বিদেশি ডাক্তার
|| কাজী জহিরুল ইসলাম ||
কালিয়াকুরির হেলথ সেন্টার, ডাক্তার এড্রিক বেকার, হানিফ সংকেত, ডাক্তার জেসন এবং তার স্ত্রী ডাক্তার মেরিন্ডি, তাদের চার শিশু সন্তান, বাংলাদেশের ডাক্তারদের অমানবিকতা, ইত্যাদি ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান, এই বিষয়গুলো গত কয়েকদিন ধরে সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশ আলোচিত হচ্ছে।
নিউজিল্যান্ডের ডাক্তার এড্রিক বেকার ৩২ বছর ধরে বাংলাদেশের এক অজপাড়াগাঁয়ে পড়ে থেকে দরিদ্র মানুষদের মধ্যে চিকিৎসা সেবা বিতরণ করে এখানেই মৃত্যুবরণ করেন। হেলথ সেন্টারের বারান্দাতেই তাকে সমাহিত করা হয়। তার অন্তিম ইচ্ছা পুরণ করতে কোনো বাংলাদেশি ডাক্তার এগিয়ে আসেননি, বরং হাজার হাজার মাইল দূরের আমেরিকা থেকে উড়ে এসেছেন এক মার্কিন ডাক্তার দম্পতি, কাঁধে তুলে নিয়েছেন এড্রিক বেকারের গড়ে তোলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দায়িত্ব। ২৯ নভেম্বর ইত্যাদি অনুষ্ঠানে প্রচারিত এক মানবিক প্রতিবেদনে এসব ঘটনা তুলে ধরেন হানিফ সংকেত। লক্ষ লক্ষ মানুষের চোখ অশ্রুসিক্ত হয়, মানুষের বিবেকের পাথর গলতে শুরু করে, অনেকেই ভাবতে শুরু করেন, আমি কীভাবে এড্রিকের মতো, জেসনের মতো, মেরিন্ডির মতো মানবিক আহ্বানে সাড়া দিতে পারি।
বিষয়টি নিয়ে আমি একটি পোস্ট লিখি গতকাল। আমার পোস্টে বাংলাদেশের ডাক্তারদের, সামগ্রিক চিকিৎসা ব্যবস্থার, সমালোচনা করেছি। লেখাটি পোস্ট করার কিছুক্ষণের মধ্যেই একজন বর্ষীয়ান ডাক্তার আমাকে ফোন করেন। তিনিও আক্ষেপ করে চিকিৎসকদের বেশ কিছু অনৈতিকতার দৃষ্টান্ত তুলে ধরেন। তার একজন অনুজপ্রতিম ডাক্তার প্রতিমাসে ১৫ লক্ষ টাকা ল্যাব-কমিশন পান, কীভাবে বাংলাদেশের ডাক্তারেরা, ক্লিনিকগুলো, বিল বাড়ায়-কমায় তার কিছু ফিরিস্তি তুলে ধরেন। রোগীর আত্মীয়-স্বজনের পকেট কত ভারী সেসব দেখে চিকিৎসা দেবার বিষয়টিও তুলে ধরেন কেউ কেউ। দুয়েকজন তরুণ ডাক্তার, তাদের শুভাকাঙ্ক্ষী, আত্মীয়-বন্ধুরাও আমাকে ইনবক্সে মেসেজ পাঠান। অনেকেই আমার লেখার সমালোচনা করে প্রতিবাদ জানান। বেশ কয়েকজন এড্রিক বেকার, জেসন, মেরিন্ডির এই সেবামূলক কাজের তীব্র বিরোধিতা করে মেসেজ পাঠান। তাদের মতে চিকিৎসা সেবাটা ক্যামোফ্লেজ, ভেতরে ভেতরে চলছে খৃষ্টান বানানোর কাজ। কাওসার মিটু নামে এক ফেইসবুক বন্ধু চট্টগ্রামের ডাক্তার শাহ আলমের কথা বলেন। তিনিও সৌদি আরবের চাকরি ছেড়ে দেশে ফিরে আসেন দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে চিকিৎসা সেবা বিতরণের জন্য। ক্লিনিক থেকে রাতের অন্ধকারে বাড়ি ফেরার পথে তিনি খুন হয়ে যান। এই তথ্য আমাকে জানান।
