[সত্তরের দশকের কবি ড. মাহবুব হাসানের ধারাবাহিক সাক্ষাৎকারের আজ তৃতীয় পর্ব প্রকাশ করা হ লো। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কাজী জহিরুল ইসলাম]
সেই মহানকে বেয়াদব বলেছি
- মাহবুব হাসান
কাজী জহিরুল ইসলামঃ 'টগর তোর স্বাধীনতা' কবিতায় মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করতে করতে এক পর্যায়ে প্রচণ্ড হতাশা ব্যক্ত করেছেন এভাবে, "আমি স্বাধীনতার বেনোজলে ভেসে যাচ্ছি;/ এর চেয়ে বরং তোর মতো/ রক্তাক্ত মৃত্যুর ঠাঁই ছিল ঢের বেশি ভালো;"। কেন এই হতাশা?
মাহবুব হাসানঃ কারণ এ-কবিতার মর্ম লুকিয়ে আছে সেই সময়ের বাতিঘরে।এই হতাশার কারণ নিহিত আছে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে। পাঁচ ও ছয়-এর দশকে পূর্ব পাকিস্তানের গণমানুষের বঞ্চনা, শোষণ আর সম্পদ লুটে নেবার পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের হায়েনাসুলভ আচরণের বিরুদ্ধে গণমানুষের মনে যে স্বপ্ন বুনেছিলেন আমাদের রাজনীতিক ও বুদ্ধিজীবীরা, সেই স্বপ্নভঙ্গের কথাই ওই কটি পঙক্তিতে উঠে এসেছে।
রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন হবার পরও কেন কথক নিজের মৃত্যুকেই ভালো বলছেন, তার মর্ম বুঝতে হবে। আমি আপনাকে বলি- রণক্ষেত্র থেকে ফিরে এসে আমরা তো দেশগঠনের কাজে নিয়োজিত হতে চেয়েছিলাম, তাকে পাশ কাটিয়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় বসে। তাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বে আমরা যুদ্ধ করেছি বটে, তবে সবাই তো আর আওয়ামী ঘরানার যোদ্ধা ছিলেন না। আমি যেমন বিশ্বস করতাম বন্দুকের নল ছাড়া দেশের স্বাধীনতা আনা সম্ভব নয়। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনা ছিলো ভিন্ন। তিনি ভাবতেন আলাপ আলোচনার মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়া যাবে। সত্তরের নির্বাচনে বিপুল আসনে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হলেও প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া গণমানুষের রায়কে ফিরিয়ে দিলেন। বঙ্গবন্ধু এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রামের রাজনৈতিক ঘোষণা দিলেও তিনি ইয়াহিয়া ও ভূট্টোর সাথে ক্ষমতা ভাগাভাগির আলোচনায় বসলেন। আমরা দেখলাম তার পরে কি নৃশংস হত্যাযঞ্জ চালানো হলো। তারপরই কিন্তু আমরা যুদ্ধে নামলাম। এর আগে নয়।
বিজয় অর্জিত হওয়ার পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় বসে গেলো। তারা মুক্তিসেনাদের কথায় কর্ণপাত করলো না। তারা আমাদের আত্মত্যাগের মূল্য বোঝেননি। রাজনৈতিক সরকার কায়েম হওয়ার পর যে শাসনধারা চালালেন, তা ছিলো পাকিস্তানিদের ফেলে যাওয়া প্রশাসন ব্যবস্থা। আর যারা ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সামরিক সরকারকে ৯ মাস ধরে সার্ভ করেছে, তারাই আবার ক্ষমতায় রয়ে গেলো। কিছু উচ্চপদস্থ আমলাকে চাকরিচ্যুত বা ওএসডি করা হলেও তাদেরকেই আবারো ফিরিয়ে আনা হলো প্রশাসন চালানোর অজুহাতে। ওই প্রশাসন তো ছিলো ঔপনিবেশিক আমলের একটি অচল প্রশাসন।
