Skip to main content

ভয়কে জয় করার গল্প

অ্যা জার্নি টু জন জে

।। কাজী জহিরুল ইসলাম ।।  




ম্যানহাটনকে আড়াআড়ি ক্রশ করে ছুটছি ইস্ট সাইড থেকে ওয়েস্ট সাইডে। লক্ষ জন জে কলেজ। হালকা তুষারপাত শুরু হয়েছে। দেখতে দেখতে ফুটপাত, দেয়ালের কার্নিশ শাদা হয়ে গেল। এক চিলতে শহর ম্যানহাটন। এই শহরে আমি কখনোই যানবাহনে চড়ি না। দালানের সারি আমার ভালো লাগে না, কংক্রিটের বস্তি মনে হয়, কিন্তু কোনো এক অদ্ভুত কারণে এই শহরের দালানগুলো আমার ভালো লাগে, এই শহরের মানুষগুলো ভালো লাগে। হাঁটতে হাঁটতে মানুষ দেখি, দালান দেখি, দোকান দেখি, বিভিন্ন মডেলের নতুন নতুন গাড়ি দেখি।

এই শহরের প্রতিটি রাস্তায়ই উপচে পড়া মানুষের ভিড়, এবং আমি টের পাই, মানুষের ভিড়ই আমার সবচেয়ে ভালো লাগে। আমার কাছে মনে হয় মানুষের চেয়ে সুন্দর কিছু নেই, সেই মানুষ যেমন মানুষই হোক। নাক বোঁচা, চোখ ছোটো, চুল কম বা ন্যাড়া মাথা, বেটে কিংবা কালো, যেমনই হোক, সকল মানুষই সুন্দর। কত রঙের মানুষ, কত রকমের মানুষ, একেকটি মানুষ যেন একেকটি গল্প। আমি সেইসব গল্প কুড়িয়ে কুড়িয়ে আমার ঝুলিতে তুলে নেবার চেষ্টা করি। এই দুর্যোগের দিনে বেরুবো না ভেবে ফোন দিই রাজুকে। অধ্যাপক রাজু ভৌমিক। জন জে কলেজের ক্রিমিনোলোজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। ২৯ বছরের এক উজ্জ্বল তরুণ। টের পাই ফোনের ওপাশে আহত কন্ঠ। ‘আজ এলেই ভালো হত। আমি কিছু আয়োজন করে রেখেছিলাম’। আরো কিছু যুক্তি দিতে চাইলো, আমি ওকে থামিয়ে দিয়ে বলি, আসছি।

এই জার্নির শুরু আরো অনেক অনেক দিন আগে। ছেলেবেলা থেকেই আমার ছিল ইংরেজি ভীতি। ভাগ্যিস দ্বিতীয় পত্রে ইংরেজি ব্যকরণ ছিল, ব্যকরণের ওপর ভর করেই শ্রেণি বদলের বৈতরণী পেরিয়েছি। লিটারেচার দেখলেই গায়ে জ্বর। উত্তর মুখস্ত করে লেখা একদমই হতো না আমার। আর বানিয়ে বানিয়ে ইংরেজি লেখা, অসম্ভব। ইংরেজি সাহিত্য আমার ক অক্ষর গো মাংস হলেও বিদেশিদের সাথে যোগাযোগে ছিলাম খুবই স্বচ্ছন্দ। হাই স্কুলের শুরুতেই পুরনো ঢাকা থেকে বাসা বদল করে বাড্ডায় চলে যাই। আব্বা জমি কিনে বাড্ডায় একটি ডেরা তুলেছিলেন সত্তরের দশকের মধ্যভাগে। তখন একবার গিয়েও বর্ষার বিলের উথাল-পাথাল ঢেউয়ের কাছে পরাজিত হয়ে ফিরে আসি। তিন বছর পর আবারো আব্বার এডভেঞ্চারের সঙ্গী হয়ে ছুটে যাই বাড্ডার বিলে। তখন আমি মাত্র ছয় ক্লাস পেরিয়েছি। যখন শীতকাল এলো, বাড্ডার অবারিত খোলা প্রান্তর, সবুজ ঘাস আর ফসলের মাঠ আমাকে পাগল করে তোলে। রোজ বিকেলে ফাঁকা বিল পাড়ি দিয়ে হেঁটে হেঁটে গুলশানে চলে যাই ফুল চুরি করতে। তখন দেখা হয় নানান দেশের মানুষের সাথে। কী অবলীলায় ওদের সাথে গল্প জুড়ে দিই। তখন কিন্তু একটুও মনে হয়নি ইংরেজি একটি কঠিন ভাষা।

