Skip to main content

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জুর সাক্ষাৎকার - দ্বিতীয় পর্ব

তিন চার লাইনে খুশবন্ত সিং 

আমাকে অনুমতিটা লিখে দেন

                               - আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু 


 [লেখক, সাংবাদিক, অনুবাদক আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু একজন প্রথিতযশা বাংলাদেশি সাংবাদিক। বর্তমানে আমেরিকা প্রবাসী। তিনি ষাটের অধিক বিশ্বসাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ বাংলায় অনুবাদ করেছেন। খুশবন্ত সিং তাকে লিখিতভাবে অনুমতি দিয়েছেন তাঁর গ্রন্থগুলো বাংলায় অনুবাদ করার জন্য। তিনি নাগিব মাহফুজের কায়রো ট্রিলজির তিন খণ্ডই অনুবাদ করেছেন। খুশবন্তের প্রায় সব বইই করে ফেলেছেন। বহুল আলোচিত ইতালীয় সাংবাদিক অরিয়ানা ফালাচির ইন্টার্ভিউ উইথ হিস্টরিঅনুবাদ করেছেন। কবি কাজী জহিরুল ইসলাম আনোয়ার হোসেইন মঞ্জুর একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নিয়েছেন যেটি ধারাবাহিকভাবে এই ব্লগে প্রকাশ করা হচ্ছে। আজ প্রকাশিত হলো দ্বিতীয় পর্ব। ]


 

জহিরুলঃ খুশবন্ত সিং, সন্দেহ নেই খুব বড় মাপের একজন লেখক, তার অনেকগুলো গ্রন্থ আপনি অনুবাদ করেছেন, খুশবন্ত সাহিত্যের প্রতি আগ্রহী হলেন কেন? তার লিখিত অনুমোদন সংগ্রহ করতে কি খুব কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিল? তার সঙ্গে দেখা করার গল্পটা জানতে চাই। 

 

মঞ্জুঃ ভারতে যারা ইংরেজি ভাষায় সাহিত্য চর্চা করেছেন, তাদের মধ্যে খুশবন্তু সিং অন্যতম; বরং বলা যায় ভারতে সর্বাধিক পঠিত লেখক। বর্তমানে ভারতে এবং ভারতের বাইরে ভারতীয় বংশোদ্ভুত বিশ্ব মানের বহু লেখক সৃষ্টি হয়েছে, তাদের অনেকের রচিত বই অত্যন্ত জনপ্রিয়, তারা আন্তর্জাতিক সাহিত্য পুরস্কার অর্জন করছেন, অনেকে বিতর্কও সৃষ্টি করেছেন।  ভারতীয়দের দ্বারা ইংরেজি সাহিত্য চর্চার ইতিহাসের দিকে লক্ষ্য করলে দেখতে পাবেন, এখনো এর বয়স দেড়শ বছর হয়নি। যদিও এর আগেও ইংরেজিতে ভারতীয়রা নন-ফিকশন ধরনের লেখা লিখেছেন এবং ধারণা করা হয় যে কোনো ভারতীয় কর্তৃক ইংরেজিতে প্রকাশিত বইয়ের প্রথম লেখক ছিলেন শেখ দীন মোহাম্মদ, যার লেখা “দ্য ট্রাভেলস অফ দীন মোহাম্মদ” প্রকাশিত হয় ১৭৯৩ সালে। রাজনৈতিক ও আত্মজীবনীমূলক কিছু ইংরেজি বই অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ ভাগে লেখা হলেও ভারতে প্রথম পর্যায়ের ইংরেজি সাহিত্য সৃষ্টিকারীরা ভারতীয় প্রেক্ষাপটে তাদের কাজ শুরু করেন উনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে এবং তারা এখন আমাদের কাছেও ইংরেজি লেখক হিসেবেই পরিচিত, আমরা তাদের বই পড়ি এবং তাদের সময়ের মানুষ, সমাজ ও রাজনীতি সম্পর্কে নির্মোহ ধারণা পাই। প্রথম পর্যায়ের ভারতীয় ইংরেজি সাহিত্যের প্রসঙ্গ আসলে আমরা আর,কে নারায়ণ, মুলক রাজ আনন্দ, রাজা রাও এর কথা ভাবি। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও এই সময়েই তাঁর অনেক কবিতা ও অন্যান্য লেখা নিজেই ইংরেজিতে অনুবাদ করতেন। 

 

জহিরুলঃ এর কিছুকাল পরেই তো খুশবন্ত সিং, নীরদ সি চৌধুরীদের আবির্ভাব ঘটলো।

মঞ্জুঃ হ্যাঁ, খুশবন্ত সিং তাদের একটু পর সাহিত্য চর্চায় পা রাখেন। তিনি বরাবর ইংরেজিতেই লিখেছেন। তুলনামূলভাবে একটু বিলম্বে। তাঁর জীবন বৈচিত্রে ভরা। পড়াশোনা করেছেন কেমব্রিজ ও ইনার টেম্পলে। আইনজীবী, কূটনীতিক, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ ও লেখক হিসেবে কাজ করেছেন জীবনের এক এক পর্যায়ে। সম্ভবত তিনি প্রথম জীবনে স্থির করতে পারেননি পেশা হিসেবে কোন্ কাজটি তিনি বেছে নেবেন। এ কারণেই আমি বলেছি যে সাহিত্য চর্চায় তিনি এসেছেন তুলনামূলকভাবে বিলম্বে।  তাঁর প্রথম উপন্যাস “ট্রেন টু পাকিস্তান” প্রকাশিত হয়েছে ১৯৫৪ সালে, তখন তাঁর বয়স ৩৯ বছর। এরপর তিনি আর থেমে ছিলেন না। তাঁর সাহিত্য উপন্যাসের মধ্যে সীমিত ছিল না। বরং তাঁর সবচেয়ে বড় কাজ হলো দুই খণ্ডে শিখদের ইতিহাস। তাঁর জনপ্রিয় হয়ে ওঠার পেছনে সাহিত্যে অবদানের চেয়ে তাঁর সিণ্ডিকেটেড কলামের ভূমিকা অধিক। নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত তাঁর কলাম ভারতের ৫০টির বেশি সংবাদপত্রে প্রকাশিত হতো। 