আর আমরা তো ওই ঔপনিবেশিক শাসনের নিগড় থেকে মুক্তির জন্যই যুদ্ধ করেছি। ভৌগলিক বা ভূ-রাজনৈতিক স্বাধীনতা এলেই যে সেই জনপদটিকে স্বাধীন বলে বিবেচনা করা যায়, এটা আমরা কখনোই মনে করতাম না। আমরা চেয়েছিলাম দেশে বিপ্লবী সরকার গঠিত হোক এবং তারাই জনগণের কি ইচ্ছা তার প্রশাসনিক রূপ দেবেন। কিন্তু সেখানে পেলাম একটি ঘুণে ধরা, জ্বরাক্রান্ত, পরিত্যক্ত শাসন, যা আমাদের রাজনৈতিক আশাকে গুড়িয়ে দিয়েছিলো। ‘টগর তোর স্বাধীনতা’ কবিতায় সেই ক্ষোভ ও বেদনার কথাই বলেছি আমি। আমার ওই সহযোদ্ধা, আমার প্রিয় বন্ধু ছিলো আমারই সহপাঠি। আমরা স্কুলে একসাথে পড়েছি।, যুদ্ধেও গেছি একসাথেই, তবে সে রহম নামের এক কোম্পানি কমান্ডারের সাথে চলে গেছিলো। ও ফিরে এসেছে টাঙ্গাইল শহর শত্রুমুক্ত হবার পর। কিন্তু ছত্রভঙ্গ পাকিস্তানি সেনাদের অ্যাম্বুশের মধ্যে পড়ে যায় এবং সে বাঁচতে পারেনি।
জহিরুলঃ আপনার আগের কবিতাগুলোতে শুদ্ধ অক্ষরবৃত্তের পর্ব পাই, মন্দাক্রান্তা ছন্দ পাই, এবং পাঠক সেসব গ্রহণও করেছে। আজকাল আপনার কবিতায় ছন্দের কোনো কাঠামো খুঁজে পাই না, এর কারণ কি? ছন্দে লিখে আপনি কি হতাশ? কবিতার জন্য ছন্দের কোনো প্রয়োজন নেই বলছেন?
মাহবুব হাসানঃ হ্যাঁ, আগের কবিতায় ছন্দ ছিলো, যা আমি প্রথম যৌবনে শিখেছিলাম। ছন্দের সেই শাসনেই তো সারা জীবন ছিলাম এবং এখনো আছি। কিন্তু আপনি কেন বলছেন যে ছন্দের কাঠামো খুঁজে পাচ্ছেন না। বাংলা কবিতার তিনটি মৌলিক ছন্দ স্বরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত ও অক্ষরবৃত্ত ছন্দে তো লিখেছি।
আমি তো প্রবহমান অক্ষরবৃত্তেই এখন লিখি, যা দেখতে গদ্যের মতো। এটা মূলত শ্বাসাঘাতের সাথে জড়িত। অনেকে মুক্তক বলে এক। অথবা অন্য নামেও তা প্রচল হতে পারে, আমি তা জানি না। ছন্দের বেড়াজাল থেকে কবিতার মুক্তি জরুরি বলেই মনে করি। কিন্তু আমরা তো ছন্দমুক্তির কোনো চিন্তা করি না। করা উচিত।
একটা কথা বলে নিই আগে। ছন্দ কিন্তু কবিতা নয়। মাত্রা গুনে শব্দ বসালেই কবিতা হয় না। কবিতার মূল শক্তি ইমাজিনেশন পাওয়ার। একে আমরা কল্পনাশক্তি বলতে পারি। আর কল্পনাশক্তির ওপরই কবির চিত্রকল্প সৃষ্টির মৌলিক কাজ আমরা দেখতে পাবো। বুদ্ধদেব বসু বলেছেন— ‘আমাকে এখন লিখতে হবে কথার বদলে চিত্রকল্প দিয়ে।’
কে ভালো কবি ও বড় মাপের কবি, তা নির্ণীত হয় সেই কবির বিপুল ব্যাসার্ধ্য কল্পনাশক্তির প্রকাশ-চিত্রকল্প দেখে। জীবনানন্দ কেন বড় মাপের কবি? কারণ তার চিত্রকল্পময়তা। ইমেজ ও ইমেজারির মধ্যে পার্থক্য আছে, সেটা কবিকে বুঝতে হয়।
কথাকে আপনি মাত্রায় ফেলতে পারবেন, ইমেজকেও পারবেন কখনো কখনো, কিন্তু ইমেজারি দিগন্তের উন্মোচন করে। তাকে বাঁধবেন কি দিয়ে? ছন্দ সেখানে গৌণ ভূমিকায় থাকে। ছন্দ সেখানে নিজেকে লুকিয়ে রাখে বা রাখতে বাধ্য হয়। সে থাকে মানুষের দেহের শিরদাঁড়ার মতো। আমি এখন ছন্দমুক্ত হতেই চেষ্টা করি।
জহিরুলঃ একটি কবিতা কখন কবিতা হয়ে ওঠে? একটি সফল কবিতায় কি থাকা দরকার বলে আপনি মনে করেন?