১৯৯০ সালে ব্র্যাকের চাকরি নিয়ে ছুটে যাই হবিগঞ্জে। কিছুদিন পর বেরি নামের এক আমেরিকান যুবক এসে হাজির। লম্বা সোনালি চুল ওর ঘাড়ের নিচে দোল খায়। মাঝে মাঝে সে তাঁর লম্বা চুল ব্যান্ড দিয়ে বেঁধে ঝুঁটি বানায়। দু’অবস্থাতেই ছিপছিপে লম্বা এই তরুণকে আমার ভালো লাগে। গবেষণার কাজে এসেছে বেরি। অফিসে এতো লোক থাকতে আমার সাথেই ওর বন্ধুত্ব হয়। অফিসই ছিল আমাদের বাসা। নিচতলায় অফিস আর ওপরতলায় বাসা। বাসা থেকে দেখা যেতো খরস্রোতা খোয়াই নদীর উত্তাল বুক। যেহেতু কাজ, থাকা, খাওয়া সবই একসাথে, বেরি হয়ে যায় আমার প্রাণের বন্ধু। ওর বাড়ি ম্যাসাচুসেটসে। আমার সোনালি ব্যংকের ডায়েরিতে বেরি লাল কালিতে ওর নাম ঠিকানা লিখে দিয়েছিল। কিন্তু সেই ডায়েরি আমি হারিয়ে ফেলি। পরের বছর আমার ছোটোবোনের বিয়েতেও বেরি এসেছিল। ওর খুব ইচ্ছে ছিল একটি বাংলাদেশি বিয়ে দেখবে।

না, ইংরেজি ভীতি কিন্তু আমার একদমই কাটেনি। ব্র্যাকের চাকরি ছেড়ে দিয়ে ১৯৯১ সালে ঢাকায় চলে আসি। যোগ দিই বিজ্ঞান গণশিক্ষা কেন্দ্রে। এনজিও হলেও এর যাবতীয় কাজ-কর্ম বাংলায়ই হত। কাজেই আমাকে তেমন ঝামেলায় পড়তে হয়নি। দুবছর পর আমার এক সহকর্মী আবদুল ওয়াহাব ম্যানিলার এশিয়ান ইন্সটিটিউট অব ম্যানেজমেন্টে মাস্টার্স করতে যান। ফিরে এসে আমাদের সকলকেই উৎসাহিত করেন আমরাও যেন এই ডিগ্রিটি করার সুযোগ নেই। টাকার অভাব হবে না। নানান রকমের ডোনার আছে। আমি তো সকলের আগেই লাইনে দাঁড়িয়ে যাই। বিদেশে পড়তে যাবার স্বপ্ন আমার চোখে-মুখে। কিন্তু সমস্যা হলো যখন শুনলাম, এআইএম থেকে একজনমাত্র প্রতিনিধি এসেছেন, তাঁর সাথে আরো তিনজন বাঙালি বুজুর্গ লোক থাকবেন, তাঁরা ইন্টারভিউ নেবেন। শুনেই আমার গায়ে জ্বর এসে যায়। প্রকৃতপক্ষে তখনই আমি আবিস্কার করি ইংরেজি ভীতি আমার বাঙালিদের সাথে। বিদেশিদের সাথে স্বচ্ছন্দে কথা বলতে পারলেও বাঙালিদের সাথে এক বর্ণও ইংরেজি বলতে পারি না। আমি কিন্তু বেশ স্বচ্ছন্দে ইংরেজি লিখতেও পারি। ইংরেজিতে সাহিত্য রচনা করতে না পারলেও, রিপোর্ট লেখা বা কোনো একটি ঘটনা বর্ণনা করা তেমন কঠিন মনে হতো না। সমস্যা হচ্ছিল শুধু বাঙালিদের সাথে ইংরেজিতে কথা বলতে গেলেই। 