বিভিন্ন বিষয়ের ওপর তাঁর বইয়ের সংখ্যা আশিটির বেশি। আমি তাঁর মাত্র পনেরোটি বই অনুবাদ করেছি, যার মধ্যে রয়েছে তাঁর সবগুলো উপন্যাস, তাঁর আত্মজীবনী, দুটি ছোটগল্প সংকলন, একটি প্রবন্ধ সংকলন এবং একটি জোকস এর বই। ১৯৮৪ সালের আগে খুশবন্ত সিং এর সাহিত্য সম্পর্কে আমরা কোনো ধারণা ছিল না, তাঁর নামও জানতাম না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালে আমি ভারতের বেশ কয়েকটি ইংরেজি ও হিন্দি ম্যাগাজিনের অনিয়মিত গ্রাহক ছিলাম, যা পরবর্তী সময়েও অব্যাহত ছিল। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল “ইলাসট্রেটেড উইকলি অফ ইণ্ডিয়া।” ম্যাগাজিনটির আদ্যোপান্ত পড়তাম। ১৯৮৪ সালে ওই ম্যাগাজিনের দুই সংখ্যায় “দ্য লাস্ট এণ্ড দ্য লোনলি সিটি” নামে বড় একটি লেখা ছিল খুশবন্ত সিংয়ের। ঐতিহাসিক কাহিনি ভিত্তিক লেখা এবং কাহিনির মূল চরিত্র বিখ্যাত উর্দু কবি মীর তকী মীর। এটি প্রকাশিতব্য একটি উপন্যাসের অংশ বলে উল্লেখ করা ছিল। আমি তখন ঢাকার কিছু ম্যাগাজিনের জন্য গল্প অনুবাদ করতাম। খুশবন্ত সিংয়ের ওই লেখাটিও অনুবাদ করি। কিন্তু নারী-পুরুষের যৌন সম্পর্কের রগরগে বর্ণনা থাকায় কোনো ম্যাগাজিন সেটি প্রকাশ করতে রাজি হয়নি। আমার এক বন্ধু বললেন মোস্তফা জব্বারের পাক্ষিক নিপূণে দিতে। মোস্তফা জব্বার কাটছাট করে ছাপতে রাজি হলেন। অনুবাদ করার সময়ই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে উপন্যাসটি প্রকাশিত হলে আমি অনুবাদ করবো। সৌভাগ্যক্রমে ‘ইলাসট্রেটেড উইকলি অফ ইণ্ডিয়া’য় চিঠিপত্র কলামে তাঁর একটি চিঠি ছিল। খুশবন্ত সিংয়ের ঠিকানা লেখা একটি পোস্টকার্ড, যাতে তিনি ম্যাগাজিনের ওই সময়ের সম্পাদক প্রীতিশ নন্দীকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন ম্যাগাজিনটি ভালো হচ্ছে মর্মে প্রশংসা করে। প্রীতিশ নন্দী উত্তর দিয়েছে যে খুশবন্ত সিংয়ের সময়েই বরং ম্যাগাজিনটি অনেক জনপ্রিয় ছিল। তখনই জানতে পারি যে খুশবন্ত সিং ১৯৬৯ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত ইলাসট্রেটেড উইকলি অফ ইণ্ডিয়া’র সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। যাহোক, আমি খুশবন্ত সিংকে একটি চিঠি লিখে আমার ইচ্ছার কথা জানাই। তিনি তখন ভারতীয় পার্লামেন্টের উচ্চ কক্ষ রাজ্যসভার সদস্য। ধরেই নিয়েছিলাম উত্তর পাবো না। কিন্তু দেড় সপ্তাহের মাথায় তাঁর উত্তর আসে। তিনি জানান, উপন্যাসটি ১৯৯০ সালের আগে শেষ হবে না। আমার বাংলা অনুবাদ পাঠাতে বলেন। একটু খটকা লাগছিল। কারণ প্রকাশিত অনুবাদ যথেষ্ট কাটছাট করা। তবুও আমি পাঠিয়ে দেই। আবারও তাঁর উত্তর আসে, তিনি তাঁর সাথে যোগাযোগ রাখতে বলেন। 

জহিরুলঃ তো বইটি পাওয়ার জন্য ৯০ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করলেন?

মঞ্জুঃ ১৯৮৮ সালে আমি ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের একটি বৃত্তি পেয়ে ক্যালিফোর্নিয়ার স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে আসি। ক্লাস শেষে, সাপ্তাহিক ছুটির দিনে ক্যাম্পাস সংলগ্ন সিটি পালো আল্টোর শপিং মল, অন্যান্য দোকানপাট, বুকষ্টোরে কাটাই। একদিন এক পুরোনো বইয়ের দোকানে বই ঘাটতে ঘাটতে খুশবন্ত সিংয়ের “ট্রেন টু পাকিস্তান” বইটি পাই। সেটি ছিল প্রথম সংস্কর। অবিশ্বাস্য দাম। মাত্র ২৫ সেন্ট। পড়তে শুরু করে বিস্মিত হই। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের অনেক গল্প উপন্যাস পড়েছি। অধিকাংশই ভারতীয় বা পাকিস্তানি লেখকদের। কিন্তু খুশবন্ত সিংয়ের ‘ট্রেন টু পাকিস্তান’ এর প্রতিটি চরিত্রকে ঘটনার সাথে এমন আবেগ দিয়ে তুলে আনা আমাকে বিস্মিত করে। মনে হয় আমি ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে দেশ বিভাগের বিভীষিকা প্রত্যক্ষ করছি। আমার অনুবাদের তালিকায় বইটি রাখি। খুশবন্ত সিং এর ওপর আমার আগ্রহ আরো বৃদ্ধি পায়।

 

১৯৮৯ সালের শেষ দিকে আমি দেশে ফিরে যাই। খুশবন্ত সিংকে আমার যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান, তাঁর ‘ট্রেন টু পাকিস্তান’ পাঠ সম্পর্কে জানাই এবং তাঁর প্রকাশিতব্য উপন্যাসের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাই। তখন তিনি আর রাজ্যসভার সদস্য ছিলেন না। পরের বছর অর্থ্যাৎ ১৯৯০ সালে আমার আগ্রহের বইটি প্রকাশ পাবে। আমি আমার কাজের ফাঁকে শুধু ভাবছিলাম, আহা, দিল্লিতে যদি দীর্ঘ সময় কাটানোর একটা সুযোগ পেতাম। আমার সম্পাদকও আমার সাথে বৈরি আচরণ শুরু করেছিলেন এবং একসময় যারা আমার ঘনিষ্ট ছিল তাদের আচরণেও এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল যে আমি দম নেয়ার জন্য দেশের বাইরে কাটিয়ে আসার কথা ভাবছিলাম। কোথায় কিভাবে সেই সুযোগ সৃষ্টি করা যায় তা খুঁজছিলাম। প্রায় দুই বছর লেগে গেল। ১৯৯২ সালে কমনওয়েলথ টেকনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স প্রোগ্রামের আওতায় দিল্লিতে ছয় মাসের জন্য একটি ফেলোশিপ পেয়ে গেলাম। কিছুদিন অন্তত মুক্ত বাতাসে নি:শ্বাস নিতে পারবো। মোগল-দিল্লি দেখতে পারবো এবং সবচেয়ে বড় কথা খুশবন্ত সিংয়ের সাথে সাক্ষাৎ করতে পারবো। আমাকে যেতে হবে ১৯৯২ সালের নভেম্বর মাসে। ভারত জুড়ে তখন বাবরি মসজিদ ইস্যু নিয়ে চরম উত্তপ্ত এক অবস্থা। ঘনিষ্টজনেরা নিষেধ করলো। কারো কথায় কান দেওয়ার অভ্যাস কোনোকালে ছিল না। অতএব ব্যাগ গুছিয়ে এক সন্ধ্যায় কলকাতাগামী প্লেনে ওঠে পড়ি, সেখান থেকে দিল্লি পৌঁছে গেলাম। 

 

