বই নিয়ে খেলা
|| কাজী জহিরুল ইসলাম ||
বই নিয়ে যত কাজ হয় আমার ততই ভালো লাগে। ফেইসবুকে দেখছি গত কয়েকদিন ধরে বই নিয়ে একটি দারুণ খেলা চলছে। একজন একটি বই সম্পর্কে, তার বিবেচনায় সেরা বই সম্পর্কে, কিছু লিখে বইয়ের ছবিসহ একটি পোস্ট দিচ্ছেন। সেই পোস্টে তিনি একজনের নাম লিখে পোস্টটি তাকে ট্যাগ করেন। যার নাম লিখলেন তার দায়িত্ব হচ্ছে, তার পছন্দের অন্য একটি সেরা বই সম্পর্কে আরো একটি পোস্ট লেখা এবং অন্য আরেকজনের নাম উল্লেখ করে তাকে ট্যাগ করা। এভাবে সেরা বই বা প্রিয় বইগুলোর তালিকা ফেইসবুকে ভেসে উঠতে থাকবে। এতে করে আমাদের পাঠাভ্যাস এবং পাঠরুচির সাথেও অন্যদের ক্রমশ পরিচয় ঘটতে থাকবে। এই প্রক্রিয়ায় আহমাদ মাযহার, রোমেনা লেইস, ইব্রাহীম চৌধুরী, আনিসুল হকসহ আরো বেশ কয়েকজনকে যুক্ত হতে দেখেছি। খুব ভালো একটি উদ্যোগ। ফেইসবুককে আরো কত কতভাবেই না আমরা কাজে লাগাতে পারি। সেন্সরবিহীন সোশ্যাল মিডিয়া যে কত বড় শক্তি তা আমরা ইতোমধ্যেই টের পেয়ে গেছি। আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে এটাকে ইতিবাচকভাবে কাজে লাগানো।
২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে নিউ ইয়র্কের কুইন্স লাইব্রেরির হলিস শাখায় আমরা কয়েকজন মিলে একটি বাংলা বুক ক্লাব গড়ে তুলি। এর নাম দিই পাঠকের পাতা। পাঠকের পাতার কাজ হলো প্রতি মাসের জন্য একটি সেরা বাংলা বই নির্বাচন করা। লাইব্রেরি সেই বইটি সংগ্রহ করে পাঠকের জন্য উন্মুক্ত করে। সংগ্রহ করতে না পারলে পিডিএফ যোগাড় করে সবাইকে দেয়, প্রিন্ট করে হার্ড কপিও দেয়। আমরা সবাই বইটি পড়ি। এরপর একটি নির্দিষ্ট দিনে সবাই একত্রিত হয়ে বইটি নিয়ে আলোচনা করি, আমাদের অর্জিত জ্ঞান অন্যের সাথে শেয়ার করি। এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আমরা প্রায় বাধ্য হয়েই প্রতি মাসে একটি ভালো বই পড়ে ফেলতে পারছি। এ মাসের নির্বাচিত বই ছিল হাসান আজিজুল হকের সাবিত্রী উপাখ্যান। লেখক সারা জীবনে মাত্র দুটি উপন্যাস লিখেছেন, দ্বিতীয়টি সাবিত্রী উপাখ্যান। বেরিয়েছে ২০১৩ সালে। প্রথমটি ছিল আগুনপাখি। আমাদের আলোচনার মধ্য দিয়ে এই উপন্যাসের প্রধান চরিত্র সাবিত্রীকে আমরা শনাক্ত করেছি বাংলাদেশের প্রতীক হিসেবে, বাংলাভাষা ও সংস্কৃতির প্রতীক হিসেবে। যে কিনা স্বামীর সাথে প্রথম মিলনের আগেই গণধর্ষণের শিকার হয় এবং তা অব্যাহতভাবে চলতেই থাকে। সেই সাথে আমাদের আলোচনায় এ-ও উঠে এসেছে যে লেখক তার দক্ষ ও শৈল্পিক ভাষায় ত্রিশের দশকের শেষের দিকের একটি সত্য ঘটনা থেকে গল্পটি তুলে এনেছেন বটে তবে ধর্ষণের বর্ণনা দিতে গিয়ে হয়ত কিছুটা শিল্পের সীমা ছাড়িয়ে গেছেন। তিনি পরিমিতি বোধের বাইরে গিয়ে এই নিষ্ঠুর ঘটনাটিকে পাঠকের জন্য এবং লেখক হিসেবে নিজের জন্যও উপভোগ্য করে তোলার চেষ্টা করে ফেলেছেন কী?
এমনি করে প্রতি মাসেই আমরা একটি গ্রন্থের আদ্যোপান্ত আলোচনার চেষ্টা করি, চুলচেরা বিশ্লেষণের চেষ্টা করি। তাই এই কর্মসূচীটির নাম দিয়েছি বই ব্যবচ্ছেদ। ডিসেম্বরের জন্য আমরা নির্বাচন করেছি আনোয়ার পাশার 'রাইফেল রোটি আওরাত'।
ফেইসবুকে বই নিয়ে প্রচুর গ্রুপ আছে। সেই সব গ্রুপ নতুন বইয়ের খবর দেয়। বইয়ের পরিচিতি দেয়, আলোচনা পোস্ট করে। এসবের মান নিয়ে অনেকে সমালোচনা করেন। সমালোচনার ভয়ে যেন কাজ বন্ধ না হয়ে যায় এটা যেমন আমাদের মনে রাখতে হবে আবার সমালোচকদের থামিয়ে দিলেও চলবে না, বরং তারা যেন অব্যাহতভাবে সমালোচনা চালিয়ে যান সেজন্য তাদেরকে বরং উৎসাহিত করতে হবে। মাথার ওপর 'মোহিতলাল মজুমদার' দাঁড়িয়ে আছেন এই ভীতিটা থাকা দরকার, তাহলে মানোন্নয়নের তাগিদটা সচল থাকবে।
বই নিয়ে যত কাজ হয় আমার ততই ভালো লাগে। যারা বইয়ের কথা বলেন তাদেরকে অতি আপনজন মনে হয়। একেকটি নতুন বইয়ের খোঁজ যেন নতুন কোনো ভূখণ্ড আবিস্কারের উন্মাদনা তৈরি করে আমার মধ্যে। তবে অবশ্যই তা ভালো এবং পাঠযোগ্য বই।
হলিসউড, নিউইয়র্ক। ২৫ নভেম্বর ২০১৯

Comments
Post a Comment