Skip to main content

দক্ষিণ এশিয়াই রেকর্ড করেছে

পৃথিবীর প্রথম নারী সরকারপ্রধান

|| কাজী জহিরুল ইসলাম || 




মানছি, দেশের শীর্ষ পর্যায়ে নারীর অবস্থান সমাজে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করে না। কিন্তু যখন নারী বা নারীরা একটি দেশের রাষ্ট্র ক্ষমতা দীর্ঘদিন নির্বিঘ্নে পরিচালনা করেন, তখন একথা অন্তত বলা যায় যে সেই দেশের বা সেই ভূখন্ডের জনসাধারণের মধ্যে নারীর ক্ষমতায়নের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব  রয়েছে। উন্নত বিশ্বের লোকেরাই প্রথম উপলব্ধি করেন সমাজে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা না গেলে সামগ্রিক উন্নয়ন ব্যহত হবে। এর ঢেউ এসে লাগে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে। সেই ঢেউয়ে, কখনো কখনো বিষয়টি ভাল করে না বুঝেই, আমরা ভেসে যাই। এ বিতর্কে যাওয়ার অবশ্য আমার ইচ্ছে নেই। আজ আমি রাষ্ট্র ক্ষমতায় নারীর অবস্থান বিষয়েই আলোকপাত করবো। ভারত-পাকিস্তানের রাষ্ট্র ক্ষমতায় নারী বা গত ২৬ বছর ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে বাংলাদেশ শাসন করছেন নারীরা, এটি কোনো আকস্মিক বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। পৃথিবীর প্রথম নির্বাচিত নারী সরকার প্রধান যিনি ছিলেন তিনিও দক্ষিণ এশিয়ারই মানুষ। এর আগে অবশ্য সোভিয়েত ইউনিয়নের বেশ কিছু রাজ্যে নারীরা প্রধান নির্বাহির দায়িত্ব পেয়েছিলেন, যাদের মধ্যে ইউক্রেনের ইয়েভগেনিয়া বশ ৩০ ডিসেম্বর ১৯১৭ সালে (ভারপ্রাপ্ত),  বেলারুশের নাদেজদা গ্রেকোভা ১৯৩৮ সালের ২৫ জুলাই, তানু তোবা রাজ্যের খেরতেক আঞ্জিমা-তোকা ১৯৪০ সালের ৬ এপ্রিল এবং মঙ্গোলিয়ার সুখবাতারিন ইয়াঞ্জমা ১৯৫৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর (ভারপ্রাপ্ত)উল্লেখযোগ্য। শ্রীলংকার তিনবারের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমাভো বন্দরনায়েকে ১৯৬০ সালের ২১ জুলাই তৎকালীন স্বাধীন সিলন এর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ করেন এবং ১৯৬৫ সালের ২৭ মার্চ পর্যন্ত দেশটির রাষ্ট্রক্ষমতা পরিচালনা করেন। তিনিই কোনো স্বাধীন দেশের প্রথম নির্বাচিত নারী সরকার প্রধান। ১৯৬৬ সালের ২৪ এপ্রিল পৃথিবীর দ্বিতীয় নারী সরকার প্রধান ক্ষমতা গ্রহণ করেন, তিনিও দক্ষিণ এশিয়ারই মানুষ, ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। এরও অনেক পরে ১৯৭৯ সালের ৪ মে উন্নত দেশগুলোর মধ্যে গ্রেট ব্রিটেনের ক্ষমতায় আসেন একজন নারী, মারগারেট থেচার। এর মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো ১৯৭০ সালের ২৯ মে ক্ষমতা গ্রহণ করেন শ্রীমাভো বন্দরনায়েকে এবং ৭ বছর ৫৫ দিন ক্ষমতায় থেকে বিদায় নেন ১৯৭৭ সালের ২৩ জুলাই। ইজরাইলের চতুর্থ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে গোল্ডা মেয়ার ১৯৬৯ সালের ১৭ মার্চ দেশটির প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ইউক্রেনে জন্মগ্রহণকারী এই নারী পরিবারের সঙ্গে আমেরিকায় অভিবাস গ্রহণ করেন এবং স্কুল শিক্ষিকার পেশা বেছে নেন। পরবর্তিতে স্বামীর সঙ্গে দ্বিতীয়বার অভিবাস গ্রহণ করেন প্যালেস্টাইনে। তিনি পৃথিবীর চতুর্থ এবং ইজরাইলের একমাত্র নারী প্রধানমন্ত্রী।    

