খন্দকার মোশতাক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা এড়িয়ে যান
[লেখক, সাংবাদিক, অনুবাদক আনোয়ার হোসেইন মঞ্জুর সাক্ষাৎকারের ষষ্ঠ পর্ব আজ প্রকাশ করা হলো। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কবি কাজী জহিরুল ইসলাম।]
জহিরুলঃ ভাষা আন্দোলন থেকে নব্বুইয়ের গণআন্দোলন পর্যন্ত সকল রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনে, গণমানুষের দাবী আদায়ের সংগ্রামে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) যারা নেতা ছিলেন, বিশেষ করে ভিপি, জিএস এসব আন্দোলনের মধ্য দিয়ে উজ্জ্বল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। রাশেদ খান মেননও এই ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়ে তৈরি হওয়া একজন নেতা। বাম ধারার ওয়ার্কাস পার্টির প্রধান ব্যক্তি। কিন্তু পরবর্তি সময়ে আমরা দেখি মন্ত্রী হওয়ার জন্য অন্য অনেক স্খলিত নেতার মতো তিনিও নীতিভ্রষ্ট হন, রাজনীতির ক্লাউনে পরিণত হয়েছেন। আপনি তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। কাছে থেকে দেখা এবং সাংবাদিকের অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিতে দেখা রাশেদ খান মেনন সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কি?
মঞ্জুঃ দেশে গণআন্দোলন বলতে যে ক’টি আন্দোলন হয়েছে, সব ক’টিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শুধু যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে তাই নয়, বরং যখন যে আন্দোলন হয়েছে সেই আন্দোলনকে নির্দিষ্ট আকার দিয়েছে, গতি সৃষ্টি করেছে এবং আন্দোলনকে সফলতার পথে এগিয়ে নিয়েছে। পাকিস্তান আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং গণআন্দোলন যেন সমার্থক ছিল। সারা দেশ, সকল রাজনৈতিক দল, অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা তাকিয়ে থাকতেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কী কর্মসূচি দেয়া হয় তা দেখতে। ভাষা আন্দোলনকে উত্তুঙ্গে তোলার ক্ষেত্রে নেতৃত্বও দিয়েছিলেন ওই সময় ডাকসুতে নির্বাচিত ছাত্র নেতারাই। অবশ্য তারা কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিত্ব করতেন না বা এখনকার মতো রাজনৈতিক দলের সৃষ্ট ছাত্র সংগঠনের লেজুড় ছিলেন না। দু’একটি ব্যতিক্রম ছাড়া ১৯৬৩ সালের পূর্ব পর্যন্ত ডাকসুতে যারা নির্বাচিত হয়েছেন তারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নির্বাচিত হয়েছেন। পরবর্তীতে তাদের অধিকাংশই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে নেতৃত্ব দিয়েছেন। দলীয়ভাবে ডাকসুতে নির্বাচনের ধারা যখন শুরু হয় তখন, ১৯৬৩-৬৪ সালে, ডাকসুর ভিপি ও জিএস পদে নির্বাচিত হন যথাক্রমে রাশেদ খান মেনন ও বেগম মতিয়া চৌধুরী। তারা পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের প্রতিনিধি ছিলেন। এরপর ডাকসুর সব নির্বাচন দলীয় ভিত্তিতে হয়েছে। কিন্তু দু:খজনক হলো, বৃটিশ, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ আমলে বেশির ভাগ সময়েই নানা জটিলতার অজুহাতে ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একশ’ বছর পূর্ণ হয়েছে। ডাকসু’র মেয়াদ এক বছরের। সে হিসেবে ডাকসু’র একশ’টি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। কিন্তু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে মাত্র ২৬ বার। নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হওয়ায় নেতৃত্বের সুষ্ঠু বিকাশ ঘটার ক্ষেত্রেও বাঁধা সৃষ্টি হয়েছে।
রাশেদ খান মেনন রাজনৈতিকভাবে আলোকিত এক পরিবারের সন্তান। তাঁর পিতা আবদুল জব্বার খান মুসলিম লীগের নেতা ছিলেন এবং ১৯৬৫ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর ভাইবোনদের অনেকই রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। তাঁর ভাই এজেডএম ওবায়দুল্লাহ খান, এজেডএম এনায়েতুল্লাহ খান ও বোন সেলিমা রহমান বিভিন্ন সরকারের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। প্রেসিডেন্ট আবদুর রহমান বিশ্বাস তাঁর জ্ঞাতি বোনের স্বামী ছিলেন। মেনন নিজেও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের মন্ত্রী ছিলেন। দেশের রাজনীতির সাথে, বিশেষ করে ক্ষমতার রাজনীতির সাথে এভাবে জড়িত থাকা পরিবারের সংখ্যা খুব কম। রাশেদ খান মেনন ছাত্রজীবনেই বাম ধারা বেছে নেন। এক পর্যায়ে বাম ধারায় চীন ও সোভিয়েত ব্লকের পক্ষাবলম্বনের প্রশ্নে ছাত্র ইউনিয়ন ভেঙে যায় এবং দুটি অংশের মধ্যে রাশেদ খান মেনন চীনা কমিউনিজম এবং বেগম মতিয়া চৌধুরী সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের ঝাণ্ডা তুলে ধরে ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন) ও ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া) নামে শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে নেমে পড়েন। কিন্তু মেননের জন্য দুর্ভাগ্যজনক ছিল যে তিনি তাঁর ছাত্র সংগঠনকে এগিয়ে নিতে পারেননি। কিন্তু ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া) বেশ শক্তিশালী ছাত্র সংগঠনে পরিণত হয়েছিল। মেনন মাওলানা ভাসনীর ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে (ন্যাপ) যোগ দিয়ে ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। কিন্তু জয়ী হতে পারেননি। এরপর তিনি কাজী জাফর আহমেদের নেতৃত্বে গঠিত ইউনাইটেড পিপলস পার্টিতে (ইউপিপি), এবং এক পর্যায়ে ইউপিপি থেকে সরে এসে ওয়াকার্স পার্টি গঠন করেন। ১৯৭৯ সালে দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করে প্রথমবার সংসদ সদস্য হন। এভাবে দল বদলের মধ্য দিয়েই তার রাজনৈতিক অস্থিরতা সম্পর্কে কিছুটা ধারণা করা যেতে পারে। প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ তার স্বৈরশাসনকে বৈধ রূপ দিতে ১৯৮৬ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘোষণা করেন। বিএনপি নির্বাচন বর্জন করে। আওয়ামী লীগ এবং অন্যান্য ছোট দল এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। রাশেদ খান মেননের ওয়ার্কার্স পার্টিও নির্বাচনে অংশ নেয়।
ওই সময়ে গুজব ছিল যে বিরোধী দলগুলোকে নির্বাচনে আনার জন্য এরশাদ দলগুলোর নেতাদের প্রচুর অর্থ প্রদান করেন এবং এ অর্থ বিতরণের দায়িত্ব ছিল ওই সময় ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র নাজিউর রহমান মঞ্জুর। অর্থ গ্রহণকারীদের মধ্যে রাশেদ খান মেননও ছিলেন। তার দল ওই সংসদে তিনটি আসন পেয়েছিল। এরপর তার রাজনীতির পুরোটাই স্খলনের রাজনীতি। ক্ষমতার জন্য বা মন্ত্রী হওয়ার জন্য আদর্শ ত্যাগ করতে কুণ্ঠিত হননি। আদর্শের প্রশ্নে যে মতিয়া চৌধুরীর সঙ্গে দ্বন্দ্বে ছাত্র ইউনিয়নকে বিভক্ত করেছিলেন, এরশাদ ও বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে সেই মতিয়া চৌধুরীর সাথে রাজপথে আন্দোলন করেছেন এবং একই মন্ত্রীসভায় বসেছেন। তারা প্রমাণ করেছেন রাজনীতি আদর্শ প্রতিষ্ঠা বা জনগণের কল্যাণের জন্য নয়, মন্ত্রী হওয়ার জন্য।