মাহবুব হাসানঃ কবিতার কোনো কাঠামো নেই যে ওই কাঠামো দেখে বলবো ওটি কবিতা। এই যে ছোটো একটি ফর্মেটে আমরা আমাদের কথাগুলো লিখি, এর কারণ হচ্ছে, আমরা আমাদের কথাগুলোকে প্রতীকী করে প্রকাশ করি। ফলে বেশি কথা লেখার দরকার হয় না। দরকার কি বলতে চাই সেই কথাগুলোর প্রতীক খুঁজে নেয়া। এখন কিসের প্রতীক কী? সেটা আমরা জানি না। সেটা জানার জন্য আপনাকে অবিরাম কবিতা এবং সাহিত্যের গদ্য পাঠ করতে হবে।
আমি চিত্রকল্পময়তাকেই প্রাধান্য দিই কবিতার জন্য। উপমা যা মূলত একটির সাথে অন্যের তুলনা, প্রতীক বা সিম্বল কী তা বুঝতে, জানতে হবে। ভাষার মধ্যে যে শব্দ, ব্যঙ্গ ও শ্লেষ নির্মাণ করতে পারে, তার ব্যবহার (যেমন বরং তুমিই লেখো নাকো একটি কবিতা/ অজর, অক্ষয় অধ্যাপক এক’ (সমারূঢ়- জীবনানন্দ)। এই শ্লেষবাণ এবং শব্দালংকারসহ আরো কিছু উপকরণ-অলংকার আছে যা ভাষার মধ্যেই আছে, কেবল তাকে কবি তার নিজের দক্ষতা অনুযায়ী নির্মাণ করবেন।
সফল বলে কোনো কবিতা নেই। কবিতা ভালো লাগা, মন্দ লাগা সম্পূর্ণ নির্ভর করে পাঠকের উপলব্ধির ওপর। পাঠক পড়তে পারেন, কিন্তু শব্দের ভেতরে নিহিত অন্তর্গূঢ় ব্যঞ্জনা যদি অনুভব করতে না পারেন, তাহলে সেই ‘খ্যাত’ সফল কবিতাও ব্যর্থ প্রমাণিত হবে। অর্থাৎ পাঠককেও হতে হবে ‘সহৃদয়হৃদয়সংবেদী’ মানুষ। তাকে জানতে হবে তার সাংস্কৃতিক জীবনাচারের অনুপুংখ, ইতিহাসের দুর্লভ তথ্যপঞ্জি, জানতে হবে সুন্দরের ওরিয়েন্টাল ও পশ্চিমা দৃষ্টিভঙি ও তার ব্যখ্যা। যদিও সৌন্দর্যের মাপকাঠি বলে কিছু নেই, তবু আমরা নানামুনির নানা মতকেই সেই সুন্দরের মাপকাঠি বলে ধরে নিয়ে তার ব্যাখ্যা দিই। ‘কায়া তরুবর পঞ্চবি ডাল’ চর্চাপদের এই পঙক্তির মানে আমরা বুঝবো না, যদি পন্ডিতজন এর ব্যাখ্যা না দেন। ‘কায়া হচ্ছে তরু বা গাছের পাঁচটি ডালের মতো।’ কিন্তু সেই পাঁচটি ডাল যে পাঁচরকমের, পাঁচ আকারের এবং পাঁচের এই অসমতল চেহারার সম্মিলন, এটা কি আমরা কেউ বুঝবো? তার মানে আমরা যা বুঝি তা অন্যের মুখের স্বাদে নিজের স্বাদকে মিলিয়ে।
এ-জন্য সফল বলে কোনো কবিতাকে চিত্রিত বা চিহিৃত করা ঠিক না। আমি করি না। করতে চাই না।
জহিরুলঃ আপনি নিজেকে কি একজন সফল কবি মনে করেন? কি কারণে আপনি সফল বা অসফল?
