বৈশাখের সনেট
কাজী জহিরুল ইসলাম
বৈশাখের সনেট
১.
সুমেরু রাত্রির নিচে তাকে বলি না অবগুন্ঠন
সৈকতে ঝিনুক ফোটা প্রহর আসুক না দেরীতে
আজ রাতে মগ্ন হতে চাই নীরবতার সঙ্গীতে
দিও না তুফান তছনছ করে কৃষ্ণচূড়া-বন।
না, না, নড়বে না একটুও, জানি ভেতরে কী ঝড়
তুমি স্থির বসে থাকো মন্ত্রে বাঁধা অনড় প্রহরে
তোমাকে যে ভাঙে সেই ঝড় কাঁপে আমার ভেতর
নামুক আঁধার আরো ঢেউ দেব নরোম ডহরে।
বক্ষ-চৈত্রমাঠ খোঁজে নারীর অমৃত রসধারা
চতুর্দশী রাতের পূর্ণতা খুঁজে নিক তৃষ্ণা-তিথি
কামনার সব রঙ দেয় যদি বাসর পাহারা
ঘোমটা সরিয়ে আমি খুলে দেব আলোস্ফীতি
কোথায় সানাই তবে, উলুধ্বনি, ঢোল, কই শাঁখ
আমার বাসরে বাজে রাঙা ভোর, নতুন বৈশাখ।
নিউইয়র্ক। ৫ মার্চ ২০২০
২.
মাটির ফাটলে চিকচিক করে জ্বলে আলো-জল
দূর থেকে এই জল-জ্যোৎস্না আমাকে ডেকে আনে
আমি কেন অযথাই ম্রিয়মান আলোতে প্রবল
ফাটলে হড়কে পড়া হীরে-মতি আমাকেই টানে?
আমি তো বণিক নই, করিনি সওদা বিকিকিনি
কেন চাও জ্যোৎস্নার দাম অভাগা কবির কাছে
চেনো না আমাকে নারী, তোমাকে তো ভালো করে চিনি
তোমার উদরে আমার গোপন বীজ ঊত আছে।
শুষ্ক, রুক্ষ মাটি, হতে চাও কাদা রাতের আঁধারে
ঝড়ের দহন নেবে, তবু চাও তুমুল বর্ষণ?
দেহের বিদ্যুৎ ছেনে ঢালি জল পাহাড়ে পাহাড়ে
ভেবে দেখো এই বৈশাখে তোমার কতটা অর্জন?
কতটা জলের ভারে পূর্ণ তুমি হে রমনী-ভগ্নি
জলের অতলে জ্বলো ধিকিধিকি আয়ানের অগ্নি।
নিউ ইয়র্ক। ৬ মার্চ ২০২০।
৩.
কবোষ্ণ লেপের নিচে আজ খোঁজো এক বুনো ষাঁড়
অন্ধকারে শুয়ে পড়ো সর্বংসহা নরোম মৃত্তিকা
ধূলি-পল্লবের ভাঁজ খুলে স্বর্ণবীজ করে কে উদ্ধার
তোমার গোপন সম্ভ্রম রেখেছো কার কাছে ঠিকা?
লাঙলে আগুন জ্বেলে কে ভেঙেছে জমির পাথর
সহস্র বছর বর্ষণে, কর্ষণে হয়েছো নরোম
কত খরতাপ সয়েছে কৃষক, কত রুদ্র ঝড়
সোনালী ধানের বীজ কত রাত্রি সে দিয়েছে ওম।
শস্য ও সন্তানে আজ হেসে ওঠে তোমার সকাল
দিমিত্রার কোলে পূর্ণ চৌদ্দ তিথি, চাঁদের উঠোন
বৃষ্টির আহ্লাদে ছেনাল মাগীর মতো হও লাল
বৃক্ষপুত্রে লোভ, তুমি পার্সিফোন, ভেনাসের বোন?
শস্যফলা নারী, অহংকার তোমার গর্ভের বীজ!
চাষার লাঙল ছিল সৌভাগ্যের রূপালী তাবিজ।
হলিসউড, নিউইয়র্ক। ১৩ জুলাই ২০২০।
৪.
কাদায় কচুরিপানা, এঁদো ডোবা, রুগ্ন-জড়াজড়ি
কালচে পাতারা জীর্ণ চোখ মেলে খোঁজে প্রাণ-জল
চাতালে শকুণ ওড়ে ভাগাড়ের প্রধান প্রহরী
তাপদাহে থরোথরো কাঁপে গ্রাম, দূরের অঞ্চল।
চাতালে চতুর মুচি দূরে বসে আঁড়চোখে খোঁজে
গবাদির মৃতদেহ। গৃহস্থের অশ্রুজলে চাল
ফোটে তার ঘরের উনুনে। তারাপুঞ্জ-অন্নভোজে
উৎসব মুচিগৃহে, খা খা এ-নিদান দাহকাল।
শাঁখ, শঙ্খ বাজে গাঁয়ে, বেজে ওঠে বিশেষ আজান
প্রার্থনায় নতজানু, হে খোদা, ঈশ্বর, রসধারা
সঘন বর্ষণ দাও, ভেজাও এ-মাটির পাষাণ,
শান্ত করো তাপদাহে পোড়া এই পাপের সাহারা।
রুদ্ররোষে নামে বৈশাখী-ঝড় কাঁপিয়ে নীরবতা
নবধারাজলে বদ্ধ পানাগুচ্ছ, মুক্ত স্বাধীনতা।
নিউইয়র্ক। ৫ মার্চ ২০২০।
৫.
আনার-দানার মতো ফাটে আওয়াজ তুলে নারী
খরচৈত্রদাহে পোড়ে শস্যহীন বিরাণ গতর
এই দেহে রেখো না তোমার বীজ শস্যের কাণ্ডারী
ছুঁয়ে দেখো চরের নরোম কাদা পাষাণ পাথর।
মেঘ ভাঙো মেঘের ঘর্ষণে বিদ্যুৎ জ্বলুক দেহে
ঢালো রস, ভেজাও, মন্থন করো, যেন হই কাদা
দিও না সুদূরে ঠেলে পাণ্ডবের দ্রৌপদী-সন্দেহে
দাও প্রেম, অমৃত রসের ধারা, নারীর তাগাদা।
সর্বংসহা নারী হয়না উর্বরা বিশুষ্ক কর্ষণে
বুকের আকাশ থেকে তুমি ঢেলে দাও প্রেমরস
ভালোবেসে ভেজাও মাটির খাই প্রবল বর্ষণে
নরোম গতর ছুঁয়ে দেখো সুখে কতটা অবশ।
হে বৈশাখী ঝড় কঠিনেরে ভাঙো নরোম আঘাতে
পাথর উর্বরা হয় শুধু বর্ষণের নীল রাতে।

Comments
Post a Comment