আজকের এই রচনায় পৃথিবীর প্রথম নারী সরকার প্রধান শ্রীমাভো বন্দরনায়েকেকে নিয়েই আলোচনা করবো।  ১৯১৬ সালের ১৭ এপ্রিল তিনি তৎকালীন ব্রিটিশ কলোনি সিলনে জন্মগ্রহণ করেন। মাঠ থেকে উঠে আসা নেত্রী তিনি নন, জন্মই তাঁর এক রাজনৈতিক পরিবারে। পিতা বারনেস রাতওয়াত্তে ছিলেন স্টেট কাউন্সিলের সদস্য এবং ব্রিটিশ সিলনের সিনেটর। ১৯৪০ সালে ২৪ বছর বয়সে শ্রীমাভো  রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ৪১ বছর বয়সী সলোমন ওয়েস্ট রিজওয়ে ডায়াস বন্দরনায়েকের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। এর ছয় বছর পরে ১৯৪৬ সালে শ্রীলংকার ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টি প্রতিষ্ঠিত হয়, সলোমন ছিলেন এই পার্টির প্রতিষ্ঠাতাদেরই একজন, তিনি ১৯৪৭ সালে নিম্নকক্ষের সাংসদও নির্বাচিত হন। উচ্চাকাংখী এবং দূরদর্শী সলোমন ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টি থেকে বেরিয়ে গিয়ে শ্রীলংকা ফ্রিডম পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৫৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে জয়লাভ করে সলোমন শ্রীলংকার চতুর্থ সরকার প্রধানের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। কিন্তু অচিরেই, ১৯৫৯ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর তাঁকে হত্যা করা হয়। তাঁর মৃত্যু রাষ্ট্রক্ষমতায় এবং দলের মধ্যে শূন্যতার সৃষ্টি করে, যার ফলে ১৯৬০ সালের মার্চ মাসের নির্বাচনে ফ্রিডম পার্টি হেরে যায়। অবধারিতভাবেই পার্টির হাল ধরেন সলোমনের বিধবা শ্রীমাভো। তাঁর বিচক্ষণ নেতৃত্ব দলকে পুনর্গঠিত করে মাত্র চার মাসের মাথায় ক্ষমতায় নিয়ে আসে। ২১ জুলাই ১৯৬০ তারিখে তিনি শ্রীলংকার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং এর মধ্য দিয়ে তিনি আধুনিক বিশ্বের প্রথন নারী প্রধানমন্ত্রী হয়ে রেকর্ড গড়েন।

এরপর আর তাঁকে কখনোই পেছেন ফিরে তাকাতে হয় নি। ১৯৬৫ সালে তাঁর দল নির্বাচনে হেরে গেলে তিনি বিরোধীদলীয় নেতার দায়িত্ব পালন করেন ১৯৭০ পর্যন্ত। ৭০-এর নির্বাচনে জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে তিনি আবার প্রধানমন্ত্রীর আসনে অধিষ্ঠিত হন।  এ পর্যায়ে তিনি দেশের সংবিধানসহ বিভিন্ন পর্যায়ে বেশ বড় ধরনের পরিবর্তন আনেন। সিলন থেকে দেশের নাম পরিবর্তন করে রাখেন শ্রীলঙ্কা। মেয়াদের শেষের দিকে তার জনপ্রিয়তায় বড় ধরনের ধস নামে। অভিযোগ ওঠেক্ষমতার অপব্যবহারের। গোটা আশির দশকটাই বেশ খারাপ সময় কাটিয়েছেন তিনি। পরে ১৯৯৪ সালে আবারও শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। 

