আবেগ কলমের কালির মত
|| কাজী জহিরুল ইসলাম ||
আবেগ হচ্ছে কলমের কালির মতো। কালি ছাড়া লেখা হয় না। আবার বেশি কালি ছড়ালে লেখা নষ্ট হয়ে যায়। কতটুকু কালি হলে ভালো লেখা হয় তা আমাদের বুঝতে হবে। আমরা প্রায়শই আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। অনিয়ন্ত্রিত আবেগ বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। নিজের জন্য এবং অন্যের জন্যেও। বিশেষ করে যখন কথা বলি তখন এটা বেশি ঘটে। কিন্তু সচেতনতা আমাদের এই বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারে। বিশেষ করে যখন অনেক মানুষের সামনে বা মিডিয়ার সামনে কথা বলি তখন আবেগের লাগাম না টানলে বিপদের সম্ভাবনা খুব বেশি থাকে। বিপদ বিষয়টা অবশ্য আপেক্ষিক। কে কীভাবে দেখেন তার ওপর নির্ভর করছে। কেউ কেউ আছেন কে কী বললো, তার কথায় কোথায় কী প্রতিক্রিয়া হলো, এসবের মোটেও তোয়াক্কা করেন না। এরকম বেহায়া আচরণ অবশ্য আমাদের রাজনীতিসংশ্লিষ্ট লোকদের মধ্যেই বেশি দেখা যায়।
আমি ছোটো ছোটো দুটি ঘটনার কথা বলি। সম্প্রতি উপস্থিত থেকেছি নিউ ইয়র্কের এমন দুটি অনুষ্ঠানের কথা বলছি। আপনারা নাজমুন নাহারকে চেনেন। বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়ান। খুব সাহসী মেয়ে। এ যাবৎ ১৩৫টি দেশ ভ্রমণ করেছেন। নাজমুনের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা আমাদের ভ্রমণের মতো অতোটা আরামদায়ক নয়। তিনি খুব কম খরচে স্থলপথে, জলপথে, পায়ে হেঁটে, পাবলিক বাসে চড়ে, এক দেশ থেকে আরেক দেশে ছুটে বেড়ান। এতে শুধু যে খরচ কম হয় তাই নয়, অভিজ্ঞতাও বেশি হয়, দেখার, জানার, বোঝার সুযোগ ঘটে অনেক বেশি। নাজমুনের পরিকল্পণা হচ্ছে পৃথিবীতে যে প্রায় দু'শটি দেশ আছে সবগুলো দেশ ভ্রমণ করে ফেলা। তার সঙ্গে সব সময় বাংলাদেশের পতাকা থাকে। নতুন কোনো ভূখণ্ডে পৌঁছেই তিনি বাংলাদেশের পাতাকাটি মেলে ধরেন, ছবি তোলেন। সেইসব ছবি মিডিয়ায় ছাপা হয়, সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ হয়। আমরা আনন্দে উদ্বেলিত হই। আমাদের মেয়ে নাজমুন আরো একটি দেশ জয় করলো।
নাজমুন সম্পূর্ণ নিজের চেষ্টায়, নিজের খরচে এই কাজটি করছেন। তিনি তার এই দুঃসাহসী ভ্রমণের অনেক গল্প আমাদের শুনিয়েছেন, আমরা শিহরিত হয়েছি, আনন্দিত হয়েছি, আপ্লুত হয়েছি। অনেক তরুণ-তরুণী নাজমুনের গল্প শুনে ভ্রমণে উৎসাহিত হয়েছে এবং কাঁধে ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে।
কিছুদিন আগে ড. বিলকিস রহমান দোলা, চৌকষ উপস্থাপিকা এবং আবৃত্তি শিল্পী দিমা নেফারতিতির সহায়তায় নাজমুনকে নিয়ে একটি আড্ডার আয়োজন করেন নিউইয়র্কের টাইম টেলিভিশনে। আমি এবং আমার স্ত্রী সেই আড্ডায় যোগ দিই। নাজমুন দীর্ঘ সময় ধরে তার ভ্রমণ-অভিজ্ঞতা শোনান। দোলার সঞ্চালনায় আমরা সবাই নাজমুনকে নিয়ে কথা বলি। মূলত আমরা তার প্রশংসাই করি এবং আমাদের কেউ কেউ, যাদের প্রচুর ভ্রমণ অভিজ্ঞতা আছে, কিছুটা নিজের অভিজ্ঞতার কথাও শেয়ার করি। এই শহরে কিছুটা পরিচিতি আছে এমন একজন মানুষ নাজমুনের প্রশংসা করতে গিয়ে দুটি কথা বলেন। তিনি বলেন, মাদার তেরেজা তো আপনার কাছে কিছুই না। দ্বিতীয়টি হচ্ছে, আমাদের সামনে