আমি এই পরিবারের চার ভাইয়ের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করার সুযোগ পেয়েছি। এনায়েতুল্লাহ খান, এজেডএম ওবায়দুল্লাহ খান, সাদেক খান ও রাশেদ খান মেননের। মেননের সাক্ষাৎকার নেয়ার আগেই তাঁকে কাছে থেকে জানার সুযোগ হয়েছে ১৯৭৯ সালে তিনি প্রথমবার জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর। তরুণ রিপোর্টার হিসেবে সংসদ কভার করার জন্য আমাকে যেমন অনেক কিছু শিখতে হয়েছিল, নতুন সংসদ সদস্যদেরও অনেক কিছু শিখতে হতো। সংসদে কথা বলতে হলে কার্যপ্রণালী বিধির কোনো না কোনো ধারা অনুযায়ী বলতে হবে। এর বাইরে কিছু বলার সুযোগ দেবেন না স্পিকার। সংসদে শেখার শেষ নেই। মেননও শিখছিলেন। সাংবাদিকদের সাথে প্রায়ই মতবিনিময় হতো তাঁর। ১৯৮২ সালের মার্চে এরশাদ ক্ষমতা দখল করে সামরিক আইন জারি করেন। রাজনৈতিক কার্যকলাপ বন্ধ ছিল। এক বছর পর ১৯৮৩ সালে আমাকে দায়িত্ব দেয়া হয় রাজনৈতিক নেতাদের সাক্ষাৎকার গ্রহণের জন্য। এসময় আমি অনেক রাজনৈতিক নেতার সাক্ষাৎকার গ্রহণ করি। রাশেদ খান মেননও ছিলেন। সাংবাদিকদের সাথে তিনি খুব স্বচ্ছন্দ। এক সকালে তোপখানা রোডে ওয়ার্কার্স পার্টির অফিসে গেলাম। তিনি অপেক্ষা করছিলেন। সংবাদপত্রে ছোট দলগুলোর কথা কমই প্রকাশিত হয়। এমনকি প্রেস রিলিজ পাঠানো হলেও অনেক সময় তা অগ্রাহ্য করা হয়। অতএব সামরিক শাসনের সময় কোনো সংবাদপত্রে সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হলে তার ও তার দলের লাভ। রাশেদ খান মেননের মুখে স্মিত হাসি থাকে, কিন্তু তিনি বিনয়ী নন। যেহেতু রাজনৈতিক তৎপরতা বন্ধ, অফিসে দু’একজন লোক ছাড়া নেতাকর্মীর ভিড় নেই। তিনি চা দিতে বলে আমাকে তাঁর রুমে নিয়ে গেলেন। পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলেন। যতোটা জানি বললাম, পরিস্থিতির ওপর তাঁর মূল্যায়ন জানতে চাইলাম। তিনি বার বার বলছিলেন, এগুলো কিন্তু অফ দ্য রেকর্ড। আমি তাঁকে আশ্বস্ত করি। সংবাদপত্রে সেন্সরশিপ বহাল, এসব কথা এমনিতেই প্রকাশ করা যাবে না। আনুষ্ঠানিক প্রশ্নোত্তর পর্বে তাঁর রাজনীতিতে আগমণ, বাম ধারার রাজনীতিতে দীক্ষা গ্রহণ, পিতার মুসলিম লীগের রাজনীতির পটভূমিতে তাঁর বাম রাজনীতির কারণে কোনো দ্বন্দ্বের উদ্ভব হয়েছিল কিনা, ছাত্র ইউনিয়নের ভাঙন এবং তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বেশ খোলামেলা আলোচনা হয়। বামপন্থীদের সঙ্গে আলোচনার বড় সমস্যা হলো তারা কথায় কথায় তত্ত্ব জাহির করেন। অংকের ফর্মূলার মতো অথবা গেরিলা যুদ্ধের কৌশলের মতো রাজনীতি করতে চান, বাস্তবের সাথে মিল থাকুক আর না থাকুক। তিনি চীনের মাওবাদের মোক্ষম প্রয়োগের মাধ্যমে শ্রেনি-বিভক্ত সমাজকে ভেঙে শ্রেনিহীন সমাজ গড়ে তোলার সংকল্প ব্যক্ত করেন এবং সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের ত্রুটিগুলো প্রদর্শন করেন। পিতার প্রতি তিনি শ্রদ্ধাশীল, পিতার রাজনীতি নিয়ে তাঁর আপত্তি নেই। মেননের রাজনীতি আইয়ুব খানের দলন, পীড়ন, শোষণ ও পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের বিরুদ্ধে। পিতার সাথে রাজনীতি নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা হয়েছে। তিনি তাঁর সন্তানদের ওপর কোনোকিছু আরোপ করতে চাননি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব যেহেতু তাঁর ভাষায় বুর্জোয়া ও ধনীক শ্রেনির হাতে, তার দলের মতো ছোট দলের পক্ষে বুর্জোয়া নেতৃত্ব খতম করে শ্রেনিহীন সমাজ গড়ার স্বপ্ন সফল করতে পারবে কিনা জানতে চাইলে বলেন যে, তাদের রাজনীতিতে স্বপ্ন দেখার স্থান নেই। কাজের মধ্য দিয়ে সবকিছু বাস্তবায়ন করাই তার দলের লক্ষ্য এবং তিনি আশাবাদী যে তিনি বাংলাদেশে শ্রেনিহীন সমাজ ও কৃষক শ্রমিকের প্রতিনিধিদের নেতৃত্ব দেখে যাবেন। রাশেদ খান মেননের বয়স এখন ৭৭ বছর। তার দল বা সমমনা দলগুলো মিলেও শ্রেনিহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার ধারে কাছে পৌছুঁতে পারেনি। তিনি যাদেরকে বুর্জোয়া বলতেন তাদের সাথে হাত মিলিয়ে মন্ত্রী হয়েছেন এবং মন্ত্রীত্ব হারানোর ভয়ে সরকারের আপত্তিকর কাজেও তার সমর্থন দিয়ে বাম রাজনীতির আদর্শকে কলঙ্কিত করেছেন। আমাদের দেশে বলা হয়ে থাকে, মাছের পচন শুরু হয় মাছের মাথা থেকে, বাম নেতাদের পচনও মাথা থেকেই শুরু হয়। রাশেদ খান মেনন, বেগম মতিয়া চৌধুরীরা তার উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত।
জহিরুলঃ সফল সিনেমায় যেমন খলনায়কের চরিত্র গুরুত্বপূর্ণ, ইতিহাসেও খলনায়কদের ভূমিকা বারবারই আলোচনায় আসে। আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ নেতা ও মন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমেদ বাংলাদেশের ইতিহাসের একজন খলনায়ক। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর তিনি রাষ্ট্রপতি হন, অনুগতদের নিয়ে মন্ত্রীসভা গঠন করেন। তার চেয়েও খারাপ কাজ যেটি করেন ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারির মধ্য দিয়ে এই অপরাধের বিচার প্রক্রিয়াকে আটকে রাখেন। আপনি এক পর্যায়ে তার ইন্টারভিউ করেন, কেমন দেখেছেন তাকে?
মঞ্জুঃ খন্দকার মোশতাক আহমেদ সম্পর্কে আমার সবসময় কৌতুহল ছিল। ছোটখাট আকৃতির মানুষটি নাকি রাজনীতিতে তুখোড় ছিলেন। আওয়ামী লীগেও সকলের শ্রদ্ধাভাজন ছিলেন। এমনকি তাঁর সম্পর্কে বলা হতো, শেখ মুজিবুর রহমান দলের সকল শীর্ষ নেতাকে “তুই” এবং কিছু সংখ্যককে “তুমি” সম্বোধন করলেও খন্দকার মোশতাক ও অবাঙালী আওয়ামী লীগার জহিরউদ্দিন খানকে “আপনি” সম্বোধন করতেন। এর সত্য মিথ্যা জানি না। রাজনীতিতে তিনি সবসময় লাইমলাইটে ছিলেন। ১৯৭১ সালে তিনি প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে তাঁর তৎপরতার খবর বেশি প্রচারিত হতো। কারণ তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিভিন্ন দেশের সমর্থন আদায়ের জন্য সবসময় ব্যস্ত থাকতেন, ওই সময় যা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল। কিন্তু যুদ্ধ যখন শেষ পর্যায়ে তখন পাকিস্তান নিজেদের শোচনীয় অবস্থা দেখে খন্দকার মোশতাকের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা চালায়। পাকিস্তানের এ চেষ্টা সফল হয় খন্দকার মোশতাক ও প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র সচিব মাহবুবুল আলম চাষীর যুক্তরাষ্ট্র সফরকালে। স্টেট ডিপার্টমেন্টের এক প্রতিনিধির সাথে আলোচনার পর চাষী পাকিস্তানের সাথে আলোচনা শুরু করার জন্য মোশতাকের সঙ্গে একমত হন; অর্থ্যাৎ আওয়ামী লীগৈর ৬ দফার আলোকে পাকিস্তানের সাথে সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান। তা না হলেও অন্তত পাকিস্তানের সঙ্গে কনফেডারেশন ধরনের সম্পর্কে থাকা। যুক্তরাষ্ট্রের মাধ্যমে পাকিস্তানের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছিল বলে জানা গেছে এবং অনেক বইয়ে এ ধরনের তথ্য রয়েছে। ভারতীয় গোয়েন্দাদের হাতে এমন বার্তা আসে যে মোশতাক পাকিস্তানের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছেন। মোশতাকের ভূমিকা বিতর্কিত হয়ে পড়ে। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রবাসী সরকার বাংলাদেশে আসার পর বিতর্কিত ভূমিকার অভিযোগে খন্দকার মোশতাককে পররাষ্ট্র মন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে সরিয়ে আবদুস সামাদ আজাদকে পররাষ্ট্র মন্ত্রী করা হয়। এর প্রতিবাদে মোশতাক মন্ত্রীসভা থেকে পদত্যাগ করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন। কয়েক বছর আগে ডেইলি স্টারের এক রিপোর্টে পড়েছিলাম যে, মোশতাক পদত্যাগ করার পর বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর স্বামী ড. ওয়াজেদ মিয়া হাসপাতালে মোশতাকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে যখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ঢাকায় এবং অন্যান্য বাহিনীর সদস্যরাও অস্ত্র হাতে ঘুরছে, এসব বিবেচনা করে পদত্যাগপত্র প্রত্যাহারের অনুরোধ করলে তিনি এই শর্তে পদত্যাগপত্র প্রত্যাহার করেন যে শেখ মুজিব পাকিস্তান থেকে ফিরে এলে ওয়াজেদ মিয়া তাঁর জন্য তদবির করবেন। কিন্তু মোশতাকের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার অভিযোগ শেষ পর্যন্ত ছিল। শেখ মুজিবুর রহমানের প্রথম সরকারেও খন্দকার মোশতাক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। এমনকি প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজুদ্দিন আহমেদকে বাণিজ্য ও অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে সরিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব ন্যস্ত করা হয় খন্দকার মোশতাকের হাতে। এ নিয়ে ওই সময়েই অনেক কানাঘুষা ও বিতর্ক ছিল। আমার কাছে এখনো বিস্ময়ের ব্যাপার যে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মোশতাকের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের সঙ্গে ঐক্য প্রচেষ্টায় যোগসূত্র থাকার অভিযোগ, কিছু প্রমাণ থাকা এবং আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ে মোশতাকের ব্যাপারে আপত্তি থাকা সত্বেও তিনি মন্ত্রীসভায় ফিরে এলেন কীভাবে।