নিউ ইয়র্কের একজন বর্ষীয়ান ফার্মাসিস্ট সৈয়দ শামসুল হুদা অন্য একটি ঘটনার উল্লেখ করে বোঝানোর চেষ্টা করেন বাঙালিরা সেবা বা উপকার নিতেও জানে না। নিউ ইয়র্কের একজন ধনাঢ্য ডেন্টিস্ট ডাক্তার বিল্লাহ প্রচুর টাকা পয়সা নিয়ে দেশে যান। তার উদ্দেশ্য ছিল কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে শিল্প কারখানা গড়ে তুলবেন। নরসিংদীতে টেক্সটাইল কারখানা গড়ে তোলেন। তার মূল লক্ষ্য ছিল শ্রমিকেরাই এই কারখানার মালিক হয়ে উঠবেন এবং এর লভ্যাংশ পুনঃবিনিয়োগ হবে যাতে আরো অধিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। কিছুদিনের মধ্যেই ইন্ডাস্ট্রি লাটে উঠিয়ে দেয় তারাই, যাদের জন্য তিনি এই কাজে হাত দিয়েছিলেন। সোনার ডিম পারা হাঁস জবাই করে খাওয়া বাঙালি আমরা, রয়ে সয়ে ডিম খাওয়া আমাদের ধাতে নেই।
গত রাত থেকে আজ সন্ধ্যা পর্যন্ত এমনি অসংখ্য গল্প এসে জমা হয়েছে আমার ঝুলিতে। এসব গল্পের ভিত্তিতে আমি আমার মত করে এই বিষয়গুলোর বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করছি।
প্রথম অভিযোগ হচ্ছে, ওরা খৃষ্টান বানাচ্ছে। পৃথিবীতে ধর্ম এসেছিল কেন? উশৃঙ্ক্ষল মানুষদের একটি শৃংখলার মধ্যে আনার জন্য। ধর্ম হচ্ছে মানুষের প্রথম এডুকেশন। ধর্মই মানুষকে সভ্য করেছে। তাই যেখানে অনাচার, অত্যাচার, ব্যভিচার, হত্যা, লুন্ঠন ছিল সেখানেই ধর্মযাজকেরা ছুটে গেছেন ধর্মের আলো নিয়ে। মানুষকে ধর্মে দীক্ষিত করে সভ্য করে তুলেছেন। খৃষ্টান ধর্ম প্রচারকেরা এবং ইসলাম ধর্ম প্রচারকেরা এই কাজ সবচেয়ে বেশি করেছেন। অন্যান্য ধর্মযাজকেরাও এ কাজে ব্রতী হয়েছেন। এর মধ্যে খারাপ কিছু নেই। হ্যাঁ, একথা ঠিক যে ধর্মের ভেতরে কিছু অধর্মের কাজ সবকালেই হয়েছে, আজও হচ্ছে। ধর্মকে ব্যবহার করে কিছু স্বার্থান্বেষী মানুষ এসব কাজ করেছেন এবং করছেন। এতে ধর্মের কোনো দায় নেই। ধর্মের ভেতরে যেটুকু অধর্ম আছে তার নিরিখে ধর্মকে বিচার করলে চলবে না। ফুলের মধ্যে মধু আছে আবার বিষও আছে। মৌমাছি মধু নেয় আর ভোমরা বিষ নেয়। ধর্ম পবিত্র এবং চিরকল্যাণের। ধর্মসংশ্লিষ্ট আচার রীতি, যা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কারণে যুক্ত এবং বর্জিত হয়েছে সেসব আমাদের বুঝে শুনে গ্রহণ- বর্জন করতে হবে। প্রতিটি মানুষ স্বাধীন। সে কোন ধর্ম পালন করবে বা কোনো ধর্মই পালন করবে না, এটা তার স্বাধীনতা। যে কেউ যে কারো কাছে অন্য কোনো ধর্মের দাওয়াত নিয়ে যেতে পারে। এতে দোষের কিছু নেই। দোষের হচ্ছে যদি এখানে মানবতা লঙ্ঘিত হয়। যদি কাউকে কোনো কিছু গ্রহন বা বর্জন করতে বাধ্য করা হয়। আমি ব্যক্তিগতভাবে আস্তিক মানুষ। ধর্মের পক্ষে আমার অবস্থান। আমি ধর্মের পক্ষে এজন্য যে হয়ত ধর্মের বিপক্ষে যাওয়ার মত যথেষ্ট জ্ঞান আমার নেই। দিনের শেষে আমি আত্মসমর্পনের জন্য একটা জায়গা চাই। ধর্ম আমার আত্মসমর্পনের জায়গা। আমি এতে স্বস্তি পাই, শান্তি পাই। আমি সকল ধর্মকে সম্মান করি, সকল ধর্মের মানুষ তার পছন্দ মত ধর্ম পালন করুক তা চাই। কেউ কোনো ধর্ম পালন না করতে চাইলে তাও যেন সে করতে পারে আমি তাও চাই।
