Skip to main content

স্বামীকে সুখী করার জন্য মেয়েরা তৈরি হয় কুহোবাসকালে

 কুহোবাসিনী

|| কাজী জহিরুল ইসলাম || 




 কুহোবাসের গল্প নরমা আমাকে আগেই বলেছিল। নরমা মুয়াম্বাজি। নাইজেরিয়ার মেয়ে।

 

এফিক সম্প্রদায়ের বাস নাইজেরিয়া এবং ক্যামেরুনে। দক্ষিণ নাইজেরিয়ার একটি প্রদেশ ক্রস রিভার, যার রাজধানী কালাবার। কালাবারই হচ্ছে এফিক সম্প্রদায়ের মূল আবাসভূমি। এফিক ভাষায়, আকোয়া আকপা, এটিই কালাবারের আদি নাম। ওবান পর্বতে জন্ম নেয়া কোয়া ফলস থেকেই তৈরী হয় খরস্রোতা কোয়া নদী। এই নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করাই ছিল এফিকদের আদি পেশা। অর্থাৎ এফিকরা ছিল মূলত কৈবর্ত জাতি। কিন্তু ঊনবিংশ শতাব্দীতে যখন ইওরোপীয়রা পশ্চিম আফ্রিকায় দাস সংগ্রহের জন্য আসে তখন তাদের সাথে হাত মেলায় এফিকরা, হয়ে ওঠে দাস ব্যবসায়ের মধ্যস্থতাকারী। কালক্রমে ইওরোপিয় ভাষা এবং তাদের আচার আচরণ এফিকরাই রপ্ত করে সকলের আগে। কিন্তু তা সত্বেও কিছু আদি সংস্কৃতি আজো পালন করে এফিক সম্প্রদায়ের মানুষেরা। সেগুলোরই একটি কুহোবাস।

এফিকরা বিশ্বাস করে যে মেয়ের কোমর যতো মোটা সেই মেয়ে ততো বেশি সুন্দরী। বিষয়টি এফিকদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ওদের সংস্কৃতি এবং জীবনব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রথা হলো মেয়েদের ‘কোমর মোটাকরণ’ প্রক্রিয়া। প্রতিটি মেয়েকেই ‘কোমর মোটাকরণ’ পর্ব পালন করতে হয়।  ঋতুবতী হওয়ার পর থেকে বিয়ের আগ পর্যন্ত যে কোনো এক সময়ে এটি করতে হয়। 

প্রথাগত কোমর মোটাকরণ প্রক্রিয়ার জন্য রয়েছে কোমর মোটাকরণ গৃহ। এফিক ভাষায় এই ঘরকে বলা হয় কুহো। আধুনিক এফিক মেয়েরা এই পর্বটি পালন করে বিয়ের আগে আগে। কেউ কেউ করে বিয়ের কথা পাকা হয়ে যাওয়ার পরে। কুহোতে কণের দেখাশোনা করেন বাড়ির বয়স্কা এবং অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বৈবাহিক জীবনে সফল নারীরা। এ সময়ে কণেকে বাইরের কারো সাথে দেখা করতে দেওয়া হয় না। শুধু তাই নয়, এ সময়ে কুহোর বাইরে বের হওয়াও নিষেধ। কুহোবাসকাল ছয় মাস থেকে এক বছর, কখনো কখনো তিন বছরেও গড়ায়। তবে আধুনিক এফিক মেয়েরা এটিকে ছয় সপ্তাহে নামিয়ে এনেছেন। ইওরোপ, আমেরিকায় শিক্ষিতা অতি আধুনিক এফিক মেয়েকেও ‘কুহোবাস’ পালন করতে দেখা যায়। একজন এফিক মেয়ের জীবনের এই সময়টাকে ‘বিচ্ছিন্নকাল’ও বলা হয়। 