সবকিছু গুছিয়ে ওঠার সময়ের মধ্যেই ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ধ্বংস হলো। আমার সাথে রুহুল আমিন নামে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের প্রটোকল অফিসারও প্রোগ্রামে ছিলেন। একসঙ্গে এক শিখ ভদ্রলাকের বাড়ির তৃতীয় তলায় থাকতাম। তাঁর নাম ছিল মনোহর লাল দং। তাঁর তিন ছেলে, দুই মেয়ের সাথে আমাদের ভালো সম্পর্ক গড়ে ওঠেছিল। সৃষ্ট পরিস্থিতি তাঁকে আমাদের নিরাপত্তার ব্যাপারে উদ্বিগ্ন করে তুলেছিল। তিনি বলছিলেন, আমি খুব সাধারণ মানুষ, তোমাদের কিছু হলে আমি নিরাপত্তা দিতে পারবো না। বাকি জীবন আমাকে, আমার পরিবারকে অপরাধ বোধের মধ্যে কাটাতে হবে।  তোমরা বরং দেশে চলে যাও। আমরা তাঁকে আশ্বস্ত করি। তবে দিল্লিতে খুব বেশি দাঙ্গা হয়নি। আমাদের ক্লাস চলছিল। বাসা থেকে বাসে এক ঘন্টার দূরত্বে ইন্সটিটিউট পর্যন্ত পথের কোনো কোনো স্পট বেশ নাজুক ছিল। যাহোক দিল্লির পরিস্থিতি শিগগিরই শান্ত হয়ে আসে। 

 

জহিরুলঃ খুশবন্ত সিংয়ের সাথে দেখা করার চিন্তা নিশ্চয়ই দাঙ্গার ভয়ে বাদ দেন নি?

মঞ্জুঃ প্রশ্নই ওঠে না। ইতোমধ্যে আমি খুশবন্ত সিংয়ের উপন্যাস “দিল্লি’ কিনে নিয়েছিলাম, আমার অনুবাদ করা অংশটিও ‘দিল্লি’তে আছে। ইতিহাসাশ্রয়ী অসাধারণ একটি উপন্যাস। প্রায় এক হাজার বছরের ইতিহাস তুলে আনা হয়েছে বিভিন্ন ঐতিহাসিক চরিত্রকে উপস্থাপনের মাধ্যমে। আমাদের প্রোগ্রামে ভারতীয় পার্লামেন্টের বেশ ক’জন অফিসার ছিলেন। তাদের কাছে খুশবন্ত সিংয়ের ফোন নাম্বার চাইলে তারা আমাকে সংগ্রহ করে দিলেন। ইন্সটিটিউট থেকে ফোন করে তাঁর সাথে দেখা করার আগ্রহ জানালে তিনি তাঁর বাড়ির পরিবর্তে ‘ইণ্ডিয়া ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার’ এ যাওয়ার দিন ও সময় বলে দিলেন। আমি যথাসময়ে গেলাম। এটি অভিজাত একটি ক্লাব। তাঁকে ঘিরে আছে অনেকে। এটেন্ডেন্টরা অপরিচিত দেখে আমার কাছে জানতে চাইলো আমি কাকে চাই? আমি বললে, একজন খুশবন্ত সিংয়ের কাছে ঝুঁকে আমার কথা বলার পর তিনি ওঠে দাঁড়ালেন এবং আমাদের একা রেখে অন্যরা চলে গেলেন। হাত মিলিয়ে বললেন, আপনাকে আরো বয়স্ক ভেবেছিলাম। আমি ড্রিঙ্ক করি কিনা জানতে চাইলেন। যেহেতু পান করি না, আমার জন্য সমুচা ও কফি দিতে বললেন। বেয়ারাররা জানে তাঁকে কী দিতে হবে। তিনি জানালেন রাস্তার ওপারেই প্রায় হাঁটা দূরত্বে সুজন সিং পার্কে তাঁর বাড়ি। আমি কী কখনো তাঁর বাড়ি আসতে পারি জানতে চাইলে তিনি আরেকদিন ফোন করে জেনে নিতে বললেন। আমার প্রয়োজন তাঁর বই অনুবাদ করার অনুমতি সংগ্রহ করা এবং একান্তে তাঁর বইগুলো সম্পর্কে জানা। ক্লাবে তা সম্ভব ছিল না। 

 

ডিসেম্বরের শেষ দিকে এক বিকেলে দিল্লির অস্থি কাঁপানো ও হৃদস্প্ন্দন থামিয়ে দেওয়ার মতো ঠান্ডার মধ্যে তাঁর সুজন সিং পার্কের বাসায় গেলাম। ইতোমধ্যে আমি জেনে নিয়েছিলাম যে উনি অতিথি আপ্যায়নে খুব উদার নন। অথবা লোকজনকে বেশিক্ষণ সহ্য করতে পারেন না। বাংলাদেশ সম্পর্কে তাঁর কিছু স্মৃতির কথা বলেছিলেন, সেটি ছিল ১৯৭২ সালে যখন নিউইয়র্ক টাইমস এর পক্ষে রিপোর্ট করতে ও পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের সাক্ষাকার নিতে আসেন। কফি দিতে বলার আগেই আমি তাঁর বই প্রকাশের অনুমতি চাইলাম। তিনি বললেন, আমার মনে আছে। তাঁর নাম ঠিকানা মুদ্রিত লেখা প্যাডে তিনি তিন চার লাইনে আমাকে বাংলায় তাঁর যে কোনো বই অনুবাদ করার অনুমতিপত্র লিখে দিলেন। কফি শেষ করে আমি তাঁকে ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় নেয়ার সময় দেশে ফিরে যাওয়ার আগে তার সাথে দেখা করে যেতে বলেন। 

 


জহিরুলঃ খুশবন্ত সিং বলেছেন তার সাহিত্যকর্ম তিনটি নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত, অন্যকে জানানো, আনন্দ দেয়া এবং ক্ষেপানো। একজন লেখক অন্যকে ক্ষেপানোর জন্য লেখেন, এই বিষয়টিকে আপনি কিভাবে দেখেন? 

 

 

