সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ ও আমাদের রাজতন্ত্র
কাজী জহিরুল ইসলাম
বাংলাদেশের সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ কি গণতন্ত্রের পরিপন্থি? এ নিয়ে অনেক আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক হয়েছে। সম্প্রতি এ-বিষয়ে আমি একটি ফেইসবুক স্ট্যাটাস দেওয়ায় আমার চেনাজানা অনেকেই নতুন করে আবার এই বিষয়ে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। বিষয়টি নিয়ে কথা বলার আগে আসুন দেখে নিই কি আছে ৭০ অনুচ্ছেদে। A person elected as a member of Parliament at an election at which he was nominated as a candidate by a political party shall vacate his seat if he – (a) resigns from that party ; or (b) votes in Parliament against that party. এই ইংরেজী শব্দগুচ্ছের বাংলা করলে দাঁড়ায়, ‘দলীয় মনোনয়নপ্রাপ্ত নির্বাচিত সাংসদ তার সদস্যপদ হারাবেন যদি তিনি দল থেকে পদত্যগ করেন বা সংসদে দলের কোনো প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভোট দেন’। বাংলাদেশের জন্য এটি চরমভাবে গণতন্ত্রের পরিপন্থী যখন রাজনৈতিক দলগুলো একনায়কতান্ত্রিক। যখন আমরা দেখি দলীয় প্রধানের ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের কারণে অনেককেই দল থেকে পদত্যাগ করতে হয় বা অনেকেই বহিষ্কৃত হন। একজন জনপ্রতিনিধি দেড়/দুই লক্ষ মানুষের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হয়ে সংসদে আসেন। যারা তাঁকে ভোট দিয়েছেন তাদের প্রত্যাশা থাকে তিনি জাতীয় সংসদে সেই জনগোষ্ঠীকে প্রতিনিধিত্ব করবেন। প্রকৃতপক্ষে সংসদে তার কন্ঠ মানেই নির্বাচনী এলাকার লক্ষ মানুষের কন্ঠ। অথচ তিনি সংসদে বসে গণমানুষের হয়ে কিছুই বলতে পারবেন না যদি না তার দল (বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দলের প্রধান) তাকে বলার অনুমতি দেয়। দল যদি একটি ভুল প্রস্তাব উত্থাপন করে, দলের সকল সদস্যকে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে বলতে হয়, ‘ইহাই সঠিক এবং উত্তম প্রস্তাব’, অন্য কিছু বললেই সংসদ সদস্যপদ বাতিল। অনেকে এই বলে যুক্তি দেখান যে এই বিধান না থাকলে হর্স ট্রেডিং, মানে এমপি কেনা-বেচা, শুরু হবে। এমপি যদি বিক্রি হয়ে যান এর জবাবদিহিতার জায়গা তো রয়েছেই, নির্বাচনী এলাকার মানুষ তার বিচার করবে। পরের নির্বাচনে ভোট দেবে না। লক্ষ মানুষের হাতে বিচারের ভার ছেড়ে না দিয়ে একজন পার্টি প্রধানের হাতে সেই দায়িত্ব তুলে দেওয়া কি রাজতন্ত্রের পৃষ্ঠপোষকতা নয়?
আমাদের সংবিধানের এই ধারাই রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে রাজতন্ত্রের চর্চাকে উৎসাহিত করছে। প্রকৃত গণতন্ত্রের চর্চা নিশ্চিত করতে হলে ৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করতে হবে। সদ্য স্বাধীন দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য কিছুকাল এইরকম একটি ধারা থাকতে পারে কিন্তু যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই অগণতান্ত্রিক রক্ষাকবচ গলা থেকে খুলে ফেলা দরকার। বরং সংবিধানে যা সংযোজন করা দরকার তা হচ্ছে ‘সরকারপ্রধান হিশেবে শপথ নেওয়ার সাথে সাথে রাজনৈতিক দলের প্রধানের পদ থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার পদত্যাগ হয়ে যাবে’। তাহলেই তিনি দলের না হয়ে দেশের সরকার প্রধান হতে পারবেন। এবং এক ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুই মেয়াদ পর্যন্ত সরকার প্রধান থাকতে পারবেন, এমন একটি বিধানও সংবিধানে সংযোজনের প্রয়োজন রয়েছে। তাহলে নতুন নেতৃত্ব তৈরী হবে। রজনীতিতে সৎ এবং মেধাবী নেতৃত্ব আসবে।
অনেকেই এই অভিযোগ করেন যে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন নেতৃত্ব আসছে না। মেধাবী নেতৃত্ব আসছে না। আপনি যদি গেইট বন্ধ করে দিয়ে বলেন বাসায় কেউ আসছে না কেন, তাহলে তো হবে না। দরোজা খোলা রাখতে হবে। আর্টিকেল ৭০ এবং যতবার খুশি ততবার সরকার প্রধান হওয়ার সুযোগ হচ্ছে সেই বন্ধ দরোজা।
