার নেয়ার জন্য তাকে সঙ্গ দিতে আগ্রহ বোধ করি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তিনি শুধু তার ছোট বোন ছাড়া পরিবারের সবাইকে হারিয়েছেন। প্রায় সাত বছর ভারতে নির্বাসিত জীবন কাটানোর পর দেড় বছর আগে দেশে ফিরেছেন। তিনি ভারতে থাকতেই আওয়ামী লীগ তাকে দলের সভাপতি নির্বাচন করেছিল। তাকে কাছে থেকে দেখা এবং তার কথা শোনার জন্য সাংবাদিক হিসেবে আমার আগ্রহ থাকাই স্বাভাবিক। আমরা দু’জন অনেকগুলো প্রশ্ন ঠিক করলাম। সাক্ষাৎকারের স্থান ৩২ নম্বরের বাড়ি। নিদিষ্ট দিনে দুপুরের পর পর আমরা হাজির হলাম। শেখ হাসিনা তখনো এসে পৌঁছাননি। বারান্দায় আমরা অপেক্ষা করছিলাম। মতিয়া চৌধুরী ছিলেন। একটু পর এলেন আওয়ামী লীগের ওই সময়ের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক এম এ জলিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই শেখ হাসিনা এলেন, বিলম্বের জন্য দু:খপ্রকাশ করে নিচতলায় লাইব্রেরি রুমে নিয়ে গেলেন। পরিচয় পর্বে আসলাম আবদুল্লাহ দিল্লিবাসী জেনে শেখ হাসিনা উচ্ছসিত হয়ে উঠলেন। দীর্ঘদিন তার দিল্লি অবস্থান এবং নানা স্মৃতির কথা বললেন আসলাম আবদুল্লাহকে। বোঝা গেল সাক্ষাৎকার গ্রহণ সহজ হবে। শেখ হাসিনা মন খুলে কথা বলবেন। কেউ নাশতা দিয়ে গেল এবং শেখ হাসিনা নিজ হাতে পরিবেশন করলেন। স্বভাবসুলভ রসিকতায় আমাকে বললেন যে আমি আসলাম আবদুল্লাহকে ঢাকার খাবারের সঙ্গে পরিচিত করিয়েছি কিনা।
আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎকার শুরু হলো। শেখ হাসিনা তখন ইংরেজি বলতে তেমন অভ্যস্ত হয়ে ওঠেননি। তিনি বাংলায় উত্তর দেবেন এবং ইংরেজিতে তরজমা করবেন এম এ জলিল। আসলাম আবদুল্লাহই অধিকাংশ প্রশ্ন করলেন। আমার জন্য কয়েকটি প্রশ্ন তিনিই নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। তিনি তার বাবা-মা, শেখ কামাল, শেখ জামাল ও তাদের স্ত্রী এবং শেখ রাসেলের স্মৃতি রোমন্থন করতে দীর্ঘ সময় নিলেন। তাদেরকে হারানোর কষ্টে তার কণ্ঠ অবরুদ্ধ। আমরা তাকে বলতে দিলাম। কথাগুলো হয়তো তিনি একইভাবে বহুজনের কাছে বহুবার বলেছেন। কিন্তু মনে হলো তিনি গতকাল ঘটে যাওয়া বিয়োগান্তক ঘটনার বিবরণ দিচ্ছেন। ইংরেজিতে তরজমা করার কারণে স্বাভাবিকভাবেই সময় বেশি লাগছিল। তিন ঘন্টা অতিবাহিত হয়েছে। আমরা কোনো রাজনৈতিক প্রশ্নেই আসতে পারিনি। এমএ জলিল তাকে একটি সভার কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছিলেন। তিনি বললেন, আজ তো শেষ করা যাবে না। কাল এ সময়েই আসুন। অন্য কোনো প্রোগ্রাম থাকলেও আমি কাল সময় দেব। আসলাম আবদুল্লাহ বললেন যে, বাড়িটি তিনি ঘুরে দেখতে পারেন কিনা। শেখ হাসিনা উঠলেন। সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় নিয়ে গেলেন। এখানে ওখানে গুলির দাগ, সিঁড়ির কোথায় তার পিতার লাশ পড়েছিল আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছিলেন। ১৫ আগস্ট রাতে বাড়িটি যে অবস্থা ছিল সে অবস্থাই রাখা। ধূলিতে আচ্ছাদিত রুম। খাটের ওপর জাজিম ছিঁড়ে নারকেলের ছোবড়া ও আঁশ বের হয়ে আছে। তিনি দেখালেন কোনটা তাঁর বাবা-মার রুম, শেখ কামাল ও শেখ জামালের রুম। তিনি দেখাচ্ছেন। কথা বলতে পারছেন না। বললেন, ‘আমি ওপরে উঠতে সাহস পাই না। বহুদিন পর আজ ওঠলাম।’ আমরাও ভারাক্রান্ত। তার পেছন পেছন নিচে নেমে এলাম। পরদিন আসতে বলে তিনি গাড়িতে উঠলেন এমএ জলিলের সাথে।
পরদিন আবারও আমরা ৩২ নম্বরে গেলাম। এবার সরাসরি রাজনৈতিক প্রশ্ন। তিনি তার দলকে পুনর্গঠন, এরশাদের তথাকথিত ঘরোয়া রাজনীতি শেষ হলে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন জোরদার করার কর্মসূচি, দেশকে সোনার বাংলায় পরিণত করার ব্যাপারে তার পিতার স্বপ্ন পূরণের অঙ্গীকার ব্যক্ত করলেন। শীতকালে দিন দ্রুত ফুরিয়ে যায়। চা নাশতা এলে আগের দিনের মতো নিজ হাতে পরিবেশন করলেন। তিনি বেশ উৎফুল্ল ছিলেন। আসলাম আবদুল্লাহকে পুরনো দিল্লির বিভিন্ন খাবারের কথা বললেন। সময় পেলে তিনি আবার যাবেন। দিল্লির স্মৃতি এবং দিল্লিতে অনেকের আতিথেয়তার কথা তিনি ভোলেননি। আমরা প্রায় চার ঘন্টা কাটিয়েছি তার সাথে। অন্ধকার হয়ে এসেছে। আমরা বিদায় নিলাম।
জহিরুলঃ গোলাম আযমের সাক্ষাৎকার নেবার সময় কি একাত্তরে তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন করেছেন? যদি করে থাকেন সেইসব প্রশ্নের জবাব তিনি কিভাবে দিয়েছেন? ভাষা আন্দোলনের সময় গোলাম আযম ডাকসুর জিএস ছিলেন, ভাষা আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কারণে তাকে ভাষা সৈনিক বলা হয় কিন্তু ভাষাসৈনিক আব্দুল মতিন ব্যাঙ্গ করে বলেছেন, তার ঘাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে আমি পোস্টার লাগিয়েছিলাম, তার কোনো ভূমিকা ছিল না, তবে তার ঘাড়ের ভূমিকা ছিল। এসব প্রসঙ্গে কি গোলাম আযমের সাথে আপনার কথা হয়েছে? তার সাক্ষাৎকারের গুরুত্বপূর্ণ কিছু অংশ উল্লেখ করুন।
মঞ্জুঃ আমি একাধিকবার গোলাম আযমের সাক্ষাৎকার নিয়েছি এবং প্রতিটি সাক্ষাৎকারে একাত্তরে তার ও তার দলের ভূমিকা, ভাষা আন্দোলনে তার ভূমিকা এসব বিষয়ে প্রশ্ন করেছি। তার প্রথম সাক্ষাৎকার নেই দৈনিক সংগ্রামের পক্ষ থেকে সম্ভবত ১৯৮০ সালে। লণ্ডন থেকে বাংলাদেশে তার ফিরে আসার দুই বছর পর। জাতীয় সংসদে তাকে নিয়ে প্রায় প্রতিদিন প্রশ্ন তুলছিলেন আওয়ামী লীগের সদস্যরা। কারণ বাংলাদেশ সরকার স্বাধীনতার পর একাত্তরে তার নাগরিকত্ব বাতিল করেছে, যা তখনো বহাল করা হয়নি। অসুস্থ মাকে দেখার জন্য তিনি পাকিস্তানি পাসপোর্ট নিয়ে তিন মাসের ভিসায় ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশে এসেছেন। ভিসার মেয়াদ বহু আগেই শেষ হয়েছে। এখনো তিনি বাংলাদেশে অবস্থান করছেন ইত্যাদি প্রসঙ্গ নিয়ে বেশ বিতর্ক চলছিল। ওই সময় ইললামিক ডেমোক্রেটিক লীগের নামে জামায়াতে ইসলামীর ছয় জন সংসদ সদস্য ছিলেন এবং তাদের নেতা ছিলেন মাওলানা আবদুর রহিম। গোলাম আযমের বাংলাদেশে অবস্থান, বাংলাদেশের পাসপোর্টের জন্য তার আবেদন এসব প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এই পর্যায়ে আমাকে দায়িত্ব দেয়া হয় তার সাক্ষাৎকার গ্রহণের জন্য। আমার জন্য একটু গুরু দায়িত্ব ছিল। কারণ নিয়মিত সাংবাদিকতায় আমার তখন মাত্র তিন বছরের অভিজ্ঞতা। তখনো আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। পেশায় একেবারেই জুনিয়র। সিনিয়র কাউকে দায়িত্বটা দিলেই হয়তো ভালো হতো। আবার পেশাগতভাবে এগিয়ে যাওয়ার আগ্রহের কারণে হালকা ওজর-আপত্তি করে আমি গোলাম আযমের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করতে যাই। এর আগে আমি দু’বার গোলাম আযমকে দেখেছি। একবার ১৯৭০ সালে, এক জনসভায় ববক্তৃা করতে শেরপুর গিয়েছিলেন তখন, দ্বিতীয়বার তিনি ১৯৭৮ সালের আগস্ট মাসে যেদিন লণ্ডন থেকে ঢাকায় আসেন, সেদিন ঢাকার পুরনো বিমানবন্দরে। আমাকে সেদিনও দৈনিক সংগ্রামের পক্ষ থেকে এয়ারপোর্টে এসাইনমেন্ট দেয়া হয়েছিল। কিন্তু খবরটি প্রকাশ করার জন্য নয়। তার ঢাকায় আসার খবর সংগ্রামে প্রকাশ করা হয়নি।