মঞ্জুঃ খুশবন্ত সিং আসলে কথাটি বলেছেন যে তাঁর লেখার মূল উদ্দেশ “To inform, to entertain and to agitate” অর্থ্যাৎ পাঠকদের অবহিত করা, বিনোদন দেয়া ও ক্ষেপিয়ে তোলা। শুধু সাহিত্যের ক্ষেত্রে একথা বলেননি, সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও তিনি একই বিশ্বাস থেকে কলাম লিখেছেন। তাঁর গল্প, উপন্যাস এবং তাঁর উপ-সম্পাদকীয় কলামগুলো পড়লেই দেখা যাবে যে তিনি একই লেখায় তথ্য জানানোর পাশাপাশি হালকা অথবা সিরিয়াস ধরনের রসিকতা করে পাঠকদের বিনোদন দিয়েছেন এবং কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে ক্ষেপিয়ে তোলার মতো কথাও তুলেছেন। এজন্য তাঁকে বিশেষ করে তাঁরই সম্প্রদায়ভূক্ত শিখদের বড় অংশ পছন্দ করতো না। তিনি সম্ভবত এটাও উপভোগ করতেন। কানাডা থেকে কোনো শিখ তাঁর ওপর ক্ষোভ ঝাড়তে তাঁকে চিঠি লিখে ঠিকানা হিসেবে লিখেছে “বাষ্টার্ড খুশবন্ত সিং, দিল্লি, ইণ্ডিয়া”। এতো বড় দিল্লিতে ডাকবিভাগের পিয়ন ঠিকই জায়গামতো প্রাপককে চিঠি পৌঁছে দিয়েছে। রাজনীতিবিদদের একটি অংশ তাঁর নিন্দা করতেন ও পাকিস্তানের দালাল অভিহিত করতেন। ভিন্দ্রালওয়ালের শিখ সন্ত্রাসীদের হিট লিস্টে ছিলেন তিনি, যে কারণে প্রায় দশ বছর তাঁকে পুলিশ প্রটেকশনে থাকতে হয়েছে। খুশবন্ত সিংয়ের লেখা আমি যতোটা পড়েছি, তাতে আমার মনে হয়েছে তাঁর ক্ষেপানোটা তাঁর লেখার স্টাইলে পরিণত হয়েছিল, যা অন্য কারো পক্ষে আয়ত্ব করা সম্ভব নয়। ক্ষেপানোর মধ্য দিয়েও তিনি আসলে সত্য তুলে ধরতেই চেষ্টা করেছেন। আমার চার দশকের সাংবাদিকতায় ব্যক্তিগতভাবে আমি ক্ষেপানোর মতো কোনো কিছু লিখিনি। হয়তো আমার সে যোগ্যতাও ছিল না। ক্ষেপানোর প্রতিক্রিয়া সামলানোর মতো অবস্থাও আমার ছিল না বা নেই। তাছাড়া বাংলাদেশে কোনো পক্ষেরই সামান্য সমালোচনা বা বিরূপ মন্তব্য সহ্য করার মতো সহনশীলতা নেই। খুশবন্ত সিং পেরেছেন তাঁর পারিবারিক পটভূমি, পেশাগত অবস্থান ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা, খ্যাতি ও পরিচিতির বিশাল গণ্ডির কারণে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আমি বলতে পারি, আমাদের সামাজিক কাঠামোতে চিন্তার দৈন্যতা কাটিয়ে ওঠা শুধু কঠিন নয়, প্রায় অসম্ভব, অতএব যে কোনো লেখক-সাহিত্যিকের উচিত ক্ষেপিয়ে তোলার কাজ যথাসম্ভব পরিহার করা।

 

জহিরুলঃ খুশবন্তের বেশিরভাগ লেখাই আত্মজীবনী ধরনের, ফিকশনে সত্য থাকতেই হবে এমন নয়, কিন্তু যখন ইতিহাস বা আত্মজীবনীমূলক ফিকশন হয়, তখন পাঠক সেখানে সত্য খুঁজতে শুরু করেন। আপনি তো তাকে নিবিড়ভাবে পাঠ করেছেন, তিনি এইসব ক্ষেত্রে কতটা সত্যের কাছাকাছি ছিলেন বলে মনে করেন? 

 

জহিরুলঃ  এটা ঠিক নয় যে তাঁর বেশির ভাগ লেখা আত্মজীবনীমূলক। তাঁর লেখাগুলোর বৈশিষ্ট হচ্ছে, অধিকাংশ লেখার প্রধান চরিত্র বা প্রধান চরিত্রকে তুলে ধরার জন্য ফার্ষ্ট পার্সন বা প্রথম পুরুষে বর্ণনা করা। যদি দিল্লি উপন্যাসের কথা বলি, তাহলে দেখতে পাবেন, নিজামুদ্দিনকে বর্ণনা করে যাচ্ছেন অতি সাধারণ এক রাজ কর্মচারি, সম্রাট শাহজাহানকে তুলে ধরছে একজন মেথর এবং লেখক স্বয়ং ফার্ষ্ট পার্সনে দিল্লির নানা বিষয়ের সাথে পাঠকের পরিচয় ঘটিয়ে দিচ্ছেন। অন্যান্য উপন্যাস ও ছোটগল্পেও তিনি কমবেশি একই কাজ করেছেন। ফিকশনের পাঠক হিসেবে অথবা মুভি দেখার সময় নায়ক-নায়িকার সাথে সম্পৃক্ত হয়ে যাই। নিজেদেরকে প্রধান চরিত্রগুলোর মধ্যে দেখি। খলনায়কের বিরুদ্ধে ক্ষেপে উঠি। একটি কাহিনি শুনেছি যে নীল চাষের সময় নীলকুঠির সাহেবদের অত্যাচারের ওপর নাটক মঞ্চায়নকালে শ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তাঁর চটি ছুঁড়ে মেরেছিলেন অভিনয়কারী নীলকুঠির সাহেবের দিকে। অতএব পাঠক যদি সত্য খুঁজে পেতে চান, তাহলেও সেটি লেখকের সার্থকতা বলেই আমি মনে করি। আমি খুশবন্তে প্রায় সব বই পড়েছি, তাঁর ওপর আলোচনা ও তাঁর বিরুদ্ধে সমালোচনা এবং তাঁর সাক্ষাকারগুলো পাঠ করেছি। তাঁর উপন্যাসের মধ্যে তিনটি ‘ট্রেন টু পাকিস্তান,’ ‘আই শ্যাল নট হিয়ার দ্য নাইটিঙ্গেল,’ এবং ‘দিল্লি’ ইতিহাসশ্রয়ী বা ঐতিহাসিক ঘটনা বা ইতিহাস সৃষ্টিকারী ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে লিখিত। ঘটনা সত্য এবং ব্যক্তির অস্তিত্ব ছিল। তিনি নিজেই এ সম্পর্কে লিখেছেন, “ইতিহাস আমাকে দিয়েছে উপন্যাসের কঙ্কাল। আমি সংযোজন করেছি মাংস এবং তাতে রক্ত ও বীর্যসহ তরল উপাদানের অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছি।” খুশবন্ত সিং বলেছেন যে তার ‘দিল্লি’ লেখার অনুপ্রেরণা ছিল নোবেল বিজয়ী সার্ব লেখক আইভো অ্যানড্রিচ। ওই বইটিও আমি অনুবাদ করেছি, যে বইয়ের সিংহভাগ জুড়ে আছে অটোম্যানদের ওই অঞ্চলে শাসন সম্পর্কিত ঘটনাবলী। একটি সেতুকে কেন্দ্র করে বইয়ে তিনশ বছরের ইতিহাস বর্ণনা করা হয়েছে। পাঠক হিসেবে আমি তো বর্ণিত সেতু, সেতুর আশপাশের জায়গাগুলোতে চলে যাই এবং এখানেই একজন সাহিত্যিকের সার্থকতা বলে আমি বিশ্বাস করি।

 

জহিরুলঃ ওয়েস্টার্ন সাহিত্যের চেয়ে অনুবাদের ক্ষেত্রে আপনার ওরিয়েন্টাল সাহিত্যের প্রতি অধিক আগ্রহ, এর কারণ কি? 