খন্দকার মোশতাক প্রকৃত অর্থেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে নিজেকে খলনায়ক হিসেবে প্রমাণ করেন কিছু সংখ্যক সেনা অফিসারের দ্বারা ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট সপরিবারে রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবকে হত্যার পর রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করে। তিনি ঘাতক সেনা অফিসারদের সূর্যসন্তান হিসেবে প্রশংসা করেছিলেন। তখনো জাতীয় সংসদ ভেঙে দেয়া হয়নি। সংবিধান স্থগিত করা হয়নি। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির মৃত্যু বা অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করার কথা জাতীয় সংসদের স্পিকারের। ওই সময় স্পিকার ছিলেন আবদুল মালেক উকিল। এ নিয়ে সংসদে প্রশ্ন ওঠে। কিন্তু পরিস্থিতি কারো নিয়ন্ত্রণে ছিল না। ফলে সংসদ ভেঙে দেয়া হয়। রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর ৮৩ দিনের দায়িত্ব পালনকালে তিনি যে অপকর্মগুলো করেন তার মধ্যে “ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ” আদেশ জারি করে শেখ মুজিবের হত্যার সাথে জড়িত সেনা অফিসারদের অপরাধ থেকে দায়মুক্তি দেয়া এবং বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোতে নিয়োগ দিয়ে বিদেশে পাঠিয়ে দেয়া, প্রচলিত বিষয়গুলোর মধ্যে “জয় বাংলা’র বদলে “বাংলাদেশ জিন্দাবাদ” স্লোগান চালু করা, কারাগারে আটক চার জাতীয় নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজুদ্দিন আহমেদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী এবং এএইচএম কামরুজ্জামানকে হত্যা করার মতো ঘটনা ঘটানো, এসবের কারণে ধরেই নেয়া হয় যে, খন্দকার মোশতাক শেখ মুজিবসহ প্রতিটি হত্যাকাণ্ডে নীরবে সমর্থন দিয়েছেন। তিনি সেনা কর্মকর্তাদের হাতের পুতুল ছিলেন তা খুব কম লোকই বিশ্বাস করে। ১৯৭৫ সালের ৩রা নভেম্বর তিনি পাল্টা এক সেনাবিদ্রোহের পর ৬ই নভেম্বর রাষ্ট্রপতি পদ থেকে অপসারিত হন এবং বিচারপতি আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে রাষ্ট্রপতি পদে বসিয়ে দেশে সামরিক আইন জারি ও তাঁকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক করা হয়।
খন্দকার মোশতাক ডেমোক্রেটিক লীগ নামে একটি দল প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার আগেই তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। বেশ কিছু দুর্নীতির মামলাও হয় তাঁর বিরুদ্ধে, বিচারে তাঁকে কারাদণ্ড দেয়া হয়। কারাগার থেকে বের হয়ে ১৯৮১ সালের কোনো এক সময়ে তাঁর দলের পক্ষ থেকে বায়তুল মোকাররম মসজিদের সামনে এক জনসমাবেশের আয়োজন করেন। সেদিন আমি ও বাবর ভাই সংসদে ছিলাম। আমাদের চিফ রিপোর্টার মোহাম্মদ আবদুল মান্নান, যিনি পরবর্তীতে ইসলামী ব্যাংকের সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, তিনি সেদিন সংসদে না এসে খন্দকার মোশতাকের সমাবেশ করতে যান। সন্ধ্যার আগে খবর এলো, মোশতাকের সমাবেশে বোমা বিস্ফোরিত হয়েছে এবং সভায় সাপ ছেড়ে দেয়া হয়েছে। বিস্ফোরণে এবং সাপের আতঙ্কে সাংবাদিকসহ বহু লোক আহত হয়েছে। আহত সাংবাদিকদের মধ্যে আমাদের চিফ রিপোর্টার মোহাম্মদ আবদুল মান্নানও আছে। বাবর ভাইকে বললাম, আপনি হাসপাতালে যান। আমি সংসদ সামলাই। যাহোক, এ ঘটনার পর থেকে খন্দকার মোশতাক আর জনসমক্ষে বের হননি। তার দলের তৎপরতাও তেমন দেখা যায়নি।
এরশাদ ক্ষমতা দখল করে প্রথমে রাজনৈতিক তৎপরতার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। এরপর ঘরোয়া রাজনীতি বা সীমিত রাজনৈতিক তৎপরতার অনুমতি দেন। রাজনৈতিক তৎপরতার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার পর এরশাদ বিরোধী আন্দোলন চাঙ্গা হতে বেশি সময় লাগেনি। আন্দোলন দমনের জন্য পুলিশের তৎপরতা ছিল নারকীয়। মিছিলের ওপর ট্রাক তুলে দেয়ার কয়েকটি ঘটনা ঘটে। দু’জন ছাত্র নিহত হয় দ্রুতগামী ট্রাকের নিচে চাপা পড়ে। দমন যতো বাড়ে আন্দোলনের তীব্রতাও বেড়ে চলে। এমনি এক সময়ে আমরা বেশ ক’জন রিপোর্টার ও ফটো সংবাদিক নিমতলী, সিদ্দিক বাজার এলাকায় বিক্ষোভ ও পুলিশী তৎপরতা দেখার জন্য কর্তব্যরত ছিলাম। অবস্থা একটু শান্ত হলে সম্ভবত দৈনিক বাংলার সিনিয়র ফটো সাংবাদিক প্রস্তাব করলেন কাছেই আগামসিহ লেনে খন্দকার মোশতাকের বাড়িতে যাওয়ার। জামান ভাই ওই এলাকার বাসিন্দা। আমরা দশ-বারোজন সাংবাদিক সম্মত হলাম। আগামসিহ লেনের খন্দকার মোশতাকের বাড়ি আগে থেকেই পরিচিত। সবসময় গেটের সামনে দু’জন পুলিশ সদস্য প্রহরায় থাকে। আমরা গেটে উপস্থিত হলে পুলিশ জেরা করলো। অনুমতি আনতে একজন ভেতরে গেল। খন্দকার মোশতাক অনুমতি দিয়েছেন। আমরা দোতলায় গেলাম। খন্দকার মোশতাক এগিয়ে এসে স্বাগত জানালেন। কয়েকজন সাংবাদিক তাঁর পরিচিত। তাদেরকে বললেন, আপনারা তো ভুলেই গেছেন যে, আমি দেশের প্রেসিডেন্ট ছিলাম। তাঁর বাড়িটি পুরনো। এত বেশি সংখ্যক লোকের একসাথে বসার সুযোগ নেই ড্রয়িং রুমে। আমাদেরকে একতলার ছাদে নিয়ে গেলেন। সেই প্রথম খন্দকার মোশতাককে সামনাসামনি দেখি। তিনি কাউকে ডেকে চা দিতে বলেন। সিনিয়ররা আপত্তি করে বলেন, আমরা শুধু আপনার সাথে দেখা করতে এসেছি। এদিকেই দায়িত্ব পালন করছিলাম, তাই আসা হলো। আলাদাভাবে আসা হয়ে উঠতো না। অনেকে তাঁর সাথে ছবি তোলার আগ্রহ দেখালে তিনি ছবি তুলতেও সাড়া দেন। আমিও তাঁর সাথে ছবি তুলেছিলাম। কিন্তু জামান ভাইয়ের কাছ থেকে ছবি নেয়া হয়নি। হালকা কথাবার্তার পর আমরা বিদায় নিয়ে চলে আসি।
এর প্রায় তিন বছর পর এরশাদের পতনের আগে আমার ওপর দায়িত্ব পড়ে খন্দকার মোশতাক আহমদের সাক্ষাৎকার নেয়ার। তার নাম্বারে ফোন করি। কেউ ফোন ধরে আমার পরিচয় ও ফোন করার উদ্দেশ্য জানতে চায়। আমি আমার পরিচয় দেই ও উদ্দেশ্য বলি। খন্দকার মোশতাক ফোনে আসেন। তার কাছেও পরিচয় দিয়ে উদ্দেশ্যসম্পর্কে বলি। আমাকে লাইনে রেখে তিনি একটু সময় নেন। দুই-তিন মিনিট পর ফিরে এসে একটা তারিখ ও সময় ঠিক করে দেন। নির্ধারিত দিনে যথাসময়ে তার বাড়ির গেটে উপস্থিত হয়ে প্রহরারত পুলিশকে আগমনের কারণ বলি, আমার কার্ড দেই। পুলিশ কার্ড নিয়ে দোতলায় যায়। একটু পর ফিরে এসে আমাকে ওপরে যাওয়ার ইঙ্গিত করে। ভেতরে প্রবেশ করে একটি রুমের বাঁক ঘুরে বামে ড্রয়িং রুমে ঢুকি। রুমে ঝুলানো একটি দোলনায় খন্দকার মোশতাক দুলছেন। এর আগে অন্য সাংবাদিকদের সঙ্গে এসেছিলাম, সেদিন আমরা ড্রয়িং রুমে প্রবেশ না করায় দোলনাটি চোখে পড়েনি। আমাকে বসার ইঙ্গিত দিয়ে তিনি দোলনা থেকে ওঠলেন। আমার মুখোমুখি বসে জানতে চাইলেন, “তা আপনি এবং আপনারা কেমন আছেন-টাছেন? সব খবর ভালো-টালো তো? আপনি জানেন-টানেন তো আমি বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ছিলাম?” তাঁর প্রতিটি বাক্যে এমন দ্বিরুক্তিসূচক শব্দ। আমি ভালো থাকার কথা বলি। তাঁর খবর জানতে চাই। এসময় একজন লোক প্রবেশ করেন। তাঁর এলাকা দাউদকান্দি থেকে এসেছেন। সাধারণ গ্রামীণ চেহারা। খুব প্রয়োজনে এসেছেন। কথা বলতে চান। তিনি সহসাই আনুষ্ঠানিক হয়ে যান। তাকে বলেন,“আপনি আসলেই তো হবে না। আমি এখন কী করে আপনার সাথে কথা বলি। উনি আমার কাছে সময় নিয়ে এসেছেন। আমাকে যদি আপনার সাথে কথা বলতে হয় তাহলে আপনি উনার অনুমতি নিন। উনি আপনাকে সময় দিলেই আমি আপনার সাথে কথা বলতে পারি।” আমি বিনয়ের সাথে সময় দেই। লোকটি তাঁর কথা বলেন। এলাকায় জমি নিয়ে পারিবারিক কী সমস্যা। তিনি বলে দিলেই সমস্যা থেকে তিনি মুক্ত হতে পারেন। খন্দকার মোশতাকের পা ধরতে আসেন। মোশতাক পা সরিয়ে নিয়ে তাকে আশ্বাস দেন। লোকটি চলে যান। এবার আমার সাথে কথা। তিনি তার প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন তিন মাসের কৃতিত্বের কথা বলে যান, “আমিই আপনার পত্রিকাটি বের করার অনুমতি দিয়েছি, একথা কী আপনারা মনে রেখেছেন-টেখেছেন? আমি