সেই মেয়েটিই পৃথিবী কাঁপিয়ে দিয়েছিল
।।কাজী জহিরুল ইসলাম।।
ছোট্ট শহর লুবলিন। পাহাড় ঘেরা। রাজধানি ওয়ারশো থেকে ১০৬ মাইল দূরে হলেও জনজীবন মোটেও মন্দ ছিল না এ শহরের। রোববারের চার্চ আর শুক্রবারের বার দুটোই উষ্ণ ছিল যথেষ্ঠ। শীতের সন্ধ্যায়ই বারগুলো গরম হতো বেশি। ফারের ওভারকোট তখন বেশ সস্তায়ই পাওয়া যেত। ১৮৬৭ সাল। যোসেফ স্ক্লোডোভস্কি তখন তেষট্টিতে পা দিয়েছেন। স্কুলের চাকরি থেকে অবসর নিয়ে নাতি-নাতনিদের মধ্যে তাঁর দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনের মূল্যবান অর্জন বিতরণ করে যাচ্ছেন। সে বছরই, ৭ নভেম্বর, সবচেয়ে ছোট নাতনি মারিয়ার জন্ম। জন্মের পর মারিয়া কাঁদছে না কেন? সবাই যখন আতঙ্কিত, দাদা যোসেফের মুখে তখন রহস্যের হাসি। ‘এই মেয়ে একদিন চিৎকার দিয়ে পৃথিবী কাঁপিয়ে দেবে।’ দাদার কথা রেখেছিলেন মারিয়া।
মারিয়ার বাবা উলেডিস্লো স্ক্লোডোভস্কিও শিক্ষক ছিলেন, তিনি শিক্ষকতা করতেন ওয়ারশোতে। পড়াতেন অঙ্ক এবং পদার্থ বিদ্যা। পিতার উৎসাহে মারিয়াও পদার্থ বিদ্যার প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে। সেই সময়টাতে স্বাধীনতাকামী পোলিশরা সঙ্ঘবদ্ধ হতে শুরু করে। শুরু হয় রাজনৈতিক দমন-পীড়ন। পোলিশদের শিক্ষা-দীক্ষায় পঙ্গু করে দেবার পরিকল্পনা করে রাশিয়ান কর্তৃপক্ষ। স্কুলগুলো থেকে সরিয়ে নেয় ল্যাব সরঞ্জাম ও নির্দেশিকাসমূহ। উলেডিস্লো কিছু ল্যাব-যন্ত্রপাতি স্কুল থেকে বাড়িতে নিয়ে আসেন। সন্তানদের, বিশেষ করে মারিয়াকে, তিনি বাড়িতেই ল্যাব-প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করেন। ঘটনাটি জানাজানি হয়ে গেলে তাকে পোলিশ স্বাধীনতাপন্থি হিশেবে শনাক্ত করা হয় এবং একটি নিচু এবং কম বেতনের পদে পদাবনতি দেওয়া হয়। পরিবারটি ক্রমশ অর্থ কষ্টে পড়ে। মারিয়ার মা ছিলেন ধর্মভীরু ক্যাথলিক আর বাবা নাস্তিক। তা সত্বেও পরিবারে কোনো অশান্তি ছিল না। মারিয়ার মা একটি মেয়েদের বোর্ডিং স্কুল চালাতেন। একসময় তাকেও সেটি ছেড়ে দিতে হয়। মারিয়ার যখন দশ বছর বয়স, ১৮৭৮ সালে, যক্ষায় আক্রান্ত হয়ে মারিয়ার মা ব্রোনিস্লাভা বেগুস্কা মারা যান। এর তিন বছর আগে বড় বোন জোফিয়া টাইফুস রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। বোন এবং মায়ের মৃত্যুতে আশাহত হয়ে মারিয়া ক্যাথলিক বিশ্বাস পরিত্যাগ করে হয়ে যায় সংশয়বাদী।