 

মঞ্জুঃ  আমার ওরিয়েন্টাল সাহিত্য অনুবাদ করার প্রধান কারণ বাংলাভাষী পাঠকদের প্রাচ্যের সমৃদ্ধ সাহিত্যের প্রতি অধিকতর আগ্রহী ক্রে তোলা। পাশ্চাত্যের সাহিত্য আমরা পড়ছি, এখনকার তরুণরা  আরো বেশি পড়ছে। কিন্তু এর ফলে বর্তমান প্রজন্মের ধারণা হতে পারে যে প্রাচ্যে সমৃদ্ধ কোনো সাহিত্য নেই। ইংরেজি, জার্মান ও ফরাসি ভাষায় বা পাশ্চাত্যে অন্যান্য ভাষায় বহু সেরা রচনা আছে। সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারসহ সকল আন্তর্জাতিক সাহিত্য পুরস্কার যারা লাভ করেছেন তাদের অধিকাংশই পাশ্চাত্যের। এর ফলে আমাদের দেশের পাঠকদের মধ্যে একটা ধারণা প্রায় প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে যে, প্রাচ্যে ভালো কোনো সাহিত্য হয় না। বাংলাদেশে প্রতিবছর যতো সংখ্যক থ্রিলার, সায়েন্স ফিকশন, অন্যান্য ফিকশন, নন-ফিকশন বাংলায় অনুবাদ হয়, সেগুলোর ৯০ শতাংশই ওয়েষ্টার্ন সাহিত্য। বাংলাভাষী পাঠকরা হয়তো বিশ্বাসই করতে পারবে না যে কীভাবে প্রাচ্যের সাহিত্য দ্বারা পাশ্চাত্যের সাহিত্য প্রভাবিত। হিব্রু, ফারসি ও আরবি সাহিত্য পাশ্চাত্যে এসেছে দর্শন ও ধর্মীয় সাহিত্য হিসেবে। খ্রিষ্টপূর্ব সময়ে রচিত হিব্রু বাইবেল,  যা খ্রিষ্টান বাইবেলের ভিত্তি সেটিই মূলত পাশ্চাত্যের সংস্কৃতি ও সাহিত্যে বলা যায় চিরদিনের মতো পরিবর্তন এনে দিয়েছে। একইভাবে কোরআনও আরবি সাহিত্যকলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও অনুপম সাহিত্যের নিদর্শন, যা মুসলিম বিশ্ব ছাড়িয়ে মুসলমানরা ইউরোপের যেসব ভূখণ্ড শাসন করেছে, সেসব স্থানে সাহিত্যের আধুনিক বিকাশে ভূমিকা রেখেছে এবং পাশ্চাত্য পর্যায়ক্রমে নিজেদের সাহিত্যের ধরন ও স্টাইল তৈরি করে নিয়েছে।  আরব্য উপন্যাস আরবিতে লিখিত কল্পনাশ্রয়ী সাহিত্য, একইভাবে ফারসি শাহনামাও কল্পনাশ্রয়ী। এসব গ্রন্থ কালোত্তীর্ণ এবং সকল সভ্যতা সাদরে গ্রহণ করেছে ও অনুসরণ করার চেষ্টা করেছে। পাশ্চাত্যে কল্পনাশ্রয়ী সাহিত্য এসেছে অনেক পরে। জোনাথন সুইফটের গালিভার্স ট্রাভেলস, জুলে ভার্নের বইগুলোর অধিকাংশই কল্পনা নির্ভর, একইভাবে আম লুইস ক্যারলের এলিস ইন দ্য ওয়াণ্ডারল্যাণ্ড, গ্রীম ব্রাদার্সের রূপকথা, ক্রিস্টোফার মারলো’র ‘ডক্টর ফস্টাস’ এর কথা বলতে পারি। পরবর্তী সময়ে পাশ্চাত্যের সাহিত্যে কল্পনার মধ্যে বিজ্ঞান বড় স্থান দখল করে নিয়েছে, যখন প্রাচ্য বিজ্ঞানে পিছিয়ে পড়েছিল। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য একটি বিষয় হলো পরবর্তী সময়ে, হয়তো এখন থেকে দেড়শ বছর পাশ্চাত্য সাহিত্যে, বিশেষ করে কবিতার ক্ষেত্রে আধ্যাত্মিকতার মধ্যে টেনে এনেছে মাওলানা জালালুদ্দীন রুমির প্রেমের কবিতা এবং তাঁর দীর্ঘ কাব্য ‘মসনভী’। আটশ’ বছর আগে সুফি কবি যা লিখে গেছেন, পাশ্চাত্য এখন তা ধারণ করছে। কিন্তু বাংলাদেশে রুমি এখন সাহিত্য বোদ্ধাদের কাছে প্রায় অপরিচিত। এই কারণগুলো আমাকে প্রাচ্যের সাহিত্য সম্পর্কে আরো বেশি জানার ও পড়ার আগ্রহ সৃষ্টি করেছে।

 

 

জহিরুলঃ আপনি মূলত সাংবাদিক, সৃজনশীল সাহিত্যের অনুবাদে কেন হাত দিলেন? এর পেছনে কোনো গল্প আছে কি? 

 

মঞ্জুঃ সাংবাদিকতা আমার পেশা এবং সাহিত্য আমার আবেগ। সাংবাদিকতার প্রতি আমার আগ্রহ সৃষ্টির অনেক আগে থেকেই আমি একজন পাঠক। আমি বই পেলেই পড়তাম। আমার মনে আছে আমি যখন ক্লাস সেভেনে পড়ি, আমাদের এক আত্মীয়, যিনি কলেজে বিএ ক্লাসে পড়তেন, তার বইগুলো আমাদের বাড়িতে রেখে যান। আমি তাঁর বইগুলো সব পড়ে ফেলেছিলাম। সবগুলো বোধগম্য ছিল না। তবুও পড়েছি। তার একটি বই ছিল লজিকের ওপর। আমি তখন লজিক্যাল ফ্যালাসি পড়েছি। যখন সাংবাদিকতা শুরু করি, তখন আমার কাজ ছিল সামান্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছোটখাট বিষয় লিখে দিয়েই আমার কাজ শেষ। কিন্তু আমি নিউজ এডিটরের কাছে ইংরেজি স্ক্রিপ্ট চেয়ে নিয়ে বাংলা করে দিতাম। সংবাদপত্রে অনুবাদের কাজগুলো করেন মূলত সাব-এডিটররা। আমি বরাবর রিপোটিংয়ে কাজ করেছি। কিন্তু অনুবাদ করেছি ব্যক্তিগত আগ্রহে। এভাবে ছোটগল্প অনুবাদ শুরু করি। বিভিন্ন ম্যাগাজিনে দেই। শুধু ইংরেজি থেকে নয়, হিন্দি শিখেছিলাম ১৯৭২-৭ সালে। হিন্দি থেকেও গল্প অনুবাদ করতাম। ঢাকায় আসার আগে কোনো ইংরেজি  ফিকশন পুরোপুরি পড়িনি। কারণ তখন ইংরেজি তেমন বুঝতাম না। যখন বুঝে পড়তে শুরু করলাম তখন ইংরেজি ছোটগল্প ও উপন্যাসের  বিষয়বস্তু, উপস্থাপনার স্টাইল, ব্যাপকতা, গভীরতা আমাকে মুগ্ধ করতে লাগল এবং ক্রমেই বাংলা উপন্যাস ও ছোটগল্পের দৈন্যতা ধরা পড়তে লাগলো আমার কাছে। নিজেকেও হীন মনে হতে লাগলো এই ভেবে যে, আমার মাতৃভাষা কী এতো দুর্বল, আমাদের কল্পনা কী এতো সীমিত! আমি প্রাচ্য সাহিত্যের দিকে ফিরলাম, কারণ প্রাচ্যই আমাদের হৃদয়ের কাছে, প্রাচ্যের চিন্তাভাবনাই আমাদের চিন্তাভাবনা। আমার কাছে যে বইগুলো পড়ে ভালো লাগতো আমি তা অনুবাদ করার কথা ভাবতাম। কিন্তু ইংরজিতে দুর্বল থাকায় বড় কোনো কাজে হাত দেওয়ার সাহস হয়নি। ১৯৮৮-৮৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করতে আসার সুযোগ পেয়ে আমার ইংরেজি চর্চার সুযোগ হয় এবং দেশে ফিরে গিয়ে সাংবাদিকতার পাশাপাশি সৌখিন অনুবাদক হিসেবে অনুবাদের কাজ শুরু করি। আমার অনুবাদের লক্ষ্য সাধারণ পাঠক নয়, আমি সবসময় চেয়েছি যাতে পাঠকদের পাঠরুচি বৃদ্ধি পায় এবং পাঠকরা অনুবাদ পাঠ করার পর যারা বাংলা সাহিত্য রচনা করছেন, অন্তত তাদেরকে বলার সুযোগ পান কেন তাদের সৃষ্টি আন্তর্জাতিক মানের হচ্ছে না।    

