বোকা পরবাস
কাজী জহিরুল ইসলাম
প্রথম ছবিটি অসমাপ্ত রেখেই ৭ এপ্রিল ২০১৮ তারিখ সকালে রাগীব আহসান দ্বিতীয় ক্যানভাসটি ইজেলে তোলেন। আমি খানিকটা দ্বিধা এবং ভয় নিয়েই জিজ্ঞেস করি, ওটা শেষ করবেন না?
করবো। এখন ওটা নিয়ে কাজ করতে ভাল্লাগছে না। যা আঁকতে চেয়েছিলাম তা হচ্ছে না। পরে আবার হাত দেব। বলেই তিনি দরোজা খুলে স্টুডিও সংলগ্ন গ্যারেজে ঢুকে যান। আপাতত ওটাই তাঁর ধূমপানের জায়গা। তিনি সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করে তাকিয়ে আছেন দেয়ালের দিকে।
প্রথম ছবিটি থেকে আমি চোখ ফেরাতে পারি না। দেখি একাত্তরের যুদ্ধশিশু, যিনি স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরে এখন এক যুবতী নারী, বাঁ দিকে মাথা কাঁত করে অর্ধশায়িত পড়ে আছেন দূরের কোনো শহরে। ওর হাঁটুতে একটি কাক বসে আছে। এলোচুলে ঢেকে আছে নীল মুখাবয়ব। নিতম্বের নিচে রক্তে ভেজা চুল তৈরী করেছে কষ্টের নদী। সেই নদী ধীরে ধীরে বয়ে যাচ্ছে স্বদেশে, হতাশার দাহকালের দিকে।
আমি আর কথা বাড়ালাম না। শিল্পীর মুডের সাথে আমার পরিচয় ঘটেছে অনেককাল আগেই, ইতালির জলে ভাসা শহর ভেনিসের অদূরে একটি ছোট্ট দ্বীপ মুরানোতে গিয়ে। ২০০৩-এর জানুয়ারী মাস। উজ্জ্বল দুপুর। নীল লেগুন থেকে উঠে আসা শীতল হাওয়াটা এখন আর তেমন গায়ে বিঁধছে না। রোদটা বেশ মিষ্টি আর উষ্ণ লেপের ওমের মত আরামদায়ক লাগছে।
১১৩৪ একরের ছোট্ট এই দ্বীপটি বড়সড় একটি নৌকার মত ভাসছে ভেনেশিয়ান লেগুনের ওপর। নৌকা থেকে যেন আমরা আরো একটি বড় নৌকার ওপর লাফ দিয়ে নেমে পড়লাম। পুরো মুরানো দ্বীপ জুড়েই অসংখ্য ছোটো ছোটো ক্রিস্টালের স্টুডিও। স্টুডিও শুনে অবাক হচ্ছেন? হ্যাঁ, এগুলো কারখানা নয়, স্টুডিওই। প্রতিটি স্টুডিও সংলগ্ন ওদের ডিসপ্লে গ্যালারি এবং বিক্রয়কেন্দ্র। আমি তো গতানুগতিক চিন্তা থেকে কারখানাই বলছিলাম। আর যে মানুষটির উদোম পিঠের ওপর পনিটেইল, কানে দুল, পায়ে চামড়ার পাম শু, পরনে শুধু শর্টস, গলায় কেষ্ঠপুতির মালা, তাকে কারিগর বলতেই টনক নড়ল। ম্যানেজার আমার দিকে কটমট করে তাকালেন এবং আমাকে একরকম টেনে ওখান থেকে সরিয়ে গ্যালারির অন্য প্রান্তে এনে আস্তে আস্তে বলেন, খবরদার কারিগর বলো না, ও একজন শিল্পী। দেখছো না, আগুনে ক্রিস্টাল গলিয়ে কি নিখুঁত দক্ষতায় দেবী ভেনাসকে বের করে আনছেন। ম্যানেজার আরো জানালেন, ওরা খুব মুডি আর্টিস্ট, একবার বেঁকে বসলে সাতদিন আর কাজেই আসবে না। তখনই জানলাম, ওরা শিল্পী, কারখানাগুলো স্টুডিও আর শোরুমগুলো হচ্ছে গ্যালারি। উল্লেখ্য যে অড্রিয়াটিক সাগর থেকে বেরিয়ে আসা ভেনেশিয়ান লেগুনের ওপর জেগে উঠেছে মুরানো দ্বীপ আজ থেকে দেড় হাজার বছর আগে, এই দ্বীপেই তৈরী হয় পৃথিবীর সবচেয়ে নান্দনিক ক্রিস্টাল শিল্পকর্ম। মুরানোর ক্রিস্টাল মানেই বিশ্বখ্যাত ক্রিস্টাল।