শুরু হয় কষ্টের জীবন। তবুও পড়ালেখার প্রতি অদম্য আগ্রহ তাকে শ্রেষ্ঠত্বের আসনেই বসিয়ে দেয়। ১৮৮৩ সালে স্বর্ণপদক নিয়ে স্কুল জীবন শেষ করে মারিয়া। কিন্তু এরপর? মেয়েদের এর চেয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের প্রথা নেই পোলিশ তথা রাশিয়ান সমাজে। মারিয়া হতাশ হয়ে পড়েন। এক বছর কাটে গ্রামে, এক আত্মীয়ের কাছে। পরের বছর ওয়ারশোতে, পিতার কাছে। এই সময়টাতে মারিয়া অনানুষ্ঠানিক পড়ালেখায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন। শেষমেশ মারিয়া এবং তার বোন ব্রোনিস্লাভা একটি আন্ডারগ্রাউন্ড শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ফ্লাইং ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান। পড়ার খরচ জোগাতে ওকে কিছুদিন প্রাইভেট টিউশনি করতে হয়। পরে পিতার এক আত্মীয়ের বাড়িতে গৃহশিক্ষিকা তথা গৃহপরিকার কাজও তাঁকে নিতে হয়। এতে উপার্জন যা হতো তা থেকে কিছু টাকা পাঠাতেন বোন ব্রোনিস্লাভাকে, যিনি ইতোমধ্যেই ডাক্তারি পড়তে পাড়ি জমিয়েছেন প্যারিসে। গৃহ শিক্ষিকার কাজ করার সময় গৃহস্বামীর পুত্র কাজিমিয়েরজ জোরাভস্কির প্রেমে পড়েন মারিয়া কিন্তু দরিদ্র পরিবারের মেয়ে মারিয়ার সাথে প্রণয়ে আপত্তি জানায় কাজিমিয়েরজের পিতা। ওদের সম্পর্ক ভেঙে যায়। কাজিমিয়েরজ পরবর্তীতে একজন প্রখ্যাত অঙ্কবিদ হয়েছিলেন এবং ক্রাকো বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন।
বোন ব্রোনিস্লাভা এরই মধ্যে ডাক্তার কাজিমিয়েরসকে বিয়ে করে প্যারিসে পাকাপোক্ত অবস্থান তৈরী করে ফেলেন এবং মারিয়াকে প্যারিসে পড়তে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানান। কিন্তু টাকার অভাবে মারিয়ার প্যারিসে পড়তে যাওয়া হলো না। কিন্তু মারিয়া যে হেরে যাওয়ার মতো মেয়ে নয়, তাকে পারতেই হবে। মেয়েটি আবারও গৃহশিক্ষিকার কাজ নেয়। এরি মধ্যে মারিয়ার পিতা উলেডিস্লো স্ক্লোডোভস্কি তার হারানো সম্মান ফিরে পান এবং একটি উঁচু পদেও অধিষ্ঠিত হন। নিজের জমানো টাকা এবং পিতার কাছ থেকে কিছু আর্থিক সাহায্য নিয়ে মারিয়া উচ্চতর শিক্ষার জন্য পাড়ি জমান প্যারিসে।
এখানে এসে শুরু হয় নতুন চ্যালেঞ্জ। ব্যয়বহুল প্যারিস শহরে নিজের খরচ চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছিল তাকে। ১৮৯১ সালের শেষের দিকে মারিয়া ভর্তি হন ইউনিভার্সিটি অব প্যারিসে। এখানে তিনি পদার্থ বিদ্যা, রসায়ন এবং অঙ্ক শাস্ত্রে অধ্যায়ন শুরু করেন।অপ্রতুল শীতবস্ত্রের কারণে তাকে ঠান্ডায় ভুগতে হয়েছে। পেটের ক্ষুধা সহ্য করতে না পেরে বহুবার জ্ঞান হারিয়েছেন মারিয়া। এরপরও দমে যান নি। জ্ঞানলাভের অদম্য স্পৃহা নিয়ে মনোনিবেশ করেন কঠোর তপস্যায়। দিনে কাজ আর সন্ধ্যায় পড়া, এই ছিল রুটিন। চার বছর পর যখন পদার্থ বিদ্যায় ডিগ্রী অর্জন করেন তখন তিনি এক ইন্ডাস্ট্রিয়াল ল্যাবরেটরিতে অধ্যাপক গাব্রিয়েল লিপম্যানের অধীনে কাজ করার সুযোগ পান। এর মধ্যে তার নাম বদলে যায়। ফরাসী উচ্চারণে মারিয়া হয়ে যান মারি।