যাহোক, তৃতীয় সাক্ষাতের ঘটনা ঘটে তার মগবাজার কাজী অফিস লেনের বাসায় সাক্ষাৎকার গ্রহণ উপলক্ষে। সৌজন্য কথাবার্তার পর প্রশ্ন করতে শুরু করি। প্রথমেই পাকিস্তানি পাসপোর্টে তার বাংলাদেশে এসে অবস্থানের প্রশ্ন, বিশেষত তার নাগরিকত্ব পুনর্বহাল না হওয়ায় তার অবস্থান যে অবৈধ, তবু তিনি কেন অবৈধভাবে বাংলাদেশে অবস্থান করছেন। তিনি সবসময় হেসে কথা বলেন। তার উত্তর ছিল, বাংলাদেশে তিনি তার ইচ্ছায় জন্মগ্রহণ করেননি। আল্লাহ একজন মানুষকে তার সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের মাটিতে জন্ম দিয়েছেন। এদেশ আগেও তার ছিল, এখনো তার। এ জন্মগ্ত অধিকার কেউ কেড়ে নিতে পারে না। তিনি তো অন্য কোথাও যেতে পারেন না। অন্য কোনো দেশ কেন তাকে গ্রহণ করবে। তিনি আরো জানান যে, একাত্তরে তিনি যখন তদানীন্তন পশ্চিম পাকিস্তানে যান তখন তার পাকিস্তানি পাসপোর্ট ছিল। সেই পাসপোর্টে তিনি যুক্তরাজ্যে গেছেন। সেখানে বাংলাদেশ হাই কমিশনে বাংলাদেশের পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেছেন। কিন্তু হাই কমিশন তাকে পাসপোর্ট দেয়নি এবং কোনোকিছু বলেনি। অতএব তিনি পাকিস্তানের পাসপোর্টে বাংলাদেশের ভিসা নিয়ে এসেছেন। একাত্তরে তার ও জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নের উত্তরে গোলাম আযম বলেছেন, আমাদের রাজনৈতিক অবস্থান ছিল অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষে। কারণ আমরা ভারতীয় আধিপত্য বিস্তারের আশঙ্কা করেছিলাম। কিন্তু পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কর্মকান্ডের প্রতিবাদ আমরা করেছি। পঁচিশে মার্চের অপারেশন সার্চলাইটে যে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, আমরা ওই সময়ের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ নূরুল আমিনের নেতৃত্বে গভর্নর ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক টিক্কা খানের সাথে সাক্ষাৎ করে প্রতিবাদ করেছি এবং তাকে বলেছি যে, বিদ্রোহ দমনের নামে হত্যাকাণ্ড চালালে জনগণ আপনাদেরকে সমর্থন করবে না এবং পাকিস্তানের বিরুদ্ধে চলে যাবে। রাজাকার, আল-বদর বাহিনী গঠন করায় তার ভূমিকা সম্পর্কে প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছেন, আমরা তো সরকারে ছিলাম না। কোনো বাহিনী গঠন করার ব্যাপারে ভূমিকা সম্পূর্ণ সরকারের। তারা গেজেট নোটিফিকেশন দিয়ে এসব বাহিনী গঠন করেছে, লোকজনকে রিক্রুট করেছে, ট্রেনিং দিয়েছে। আমাদের দলের পক্ষ থেকেও কাউকে এসব বাহিনীতে যোগ দেয়ার জন্য বলা হয়নি। যারা যোগ দিয়েছে তারা তাদের নিজ ইচ্ছায় গেছে।
ভাষা আন্দোলনের সূচনা মূলত ১৯৪৭ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে এবং তা চাঙ্গা হয়ে ওঠে ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে অনুষ্ঠিত বিশেষ কনভোকেশনে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে জিন্নাহর ভাষণের পর থেকে ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত। গোলাম আযম ১৯৪৮ সালে ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। এ সময়ে নভেম্বর মাসে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান পূর্ব পাকিস্তান সফরে এলে ২৭ নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাকে সংবর্ধনা দেয়া হয়। সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের পক্ষ থেকে তাকে একটি মানপত্র দেয়া হয়। মানপত্রে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্বশাসনের দাবীসহ অন্যান্য দাবীর সঙ্গে বাংলা ভাষা নিয়েও কিছু দাবি জানানো হয়। মানপত্রটির খসড়া তৈরি করেন আবদুর রহমান চৌধুরী, যিনি পরবর্তী সময়ে বিচারপতি হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। মানপত্র পাঠ করেন ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক গোলাম আযম। পদাধিকার বলে মানপত্র পাঠ করার কথা ছিল ডাকসুর সহ-সভাপতি অরবিন্দ বোসের। কিন্তু ভাষাসহ বিভিন্ন দাবীদাওয়া সম্বলিত মানপত্র একজন হিন্দু ছাত্রকে দিয়ে পাঠ করানোর ঘটনা এড়ানো হয় কৌশলগত কারণে। একথা গোলাম আযম নিজেও তার সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেছেন। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো যে মানপত্র নিয়ে এতো কথা সেই মানপত্রে ভাষা আন্দোলনের মূল সূর খুঁজে পাওয়া যায় না। বাংলাকে যেখানে ছাত্রসমাজ ও বুদ্ধিজীবীরা পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার দাবীতে সোচ্চার ছিলেন, প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানকে দেয়া মানপত্রে তাঁর কোনো প্রতিফলন ঘটেনি। সে কারণে বহুল আলোচিত সেই মানপত্রে ভাষা নিয়ে সংশ্লিষ্ট বক্তব্যটুকু তুলে ধরলে পাঠকরা উপলব্ধি করতে পারবেন। ওতে বলা হয়েছিল:
“We are happy to note that out Central Government, under your wise guidance, has given Bengali an honoured place. This is a step in the right direction which shall go a long way to further strengthen our cultural ties, with our brethren in West Pakistan. Interchange of thoughts and ideas and mutual understanding are essential if we have to develop a homogeneous and healthy national outlook. We have accepted Urdu as our Lingua Franca but we also feel very strongly that, Bengali by virtue of its being the official language of the premier province and also the language of the 62% of the population of the state should be given its rightful place as one of the state languages together with Urdu…” .
বাংলাকে ওই মানপত্রে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিই জানানো হয়নি! কেবল করা হয়েছিল প্রাদেশিক সরকারি কাজকর্মের ভাষা করার।
গোলাম আযম তার সাক্ষাৎকারে ভাষা আন্দোলনের দাবীতে গঠিত কমিটির সাথে কখনো তার সংশ্লিষ্টতা দাবী করেননি। ভাষার দাবী তুলে ধরার সূচনাকারী প্রতিষ্ঠান তমুদ্দুন মজলিশের সঙ্গে তার সম্পর্কে কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন যে ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক থাকাকালে রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে চকবাজারে লিফলেট বিতরণ করতে গিয়ে জনতার ক্ষোভের মুখে পড়েছিলেন। ভাষা আন্দোলনের নেতা কমরেড তোয়াহা এক সাক্ষাৎকার এ ঘটনার কথা উল্লেখ করে বলেছেন যে তিনিও একই সাথে লিফলেট বিতরণে অংশ নিয়েছিলেন। গোলাম আযম বলেছেন যে ১৯৫২ সালে তিনি যখন রংপুর কারমাইকেল কলেজে শিক্ষকতা করছিলেন তখন ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে তার সাবেক সংশ্লিষ্টতার কারণে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। ভাষা সৈনিক আবদুল মতিন কী বলেছেন তা আমি গুরুত্বপূর্ণ মনে করি না। কাউকে খাটো করে দেখানোর প্রবণতা কিছু মানুষের সহজাত। একজনকে দেখতে পারি না, অতএব তাকে ব্যঙ্গ বিদ্রূপ করতে হবে। বাংলাদেশের কোথাও কোনো প্রবীণ ও মোটামুটি শিক্ষিত লোক মারা গেলেও আপনি দেখতে পাবেন তার নামের সঙ্গে যে বিশেষণগুলো যোগ করা হয় তাতে প্রায় অনিবার্যভাবে ‘ভাষা সৈনিক’ শব্দ দুটি থাকে। এটি দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপার যে আপনি কাকে কী বলতে চান। কাকে আপনি ওপরে তুলতে চান, আর কাকে টেনে নিচে নামাতে চান।
