Skip to main content

মেয়েটি পৃথিবী কাঁদিয়েছে

ফুলের মতো শিশুরা

কাজী জহিরুল ইসলাম  



রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করামৌলিক চাহিদাগুলো মেটানো এবং রাষ্ট্রটি যদি গণতান্ত্রিক হয় তাহলে নাগরিকদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের একটি পবিত্র দায়িত্ব। যদি আর্থিক সামর্থ বেশি থাকে তাহলে রাষ্ট্র তার নাগরিকদের জন্য এর চেয়েও বেশি কিছু করেযেমন বিনামূল্যে উন্নত চিকিৎসাবিনামূল্যে উচ্চতর শিক্ষাবিবাহভাতাবৃদ্ধভাতাতথ্য-প্রযুক্তির এক্সেসউন্নত মানের বর্জ্র ব্যবস্থাপনাবিনোদন ও খেলাধুলার ব্যবস্থা করাআরো কত কী। রাষ্ট্র যেহেতু কিছু মানুষের দ্বারা পরিচালিত হয়কখনো কখনো কিছু ত্রুটি বিচ্যুতি হতেই পারে। তখন রাষ্ট্রের নাগরিকেরা তাদের জনপ্রতিনিধির মাধ্যমে তা রাষ্ট্র পরিচালনাকারিদের নজরে আনেন। এতে কাজ না হলে নাগরিকেরা রাজপথে নেমে আন্দোলন - সংগ্রাম করেন।

রাষ্ট্রের যে সীমানা এটি একটি কৃত্রিম বিষয়। রাষ্ট্রনায়কেরা কী চাইলেই সব কিছু রাষ্ট্রসীমার মধ্যে সীমিত রাখতে পারবেনবাতাসপাখিমেঘনদীমাছ এই কৃত্রিম সীমানা মানে না। মানে না বলেই তারা ছুটে বেড়ায় এক দেশ থেকে অন্য দেশে। আর তখনই সমস্যাটা তৈরি হয়। পাখিরাবাতাসেরা যদি জটিল রোগ বালাই নিয়ে অন্য দেশে যায়অন্য দেশের মানুষকে অসুস্থ করে তোলেপারবেন কী রাষ্ট্র পরিচালনাকারীরা তা নিয়ন্ত্রণ করতেপারবেন না। তাই রাষ্ট্রের নাগরিক হবার পাশাপাশি আমাদের বিশ্বনাগরিকও হতে হয়। আমার দেশের রাষ্ট্রনীতি যদি অন্য দেশের জন্যএই পৃথিবীর জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়তাহলে একজন বিশ্বনাগরিক হিসেবে এটা আমার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে নিজ দেশের সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা। জলবায়ু দুষণের ফলে শ্রীলঙ্কার একদল মানুষ মারা গেলে আমি কী চুপ করে বসে থাকববাংলাদেশে এতো এতো মৌলিক সমস্যাকোন দেশের কে মরলোকেন সুনামী হলোকী করলে এ জাতীয় দুর্যোগ থেকে পৃথিবীকে বাঁচানো যায় এ নিয়ে মাথা ঘামাবার সময় একদম নেইযখন পেয়াজের খবর রাখতে রাখতেই আমাদের নাভিশ্বাস উঠছে। কিন্তু যাদের মৌলিক সমস্যাগুলোর সুরাহা হয়ে গেছে তারা আজ পৃথিবীর সমস্যা সমাধানে মাঠে নেমেছে।

জাতিসংঘের ৭৪ তম সাধারণ অধিবেশনে জলবায়ু সমস্যা নিয়ে ভাষণ দিয়ে সারা পৃথিবীকে কাঁদিয়েছে ১৬ বছরের এক সুইডিশ তরুণী গ্রেতা থুনবার্গ। পরিবেশ বিপর্যয়ের জন্য দায়ী দেশগুলোর নীতিনির্ধারকদের রীতিমতো ধমক দিয়ে এই মেয়ে বলেছে "হাউ ডেয়ার ইউ" গ্রেতার মতো লক্ষ লক্ষ স্কুল পড়ুয়া ছেলে-মেয়ে আজ রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছে এই পৃথিবীকে বাঁচাতে। আজ সকালে যখন ম্যানহাটনের ফার্স্ট অ্যাভিনিউ দিয়ে গাড়ি চালিয়ে পার্কিং লটের দিকে যাচ্ছিলাম ডানদিকে তাকিয়ে দেখি জাতিসংঘের সামনে একদল শিশুহাতে হাতে পোস্টারপ্লাকার্ড নিয়ে স্লোগান দিচ্ছে। এই শীতের সকালে স্কুল ফেলেউষ্ণ গৃহ ফেলেকেন ওরা রাজপথে শৈত্যপ্রবাহের সুঁচালো আঘাত সহ্য করে আওয়াজ তুলছে "no more coal no more oil/ keep your climate in the soil". হাতে লেখা প্লাকার্ড ধরে বসে আছেদাঁড়িয়ে আছে ম্যানহাটনের তরুণ তরুণীরাওতে লেখা ক্লাইমেট চেঞ্জ ইস্যু ইজ অ্যা হিউম্যান রাইটস। 

