কবিতাবই
দেওয়াল ঘড়িটা কী মিথ্যুক
লেখক: কাজী জহিরুল ইসলাম
সমালোচক: অয়ন ঘোষ
কবি কাজী জহিরুল ইসলাম এর সাথে আমার আলাপ সামাজিক মাধ্যমে। "কফি ও কবিতার" আসরের অনবদ্য সঞ্চালক তিনি। সেখানেই দেখা ও একটু একটু করে বোঝা। দূর থেকে যতটা বুঝেছি এই ক'দিনেই, তা হলো মানুষটি ভালো মনের ও আদন্ত্য কবিতা পাগল। সুরসিক তিনি ও ছন্দের সুচারু জ্ঞান তার অনায়স আয়ত্তে। ফেইসবুকের দেওয়ালে যে কবিতা পোস্ট করেন, আগ্রহ নিয়ে সেই কবিতা পড়ি এবং সেই থেকেই আমার লাইভ অনুষ্ঠানে ওর কবিতা পাঠ। তারপর ইচ্ছে হলো ওর কবিতার গভীরে ডুব দেবার। আমি তার কিছু কবিতা চাইলে জহিরুল দাদা তার "দেয়ালঘড়িটা কী মিথ্যুক" এই কাব্যগ্রন্থ থেকে দশটি কবিতা পাঠান। এই আলোচনা সেই কবিতার শরীর ঘিরে।
এই দশটি পড়ে প্রথমেই আমার যা মনে হয়েছে প্রতিটি কবিতার মধ্যেই অন্তর্লীন এক সুরের নিগূঢ় বন্ধন রয়েছে ফলে কবিতাগুলি শরীরে আলাদা হলেও মনে মনে একই নদীর ফল্গুধারা। আসলে এ'ক্ষেত্রে কবিতার ও কবির অবস্থানগত যে যাপন তার কাছে যদি ফেরা যায় তাহলে সম্যক বোঝা যাবে। অনেকই হয়ত Roland Barthes এর "The Death of the Author" এর কথা বলতে পারেন কিন্তু আমি ওই থিওরির সাথে সম্পূর্ণ একমত নই। এ-প্রসঙ্গে আমার বিশ্বাস কবিকে না জানলে তার প্রেক্ষিত না জানলে, কিছুটা ফাঁক থেকেই যায়। কবি কাজী জহিরুল ইসলাম যেহেতু অনেকদিন কর্মসূত্রে আমেরিকাবাসী ও প্রিয় স্বদেশ থেকে অনেক দূরে, তাই তার কবিতায় diaspora বা অভিবাসী সাহিত্যের যে মূল সুর, nostalgia বা স্বরণবেদনা, তা খুবই প্রাসঙ্গিক ভাবে এসেছে। কবি সততই স্মৃতির পাতায় পাতায় ছড়িয়ে পড়েছেন আর সেখান থেকে মনিমুক্তো তুলে এনে সাজিয়েছেন পাঠকের জন্য যা পড়তে পড়তে মন ভারী হয়ে উঠেছে। যেমন "পরাধীন পা" কবিতাটিতে বিদেশ বিভূঁইয়ে আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য ও আরামের জীবনের মধ্যেও কবি হাঁপিয়ে উঠেছেন কারণ আর যাই হোক এদেশ তার নিজের নয়। তাই তিনি গৃহ ব্যাকুল হয়ে তার পুরনো ঠিকানা স্মরণ করছেন যা এখন তার কাছে প্রায় নিষিদ্ধ:
"নবীন চরের কাদা...গোপাটে হেঁটে বেড়ানো/ নিষিদ্ধ এখন"। অভিবাসীদের লেখার মধ্যে এক ধরনের দোটানা থাকে পরিচয় নিয়ে, এই কবিতায় তা সম্যকরূপে বর্তমান।
"সাপের আনন্দ ভ্রমণ" কবিতায় আমার পুরাণের বিনির্মাণ চোখে পড়েছে। কবির বেড়ে ওঠা এই প্রাচ্যভূমিতে। এখানকার জল হাওয়ায় সাথে তার কল্পনা পুষ্ট হয়েছে। তারপর তার পড়াশোনা তাকে নিয়ে ফেলেছে পাশ্চাত্যের গাঁথায়। বাইবেলের Genesis এর যে সৃষ্টিরহস্য, লাল আপেলে ইভের পয়লা কামড়, তার বিদ্রোহী সত্ত্বা এই কবিতায় বারবার এসেছে। আর তার সাথে জীবনের সিঁড়ি ভাঙা অঙ্কের পিছনে আমাদের অনিবার্য ছুটে চলা কে মিশিয়ে দিয়েছেন কবি। ঈশ্বরের বারণ না শুনে জ্ঞানবৃক্ষের ফলের আস্বাদ যেমন স্বর্গচ্যুত করেছিল প্রথম মানব মানবীকে, ঠিক তেমনি অর্থ আর প্রতিপত্তির পিছনে ছুটতে ছুটতে মানুষ বিস্বাদ করে তুলছে তার জীবনের আশু মুহূর্তগুলোকে।
