ঝড়ো হাওয়া
|| কাজী জহিরুল ইসলাম ||
হেমন্ত বললেই চোখের সামনে সোনালী ধান ঝকমক করে ওঠে৷ শরৎ মেলে ধরে কাশফুলশুভ্র প্রকৃতি, নীল আকাশে ভেসে বেড়ানো মেঘের ভেলা। পত্রশূন্য ধুসর বৃক্ষরাজী, ঝরা পাতাদের বিভ্রান্ত উড়ে বেড়ানো যে বিষন্নতার সৃষ্টি করে তাকে আমি বরং ফলই বলি। হাইওয়ে, বুলেভার্ড, বাড়ির আশেপাশের ছোটো রাস্তা, উঠোন, এলিওয়ে সব এখন ঝরাপাতাদের দখলে। মেঘলা আকাশ আর মাতাল হাওয়া। সকালেই কবি মাহবুব হাসানের ফোন। কোথায় আপনি? বাসায়। আরে চলে আসেন, আজ তো থ্যাঙ্কস গিভিংয়ের ছুটি। আসেন আড্ডা দিই।
থ্যাঙ্কসগিভিং ডে আমেরিকার একটি বড় উৎসব। ১৬২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ইংল্যান্ড থেকে মে-ফ্লাওয়ার জাহাজে চড়ে ১০২ জন ধর্মযাজক পাড়ি জমায় নতুন ভূখণ্ডের উদ্দেশ্যে। চাষাবাদের জন্য উর্বর ভূমি, ধর্মচর্চা আর বসবাসের জন্য শান্তিপূর্ণ আবাসের খোঁজে তারা বেরিয়ে পড়েন। ৬৬ দিন পরে তারা আমেরিকায় এসে পৌঁছোয়। এখানে এসে রোগবালাইয়ের কবলে পড়ে। নানান চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে ১৬২১ সালের নভেম্বরে তারা সফলভাবে ভূট্টার চাষ করে ফসল ঘরে তোলে। স্থানীয় মেয়র তাদেরকে ধন্যবাদজ্ঞাপনার্থে এক ভোজের আয়োজন করে। এভাবেই ধন্যবাদজ্ঞাপন দিবস বা থ্যাঙ্কসগিভিং ডে এর জন্ম হয়।
পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও এ ধরণের দিবস আছে। কৃষকেরা ফসল তোলা হয়ে গেলে ঘটা করে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানায়। কর্পোরেট দুনিয়া এখন উৎসবগুলোকে রঙ মেখে দিনে দিনে যতোটা সম্ভব আকর্ষণীয় করে তোলার চেষ্টা করছে। কারণ উৎসব মানেই বিপুল কেনা-বেচা। বিপুল বাণিজ্য।
আজ আর কিং কাবাব নয়। আমি গিয়ে দেখি তিন পুরুষ বসে আছে ঘরোয়া রেস্টুরেন্টে। অন্য দুজন বিটিভির প্রকৌশলী সাইফুল্লাহ এবং শিল্পপতি আমীর আজম চৌধুরী। সাইফুল্লাহ ভাইয়ের মুখে কথার খই ফুটছে। বিটিভিকালের স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে তিনি বেশ আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ছেন। বাংলাদেশ এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজের মধ্যকার খেলা বিটিভিতে দেখানো নিয়ে কী ঝক্কি ঝামেলা হয়েছিল সেই গল্প বলতে শুরু করেন। “আমি ফাইলে নোট দিলাম, ঝুকিপূর্ণ। জিএম বরকতুল্লার তো চান্দি গরম হয়ে গেল। কী করা যায়। সকালে খেলা, রাত আটটার সংবাদে ঘোষণা যাবে। ঝুকিপূর্ণ হলে তো ঘোষণা দেয়া যাবে না। তিনি ফোন করেন ডিজি সালাহউদ্দিন জাকিকে। জরুরী মিটিং বসে। মিটিংয়ে আমি জানাই, ওয়ার্ল্ডটেল আমাদের অনুমতি দিচ্ছে না। দেখাতে হলে অন্যভাবে ব্যবস্থা করতে হবে, যা হবে ঝুঁকিপূর্ণ। শেষমেষ সিদ্ধান্ত হয়, ঘোষণা যাবে, যেভাবেই পারি আমরা খেলা দেখাবো। যদি সম্প্রচারে বিঘ্ন ঘটে তখন দেখা যাবে কী করা যায়”।