মাহবুব হাসানঃ সফল বলে কোনো শব্দ আমার অভিধানে নেই। কবিতার সাথে সাফল্য শব্দটি যোগ কে বা কারা করেছে, তা আমার জানা নেই। এটি একটি বাণিজ্যিক শব্দ। ধরুন, আমাদের দুই প্রধান কবি আল মাহমুদ ও শামসুর রাহমান, জীবিতকালে কোনো কোনো কবিকে চিহিৃত ও চিত্রিত করে গেলেন সফল বা ভালো কবি হিসেবে। এবং কি কি কারণে তিনি বা তারা ভালো বা সফল সে কথাও বলে গেলেন। কিন্তু আপনি এখন পড়ে দেখলেন, ওই কবি বা তার কবিতা আপনার ভালো লাগছে না। তাহলে তার সাফল্য কোথায় থাকলো? যেমন আমি মনে করি, নির্মলেন্দু গুণ সফল কবি, মহাদেব সাহাও। দুজনেরই প্রচুর পাঠক আছে। তাদের কবিতার বই আল মাহমুদ ও শামসুর রাহমানের বইয়ের চেয়ে বেশি বিকায়। তাহলে কি আমরা ধরে নেবো রাহমান ও মাহমুদ ছোটো কবি গুণ আর সাহার চেয়ে? তাদের সাফল্য তো কবিতার নয়, তাদের সাফল্য তো বাণিজ্যে। যারা তাদের কবিতার বইয়ের প্রকাশক, তারাই নানা কায়দায় এ-দুজনের নামে সফল কবি, ভালো কবি, বিখ্যাত কবি, আহা কবি, উহু কবি ইত্যাদি তকমা এঁটে দিয়ে বই বিক্রি বাড়িয়েছেন। তৈরি করেছেন বাণিজ্যিক সফল ‘মিথ’। যা আসল নয়, সত্যও নয়। সেই বাণিজ্য সফলতা প্রকাশকের, ওই দুই কবির নয়।
আবার অন্যভাবেও আমরা এই দুই কবির কবিত্ব যাচাই করতে পারি। তাহলো, তাদের রচিত কবিতা বিষয়ক গদ্য পড়ে। তারা কবিতা কতোটা হৃদয়ঙ্গম করতে পারেন, আমাদের চিন্তার নদীতে কতোটা ঢেউ তুলতে পারেন, তার রহস্য বোঝা ও জানা যাবে তাদের ওই সব কবিতা বিষয়ক গদ্য রচনা পড়ে।
ওই অর্থে আমার কোনো কবিতাই সফল নয়। তবে আমি মনে করি, পাঠক যদি অভিনিবেশ সহকারে পড়েন আমার কবিতা, এবং কবিতায় বর্ণিত বিষয় সম্পর্কে অবহিত থাকেন, তাহলে কবিতার রসাস্বাদন সম্ভব। আমি বাণিজ্যিক সফল কবি নই, কোনোদিন ছিলাম না। আমি কবিতা লিখেছি, বর্ণনা লিখিনি। কাব্যিক বিচারে আমার কবিতা আমার কাছে সফল। অন্যের কাছে তা কি তা আমি জানি না। যারা ইতোমধ্যেই আমার তিরিশ বছরের চর্চার কবিতা নিয়ে লিখেছেন, আমার ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে, ২০০৪ সালে, তারা জানেন আমি কি রকম কবি।
জহিরুলঃ ত্রিশের দশক থেকে বাংলা কবিতা গণবিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, এর জন্য পশ্চিমা আধুনিকতাই দায়ী, আপনি কি একমত? নাকি পশ্চিমকে পুরোপুরি ধারণ করে বাংলা কবিতায় একে সঠিক মাত্রায় ঢেলে দিতে না পারাই এর প্রধান কারণ?