ইন্টারভিউ বোর্ডের সামনে যখন বসেছি। আমি চোখে-মুখে অন্ধকার দেখছি, গায়ে জ্বর। কাঁপতে কাঁপতে কী সব উত্তর দিয়েছি জানি না। তবে পরের দিন জানানো হয় এআইএম তাদের ছাত্র হিসেবে আমাকে গ্রহণ করেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমার আর যাওয়া হয়নি কারণ সে বছর আমাদের নির্বাহী পরিচালক ড. ইব্রাহীম সিদ্ধান্ত নেন আমাকে নয়, অন্য দুজন সহকর্মী হাদিউজ্জামান এবং হাসনা বানুকে এই কোর্সে ম্যানিলা পাঠাবেন। কেননা তাঁরা পদাধিকার বলে আমার চেয়ে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা।

৯৬ সালের মার্চ মাসে বিয়ে করে ফেলি। বিয়ের পর মুক্তি প্রায়শই আমাকে খোঁচায়, ওখানেই পচে মরবে, না এদিক-সেদিক চোখ খুলে একটু চাকরির বাজারটা দেখবে? সে তখন সেইভ দি চিলড্রেন অস্ট্রেলিয়ার ট্রেইনিং অফিসার। আমি বলি, আন্তর্জাতিক এনজিওতে আমার হবে না, আমি ইংরেজিতে কথা বলতে পারি না। একদিন সে ডেইলি স্টারের একটি পেপারকাটিং আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে নির্দেশের সুরে বলে, এপ্লাই করো। আমিও অনুগত স্বামীর মতো এপ্লাই করে দিই। সেইভ দি চিলড্রেন ইউকে তখন বেশ নামকরা এনজিও, ওদের বেতন কাঠামো বেশ ভালো। আমি নিশ্চিত আমাকে ডাকবে না, ওসব জায়গায় আগে থেকেই ধরাধরির ব্যাপার থাকে। কিন্তু কী আশ্চর্য দু’সপ্তাহের মাথায়ই বাসায় চিঠি চলে আসে। তিনদিন পর লিখিত পরীক্ষা। আমি কখনোই কোনো লিখিত পরীক্ষাকে ভয় পাই না। আমি জানি যদি একজন পাস করে সেই একজনই আমি। হলোও তাই। লিখিত পরীক্ষায় পাস, এবার ইন্টারভিউ। এসিস্ট্যান্ট ফাইনান্স ম্যানেজার পদের ইন্টারভিউ প্রতিষ্ঠানটির কান্ট্রি ডিরেক্টর সায়মন মলিসন নেবেন শুনে আমি কিছুটা আশ্বস্ত, যদিও আমি নিশ্চিত এতো ভালো বেতনের চাকরি আমার হবে না। ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে দেখি সায়মনের দুপাশে দুই বুজুর্গ বাঙালি, যারা চিবিয়ে চিবিয়ে অদ্ভুত উচ্চারণে ইংরেজি বলছেন। ওদের দেখেই আমার প্যান্টে হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। শেষমেশ কি মনে করে ওরা চাকরিটা আমাকে দিয়েই দিলো।

