Skip to main content

পৃথিবীর প্রথম কবি ছিলেন একজন নারী, এনহেদুয়ানা

 পৃথিবীর প্রথম কবি

এনহেদুয়ানা


|| কাজী জহিরুল ইসলাম || 



চন্দ্রদেবী সুয়েনের মন্দিরে ধ্যনমগ্ন এক যুবতী, পদ্মাসনে উপবিষ্ট। দু’হাতের করতল সংযুক্ত, ঈষৎ উত্তোলিত। বুকের দু’পাশে নগ্ন স্তনের ওপর দু’গাছি কালো চুল। সুডৌল বাহুযুগল, উন্মুক্ত পিঠ এবং ঊরুসন্ধির সঙ্গমস্থলে স্ফীত নিতম্ব, যা শ্বেতপাথরের ওপর ছড়ানো একতাল মসৃণ মাংসপিন্ডের মতো পড়ে আছে। ধু ধু প্রান্তরে 
মৌন সন্যাসীর মতো দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটি ন্যাড়া বৃক্ষ । গোধুলী লগ্ন। সূর্যাস্তের এক চিলতে লাল আভা এসে পড়েছে দেবী সুয়েনের কপালে শোভিত মুকুটের ওপর। প্রার্থনামগ্ন আক্কাদিয়ান যুবতীর নগ্ন অবয়ব থেকে এক অলৌকিক আলোর অত্যুজ্জ্বল আভা বিকীর্ণ হচ্ছে। পেছনে সম্রাট সারগনের নেতৃত্বে আক্কাদ সাম্রাজ্যের গণ্যমান্য লোকজন। চন্দ্রদেবীর কাছে আজ ওদের একটিই প্রার্থনা, তিনি যেন এ সাম্রাজ্যকে অসুর লুগাল এনের হাত থেকে রক্ষা করেন। দৃশ্যটি আজ থেকে চার হাজার দুইশ চুয়াত্তুর বছর আগের অর্থাৎ যীশুর জন্মের ২২৫৮ বছর আগের। এই প্রার্থনা সভার নেতৃত্ব দিচ্ছেন যে নারী, তার নাম এনহেদুয়ানা। সাতাশ বছরের এক পুর্ণ যুবতী। এনহেদুয়ানা শব্দের অর্থ অন্তরীক্ষদেবী। তিনি আক্কাদের সম্রাট সারগন এবং তার স্ত্রী রাণী তাশলুলতুমের কন্যা। অন্য এক মতে এনহেদুয়ানা সম্রাট সারগনের (যাকে পৃথিবীর সম্রাট বলে অভিবাদন জানানো হতো) কন্যা নন, তবে রক্তের সম্পর্কিত আত্মীয়া। 

 

এনহেদুয়ানা ছিলেন অসম্ভব মেধাবী এক মানুষ, এক নারী, যিনি প্রার্থনা সঙ্গীত এবং কবিতা লিখতে পারতেন বলে তৎকালীন সমাজ তাকে দেবী হিশেবে পূজো করতো। তার পিতা সম্রাট সারগন কন্যা এনহেদুয়ানাকে রাজ্যের প্রধান পুরোহিতের সম্মানে ভূষিত করেন। এই পদটি রাজ্যের সবচেয়ে সম্মানিত পদ হিশেবে মর্যাদা পেত। সারগনের মৃত্যুর পরে তার পুত্র রামিস সম্রাট হলেও এনহেদুয়ানা তার স্বপদে বহাল থাকেন। ২২৮৫ বিসিতে জন্মগ্রহণকারী এই নারীই এ যাবতকালে আবিষ্কৃত প্রথম লেখক বা কবি। তিনি ৪২টি স্তবগান রচনা করেন, যা পরবর্তীকালে ৩৭টি প্রস্তরখন্ড থেকে উদ্ধার করা হয়।  এ ছাড়াও তিনি দেবী ইনানা’র স্তুতি করে আরও বেশ কিছু শ্লোক রচনা করেন।  

 