জাতীয় পোশাক চালু করেছিলাম। আমিই মুসলিম দেশগুলোর স্বীকৃতি আদায়ের ব্যবস্থা করেছিলাম। আমার সময়েই চীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিল।” আমি বিরক্ত বোধ করি। সবকিছুতে নিজের কৃতিত্ব জাহির করা লোকজন আমার খুব অপছন্দ। আমি প্রশ্ন করার সুযোগ পাই না। এরপর তিনি বলেন, “আপনি যে আমার সাক্ষাৎকার নেবেন তা কি পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় ছাপা হবে। মনে রাখবেন আমি দেশের প্রেসিডেন্ট ছিলাম। আমার অধিকার আছে আপনার পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় স্থান পাওয়ার।” আমি তাঁকে আশ্বস্ত করি। আমি প্রশ্ন করি, আপনি একটি দল করেছেন। আপনার সাথে অনেক বড় বড় নেতাও আছে। ১৯৮১ সালে আপনার সভায় গোলযোগ হওয়ার পর আপনি আর কোনো সমাবেশ করেননি। সব দলই তো মাঠে। এ সময় আপনি ঘরে কেন? তিনি জবাব দেন যে, তাঁর দল মাঠে সক্রিয় রয়েছে। দলের নেতাকর্মীরা সক্রিয়। তিনি সব খবর রাখছেন। যেহেতু তার অনেক শত্রু আছে। দলের নেতারাই চান না যে তার ওপর কোনো আঘাত আসুক। তিনি সবসময় তাদেরকে নির্দেশনা দেন এবং তার নির্দেশনা ও পরামর্শ অনুসারেই তারা তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে, ইত্যাদি। আমি ইনডেমনিটি আইন নিয়ে প্রশ্ন করি, তিনি আমাকে থামিয়ে দেন। জেলখানায় চার নেতার হত্যা সম্পর্কে প্রশ্ন করলেও থামিয়ে দেন। তবে এটুকু বলেন,“আমার হাত পা বাঁধা ছিল। আমাকে দিয়ে সব করিয়ে নেয়া হয়েছে। জেলখানায় যা ঘটেছে তা আমি পরে জানতে পেরেছি। এরপর তো আমাকে সরিয়েই দেয়া হয়েছে।” কি বিচিত্র লোক। তার আদেশেই তার সাবেক রাজনৈতিক সহকর্মী, একই মন্ত্রীসভার সদস্যদের গ্রেফতার করা হয়েছিল, অথচ তিনি কিছুই জানেন না।
সব মিলিয়ে খন্দকার মোশতাক আহমেদকে রাজনৈতিক ক্যারিকেচার মনে হয়েছে। এমন একজন ব্যক্তি কী করে আওয়ামী লীগের মতো একটি দলের সূচনা থেকে গুরুত্বপূর্ণ সব দায়িত্ব পালন করেছেন। শেখ মুজিবের সাথে ছায়ার মতো ছিলেন, তাঁকে চিনতে আওয়ামী লীগের ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে! তার ভাগ্য ভালোই বলতে হবে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার তিন মাস আগে তিনি মারা গেছেন।
জহিরুলঃ অপরূপ ভৌগোলিক সৌন্দর্যের কারণে কাশ্মীরকে আমরা ভূস্বর্গ বলি, অন্যদিকে কাশ্মীর ভারত উপমহাদেশের একটি অগ্নিকুণ্ড। ভারত ও পাকিস্তানের মাঝখানে পড়ে কাশ্মীরের মানুষ যুগ যুগ ধরে অত্যাচারিত, নির্যাতিত এবং ভীতিকর এক জীবন যাপন করে। আপনি কাশ্মীর ভ্রমণ করার সুযোগ পেয়েছেন। কাশ্মীরের রাজনৈতিক ডাইনামিক্স, তখন এবং এখন, যদি আমাদের জানান।
মঞ্জুঃ কাশ্মীরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং কাশ্মীরকে বেহেশত-তূল্য বলে বিখ্যাত কবিরা যে বর্ণনা দিয়েছেন, তার কারণে কাশ্মীর মানুষের কল্পনায় বেহেশতে পরিণত হয়েছে। সম্ভবত এক্ষেত্রে কবি আমীর খসরুর অবদান সবচেয়ে বেশি। তিনি লিখেছেন, “গর ফিরদৌস বাররু-এ-জমিনাস্ত. হামিনাস্তো হামিনাস্তো হামিনাস্ত” [পৃথিবীতে যদি বেহেশত হতো, তাহলে এই সেই স্থান, এই সেই স্থান, এই সেই স্থান।] চির সৌহার্দ্যের ভূখণ্ড কাশ্মীরের অগ্নিকুণ্ড হয়ে উঠার ইতিহাস শুরু হয়েছে উপমহাদেশ বিভাজন প্রক্রিয়ার সময় থেকে। কাশ্মীর ঐতিহাসিকভাবে মুসলিম প্রধান এলাকা। কিন্তু একটি পর্যায় থেকে হিন্দু রাজার অধীনে শাসিত হচ্ছিল এবং বিভাজনের প্রক্রিয়ার সময় শাসক ছিলেন মাহরাজা হরি সিং। কাশ্মীরের প্রধান রাজনৈতিক দল মুসলিম কনফারেন্স ১৯৪৬ সালে সিদ্ধান্ত নেয় “আজাদ কাশ্মীর” এ পরিণত করার। অর্থ্যাৎ ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ দেশীয় রাজ্যগুলোকে পাকিস্তান অথবা ভারতে যোগ দেয়া অথবা স্বাধীন থাকার যে এখতিয়ার দিয়েছিল সেই আলোকে মুসলিম কনফারেন্স পাকিস্তান বা ভারতে যোগ না দিয়ে স্বাধীন দেশ হিসেবে থাকার পক্ষে প্রস্তাব গ্রহণ করে। তারা মহারাজা হরি সিং এর কাছে দাবী জানায় নির্বাচনের মাধ্যমে একটি গণপরিষদ গঠনের। মহারাজা নিজেও কাশ্মীরকে স্বাধীন রাখার পক্ষে ছিলেন। কিন্তু ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসের আগে সিদ্ধান্ত পাল্টে তারা মহারাজার প্রতি দাবী জানায় পাকিস্তানে যোগ দেয়ার জন্য। কিন্তু কাশ্মীরের একটি এলাকায়, যেটি বর্তমানে পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত আজাদ কাশ্মীরের অংশ, সেখানে মহারাজার প্রশাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু হয় উচ্চহারে কর বৃদ্ধির জন্য এবং তা দমন করতে মহারাজা কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। বহু মুসলিম নিহত হয় এবং উদ্বাস্তু হয়ে পড়ে। উপমহাদেশ স্বাধীন হওয়ার কয়েক মাস পর রাওয়ালপিণ্ডিতে অস্থায়ী আজাদ জম্মু ও কাশ্মীর সরকার গঠিত হয় এবং আজাদ কাশ্মীরের বর্তমান রাজধানী মুজাফফরাবাদের চলে আসে। ১৯৪৭ সালের শেষ দিকে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের কয়েক হাজার সশস্ত্র উপজাতীয় লোক, যারা মূলত পাশতুন, তারা জম্মু ও কাশ্মীরকে মহারাজা হরি সিংয়ের শাসনমুক্ত করার উদ্দেশে কাশ্মীরে আসে। মহারাজার বাহিনী তাদের হামলা ঠেকাতে ব্যর্থ হয় এবং হামলাকারীরা রাজধানী শ্রীনগরের কাছাকাছি পৌঁছে গেলে মহারাজা হরি সিং ভারতের সামরিক সহযোগিতার জন্য অনুরোধ জানান। কিন্তু মহারাজা ভারতে যোগদানের সম্মতিপত্রে স্বাক্ষর না দিলে ভারতের পক্ষে সামরিক সহযোগিতা করা সম্ভব নয় মর্মে জানানোর পর হরি সিং সম্মতিপত্রে স্বাক্ষর করেন। ভারত অবিলম্বে সামরিক হস্তক্ষেপ করে। পাকিস্তানও যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। দ্বন্দ্ব নিস্পত্তির জন্য ভারত জাতিসংঘের দ্বারস্থ হয় এবং জাতিসংঘে কাশ্মীরের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের জন্য গণভোট অনুষ্ঠানের পক্ষে প্রস্তাব গৃহীত হয়। কিন্তু আজ পর্যন্ত উভয় কাশ্মীরে কোনো গণভোট অনুষ্ঠিত হয়নি। পরবর্তীতে দুই পক্ষের যুদ্ধ বিরতি রেখা “লাইন অফ কন্ট্রোল’ হিসেবে কাশ্মীরকে বিভক্ত করে রেখেছে। ভারত কাশ্মীরকে ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দাবী করে এবং ভারতীয় পার্লামেন্টে তাদের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। অন্যদিকে আজাদ কাশ্মীর বা পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীসহ নিজস্ব সরকার রয়েছে এবং পাকিস্তানের পার্লামেন্টে তাদের কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই। ১৯৯০ সালের শীত মওসুমের পর কাশ্মীরকে ভারতের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করার জন্য সশস্ত্র যুদ্ধ শুরু হয়েছে, যা এখন পর্যন্ত চলছে। ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে নিয়মিত ও আধা-সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি এতো ব্যাপক যে পৃথিবীর আর কোথাও এতো সৈন্য সমাবেশের ঘটনা ঘটেনি বা নেই।