গোলাম আযমের সবচেয়ে দীর্ঘ সাক্ষাৎকার গ্রহণ করি আমার সম্পাদনায় প্রকাশিত মাসিক নতুন ঢাকা ডাইজেস্টের জন্য। আমরা তখন বিশিষ্ট ব্যক্তিদের একটু ব্যতিক্রমী ধরনের সাক্ষাৎকার নিতে শুরু করেছিলাম। এই সিরিজে ইতোমধ্যে কবি আল মাহমুদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর মনিরুজ্জামান মিয়া, প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর আহমেদের সাক্ষাৎকার নিয়েছি এবং এগুলো বিপুল পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে। সাক্ষাৎকারগুলো আমরা নিতাম দলবদ্ধভাবে। বেশ ক’জন সাংবাদিক প্রশ্ন করতো, পুরো সময়ের জন্য একজন ফটোগ্রাফার থাকতো ছবি তোলার জন্য এবং সাক্ষাৎকার শেষে যার সাক্ষাৎকার নিয়েছি তাকে ভোজে আপ্যায়ন করা হত। এসময় আরো ক’জন বিশিষ্ট ব্যক্তিকেও আমন্ত্রণ জানাতাম। কাজী জাফরের ক্ষেত্রে এটি সম্ভব হয়নি, কারণ তখন তিনি প্রধানমন্ত্রী, গোলাম আযমের ক্ষেত্রেও সম্ভব হয়নি নিরাপত্তাজনিত কারণে। গোলাম আযমকে নিয়ে তখন দেশজুড়ে আরেক দফা তুলকালাম কাণ্ড চলছিল। ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ১৪০ আসনে জয়ী হয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। আওয়ামী লীগ জয়ী হয় ৮৮ আসনে, জাতীয় পার্টি ৩৫ ও জামায়াতে ইসলামী ১৮ আসনে জয়লাভ করে। এসময় আওয়ামী লীগ চেষ্টা করেছিল সরকার গঠন করতে জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন নিয়ে। কারণ জাতীয় পার্টি, অন্যান্য ছোট দল আওয়ামী লীগকে সমর্থন করবে। সেক্ষেত্রে জামায়াতের সমর্থন পেলে আওয়ামী লীগের সরকার গঠনে কোনো সমস্যা হতো না। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ জোর প্রচেষ্টা চালায় তাদের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরীর পক্ষে জামায়াত সংসদ সদস্যদের ভোট নিশ্চিত করার জন্য। বদরুল হায়দার চৌধুরী স্বয়ং গোলাম আযমের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তার দোয়া কামনা করেন। শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে তাকে উপহার পাঠানো হয়। কিন্তু আওয়ামী লীগের প্রচেষ্টা ফলপ্রসু হয়নি। জামায়াত সরকার গঠনে এবং বিএনপির প্রেসিডেন্ট প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাসকে সমর্থন করে। বিনিময়ে জামায়াত সরকারে অংশগ্রহণ করেনি। তবে দুটি সংরক্ষিত মহিলা আসন গ্রহণ করেছিল। স্বাভাবিকভাবে আওয়ামী লীগ জামায়াতের ওপর ক্ষুব্ধ হয়েছিল। অন্যদিকে জামায়াত আশা করেছিল, বিএনপিকে নি:শর্ত সমর্থন করলে তারা গোলাম আযমের নাগরিকত্ব পুনর্বহাল করবে। কিন্তু বিএনপি তা করেনি। বরং সরকার গোলাম আযমের বিরুদ্ধে ফরেনার্স অ্যাক্টে মামলা দায়ের করে এবং ১৯৯২ সালের ২৪ মার্চ তাকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠায়। দুইদিন পর ২৬ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গণআদালতে গোলাম আযমের বিচার করা হয়। এসব কারণে জামায়াত বিএনপির উপর ক্ষুব্ধ ছিল। প্রায় তিন বছর পর ১৯৯৪ সালে উচ্চ আদালত গোলাম আযমের নাগরিকত্ব পুনর্বহালের পক্ষে রায় দেয়। জামায়াত বিএনপি সরকারের কাছে যে আশা করেছিল তা পূরণ না হওয়ায় তারা বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির সাথে তাল মিলিয়ে যুগপৎ কেয়ারটেকার সরকারের আন্দোলন শুরু করে। সে আন্দোলন সফল হয় এবং ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। এ সম্পর্কে আমি আগের প্রশ্নের উত্তরে বিস্তারিত বলেছি।
ঘটনার পূর্বাপর বোঝার জন্য আমি কথাগুলো বললাম। আমরা গোলাম আযমের সাক্ষাৎকার নিয়েছি জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা গণআদালতে তার বিচার ইস্যুতে আন্দোলন চাঙ্গা হয়ে ওঠার পর এবং বিএনপি সরকার তাকে গ্রেফতারের আগে। সাক্ষাৎকারের দিনক্ষণ আমার সঠিক মনে নেই। তবে ১৯৯২ সালের শুরুতে এবং তিনি গ্রেফতার হওয়ার আগে। সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী টিমে আমি ছাড়াও ছিলেন বিশিষ্ট সাংবাদিক সালাহউদ্দিন বাবর, আজম মীর, ফখরুল আলম কাঞ্চন এবং ফটোগ্রাফার হিসেবে ছিলেন নবিউল হাসান। এ সাক্ষাৎকার ছিল দীর্ঘ। গোলাম আযমের রাজনৈতিক জীবনের পুরো ইতিহাস তুলে আনার চেষ্টা করেছি আমরা। ভাষা আন্দোলন, জামায়াতে ইসলামীতে তার যোগদান, একাত্তরে তার ও জামায়াতে ভূমিকা, ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশে ফিরে আসার পূর্ব পর্যন্ত বিদেশে বাংলাদেশ বিরোধী প্রচারণা করার অভিযোগ সব প্রশ্ন তুলি আমরা। তার সাক্ষাৎকার ঢাকা ডাইজেস্টে কভার ষ্টোরি করি এবং সংখ্যাটি এতো জনপ্রিয়তা লাভ করে যে আমাদেরকে দ্বিতীয় মুদ্রণ করতে হয়েছিল।
জহিরুলঃ এরশাদকে আমরা রাজনৈতিক নেতা মনে করি না, তিনি ছিলেন স্বৈরাচার। ক্ষমতা দখল করে রাজনীতিতে এসেছেন। জেল খাটার পরে রাজনীতিবিদ হয়ে ওঠার সুযোগ ছিল কিন্তু পুনরায় জেলে যাবার ভয়ে তিনি ক্রমাগত আপোষ করে গেছেন, যা বাংলাদেশের রাজনীতিতে ব্যাপক ক্ষতিসাধন করেছে। কেমন ছিল তার সাক্ষাৎকার গ্রহন?
মঞ্জুঃ সাবেক প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করি ২০০১ সালে, তিনি রাষ্ট্রপতি হিসেবে পদত্যাগ করার দশ বছর পর। আমি তখন সাময়িক বেকার ছিলাম। ২০০১ সালের মে মাসে দৈনিক বাংলার বাণী হঠাৎ করেই বন্ধ হয়ে যায়। কেউ ধারণা করেনি যে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে বাংলার বাণী বন্ধ হতে পারে। অতএব অন্য কোথাও আগে যোগ দেব এমন প্রস্তুতিও ছিল না। এসময় এশিয়া ডাইজেস্ট নামে একটি মাসিক ম্যাগাজিন প্রকাশের উদ্যোগ নেন বেলায়েত হোসেন নামে এক ব্যবসায়ী। তার সাথে আমার পরিচয় ছিল না। তার ছোটভাই কবি ইশারফ হোসেন ঢাকা ডাইজেস্টে লিখতেন। তিনি আমার সাথে যোগাযোগ করে এশিয়া ডাইজেস্টের দায়িত্ব নিতে বলেন। একটি মাসিক ম্যগাজিনে চাকুরি করার ইচ্ছা ছিল না। তাছাড়া ইতোমধ্যেই আমাকে এটিএন বাংলায় যোগ দিতে বলছিলেন বর্তমানে বাংলাদেশ প্রতিদিন সম্পাদক নঈম নিজাম। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থায় (বাসস) যোগ দেয়ার একটি সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে বলেও আভাস পেয়েছিলাম। ইশারফ তার ভাইয়ের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য নিয়ে যান। আমি আমার অবস্থা বলার পর দুই ভাই সম্মত হন যে, আমি কোথাও যোগ দেয়ার পূর্ব পর্যন্ত যাতে তাদের সাথে থাকি। নিশ্চিত হওয়ার পর আমি এশিয়া ডাইজেস্টের দায়িত্ব গ্রহণ করি। ঢাকা ডাইজেস্টের পূর্ব অভিজ্ঞতার কারণে এশিয়া ডাইজেস্টের কাজ কঠিন কিছু ছিল না। নিয়মিত বিষয়গুলোর বাইরে আমি সাক্ষাৎকারের ওপর জোর দেই। প্রতিটি সংখ্যায় খ্যাতিমান কারো সাক্ষাৎকার থাকতে হবে। কবি আল-মাহমুদের সাক্ষাৎকারও নিয়েছিলাম এশিয়া ডাইজেস্টের পক্ষ থেকে। কয়েক সংখ্যা পর এরশাদের সাক্ষাৎকার নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে জাতীয় পার্টির প্রচার সম্পাদক সুনীল শুভ রায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে এরশাদের সাক্ষাৎকার নেয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করি। পরদিন তিনি দিনক্ষণ ঠিক করে আমাকে জানান। তখন বিএনপি ক্ষমতায়। সংসদে জাতীয় পার্টির সদস্য সংখ্যা ছিল ১৪টি। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের অফিস বারিধারায়। যথাসময়ে আমি যাই। আমার সাথে ছিলেন কবি তৌফিক জহুর। একজন ফটোগ্রাফারও ছিলেন, যার নাম স্মরণ করতে পারছি না।