 

 

 

জহিরুলঃ আপনি প্রচুর কবিতা পড়েন, কবিতার একজন নিবেদিত পাঠক, জালালুদ্দিন রুমির কবিতা অনুবাদও করেছেন, নিজে কবি না হয়ে কবিতার অনুবাদ করা বেশ কঠিন এবং সেটির মান দুর্বল হবার খুব সম্ভাবনা থাকে, কবিতার অনুবাদ করতে গিয়ে এই আশঙ্কা কি আপনার মধ্যে কাজ করেছে?

 

মঞ্জুঃ জি, পাঠক হিসেবে কবিতার প্রতি আমার অনুরাগ রয়েছে। যে কোনো শিশুর মতো আমারও কবিতার শিক্ষক আমার মা। আম্মা খুব কম পড়াশোনা করেছেন। কিন্তু এতো কবিতা কিভাবে পড়েছেন বা মনে রেখেছেন তা এখনো আমাকে বিস্মিত করে। স্কুলের বাংলা ও ইংরেজি বইয়ে যেসব কবিতা থাকতো সেগুলো আমার প্রায় কণ্ঠস্থ ছিল। এমনকি মাইকেল মধুসূদনের মেঘনাদ বধ কাব্যের অংশবিশেষ ক্লাস নাইন, টেন এবং ইন্টারমেডিয়েট পর্যায়ে থাকতো, যা অধিকাংশ শিক্ষার্থীর কাছে দুর্বোধ মনে হতো, সেটুকু তো আমার মুখস্থ ছিলই, মেঘনাদ বধ কাব্য সংগ্রহ করে অতি আগ্রহে আমি পাঠ করি এবং প্রায় চারশ’ লাইন মুখস্থ করে ফেলেছিলাম। কিন্তু আমি কখনো কবিতা লেখার চেষ্টা করিনি। শৈশবে কোনো ওয়াজ মাহফিলে গেলে ওয়ায়েজিনদের মুখে জালালুদ্দিন রুমির অনেক কবিতা উচ্চারিত হতে শুনেছি এবং কোনো কোনো কবিতার উদ্ধৃতি মুখস্থও হয়ে গিয়েছিল। যদিও কবিতাগুলোর অর্থ বোঝার উপায় ছিল না। তারা শেখ সাদী, ফেরদৌসির কবিতা থেকেও উদ্ধৃতি দিতেন। রুমির কবিতার প্রতি আগ্রহ জাগে ২০০০ সালের পর। নিউইয়র্কে টুইন টাওয়ার ধ্বংসের দুই মাস পর নভেম্বর মাসে টাইম ম্যাগাজিন জালালুদ্দিন রুমির ওপর একটি কভার স্টোরি করে। আমি সেটি পাঠ করি এবং অবাক হই যে পশ্চিমা জগৎ এবং বিশ্বের মুসলিম বিরোধীরা যখন মুসলমানদের ঢালাওভাবে সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করছে, ঠিক এ সময়ে টাইম ম্যাগাজিন রুমিকে এতো প্রাধান্য দিল কেন? মূলত তখন আমেরিকান এক শিক্ষাবিদ ও কবি কোলম্যান বার্কস রুমির একটি কবিতা সংকলন ইংরেজিতে “দ্য সোল অফ রুমি” নামে প্রকাশ করেন। বইটির ওপর আলোচনা করতে গিয়ে বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় মুসলিম, বিশেষত সুফিদের প্রেমের বাণী চর্চার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। রুমির ওপর আমারও আগ্রহ বাড়ে। “দ্য সোল অফ রুমি” সংগ্রহ করে অনুবাদ করতে শুরু করি। কবিতা অনুবাদ করা সত্যিই কঠিন এক কাজ। কবি কী বোঝাতে চেয়েছেন এবং আমি কী বুঝছি, দু’য়ের মধে যথেষ্ট ফারাক থেকে যায়। গদ্যে সবকিছু প্রকাশ্য বা স্পষ্ট, যাকে ইংরেজিতে বলা হয় ‘এক্সপ্লিসিট’, অন্যদিকে কবিতায় অনেক কিছু থাকে উহ্য বা অন্তর্নিহিত, যাকে ইংরেজিতে বলা হয়, ‘ইমপ্লিসিট’। একজন কবির পক্ষেই ভিন্ন এক ভাষার কবি কী বোঝাতে চেয়েছেন তা উপলব্ধি করা সম্ভব এবং কোনো ভালো কবি যদি রুমির কবিতা অনুবাদ করতেন বা করেন তাহলে নি:সন্দেহে ভালো করবেন। আমার কবিতা অনুবাদ শাব্দিক অনুবাদ হয়েছে এবং দ্বাদশ শতাব্দীর একজন আধ্যাত্মিক কবির কবিতার ভাবের কাছে উপনীত হওয়া সম্ভব হয়নি। তবে তিনি যে একটির পর একটি উপমা উপস্থাপন করেছেন, আমি সেই উপমাগুলোকে একের পর এক আনতে চেষ্টা করেছি। বাকিটুকু বিচারের ভার পাঠকদের ওপর।  

 

কাজী জহিরুল ইসলামঃ লক্ষ করেছি বিভিন্ন সময়ে আপনি উর্দু, হিন্দি কিংবা ফার্সি কবিতা আওড়াতে পছন্দ করেন, এর কারণ কি? বিশেষ কোনো কারণে, (হতে পারে আপনার কাছে মান সম্মত মনে হয় না) বাংলা কবিতার প্রতি কি অনীহা আছে? 