আমি কাশ্মীরের একটি অংশ, অর্থ্যাৎ আজাদ কাশ্মীরের মুজাফফরাবাদ ও আশপাশের এলাকা দেখার সুযোগ পেয়েছি। যেটুকু দেখেছি, তাতে কাশ্মীরের অপরূপ প্রাকৃতিক দৃশ্য আমাকে মুগ্ধ করেছে। কাশ্মীরের মূল অংশ, যা ভারত নিয়ন্ত্রিত সেখানে যাওয়ার সুযোগ হয়নি। ১৯৯০ সালের মে মাসে আমি পাকিস্তান ভ্রমণে গেছি; কিন্তু আমার ভ্রমণ পরিকল্পনায় কাশ্মীর ছিল না, হঠাৎ করেই আমার ভ্রমণ কর্মসূচিতে কাশ্মীর যুক্ত হয়েছিল। আমার গন্তব্য ছিল ইসলামাবাদ। সময় ও পরিস্থিতি কোনোটাই পাকিস্তান ভ্রমণের অনুকূল ছিল না। ১৯৯০ সালের মে মাস। পাকিস্তানে প্রচন্ড গরমের মওসুমের সূচনার সময়। প্রকৃতির দাবদাহকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছিল সিন্ধু প্রদেশে চলমান মুহাজির-সিন্ধী দাঙ্গা এবং প্রবল হয়ে উঠা কাশ্মীরের স্বাধীনতা অথবা বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগ্রাম। দাঙ্গায় করাচিতে প্রতিদিন ডজন ডজন মানুষ নিহত হচ্ছিল। সাত বছর আগে জার্মানি থেকে দেশে ফেরার সময় করাচি বিমান বন্দর থেকে হোটেল পর্যন্ত গিয়ে পরিচিত কয়েকজনকে ফোন করে কাউকে না পেয়ে সংক্ষিপ্ত যাত্রাবিরতি দিয়ে ঢাকায় ফিরে আসি। সে কারণে পাকিস্তান ভ্রমণ করতে না পারার অতৃপ্তি ছিল। স্কুলের ক্লাস শুরুর আগে এসেম্বলিতে পাকিস্তানের জাতীয় সঙ্গীত ‘পাক সার জমিন’ গেয়ে পাকিস্তানের চাঁদতারা খচিত পতাকাকে স্যালিউট করেছি। ১৪ই আগষ্ট স্বাধীনতা দিবস, ২৩শে মার্চ পাকিস্তান দিবস উদযাপন করেছি। স্কুলের পাঠ্য বইয়ে তদানীন্তন পশ্চিম পাকিস্তানের বড় বড় শহর, জিলা, ঐতিহাসিক নিদর্শন, খ্যাতিমান ব্যক্তি, নদী ইত্যাদির নাম পড়ে পড়ে বড় হয়েছি। পাটিগনিতের অংক কষতে পাকিস্তানের নামী ক্রিকেট খেলোযাড়দের রান সংখ্যা নিয়েও অংকের ফল মিলাতে হয়েছে। ১৯৬৮ সালে মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিত সামার অলিম্পিকে পাকিস্তান হকিতে স্বর্ণপদক লাভ করায় স্কুলে ছুটি পেয়েছি। আমাদের বৃহত্তর পরিবারের দু’জন পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে ছিলেন, ছুটিতে তারা বাড়িতে এলে তাদের কাছে পশ্চিম পাকিস্তানের গল্প শুনেছি। দেশ বিভক্ত হয়ে পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন বাংলাদেশ হিসেবে আবির্ভূত হলেও পাকিস্তান ভ্রমণের ইচ্ছার মৃত্যু ঘটেনি।
বাংলাদেশ বিমানের করাচি ষ্টেশন ম্যানেজার আনোয়ারুল হক এয়ারপোর্টে আমাকে রিসিভ করে বিমানের গাড়ি দিয়ে ড্রাইভারকে বলে দিলেন আমাকে গন্তব্যে পৌঁছে দিতে। জনমানবশূন্য রাস্তা, প্যারামিলিটারী সৈন্যদের টহল এবং যানবাহনের স্বল্পতা পরিস্থিতির ভয়াবহতা প্রমাণের জন্য যথেষ্ট ছিল। গুরুমন্দির রোডের এক রেষ্টহাউজে পৌঁছে দিল ড্রাইভার। ১৯৮৩ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত ওআইসি ফরেন মিনিষ্টার্স কনফারেন্স কভার করতে এসেছিলেন পাকিস্তানের জনপ্রিয় উর্দু দৈনিক জং এর চিফ রিপোর্টার আরিফুল হক আরিফ এবং জং এর সাপ্তাহিক প্রকাশনা আখবার-এ-জাঁহা’র সম্পাদক ও করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ বিভাগের প্রফেসর ড. নিসার জুবেরী। ঢাকায় তাদের থাকার ব্যবস্থা ও দেখভাল করা এবং আপ্যায়ন করার কারণে তাদের সাথে আমার সুসম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। নিসার জুবেরীকে পাওয়া গেল না। আরিফুল হক দৈনিক জং অফিসে আমন্ত্রণ জানালেন। পরদিনই করাচি ছাড়বো জানার পর তিনি আমাকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ লোকের নাম, ফোন নম্বর দিয়ে বললেন ইসলামাদে গিয়ে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে। রেষ্টহাউজে এক পাঞ্জাবী ব্যবসায়ীর সাথে পরিচয় হলো। আমিরুল আজিম। তিনি আমাকে বললেন ইসলামাবাদের আগে লাহোর হয়ে যেতে। উর্দুতে একটি ঠিকানা লিখে দিয়ে বললেন লাহোর ষ্টেশনে নেমে কোনো ট্যাক্সি বা স্কুটার ড্রাইভারকে ঠিকানাটি দিলেই জায়গামত পৌঁছে দেবে। সেখানে তিনি থাকবেন। তিনদিন করাচিতে কাটিয়ে লাহোরগামী ট্রেনে উঠলাম। লাহোরে ঠিকানা অনুযায়ী পৌছে গেলাম। সেটিও একটি রেষ্টহাউজ। আমিরুল আজিম অভ্যর্থনা জানালেন। আমাকে বললেন আজাদ কাশ্মীরের রাজধানী মুজাফফরাবাদ যেতে। সাংবাদিক হিসেবে কাশ্মীর পরিস্থিতি দেখার জন্য আমার যাওয়ার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বললেন তিনি সব ব্যবস্থা করে দেবেন। পাঞ্জাব ইউনিভার্সিটির ছাত্র আবদুল্লাহ ফারুক ভাট্টিকে ডেকে তার গাড়ির চাবি দিয়ে বললেন আমাকে লাহোর নগরী ঘুরিয়ে সন্ধ্যায় সেজান রেষ্টুরেন্টে নিয়ে যেতে। ভাট্টি আমাকে শাহী কিল্লা, শাহী মসজিদ, কবি ইকবালের মাজার, লাহোর প্রস্তাবের স্মৃতি বিজড়িত মাঠে মিনার-ই-পাকিস্তান, বিশাল বুকষ্টোর ফিরোজ এন্ড সন্সসহ আরো কিছু ঐতিহাসিক জায়গা ঘুরিয়ে দেখালো।
সন্ধ্যায় ভাট্টি এসে আমাকে নিয়ে গেল সেজান রেষ্টুরেন্টে। আমিরুল আজিম আমার সম্মানে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন এবং তার ঘনিষ্ট নবীন প্রবীণ জনা বিশেক সাংবাদিককে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। আমি রীতিমতো বিব্রত। বাংলাদেশ সম্পর্কে সবার অনেক কৌতুহল। অনুষ্ঠানে আমাকে বক্তব্য দিতে হলো, কিছু প্রশ্নের উত্তরও দিতে হলো। ইংরেজিতে না বলে উর্দুতেই কথা বললাম। আমার উর্দু জানা তাদের কাছে বিস্ময়। পূর্ব পাকিস্তানিরা উর্দুকে ঘৃণা করে, তাদের ধারণায় এটাই বদ্ধমূল ছিল। আমি বললাম, ভাষার সাথে বিরোধ ছিল না, চাপিয়ে দেয়ার প্রবণতাই বিরোধের কারণ। ভাষার প্রশ্নে তাদের বক্তব্য হলো, আমরা পাঞ্জাবী, উর্দু আমাদেরও ভাষা নয়। বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের স্বার্থে আমরা উর্দু গ্রহণ করেছি। আমি বলি, ভাষার রাজনৈতিক দিক নিয়ে আমার মাথা ব্যথা নেই। ব্যক্তিগতভাবে উর্দু কবিতা-গান আমাকে মুগ্ধ করে এবং সেই মুগ্ধতা থেকেই সামান্য উর্দু চর্চা করতে চেষ্টা করেছি। পরদিন আমার আপ্যায়নকারী আমার হাতে লাহোর-রাওয়ালপিন্ডির বিমানের টিকেট ধরিয়ে জোর করে পকেটে বেশকিছু রুপি গুঁজে দিলেন। রাওয়ালপিন্ডির কয়েকজনের নাম ও টেলিফোন নম্বর দিয়ে বললেন, যে কাউকে ফোন করলেই তারা আমাকে মুজাফফরাবাদ পাঠানোর ব্যবস্থা করবেন।
রাওয়ালপিন্ডির চাকলালা বিমানবন্দরের নাম কতো শুনেছি। সেই বিমানবন্দরে অবতরণ করলাম। ওআইসি পরিচালিত বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশী ছাত্র ফজলু বিমানবন্দরে আমাকে রিসিভ করে দশ মাইল দূরে ইসলামাবাদে তার ক্যাম্পাসে নিয়ে গেল। দু’দিন ইসলামাবাদে কাটিয়ে আমাকে দেয়া একটি নম্বরে ফোন করলে রাতে এক যুবক এসে মোটর সাইকেলে তুলে আমাকে রাওয়ালপিন্ডিতে এক বহুতল ভবনের অ্যাপার্টমেন্টে পৌঁছে দিল। এটি কাশ্মীরি সশস্ত্র গ্রুপের রাজনৈতিক সদর দফতর। নেতাদের সঙ্গে পরিচয় হলো। শীর্ষ নেতা প্রফেসর আশরাফ শরফ। শ্রীনগরের এক সরকারি কলেজের শিক্ষক। ভারতের বিরুদ্ধে সশস্ত্র আন্দোলনের পক্ষে রাজনৈতিক পর্যায়ে কাজ করছেন। রাতে আরো বেশ ক’জন নেতার সাথে খেতে বসে তারা কাশ্মীর পরিস্থিতি নিয়ে কথা বললেন। আমাকে অনেক জেরা করলেন আমি যে যথার্থই একজন সাংবাদিক এবং সন্দেহভাজন কেউ নই তা নিশ্চিত হতে চাইছিলেন তারা। তাদের সাথেই রাত কাটালাম। সকালে নাশতা সেরে প্রফেসর আশরাফ শরফের সাক্ষাতকার নিলাম।
দশটার দিকে একজন আমাকে চাকলালা বিমানবন্দরে নিয়ে মুজাফফরাবাদের টিকেট হাতে দিল। চৌদ্দ আসনের ছোট বিমান। আধা ঘন্টা পর মুজাফফরাবাদে পৌছলাম। ছোট্ট বিমানবন্দরের অল্প দূর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে খরস্রোতা এক নদী। সেখানে একটি গাড়ি নিয়ে আমার অপেক্ষায় ছিল তিনজন। প্রথমে তারা আমাকে একটি রেষ্টুরেন্টে নিয়ে গেল। সেখানে আরো কয়েকজন কাশ্মীরি যুবক। তারা পাকিস্তানের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়েরছাত্র। তাদের মধ্যে একজন তার বন্ধুর বিয়েতে রাজশাহী গিয়েছিল। বাংলাদেশের আতিথেয়তায় সে মুগ্ধ। তারা পাহাড়ি পথে চারদিকে উঁচু পর্বতশ্রেনীর মাঝে খোলা প্রান্তরে বড় ধরনের একটি তাবুতে নিয়ে গেল আমাকে। তাবুতে শ’খানেক যুবক। তাদের কাছে আমার পরিচয় দেয়া হলো। এসব যুবক ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর থেকে আজাদ কাশ্মীরে এসেছে অস্ত্রচালনার প্রশিক্ষণ নিতে এবং প্রশিক্ষণ শেষে কাশ্মীরে গিয়ে ভারতীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে। ইতোমধ্যে বেশ ক’টি যুদ্ধে অংশ নিয়েছে এমন ক’জন যুবকও ছিল সেখানে।
ছবি তোলার জন্য ক্যামেরা তুলতেই তারা ঘাড়ে ঝুলানো স্কার্ফে মুখ ঢাকলো। তারা যা বলার জন্য নির্দেশিত এর বাইরে কোনো কিছু নিয়ে মুখ খুললো না। আমাকে বললো তাদের সাথে যুদ্ধে গিয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করতে। এবার তাদের অনুরোধ রক্ষা করা সম্ভব নয় বলে দু:খ প্রকাশ করলাম। তাবুতে বিশাল ডেকচি ভর্তি চা। আমাকে চায়ে আপ্যায়ন করলো। মশলা ও লবন মিশ্রিত চা, ওরা বলে ‘কাওয়া’। প্রচন্ড গরমে পানিশূন্যতা কাটাতে ওরা দিনভর এই চা পান করে। সেখান থেকে আরেকটি ক্যাম্পে গেলাম। অসংখ্য কাশ্মীরি যুবক। তারাও ভারতের বিরুদ্ধে জিহাদে জয়ী হওয়ার সংকল্প ব্যক্ত করলো। মুজাফফরাবাদে কাশ্মীরি নেতাদের মূল অপারেশনাল হেডকোয়ার্টারে গিয়ে নেতৃস্থানীয় কাশ্মীরিদের সাথে সাক্ষাৎ হলো। তারা জিহাদে জয়ী হওয়ার ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করলেন। সন্ধ্যায় আমি একটি বাসে উঠে বেশ রাতে ইসলামাবাদে ফিরে এলাম।