এ সময়ে কুহোবাসিনীকে সংক্ষিপ্ত মসৃণ এবং স্বচ্ছ পোশাক পরানো হয়। প্রতিদিন তিনবেলা কুহোবাসিনীর শরীর ম্যাসাজ করা হয়। তিনবেলা প্রচুর খাবার খেতে দেওয়া হয়। এসব খাবারের মধ্যে প্রথাগতভাবে প্লান্টেইন (আফ্রিকার বিশেষ কলা), কাসাবা, সুজি জাতীয় খাবার এবং সাথে মরিচের ঝোল থাকে। আধুনিককালে বিভিন্ন ধরণের কার্বোহাইড্রেড এবং প্রোটিন যুক্ত হয়েছে। খাওয়া, ম্যাসাজ নেওয়া এবং সুনির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ গ্রহণ ছাড়া বাকী সময়টা কুহোবাসিনীকে বাধ্যতামূলকভাবে ঘুমিয়ে কাটাতে হয়। 

কুহোতে কণেকে গৃহস্থালি কাজ-কর্মও শেখানো হয়। যেমনঃ রান্না করা, সন্তান পালন করা, স্বামীর যত্ন করা ইত্যাদি। স্বামীর যৌচাহিদা মেটাতে সক্ষম হওয়া, তাকে সুখী করা এবং সুখী রাখার যাবতীয় কলাকৌশলও শেখানো হয়। সাধারণত সুখী পরিবারের বয়স্কা নারীরা তাদের অভিজ্ঞতার আলোকে কুহোবাসিনীকে এই শিক্ষা দেন। প্রত্যেকেই তাদের জীবনের সফলতার গল্পগুলো পালাক্রমে তুলে ধরেন। এখন অবশ্য অনেক পেশাগত কুহো প্রশিক্ষক তৈরী হয়েছে যারা কুহোবাসকালীন সময়ের মধ্যে ৩ বা ৫ দিনের একটি নিয়মতান্ত্রিক এবং পেশাগত প্রশিক্ষণ প্রদান করেন।  কুহোবাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশিক্ষণ হলো সম্প্রদায়ের প্রথাগত আচার-আচরণ এবং নাচ-গান শেখা। এফিক সম্প্রদায়ের প্রধান নৃত্য ইকোম্বি শেখার ক্ষেত্রে কোনো ধরণের ত্রুটি যেন না থাকে তা কুহোবাসকালীন সময়েই নিশ্চিত করা হয়। কালাবাসের (শুকনো লাউ বা কুমড়োর মতো ফল) ওপর কারুকর্ম করা এফিকদের প্রথা। এই কাজ প্রতিটি এফিক মেয়েকেই শিখতে হয়। কুহোবাসের সময় এটিও নিখুঁতভাবে শিখতে হয়। মোটকথা একটি মেয়ে কুহোবাসের মধ্য দিয়ে হয়ে ওঠে একজন পরিপূর্ণ এফিক নারী, যৌবনবতী এবং আবেদনময়ী। শেষের ক’সপ্তাহ খাওয়া-দাওয়া এবং ঘুমের পরিমাণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়।

কুহো থেকে যেদিন মেয়েটি বেরিয়ে আসে সেটা উৎসবের দিন। সামর্থ অনুযায়ী মেয়ের পরিবার গ্রামের বা সম্প্রদায়ের লোকজনকে দাওয়াত করে। উৎসব শুরু হয় বিকেল থেকে, চলে সমস্ত রাত। প্রচুর খাওয়া-দাওয়া এবং মদ্যপান করা হয়। প্রথাগত বাজনা এবং ইকোম্বি নৃত্য চলে সমস্ত রাত। প্রতিবেশী, বন্ধু, আত্মীয়রা কুহোত্তীর্ণ মেয়ের জন্য নানান রকম উপহার সামগ্রী নিয়ে আসে। গান-বাজনার ফাঁকে ফাঁকে সেইসব উপহার সামগ্রী প্রদর্শন করা হয় এবং উপহার প্রদানকারীর নাম ঘোষণা করা হয়। তখন সমবেত হর্ষধ্বনি ও করতালিতে ফেটে পড়ে মজলিশ। 