কিন্তু চাকরি নিয়ে টের পাই আমি স্বেচ্ছায় এক হাবিয়া দোযখে ঢুকেছি। উঠতে-বসতে খালি ইংরেজি আর ইংরেজি। একমাত্র পিয়ন জয়নাল আর কুক পরিমল ছাড়া কেউ বাংলায় কথা বলে না। আমি রীতিমত ইদুরের গর্তে লুকিয়ে থাকি। কাউকে আমার অফিসে আসতে দেখলেই ছুটে বাথরুমে গিয়ে লুকাই। ডায়নিং টেবিলে খেতে যাই সকলের খাওয়া হয়ে গেলে। তিনটার টি ব্রেকে কদাচিৎ কেউ ধরে না নিয়ে গেলে যাই না। আমার এই সমস্যা আবিস্কার করেন সহকর্মী, নাট্যব্যক্তিত্ব, জন মার্টিন। তাঁকে সব খুলে বলি। মার্টিন সায়মনের সাথে কথা বলে। আমিসহ, যারা ইংরেজিতে দূর্বল, তাঁদেরকে ব্রিটিশ কাউন্সিলে কোর্স করতে পাঠানো হয়। কিন্তু ওখানে গিয়ে দেখি ওরা যা শেখায় সবই আমি পারি। ব্রিটিশ মহিলার সাথে ইংরেজিতে কথাও বলতে পারি। অর্ধেক কোর্স করেই ইস্তফা দিয়ে চলে আসি। এরপর কিছুটা সাহস বাড়ে। একটু একটু করে আমি আমার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসতে থাকি। লন্ডন থেকে প্রকাশিত সেইভ দি চিলড্রেনের ম্যাগাজিনে আমার লেখা ছাপা হয়। সেটা হাতে নিয়ে সায়মন এসে আমাকে অভিনন্দন জানায়। এভাবে আমার আত্মবিশ্বাস বাড়তে থাকে।

আবারো মুক্তির তাড়া। এখানেই জীবন পাড় করে দেবে নাকি অন্যদিকেও তাকাবে? আমি বলি, এই চাকরিটা মন্দ কি? প্রায় পঁচিশ হাজার টাকা বেতন, ঈদ বোনাস, গ্রাচুইটি, কতো সুযোগ সুবিধা। মুক্তি আমার মধ্যে এর চেয়েও বেশি সম্ভাবনা দেখতে পায়, যা আমি দেখি না। ২০০০ সালের মার্চ মাসে পুরনো সহকর্মী আবদুল মমিন একদিন আমার অফিসে এসে হাজির। একটি কাগজ বাড়িয়ে দিয়ে বলেন, জহির ভাই, আমি ইংরেজিতে একটি সিভি লিখেছি, জাতিসংঘে চাকরির জন্য আবেদন করবো। আমার সম্মন্ধি আছেন ওখানে, তিনি সাহায্য করবেন। আপনি যদি কাইন্ডলি সিভিটা এদেখে দেন খুব উপকার হয়। 

আমি ওর সিভিটা দেখে দিলে মমিন চলে যায়। ওকে বিদেয় দিয়ে রুমে ঢুকতেই মনে হয়, আচ্ছা মুক্তি আমার মধ্যে এতো প্রতিভা দেখতে পায় যখন আমিও তো জাতিসংঘের চাকরির জন্য আবেদন করতে পারি। একজন চাকরি প্রার্থীর আবেদনপত্র পরীক্ষা করার যোগ্যতা যদি আমার থাকে আবেদন করার যোগ্যতাও নিশ্চয়ই আছে। এবাউট টার্ন করে ছুটে যাই ধানমণ্ডির ২৭ নম্বর সড়কে। মমিনের রিক্সা ততক্ষণে অনেক দূর চলে গেছে। আমি ওকে চিৎকার করে ডাকি। রিক্সা থামে। দৌড়ে গিয়ে বলি, সার্কুলারটা দেন তো, কপি করে রাখি। আমি সারাজীবনের অস্থির মানুষ। তখনই, দশ মিনিটের মধ্যে, একটি দুই পাতার সিভি লিখে ইমেইলে পাঠিয়ে দিই। গল্পটি রাতে মুক্তিকে বলি। সে বলে, তোমার হবে।

দুই সপ্তাহ পরে মুক্তি অফিস থেকে আমাকে ফোন করে। আচ্ছা, তুমি যে কসোভোতে চাকরির জন্য আবেদন করেছিলে সেটার কি হলো খোঁজ নিয়েছো? আমি বলি, এসব ভুলে যাও। ফোন নামিয়ে রাখতেই আমার এক্সটেনশন আবার বেজে ওঠে। ওপাশ থেকে কেউ একজন ইংরেজিতে বলে, আর ইউ মিস্টার জহির? আই অ্যাম কলিং ফ্রম ইউএনডিপি। ব্যাস, এরপর একের পর এক তাড়া। ইমার্জেন্সি মিশন, যত তাড়াতাড়ি পারো ফ্লাই করো।