৪৯ স্ট্রিটে গাড়ি পার্ক করে আমি এবং আমার স্ত্রী ফিরে আসি। আমাদের অফিসে যাওয়ার পথেই ওরা৪৭ স্ট্রিটের মাথায়। কাছে থেকে ছেলেমেয়েগুলোকে দেখার চেষ্টা করিবোঝার চেষ্টা করি। আহা কচি কচি বাচ্চারা এই শীতের মধ্যে কী কষ্টটাই না করছে। শিশুদের চেয়ে সুন্দর আর কী আছেএকদল ফুটফুটে শিশুকে দেখলে কী গ্রীষ্মের দুপুরে এক পশলা শান্তির শীতল হাওয়া এসে প্রাণ জুড়িয়ে দেয় না অথবা শীতের সকালে পিঠের ওপর উষ্ণ রোদের স্পর্শআমার খুব ইচ্ছে হয়ওদের সাথে আমিও দাঁড়িয়ে যাই। চিৎকার করে বলিনো মোর কোলনো মোর ওয়েল/ কিপ ইওর ক্লাইমেট ইন দ্য সয়েল। কিন্তু পরক্ষণেই লজ্জায় কুঁকড়ে যাইযখন চোখের সামনে ভেসে ওঠে আত্মঘাতী রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প। পৃথিবীর সব জায়গা থেকে কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো তুলে দেয়া হচ্ছে কারণ কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প পরিবেশের জন্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর। প্রথমত কয়লা উত্তোলন ক্ষতিকরদ্বিতীয়ত কয়লা পোড়ালে এতো অধিক পরিমানে কার্বন ডাই অক্সাইড বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে যে পরিবেশ খুব দ্রুত বিষাক্ত হয়ে ওঠে। এই কথাগুলো উন্নত দেশের শিশুরাও জানে। পৃথিবীর ২৪ টি বৃহৎ বাণিজ্যিক ব্যাংক কয়লা প্রকল্পে ঋণ দেয়া বন্ধ করে দিয়েছে। ২০১৫ সালের মে মাসে ব্যাংক অব আমেরিকা কয়লা প্রকল্প থেকে সরে আসেচার বছরে আরো ২৩টি ব্যাংক তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে। এমনি করে খুব দ্রুত উন্নত দেশগুলো কয়লা উত্তোলন এবং এর ব্যবহার থেকে সরে আসছে। আর আমরা সেই যুগে বাস করে কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করতে যাচ্ছি। হয়ত সেই দিন আর দূরে নেই এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের মাধ্যমে পরিবেশ দুষণের দায়ে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা হতে পারে। বড় ধরণের অর্থদণ্ডও দিতে হতে পারে। আজ আমরা জাতিসংঘে দাঁড়িয়ে উন্নত দেশের বিরুদ্ধে পরিবেশ নষ্ট করার অভিযোগ তুলছিক্ষতিপূরণ চাইছি। রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করে কোন মুখে ক্ষতিপূরণ চাইবোনাকি এটি কোনো আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র যাতে আমরা আর ক্ষতিপূরণ চাইতে না পারি?

আমি বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শিশুদের পরিবেশ আন্দোলন দেখি। ছবি তুলি। ওদের সাথে কথা বলি। কথা বলে মনে হলো ওদের প্রতিশ্রুতি ভালোবাসা থেকে উৎসারিত। এখানে কোনো খাদ নেইভণ্ডামি নেই। একটি সুন্দর পৃথিবী চায় ওরাযে পৃথিবীতে প্রতিটি মানুষ বুক ভরে নির্মল নিঃশ্বাস নিতে পারবে। সমুদ্র ফুসে উঠবে না গোস্বায়মাছেরা মরে যাবে না খরায়বাতাসে মাত্রাতিরিক্ত কার্বন ডাই অক্সাইডের কারণে মানুষ শ্বাসকষ্টে ভুগবে না। একটি সুস্থসুন্দরনির্মল পৃথিবীর স্বপ্ন ওদের চোখে জ্বলজ্বল করছে।