মাহবুব হাসানঃ কবিতা শিল্প হিসেবে সব সময়ই ছিলো গণবিচ্ছিন্ন। যখন পশ্চিমা আধুনিকতার প্রকোপ শুরু হয়, তার আগে যারা সেরা কবি হিসেবে তখনকার শিক্ষিতজনের কাছে গণ্য হতেন, তারা গণমানুষের থেকে ছিলেন বিচ্ছিন্ন। কারণ অনেক। তবে প্রধান কারণ ‘গণ’ ছিলো নিরক্ষর। যারা সাক্ষর ছিলেন গণ-সমাজের মধ্যে, তাদের জ্ঞান-গম্মি তেমন ছিলো না যে মাইকেলের বা রবীন্দ্রনাথের কবিতার ভাষা বুঝতে পারবে। মাইকেল-রবীন্দ্রনাথের সাথে যেমন গ্রামীণ কৃষকের সাংস্কৃতিক পার্থক্য ছিলো আজো তেমনি আমার সাথে গাঁয়ের শিক্ষিত জনের পার্থক্য আছে। ফলে আমার কবিতা বোঝা তাদের জন্য কঠিন।
আধুনিকতা একটি মতবাদ। সেটা আমাদের দেশে তিরিশি মূলত পাঁজন কবির হাত ধরে বাংলা কবিতায় অনুপ্রবেশ করেছে। আমি একে মনে করি, বাংলা কবিতার রাজ্যে অনুপ্রবেশ, যা ব্রিটিশ বেনিয়াদের ভারত উপমহাদেশ দখলের মতোই, তবে তুলনায় আরো ব্যাপক। আমরা এখন ইউরো সাংস্কৃতিক ঔপনিবেশের অধীন। ইউরো কাব্য চিন্তার অনুকারী। আর ওই পাঁচজন, সেই ইউরো আধুনিকতার আমদানিকারক বা তাদেরই সাংস্কৃতিক এজেন্ট ছিলেন। তারা ইউরো সাহিত্যের আগ্রাসনের মধ্যে ফেলেছেন আমাদের। পোস্ট কলোনিয়াল থিংকিংয়ে কোনো নতুন মাত্রা আমরা যোগ করতে পারিনি। সে-কারণে এখনো ইউরো আধুনিকতার খোলসেই নিজেদের রেখেছি। আমাদেরকে বের হয়ে আসতে হবে ওই ইউরো এনলাইটেনমেন্টের নকল আলো থেকে। আমাদের রচনা করতে হবে ওরিয়েন্টাল চিন্তার ছাতা, যা ব্যবহার করে নিজেদের চিনতে পারবো এবং আমরা ‘স্বাধীন’ হতে পারবো। এই স্বাধীনতার একান্ত প্রয়োজন বাংলা কবিতাকে তার মাটির সংস্কৃতির সান্নিধ্যে ফেরাতে।
কোনো কিছুকে ‘পুরোপুরি ধারণ’ করার অর্থ হচ্ছে সেই কাঠামোর ভেতরে মিশে যাওয়া। আমি এতে বিশ্বাস করি না। হ্যাঁ, আপনি পশ্চিমা সভ্যতার ভালোটুকু গ্রহণ করে, তাকে মডিফাই করতে পারেন এবং নতুন কিছু সৃষ্টি করতে পারেন। মাইকেল মধুসূদন দত্ত মিলটনের প্যারডাইস লস্ট-এ উদ্বুদ্ধ হয়ে লিখেছিলেন ‘ক্যাপটিভ লেডি ও মেঘনাদ বধ’। নতুন চিন্তার দুয়ার তিনি খুলে দিয়েছিলেন। তিনি অনুকরণ করেননি। আমি অনুকরণে বিশ্বাস করি না। বরং অনুকারীকে প্রত্যাখ্যান করাই আমার ইচ্ছা।
জহিরুলঃ আপনার কবিতায় প্রচুর লোকজ শব্দ ও মিথ আনার চেষ্টা করেছেন এবং তা প্রায়শই আরোপিত মনে হয়েছে, এ বিষয়টা কি কখনো ভেবে দেখেছেন?