সবশেষে মেয়েটি তার হবু স্বামীকে জড়িয়ে ধরে চুমু খায় এবং যুগল নৃত্য করে। উপস্থিত অতিথিরা তখন উঠে দাঁড়ায়, করতালি দেয় এবং ওদের নতুন জীবনকে স্বাগত জানায়। এরপর ঢোল-বাদ্য আরো জোরে জোরে বাজতে থাকে এবং সকলে একসঙ্গে নাচতে থাকে। এভাবেই এফিক সম্প্রদায়ের মেয়েদের কুহোবাস সম্পন্ন হয়।

জাতিসংঘ দিবসে প্রতিবছরই আমরা সুন্দরী নির্বাচনের একটি অনুষ্ঠান করি। এ বছরের সেরা সুন্দরী নির্বাচিত হয়েছেন নরমা মুয়াম্বাজি। নরমা যখন ওর সুবিশাল নিতম্বখানি ভূমিকম্পের মতো কাঁপাচ্ছিল, বলতে দ্বিধা নেই ওর দুইমণি শরীর আমাদের চোখে যেমনই লাগুক না কেন ওর অসাধারণ শৈল্পিক নিতম্বের কাঁপনে আমরা সবাই মুগ্ধ। এ শিল্পকর্ম প্রদর্শনের দক্ষতা কেবল আফ্রিকীয় নারীরই জানা, আর কারো পক্ষে তা সম্ভব নয়। নরমা যখন ওর নিতম্বে পামপাতার অভূতপূর্ব বিরামহীন কাঁপন তুলে হাস্যোজ্জ্বল দাঁতের ঝিলিক দেখাচ্ছিল বিচারকদের আমার তখন কেবলি মনে হচ্ছিল ওইতো এফিক দেবী আতাই, মহান ঈশ্বর আবাসির কৃপা প্রার্থনায় নিজেকে সমর্পণের জন্যে তৈরী। 

নরমা মুয়াম্বাজি ক্রেস্ট হাতে নিয়ে আরো একবার দর্শকদের উদ্দেশে নিতম্বে ঝড় তুললো। আমি খানিকটা গর্ব অনুভব করছিলাম এই ভেবে যে এই মেয়েটি শুধু আমার সহকর্মীই নয়, একজন ভালো বন্ধুও। মনে মনে সেই চেনা রবীন্দ্রসঙ্গীতটি একটু বদলে দিয়ে গাইতে শুরু করলাম, আমি চিনি গো চিনি তোমারে, কুহোবাসিনী।

 

[২০০৭ সালে লেখা] 

 

 

Comments

Popular posts from this blog

অসাধারণ এই শিল্পীর জীবনের গল্প বড় করুণ

  [এই সময়ের অত্যন্ত প্রতিভাবান শিল্পী সারফুদ্দিন আহমেদ। বাড়ি পশ্চিমবঙ্গে। আর্ট কলেজে খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করেন ,  আর শুধু ছবি আঁকেন। নানান মাধ্যমে ,  নানান বিষয়ের ছবি। সারফুদ্দিন আহমেদের ছবি থেকে চোখ ফেরানো যায় না ,  আপনাতেই ওঁর নান্দনিক সৃষ্টিকর্মে দৃষ্টি আটকে যায় ,  কী জল রঙ ,  কী অ্যাক্রিলিক ,  কিংবা স্রেফ পেন্সিলের ড্রয়িং। এই গুণী শিল্পীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কবি কাজী জহিরুল ইসলাম। সাক্ষাৎকারটি এখানে উপস্থাপন করা হলো।]       ভারত আমাকে চোখ দিয়েছে ,  বাংলাদেশ দিয়েছে দৃষ্টি -     সারফুদ্দিন আহমেদ     কাজী জহিরুল ইসলামঃ  ব্যাক গ্রাউন্ডে তবলা বাজছে আপনি ছবি আঁকছেন কাচের ওপর।    এই যে বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে ছবি আঁকা, এই ছন্দটা ছবিতে কিভাবে ধরেন? আর কোনো শিল্পী ছবি  আঁ কার সময় যন্ত্রানুসঙ্গ ব্যবহার করেছেন?   সারফুদ্দিন আহমেদঃ   কাঁচ নয়,   এটি এক বিশেষ ধরনের কাপড়-নেট। এই নেটের উপরে বর্তমানে আমার এক্সপেরিমেন্ট চলছে।    জহিরুলঃ ও ,  ফেইসবুকে যখন ছবিটি দেখি কাচের মতো ...

