আমি সব সময় মধ্যপন্থা অবলম্বন করেছি
- আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু
[লেখক, সাংবাদিক, অনুবাদক আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু একজন প্রথিতযশা বাংলাদেশি সাংবাদিক। বর্তমানে আমেরিকা প্রবাসী। তিনি ষাটের অধিক বিশ্বসাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ বাংলায় অনুবাদ করেছেন। খুশবন্ত সিং তাকে লিখিতভাবে অনুমতি দিয়েছেন তাঁর গ্রন্থগুলো বাংলায় অনুবাদ করার জন্য। তিনি নাগিব মাহফুজের কায়রো ট্রিলজির তিন খণ্ডই অনুবাদ করেছেন। খুশবন্তের প্রায় সব বইই করে ফেলেছেন। বহুল আলোচিত ইতালীয় সাংবাদিক অরিয়ানা ফালাচির ‘ইন্টার্ভিউ উইথ হিস্টরি’ অনুবাদ করেছেন। অনুবাদ গ্রন্থটিতে ফালাচির সাথে বঙ্গবন্ধুর একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার আছে। কবি কাজী জহিরুল ইসলাম আনোয়ার হোসেইন মঞ্জুর একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নিয়েছেন যেটি ধারাবাহিকভাবে এই ব্লগে প্রকাশ করা হবে। আজ প্রকাশ করা হলো প্রথম কিস্তি।]
কাজী জহিরুল ইসলামঃ ছেলেবেলায় বাবা-মা, গৃ্হশিক্ষক, পাড়ার মুরুব্বিরা জিজ্ঞেস করেন, জীবনের লক্ষ্য কি? বড় হয়ে কি হতে চাও? কখনো কি এর উত্তরে বলেছিলেন সাংবাদিক হতে চাই? কিভাবে সাংবাদিকতায় এলেন?
আনোয়ার হোসেইন মঞ্জুঃ একেবারে শৈশবে কার এ ধরনের প্রশ্নের কি উত্তর দিয়েছি তা মনে নেই। তবে আমার মা চাইতেন তাঁর ছেলেমেয়েদের কোনো একজন ডাক্তার হোক। কারণ তাঁর ভাইসহ তাঁর দিকের অনেকেই ডাক্তার ছিলেন। আমার নানা ছিলেন ওই এলাকার একজন নামী কবিরাজ। পরে আমার দুই মামার আট ছেলের মধ্যে চার জনই ডাক্তার হয়েছে। আমাদের পাঁচ ভাইবোনের কেউ ডাক্তার হওয়ার দিকে যায়নি। আমাদের বৃহত্তর পরিবারেও কোনো ডাক্তার ছিল না। শতভাগ কৃষিভিত্তিক সম্পন্ন পরিবার। জমি-ফসলের বাইরে আর কিছু ভাবেনিকেউ। তার মধ্য থেকেও আমার আব্বা ও চাচা কৃষি বিভাগে পড়াশোনা শেষ করে দুজনই কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগে চাকুরি করেন।
ক্লাস নাইনে ওঠার পরই বুঝে যাই, মায়ের আশা পূরণ করতে পারবো না। বিজ্ঞান মাথায় ঢুকতো না। সংবাদপত্র পড়ার অভ্যাস গড়ে ওঠেছিল ক্লাস ফাইভ থেকে। আব্বা তখন একটা সাপ্তাহিক পত্রিকা রাখতেন। হকার দিয়ে যাওয়ার পর ষোলো পৃষ্ঠার পত্রিকা একদিনেই পড়ে ফেলতাম। প্রতি সংখ্যায় শিশু-কিশোরদের জন্য দুটি পৃষ্ঠা থাকতো। তাতে একটি প্রশ্নোত্তর বিভাগও ছিল। পাঠকদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হতো। দু’এক বছর পর আমিও দু’একটা প্রশ্ন পাঠিয়েছি; বালসুলভ প্রশ্ন। কোনোটির উত্তর পেয়েছি, কোনোটির পাইনি। ছাপার অক্ষরে নিজের নাম দেখলে মনে হতো সপ্তম আসমানে ওঠে গেছি। দৈনিক পত্রিকা পড়তে শুরু করি ক্লাস এইটে। প্রতিদিন বিকেলে এক বিহারি নাপিতের দোকানে গিয়ে দৈনিক ইত্তেফাক পড়তাম। নাপিতের দোকানে ইত্তেফাক ছাড়াও একটি ওষুধের দোকানে দৈনিক আজাদ পড়তাম। ইতোমধ্যে আমি সংবাদ লেখার ধরন অনুসরণ করা শুরু করেছিলাম। বিশেষ করে দুর্ঘটনার খবর। আমি অবাক হতাম যে প্রতিটি সড়ক দুর্ঘটনার খবর শেষ হতো “দুর্ঘটনার পর ড্রাইভার