আমার পাকিস্তান অবস্থানকালেই ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে দুটি বড় ধরনের ঘটনা ঘটে। একটি হলো কাশ্মীরের প্রভাবশালী ও শ্রদ্ধেয় ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতা এবং অল পার্টি হুররিয়াত কমিটির চেয়ারম্যান মিরওয়াইজ মৌলভি ফারুককে শ্রীনগরে তার প্রতিপক্ষ সশস্ত্র গ্রুপ গুলি করে হত্যা করে। তাঁর শবযাত্রায় অংশগ্রহকারীরা তাদের ধর্মীয় নেতার হত্যাকান্ডে উত্তেজিত ও বিশৃঙ্খল হয়ে উঠলে নিরাপত্তা বাহিনী তাদের ওপর গুলিবর্ষণ করলে চার মহিলাসহ ৭২ জন লোক নিহত হয়। মিরওয়াইজ বংশানুক্রমিক উত্তরাধিকারের একটি প্রতিষ্ঠান এবং নিহত মৌলভি ফারুক ছিলেন ক্রয়োদশ মিরওয়াইজ। তাঁর সতের বছর বয়স্ক পুত্র ওমর ফারুক নতুন মিরওয়াইজ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। অপর ঘটনাটি ছিল নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ এন্ড এনালিসিস উইং (র) এর সাবেক পরিচালক গিরিশ চন্দ্র সাকসেনাকে জম্মু ও কাশ্মীরের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দান। আমি রাওয়ালপিন্ডিতে বিদ্রোহী নেতাদের সাথে অবস্থানের সময়ই সাকসেনার নিয়োগে তাদের মধ্যে অস্বস্তির ভাব লক্ষ্য করেছি।
পাকিস্তানে আমার অবশিষ্ট দিনগুলোতে আমি কাশ্মীর পরিস্থিতি উপলব্ধি করার চেষ্টা করেছি। কাশ্মীরিদের সশস্ত্র সংগ্রামের উদ্দেশ্য এক ছিল না। দল-উপদলে বিভক্ত কাশ্মীরিরা অভিন্ন লক্ষ্য স্থির করতে ব্যর্থ হয়েছে। সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল কাশ্মীরের এক সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা শেখ আবদুল্লাহ প্রতিষ্ঠিত ন্যাশনাল কনফারেন্স এবং দ্বিতীয় বৃহত্তম দল কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রীর পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টি (পিডিপি) কাশ্মীরকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত রাখার পক্ষে। শেখ আবদুল্লাহর ন্যাশনাল কংগ্রেস বরাবর ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের মিত্র, আর পিডিপি ভারতীয় জনতা পার্টিরও মিত্র। কারণ তিনি ধর্মের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানে যোগ দিতে চাননি। কাশ্মীরে সরকার গঠনকারী বড় দুটি দলই যদি ভারতভূক্ত থাকতে চায়, সেক্ষেত্রে কাশ্মীরের স্বাধীনতা বা বিচ্ছিন্ন হওয়ার যুদ্ধ কতোটা সফল হবে তা প্রশ্ন সাপেক্ষ। ছোট ছোট বিদ্রোহী দলগুলোর আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে যারা অস্ত্র তুলে নিয়েছিল তাদের মধ্যেও ছিল নানামুখী স্বার্থ হাসিলের প্রতিযোগিতা। একটি গ্রুপ লড়াই করছিল কাশ্মীরের পূর্ণ স্বাধীনতার জন্য। আরেকটি গ্রুপ চাইছিল কাশ্মীরকে পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত করতে। ভারতের একটি রাজ্য হিসেবে ভারতভূক্ত হওয়ার পক্ষে ছিল কাশ্মীরের হিন্দু পন্ডিতরা ছাড়াও অনেক কাশ্মীরি এবং ভারতীয় বাহিনীর পক্ষে তারা গোপনে কাজ করতো। এ-ধরনের বিপরীতমুখী ও পরস্পর বিরোধী রাজনৈতিক চেতনায় উজ্জীবিত সশস্ত্র গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ অনিবার্য এবং পরবর্তী বছরগুলোতে হয়েছিল তাই। বহুধা-বিভক্ত কাশ্মীরিদের অনৈক্য ও চিন্তাধারার বৈপরীত্যকে সফলভাবে কাজে লাগিয়ে ভারতীয় সেনাবাহিনী কয়েক বছরের ব্যবধানেই কাশ্মীরিদের মধ্য থেকে প্রতি-বিপ্লবী গ্রুপ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয় এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপগুলোকে অকার্যকর করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এমন একটি পরিস্থিতির অপেক্ষায় ছিল। অন্যান্য দলের সরকার ক্ষমতায় এসে কাশ্মীর প্রশ্নকে অত্যন্ত স্পর্শকাতর ভাবলেও উগ্র হিন্দুত্ববাদী ভারতীয় জনতা পার্টি - বিজেপি’র কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বিলোপের ব্যাপারে আপোষহীন ছিল। ২০১৯ সালের ৫ই আগস্ট তারা কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদার গ্যারান্টি দানকারী সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ এবং ৩৫ ধারা বিলোপ করে জম্মু ও কাশ্মীরকে ভারতের অন্তর্ভূক্ত করেছে। এর অনিবার্য পরিণতি হিসেবে উপমহাদেশ হয়তো আরো বেশি সংঘাত, আরো বেশি রক্তপাত দেখবে।
জহিরুলঃ কাশ্মীরের মানুষ ধর্মপ্রাণ মুসলমান, যতদূর জানি ওদের জীবনাচার ও সংস্কৃতিতে সুফি চর্চার বেশ প্রভাব রয়েছে। এপার-ওপার দু'পাড়ের মানুষের সংস্কৃতিতেই কি সুফি চর্চার প্রভাব আছে? কি ধরণের সাংস্কৃতিক চর্চা আপনি প্রত্যক্ষ করেছেন?
মঞ্জুঃ আমার ধারণা, ভারতীয় উপমহাদেশে ধর্ম বিশ্বাসের উর্ধে ওঠে দুটি ভূখন্ডগত ও ভাষাগত জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠী নিজেদের পরিচয়ের ব্যাপারে প্রচণ্ড আত্মাভিমানী – পাঞ্জাবী ও কাশ্মিরী। তাদের জাতীয়তাবাদ ভারতীয় বা পাকিস্তানি নয়, পাঞ্জাবিয়াত ও কাশ্মিরিয়াত। এই দুটি ভূখণ্ডেই মুসলিম, হিন্দু ও শিখদের ওপর সুফিবাদের প্রভাব সার্বজনীন। এখনো কাশ্মীরে মানুষের জীবনে সুফি ঐতিহ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, তারা পৃথিবীকে উপলব্ধি করতে চেষ্টা করে আধ্যাত্মিকতা দিয়ে: “আমরা একই বাবা-মা’র সন্তান/ আমাদের মাঝে এই ভিন্নতা কেন/ হিন্দু ও মুসলিমদের একত্রে ইশ্বরের আরাধনা করতে দাও/ আমরা পৃথিবীতে সঙ্গীর মতো এসেছি/ আমাদের আনন্দ ও বিষাদ একত্রে ভাগ করে নেয়া উচিত।” ইতিহাসের নানা উত্থান-পতন, যুদ্ধ-সংঘাত সত্বেও সুফিবাদ কাশ্মিরী সমাজের ভিত্তি। তবে ভারতীয় উপমহাদেশে বিদ্যমান সুফি ঐতিহ্য থেকে কাশ্মিরী সুফি ঐতিহ্য একটু ভিন্ন। কাশ্মীরে প্রথম দিকের সুফিদের অধিকাংশ এসেছেন মধ্য এশিয়া থেকে এবং তারা এর বিকাশ ঘটিয়েছেন স্থানীয় ঐতিহ্য ও দর্শনকে সম্পৃক্ত করে, যার মধ্যে ইসলামী দর্শন ছাড়াও কাশ্মিরী বৌদ্ধ দর্শন, কাশ্মিরী শিব ভক্তি, তান্ত্রিক ঐতিহ্যকেও বাদ দেয়া হয়নি। যে কারণে অনেক সুফি সাধকের নামের সাথে যুক্ত হয়েছে “ঋষি”। যেমন: কাশ্মীরের চারার-ই-শরীফ এ বিখ্যাত সুফি শেখ নূর-উদ-দীনের মাজার রয়েছে। কাশ্মিরীরা তাকে জানে “নন্দ ঋষি” নামে। কাশ্মীরে সুফিরা ঋষি এবং ঋষিরা সুফি। মনোরম কাশ্মীরের পর্বত শীর্ষে ও উপত্যকায় অসংখ্য সুফির মাজার ও দরগাহ’র উপস্থিতির কারণে কাশ্মীরকে ঋষি ও পীরদের উপত্যকাও বলা হয়। কাশ্মীরে আমার অবস্থান যেহেতু অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ছিল, অতএব আমার পক্ষে কাশ্মীরের জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক চর্চা সম্পর্কে দেখার সুযোগ হয়নি। তবে কাশ্মীরের সুফিবাদ সম্পর্কে প্রথম জানতে পারি নব্বইয়ের দশকে পরিবেশ আন্দোলনে সক্রিয় হয়ে। সাড়ে পাঁচশ’ বছরের বেশি সময় আগে নন্দ ঋষি কর্তৃক তাঁর ভক্তদের বন সংরক্ষণের গুরুত্ব সম্পর্কে বলেছেন: “আ’ন পশ তেলিহ ইয়েলিহ ওয়ান পশ” [যতোদিন বন থাকবে ততোদিন খাদ্যের নিশ্চয়তা থাকবে।] এরপর থেকে শুধু নন্দ ঋষি নয়, আরো অনেক কাশ্মিরী সুফি সম্পর্কে জানার চেষ্টা করি। কাশ্মিরী সুফিরা ধর্মনিরপেক্ষ কাশ্মিরী সমাজের জন্য সার্বজনীন প্রেমের বাণী ছড়িয়েছে যা ঐক্য ও ধর্মীয় উদারতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। উভয় কাশ্মীরের সুফি ভক্তি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য অভিন্ন এবং ভারত ও পাকিস্তানের অবশিষ্ট অংশের সুফি দর্শন ও সাংস্কৃতি চর্চা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন।
জহিরুলঃ কাশ্মীরের লেখক বাশারাত পীরের "কারফিউড নাইট" বইটি আপনি অনুবাদ করেছেন। বইটি সম্পর্কে খুশবন্ত সিং বলেছেন, "চমৎকার লেখা, নির্মম সত্য এবং নিদারুণ মর্মস্পর্শী" - কি আছে এই গ্রন্থে?