এরশাদ সম্পর্কে আপনার মতো আমারও নেতিবাচক ধারণা ছিল। কারণ ১৯৮২ সালের মার্চে ক্ষমতা দখলের বেশ আগে থেকেই তিনি এই প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছিলেন বিএনপির অভ্যন্তরীণ গোলযোগের সুযোগ নিয়ে। আমার মনে আছে ১৯৮১ সালের নভেম্বরের শেষ দিকে সেনাপ্রধান হিসেবে তিনি সম্পাদকদের তার অফিসে আমন্ত্রণ জানান, যা একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা ছিল। দেশে এমন কোনো পরিস্থিতির উদ্ভব হয়নি যে তিনি প্রটোকল ভেঙে সরাসরি সম্পাদকদের সঙ্গে কথা বলার আগ্রহ ব্যক্ত করবেন। সরকারের পক্ষ থেকেও এ ব্যাপারে কোনো বক্তব্য দেয়া হয়নি। কারণ তখন বিচারপতি সাত্তারের নেতৃত্বে সম্ভবত বাংলাদেশের সবচেয়ে দুর্বল সরকার দেশের শাসন ক্ষমতায় ছিল। আমরা অফিসে বসেই আঁচ করছিলাম এরশাদের উদ্দেশ্য শুভ নয়। কিন্তু আমাদের সম্পাদক আবুল আসাদ সেনা প্রধানের সাথে সম্পাদকদের বৈঠক থেকে বললেন যে এরশাদের ক্ষমতা দখলের কোন ইচ্ছা নেই। সেনা প্রধান হিসেবেই তিনি সন্তুষ্ট এবং তার রাজনৈতিক কোনো অভিলাষ নেই ইত্যাদি। তবে এরশাদের বক্তব্যের মধ্যে তাৎপর্যপূর্ণ যে কথাটি ছিল, তা হলো সরকারে সশস্ত্র বাহিনীর অবদান রাখার আবশ্যকীয়তা। যাহোক, এর চার মাস পর এরশাদ বিএনপি সরকারকে হটিয়ে ক্ষমতা দখল করেন। রাজনৈতিক তৎপরতা নিষিদ্ধ করেন। সংবাদপত্রের ওপর সেন্সরশিপ আরোপ করেন এবং দেশের সর্বত্র সামরিক আইন আদালত চালু করে সংক্ষিপ্ত বিচারে দুর্নীতিবাজদের বিচার শুরু করেন। বিস্তারিত আলোচনা অনাবশ্যক। রাজনীতি সচেতন সকলে কমবেশি এসব জানেন।
বিভিন্ন উপলক্ষে এরশাদের অনেক সভা, সাংবাদিক সম্মেলন কভার করেছি। তাকে কখনো কঠোর মনে হয়নি। ক্ষমতা দখলকারী যে কোনো সামরিক শাসকের প্রথম কাজ রাজনীতিকে কলুষিত করা। জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধেও এই অভিযোগ রয়েছে। জিয়াউর রহমান যেভাবে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল থেকে নেতাদের ছুটিয়ে এনে তার দল গঠন করেছিলেন, এরশাদও একইভাবে বিভিন্ন দলের নেতাদের জাতীয় পার্টিতে সমবেত করেছিলেন। তবে ব্যক্তিগত সততার কারণে জিয়াউর রহমান এখনো শ্রদ্ধাভাজন হয়ে আছেন, এরশাদ তার দুর্নীতি ও নৈতিক স্খলনজনিত কারণে নিন্দিত হয়েছেন। জিয়াউর রহমান আপোষ না করে মারা গেছেন, এরশাদ একের পর এক আপোষ করে রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে গেছেন। যাহোক, সেনাপ্রধান, রাষ্ট্রপতি ও সংসদ সদস্য হিসেবে তিনি বহু ধরনের অভিজ্ঞতার অধিকারী। তাকে প্রশ্ন করেছিলাম তিনি রাজনীতিতে আসবেন না বলে সম্পাদকদের আশ্বস্ত করার পরও কেন রাজনীতিতে এলেন। এসব পুরোনো কথা বলে তিনি এড়িয়ে যেতে চেষ্টা করলেও আমি তার উত্তর জানার জন্য মোটামুটি চেপে ধরি। তিনি মৃদু হাসেন। আমাকে নাছোড়বান্দা বলেন এবং আমার কাছেই জানতে চান যে একজন মন্ত্রীর বাড়িতে খুনীর অবস্থান করার ঘটনায় আপনার প্রতিক্রিয়া কী হতো। তিনি বলেন শুধু একজন খুনীর আশ্রয়ের বিষয় নয়, বিএনপি সরকার দেশকে যে পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল তাতে হস্তক্ষেপ না করলে দেশের আরো দুর্গতি হতো। বেসামরিক প্রশাসনের পক্ষে দেশ সামলানো অসম্ভব হয়ে পড়তো। মেরি সম্পর্কেও প্রশ্ন করেছিলাম। কিন্তু সে বিষয়ে তিনি মুখ খুলতেই রাজি হননি। নারীর প্রতি আসক্তির কারণে আমি তার জন্য আমার অনুবাদ করা খুশবন্ত সিংয়ে ‘দ্য কম্প্যানি অফ ওম্যান” উপন্যাসটি নিয়ে যাই। বইটির কভারে এক নগ্নিকার ছবি আছে। তিনি হাতে নিয়ে মুচকি হাসেন এবং বইটি টেবিলে উল্টে রাখেন। এছাড়া উনার সাথে রাজনৈতিক বিষয়েই কথা হয়েছে। তিনি কথা বলতে পছন্দ করেন এবং কথা বলার সময় উচ্ছসিতভাবে বলেছেন।
জহিরুলঃ কাজী জাফর আহমেদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন যখন তিনি প্রধানমন্ত্রী। কেমন ছিল একজন ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎকার গ্রহনের অভিজ্ঞতা?
মঞ্জুঃ কাজী জাফর আহমেদ প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগেও বিভিন্ন উপলক্ষে আমি বেশ ক’বার দেখা হয়েছে। সাথে আমার দীর্ঘদিনের পরিচয়। তার বাসায়, তার অফিসে সাক্ষাৎকার নিয়েছি। প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎকার নিতে হলে যেসব আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কক্ষ পর্যন্ত যেতে হয়, এর বাইরে তার সাথে আলাপচারিতায় নতুন কোনো অভিজ্ঞতা হয়নি। আমার ঘনিষ্ট রাজনীতিবিদদের মধ্যে একমাত্র তিনিই যেহেতু প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন, সেজন্য কিছু ভিন্নতা ছিল। আগে তিনি সরকারের বিরুদ্ধে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সরকারের পক্ষে বলেছেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমাকে সাক্ষাৎকার দেয়ার আগে তার সাথে সরাসরি সম্পর্কের কথা বলে নেয়া উচিত। কাজী জাফর আহমেদের সাথে আমার সরাসরি আলাপচারিতা ১৯৮৩ সালে শীতের এক সকালে। তখন জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসন চলছে। মগবাজার কাজী অফিস লেন এর শেষ প্রান্তে মসজিদের ঠিক উল্টো দিকের একটি একতলা বাড়ির ভাড়াটে তিনি। নানা কারণেই মগবাজার কাজী অফিস লেন বিখ্যাত। মসজিদ সংলগ্ন পূর্ব পাশের বাড়িটি খ্যাতিমান ইসলামী ব্যক্তিত্ব মাওলানা আলাউদ্দিন আল-আজহারীর, পশ্চিম পাশে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর অঘোষিত আমীর অধ্যাপক গোলাম আজমের, এরপর মগবাজার কাজী অফিস, এবং এর পাশেই পাকিস্তান আমলে মুসলিম লীগের তিনটি বৃহৎ গ্রুপের কোন একটির ভাইস প্রেসিডেন্ট একিউএম শফিকুল ইসলামের। বাংলাদেশের স্বাধীনতার অব্যবহিত পর একাত্তরে পাকিস্তানী বাহিনীকে সহযোগিতা করার অভিযোগে যাদের নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়েছিল তাদের মধ্যে অধ্যাপক গোলাম আজম ও শফিকুল ইসলাম ছিলেন। এসব সুপরিচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের বাড়ি ঘেঁষেই বিশাল জায়গা জুড়ে উঁচু প্রাচীরের উপর কাঁটাতার বেষ্টিত দুর্গ সদৃশ আমেরিকান দূতাবাসের ওয়্যারহাউজ। কাজী জাফর আহমেদ যে বাড়িটিতে থাকেন সেটির মালিকও কোন এক রাজনীতিবিদ, যার নাম এতোদিনে আমার মনে নেই। তার একটি বা দু’টি বাড়ি পর মুসলিম লীগ নেত্রী দ্বিতীয় জাতীয় সংসদের সদস্য রাজিয়া ফয়েজের। ১৯৭৯ সালের সংসদ নির্বাচনে মুসলিম লীগ সভাপতি খান এ সবুর তিনটি আসনে জয়ী হয়েছিলেন। দু’টি আসন ছেড়ে দেয়ার পর সাতক্ষীরার আসনটিতে উপনির্বাচনে তিনি নির্বাচিত হন। রাজিয়া ফয়েজের স্বামী আবুল ফয়েজ ছিলেন রাষ্ট্রায়ত্ব খাতের প্রতিষ্ঠান ইস্পাত ও প্রকৌশল সংস্থার চেয়ারম্যান। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউটে ইস্পাত ও প্রকৌশল সংস্থার এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি দেশের ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আবদুস সাত্তারের উপস্থিতিতে আবুল ফয়েজ তার বক্তব্য শেষ করেন ভুলবশত: “পাকিস্তান জিন্দাবাদ” উচ্চারণ করে। এর ফলে তার চাকুরি চলে যায় এবং রাজনৈতিক বিড়ম্বনার শিকার হন তিনি। আরো কিছু বিখ্যাত ব্যক্তির বসবাস ছিল ওই গলিতে।