নিরাপদে পালাইয়া যাইতে সক্ষম হয়” এবং “লাশ ময়না তদন্তের জন্য হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়”। ময়না তদন্ত কী তা বোঝানোর মতো কেউ ছিল না। কাউকে জিজ্ঞাসা করতে লজ্জাবোধ হতো, যদি ভেবে বসে ক্লাস নাইনে পড়ে, অথচ “ময়না তদন্ত” বোঝে না। অবশেষে কারো কাছে জানতে পারলাম যে ময়না তদন্ত কী। শেরপুরে তখনকার শহর সীমানার একেবারে এক প্রান্তে, মেথর পট্টির কাছেই নাকি লাশকাটা ঘর আছে। দুর্ঘটনা, হত্যা ও আত্মহত্যাজনিত মৃত্যুর ঘটনা ঘটলে ওই ঘরে লাশ চিড়ে দেখা হয় শরীরের কোথায় আঘাত লেগেছিল, কী দিয়ে আঘাত করা হয়েছিল, বিষ খেলে বা ফাঁসিতে ঝুললে কী বিষ ও কতোটুকু পান করেছিল, বা কতো সময় ধরে ফাঁসিতে লটকে ছিল ইত্যাদি।
সংবাদপত্র অফিস ভ্রমণের পর আমি মোটামুটি সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলি যে, ভবিষ্যতে যদি কোনো কাজ করতে হয়, তাহলে আমি সাংবাদিকতাই করবো। তবে মনের পেছন দিকে আরেকটা চিন্তা ছিল, সামরিক বাহিনীতে যাওয়ার, প্রথমত আমাদের সম্প্রসারিত পরিবারের এক দাদা ও এক চাচা সেনাবাহিনীতে ছিলেন এবং দূর সম্পর্কের এক ভাই বিমান বাহিনীতে ছিলেন। সারা বছর তারা পশ্চিম পাকিস্তানে থাকতেন, ১৯৬৫ সালের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। তাদের কাছে যুদ্ধের কাহিনী শুনে সামরিক বাহিনীতে যাওয়ার জন্য অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম। যাহোক, ঢাকা থেকে ফেরার পর আমাদের এলাকায় কোনো ঘটনা ঘটলে আমি ছোটখাট খবর লিখে দৈনিক আজাদ বা দৈনিক পয়গামে পাঠিয়ে দিতাম। পয়গাম আমাদের এলাকায় তেমন চলতো না, অতএব পয়গামে আমার পাঠানো কোনো খবর ছাপা হয়েছে কিনা তা দেখিনি। তবে আজাদে আমার বেশ কটি খবর প্রকাশিত হয়েছে। তাতে আমার সাংবাদিকতার আগ্রহ আরো বেড়ে যায়। আমি নিজে থেকে সংবাদপত্র অফিসে যোগাযোগ করতে শিখি। আরো কিছু মাসিক সাময়িকীর গ্রাহক হই – মাহে নও, বাংলা ডাইজেস্ট, আজকের জার্মানি। আব্বা কৃষি বিভাগে চাকুরি করার কারণে প্রতি মাসে ‘কৃষি কথা’ আসতো। মাঝে মাঝে মার্কিন পরিক্রমাও আসতো। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়তাম সবগুলো।
ইতোমধ্যে ১৯৬৯ সালের গণআন্দোলন শুরু হয়, যার দোলা আমাদের ছোট মফস্বল শহরেও লেগেছিল। ওই বছর আমার এসএসসি পরীক্ষা। সামরিক আইন জারি হওয়ায় পরীক্ষা পিছিয়ে গেল। পরীক্ষা দেওয়ার পর কয়েক মাসের বিরতিতে ফলাফল পেয়ে স্থানীয় কলেজে ভর্তি হই। ঊনসত্তরের শেষ দিকে সকল সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দেখছিলাম যে দৈনিক সংগ্রাম নামে একটি সংবাদপত্র প্রকাশিত হবে। যারা বিভিন্ন স্থান থেকে সংবাদদাতা হতে ইচ্ছুক তাদেরকে আবেদন করতে বলা হয়েছে। আমি আবেদন করি এবং আমাকে শেরপুর সংবাদদাতা হিসেবে নিয়োগ ও পরিচয়পত্র দেওয়া হয়। সংগ্রামের প্রকাশনার তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৯৭০ সালের ১৭ই জানুয়ারী। ঘটনাচক্রে আমি তার দু’দিন আগে থেকেই ঢাকায় ছিলাম। একদিন ওয়ারীর ৩১ র্যাঙ্কিন ষ্ট্রিটে গিয়ে পত্রিকাটির অফিসও দেখে এসেছি। ১৭ই জানুয়ারি সকালে ঢাকা স্টেডিয়াম থেকে দৈনিক সংগ্রামের উদ্বোধনী সংখ্যা কিনে ট্রেনে চেপে বাড়ি চলে যাই। আমি কখনো উচ্ছাস প্রকাশ করি না। তবে মনে মনে আমি উচ্ছসিত ছিলাম।