দৃষ্টান্ত দেবার মতো কোনো বাঙালি নারী নেই, আজ আপনাকে আমরা পেলাম, এখন থেকে দৃষ্টান্ত দেবার মতো অন্তত একজনকে পাওয়া গেল। রানু ফেরদৌস অবশ্য পরের মন্তব্যটির মৃদু প্রতিবাদ করে একটি সুন্দর উত্তর দিয়েছেন। তিনি খুব সুন্দরভাবে গুছিয়ে বলেছেন যে আমাদের সামনে অনেক দৃষ্টান্তই আছে, নাজমুন নাহার আরো একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে যোগ হলো। প্রশংসা করতে গিয়ে আমরা যদি পরিমিতিবোধের বাইরে চলে যাই তাহলে যার প্রশংসা করছি তাকেও প্রকারান্তরে হেয়ালি করাই হয়। নাজমুন একদিন মাদার তেরেজার কীর্তিকে ছাড়িয়ে যেতেও পারেন, কিন্তু ঠিক এই মুহূর্তে তার প্রসঙ্গে যদি বলি, মাদার তেরেজা আপনার কাছে কিছুই না, তাহলে বিষয়টি কৌতুকের মতোই শোনায়।
মওলানা ভাসানীর ৪৩তম মৃত্যবার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা সভার আয়োজন করে নিউইয়র্কের ভাসানী ফাউন্ডেশন। আয়োজকেরা আমাকেও দাওয়াত করেছে আলোচনা করার জন্য। ভাসানীর জীবন ও আদর্শের প্রতি আমার বিশেষ টান আছে। এই ভদ্রলোক ৯৬ বছরের এক দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য জীবন অতিবাহিত করেছেন। ব্যক্তিগত জীবনের আরাম আয়েশ উপেক্ষা করে নিপীড়িত মানুষের জন্য কাজ করেছেন সারা জীবন। তার হত-দরিদ্র জীবন-যাপন দেখে একথা ভাবার কোনো কারণ নেই যে তিনি খুব দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছেন। ১৮৮০ সালে সিরাজগঞ্জের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার পিতা এবং পিতামহ দুজনই ছিলেন হাজী সাহেব। সেই সময়ে কেবল বিত্তবান লোকেরাই হজে যেতে পারতেন। ভাসানীর শ্বশুর ছিলেন পাঁচবিবির জমিদার। তার স্ত্রী উত্তরাধিকারসুত্রে পৈত্রিক সম্পত্তির যে অংশ পান তার পুরোটাই ভাসানীর জনহিতকর সংগঠন হক্কুল ইবাদে দান করে দেন। তিনি শুধু দরিদ্র জনগোষ্ঠির অধিকার আদায়ের জন্য আন্দোলন-সংগ্রামই করেননি তাদের জীবন-যাপনও নিজের জন্য বেছে নিয়েছিলেন।
পুরো যৌবন তিনি আসামে কাটান। আসামের ভাসান চরে কৃষক সমাবেশ করে তিনি সকলের প্রিয় পাত্র হয়ে ওঠেন। ভালোবেসে আসামের লোকেরা তাকে ভাসানের মওলানা বলে ডাকতো। এভাবেই তিনি ধীরে ধীরে মওলানা ভাসানী হয়ে ওঠেন। আব্দুল হামিদ খান ছাড়াও তার একটি ডাক নাম ছিল, চেগা মিয়া।
দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের বক্তৃতা শুনে তিনি রাজনীতির প্রতি আগ্রহী হোন। দেশভাগের আগে তিনি আসামের মুসলিম লীগের সভাপতি ছিলেন। রায়টের সময় আসামের মুসলমানদের বাঁচাতে তিনি প্রচুর ছোটাছুটি করেন। দেশভাগের আগেই তাকে গ্রেফতার করা হয়, ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময়ে তিনি আসামের জেলে বন্দী ছিলেন। ১৯৪৮ সালে ছাড়া পেয়ে টাঙ্গাইলের সন্তোষে চলে আসেন। পূর্ব বাংলা পরিচালনার জন্য তখন ব্যবস্থাপক সভা ছিল। তিনি মুসলিম লীগের প্রতিনিধি হিসেবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য নির্বাচিত হন। ব্রিটিশ সরকারের আমলে পূর্ব বাংলার ট্যাক্স আদায় করতো পূর্ববাংলার প্রশাসন। কিন্তু পাকিস্তান হওয়ার পর কেন্দ্রীয় সরকার কর আদায় করতে শুরু করে। ভাসানী দাবী তোলেন এখান থেকে যে কর আদায় হবে তার কমপক্ষে ৭৫% এখানকার বাজেটে দিতে হবে। মুসলিম লীগ সরকার তা পছন্দ করেনি। ভাসানীর নির্বাচনে ত্রুটি আছে তারা এই অজুহাত তোলে। ভাসানী এক পর্যায়ে ব্যবস্থাপক সভা থেকে পদত্যাগ করলেও অপমান করার জন্য তাকে ওরা বহিস্কার করে।