শুরু হয় বিজ্ঞানী হিশেবে মারির নতুন ক্যারিয়ার। এক বছর পরে একটি স্কলারশিপের টাকায় মারি প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আরো একটি ডিগ্রী অর্জন করেন। পোলিশ পদার্থবিদ জোজেফ কভালস্কি ভিয়েরুজের মাধ্যমে মারির সাথে পরিচয় হয় পিয়েরে কুরির। পিয়েরে কুরিও এক তুখোড় পদার্থবিদ, দিনরাত গবেষণা আর নতুন কিছু আবিস্কারের নেশায় মত্ত। দু’জনের আগ্রহ, চিন্তা এবং লক্ষ্য মিলে যাওয়ায় খুব স্বাভাবিকভাবেই ওরা একে অন্যের কাছে আসেন, প্রেম হয় এবং এক পর্যায়ে তারা বিয়ে করেন। মারিয়া স্ক্লোডোভস্কি হয়ে যান মারি কুরি। মারি কিন্তু প্রথমে পিয়েরের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। কারণ তিনি ঠিক করে রেখেছিলেন পোল্যান্ডে ফিরে গিয়ে পোলিশদের জন্যে তিনি কাজ করবেন। পিয়েরে তখন মারির সঙ্গে পোল্যান্ডে যেতেও রাজী। এই লোক যখন প্রেমে এতোই উতলা, শেষমেশ মারি রাজী হন এবং তাদের বিয়ে হয় খুব অনাড়ম্বরভাবে। বিয়ের দিন মারি প্রথাগত বিয়ের গাউন পরেন নি, পরেছিলেন আঁটসাঁট একটি নীল জামা, যেটি পরে তিনি বহুদিন ল্যাব এ কাজ করেছেন।
দু’জনের মিলিত শক্তি লক্ষ্যের সিঁড়িতে এনে দাঁড় করিয়ে দেয় অনায়াসেই, যে সিঁড়ি বেয়ে তাঁরা উঠে আসেন সাফল্যের উঁচু শিখরে। ১৮৯৪ সালের গ্রীস্মের ছুটিতে মারি পোল্যান্ডে যান এক অদম্য ইচ্ছে নিয়ে যে তিনি তাঁর পছন্দের কাজটি পোল্যান্ডে করতে পারবেন। কিন্তু পরিতাপের বিষয় ক্রাকো বিশ্ববিদ্যালয় নারী বলে তাকে সেই সুযোগটি দেয় নি। পিয়েরে তাকে সান্তনা দিয়ে চিঠি লিখেন এবং অনুরোধ করেন প্যারিসে ফিরে এসে পিএইচডির গবেষণা করতে। হতাশ হয়ে মারি প্যারিসে ফিরে আসেন।
মারির অনুরোধে এবং অনুপ্রেরণায় পিয়েরে ম্যাগনেটিজমের ওপর অভিসন্দর্ভ রচনা করে পিএইচডি ডিগ্রী লাভ করেন। ১৯০৩ সালে মারিও পিএইচডি ডিগ্রী লাভ করেন এবং একই বছর পৃথিবীর প্রথম নারী হিশেবে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। তিনি পদার্থবিদ্যায় যৌথভাবে তাঁর স্বামী পিয়েরে কুরি এবং অধ্যাপক হেনরি বেকেরেলের সাথে এই পুরস্কার লাভ করেন। ১৯১১ সালে মারি কুরি দ্বিতীয়বারের মতো নোবেল পুরস্কার লাভ করেন, এবার রসায়নে। তিনিই পৃথিবীর একমাত্র ব্যক্তি যিনি পদার্থ বিদ্যা এবং রসায়ন দুই বিষয়েই নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।
১৯৩৪ সালের ৪ জুলাই এই মহীয়সী নারী মাত্র ৬৭ বছর বয়সে দক্ষিণ ফ্রান্সের পেসিতে মৃত্যুবরণ করেন।

Comments
Post a Comment