একইভাবে "দুই বোন" নামের যে কবিতাটি সেখানেও মিথের বিনির্মাণ আমাদের চমকিত করে। কবিতাগুলি পড়তে পড়তে মনে হয় তুলনামূলক পুরান কথায় কবির গভীর আগ্রহ এবং সেখান থেকে উপাদান নিয়ে শিল্পের সুচারু বিনির্মাণ করতে তিনি সিদ্ধহস্ত। কিন্তু এই কবিতায় শব্দের যে ব্যবহার তাতে বাংলাদেশের মাটির নরম গন্ধ। আর এখানেই কবিতা ভেঙে দিচ্ছে দেশ-কালের বেড়া। গ্রীক পুরাণের দুই চরিত্র, দুই বোনকে মনে হচ্ছে আমাদের পাশের বাড়ির মেয়ে। আমার কাছে এই কবিতাটিকে খানিকটা রাজনৈতিকও মনে হয়েছে। দুই বোন যখন ভাগ করে পুরো বন খেয়ে ফেলে তখন রাজনীতির ক্ষমতাধর দুই নারীচরিত্রকে কল্পনা করাটা খুব একটা দূরভিসন্ধিমূলক হবে না নিশ্চয়ই। এই কবিতায় ইংরেজি সাহিত্যের ভিক্টোরিয়ান যুগের কবি C. G. Rossetti র কবিতা Goblin Market এর দুই সহোদরার সাথে অনুপম সাযুজ্য রয়েছে।
"আপেল বাগান" কবিতায় কবির শব্দ নিয়ে খেলার স্বভাবজাত মুন্সিয়ানা চোখে পড়েছে। এক দুর্দান্ত চিত্রকল্পের মধ্য দিয়ে বন্ধ্যা প্রকৃতির ছবি এঁকেছেন ও তার স্থায়ীর ভিতর বেদনার রস ঢেলেছেন। কোনো সৃষ্টিই সম্পূর্ণ নয় প্রকৃতি ও পুরুষের আন্তরিক সহাবস্থান ছাড়া। আর প্রথা কাউকে পূর্ণ করে না, প্রেমে পূর্ণতা পায় জীবন। এই কবিতা জীবন বোধের শরিক। ফলভারে আনত জীবনের প্রতি কবির অমলিন আকাঙ্খার প্রকাশ: "ফলবতী আপেল বাগান ছাড়া পৃথিবী কী করে পয়মন্ত হবে?"
"কালো পাখি" ও "উপন্যাস" এই দুই কবিতাকে আমরা কবির অভিবাসী জীবনের অনিবার্য পরিণতি হিসেবে ধরতে পারি। এমনিতেই যে কোনো অভিবাসী সাহিত্যিকের মধ্যে এই প্রবণতা স্বাভাবিক ভাবেই বর্তমান। আমি যে কবির ওপর গবেষণা করছি সেই A. K. Ramanujan ও অভিবাসী ছিলেন। তার প্রায় অর্ধেক জীবন কেটেছে শিকাগো শহরে। কাজ করতে গিয়ে তার প্রায় আশি শতাংশ কবিতার অভিবাসী জীবনের দ্বন্দ ও শিকড়ের সন্ধানে যাত্রা লক্ষ্য করেছি। এখানেও সেই একই দ্বন্দ ও দ্বিধা পথ: "সেই পাখি কি করে ঘুমিয়ে গেলো নতুন আকাশে"। এখন তার সব আছে ওড়ার আকাশ অনেক বেশি রঙিন, মসৃণ কিন্তু পুরনো পাখার সন্ধান না পেয়ে মনোকষ্টে দিন কাটে তার। এ বেদনা একেবারেই তার একার, বড় নিজস্ব। পুরনো গ্রন্থের পাতায় রঙ ঢেলে যদিও বা নতুন উপন্যাস লেখা হলো কিন্তু সে উপন্যাস নিজের হয়ে উঠল না।
অনেক আলোর মাঝেও অদ্ভুত এক আঁধার ঘিরে রয়েছে কবির যাপনকে। নদীর গর্ভের অন্ধকারে কতো রঙিন নিমেষ লুকিয়ে রইল তার খবর কে রাখে। সবাই তার ওপরের স্রোত দেখে। কবি তার primary imagination এ ভর করে পাড়ি জমান নিষেধ পেরোনো অন্তহীন অতলে। সেই আলোহীন প্রদেশে অক্ষর-আলো মূর্ত হয়। এক অলৌকিক প্রবহমান জীবনের সাক্ষী কেবল কবিই থাকেন, "যেতে যেতে একটা নদী" কবিতায় তারই নির্মাণ।
"নিষিদ্ধ পল্লী" ও "ভয়ের অনুপ্রাস" এই দুটি কবিতায় ঘরের স্বপ্ন ভাঙার বেদনা যেমন আছে তেমনি তার থেকে মুক্তির যাচনাও বর্তমান। আমাদের প্রত্যেকের জীবনে কিছু কিছু বিশ্বস্ত ক্ষত আছে, যা ক্ষণে ক্ষণে যন্ত্রণা দেয় কিন্তু সেই যন্ত্রণার অন্য রকমের একটা আমোদ আছে, আনন্দ না থাকলেও। পূর্ণতা আর অপূর্ণতার মধ্যে একটা স্বর বর্ণের অন্তরায় মাত্র। ওই আড়ালটুকুই আমাদের তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়, তাই বা কম কিসে!
মানুষ সব নিয়েই ধন্য প্রাণের সম্মানে। তাহলে তার সৃষ্ট কবিতাই বা তার ব্যতিক্রম হবে কি ভাবে? আলোর পথযাত্রী যে, সে কি আঁধার রাতে তার যাত্রা বিরতি দিতে পারেন। মাঃ ভৈ মন্ত্রে যে তার দীক্ষা। তাই তো তিনি স্বপ্ন দেখেন "দিন আসবেই"। দেবদূতের অশ্রুর মতো রাত ঝরে যাবে নিঃসাড়ে। তারপর অমল ধবল পালে বাতাস লেগে ভোর আসবে আর সেই ভোরের নীল আকাশে মুক্ত হয়ে পাখি উড়বেই। সেই দিনের অপেক্ষা থাকুক এই পাখি-বুকে। ওইটুকু যে আমাদের বড় আপনার।


Comments
Post a Comment