এর প্রতিবাদে তিনি ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন টিকাটুলির রোজ গার্ডেনে মুসলিম লীগের সভা ডাকেন। ৩০০ জন সদস্যের উপস্থিতিতে তিনি প্রধান অতিথির আসন অলংকৃত করেন এবং আতাউর রহমান তাতে সভাপতিত্ব করেন। দুইদিন ধরে সভা চলে। সেই সভায় আওয়ামী মুসলিম লীগ নামে নতুন একটি রাজনৈতিক দল গঠিত হয়। সর্বসম্মতিক্রমে যার সভাপতি হন মওলানা ভাসানী। সাধারণ সম্পাদক করা হয় শামসুল হককে এবং দুজন যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন, শেখ মুজিবুর রহমান এবং খন্দকার মোশতাক আহমদ। এই ভূখণ্ডের এটিই প্রথম জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক দল।
১৯৬৫ সালের রায়টের সময় হিন্দুদের ভারতে চলে যাওয়া বন্ধ করার জন্য তিনি চেষ্টা করেছেন। হিন্দুরা চলে গেলে যে পাকিস্তানের উপকার নয় ক্ষতি হবে একথা তিনি শুধু বলেননি ভারতের প্রধামমন্ত্রীকে প্রস্তাব পাঠিয়েছেন হিন্দুদের ফিরিয়ে আনার বিষয়ে। ওই সময়ে পাকিস্তান সরকার রেডিও টিভিতে রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রচার নিষিদ্ধ করেছিল, ভাসানী এর প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন।
এমনি আরো অসংখ্য কারণে আমি মওলানার একজন ভক্ত। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট সরকারের সবচেয়ে বড় নেতা হওয়া সত্বেও তিনি মূখ্যমন্ত্রীর পদ নেননি। কখনোই তিনি ক্ষমতায় যাওয়ার রাজনীতি করেননি। তার রাজনীতির মূল লক্ষ্য ছিল দুখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো।
তো ভাসানীর ৪৩তম মৃত্যুবার্ষিকীর সভায় একজন বুজুর্গ আলোচক বলেন, ‘ভাসানী সম্পর্কে আপনারা অনেক কথা বলে গেলেন কিন্তু আপনারা কেউ তার পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে জানেন না। এরপর তিনি ভাসানীর পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে জ্ঞান দিতে শুরু করেন। আইয়ুব খান সরকার তার পায়ে ধরেছিল চীন সফরে যাওয়ার জন্য। কারণ চীনকে ম্যানেজ করার ক্ষমতা পুরো পাকিস্তানে আর কারো ছিল না’। আমি অবশ্য আমার বক্তৃতায় চীনে গিয়ে ভাসানী যে খুব ব্যতিক্রমী একটি কাজ করেছিলেন তা তুলে ধরি। অন্যান্য রাষ্ট্রীয় অতিথির মতো চীনের শৌর্যবীর্য দেখেই তিনি সন্তুষ্ট হননি, দেখতে চেয়েছেন চীনের জেলখানা। এ জাতীয় আব্দার কোনো রাষ্ট্রীয় অতিথি এর আগে করেনি। মাও সেতুংয়ের সরকার কোনো বিদেশিকে জেলখানা দেখতে না দিলেও ভাসানীকে সেই সুযোগ দিয়ে বিশেষ সম্মান দেখিয়েছিলেন।
একটি সভায় কেউ যদি বলেন, আপনারা কেউ তার পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে জানেন না। তখন তাকে একটু বেশিই আবেগ প্রবণ মনে হয়।
'আবেগ' এই ছোটো একটি শব্দ নিয়ে বলতে গিয়ে আমি নিজেই কী আবেগ প্রবণ হয়ে একটি দীর্ঘ লেখা লিখে ফেললাম? এমনটিও তো আমরা প্রায়শই করি।
হলিসউড, নিউইয়র্ক। ২৬ নভেম্বর ২০১৯

Comments
Post a Comment