কাজী জাফর আহমদের সাথে আমার সাক্ষাৎকারের দিনক্ষণ আগেই নির্ধারিত ছিল। তিনি বলেছিলেন সকালটাই তার জন্য সুবিধাজনক। রাজনৈতিক কর্মীরা তখন ভিড় করে না, সামরিক আইন থাকার কারণে প্রকাশ্য রাজনৈতিক তৎপরতার অনুপস্থিতিতে বাড়িতেই বেশির ভাগ সময় কাটান। তার সাথে নাশতাও করতে বলেছিলেন। কলিং বেল টিপতেই কাজী জাফর আহমেদ নিজেই দরজা খুললেন। যেহেতু আমার সাথে তার প্রথম সাক্ষাৎ তিনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আমার খোঁজখবর নিলেন। বাড়ি কোথায়, কোথায় কি পড়াশুনা করেছি. কতোদিন যাবত সাংবাদিকতা করছি ইত্যাদি। কেউ নাশতা দিয়ে গেল। খুবই সাধারণ খাবার। রুটি, সব্জি, মামলেট। নিজ হাতে খাবার তুলে দিলেন। খেতে খেতে নিজের কথা বললেন। তার শিক্ষাজীবন, পারিবারিক জীবন। ভালোই হলো। কারণ তার সাক্ষাৎকার নিতে এ বিষয়গুলো জানার প্রয়োজন পড়তো না আমার। আমার উপর দায়িত্ব পড়েছিল রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের নিকট থেকে জানা যে পাকিস্তান আমলে আইয়ুব ও ইয়াহিয়া খানের সামরিক আইন জারীর ফলে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হওয়ার অভিজ্ঞতার পরও স্বাধীন বাংলাদেশে অল্প সময়ের ব্যবধানে দু’বার সামরিক শাসন অনিবার্য হয়ে উঠলো কেন? একটি মাত্র মূল প্রশ্নের উত্তর পেতে আমি ইতোমধ্যে সিপিবি প্রধান কমরেড মনি সিং, জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত আমীর আব্বাস আলী খান, জাসদ সভাপতি মেজর (অব:) এমএ জলিল, ওয়ার্কাস পার্টির রাশেদ খান মেননের সাক্ষাৎকার নিয়েছি। বিষয়টির উপর কাজী জাফর আহমেদ রাজনীতিবিদ হিসেবে নয়, মনে হলো রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর বিশ্লেষণ তুলে ধরছেন। শিক্ষকের মতো স্থিরতায় তার পর্যবেক্ষণ আমি টুকে নিচ্ছি নিউজপ্রিন্টের প্যাডে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে দেশে দেশে সামরিক শাসনের পক্ষের প্রবক্তাদের অনেক যুক্তিই আমার জানা। কিন্তু কাজী জাফরের দেয়া সামরিক শাসনের বিপক্ষের যুক্তিগুলো অধিকতর শানিত। তবে তার চোখেমুখে হতাশার অভিব্যক্তি। তিনি বললেন, “কে জানতো শেখ মুজিবের মতো সংসদীয় গণতন্ত্রের ধ্বজাধারী দেশের প্রথম সংসদের মেয়াদকালেই সংসদীয় পদ্ধতির অসারতার ঘোষণা করে একদলীয় প্রেসিডেন্সিয়াল পদ্ধতি চালু করবেন, বাক, ব্যক্তি ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ করবেন। সামরিক শাসন কোনভাবেই কাম্য নয়। কিন্তু শেখ মুজিব সামরিক শাসনের চেয়েও কঠোর, বর্বর শাসন কায়েম করেছিলেন, যা থেকে দেশকে, গণতন্ত্রকে উদ্ধার করার কোন পথই রাজনীতিবিদদের কাছে খোলা ছিল না।” মাঝে মাঝে আমার কিছু সম্পুরক প্রশ্ন ছাড়া তার কথায় আমি খুব একটা বাঁধা দেইনি। ঘন্টা দু’য়েক আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার কথা শুনেছি। কাজী জাফর আহমেদ ছিলেন শিক্ষক, আমি তার গুণমুগ্ধ ছাত্র। বিদায় নেয়ার সময় তিনি কথা বলতে বলতে রাস্তা পর্যন্ত নেমে এলেন আমার সাথে, বললেন, লিখতে গিয়ে কোথাও সমস্যা মনে হলে আমাকে ফোন করবেন। কিন্তু সেই প্রয়োজন হয়নি।
শেখ মুজিব জীবিত থাকতেই আমি কাজী জাফর আহমেদের একটি দীর্ঘ বক্তৃতা শুনেছিলাম। ১৯৭৪ সালে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি মিলনায়তনে। অনুষ্ঠানটি কি উপলক্ষে আয়োজিত হয়েছিল মনে নেই। সেখানে তিনি ছিলেন একক বক্তা। আমি তখনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পুরনো হয়ে উঠিনি। মফস্বলের হাবভাব, বেশভূষা, কৌতুহল সবই বিদ্যমান। ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ দোর্দন্ড প্রতাপে। এপ্রিল মাসে মহসীন হলে সংঘটিত ‘সেভেন মার্ডার’ এর রেশ কাটলেও ছাত্রলীগের দাপট কমেনি। এ পরিস্থিতিতে কাজী জাফর আহমেদ টিএসসিতে আসছেন খবরটি আওয়ামী বিরোধী শিবিরে উচ্ছাসের সৃষ্টি করেছিল। আমিও তার বক্তৃতা শুনতে গেলাম। এর আগে আমি তাকে সামনাসামনি দেখিনি, বক্তৃতাও শুনিনি, শুধু সংবাদপত্রে তার বক্তব্য পড়েছি। তবে এটুকু জানতাম, তার কথায় টঙ্গি শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকরা ওঠে ও বসে। সূচনা বক্তব্যের পর কাজী জাফর আহমেদ উঠলেন এবং টানা দেড় ঘন্টা বক্তৃতা দিলেন। মাঝে মাঝে দর্শকশ্রোতাদের তুমুল করতালি টিএসসি মিলনায়তনের পিনপতন নীরবতা ভেঙ্গেছিল মাত্র। সম্ভবত এর আগে আমি ঢাকায় সরাসরি কোন জাতীয় নেতার বক্তৃতা শুনিনি। অতএব আমার উপর তার সেদিনের বক্তব্যের প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী ছিল।
কাজী জাফর আহমেদ তখন প্রধানমন্ত্রী। এরশাদের অধীনে মন্ত্রীত্ব গ্রহণের পর থেকেই তিনি বিভিন্ন মহলের সমালোচনার মধ্যে পড়েন এবং নিস্কলুষ রাজনৈতিক জীবন কাটিয়ে আসা কাজী জাফরের মন্ত্রণালয়ে সামান্য ত্রুটি ধরা পড়লেই সমালোচকরা উঠেপড়ে লাগতো তার পিছনে এবং চিনি আমদানি নিয়ে তার বিরুদ্ধে নানাভাবে বিষোদগার চলতে থাকে। পত্রপত্রিকাগুলো তার উপর নির্দয় হয়ে উঠে। তার বিরুদ্ধে নেতিবাচক সমালোচনা শুনে বা পাঠ করেও আমার মধ্যে তার সম্পর্কে হীন ধারণা পোষণ করিনি, অভিযোগ বিশ্বাসও করিনি। তিনি যখন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন তখন আমার সম্পাদনায় প্রকাশিত ম্যাগাজিন মাসিক ‘নতুন ঢাকা ডাইজেষ্ট’ এর পক্ষ থেকে একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেই। একটি মাসিক ম্যাগাজিনকে দেশের প্রধানমন্ত্রী সাক্ষাৎকার দেবেন এটা ধারণা করা একটু কঠিণ মনে হলেও, ঢাকা ডাইজেষ্টের জনপ্রিয়তার কারণে এটি সম্ভব করেছিল। দিনক্ষণ চূড়ান্ত হলো। তার ব্যস্ত সময়সূচির মাঝেও দুই ঘন্টা দিতে সম্মত হলেন। এ ব্যাপারে তার একান্ত সচিব ও তথ্য কর্মকর্তা আমাদেরকে যথেষ্ট সহযোগিতা করেছিলেন। মূল সাক্ষাৎকার নেবেন বিশিষ্ট সাংবাদিক সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর, আমি সাথে থাকবো এবং ফটোগ্রাফার হিসেবে থাকবেন নবিউল হাসান (মরহুম)। প্রধানমন্ত্রীর অফিস তখন গণভবনে। সিকিউরিটি চেকআপের আনুষ্ঠানিকতা সেরে তার অফিসে পৌছার পর একান্ত সচিবের রুমে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না। আমাদেরকে উদারভাবে স্বাগত জানালেন। রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারে প্রধানমন্ত্রীর কোন ক্ষমতা নেই বলে মনে করা হলেও বাস্তব অবস্থা ভিন্ন। প্রধানমন্ত্রী মানেই ব্যস্ততা, তিনি রাজনৈতিক প্রধানমন্ত্রী বলে ব্যস্ততা আরো বেশি। সময় নষ্ট না করে আমরা তার সাক্ষাৎকার রেকর্ড করতে শুরু করলাম। এক ঘন্টার মতো তিনি প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত উত্তর দিলেন । এরপর তার কথার বাঁধ ভেঙ্গে গেল। তিনি একা বলে যাচ্ছেন আবেগে। মনে হচ্ছিল, না বলা অনেক কথা বলে যাচ্ছেন। তার কথার মাঝখানে কোন প্রশ্ন করে আমরা তাকে বাঁধা দিতে চাইনি। এভাবে আরো প্রায় এক ঘন্টা পর একান্ত সচিব তার পাশে গিয়ে দাঁড়ালে তিনি থামলেন। তার পরবর্তী কর্মসূচির কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন। রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব তাকে অসহায় করে ফেলেছে বলে ব্যক্ত করলেন এবং বললেন, “আমার কথা শেষ হয়নি। কাল আবার আসুন, বাকি কথা কাল বলবো।” একান্ত সচিবকে বলে দিলেন আমাদেরকে সময় ঠিক করে দিতে। আমরা অত্যন্ত আনন্দিত। তিনি তো একদিনেই তার কথা শেষ করতে পারতেন। কিন্তু তিনি কথা বলতে চান, মানুষকে তার কথা, তার স্বপ্ন এবং স্বপ্ন বাস্তবায়নে কি করবেন তা জানাতে চান। পরদিন যথাসময়ে আমরা গেলাম। তিনি আমাদের অপেক্ষায় ছিলেন। তার না বলা কথাগুলো ধীরে ধীরে বলে গেলেন। আমরা একজন নিরহঙ্কারী জাতীয় নেতা, একজন প্রধানমন্ত্রীর কথা শুনছিলাম, তিনি মাটি ও মানুষকে ভালোবাসার কথা বলছিলেন।
জহিরুলঃ আপনি একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী মিজানুর রহমান চৌধুরীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন, কেমন ছিল সেই অভিজ্ঞতা?