আমি কিছুকাল একটি জনপ্রিয় সাপ্তাহিক পত্রিকার টিভি রিপোর্টার ছিলাম। সেই সময়ে প্রতিদিন বিটিভিতে যেতাম। খালেদা ফাহমী তখন ছিলেন বিটিভির ডিডিজি। তার সঙ্গে বেশ সখ্য গড়ে উঠেছিল। তখন আতিকুল হক চৌধুরী, আব্দুল্লাহ আল মামুন, জিয়া আনসারী, মুসা আহমেদরা নাটক বানাতেন। এর কিছু পরে ফখরুল আবেদীল দুলাল, দোহা তালুকদাররা নাটকে নাম করতে শুরু করেন। ফিরোজ মাহমুদ তখন গানের অনুষ্ঠান প্রযোজনা করতেন। অন্য সকলেরই নানান রকম বদনাম ছিল, ফিরোজ মাহমুদের ছিল সবচেয়ে বেশি। দেশের একমাত্র টিভি চ্যানেল বিটিভি হবার কারণে সবাই ঘুষ টুশ দিয়ে বিটিভিতে ঢোকার জন্য তখন মরিয়া ছিল। ফিরোজ মাহমুদ টাকা খেতেন মিউজিক কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে। যে শিল্পীর নতুন অ্যালবাম বেরুতো বিটিভিতে তার একটি প্রোগ্রাম গেলেই অ্যালবাম হিট। কাজেই কোম্পানিগুলো টাকা দিয়ে শিল্পীকে বিটিভিতে প্রোগ্রাম করাতেন। অনেক প্রধান নির্মাতা ও অভিনেতা-অভিনেত্রীর ইন্টারভ্যু করেছি তখন। বিকেল হলেই ছুটে যেতাম বিটিভিতে। মাঝরাত অব্দি পড়ে থাকতাম। সাইফুল্লাহ ভাই বিটিভির ঝাঁপিটা খুলতেই এইসব স্মৃতি হুড়মুড় করে বেরিয়ে আসতে শুরু করে।
আমাদের এলোমেলো আড্ডা নানান দিকে বাঁক নিতে শুরু করে। এক পর্যায়ে শুরু হয় জোকস বলা। সেইসব জোকস এখানে লেখা সম্ভব নয়। তবে একটি বলা যাবে। অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানের কাছে এক লোক তদবির নিয়ে এসেছেন। তিনি তাকে বলেন, স্যোয়টার পরে আসেন। ভদ্রলোক তার অফিস থেকে বের হয়ে একটি স্যুয়েটার কিনে পরে এসেছেন। সাইফুর রহমান বলেন, আপনাকে না স্যোয়টার পরে আসতে বলেছি। ভদ্রলোক বলেন, এই তো স্যুয়েটার স্যার। আপনার নির্দেশ মতো সুয়েটার পরেই এসেছি। আসলে সাইফুর রহমান তাকে ছয়টার পরে আসতে বলেছিলেন।
থ্যাঙ্কস গিভিংয়ের সূত্র ধরে আমাদের আলোচনায় উঠে আসে নবান্ন, নববর্ষসহ নানান উৎসব। যতটা না সাংস্কৃতিক প্রতিশ্রুতি তার চেয়ে বাণিজ্যিক লক্ষ্যটাই ক্রমশ প্রধান হয়ে উঠছে। আজকাল ঢাকাসহ বাংলাদেশের বড় শহরগুলোতে হ্যালোউইন, ভ্যালেন্টাইন, নিউ ইয়ার বেশ জাকজমকপূর্ণভাবে পালন করা হয়। লক্ষ্য উপলক্ষ কিছু না বুঝেই হয়ত আমরা শিগগিরই নভেম্বরের শেষ বৃহস্পতিবারে থ্যাঙ্কসগিভিং ডেও পালন করতে শুরু করবো।
বাণিজ্যের কথা উঠতেই আমীর ভাইয়ের ভেতর থেকে একটি দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। এ.কে. খান গ্রুপের জেনারেল ম্যানেজার, পরে শিল্পপতি হয়ে ওঠা আমীর ভাই সব হারিয়ে এখন আমেরিকায়, আর দশজন খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষের মতোই একজন সাধারণ মানুষ, কাজ করেন একটি ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানিতে। বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসা বহু সেলিব্রিটিকে আমি নিউইয়র্ক এবং লন্ডনে দেখেছি, একজন সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের জীবন যাপন করছেন। তাদের মধ্যে হতাশা আছে বটে, তবে কোথায় যেন একটি প্রশান্তিও আছে, হয়ত স্বাভাবিক মৃত্যুর কিছুটা অধিক নিরাপত্তাই তাদের, আমাদের, সকলের স্বস্তির জায়গা।
ঘরোয়া থেকে বেরিয়ে হাটছি পার্কিং লটের দিকে। দৈত্যের মতো ঝড়ো হাওয়া আমাকে উড়িয়ে নিতে চাইছে। পথে পথে লাল-হলুদ ঝরা পাতাদের কী রাজত্ব!
হলিসউড, নিউইয়র্ক। ২৮ নভেম্বর ২০১৯

Comments
Post a Comment