এই সময়ের মধ্যে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন ইন্দিরা গান্ধী, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন বেনজীর ভুট্টো এবং ১৯৯০ সাল থেকে আজ অবধি লাগাতারভাবেই বাংলাদেশের সরকার প্রধানের দায়িত্ব পালন করছেন দু’জন নারী, বেগম খালেদা জিয়া এবং শেখ হাসিনা। দক্ষিণ এশিয়ার নারী নেত্রীদের সাথে মারগারেট থেচার বা এঞ্জেলা মারকেলের মতো নারী নেত্রীদের একটি বড় পার্থক্য রয়েছে। সন্দেহ নেই শ্রীমাভো বন্দরনায়েকের নেতৃত্ব ছিল রাষ্ট্রনায়কোচিত কিন্তু তাঁর উত্থান ছিল স্বামীর স্থলাভিষিক্ত হওয়ার মধ্য দিয়েই। একইভাবে জওহরলাল নেহেরুর কন্যা না হলে বা জুলফিকার আলী ভুট্টোর কন্যা না হলে ইন্দিরা বা বেনজীরের রাষ্ট্রক্ষমতায় আরোহণ সম্ভব হত না। বাংলাদেশে যে দুজন নারী ২৬ বছর ধরে দেশ শাসন করছেন তারাও কারো কন্যা অথবা কারো স্ত্রী। দক্ষিণ এশিয়ার নারী নেত্রীদের নেতৃত্বের ঔজ্জ্বল্য রয়েছে তবে তা চাঁদের আলো। কিন্তু আমরা যদি মারগারেট থেচার বা এঞ্জেলা মারকেলের দিকে তাকাই তাহলে দেখবো যে অন্য কোনো পুরুষের কাধে ভর করে তাদেরকে নেতৃত্বে আসতে হয়নি, তাঁরা স্বতন্ত্র, সূর্যের মতো প্রোজ্জ্বল। চাঁদের আলোয় ফুল ফোটে, আমরা আবেগাপ্লুত হই, প্রেমে পড়ি কিন্তু এ আলোতে ফসল ফলে না, ফসলের জন্য প্রয়োজন সূর্যের আলো। যেহেতু দক্ষিণ এশিয়ায় নারী নেতৃত্বের চর্চা পরিণত হয়ে উঠেছে আমরা প্রত্যাশা করতে পারি প্রকৃত গণতন্ত্রের চর্চা যদি হয় বা যেখানে যেখানে গণতন্ত্রের চর্চা আছে তা যদি অব্যাহত থাকে তাহলে সূর্যালোকের বিভা নিয়ে কোনো নারী আবির্ভূত হবেন। 

Comments

Popular posts from this blog

অসাধারণ এই শিল্পীর জীবনের গল্প বড় করুণ

  [এই সময়ের অত্যন্ত প্রতিভাবান শিল্পী সারফুদ্দিন আহমেদ। বাড়ি পশ্চিমবঙ্গে। আর্ট কলেজে খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করেন ,  আর শুধু ছবি আঁকেন। নানান মাধ্যমে ,  নানান বিষয়ের ছবি। সারফুদ্দিন আহমেদের ছবি থেকে চোখ ফেরানো যায় না ,  আপনাতেই ওঁর নান্দনিক সৃষ্টিকর্মে দৃষ্টি আটকে যায় ,  কী জল রঙ ,  কী অ্যাক্রিলিক ,  কিংবা স্রেফ পেন্সিলের ড্রয়িং। এই গুণী শিল্পীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কবি কাজী জহিরুল ইসলাম। সাক্ষাৎকারটি এখানে উপস্থাপন করা হলো।]       ভারত আমাকে চোখ দিয়েছে ,  বাংলাদেশ দিয়েছে দৃষ্টি -     সারফুদ্দিন আহমেদ     কাজী জহিরুল ইসলামঃ  ব্যাক গ্রাউন্ডে তবলা বাজছে আপনি ছবি আঁকছেন কাচের ওপর।    এই যে বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে ছবি আঁকা, এই ছন্দটা ছবিতে কিভাবে ধরেন? আর কোনো শিল্পী ছবি  আঁ কার সময় যন্ত্রানুসঙ্গ ব্যবহার করেছেন?   সারফুদ্দিন আহমেদঃ   কাঁচ নয়,   এটি এক বিশেষ ধরনের কাপড়-নেট। এই নেটের উপরে বর্তমানে আমার এক্সপেরিমেন্ট চলছে।    জহিরুলঃ ও ,  ফেইসবুকে যখন ছবিটি দেখি কাচের মতো ...