মঞ্জুঃ আমি যখন মিজানুর রহমানের সাক্ষাৎকার নেই তখন তিনি আওয়ামী লীগের একাংশের সভাপতি। তার গুলশানের বাড়িতে সাক্ষাৎকার নেই। আমি যখন তার বাড়িতে যাই কোনো উপলক্ষে সেখানে তার দলীয় নেতাকর্মীদের ভিড় ছিল। তাকে প্রথম দেখেছিলাম তিনি যখন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচিত সরকারের তথ্যমন্ত্রী। এরপর নিয়মিত দেখা হতে থাকে দ্বিতীয় জাতীয় সংসদে। ওই সময় মূল আওয়ামী লীগের ৩৯ জন সদস্য সংসদে ছিলেন এবং মিজান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের সদস্য ছিলেন দু’জন। তিনি ছাড়া অপর একজন ছিলেন প্রফেসর মফিজুল ইসলাম। মিজান চৌধুরী হাসি-পরিহাসের মধ্য দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাগুলো বলে ফেলতেন। পার্লামেন্টারিয়ান হিসেবে তিনি অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন। তিনি উদারভাবে আমাকে স্বাগত জানান। নেতাকর্মীদের অপেক্ষা করতে বলে আমাকে ভেতরে নিয়ে যান। তাড়া দেন তার দলের জরুরী একটা বৈঠক আছে। সারা দেশ থেকে নেতারা এসেছেন। আমার উৎসাহে ভাটা পড়ে। অতএব জরুরী কিছু প্রশ্ন করার পর তার কাছ থেকে ছকবাঁধা রাজনৈতিক উত্তর পাই। মাত্র আধা ঘন্টা স্থায়ী ছিল এ সাক্ষাৎকার।
জহিরুলঃ দৈনিক বাংলার বাণীর বার্তা সম্পাদক থাকার সময় একজন শীর্ষ সন্ত্রাসী মুরগী মিলনের সাথে আপনার দেখা হয়। কি কথা বার্তা হয় তার সাথে? কেমন দেখলেন একজন শীর্ষ সন্ত্রাসীকে?
মঞ্জুঃ ২০০০ সালের মার্চ-এপ্রিলের ঘটনা। বাংলার বাণীতে নিউজ রুমে আমার টেবিলের পরই নির্বাহী সম্পাদক শফিকুল আজিজ মুকুলের রুম। যখন তখন তার রুমে যাই। একদিন রুমে ঢুকে দেখলাম টেলিফোনে কাকে ধমক দিচ্ছেন। মৃদু ধমকের সুরে বলছেন, কতোবার বলেছি এসব ছেড়ে দে। এখন কান্নাকাটি করে কী লাভ। কখনো সান্তনা দিচ্ছেন, ঠিক আছে আমি শেখ সেলিমকে বলবো। ফোন ছেড়ে বললেন, মিলন কথা বলছিল। পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। কাল আদালতে তুলবে। আদালত পর্যন্ত যাতে না নেয় সেজন্য শেখ সেলিমকে তদবির করতে বলছে। আমি জানতে চাই, কোন মিলন। তিনি বলেন, আরে বুঝলেন না। মুরগী মিলন। যুবলীগের নেতা। এভাবেই মুরগী মিলনের সাথে ঘনিষ্ট সম্পর্ক আছে এমন কারো কাছ থেকে তার কথা শুনলাম। মুরগী মিলনের নাম জানি ঢাকা নগরীর একজন শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে। কেউ যুবলীগ নেতা হিসেবে জানে না। আমিও জানতাম না। বাংলার বাণীতে তিনজন ক্রাইম রিপোর্টার ছিলেন- আবুল, খালেদ ও মাহমুদ। আস্তে আস্তে তাদের কাছেও মুরগী মিলন সম্পর্কে অনেক কথা জানতে পারি। তার নাম হুমায়ুন কবীর মিলন। হাতিরপুল বাজারে তাদের পারিবারিক মুরগির ব্যবসা ছিল এবং মিলন দীর্ঘদিন সেই ব্যবসা করতেন। পরবর্তীতে ‘মুরগী’ নামটি তার নামের সঙ্গে পাকাপোক্তভাবে জড়িয়ে যায়। এক পর্যায়ে তিনি যুবলীগের এলিফ্যান্ট রোড ও আশপাশের এলাকার নেতা হন। বিমানবন্দরে সোনা চোরাচালান তার প্রধান ব্যবসা হয়ে দাঁড়ায়। এছাড়াও জুতার দোকানসহ অন্যান্য ব্যবসা ছিল তার। তার প্রতিপক্ষও ছিল, যারা তার মতোই সন্ত্রাসী। ২০০২ সালের জুলাই-আগস্ট মাসের এক রাতে তিন ক্রাইম রিপোর্টারকে কয়েকজন অচেনা লোকের সাথে কথা বলতে দেখলাম। চিফ ক্রাইম রিপোর্টার আবুল হোসেন আমার কাছে এসে বললেন, মিলন ভাই আপনার সাথে একটু কথা বললেন। কোন মিলন জানতে চাইলে তিনি ঝুঁকে নিচু কণ্ঠে বলেন, মুরগী মিলন।
অবাক হলাম, মুরগী মিলন আমার সাথে কী কথা বলতে চায়? ক’মাস আগেই পুলিশ ধরেছিল, কবে ছাড়া পেল। মুরগী মিলন টেবিলের কাছে এসে হাত বাড়িয়ে দিলেন। ভীতি উদ্রেক করার মতো চেহারা নয়। মুখজুড়ে গুটি বসন্তের দাগ। আমি হাত মিলিয়ে বসতে বললাম। তিনি বসে বললেন, বাংলার বাণীতেও যদি আমাকে ‘মুরগী মিলন’ নাম দিয়ে আমার বিরুদ্ধে লেখে, তাহলে আমি যাই কোথায়? আবুলরা বললো, ওরা কিছু জানে না। নিউজ এডিটর জানবেন। আমি তো দেখতে পাচ্ছি, আপনি আমাকে চেনেন না, জানেন না, আপনার তো জানার কথা নয়। ওরাই কেউ করেছে, এখন আপনার ওপর দোষ চাপাচ্ছে। তিনি আরো বলেন, আপনি কিছু মনে না করলে আপনাদের জন্য কিছু খাবার আনার ব্যবস্থা করি। আমি মানা করলাম, এটা হতে পারে না। আপনি আমাদের অফিসে এসেছেন, বসুন, আমি শুধু চা খাওয়াতে পারবো। চায়ের জন্য পিয়ন নজরুলকে ডাকলাম। তিনি আপত্তি করলেন। ওঠে হাত বাড়ালেন এবং হাত মিলিয়ে চলে গেলেন। তার সাথে আমাদের তিন ক্রাইম রিপোর্টারও গেলেন। আধঘন্টা পর দেখলাম ক্রাইম রিপোর্টাররা প্রচুর খাবার এনেছে। বললেন, মিলন ভাই জোর করে গছিয়ে দিলেন। তাদেরকে বললাম, আমি খাবো না। যারা খেতে চায় তাদের দিন। এ ঘটনার দেড়-দু’মাস পর খবর এলো আদালতে হাজিরা দিতে গিয়ে ফেরার সময় প্রতিপক্ষের গুলিতে মুরগী মিলন নিহত হয়েছে। মুরগি মিলন আদালত থেকে বের হওয়ার পর প্রথমে ককটেল বিস্ফোরিত হয়। মুরগী মিলন নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য দৌড়াতে থাকেন। জানা গেছে যে বেশ ক’টি আগ্নেয়াস্ত্র থেকে একযোগে তার ওপর গুলি নিক্ষেপ করা হয়। মোট ১৪টি গুলি লেগেছিল তার শরীরে এবং ঘটনাস্থলেই তিনি নিহত হন। সন্ত্রাসীরা এভাবেই মারা যায়। প্রতিপক্ষের হাতে অথবা পুলিশের এনকাউন্টারে। ভারতের এক পুলিশ অফিসারের বক্তব্য মনে পড়লো, যিনি বলেছিলেন, কোনো সন্ত্রাসী বা দস্যু তাদের জীবনের পঞ্চাশ বছরে পৌঁছাতে পারে না। মুরগী মিলনের বয়স চল্লিশ পেরিয়েছিল। আবুল, খালেদ ও মাহমুদ আফসোস করলো, এলিফ্যান্ট রোডে গেলে তাদেরকে কেউ আর ফ্রি জুতা-স্যাণ্ডেল দেবে না।
জহিরুলঃ সাংবাদিকতা জীবনে আপনি সংসদ কভার করেছেন, কেমন ছিল সেই অভিজ্ঞতা? কখনো কি মনে হয়েছে অন্য দায়িত্ব পেলে ভালো হতো? একজন ভালো সাংবাদিকের কি কি কমিটমেন্টের কথা মাথায় রাখতে হয়?