তখন থেকেই আমি শিল্পীদের ব্যাপারে অতিমাত্রায় সচেতন।
সিগারেট ফুকা হয়ে গেলে রাগীব ভাই আমাকে বলেন, কবিতাটা পড়েন। আমি ক্রিয়াপদহীন কবিতা সিরিজের ‘বোকা পরবাস’ কবিতাটি পড়তে শুরু করি।
হ্যাঙ্গারে মানুষ সারি সারি, ইমিগ্র্যান্ট সুখ-দুঃখ, কালো-শাদা-শ্যামলা
পকেটে সশব্দ কান্না, সাইডব্যাগে কিছু স্মৃতি, দূরের, স্বদেশের শৈশব
বিয়ানীবাজার কি গোয়াইনঘাটে ছ’তলা দালান
নড়বড়ে বিশ্বাস, ভাঙাচুরা স্বপ্ন
দু’একটি স্বপ্ন খানিক শিক্ষিত......
ছেলেটির সাড়ে ছ’ফুট উঁচু মাথা হার্ভার্ডের সিঁড়িতে
মেয়েটির গলায় স্টেথিস্কোপ, সিক্স ডিজিটের পে চেক, কী উজ্জ্বল কী উজ্জ্বল!
আর বর্তমান? স্যাঁতস্যাঁতে বেইজমেন্টে, স্বপ্নের ভারে বিনিদ্র রাত
এই আমাদের বোকা পরবাস।
কবিতাটি লিখি ১৯ আগস্ট ২০১৫ তারিখে। ২০১৬-র এপ্রিলে কোলকাতার সৃষ্টিসুখ প্রকাশন বের করে ‘ক্রিয়াপদহীন ক্রিয়াকলাপ’। এই বইয়ের ৩৫টি ক্রিয়াপদহীন কবিতার একটি এটি। অভিবাসন মানুষের অতি প্রাচীন বৈশিষ্ট্য, সৃস্টির আদিকালেই মানুষ খাবারের জন্য, ভালো আবহাওয়ার জন্য, নতুন নতুন জায়গায় গিয়ে বসতি স্থাপন করেছে। আজও করছে। তখন সীমান্ত ছিল না, এখন মানুষ তৈরী করেছে দেশ, কৃত্রিম সীমান্ত, মানুষকেই রুখে দেবার জন্য। এই সীমান্ত অতিক্রম করতে গিয়ে কত কত মানুষ কতভাবে প্রাণ দিচ্ছে প্রতিদিন। তবু উন্নত জীবনের খোঁজে, সন্তানের ভবিষ্যৎ ভেবে মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাড়ি দেয় সীমান্তের দূর্গম দেয়াল।
যে স্বপ্ন তাকে টেনে আনে পরবাসে, সেই স্বপ্ন কি পূরণ হয়? হয়ত হয়, হয়ত হয় না। তৃতীয় বিশ্বের মানুষের মৌলিক স্বপ্ন তার স্বদেশ, একদিন ফিরে যাবে, বড় দালান তুলবে, স্বদেশের মাটিতে শান্তিতে বসবাস করবে, এই স্বপ্নই তাকে তাড়িত করে সারাক্ষণ। প্রতিদিন অক্লান্ত পরিশ্রম করে অর্থ জমাতে থাকে আর একটু একটু করে এগুতে থাকে কাঙ্ক্ষিত স্বপ্নের দিকে। আর পরবাসের বর্তমান? বেইজমেন্টে বা চিলেকোঠায়, বা অন্য কোনো পরিবারের সাথে এক/দুই কামরার ফ্ল্যাটে কষ্টের যৌথবাস। এই-ই তো শ্রমজীবী পরবাসীর জীবনচিত্র। স্বদেশে ধীরে ধীরে বড় দালান হয়, কিন্তু সেই দালানে তার আর থাকা হয় না। একদিন পরবাসেই ঘটে জীবনাবসান। এই আমাদের বোকা পরবাস।
ক্রিয়াপদহীন কবিতা ‘বোকা পরবাস’ এর থিমে আঁকা রাগীব আহসানের ছবি
তার তুলি ছুটছে, দ্রুত, খুব দ্রুত।
কি আঁকছেন রাগীব ভাই?