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জুর সাক্ষাৎকার || অষ্টম পর্ব ||

[লেখক, সাংবাদিক, অনুবাদক আনোয়ার হোসেইন মঞ্জুর সাক্ষাৎকারের অষ্টম  পর্ব আজ প্রকাশ করা হলো। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কবি কাজী জহিরুল ইসলাম।]          দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ বাসস - কে অকার্যকর করেছে  – মঞ্জু    জহিরুলঃ  আপনি ফেলোশিপ নিয়ে দিল্লীতে ছয়মাস ছিলেন, ব্যক্তিগত আগ্রহ এবং পেশাগত অভ্যাসের কারণে কাছে থেকে দেখার/বোঝার চেষ্টা করেছেন ভারতের এবং উপমহাদেশের রাজনীতি। আমরা দেখি ভারতের রাজনীতিতে গায়ক, নায়ক, লেখক, সাংবাদিকের আবির্ভাব ঘটে সব সময়ই এবং তারা রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও রাখেন। বাংলাদেশে এই ধারা খুব সম্প্রতি শুরু হলেও আমাদের জনপ্রিয় খেলোয়াড়, শিল্পীরা নিজেদের অর্থনীতি সমৃদ্ধ করা ছাড়া রাজনীতিতে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেন না। এমন কি ধর্ষণ, অন্যদেশকে ট্রানজিট প্রদান, উপর্যুপরি সড়ক দূর্ঘটনা, পরিবেশ ধ্বংসকারী কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্প ইত্যাদি ইস্যুতেও তারা নীরব। অথচ তাদের জনপ্রিয়তা এবং রাজনীতি সম্পৃক্ততা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত, যা ভারতে দেখা যায়। বিষয়টি যদি আপনার মতো করে ব্যাখ্যা করেন।  মঞ্জুঃ   দিল্লিতে আমার অবস্থানকালকে আমি নানা দিক থ...

কানের কাছে নারী কন্ঠ

  স্বপ্নের ঐশ্বর্য   || কাজী জহিরুল ইসলাম ||   ছুটির দিন। লম্বা সময় ধরে ঘুমাবো। কিন্তু তার আর উপায় নেই। কানের কাছে নারী কন্ঠ। বেশ আত্মবিশ্বাসী কন্ঠ। ক্রমাগ ত  কথা বলে যাচ্ছেন এক অপরিচিতা। আমি লাফ দিয়ে উঠি। কে তিনি ?  আমার স্ত্রী বলেন ,  রুবানা হক ,  শোনো কী বলছেন। রুবানা হক প্রয়াত ব্যবসায়ী আনিসুল হকের স্ত্রী। আমাদের কৈশোর-উত্তীর্ণ কালে আনিসুল হক ছিলেন আমাদের হিরো। টিভি উপস্থাপনায় অন্য এক আধুনিকতা নিয়ে হাজির হন তিনি। এরপর আমরা ধীরে ধীরে তার ব্যবসায়ীক সাফল্য ,  সাংগঠনিক সাফল্য দেখতে দেখতে বড় হই। খুব সাম্প্রতিককালে ,  আনিসুল হকের মৃত্যুর পর ,  কেউ একজন বলেছিলেন ,  তার স্ত্রী রুবানা হকও খুব ভালো কথা বলেন। কিন্তু রুবানা হকের কথা শোনার সৌভাগ্য আমার হয়নি। দুই যুগ ধরে দেশের বাইরে থাকার কারণে এই সময়ে স্টার হয়ে ওঠা অনেকের সম্পর্কেই আমার ভালো ধারণা নেই।  তার কথায় এমন কিছু ছিল যে আমার পক্ষে ঘুমিয়ে থাকা সম্ভব হয়নি। আমি মুক্তিকে বলি ,  প্রথম থেকে দাও ,  পুরো বক্তৃতাটা আমি শুনতে চাই। আমি পরপর দুইবার তার পুরো বক্তব্যটা শুনি ,  ফ...