 

মঞ্জুঃ বাংলা কবিতার প্রতি আমার কোনো অনীহা নেই। বাংলা কবিতা দিয়েই মূলত কবিতার সাথে আমার পরিচয়, যা আমি আগের প্রশ্নে বলেছি। আমি প্রচুর বাংলা কবিতা পাঠ করি। অনেক বাংলা কবিতা মুখস্থও থাকে। কিন্তু আমার মাঝে বেশির ভাগ বাংলা কবিতার গভীরতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। উপমহাদেশে উর্দু সবচেয়ে নতুন বা কমবয়সী ভাষা। বাংলা ভাষা সেই তুলনায় অনেক প্রাচীন ভাষা। মাতৃভাষা হওয়া সত্বেও আমার কাছে বাংলা ভাষাকে মনে হয়েছে এক একটি পর্যায়ে এসে থমকে দাঁড়িয়েছে এবং সেখান থেকে ওঠে আসতে কষ্ট হয়েছে। প্রতিটি পর্যায়ে বাংলা ভাষার শব্দ, উচ্চারণ ও বানান রীতিতে পার্থক্য এসেছে এবং এখনো এই পরীক্ষা-নিরীক্ষার অবসান ঘটেনি। আমি ভাষাবিদ নই, সকল প্রাচীন ভাষার ক্ষেত্রেই হয়তো এই পরিমার্জন ও পরিবর্তনের ঘটনা ঘটেছে বা ঘটছে। বাংলার ক্ষেত্রে আরো একটি সমস্যা হলো, বাংলা কখনো বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা ছিল না। স্বাধীনতা লাভ করার পর থেকে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার কথা বলা হলেও গত পাঁচ দশকে বাংলাভাষা আংশিকভাবে রাষ্ট্র্রভাষা হিসেবে চালু রয়েছে। এ কারণে সাহিত্যের প্রকাশেও দুর্বলতা আছে এবং তা কবিতার ক্ষেত্রেও।

অন্যদিকে উর্দু ভাষা শুরু থেকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেছে। রাজ দরবারে মুশায়রার আয়োজন ছিল এবং মুশায়রার মধ্য দিয়ে কবিরা প্রতিযোগিতামূলকভাবে তাদের কবিতার বিকাশ ঘটানোর সুযোগ গ্রহণ করতেন। ফারসি অতি প্রাচীন ভাষা এবং ফারসি ভাষার ক্ষেত্রে এটি আরো বেশি প্রযোজ্য। আমার ক্ষেত্রে যা হয়েছে তা হলো, আমাদের শহরে একটি সিনেমা হল ছিল। প্রতিদিন প্রতিটি শো আরম্ভ হওয়ার আগে মাইক্রোফোনে উর্দু ও হিন্দি গান বাজানো হতো। গানগুলো শুনে আসছিলাম যখন ক্লাস ফোরে পড়ি তখন থেকে। মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু গানের কথাগুলো বুঝতাম না। অতএব বোঝার একটি আগ্রহ ছিল ছোটবেলা থেকেই। বাহাত্তর সালে আমি হিন্দি শিখতে শুরু করি এবং অনেক উর্দু গান বা কবিতা হিন্দিতে পড়ার সুযোগ পাই। এভাবে অনেক কবিতা পাঠ করি এবং ভালো লাগলে মুখস্থ করি। ফারসি কবিতা খুব বেশি মুখস্থ নেই। শেখ সা’দী বা রুমির কবিতা পড়েছি ইংরেজি অনুবাদে। খুশবন্ত সিং তাঁর অনেক লেখায় মূল উচ্চারণসহ ফারসি কবিতার উদ্ধৃতি এবং ইংরেজি অনুবাদ দিয়েছেন। সেগুলো আমি মুখস্থ করেছি।  

 

জহিরুলঃ আপনি তো বিশ্বসাহিত্যের অনেক বিখ্যাত ফিকশন অনুবাদ করেছেন, বাংলা ভাষার কথা সাহিত্যের সাথে সেইসব ফিকশনের যদি কিছুটা তুলনামুলক আলোচনা করেন আমরা উপকৃত হই।

 

মঞ্জুঃ বিশ্ব সাহিত্য থেকে আমি খুব একটা অনুবাদ করিনি। বিশ্ব সাহিত্য বিশাল ব্যাপার। আমার জ্ঞানসীমা ও উপলব্ধির বাইরে। তবে কয়েকজন আধুনিক নোবেল বিজয়ী সাহিত্যিকের বই অনুবাদ করেছি, তাদের মধ্যে গ্যাব্রিয়েল গর্সিয়া মার্কেজে “মেমোরিজ অফ মাই মেলানকোলি হোরস,” ভিএস নাইপলে “হাফ এ লাইফ,” আইভো অ্যানড্রিচের “দ্য ব্রিজ অন দ্য দ্রিনা,” নাগিব মাহফুজের “কায়রো ট্রিলজি,” “খুফু’জ উইজডম,” ও “থেবস অ্যাট ওয়ার,” এবং ওরহান পামুকের “ইস্তাম্বুল: মেমোরিজ অফ দ্য সিটি।” আমাকে যদি এর যে কোনো একটি বইয়ের সঙ্গে বাংলা ফিকশনের তুলনা করতে বলেন, তাহলে আমি অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে বলবো যে, ওপরের কোনো একটি ফিকশনের তুলনীয় কোনো ফিকশন বাংলা সাহিত্যে নেই। সেজন্যই আমি আমার অনুবাদের টার্গেট গ্রুপ হিসেবে সাধারণ পাঠকদের চেয়ে বাংলা ফিকশন লেখকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্যই অনুবাদ করি, যদি তারা এসব পাঠ করে নিজেদেরকে সমৃদ্ধ করার সুযোগ গ্রহণ করেন। ব্রিটিশ ভারতে অখন্ড বাংলায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র ও বঙ্কিমচন্দ্রের পর পশ্চিমবঙ্গে অনেক বাঙালি সাহিত্যিক বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় উন্নত সাহিত্যকর্ম উপহার দিয়েছেন। কিন্তু বাংলাদেশে ওই পর্যায়ের কোনো ফিকশন আসেনি। সন্দেহ নেই অনেক ভালো কবিতা হয়েছে। ফিকশন লেখকদের মধ্যে আমি দু’জনের কথা বলবো আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ও শওকত আলী।  তারা খুব বেশি না লিখলেও যা লিখেছেন ভালো লিখেছেন।   

 

জহিরুলঃ বাংলা ভাষার কিছু বিখ্যাত কথাসাহিত্যের কথা বলবেন কি যেগুলোকে বিশ্বমানের সাহিত্য মনে হয়েছে এবং তা কোন গুণাবলির কারণে? 

 

মঞ্জুঃ  আগের প্রশ্নের উত্তরে এর কিছুটা বলেছি। কবিতার দিক থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অবশ্যই অনেক বিশ্বমানের কবিতা উপহার দিয়েছেন, যেগুলোর আবেদন সার্বজনীন। তাঁর কোনো কোনো উপন্যাস বাংলাভাষীদের পাঠের জন্য ভালো, সহজ-সরল ভাষা লেখা, পরিচিত পটভূমি, সাংসারিক জটিলতা ছাড়া আর কিছু নেই। মানুষ তার উপন্যাসে নিজেকে দেখে, নিজের পরিচিত পরিবেশকে দেখে। কিন্তু সেগুলোই যদি ইংরেজিতে অনুবাদ করা হয়, তাহলে ইংরেজি পাঠকরা তাদের উপযোগী ভাববেন না। আমি সুনির্দিষ্টভাবে আমার পড়া তাঁর সব বইয়ের নাম উল্লেখ করে বলতে পারবো না। কারণ তাঁর সব কবিতা উপন্যাস, নাটক, ছোটগল্প, প্রবন্ধ ও চিঠিপত্র আমার উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে পড়া। বলতে গেলে কোনো বইয়ের চরিত্রের সাথে আরেক বইয়ের চরিত্র মিলে যেতে পারে। এছাড়া দুলাল চন্দ্র (অবধুত), বিভূতিভূষণ, অদ্বৈত মল্লবর্মন, মহাশ্বেতা দেবী; পরবর্তী সময়ের লেখক সমরেশ বসু ও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের অনেক সাহিত্যকর্ম আমার কাছে বিশ্বমানের মনে হয়, এসব ফিকশনের বিস্তৃত পটভূমি এবং মানুষের জীবনকে পরিপূর্ণভাবে ফুটিয়ে তোলার কারণে। তাদের সাথে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ও শওকত আলীকেও একই কারণে যোগ করা যায়। 

 

 

জহিরুলঃ উপমহাদেশের আর কার লেখা আপনি অনুবাদ করেছেন?