ছুটতে শুরু করলাম। সেই যে অ্যারোপ্লেনের ধাতব ডানায় ভর দিয়ে উড়াল দিলাম, আজও অব্দি উড়ছি, উড়ালে উড়ালে বিস্তৃত করেছি স্বপ্নের আকাশ।

উড়তে উড়তে গোত্তা খেয়েছি পৃথিবীর নানান ভূখন্ডে। শেষমেষ ২০১১ সালের নভেম্বরে এসে পৌঁছাই নিউ ইয়র্কে। এখানে এসে দুজন বাঙালি সহকর্মীর সঙ্গে আমার খুব সখ্য গড়ে ওঠে। একজন পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি বাহারুল আলম, অন্যজন লে. কর্নেল (এখন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল) তোফায়েল আহমেদ। তো বাহার ভাই আর আমি রোজ একসাথে দুপুরে খেতে যাই। আমরা ম্যানহাটনের প্রায় সকল রেস্তোরাঁয় ঘুরে ঘুরে খাই, আর ফেরার পথে প্রায়শই নির্দিষ্ট একটি দোকান থেকে লটারির টিকিট কিনি। বাহার ভাইয়ের লটারি ভাগ্য খুব ভালো। তিনি দু’বার প্রাইজবন্ডের প্রথম পুরস্কার পেয়েছেন। একদিন বাহার ভাই আমাকে বলেন, আপনি যদি লটারির টিকেট পেয়ে যান তাহলে কি করবেন? আমি বলি, একটি আন্তর্জাতিক প্রকাশনা সংস্থা করব। বাংলা ভাষার সব ভালো বই ইংরেজিতে অনুবাদ করে পৃথিবীর মানুষের কাছে তুলে ধরবো। আর পৃথিবীর সব বিখ্যাত গ্রন্থ বাংলায় অনুবাদ করে বাংলাদেশের পাঠকের কাছে তুলে ধরবো। ভাষার অন্তরায়ের কারণে পৃথিবীর এক প্রান্তের জ্ঞান অন্য প্রান্তের মানুষের কাছে পৌঁছাবে না তা তো হতে পারে না। তিনি বলেন, আপনার উদ্দেশ্য ভালো, আপনি লটারি পেয়েও যেতে পারেন। আমি লটারি পাইনি কিন্তু সেই স্বপ্নটি এখনো আছে। সম্প্রতি বাঙালি কবিদের ইংরেজি কবিতার সংকলন  ‘আন্ডার দি ব্লু রুফ’ এর দুটি খন্ড বের করেছি। প্রথমটিতে ৩৭ জন কবির সাড়ে তিন’শ কবিতা এবং দ্বিতীয়টিতে ৩৩ জন কবির তিন’শ কবিতা সন্নিবেশিত হয়েছে। বই দুটো অ্যামাজনে আছে। পৃথিবীর যে কোনো প্রান্ত থেকেই অর্ডার করা যায়। স্বপ্নের সড়কে আমি হাঁটতে শুরু করেছি। হাঁটতে গিয়ে টের পাচ্ছি আরো অনেকেই আমার সহযাত্রী হয়েছেন।