সুমেরু ভাষার ইনানাই আক্কাদিয়ান ভাষার ইস্তার, পরবর্তী কালে গ্রীকরা যাকে আফ্রোদিতি বলে শনাক্ত করে এবং রোমানরা তাকে ভেনাস বলে ডাকে। তিনি ছিলেন প্রেমের দেবী। দেবী ইনানার স্তুতিস্তাবকে সমৃদ্ধ এনহেদুয়ানার কবিতাগুলোই প্রার্থনাসভাসঙ্গীতের ভিত্তি নির্মাণ করে। সেই দিক থেকে তিনি ধর্মাবতারের কাজ করেছেন। তার ওপর রাজা সারগনের ছিল পূর্ণ আস্থা। এনহেদুয়ানার মাধ্যমেই তিনি সুমেরু দেব-দেবীদের স্থলে আক্কাদিয়ান দেব-দেবীদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার কাজটি করেছিলেন, রাজ্য নিষ্কন্টক রাখার জন্য এর প্রয়োজন হয়েছিল। এনহেদুয়ানার কাব্য প্রতিভা তৎকালীন মেসিপটোমিয়ার নারীদের শিক্ষা গ্রহনে এগিয়ে আসতে অনুপ্রাণিত করে এবং রাজবংশের নারীদের কবিতা লিখতে উৎসাহিত করে। একসময় এটা প্রায় অবধারিতই হয়ে ওঠে যে রাজকন্যা এবং রাজবধুরা অবশ্যই কবিতা লিখতে জানবেন। যদিও তাঁর সামসময়িককালের আর তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো নারী কবির সন্ধ্যান পাওয়া যায়নি। এতে এটাও প্রতীয়মান হয় যে, পিবি শেলির কথাই ঠিক, কবিতা একটি ঐশ্বরিক বা স্বর্গীয় ব্যাপার। তিনি অবশ্য স্বর্গীয় বলতে বুঝিয়েছেন মানুষের স্বর্গীয় অনুভূতির কথা। কিন্তু একথা অনেকেই বলেন যে চাইলেই কবিতা লেখা যায় না, কবিতা নাজেল হয়।

 

এনহেদুয়ানা সম্পর্কে প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ পল ক্রিওয়াসজেক বলেন, “তাঁর কম্পোজিশন, যদিও এই আধুনিককালেই কেবল পুনরুদ্ধার করা হলো, সর্বকালের অনুনয়মূলক প্রার্থনার মডেল। ব্যাবিলনীয়দের মাধ্যমে এর প্রভাব হিব্রু বাইবেলে এবং প্রাচীন গ্রীক প্রার্থনা সঙ্গীতেও এসে পড়েছে। ইতিহাসের প্রথম কবি এনহেদুয়ানার ভীরু শ্লোকগুলির প্রভাব প্রথমদিকের খ্রীস্টান চার্চেও শোনা যেত।” 

 

এই রচনায় পৃথিবীর প্রথম কবি এনহেদুয়ানার কিছু শ্লোকের বাংলা অনুবাদ উপস্থাপনের চেষ্টা করছি। অনুবাদগুলো আমি ইংরেজি থেকে করেছি। এনহেদুয়ানা যে পদ্ধতিতে লিখেছিলেন সেই পদ্ধতিটিকে কিউনিফর্ম পদ্ধতি বলা হতো। এই পদ্ধতিতে মেসিপটোমিয়ার (বর্তমান ইরাকের) অধিবাসীরা ৩৪০০ বিসি থেকে লিখতে শুরু করে। 

 

ক.  

আমি তোমার এবং সব সময় তোমারই থাকবো

তোমার হৃদয় আমার জন্যে শীতল হোক,

তোমার চেতনা, সমবেদনা আমার প্রতি করুণার্দ্র হোক

তোমার কঠিন শাস্তির স্বাদ আমি উপলব্ধি করেছি।  

(নোটঃ তৃতীয় লাইনের কিছু অংশ উদ্ধার করা যায় নি। করুণার্দ্র শব্দটি আমি যোগ করেছি লাইনটিকে অর্থবহ করার জন্য)  (এনহেদুয়ানার কবিতা সংখ্যাক্রম – ১২)

 

খ.

আমার দেবী, আমি ভূমণ্ডলে তোমার মহানুভবতা ও মহিমা ঘোষণা করছি

আমি চিরকাল তোমার মহানুভবতার গুণগান করে যাবো।

(এনহেদুয়ানার কবিতা সংখ্যাক্রম – ১৩)

 

গ.

রানী যে বড় কাজগুলো করেন তা নিজের জন্যে

তিনি জড়ো করেন নিজের স্বর্গ মর্ত্য

তিনি মহান দেবীর প্রতিদ্বন্দ্বী।

(এনহেদুয়ানার কবিতা সংখ্যাক্রম – ১৬)

 

ঘ.