মঞ্জুঃ ছোট সংবাদপত্রে কাজ করার একটা সুবিধা হচ্ছে বড় দায়িত্ব পাওয়া যায়। আমার ক্ষেত্রেও সেটি হয়েছিল। আমি জাতীয় সংসদ অধিবেশন কভার করতে শুরু করি ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশের দ্বিতীয় সংসদ কভার করার মধ্য দিয়ে। তখনো আমার ছাত্রজীবন শেষ হয়নি। তবুও রিপোর্টার সংকটের কারণে আমাকে এসাইন করা হয় সংসদে। আমার সাথে আরেকজন সহকর্মী ছিলেন সালাহউদ্দিন বাবর। দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে। নির্বাচনও কভার করেছি। কিন্তু সংসদ অধিবেশন কভার করা সহজ কাজ নয়। রিপোটিংয়ের মধ্য সবচেয়ে টেকনিক্যাল সাংবাদিকতা। সংবিধান, কার্যপ্রণালী বিধি, আইন জানতে হয়। সংসদীয় রীতিনীতি সম্পর্কে ধারণা থাকতে হয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের পার্লামেন্টের কার্যপ্রণালী ও আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া সম্পর্কিত তুলনামূলক আলোচনা পড়তে হয়েছে। কিন্তু পুথিগত বিদ্যা ও বাস্তবের মধ্যে অনেক ফারাক। আমাদের সিনিয়র সাংবাদিক, যারা তখন সংসদ কভার করতেন, দৈনিক বাংলার ফজলুল করিম, দৈনিক বার্তার সলিমুল্লাহ ভাই, টাইমসের নাফা ভাইসহ সকলে সহায়তা করেছেন, যাতে কোনোকিছু ভুল না করি। সংসদ রিপোটিংয়ে ভুল করার খেসারত চরম। দ্বিতীয় জাতীয় সংসদে ঝানু পার্লামেন্টারিয়ানরা ছিলেন। শাহ আজিজ ছিলেন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা। বিরোধী দলের নেতা ছিলেন আওয়ামী লীগের আসাদুজ্জামান খান। খান এ সবুর, আতাউর রহমান খান, মিজানুর রহমান চৌধুরী, অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ, মহীউদ্দিন আহমেদ, সুধাংশু শেখর হালদার, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, রাশেদ খান মেনন, কমরেড তোয়াহা, মাওলানা আবদুর রহিম, এমএ মতিনসহ আরো অনেক রাজনীতিবিদ এ সংসদ অলঙ্কৃত করেছেন। পার্লামেন্ট কভার করার অভিজ্ঞতা যে কোনো সাংবাদিককে তার পেশাজীবনকে সমৃদ্ধ করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যারা দেশ পরিচালনা করে, যারা আইন প্রণয়ন করে তাদের সাথে ঘনিষ্ট হওয়ার জন্য এর চেয়ে বড় সুযোগ আর নেই। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আপনি কোনো প্রটোকল মেইনটেন না করেও কথা বলতে পারেন। যে কোনো জটিল ইস্যুতে সরকারি দল ও বিরোধী দলীয় নেতৃবৃন্দ সহজে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেন। সাংবাদিকরা তাদের খুব কাছের হয়ে যান। এখন সংসদ অনুষ্ঠান টেলিভিশনে সরাসরি দেখালেও যখন দেখানো হতো না তখন সংবাদপত্রের রিপোর্টারের উপর নির্ভর করা ছাড়া তাদের উপায় ছিল না। সাংবাদিকরা ছাড়া সংসদে তারা যে কথা বলেন তা তাদের এলাকাবাসীর কাছে পৌছার সুযোগ ছিল না। সংসদ কভার করা রিপোর্টারদের মন্ত্রীদের কাছে বলতে গেলে অবাধ প্রবেশাধিকার কাছে। এমনকি কারো যদি কোনো ব্যক্তিগত কাজ, এলাকার কোনো সমস্যা থাকে লালফিতার জটিলতায় না পড়ে তা সহজে করিয়ে নেয়া যায়। অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার পূর্ণ করার জন্য সংসদ এক অপূর্ব স্থান।
তবে সংসদ রিপোটিংয়ে সতর্ক না থাকলে আপনাকে চরম বিপদে পড়তে হয়, সে অভিজ্ঞতাও হয়েছে আমার। একটু বিস্তারিতভাবেই সে বিপদের কথা উল্লেখ করতে চাই। পার্লামেন্টের ‘ইন-ক্যামেরা সেশন’ এর সরল অর্থ হলো, “যে বৈঠকে পার্লামেন্ট বা পার্লামেন্টারি কোন বহিরাগত, এমনকি গণমাধ্যমেরও প্রবেশাধিকার নেই, এবং যে বৈঠকের কোন বিষয়বস্তু কোনভাবেই প্রচার করা যাবে না। বৈঠকের কার্যক্রমের কোন অংশ কারও দ্বারা বাইরে প্রকাশ পেলে স্পিকার বিশ্বাস ভঙ্গের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারবেন।” এই উদ্ধৃতি অথবা ‘ইন-ক্যামেরা সেশন’ এর সংজ্ঞাটি উল্লেখ করতে হলো পার্লামেন্ট রিপোটিং করতে গিয়ে প্রায় চার দশক আগে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে আমার সমূহ বিপদে পড়ার ঘটনায়। বাংলাদেশে পার্লামেন্টারি গণতন্ত্রের অভিজ্ঞতা যেমন সূখকর নয়, আমার সংসদ সূচনাও তেমন প্রীতিকর ছিল না। স্বাধীনতার পর প্রথম থেকে ষষ্ঠ জাতীয় সংসদের কোনটিই পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেনি। কোন না কোন কারণে সংসদ ভেঙ্গে দিতে হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে কম মেয়াদ ছিল ষষ্ঠ সংসদের। মাত্র ১২দিন। সংসদ কভার করতে গিয়ে অনভিজ্ঞতাজনিত অসতর্কতার কারণে উদ্ভুত পরিস্থিতি স্মরণ করাই আমার উদ্দেশ্য। সে পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠে কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া দ্বিতীয় পার্লামেন্ট থেকে শুরু করে নবম সংসদ পর্যন্ত টানা পার্লামেন্ট কভার করেছি। পার্লামেন্ট রিপোটিং এ আর কখনো ভুল করিনি বা অসতর্ক হইনি, বরং নবীশ পার্লামেন্ট রিপোর্টারদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিতে পেরেছি।
আমি আগেও বলেছি যে আমার নিয়মিত সাংবাদিকতা শুরু ১৯৭৭ সাল থেকে। তখন ঢাকায় দৈনিকের সংখ্যা ছিল হাতে গোনা। শুরু করেছিলাম দৈনিক সংগ্রামের বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার হিসেবে। আমার সাংবাদিকতার বয়স হয়েছে মাত্র দুই বছর। সালাহউদ্দিন বাবর এবং আমার উপর দায়িত্ব দেয়া হয়েছে সংসদের যাবতীয় বিষয় আমাদের দু’জনকে কভার করার। এপ্রিলের মাঝামাঝি সময় থেকে পার্লামেন্ট ভবনে (বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর দফতর) যাতায়াত শুরু করি। কিছুটা ভয়ে, কিছুটা উত্তেজনায়। আমাদেরকে ধরিয়ে দেয়া হয় জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি। খুটিয়ে খুটিয়ে পড়ি। যারা আগে জাতীয় সংসদ কভার করেছেন সেইসব বড় ভাই রিপোর্টারদের প্রশ্ন করে নিয়মকানুন জেনে নেই।
কিন্তু হঠাৎ করেই একটি ঘটনা ঘটলো। দিন তারিখ খেয়াল নেই। সংসদ বৈঠকের বিরতির সময় লবিতে চরম হট্টগোল। আমরা ক্যাফেটেরিয়ায় ছিলাম। দৌড়ে লবিতে এলাম। জানা গেল, বিএনপির তরুণ এক এমপি রুহুল আমিন হাওলাদার মুসলিম লীগের সংসদ সদস্য কাজী কাদেরের গালে কষে চড় মেরেছেন। ঘটনার আকস্মিকতায় বিএনপির সিনিয়র এমপি’রা বিরোধী দলীয় নেতাদের সামলাতে চেষ্টা করছেন। বিরোধী দলের সদস্য সংখ্যা কম থাকলেও প্রায় সকলেই জাদরেল নেতা। প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শাহ আজিজ, উপ সংসদ নেতা ডা: বদরুদ্দোজা চৌধুরীসহ মন্ত্রীরা সাধ্যমত কলহ থামাতে চেষ্টা করছেন। কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। পুরো অচলাবস্থা। আমরা উৎকন্ঠার সাথে অপেক্ষা করছি, শেষ পর্যন্ত কি হয় তা দেখার জন্য। শাহ আজিজ কোনমতে বিরোধী দলের নেতাদের তার রুমে নিয়ে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করলেন। আধা ঘন্টা বা পৌনে এক ঘন্টা পর তারা গেলেন স্পিকার মির্জা গোলাম হাফিজের রুমে। সাংবাদিক গ্যালারির ফোন থেকে অফিসে জানিয়ে দিয়েছি কলহের ঘটনা। আমাদেরও উৎকন্ঠা বাড়ছে। সংসদের ক্যাফেটেরিয়া থেকে সিঙ্গারা ছাড়া সারাদিন আর খাওয়া হয়নি। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত বেড়ে চলেছে। রাত দশটার পর আমাদেরকে জানানো হলো, সংসদ ক্যামেরা সেশনে বসবে। ক্যামেরা সেশন কি, তাও জানতাম না তখন। সিনিয়ররা ব্যাখ্যা করলেন, অধিবেশন চলাকালে সংসদ সদস্যরা ছাড়া আর কেউ এসেম্বলি চেম্বারে থাকতে পারবে না। কৌতুহলী হয়ে আমরা কয়েকজন রিপোর্টার তড়িঘড়ি সাংবাদিক গ্যালারিতে গিয়ে বসলাম। দেখি শেষ পর্যন্ত কি হয়। যখন ঘন্টা বাজতে শুরু করলো তখন সিকিউরিটির লোকজন এসে আমাদেরকে বের করে নিয়ে গেল। বলে দেয়া হলো আমরা এমনকি লবিতেও থাকতে পারবো না। অনন্যোপায় হয়ে আমরা কখনো ক্যাফেটরিয়ায়, কখনো সামনের লনে ঘোরাফেরা করে সময় কাটাচ্ছিলাম। রাত বেড়ে চলেছে। অফিস বংশালে, আমি থাকি সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে। তখনকার সংবাদপত্রে মধ্যরাতের পরও রিপোর্ট দেয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু কখন শেষ হবে এই ক্যামেরা সেশন। সংসদ ক্যামেরা সেশনে বসার পূর্ব পর্যন্ত কি ঘটেছে তা ফাঁকে ফাঁকে লিখে ফেলেছিলাম। কাজী কাদেরকে চড় মারার ঘটনার পুরো বিবরণ ছিল এতে। রাত ১টা বাজার পর আমি ও বাবর ভাই সিদ্ধান্ত নিলাম, আর নয়, যতোটুকু লিখেছি, সেটাই অফিসে পাঠাব। বাবর ভাই এর বাসা গেন্ডারিয়ায়। তিনি অফিসে রিপোর্ট দিয়ে চলে যাবেন।