মানুষ, অনেক মানুষ, বোকা পরবাসের বিচিত্র রঙের মানুষ।
আর স্বপ্ন?
সেটাও আঁকবো।
একটা জাহাজ দেবেন? সুপ্রাচীন মাইগ্রেশনের প্রতীক?
দেখা যাক, অন্য কোনোভাবে আনতে পারি। মাথার ওপর দালান দিতে পারি।
তিনি কথা বলেন আর তুলি চালান। আর একটু পর পর ক্যানভাস থেকে ৮/১০ ফুট দূরে গিয়ে ছবিটি দেখেন।
কিছুক্ষণের মধ্যেই ক্যানভাসে ভেসে ওঠে ভিন্ন ভিন্ন অভিব্যক্তির ৮টি মুখ। ওদের মাথার ওপর, আকাশে, স্বপ্নের দালানঘর, পায়ের নিচে রুঢ় বাস্তব, কষ্টের পরবাস। খুব দ্রুতই ছবিটি তিনি এঁকে ফেলেন। কিন্তু আমি জানি, এটাই শেষ নয়। তিনি এতে আরো রঙ চড়াবেন, বদলাবেন। দেখা যাক কি হয়।
শিল্পী রাগীব আহসান নিজেও এই বোকা পরবাসের এক স্বপ্নচারী মানুষ, আমিও। পরবাস হয়ত আমাদের দিয়েছে অনেক, কিন্তু নিয়েছে তার চেয়েও বেশি। আমি বলি, রাগীব ভাই, কোন লাইনটা নেবেন এই ছবির জন্য?
কনক্লুসিভ লাইন তো এখানে একটাই আছে, ‘এই আমাদের বোকা পরবাস’।
পরের সপ্তাহে তিনি দুটি ছবিই এঁকে শেষ করেন। আমি সেলফোনে ছবি তুলি। দেখাই বিভিন্ন দেশের সহকর্মীদের। সেনেগালের, ভারতের, ফ্রান্সের, গ্রীসের, নানান দেশের সহকর্মীকে। প্রথমে ওরা শুধু ‘ওয়াও’ বলে চোখ বড় করে। শিল্পকর্ম নিয়ে মন্তব্য করতে দ্বিধা, কিছুটা আত্মবিশ্বাসের অভাবও হয়ত। আমি যখন ছবিগুলোর পটভূমি বলি, কবিতার কথা বলি, তখন কেউ কেউ মুখ খোলে। কি পেল এই ছবিতে তা বলতে শুরু করে। শুনে আমার ভালো লাগে, কারণ আমি কবিতায় যা বলতে চেয়েছি, শিল্পী তুলির আঁচড়ে তা-ই তুলে এনেছেন।
মাঝে মাঝে ছবিটি আমাকে নিয়ে যায় আরো খানিকটা দূরে, আরো খানিকটা গভীরে, যা আমি কবিতায় আঁকতে পারিনি কিন্তু আঁকতে চেয়েছিলাম।
হলিসউড, নিউ ইয়র্ক। ১৬ এপ্রিল ২০১৮।

লেখাটি পড়ে মনে হয়েছে, আপনার কবিতার চেয়ে, চিত্রশিল্পী কে প্রাধান্য দিয়েছেন বেশি। এবং এটা করেছেন, তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বরূপ। এমন অকৃত্রিম ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাবোধ কেবল একজন প্রকৃত কবি'ই প্রদর্শন করতে পারেন। গুণী শিল্পী রাগিব ভাই এবং আপনার প্রতি আন্তরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা রইলো।
ReplyDelete