প্রথম ভলিউমটি বেরুনোর কিছুদিন পর ইনবক্সে একটি মেসেজ আসে। আপনার কি সময় হবে, আমি আপনার সঙ্গে একটু দেখা করতে চাই। কিছুক্ষণ বার্তা বিনিময়ের পর ঠিক হলো, ওইদিনই সন্ধ্যা সাতটায় আমরা জ্যাক্সন হাইটসে দেখা করবো। ভদ্রলোকের নাম রাজুব ভৌমিক, আমি তখনো জানি না তিনি কি করেন, কি তাঁর পরিচয়। আমার স্ত্রী বলেন, ফেইসবুকের চেনা, এমন মানুষের সাথে দেখা না করাই ভালো। বিপদ-আপদ হতে পারে। আমি বলি, এটা তো আমেরিকা। যাই হোক সে আমাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে সাতটা পার করে দেয়। সন্ধ্যায় অন্যত্র যাওয়ার প্রোগ্রাম করে ফেলে। ফ্রেশ মিডোজের সেই বাড়ি থেকে  যখন বেরিয়েছি তখন রাত দশটা। আমি রাজুব ভৌমিককে ফোন দেই, আপনি কি এখনো জ্যাকসন হাইটসে আছেন? তিনি বলেন, হ্যাঁ, আপনার জন্য অপেক্ষা করছি। নিজেকে আমার এতো ছোটো মনে হয়, এতো অপরাধী মনে হয়, কষ্টে আমার বুক ভেঙে কান্না আসছিল। আমার স্ত্রীর ছোটো বোন দীপু এবং মামাত বোন রিনা টরন্টো থেকে বেড়াতে এসেছে, ওরাও আমাদের সাথে আছে। ওরা ছিল বলেই সম্ভব হয়েছে, তখনই গাড়ি ঘুরিয়ে দলে-বলে জ্যাক্সন হাইটসের দিকে ছুটতে শুরু করি। প্রায় এগারটায় পৌঁছে দেখি এক সুদর্শন তরুণ রাজুব ভৌমিক এবং তাঁর সুন্দরী স্ত্রী প্রিয়াংকা। আমরা ‘না ঘুমানোর শহর’ এর একটি রেস্তোরাঁয় বসে চা খাই, আড্ডা দিই। বেশ কিছু উপহার সামগ্রী ওরা নিয়ে এসেছে আমাদের জন্য, সেগুলো পরম যত্নে আমাদের হাতে তুলে দেয়। আমি তো ওদের জন্য কিছুই নিয়ে যাই নি, নিজেকে বেশ অসহায় লাগছিল। মানুষকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে তাঁর ভেতরের কথা বের করে আনা আমার একটি বদঅভ্যেস। রাজুকে যত খোঁচাই ততই টের পাই, হিরে, মুক্তা বের হচ্ছে। আমি যেন হিরের খনিতে শাবল মারছি। দুটি পিএইচডি করেছেন তিনি, আরো দুটি প্রক্রিয়াধীন। নিউ ইয়র্ক সিটি ইউনিভার্সিটির জন জে কলেজের ফুল টাইম শিক্ষক এবং নিউ ইয়র্ক পুলিশ বিভাগের ফুল টাইম পুলিশ কর্মকর্তা। দিনে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান, রাতে পুলিশের চাকরি করেন। ফাঁকে ফাঁকে নিজের পড়াশোনা করেন। এরই মধ্যে হাফ ডজন গ্রন্থের জনক হয়ে গেছেন রাজু, যার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচীতে অন্তর্ভূক্ত। ২৪ ঘণ্টায় মাত্র ৪ ঘণ্টা ঘুমান তিনি। আমাকে চমকে দিয়ে বলেন, আপনার কবিতা নিয়ে আমি কিছু কাজ করতে চাই।

কাজ শুরু হয়ে গেল। আমার ১০৪টি কবিতা নিয়ে তাঁর সম্পাদনায় ইওরোপিয় প্রকাশনা সংস্থা জাস্ট ফিকশন এডিশন থেকে বেরুল ‘পোয়েমস অব কাজী জহিরুল ইসলামঃ পাওয়ার অব ওয়ার্ডস’।