মাহবুব হাসানঃ মিথ ও লোকজ মিথ আমি প্রচুরই ব্যবহার করেছি। আরোপিত মনে হলে কি আমি তা ব্যবহার করতাম। আমার ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা থাকতেই পারে, সেটা আমার কাছে মনে নাও হতে পারে। আপনি একজন পাঠক, আপনার কাছে যদি আরোপিত মনে হয়, তাহলে ধরে নিতে পারি দোষ করে বসে আছি।
আমি মিথ ব্যবহার করি কেবল সেই মিথের প্রচলিত গল্পের আবহে নয়, তাকে নতুন মাত্রায়ও উপস্থাপনের জন্য। হয়তো সে ক্ষেত্রেও আমি ব্যর্থ। কারণ আপনার মতো একজন সহৃদয়হৃদয়সংবেদী পাঠককে তৃপ্তি দিতে পারেনি আমার কবিতা, সেই মিথ পরম্পরা। আমাকে এ-নিয়ে আরো গভীরভাবে ভেবে দেখতে হবে।
লোকজ শব্দ আমি সাধারণত এনেছি আমারই শৈশবকৈশোরকালের যাপিত জীবন থেকে। ওই যে আমরা যারা গ্রাম থেকে মহানগরের গনগনে চুলায় এসেছি, তারা ভুলতে পারি না সেই লোকজীবনের পরম্পরা, যা আমাদের অস্তিত্বের অংশ। নিজের অস্তিত্ব কি ভোলা যায়?
জহিরুলঃ আপনার কবিতায়/গানে রানু, রিনা, এই নামগুলো এসেছে, এই র-প্রীতির কি কোনো বিশেষ কারণ আছে?
মাহবুব হাসানঃ হ্যাঁ কারণ আছে। প্রথমত র-এর অনুরণন। অনুরণনের একটি সামাজিক দ্যুতি আছে। আমাদের কান সব সময় অনুরণনপ্রিয়। মিল-মহব্বত আছে এমন শব্দের ঝংকারে তারা খুব খুশি হয়। এ-জন্যে তারা নজরুল-রবীন্দ্রনাথ-জসীমউদদীনের কবিতায় বেশি মগ্ন এবং পছন্দের তালিকায় রাখে। অন্ত্যমিলকে তারা ছন্দ মনে করে। আমার কবিতার রিনি আমার স্ত্রীর নাম। আর রানু নামের যিনি তিনি আমার ক্লাসে পড়তেন। ভালো লাগতো তাকে। প্রেম নয়। এ-দুটি নাম ছাড়াও আরো অনেক নাম আমার কবিতায় আছে, যারা আমার বন্ধু, কবি বন্ধু বা অন্য কোনো সূত্রে আমার কবিতায় এসেছে।
জহিরুলঃ ‘আমার স্বপ্নেরা ভীত বাছুরের মতো দিশাহারা’, কেন? একই কবিতায় আবার বলেছেন, ‘স্বপ্নগুলো বিক্রি হয়ে গেছে খুব চড়া দামে গতকাল!’ - কে কিনে নিলো কবির স্বপ্ন?