মঞ্জুঃ জি, ২০১৯ এ ভারতের বিজেপি সরকার সংবিধান থেকে কাশ্মীরের ‘বিশেষ মর্যাদা’ সংক্রান্ত বিধান বাতিল করার পর উদ্ভুত পরিস্থিতিতে আমি কাশ্মিরী সাংবাদিক ও লেখক বাশারাত পীরের “কারফিউড নাইট” নামে আত্মজৈবনিক উপন্যাসটি বাংলায় অনুবাদ করার প্রয়োজন অনুভব করি। একজন কাশ্মিরী সেখানে ৭০ বছর ধরে চলে আসা সংকটকে কিভাবে দেখছেন, ভারতের বিরুদ্ধে সাধারণভাবে কাশ্মিরীদের মনোভাব কী, কেন তরুণরা অস্ত্রধারণ করতে গিয়ে অকাতরে জীবন দিচ্ছেন তা তুলে ধরা হয়েছে উপন্যাসটিতে। শৈশব থেকে আমরা কাশ্মীরকে ভূস্বর্গ হিসেবে জানি। কিন্তু সৌন্দর্যের সাথেই জড়িয়ে আছে কাশ্মিরীদের চরম দূর্ভোগ ও নিপীড়নের সত্তরটি বছর। উপন্যাসে তুলে আনা হয়েছে সার্বক্ষণিক ভীতিকর পরিবেশে, নিয়মিত কা্রফিউয়ের মধ্যে কাশ্মীরিদের জীবনযাপনের কাহিনি। কাশ্মীরের স্বাধীনতা ও অধিকার আদায়ের জন্যে কিভাবে সাধারণ যুবকরা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে, হাসিমুখে প্রাণ দেয় তারও বহু দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হয়েছে। ১৯৯০ সাল থেকে কাশ্মীর যেন এক মৃত্যু উপত্যকা, যেখানে মৃত্যুর নিশ্চয়তা যতটা সুনিশ্চিত জীবনের নিশ্চয়তা ততটাই অনিশ্চিত, বাশারাত পীর সে কথাগুলোই তুলে ধরেছেন তার হৃদয় নিঙড়ানো ভাষায়। কাশ্মীরের ইতিহাসের প্রকৃত তথ্য সংগ্রহ করে বাস্তবতাকে তুলে এনেছেন। তিনি শুধু মুসলমানদের ওপর নির্যাতনের বিবরণ দিয়েই তাঁর দায়িত্ব শেষ করেননি, যেসব কাশ্মিরী পণ্ডিত তাদের জন্মভূমি ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন তাদের মানবেতর জীবনের কাহিনিও তার উপন্যাসে উপস্থাপন করেছেন। কাশ্মীরকে বিভক্তকারী ‘লাইন অব কন্ট্রোল’ সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, ‘‘এই সীমান্ত রেখা টেনে নেওয়া হয়েছে আমাদের আত্মা, আমাদের হৃদয় এবং আমাদের মনের মধ্য দিয়ে। একজন কাাশ্মিরী, একজন ভারতীয় এবং একজন পাকিস্তানি যা বলে, লিখে এবং করে তার সবকিছুর মধ্য দিয়ে টানা হয়েছে এই রেখা।’’ বর্ণনার অভিনবত্ব ও বিস্তৃত পরিসরে মানুষের জীবন ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশের যে আবেগময় বর্ণনা গ্রন্থটিতে দেয়া হয়েছে তা এটিকে সুখপাঠ্য করেছে।
জহিরুলঃ আপনি হয়ত লক্ষ্য করে থাকবেন সম্প্রতি কাশ্মীরের কবিরা "মিয়া কবিতা" নামে এক ধরণের কবিতা লিখছেন। অনেকে মিলে ক্রমাগত মানুষের জীবনের গল্প বুনে যায় এই কবিতায়। কষ্টের গল্প, নির্যাতনের গল্প, ভারতীয় সেনাবাহিনীর অত্যাচারের গল্প। আপনার দেখা কাশ্মীরে এইসব গল্প কি খুঁজে পেয়েছেন, যদিও আপনি শ্রীনগরে যেতে পারেননি, গিয়েছেন মুজাফফরাবাদে, তবুও দুই পাড়ের মানুষের গল্প নিশ্চয়ই অনুধাবন করতে পেরেছেন।
মঞ্জুঃ কাশ্মীরের ‘মিয়া কবিতা’ সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা নেই। আমি মূলত কাশ্মিরী সূফিদের কবিতা এবং কয়েকজন কাশ্মিরী কবির কিছু আধুনিক কবিতা পড়েছি। তার মধ্যে আগা শহীদের কবিতাই বেশি পড়েছি। উনিশ শতকের একজন খ্যাতিমান কাশ্মিরী কবি মিয়া মোহাম্মদ বখশ এর দীর্ঘ কবিতা ‘সফর-উল-ইশক’ এর বঙ্গানুবাদ পড়েছি। এই দীর্ঘ মহাকাব্যিক ধরনের কবিতার কারণে তাঁকে ‘কাশ্মীরের রুমি’ বলা হয়। আপনি নিজেও হয়তো এই কবিতার কাহিনি সম্পর্কে শুনে থাকবেন, যেটি ‘সয়ফুল মুলক বদিউজ্জামাল’ নামে পরিচিতি। বাংলাদেশে এই কাহিনি ভিত্তিক একটি চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়েছিল পাকিস্তান আমলের শেষ দিকে। এটি পাঞ্জাবি ভাষায় লেখা একটি লোককাহিনি এবং সমগ্র উপমহাদেশে জনপ্রিয়। কাহিনির মূল কথা মানুষের প্রতি ভালোবাসা: “হে প্রভু, আমার হৃদয়ে প্রেমের আলো জ্বালিয়ে আমাকে আলোকিত করো, আমার হৃদয়ের আলো সমগ্র পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ুক।” আমি আগা শহীদ আলীর অনেক কবিতা এবং তাঁর কবিতার ওপর আলোচনা পড়েছি। তিনি রাজনৈতিক কবিতা লিখতেন এবং সবই কাশ্মীরের ওপর। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ কাশ্মীরের পোষ্ট অফিসগুলো সাত মাসের জন্য বন্ধ করে রেখেছিল, সেই প্রেক্ষাপটে লেখা তাঁর একটি কবিতা “দ্য কান্ট্রি উইদাউট এ পোষ্ট অফিস” অত্যন্ত জনপ্রিয়তা লাভ করে। “নিখোঁজদের পুরো মানচিত্র আলোকিত হবে/ মুয়াযযিনের মৃত্যুতে আমি মিনারের রক্ষাকারী/ শিগগির এসো, আমি এখনো বেঁচে আছি/ আলোর বিপরীতে রাখা বস্ত্র কখনো সাদা, এরপর কালো/...তার হাতে ডাকটিকেট বাতিল করার মোহর/ এটি একটি সংগ্রহশালা, যেখানে আমি খুঁজে পেয়েছি/ তার কণ্ঠের অবশেষ, সেই আকাঙ্খার মানচিত্র, যার কোনো সীমা পরিসীমা নেই।” তাঁর কবিতাগুলো আমার কাছে সঙ্গীতের মতো কানে বাজে: “আল্লাহর ফেরেশতারা আবারও শয়তানকে খুঁজছে!—পরিত্যক্ত/ মুক্তি কেনা হলেও যথাসময়ে বিক্রয় হয়েছে পাপ/ এবং কে সন্ত্রাসী, কে সন্ত্রাসের শিকার?/ দেশে যথাসময়ে ভোট হলেই আমরা জানতে পারবো।” কাশ্মীরের পরিস্থিতি আগা শহীদ আলীকে যুক্তরাষ্ট্রে স্বেচ্ছা নির্বাসনে থাকতে বাধ্য করে। ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ২০০১ সালে তিনি মারা যান। এছাড়া ফারুক নাজুকি ও রশীদ নাজুকির কিছু কবিতা পড়েছি। কাশ্মীর ও পাকিস্তান ঘুরে আসার আগে কাশ্মিরী কবিতা বা সাহিত্য সম্পর্কে আমার পড়াশোনা কম ছিল। ঘুরে আসার পর যখনই কাশ্মীরের বড় কোনো অঘটন ঘটেছে তখন কাশ্মীর সম্পর্কে জানার আগ্রহ আরো বেশি অনুভব করেছি। দুই কাশ্মীরের মানুষ বলতে ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের মানুষের সাথে কথা হয়েছে শুধু কাশ্মিরী মুজাহিদদের সঙ্গে। যেখানে অস্ত্র, প্রশিক্ষণ, যুদ্ধ, মৃত্যুর ঘটনা ঘটে সেখানে মানুষের কথার মধ্যে কষ্ট ও আবেগ বেশি থাকে। আমি তাদের সেই আবেগ অনুভব করেছি।
জহিরুলঃ কাশ্মীরের মানুষের শিক্ষাব্যবস্থা, শিল্প-সাহিত্যের চর্চা সম্পর্কে যদি কিছু বলেন। উল্লেখ করার মতো লেখক, কবি, শিল্পী এবং তাদের কাজ।
মঞ্জুঃ দুই কাশ্মীরের শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে আজাদ কাশ্মীরে পাকিস্তানি শিক্ষা ব্যবস্থার প্রভাব এবং ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে ভারতীয় শিক্ষা ব্যবস্থার প্রভাব শতভাগ। অথবা বলা যায় নিয়ন্ত্রণকারী দুই দেশের শিক্ষা কারিকুলাম অনুসরণ করা হয়। কারণ উচ্চতর শিক্ষা ও চাকুরির জন্য কাশ্মীরের ছাত্রছাত্রীদের ভারত ও পাকিস্তানের ওপর নির্ভর করা ছাড়া উপায় নেই। তবে ভারতে শিক্ষাব্যবস্থার ওপর রাজ্য সরকারের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে, অতএব তারা কিছু নিয়ন্ত্রণ রাখে শিক্ষাকে রাজ্যের ইতিহাস-ঐতিহ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূণ করে কারিকুলাম তৈরি করার ক্ষেত্রে। আজাদ কাশ্মীরেও হয়তো তাই করা হয়, কারণ তাদের সম্পূর্ণ পৃথক সরকার ব্যবস্থা রয়েছে। ইতোমধ্যে আমি যেসব কবির কথা উল্লেখ করেছি, যাদের কিছু কবিতা আমি পড়েছি। এর বাইরেও কাশ্মীরে অনেক বিদগ্ধ কবি, শিল্পী রয়েছেন। এ মুহূর্তে আমি মুখস্থ বলতে পারবো না। এখন সবকিছু উন্মুক্ত। আগ্রহীরা অনলাইন ঘেঁটে অনয়াসে জানতে পারবেন।
জহিরুলঃ দিল্লিতে অবস্থান কালে কেমন দেখেছেন ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের সৌহার্দ্য ও সহাবস্থান?