এবার আসি গল্পের শেষ এবং নাটকীয় অংশে। সেদিন ছিল ১৫ নভেম্বর ২০১৮, বৃহস্পতিবার। বেশ ক’দিন আগে থেকেই তারিখটি ঠিক করা ছিল। আমি জন জে কলেজ ভিজিট করতে যাবো। রাজু তাঁর ক্লাসের ছাত্রছাত্রীদের সাথে আমাকে পরিচয় করিয়ে দেবেন। আমি আমার কবিতা নিয়ে দু’চার কথা বলবো ক্লাসে। কিন্তু বেরুবার মুখে তুষারপাত শুরু হয়ে যাওয়ায় পরিকল্পণাটি পণ্ড হতে বসেছিল। গ্রন্থটির প্রকাশ-প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আবিস্কার করি আমরা দুজনই দ্রুত গতিতে কাজ করতে পছন্দ করি, প্রতিশ্রুতির ব্যত্যয় করি না, সময়ের মূল্য বুঝি এবং মানুষকে সম্মান করি। এই কমন বৈশিষ্ট্যগুলো আমাদের একত্রে কাজ করার ক্ষেত্রটিকে সহজ করে দেয়। তুষার ঝড় উপেক্ষা করেই বেশ ক’মাইল পথ পায়ে হেঁটে আমি পৌঁছে যাই জন জে কলেজে। দুজন ছাত্র এসে আমাকে প্রায় গার্ড অব অনার দিয়ে গেইট থেকে নিয়ে যায়। নির্ধারিত সময়ের চেয়ে একটু বিলম্বে পৌঁছানোর কারণে ক্লাসে আমার কবিতা নিয়ে কথা বলা আর হল না। তখনো যে ক’জন ছাত্রছাত্রী ছিল তাঁদের সাথে পরিচয় হয়। এরপর আমরা ক্যাফেটেরিয়ায় বসি, গল্প করি। রাজু বলেন, কাজী ভাই, আমার অফিসে চলেন। সেখানে আমার জন্য অপেক্ষা করছিল এক বিরাট বিস্ময়। রাজু তাঁর কম্পিউটারের স্ক্রিন ঘুরিয়ে বলে, দেখেন। দেখি ওখানে আমার সদ্য প্রকাশিত গ্রন্থটি, পাশে জন জে কলেজের একটি কোর্সের নাম। অর্থাৎ এই গ্রন্থটি এই কলেজের পাঠ্যপুস্তক তালিকায় অন্তর্ভূক্ত হয়েছে এবং একজন অধ্যাপক তাঁর কোর্সের জন্য বইটি নির্বাচন করেছেন।

ফেরার পথে রাজু ভৌমিক রাস্তায় নেমে আসেন। আমি বলি, যাই, ও বলে একটু অপেক্ষা করেন। আসেন একটা সিগারেট খাই। সিগারেট শেষ না হতেই ট্যাক্সি এসে হাজির। কোন ফাঁকে রাজু উবার ডেকেছে।

ফিরতে ফিরতে জানালায় চোখ রেখে দেখি, দুলতে দুলতে নেমে আসছে শুভ্র তুষারপরীর দল এই সুন্দর শহরে। আহা কী সুন্দর দৃশ্য!

 

হলিসউড নিউ ইয়র্ক। ১১ জানুয়ারি ২০১৮।                

Comments

Popular posts from this blog

অসাধারণ এই শিল্পীর জীবনের গল্প বড় করুণ

  [এই সময়ের অত্যন্ত প্রতিভাবান শিল্পী সারফুদ্দিন আহমেদ। বাড়ি পশ্চিমবঙ্গে। আর্ট কলেজে খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করেন ,  আর শুধু ছবি আঁকেন। নানান মাধ্যমে ,  নানান বিষয়ের ছবি। সারফুদ্দিন আহমেদের ছবি থেকে চোখ ফেরানো যায় না ,  আপনাতেই ওঁর নান্দনিক সৃষ্টিকর্মে দৃষ্টি আটকে যায় ,  কী জল রঙ ,  কী অ্যাক্রিলিক ,  কিংবা স্রেফ পেন্সিলের ড্রয়িং। এই গুণী শিল্পীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কবি কাজী জহিরুল ইসলাম। সাক্ষাৎকারটি এখানে উপস্থাপন করা হলো।]       ভারত আমাকে চোখ দিয়েছে ,  বাংলাদেশ দিয়েছে দৃষ্টি -     সারফুদ্দিন আহমেদ     কাজী জহিরুল ইসলামঃ  ব্যাক গ্রাউন্ডে তবলা বাজছে আপনি ছবি আঁকছেন কাচের ওপর।    এই যে বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে ছবি আঁকা, এই ছন্দটা ছবিতে কিভাবে ধরেন? আর কোনো শিল্পী ছবি  আঁ কার সময় যন্ত্রানুসঙ্গ ব্যবহার করেছেন?   সারফুদ্দিন আহমেদঃ   কাঁচ নয়,   এটি এক বিশেষ ধরনের কাপড়-নেট। এই নেটের উপরে বর্তমানে আমার এক্সপেরিমেন্ট চলছে।    জহিরুলঃ ও ,  ফেইসবুকে যখন ছবিটি দেখি কাচের মতো ...