মাহবুব হাসানঃ দেশের দুর্দশা দেখে তারা দিশাহারা। আমার যে স্বপ্ন ছিলো, তা আমার চেতনার সাথে মিশে সেই লোকজীবনের বাছুরের মতো হয়েছে। একটি বাছুর ভীত হলে যে-ভাবে দিশাহারা হয়ে পড়ে, ঠিক তেমনি দিশেহারা আমি, আমার মতো সাধারণ মানুষ।
আমার স্বপ্ন সন্ত্রাস দেখে, দুঃশাসন দেখে, মানুষের চরম দুর্দশা দেখে, মানবতার অবমাননা দেখে, হত্যার শিকার হতে দেখে, টাইরান্ট শাসকের নির্যাতন-নিপীড়ন দেখে, ভেতরে বাইরে রক্তাক্ত সমাজ-সংসার দেখে তার মনে হয়েছে যে, ‘স্বপ্নগুলো বিক্রি হয়ে গেছে সন্ত্রাসের কাছে’। আর মূলত সরকারের নতজানু পররাষ্ট্রনীতি ও ভারতের কাছে আমাদের স্বাধীনতার সুফলগুলো একে একে ছেড়ে দেয়ায় মনে হয়েছে খুব চড়া দামে আমাদের স্বপ্ন বিক্রি হয়ে গেছে।
কবির স্বপ্ন নয়, ওই স্বপ্ন একটি জাতির, যা আমরা অর্জন করেছিলাম ১৯৭১ সালে, রক্তের বিনিময়ে।
জহিরুলঃ আপনি লিখেছেন, "ঈশ্বরের বেআদবি আমার রক্তে এক কোটি বেয়াড়া ঘোড়ার হ্রেষা তুললো-" আবার তিন লাইন পরেই লিখেছেন, "আজ আল্লা আমাকে কবুল করে নিয়ে তার অদৃশ্য আস্তিনে রাখলেন"। এই পরস্পর বিরোধী বক্তব্যের কারণ কি?
মাহবুব হাসানঃ আমাদের বাংলা গানে আছে ‘চোরকে বলো চুরি করো/গেরস্থকে বলো ধরো ধরো’—আধ্যাত্মিক এই গানের কথক আল্লাহর উদ্দেশে বলছেন ওই কথাগুলো। কেন বলছেন? কারণ সর্বজ্ঞ আল্লাহ তার ভালো-মন্দ বান্দাকে সমানভাবে লালন করেন। যার যা বিদ্যা, তাকেই তিনি সেইভাবেই মদত দেন। না হলে সমাজে, রাষ্ট্রে চোর, ডাকাত, রাজনৈতিক লুটেরা, হ্যাকার, ঘুষখোর, জোচ্চোর, লুইচ্চা আর ধনি-গরিবের অবস্থান থাকতো না। এই ব্যবস্থা সামাজিকভাবে আমাদের মানসিক জীবনকেও লালন করছে। তার মানে তিনিই যত অসাম্যের নকিদার, যত সংকটের সৃষ্টিকর্তা আবার সংকট নিরসনেও তিনিই ভূমিকা রাখছেন। এ-কারণেই সেই মহানকে বেআদব বলেছি, যা সামাজিক চেতনার স্তরের চেতনাজাত। তা আধ্যাত্মিক স্তরে বিদ্যমান। আর মানুষ তো সেই সৃষ্টিশীল প্রাণী, যা রয়েছে অভাবনীয় সৃজন-ক্ষমতা, টানাপোড়েনের এক দ্বিমুখিতা তার অন্তরে বাস করে। আপনি আমার আরো অনেক কবিতায়ই এ-রকম বৈসাদৃশ্য দেখতে পাবেন। কনট্রাডিকশন দেখতে পাবেন। মানুষ প্রাণী হিসেবে নানা চোরা চেতনার আঁধারে নিজেকে লুকিয়ে রাখে। সেই ক্রসকারেন্টের কতোটা আমরা জানি? আর আল্লাহ কবুল করে নেন যাকে, তাকে তিনি তার অদৃশ্য আস্তিনে লুকিয়ে রাখেন, যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় তার প্রিয় মানব সন্তান।
জহিরুলঃ ‘রাজনীতির পোদে বিষ ফোঁড়া’ এমন অশোভন শব্দ আপনি কবিতায় ব্যবহার করেছেন। আপনার বন্ধু কবি আবিদ আজাদও কবিতায় ‘গোয়ামারা’ জাতীয় শব্দ ব্যবহার করেছেন, এটা কি আপনাদের দশকের একটি বৈশিষ্ট্য?