গণতান্ত্রিক চর্চায় টপ ডাউন এবং বটম আপ দুটি এপ্রোচই কাজে লাগানো যেতে পারে। ভালো করে বিশ্লেষণ করলে দেখবেন আমাদের রাজনীতিকে গণমূখী করে তোলার জন্য কোনো এপ্রোচেরই প্রয়োগ নেই। যারা আসছেন তারা কনুইয়ের শক্তিতে আসছেন এবং যতক্ষণ কনুইবাজি করতে পারছেন ততক্ষণই টিকে থাকতে পারছেন। আর সবচেয়ে দুঃখজনক ব্যপার হলো আপনি যত মেধাবীই হোন না কেন দুটি পরিবারের গদিনশিন না হলে আপনি রাজনীতিতে নমশূদ্র। আপনার সর্বোচ্চ উত্থান হতে পারে দলের সাধারণ সম্পাদক পর্যন্ত। দলের প্রধান আপনি কোনোদিনও হতে পারবেন না। ওই পদটি রাজতান্ত্রিক পদ, রাজপরিবারের ক্রাউন প্রিন্স/প্রিন্সেস বা প্রয়াত রাজা/রানির বেটার হাফ ছাড়া অন্যদের জন্য নিষিদ্ধ। তাই আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন মেধাবী নাগরিকেরা রাজনীতির ধারে-কাছেও ঘেঁষতে চান না। দলগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে রাজতন্ত্রের চর্চা অব্যাহত থাকার ফলে এখন অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে দলের সাধারণ সম্পাদক (সেকেন্ড ইন কমান্ড) প্রকৃতপক্ষে দলীয় প্রধানের সবচেয়ে বিশ্বস্ত দাস হয়ে উঠছেন। দলের সদস্য এবং সমর্থকদের প্রতি তার কমিটমেন্টের চেয়ে দলীয় প্রধানের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনেই তার আগ্রহ বেশি। ফলে তিনি দলের সাধারণ সম্পাদক বা মহাসচিব না হয়ে, হয়ে ওঠেন একজনের ব্যক্তিগত সহকারী। এটি এখন যে কেউ বলবে যে ওই পদে যাওয়ার পূর্বশর্ত হচ্ছে তার নিজের কোনো বিবেক থাকতে পারবে না, তার নিজের একটি মুখ থাকতে পারবে না, তার নিজের কোনো চোখ থাকতে পারবে না। নেতার ইচ্ছাই তার ইচ্ছা, নেতার মাথায় ছাতা ধরাই তার একমাত্র কাজ।
তৃণমূল পর্যায়ে তো দূরের কথা বড় দলগুলির কেন্দ্রীয় নেতাদের কয়জন তার নিজ দলের সংবিধান পড়েছেন? বাংলাদেশের সংবিধান পড়েছেন? দেশের গুরুত্বপূর্ণ আইনগুলো পড়েছেন? হাতে গোনা দু’চারজন পাওয়া যাবে হয়ত। অথচ এগুলো একজন রাজনৈতিক কর্মীর প্রাথমিক পাঠ হওয়া উচিত। কর্মীদের এইসব পাঠ করার তাগিদ বা সুযোগ করে দেন না দলের হাই কমান্ড, কারণ হাই কমান্ড চান না কর্মীরা সব কিছু জানুক। তারা চান কর্মীরা কনুইয়ে শান দিক, যাতে কর্মীদের কনুইয়ের জেল্লায় নেতা/নেত্রীরা তাদের চেয়ারে দীর্ঘদিন বসে থাকতে পারেন। বিনিময়ে কর্মীরা টেন্ডার, বাসস্ট্যান্ডের চাঁদা, গরুর হাটের চাঁদা ইত্যাদি নগদ নারায়ন পেয়ে থাকেন। এতেই তারা তুষ্ট, কেননা এর চেয়ে বেশি কিছু পাওয়ার যোগ্যতা তাদের অর্জন করতে দেওয়া হয়নি।
এই অবস্থা দীর্ঘদিন চলতে থাকলে রাজনীতি বিকলাঙ্গ হবে, আইনের শাসন তিরোহিত হবে, মানুষ পারস্পরিক বিশ্বাস এবং শ্রদ্ধা হারাবে, লুট, খুন, গুম জবরদখল নৈমিত্তিক ব্যাপার হবে, মানবিক বোধ লোপ পাবে, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশটি হাস্যরসের বিষয় হয়ে দাঁড়াবে।
এই অবস্থা থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায় হলো রাজতন্ত্রের অবসান। আর্টিকেল ৭০ বাতিল করতে হবে, দুই মেয়াদের বেশি সরকার প্রধান হওয়া যাবে না, এই ধারা যোগ করতে হবে। সরকারপ্রধান হওয়ার সাথে সাথে তাকে রাজনৈতিক দলের সকল পদ থেকে ইস্তফা দিতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। মেধার মূল্যায়ন করতে হবে। সব ধরণের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, পুরষ্কারের ক্ষেত্রে দলীয় বিবেচনাকে শূন্যের কোথায় নামিয়ে আনতে হবে।
এখন কথা হচ্ছে কাজটি কে করবে? আমরা কি এই আশায় বসে থাকবো যে নেপালের রাজা জ্ঞানেন্দ্র বীরবিক্রম শাহদেবের মতো একদিন আমাদের কোনো এক রাজা বা রানির শুভ বুদ্ধির উদয় হবে, তিনি রাতারাতি এইসব সংস্কার করে গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার শুভ সূচনা করবেন, নাকি যে প্রত্যয় নিয়ে, যে চেতনা নিয়ে, ৭১ এ বীর মুক্তিযোদ্ধারা বাংলাদেশ স্বাধীন করেছিলেন সেই চেতনার আলোকে জ্বলে উঠে দেশবাসী গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার দাবী নিজেরাই আদায় করে নেবেন?
বাংলাদেশের মানুষকেই তা ভেবে ঠিক করতে হবে।

Comments
Post a Comment