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জুর সাক্ষাৎকার || অষ্টম পর্ব ||

[লেখক, সাংবাদিক, অনুবাদক আনোয়ার হোসেইন মঞ্জুর সাক্ষাৎকারের অষ্টম  পর্ব আজ প্রকাশ করা হলো। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কবি কাজী জহিরুল ইসলাম।]          দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ বাসস - কে অকার্যকর করেছে  – মঞ্জু    জহিরুলঃ  আপনি ফেলোশিপ নিয়ে দিল্লীতে ছয়মাস ছিলেন, ব্যক্তিগত আগ্রহ এবং পেশাগত অভ্যাসের কারণে কাছে থেকে দেখার/বোঝার চেষ্টা করেছেন ভারতের এবং উপমহাদেশের রাজনীতি। আমরা দেখি ভারতের রাজনীতিতে গায়ক, নায়ক, লেখক, সাংবাদিকের আবির্ভাব ঘটে সব সময়ই এবং তারা রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও রাখেন। বাংলাদেশে এই ধারা খুব সম্প্রতি শুরু হলেও আমাদের জনপ্রিয় খেলোয়াড়, শিল্পীরা নিজেদের অর্থনীতি সমৃদ্ধ করা ছাড়া রাজনীতিতে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেন না। এমন কি ধর্ষণ, অন্যদেশকে ট্রানজিট প্রদান, উপর্যুপরি সড়ক দূর্ঘটনা, পরিবেশ ধ্বংসকারী কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্প ইত্যাদি ইস্যুতেও তারা নীরব। অথচ তাদের জনপ্রিয়তা এবং রাজনীতি সম্পৃক্ততা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত, যা ভারতে দেখা যায়। বিষয়টি যদি আপনার মতো করে ব্যাখ্যা করেন।  মঞ্জুঃ   দিল্লিতে আমার অবস্থানকালকে আমি নানা দিক থ...

শিল্প কী?

  আমার শিল্পভাবনা || কাজী জহিরুল ইসলাম ||   যখন থেকে, জেনে বা না জেনে, লেখালেখির সঙ্গে জড়িয়েছি, তখন থেকেই এই বিতর্কের সঙ্গেও জড়িয়ে গেছি, শিল্পের জন্য শিল্প না-কী জীবনের জন্য শিল্প। এই বিতর্কের অবসান ঘটাতে হলে শিল্প কী তা উপলব্ধি করা দরকার। আমি খুব সতর্কতার সাথে  ‘ উপলব্ধি ’  শব্দটি ব্যবহার করছি,  ‘ জানা ’  দরকার বলছি না। আমি সাধারণত বিখ্যাত মানুষের উদ্ধৃতি দিয়ে কোনো ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই না। প্রবন্ধ লেখার প্রচলিত ধারা হচ্ছে তথ্য-উপাত্ত এবং বিখ্যাতদের সংজ্ঞার আলোকে কোনো ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করা। আমি এই ধারা থেকে বের হয়েই কিছু লিখতে চাই। আমি শুধু লিখতে চাই আমার উপলব্ধির কথা। এবং এ-ও বলি, আমার উপলব্ধির যেটুকু আপনার ভালো লাগে সেটুকুই আপনি নেবেন, আমি কোনো সংজ্ঞা তৈরী করতে চাই না যা অন্যদের গ্রহন করতে হবে। তবে আমি সকল বিখ্যাত মানুষের কথাই জানতে চাই, পড়তে চাই। তারা কী লিখেছেন, বলেছেন তা জানার আগ্রহ আমার রয়েছে। আরো সুস্পস্ট করে যদি বলি, আমি সকলকেই গ্রহণ করতে চাই, কিন্তু দেবার সময় শুধু আমারটাই দেব, আমার মত করে।  মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক (সৃজনশীল এবং মননশীল) ক্...