মাহবুব হাসানঃ না, এটা আমাদের দশকের বৈশিষ্ট্য নয়। এটা কবিতার চৈতন্যশাসিত আকাঙ্খারই প্রকাশ। আমরা কথ্যবাংলায় বা মুখের ভাষায় বলি, তুমি তো শালা গোয়ামারা খাইছো! একেবারে লোকবুলি। আমি যে লিখেছি ‘রাজনীতির পোদে বিষ ফোঁড়া’, এর লক্ষ্য রাজনীতি। চলমান রাজনীতির পোদে বা কারো পাছায় বিষ ফোঁড়া উঠলে সে কি কোনো চেয়ারে বা মাটিতে বসতে পারবে? না পারবে না। আমাদের রাজনীতিও বসতে পারে না। তার মানে ওই রাজনীতি আর মাটির কাছে, জনগণের পাশে নেই। সে বিষের জ্বালায় তটস্থ। সে কাউকেই বিশ্বাস করে না, সে নিজেও কারো বিশ্বস্ত নয়। অর্থাৎ গোটা রাজনৈতিক সমাজই গণবিচ্ছিন্ন। আর কে না জানে গণবিচ্ছিন্ন রাজনীতির সিংহাসনে অধিষ্ঠিত রাজনীতিকরা নানা খোলসের আড়ালে নিজেকে গণতান্ত্রিক বলে দাবি করে এবং চামচাদের বাহবা সাজিয়ে দেশবাসী ও সমাজকে দেখায় যে তারা টাইরান্ট নয়। আসলে তারা সন্ত্রাস লালন করে ও সন্ত্রাসীদের দিয়ে প্রশাসনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান চালায়। তারা প্রথমেই ধ্বংস করে গণতন্ত্রের মৌলিক প্রতিষ্ঠানগুলো, যাতে অতি সহজে তাদের অপরাধগুলোকে ন্যায় বলে চালানো যায়। যেমন ভোটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ইলেকশন কমিশনকে (ইসি/সিইসি), বিচার বিভাগকে দলীয়করণের মাধ্যমে ন্যায় বিচারের পাছা মেরে দিয়েছে। কোনো সরকারকে চেক অ্যান্ড ব্যালান্সের মাধ্যমে সঠিক পথে পরিচালনার জন্য ওই দুটি প্রতিষ্ঠানের শক্তিকে সৃষ্টি করা হয়েছিলো। টাইরান্ট সরকারগুলো সেই সব প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে সেখানে অনুগত, ব্যাকবোনলেস চাকর স্বভাবের লোকদের নিয়োগের ব্যবস্থা করে রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে। সেই রাষ্ট্রপতিও যে একজন ক্ষমতাহীন ও ব্যাকবোনলেস মানুষ, সে আমরা সংবিধানের সংশোধন থেকেই জেনেছি। আর পরে রাষ্ট্রপতিদের তার নির্দিষ্ট ক্ষমতাচর্চার নমুনা থেকেও দেখে আসছি। হাইকোর্টে ও সুপ্রিমকোর্টে ফাঁসির রায় বহাল রাখা আসামিদের যে রাষ্ট্রপতি ক্ষমাসুন্দর চোখে দেখেন, ক্ষমা করে দেন, ভিকটিমদের পরিবারকে অসীম শূন্যতায় ভাসিয়ে দিয়ে, তার তো বিচার বিভাগের ওপর আস্থা নেই ও বিশ্বাসও নেই। তিনিই ওই সব বিচারকদের নিয়োগ কর্তা। ভেবে দেখেন বিষয়টা। একজন ব্যক্তি হিসেবে, রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসেবে ন্যায় প্রতিষ্ঠাই যেখানে তার প্রধান ও একমাত্র কর্তব্য, সেখানে তিনি রাজনৈতিক সরকারের পরামর্শে ও নির্দেশে খুনিদের ফাঁসি থেকে বাঁচালেন। একজন প্রজ্ঞাবান মানুষ হিসেবে তিনি কি এটা করতে পারেন? পারেন তখনই যখন তার পদের মোহ থাকে। এ-সব কারণেই পোদমারার কথা বলেছি। জাতির পোদ মেরে দিয়ে তারা এখন ক্ষমতার শীর্ষে বসে আছে।


Comments
Post a Comment