সকালে সাধারণত অফিসে যাওয়া হয়না। কিন্তু রাতে সংসদে কি ঘটলো তা জানার আগ্রহে সকালে অফিসে গিয়েই শুনলাম, সংসদের জনসংযোগ বিভাগের পরিচালক জনাব মুহাম্মদ উল্লাহ আমাকে তলব করেছেন। আমার অপরাধ, সংসদের ‘ক্যামেরা সেশন’ এর কারণ এবং আনুষঙ্গিক ঘটনা, যা প্রকাশ আইনত নিষিদ্ধ, তা সবিস্তারে প্রকাশিত হয়েছে, যা অন্য কোন সংবাদপত্র প্রকাশ করেনি। সংগ্রামের সম্পাদকসহ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষও উদ্বিগ্ন যে, সংসদ শুধু আমার বিরুদ্ধেই নয়, সংবাদপত্রের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে তাদের পরিচিত সিনিয়র সংসদ সদস্য, আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলেছেন। সবার পরামর্শ, নিস্কৃতির উপায় একটাই, নি:শর্ত ক্ষমা প্রার্থনা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের রিপোর্টিং না করার মুচলেকা দেয়া। তথ্য অধিদফতরের উপ প্রধান তথ্য অফিসার দেওয়ান সাহেব রাজশাহীর লোক বলে সম্পাদকের পরিচিত, আমাদের সাথেও বেশ ঘনিষ্ট। ওই সময়ে তিনি সংসদের জনসংযোগ বিভাগের উপপরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছিলেন। তিনি বলেছেন, আমি সংসদে গিয়েই যাতে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। কি করতে হবে সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করবেন তিনি। কম্পিত বক্ষে দেওয়ান সাহেবের অফিসে গেলাম। সাথে বাবর ভাইও আছেন। তিনি নিয়ে গেলেন জনসংযোগ বিভাগের পরিচালক মুহাম্মদ উল্লাহ’র অফিসে এবং বললেন, “আসামী হাজির।” একবার চোখ উঠিয়ে আমাকে দেখে আবার ফাইলে মনোযোগ দিলেন। ফাইল শেষ করে আমার দিকে ফিরে বললেন, “তুমি তো সর্বনাশ করেছো। নিজের বিপদ ডেকে এনেছো, আর আমাদের জন্যও ঝামেলা বাঁধিয়েছো। সকালে সংবাদটি দেখার পর থেকেই স্পিকার সাহেব ক্ষেপে আছেন।” তিনি কাগজ এগিয়ে দিলেন। কি লিখতে হবে তা একটি একটি করে লাইন বললেন। আমি লিখছি, আর ঘামছি। লেখা শেষে তিনি পড়লেন, কাটাকুটি করলেন। এভাবে কয়েকটি মুচলেকার খসড়া লেখার পর একটি চূড়ান্ত হলো। টাইপিষ্টকে বললেন টাইপ করতে। টাইপ করার পর আমি স্বাক্ষর করলাম। মুহাম্মদ উল্লাহ সাহেব আমাকে নিয়ে গেলেন জাতীয় সংসদের সচিব জালাল উদ্দিনের অফিস রুমে। জালাল উদ্দিন অত্যন্ত সজ্জন লোক। মুহাম্মদ উল্লাহ আমার পরিচয় জানালেন তাকে এবং তার হাতে আমার মুচলেকাপত্রটি তুলে দিলেন। তিনি সেটিতে চোখ বুলিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন, ‘ইয়ং ম্যান, পার্লামেন্ট রিপোর্টিং করতে হলে ম্যাচিউরড হতে হবে।’ স্পিকারের অসীম ক্ষমতা। আপনার কাগজে যা ছাপা হয়েছে, তার উপর তিনি যদি কোন রুলিং দেন, তাহলে সেই রুলিং তিনি প্রত্যাহার না পর্যন্ত সেটিই বহাল থাকবে।’ তিনি আশ্বস্ত করলেন, স্পিকারকে তিনি আমার মুচলেকা পত্রটি দেবেন এবং পরদিন যেন আমি তার অফিসে গিয়ে সিদ্ধান্ত জেনে নেই।
আমার দিন কাটে না। সেদিন সংসদ কভার করলেও মন বসাতে পারিনি। গ্যালারিতে দেওয়ান সাহেব দু’একবার এসে পিঠ চাপড়ে গেছেন, “ডোন্ট ওরি।” পরদিন আবার গেলাম মোহাম্মদ উল্লাহ সাহেবের অফিসে। তিনি নিয়ে গেলেন সচিব জালাল উদ্দিনের অফিসে। তিনি বললেন যে, স্পিকার মহোদয় আমার নি:শর্ত ক্ষমা প্রার্থনা মঞ্জুর করেছেন এবং ভবিষ্যতে সতর্কতার সাথে যাতে রিপোর্টিং করি, সেজন্য আপনাকে বলতে বলেছেন। যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়লো। এমন একটি শিক্ষার পর শুধু পার্লামেন্ট রিপোর্টিং নয়, যে কোন রিপোর্টিং এর ক্ষেত্রে ‘চেক,’ ‘রি-চেক’, ‘ডাবল চেক’ শব্দগুলো মাথায় রেখে কাজ করেছি। সম্ভবত রিপোর্টিং এ গুরুতর কোন ভুলও আর করিনি।
জহিরুলঃ কখনো কি মালিক পক্ষের চাপে নীতির সাথে আপোষ করেছেন? আপোষ করা বা না করার দুয়েকটি অভিজ্ঞতার কথা বলুন।
মঞ্জুঃ সংবাদপত্রে নীতির বিষয়টি দেখেন সম্পাদক। সংবাদপত্রের নীতির সাথে আমার ব্যক্তিগত নীতির কোনো সম্পর্ক নেই। সংবাদপত্রের মালিকদের নীতি সম্পাদকের মাধ্যমে অনুসরণ করা অন্য সকলের দায়িত্ব। তবে ব্যক্তিগত ও পেশাগত বিরোধের মোকাবিলা অবশ্যই করতে হয়েছে এবং সেক্ষেত্রে আমি কখনোই আপোষ করিনি। এ কারণে দৈনিক সংগ্রামেই আমাকে বেশি দুর্ভোগ পোাহাতে হয়েছে। ১৯৯২ সালে মালিকপক্ষের ইচ্ছায় আমি সংগ্রামের বার্তা সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করি। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে সম্পাদক আমাকে এই পদে পছন্দ করতে পারেননি। আমার দায়িত্ব পালনকালে তিনি কোনো সহযোগিতা করেননি, বরং পদে পদে আমাকে বাধাগ্রস্থ করেছেন। আমি দায়িত্বটি এড়ানোর চেষ্টা করছিলাম এবং কোনো প্রোগ্রামের অজুহাতে দেশের বাইরে যাওয়ার চেষ্টা চাালিয়ে যাচ্ছিলাম। কমনওয়েলথ টেকনিক্যাল অ্যাসিষ্ট্যান্সের আওতায় দিল্লিতে ভারতীয় পার্লামেন্টের সাথে সংশ্লিষ্ট ইন্সটিটিউট অফ কন্সটিটিউশনাল এণ্ড পার্লামেন্টারি স্টাডিজ এ ছয় মাসের একটি ফেলোশিপ করার সুযোগ পেয়ে ১৯৯২ সালের নভেম্বর মাসে আমি ভারতে চলে যাই। সেখানে অবস্থানের ওপর আমি কমবেশি আগেই বলেছি। আমি ফেলোশিপ শেষে ফিরে আসার পর দেখতে পাই কর্মস্থলে আমার জন্য এক বৈরী পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন সম্পাদক সাহেব। আমাকে বার্তা সম্পাদকের দায়িত্বে ফিরে যাওয়ার পরিবর্তে সম্পাদকীয় বিভাগে যোগ দিতে বলা হয়। আমার ইগোতে লাগে। আমি অনড় অবস্থান গ্রহণ করি। আমি তো বার্তা সম্পাদকের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেয়ার উদ্দেশ্যেই ভারতে গিয়েছিলাম। কিন্তু অব্যাহতি বিধিসম্মতভাবে হতে হবে। মালিক পক্ষ আইনি বৈধতা উপলব্ধি করে আমাকে বার্তা সম্পাদক পদে বহাল করে। আমি ৭ দিন দায়িত্ব পালন করে পদত্যাগ করি এবং পূর্ব পদ বিশেষ সংবাদদাতা পদে ফিরে যাই। কিন্তু সম্পাদকের বৈরী আচরণের কারণে পরবর্তী প্রায় চার বছর আমার কোনো একটি রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়নি। অফিসে গেছি, মাস শেষে বেতন পেয়েছি। আমার জন্য পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক ছিল। কিন্তু আমি অপেক্ষা করছিলাম, এই ভালো মানুষগুলো কতদূর পর্যন্ত যেতে পারে তা দেখার জন্য। বলতে পারেন সুনীলের কবিতায় ‘কারো ভেতরের কুকুর দেখার জন্য’ আমি অপেক্ষা করছিলাম। আমার কুকুর দেখা হয়। ১৯৯৬ সালের অক্টোবর মাসে আমাকে চাকুরি থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। দ্বিতীয় একটি ঘটনা ঘটেছিল দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকায় বার্তা সম্পাদকের দায়িত্ব পালনকালে। ওই সময় পত্রিকাটির চট্টগ্রাম ব্যুরো চিফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন কবি শামসুদ্দিন হারুন। রিপোর্টার হিসেবে নির্ভরযোগ্য ও সজ্জন। একবার তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর একটি রিপোর্ট করেন। আপত্তিকর কিছু ছিল না রিপোর্টে। কেউ মালিক সম্পাদক জাকারিয়া খানকে রিপোর্টের দোষনীয় দিক বের করে দেখান। জাকারিয়া খান সাংবাদিক নন। কানকথা শুনতে পছন্দ করেন। তিনি সাত-পাঁচ না ভেবে আমাকে একটি কারণ দর্শাও নোটিশ দেন। আমি সাথে সাথে পদত্যাগপত্র লিখে জেনারেল ম্যানেজারের হাতে দিয়ে চলে আসি।

Comments
Post a Comment