 

মঞ্জুঃ উপমহাদেশের কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যে কমলা দাশ, মঞ্জু কাপুর, গুলজার, মির্জা হাদিরুসওয়ার বই অনুবাদ করেছি। এর বাইরে অনেকের ছোটগল্প অনুবাদ করেছি, যেগুলো আমি সংরক্ষণ করতে পারিনি। তবে লেখকদের অনেকের নাম মনে আছে, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন: খাজা আহমদ আব্বাস, সাদাত হাসান মান্টু, মুনশি প্রেমচাঁদ, অমর জালীল, নন্দিনী শতপতি, কেটি মোজাম্মদ, অজিত কাউর।   

Comments

Popular posts from this blog

অসাধারণ এই শিল্পীর জীবনের গল্প বড় করুণ

  [এই সময়ের অত্যন্ত প্রতিভাবান শিল্পী সারফুদ্দিন আহমেদ। বাড়ি পশ্চিমবঙ্গে। আর্ট কলেজে খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করেন ,  আর শুধু ছবি আঁকেন। নানান মাধ্যমে ,  নানান বিষয়ের ছবি। সারফুদ্দিন আহমেদের ছবি থেকে চোখ ফেরানো যায় না ,  আপনাতেই ওঁর নান্দনিক সৃষ্টিকর্মে দৃষ্টি আটকে যায় ,  কী জল রঙ ,  কী অ্যাক্রিলিক ,  কিংবা স্রেফ পেন্সিলের ড্রয়িং। এই গুণী শিল্পীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কবি কাজী জহিরুল ইসলাম। সাক্ষাৎকারটি এখানে উপস্থাপন করা হলো।]       ভারত আমাকে চোখ দিয়েছে ,  বাংলাদেশ দিয়েছে দৃষ্টি -     সারফুদ্দিন আহমেদ     কাজী জহিরুল ইসলামঃ  ব্যাক গ্রাউন্ডে তবলা বাজছে আপনি ছবি আঁকছেন কাচের ওপর।    এই যে বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে ছবি আঁকা, এই ছন্দটা ছবিতে কিভাবে ধরেন? আর কোনো শিল্পী ছবি  আঁ কার সময় যন্ত্রানুসঙ্গ ব্যবহার করেছেন?   সারফুদ্দিন আহমেদঃ   কাঁচ নয়,   এটি এক বিশেষ ধরনের কাপড়-নেট। এই নেটের উপরে বর্তমানে আমার এক্সপেরিমেন্ট চলছে।    জহিরুলঃ ও ,  ফেইসবুকে যখন ছবিটি দেখি কাচের মতো ...

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জুর সাক্ষাৎকার || অষ্টম পর্ব ||

[লেখক, সাংবাদিক, অনুবাদক আনোয়ার হোসেইন মঞ্জুর সাক্ষাৎকারের অষ্টম  পর্ব আজ প্রকাশ করা হলো। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কবি কাজী জহিরুল ইসলাম।]          দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ বাসস - কে অকার্যকর করেছে  – মঞ্জু    জহিরুলঃ  আপনি ফেলোশিপ নিয়ে দিল্লীতে ছয়মাস ছিলেন, ব্যক্তিগত আগ্রহ এবং পেশাগত অভ্যাসের কারণে কাছে থেকে দেখার/বোঝার চেষ্টা করেছেন ভারতের এবং উপমহাদেশের রাজনীতি। আমরা দেখি ভারতের রাজনীতিতে গায়ক, নায়ক, লেখক, সাংবাদিকের আবির্ভাব ঘটে সব সময়ই এবং তারা রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও রাখেন। বাংলাদেশে এই ধারা খুব সম্প্রতি শুরু হলেও আমাদের জনপ্রিয় খেলোয়াড়, শিল্পীরা নিজেদের অর্থনীতি সমৃদ্ধ করা ছাড়া রাজনীতিতে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেন না। এমন কি ধর্ষণ, অন্যদেশকে ট্রানজিট প্রদান, উপর্যুপরি সড়ক দূর্ঘটনা, পরিবেশ ধ্বংসকারী কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্প ইত্যাদি ইস্যুতেও তারা নীরব। অথচ তাদের জনপ্রিয়তা এবং রাজনীতি সম্পৃক্ততা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত, যা ভারতে দেখা যায়। বিষয়টি যদি আপনার মতো করে ব্যাখ্যা করেন।  মঞ্জুঃ   দিল্লিতে আমার অবস্থানকালকে আমি নানা দিক থ...

কানের কাছে নারী কন্ঠ

  স্বপ্নের ঐশ্বর্য   || কাজী জহিরুল ইসলাম ||   ছুটির দিন। লম্বা সময় ধরে ঘুমাবো। কিন্তু তার আর উপায় নেই। কানের কাছে নারী কন্ঠ। বেশ আত্মবিশ্বাসী কন্ঠ। ক্রমাগ ত  কথা বলে যাচ্ছেন এক অপরিচিতা। আমি লাফ দিয়ে উঠি। কে তিনি ?  আমার স্ত্রী বলেন ,  রুবানা হক ,  শোনো কী বলছেন। রুবানা হক প্রয়াত ব্যবসায়ী আনিসুল হকের স্ত্রী। আমাদের কৈশোর-উত্তীর্ণ কালে আনিসুল হক ছিলেন আমাদের হিরো। টিভি উপস্থাপনায় অন্য এক আধুনিকতা নিয়ে হাজির হন তিনি। এরপর আমরা ধীরে ধীরে তার ব্যবসায়ীক সাফল্য ,  সাংগঠনিক সাফল্য দেখতে দেখতে বড় হই। খুব সাম্প্রতিককালে ,  আনিসুল হকের মৃত্যুর পর ,  কেউ একজন বলেছিলেন ,  তার স্ত্রী রুবানা হকও খুব ভালো কথা বলেন। কিন্তু রুবানা হকের কথা শোনার সৌভাগ্য আমার হয়নি। দুই যুগ ধরে দেশের বাইরে থাকার কারণে এই সময়ে স্টার হয়ে ওঠা অনেকের সম্পর্কেই আমার ভালো ধারণা নেই।  তার কথায় এমন কিছু ছিল যে আমার পক্ষে ঘুমিয়ে থাকা সম্ভব হয়নি। আমি মুক্তিকে বলি ,  প্রথম থেকে দাও ,  পুরো বক্তৃতাটা আমি শুনতে চাই। আমি পরপর দুইবার তার পুরো বক্তব্যটা শুনি ,  ফ...