এড্রিক, জেসনরা যদি খৃস্টিয়ানিটি প্রচার করে এবং পাশাপাশি দরিদ্র, সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের চিকিৎসা সেবা প্রদান করে এতে দোষের কিছু নেই। যদি তারা মানুষকে খৃষ্টান হতে বাধ্য করে বা তাদের আদিধর্ম পালনে বাধা দেয় সেটা হবে অন্যায়। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি এমন কিছু তারা করছেন না।
দ্বিতীয় বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশের চিকিৎসক এবং চিকিৎসা ব্যবস্থা। বাংলাদেশে ভালো ডাক্তার নেই, একথা আমরা কেউই বলছি না। কিন্তু যখন ডাক্তার এড্রিকের অন্তিম ইচ্ছায় সাড়া দেওয়ার মতো একজন ডাক্তারও পাওয়া গেল না তখন আমরা অবাক হই বৈকী! তারপরেও আমরা বিশ্বাস করি বাংলাদেশে প্রচুর ভালো, মানবিক গুণসম্পন্ন ডাক্তার আছেন। প্রচুর ডাক্তার নামক 'কসাই'ও যে আছেন একথা খোদ ডাক্তাররাও স্বীকার করেন। এটিই হচ্ছে আমাদের হতাশার জায়গা। চিকিৎসা পেশায় অনৈতিকতা, অমানবিকতা থাকবে এটা আমরা মেনে নিতে পারি না। একজন অসুস্থ মানুষ ডাক্তারকে ভগবানতূল্য জ্ঞান করেন, ডাক্তারের সকল কথা বেদবাক্যের মতো বিশ্বাস করেন কিন্তু সেই বেদবাক্য যদি মিথ্যা আর স্বার্থপরতায় পূর্ণ থাকে তাহলে রোগীর আর যাওয়ার কোনো জায়গা থাকে না। মানুষ পরাজিত হতে চায় না। জেসন এবং মেরিন্ডির কালিয়াকুরির হেলথ সেন্টারের দায়িত্ব গ্রহণ বাংলাদেশি ডাক্তারদের একটি বড় পরাজয়। এই পরাজয়কে তারা কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না। তাই নানানভাবে এই মহৎ কাজটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চাইছেন। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে কোনো কোনো পরাজয় বিজয়ের চেয়ে বেশি আনন্দদায়ক। তখন পরাজয়কে মেনে নিতে হয় এবং তা থেকে শিক্ষা নিতে হয়।
সীতাকুণ্ডের ডাক্তার শাহ আলম নিজ এলাকার মানুষের সেবা করার জন্য সৌদি আরবের ভালো চাকরি ছেড়ে চলে এসেছেন। নিঃসন্দেহে তিনি মহৎ হৃদয়ের একজন মানুষ। অনেক উঁচুস্তরের মানবিক গুণসম্পন্ন মানুষ তিনি। তার প্রতি আমাদের অকুন্ঠ শ্রদ্ধা। তার পথ ধরে আরো অনেকেই এগিয়ে আসুন এটিই আমাদের প্রত্যাশা। তার খুন হয়ে যাবার ঘটনাটি অনভিপ্রেত। এর সঠিক তদন্ত হওয়া দরকার এবং বিচার হওয়া দরকার। মিডিয়ায় যেসব প্রতিবেদন এসেছে তা দেখে মনে হচ্ছে এটা ছিল ডাকাতি। যদি তার চিকিৎসা কার্যক্রম বন্ধ করার জন্য খুন করা হয়ে থাকে তা হবে খুবই হতাশাজনক। এমন ঘটনা যেন আর কিছুতেই না ঘটে সেজন্য প্রশাসনকে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। এ জাতীয় সেবামুলক কাজের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে।
শেষ করার আগে একটি অনুরোধ করবো, হারজিতের চিন্তা না করে বৃহত্তর মানবিক কল্যাণের ভিউ পয়েন্ট থেকে বিষয়গুলো দেখুন। তাহলে আপনার আমার সকলের হিসেবই মিলে যাবে।
হলিসউড, নিউ ইয়র্ক। ২ ডিসেম্বর ২০১৯

Comments
Post a Comment