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জুর সাক্ষাৎকার || অষ্টম পর্ব ||

[লেখক, সাংবাদিক, অনুবাদক আনোয়ার হোসেইন মঞ্জুর সাক্ষাৎকারের অষ্টম  পর্ব আজ প্রকাশ করা হলো। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কবি কাজী জহিরুল ইসলাম।]          দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ বাসস - কে অকার্যকর করেছে  – মঞ্জু    জহিরুলঃ  আপনি ফেলোশিপ নিয়ে দিল্লীতে ছয়মাস ছিলেন, ব্যক্তিগত আগ্রহ এবং পেশাগত অভ্যাসের কারণে কাছে থেকে দেখার/বোঝার চেষ্টা করেছেন ভারতের এবং উপমহাদেশের রাজনীতি। আমরা দেখি ভারতের রাজনীতিতে গায়ক, নায়ক, লেখক, সাংবাদিকের আবির্ভাব ঘটে সব সময়ই এবং তারা রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও রাখেন। বাংলাদেশে এই ধারা খুব সম্প্রতি শুরু হলেও আমাদের জনপ্রিয় খেলোয়াড়, শিল্পীরা নিজেদের অর্থনীতি সমৃদ্ধ করা ছাড়া রাজনীতিতে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেন না। এমন কি ধর্ষণ, অন্যদেশকে ট্রানজিট প্রদান, উপর্যুপরি সড়ক দূর্ঘটনা, পরিবেশ ধ্বংসকারী কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্প ইত্যাদি ইস্যুতেও তারা নীরব। অথচ তাদের জনপ্রিয়তা এবং রাজনীতি সম্পৃক্ততা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত, যা ভারতে দেখা যায়। বিষয়টি যদি আপনার মতো করে ব্যাখ্যা করেন।  মঞ্জুঃ   দিল্লিতে আমার অবস্থানকালকে আমি নানা দিক থ...

কানের কাছে নারী কন্ঠ

  স্বপ্নের ঐশ্বর্য   || কাজী জহিরুল ইসলাম ||   ছুটির দিন। লম্বা সময় ধরে ঘুমাবো। কিন্তু তার আর উপায় নেই। কানের কাছে নারী কন্ঠ। বেশ আত্মবিশ্বাসী কন্ঠ। ক্রমাগ ত  কথা বলে যাচ্ছেন এক অপরিচিতা। আমি লাফ দিয়ে উঠি। কে তিনি ?  আমার স্ত্রী বলেন ,  রুবানা হক ,  শোনো কী বলছেন। রুবানা হক প্রয়াত ব্যবসায়ী আনিসুল হকের স্ত্রী। আমাদের কৈশোর-উত্তীর্ণ কালে আনিসুল হক ছিলেন আমাদের হিরো। টিভি উপস্থাপনায় অন্য এক আধুনিকতা নিয়ে হাজির হন তিনি। এরপর আমরা ধীরে ধীরে তার ব্যবসায়ীক সাফল্য ,  সাংগঠনিক সাফল্য দেখতে দেখতে বড় হই। খুব সাম্প্রতিককালে ,  আনিসুল হকের মৃত্যুর পর ,  কেউ একজন বলেছিলেন ,  তার স্ত্রী রুবানা হকও খুব ভালো কথা বলেন। কিন্তু রুবানা হকের কথা শোনার সৌভাগ্য আমার হয়নি। দুই যুগ ধরে দেশের বাইরে থাকার কারণে এই সময়ে স্টার হয়ে ওঠা অনেকের সম্পর্কেই আমার ভালো ধারণা নেই।  তার কথায় এমন কিছু ছিল যে আমার পক্ষে ঘুমিয়ে থাকা সম্ভব হয়নি। আমি মুক্তিকে বলি ,  প্রথম থেকে দাও ,  পুরো বক্তৃতাটা আমি শুনতে চাই। আমি পরপর দুইবার তার পুরো বক্তব্যটা শুনি ,  ফ...