ম্যানহাটননিউইয়র্ক। ৬ ডিসেম্বর ২০১৯।

Comments

Popular posts from this blog

অসাধারণ এই শিল্পীর জীবনের গল্প বড় করুণ

  [এই সময়ের অত্যন্ত প্রতিভাবান শিল্পী সারফুদ্দিন আহমেদ। বাড়ি পশ্চিমবঙ্গে। আর্ট কলেজে খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করেন ,  আর শুধু ছবি আঁকেন। নানান মাধ্যমে ,  নানান বিষয়ের ছবি। সারফুদ্দিন আহমেদের ছবি থেকে চোখ ফেরানো যায় না ,  আপনাতেই ওঁর নান্দনিক সৃষ্টিকর্মে দৃষ্টি আটকে যায় ,  কী জল রঙ ,  কী অ্যাক্রিলিক ,  কিংবা স্রেফ পেন্সিলের ড্রয়িং। এই গুণী শিল্পীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কবি কাজী জহিরুল ইসলাম। সাক্ষাৎকারটি এখানে উপস্থাপন করা হলো।]       ভারত আমাকে চোখ দিয়েছে ,  বাংলাদেশ দিয়েছে দৃষ্টি -     সারফুদ্দিন আহমেদ     কাজী জহিরুল ইসলামঃ  ব্যাক গ্রাউন্ডে তবলা বাজছে আপনি ছবি আঁকছেন কাচের ওপর।    এই যে বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে ছবি আঁকা, এই ছন্দটা ছবিতে কিভাবে ধরেন? আর কোনো শিল্পী ছবি  আঁ কার সময় যন্ত্রানুসঙ্গ ব্যবহার করেছেন?   সারফুদ্দিন আহমেদঃ   কাঁচ নয়,   এটি এক বিশেষ ধরনের কাপড়-নেট। এই নেটের উপরে বর্তমানে আমার এক্সপেরিমেন্ট চলছে।    জহিরুলঃ ও ,  ফেইসবুকে যখন ছবিটি দেখি কাচের মতো ...

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জুর সাক্ষাৎকার || অষ্টম পর্ব ||

[লেখক, সাংবাদিক, অনুবাদক আনোয়ার হোসেইন মঞ্জুর সাক্ষাৎকারের অষ্টম  পর্ব আজ প্রকাশ করা হলো। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কবি কাজী জহিরুল ইসলাম।]          দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ বাসস - কে অকার্যকর করেছে  – মঞ্জু    জহিরুলঃ  আপনি ফেলোশিপ নিয়ে দিল্লীতে ছয়মাস ছিলেন, ব্যক্তিগত আগ্রহ এবং পেশাগত অভ্যাসের কারণে কাছে থেকে দেখার/বোঝার চেষ্টা করেছেন ভারতের এবং উপমহাদেশের রাজনীতি। আমরা দেখি ভারতের রাজনীতিতে গায়ক, নায়ক, লেখক, সাংবাদিকের আবির্ভাব ঘটে সব সময়ই এবং তারা রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও রাখেন। বাংলাদেশে এই ধারা খুব সম্প্রতি শুরু হলেও আমাদের জনপ্রিয় খেলোয়াড়, শিল্পীরা নিজেদের অর্থনীতি সমৃদ্ধ করা ছাড়া রাজনীতিতে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেন না। এমন কি ধর্ষণ, অন্যদেশকে ট্রানজিট প্রদান, উপর্যুপরি সড়ক দূর্ঘটনা, পরিবেশ ধ্বংসকারী কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্প ইত্যাদি ইস্যুতেও তারা নীরব। অথচ তাদের জনপ্রিয়তা এবং রাজনীতি সম্পৃক্ততা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত, যা ভারতে দেখা যায়। বিষয়টি যদি আপনার মতো করে ব্যাখ্যা করেন।  মঞ্জুঃ   দিল্লিতে আমার অবস্থানকালকে আমি নানা দিক থ...

শিল্পী কাজী রকিবের সাক্ষাৎকার || পর্ব ২ ||

 'কাজের ছেলে মন্তাজ ছিলো আমার প্রথম আর্ট শিক্ষক'   [কাজী রকিব বাংলাদেশের একজন গুণী শিল্পী। রাজশাহী আর্ট কলেজের একজন প্রতিষ্ঠাতা-শিক্ষক। কলেজের প্রথম ক্লাসটি নেবার কৃতিত্বও তার। নিরন্তর ছবি আঁকেন। নানান মাধ্যমে ,  নানান ভাবনার ছবি। বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউয়য়র্কে সস্ত্রীক বসবাস। তার স্ত্রী মাসুদা কাজীও একজন গুণী শিল্পী। বৈচিত্রপ্রিয় এই শিল্পীর একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন কবি কাজী জহিরুল ইসলাম। ধারাবাহিকভাবে তা এখানে প্রকাশ করা হবে। আজ উপস্থাপন করা হলো দ্বিতীয় পর্ব।] পর্ব – ২    জহিরুলঃ  আপনার জন্ম এবং বেড়ে ওঠার গল্প শুনতে চাই। পারিবারিক ,  প্রাকৃতিক ,  সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশ কেমন ছিল ,  শৈশব-কৈশোরে ? রকিবঃ   আমার জন্ম চট্টগ্রামের আসকার দীঘির পূব-দখিন পাড়ে ,  ৮৮ হেমসেন লেনে। বাঁশের বেড়ার ঘর উপরে টিনের চালা। দুই কামড়ার ঘর ,  সামনে বারান্দা এক চিলতে। পেছনে একটু ফাঁকা জায়গা তারপর রান্নাঘর। ঐ একটু ফাঁকা জায়গা ছোট বেলায় উঠান মনে হতো। সকালে মা রুটি বানাতেন ,  আব্বা রুটি ছি ঁ ড়ে কাককে খাওয়াতেন ,  কিছু কাক বারবা...