একটি গৃহ নির্মাণের জন্যে, প্রিয়তমার জন্যে একটি কামড়া নির্মাণের জন্যে, কার্য সম্পাদনের জন্যে

একটি শিশুর ঠোঁটে চুমু খাওয়ার জন্যে সকল প্রশংসা তোমার ইনানা

মুকুটের জন্যে, উঁচু আসনের জন্যে রাজদন্ড প্রদানের জন্যে সকল প্রশংসা তোমার ইনানা।

(এনহেদুয়ানার কবিতা সংখ্যাক্রম – ১৭)

 

ঙ.

 

দেবরাজ, শ্বাস-প্রশ্বাস এবং বাতাসের দেবী এই মহাবিশ্বকে করেছে তোমার দিকে ধাবমান

হে দেবীদের দেবী ইনানা তোমার পদতলে অর্পিত মহাবিশ্ব

তুমিই নির্ধারণ করো রাজকন্যাদের ভাগ্য। 

(এনহেদুয়ানার কবিতা সংখ্যাক্রম – ১৮)

 

চ.

মহীয়সী, তুমি সুমহান, তুমি গুরুত্বপূর্ণ

ইনানা তুমি মহান, তুমি গুরুত্বপূর্ণ

আমার দেবী, তোমার মহানুভবতা উদ্ভিন্ন

আমার দোহাই তোমার হৃদয় ফিরে যাক যথাস্থানে

(এনহেদুয়ানার কবিতা সংখ্যাক্রম – ১৯)

 

 

তখনকার প্রেক্ষাপটে নিয়মতান্ত্রিক প্রার্থনা মানুষের মধ্যে মানবতাবোধ তৈরীতে সহায়ক ছিল। রাজ্যে এবং সমাজে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় ধর্ম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতো। যদিও দেব-দেবীরা যাদের নিয়ন্ত্রণে থাকতো অর্থাৎ রাজা বা গোত্রপ্রধানগণ ধর্মের নামে জনগণকে প্রতারিতও করতেন। তা সত্বেও ধর্মই মানুষের অস্থির চিত্তকে নিয়ন্ত্রণে রাখার একমাত্র উপায় ছিল। সেই দিক থেকে পৃথিবীর প্রথম কবি এনহেদুয়ানা প্রার্থনাশ্লোক বা দেব-দেবীর স্তুতিবাক্য রচনা করে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন মানব সভ্যতার জন্য। 

 

২২৫০ বিসিতে মাত্র ৩৫ বছর বয়সে এই মহীয়সী নারী পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। তিনি কোনো পুরুষ সঙ্গী গ্রহণ করেছিলেন কি-না বা কোনো সন্তান জন্ম দিয়েছিলেন কি-না এ সম্পর্কে কোনো তথ্য জানা না গেলেও এটা অনুমিত যে রাজ্যের প্রধান পুরোহিত হবার কারণে হয়ত সংসারের মতো জাগতিক মায়ার বাঁধনে তিনি জড়ান নি।

 

[১৬ নভেম্বর ২০১৭ তারিখে দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত] 

Comments

Popular posts from this blog

অসাধারণ এই শিল্পীর জীবনের গল্প বড় করুণ

  [এই সময়ের অত্যন্ত প্রতিভাবান শিল্পী সারফুদ্দিন আহমেদ। বাড়ি পশ্চিমবঙ্গে। আর্ট কলেজে খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করেন ,  আর শুধু ছবি আঁকেন। নানান মাধ্যমে ,  নানান বিষয়ের ছবি। সারফুদ্দিন আহমেদের ছবি থেকে চোখ ফেরানো যায় না ,  আপনাতেই ওঁর নান্দনিক সৃষ্টিকর্মে দৃষ্টি আটকে যায় ,  কী জল রঙ ,  কী অ্যাক্রিলিক ,  কিংবা স্রেফ পেন্সিলের ড্রয়িং। এই গুণী শিল্পীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কবি কাজী জহিরুল ইসলাম। সাক্ষাৎকারটি এখানে উপস্থাপন করা হলো।]       ভারত আমাকে চোখ দিয়েছে ,  বাংলাদেশ দিয়েছে দৃষ্টি -     সারফুদ্দিন আহমেদ     কাজী জহিরুল ইসলামঃ  ব্যাক গ্রাউন্ডে তবলা বাজছে আপনি ছবি আঁকছেন কাচের ওপর।    এই যে বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে ছবি আঁকা, এই ছন্দটা ছবিতে কিভাবে ধরেন? আর কোনো শিল্পী ছবি  আঁ কার সময় যন্ত্রানুসঙ্গ ব্যবহার করেছেন?   সারফুদ্দিন আহমেদঃ   কাঁচ নয়,   এটি এক বিশেষ ধরনের কাপড়-নেট। এই নেটের উপরে বর্তমানে আমার এক্সপেরিমেন্ট চলছে।    জহিরুলঃ ও ,  ফেইসবুকে যখন ছবিটি দেখি কাচের মতো ...