মঞ্জুঃ দিল্লিকে আমি ভারতের অনেক স্থানের চেয়ে তুলনামূলকভাবে অনেক শান্তিপূর্ণ নগরী হিসেবে দেখেছি। মানুষের মাঝে সৌহার্দ্য যথেষ্ট। যে কারণে বাবরি মসজিদ ধ্বংস করাকে কেন্দ্র করে সমগ্র ভারতে চরম এক উত্তেজনাপূর্ণ ও রক্তক্ষয়ী দাঙ্গার ঘটনা ঘটলেও দিল্লিতে তেমন কিছু হয়নি। দাঙ্গার সময়ে আমি মুসলিম অধ্যূষিত নিজামুদ্দীন, পুরনো দিল্লি, আজাদ মার্কেট এলাকায় গিয়ে সবকিছু স্বাভাবিক দেখতে পেয়েছি। দু’একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া দিল্লিতে দাঙ্গার প্রভাব পড়েনি। আমি যে মহল্লায় ছিলাম, সেখানে একটি মাঠে পাশাপাশি এক সারিতে একটি মসজিদ, একটি মন্দির ও একটি গুরুদুয়ারা ছিল। মসজিদে কোনো ওয়াক্তের নামাজ বাদ পড়েনি। তবে বিভিন্ন রাজ্যের অঞ্চলগত বিরোধ ছিল ঐতিহাসিকভাবেই। বিরোধ বলা ঠিক হবে না, মানসিক দূরত্ব বলা যেতে পারে। যেমন যেখানে বাঙালিরা আছে সেই এলাকা বাঙালি প্রধান। পাঞ্জাবিদের এলাকায় পাঞ্জাবিরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ, মাদ্রাজিদের পৃথক এলাকা – এমন আছে। মুসলমানদের ব্যাপারে সার্বজনীন নেতিবাচক মনোভাব চাকুরির ক্ষেত্রে ব্যাপক। এমন কি কোনো অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ে কোনো মুসলিম অ্যাপার্টমেন্ট কিনতে বা ভাড়া নিতে পারবে না, তা প্রায় স্বত:সিদ্ধ। ব্যতিক্রমী ঘটনা ঘটেছিল ১৯৪৭ ও ১৯৪৮ সালে। হিন্দুরা মুসলমানদের হত্যা করেছে, তাদের বাড়ি-ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দখল করেছে। ১৯৮৪ সালে ইন্দিরা গান্ধী তাঁর শিখ রক্ষীদের দ্বারা নিহত হওয়ায় শিখদের ওপর ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছে।
জহিরুলঃ ভারত-পাকিস্থানের কিছু উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থানের কথা বলুন, সেই সব জায়গা ভ্রমণ করে আপনার কি উপকার হয়েছে? কি শিখেছেন, কেমন আনন্দ পেয়েছেন?
মঞ্জুঃ ভারত ভ্রমণ প্রধানত দিল্লি কেন্দ্রিক। ১৫/১৬ বার আমি দিল্লিতে গেছি। দিল্লির বাইরে দু’বার চেন্নাই, একবার পণ্ডিচেরি এবং সম্ভবত চার বার কলকাতা গেছি। দিল্লিতে আমাকে একটি ফেলোশিপের জন্য ছয় মাস থাকতে হয়েছে এবং তখন মোগলপূর্ব নিজামুদ্দিন আউলিয়ার মাজার, কুতুব মিনার এবং মোগলদের লালকিল্লা, পুরানা কিল্লা, জামে মসজিদসহ অধিকাংশ মোগল ঐতিহাসিক স্থান ও নিদর্শন ঘুরে দেখার সুযোগ পেয়েছি। আধুনিক স্থাপনাও পরিদর্শন করেছি। ওই সময়েই আমি আগ্রায় তাজমহল, ফতেপুর সিক্রিতে আকবরের কিল্লা, সেকেন্দ্রা দেখি। প্রতিটি ঐতিহাসিক সৌধ পরিদর্শনের মধ্যে শুধু দেখা নয়, শিক্ষণীয় বিষয় থাকে। বিশেষ করে যারা মোগল ইতিহাস জানতে আগ্রহী ও ইতিহাস চর্চা করেন ও লিখেন এসব বিষয়ে তাদের লেখা শুরুর আগে নিদর্শনগুলো দেখে নেয়া উচিত বলে মনে করি। দিল্লি আমাকে সবসময় টানে এবং পৃথিবীর অন্য কোনো জায়গার চেয়ে আমি আবারও দিল্লি ভ্রমণ করাকে প্রাধান্য দেব। পাকিস্তান ভ্রমণের সময় করাচির বাণিজ্যিক এলাকা, ক্লিফটন বিচ, জিন্নাহর বাড়ি ও মাজার, লাহোরে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়, শাহী কিল্লা, শাহী মসজিদ, কবি ইকবালের মাজার, লাহোর প্রস্তাবের স্মৃতি বিজড়িত মাঠে মিনার-ই-পাকিস্তান, আনারকলি, বিশাল বুকষ্টোর ফিরোজ এন্ড সন্সসহ আরো কিছু ঐতিহাসিক জায়গা দেখি। ইসলামাবাদ নতুন সিটি, পাশ্চাত্যের নগর পরিকল্পনা অনুসারে তৈরি। গাছপালার সবুজে ভরা। এক পাশে পর্বতমালা, আরেক প্রান্তে রাওয়াল লেক। সেখানে দর্শনীয় বলতে মালগালা হিলস, যেটিকে বলা হয় ‘দামান-এ-কোহ’ অর্থ্যাৎ পর্বতের আঁচল, ওই পাহাড়ের ওপর থেকে সন্ধ্যায় ইসলামাবাদের অপরূপ দৃশ্য দেখা যায়। এছাড়া দেখেছি ৩৩ একর জায়গার উপর বেদুইনদের তাবু সদৃশ বিশাল ফয়সল মসজিদ। মসজিদের পাশেই মরহুম প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হকের মাজার। আমি তাঁর মৃত্যুর দু’বছর পর গেছি। জিয়াউল হকের জন্য তখনো মানুষের আবেগ ছিল। পাকিস্তানের দূর অঞ্চল থেকে দিনরাত হাজার হাজার লোক ভিড় করছে। ফয়সল মসজিদ ইসলামাবাদের প্রধান ল্যান্ডমার্ক। মসজিদের মূল ইবাদত কক্ষ, আশপাশের চত্তর মিলে দুই লাখ মুসল্লি একসাথে নামাজ আদায় করতে পারে। আমার ভ্রমণের সময় ওআইসি পরিচালিত ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাস ছিল মসজিদ কমপ্লেক্সেই। এছাড়াও মসজিদে আরো দু’তিনটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল তখন। প্রতিটি স্থান পরিদর্শনের সাথে ইতিহাস জানা, বিশেষ করে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাতাদের ভাগ্যের বিড়ম্বনার দিকটি আমাকে বেশি আকৃষ্ট করে। ইতিহাস বইয়ে পাঠ করে যা জানা যায় পরিদর্শনে তা পরিপূর্ণতা লাভ করে। এছাড়া সেইসব এলাকার মানুষের জীবনপদ্ধতি, আচরণ ও সংস্কৃতির সাথে পরিচিত হওয়াও বড় অর্জন।
জহিরুলঃ ভারত বা পাকিস্তানের কোনো রাজনৈতিক নেতার সাক্ষাৎ লাভ করার সুযোগ হয়েছে কি? সেই অভিজ্ঞতা জানতে চাই।
মঞ্জুঃ ভারতে আমার অবস্থান যেহেতু দীর্ঘ ছিল এবং আমি ভারতীয় পার্লামেন্টের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি ইন্সটিটিউটে ফেলোশিপ প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করেছিলাম, সেজন্য অনেক ভারতীয় নেতার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছে। কিন্তু আমি কোনো নেতার আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎকার গ্রহণ করিনি। আমার পাকিস্তান সফরের সময় বেনজীর ভূটো পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। লাহোর অবস্থানকালে জানতে পারলাম বেনজীর ভূটো মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো ছয় সদস্যের এক পার্লামেন্টারি প্রতিনিধিদল পাঠাচ্ছেন। প্রতিনিধিদলের প্রধান হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর আমীর সিনেটর কাজী হোসেন আহমদের কাছে দূত পাঠিয়েছেন তাঁকে সম্মত করার জন্য। আমি কাছেই এক বাড়িতে ছিলাম। পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবদুল্লাহ ফারুক ভাট্টি, যে আমাকে আগের দিন লাহোর শহর ঘুরিয়েছে, সে খবরটি জানতো। আমাকে বললো, আমি পিপলস পার্টির কারো সাথে কথা বলতে চাইলৈ সুযোগ নিতে পারি। আমি আগ্রহী হলাম। পিপলস পার্টির দূত, সম্ভবত কোন মন্ত্রী ছিলেন, তিনি রুম থেকে বের হলে ভাট্টি তাঁকে ধরলো। আমার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলে আমি কয়েক মিনিট সময় চাইলাম, তিনি কিছুতেই সাক্ষাৎকার দিতে রাজী হলেন না। তাঁর অফিসে যাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানালেন। সিনেটর কাজী হোসেন আহমদের সাথে পরিচিত হওয়ার জন্য প্রবেশ করলাম। তাঁর কাছে আধা ঘন্টা সময় চাইলে তিনি সম্মত হলেন। আমি তাঁর সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছি। তিনি একজন পাঠান এবং পেশায় আইনজীবী। একজন রাজনৈকি নেতার মৌলিক যেসব যোগ্যতা ও গুণাবলী থাকা উচিত সবগুলোর সমাহার তার মধ্যে ছিল। পাকিস্তান পার্লামেন্টের সিনেটর হিসেবে তার ভূমিকাও ছিল উল্লেখযোগ্য। এছাড়া রাওয়ালপিণ্ডিতে কাশ্মিরী মুজাহিদদের প্রধান মুখপাত্র প্রফেসর আশরাফ শরফের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। তার চোখে একজন শিক্ষকের বিপ্লবী হয়ে ওঠার এবং বিজয়ের আকাঙ্খার প্রদীপ জ্বলতে দেখেছি।






Comments
Post a Comment