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জুর সাক্ষাৎকার || অষ্টম পর্ব ||

[লেখক, সাংবাদিক, অনুবাদক আনোয়ার হোসেইন মঞ্জুর সাক্ষাৎকারের অষ্টম  পর্ব আজ প্রকাশ করা হলো। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কবি কাজী জহিরুল ইসলাম।]          দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ বাসস - কে অকার্যকর করেছে  – মঞ্জু    জহিরুলঃ  আপনি ফেলোশিপ নিয়ে দিল্লীতে ছয়মাস ছিলেন, ব্যক্তিগত আগ্রহ এবং পেশাগত অভ্যাসের কারণে কাছে থেকে দেখার/বোঝার চেষ্টা করেছেন ভারতের এবং উপমহাদেশের রাজনীতি। আমরা দেখি ভারতের রাজনীতিতে গায়ক, নায়ক, লেখক, সাংবাদিকের আবির্ভাব ঘটে সব সময়ই এবং তারা রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও রাখেন। বাংলাদেশে এই ধারা খুব সম্প্রতি শুরু হলেও আমাদের জনপ্রিয় খেলোয়াড়, শিল্পীরা নিজেদের অর্থনীতি সমৃদ্ধ করা ছাড়া রাজনীতিতে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেন না। এমন কি ধর্ষণ, অন্যদেশকে ট্রানজিট প্রদান, উপর্যুপরি সড়ক দূর্ঘটনা, পরিবেশ ধ্বংসকারী কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্প ইত্যাদি ইস্যুতেও তারা নীরব। অথচ তাদের জনপ্রিয়তা এবং রাজনীতি সম্পৃক্ততা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত, যা ভারতে দেখা যায়। বিষয়টি যদি আপনার মতো করে ব্যাখ্যা করেন।  মঞ্জুঃ   দিল্লিতে আমার অবস্থানকালকে আমি নানা দিক থ...

কানের কাছে নারী কন্ঠ

  স্বপ্নের ঐশ্বর্য   || কাজী জহিরুল ইসলাম ||   ছুটির দিন। লম্বা সময় ধরে ঘুমাবো। কিন্তু তার আর উপায় নেই। কানের কাছে নারী কন্ঠ। বেশ আত্মবিশ্বাসী কন্ঠ। ক্রমাগ ত  কথা বলে যাচ্ছেন এক অপরিচিতা। আমি লাফ দিয়ে উঠি। কে তিনি ?  আমার স্ত্রী বলেন ,  রুবানা হক ,  শোনো কী বলছেন। রুবানা হক প্রয়াত ব্যবসায়ী আনিসুল হকের স্ত্রী। আমাদের কৈশোর-উত্তীর্ণ কালে আনিসুল হক ছিলেন আমাদের হিরো। টিভি উপস্থাপনায় অন্য এক আধুনিকতা নিয়ে হাজির হন তিনি। এরপর আমরা ধীরে ধীরে তার ব্যবসায়ীক সাফল্য ,  সাংগঠনিক সাফল্য দেখতে দেখতে বড় হই। খুব সাম্প্রতিককালে ,  আনিসুল হকের মৃত্যুর পর ,  কেউ একজন বলেছিলেন ,  তার স্ত্রী রুবানা হকও খুব ভালো কথা বলেন। কিন্তু রুবানা হকের কথা শোনার সৌভাগ্য আমার হয়নি। দুই যুগ ধরে দেশের বাইরে থাকার কারণে এই সময়ে স্টার হয়ে ওঠা অনেকের সম্পর্কেই আমার ভালো ধারণা নেই।  তার কথায় এমন কিছু ছিল যে আমার পক্ষে ঘুমিয়ে থাকা সম্ভব হয়নি। আমি মুক্তিকে বলি ,  প্রথম থেকে দাও ,  পুরো বক্তৃতাটা আমি শুনতে চাই। আমি পরপর দুইবার তার পুরো বক্তব্যটা শুনি ,  ফ...