তখন থেকে সাংবাদিকতা আমাকে জড়িয়ে রাখে, আমিও সাংবাদিকতাকে ধারণ করি। ১৯৭০ সালের পুরো সময় এবং ১৯৭১ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত প্রচুর খবর পাঠিয়েছি। প্রতিটি খবর যথাযথ গুরুত্ব সহকারে প্রকাশিত হয়েছে। এপ্রিল মাসের শেষ দিকে পাকিস্তানি বাহিনী শেরপুর চলে আসার আগেই আমরা গ্রামের বাড়ি চলে গিয়েছিলাম এবং আমার পক্ষে আর কোনো খবর সংগ্রহ বা পাঠানোর সুযোগ হয়নি। একাত্তরের ১৪ই ডিসেম্বরের পর দৈনিক সংগ্রামের প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যায়।
জহিরুলঃ জন্ম ও বেড়ে ওঠার গল্প বলেন। চারপাশের আর্থসামাজিক ও প্রাকৃতিক পরিবেশ, পরিবারের অর্থনীতি, শিক্ষা ও সংস্কৃতি, অর্থাৎ যেসব উপকরণ শিশুর মনস্তত্বে প্রভাব ফেলে, শৈশব-কৈশোর গড়ে তোলে, পরিপুষ্ট করে তোলে সেইসব গল্প শুনতে চাই।
মঞ্জুঃ আমার জন্ম ১৯৫৪ সালে। বর্তমান শেরপুর জেলার শ্রীবর্দি উপজেলাধীন গড়জরিপা গ্রামে। আব্বার ছোট্ট এক নোটবুকে লেখা ছিল ১লা ফালগুন, ১৯৫৪। দিনটি গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জী অনুসারে ফেব্রুয়ারী মাসের ১৩ অথবা ১৪ তারিখে পড়ে। সার্টিফিকেট অনুযায়ী বয়স প্রকৃত বয়সের চেয়ে কয়েকদিন বেশি। আমাদের পরিবার বর্ধিষ্ণু কৃষি পরিবার। দাদার যে পরিমাণ আবাদি জমি ছিল তা ওই সময়ে মানুষের ঈর্ষার কারণ ঘটাতো। তিনি ছিলেন ওই অঞ্চলের বহু গ্রামের মধ্যে একমাত্র হাজি। হাজিসাহেবকে দেখতে ও দোয়া নিতে এবং তার কাঠের দোতলা বাড়ি দেখতে দূরদূরান্ত থেকে লোকজন আসতো। লোকজন তাকে আরো সম্মান করতো গ্রামের বড় মসজিদে তিনি বিনা হাদিয়ায় জুমা নামাজ ও দুই ঈদের জামাতে ইমামতি করার কারণে। তার নাতি হিসেবে আমরা শৈশব থেকে অন্যে শিশুদের চেয়ে বেশি কদর পেয়েছি। আগেই উল্লেখ করেছি, আব্বা ও চাচা কৃষি বিভাগে চাকুরি করতেন। কৃষি বিভাগের চাকুরিতে নিয়োগ লাভের আগে আব্বা বগুড়া আজিজুল হক কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনা করতেন, তখন ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ ওই কলেজের প্রিন্সিপাল ছিলেন। সেখান থেকে তিনি ঢাকার শেরে বাংলা নগর কৃষি ইন্সটিটিউটে (বর্তমানে শেরে বাংলানগর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়) পড়াশোনা করে সরাসরি কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের চাকুরিতে যোগ দেন। দাদা চেয়েছিলেন তার বড় ছেলে জমির দেখাশোনা করবে। তা হয়নি। আব্বাকে অনুসরণ করে আমার চাচাও শেরপুর কৃষি ইন্সটিটিউটে (বর্তমানে কলেজ) পড়াশোনা করে চাকুরি শুরু করেন। আমাদের সম্প্রসারিত পরিবারে আব্বাই প্রথম চাকুরিজীবী।
আমাদের গ্রামের প্রাকৃতিক পরিবেশ বাংলাদেশের যে কোনো গ্রামের চেয়ে ভিন্ন ও ব্যতিক্রমী। গ্রামের চারপাশ ঘিরে উঁচু টিলা, আমরা ‘জাঙাল’ বলতাম। টিলায় ছিল প্রচুর গাছ, শিয়াল ও পাখির অভয়াশ্রম। আমরা দিনের বেলায় গাছে ঢাকা টিলার দিকে যেতে ভয় করতাম। কোনো কোনো অংশ বেশ উঁচু, কোথাও বা লোকজন বাড়িঘর বানিয়েছে। উত্তর-পশ্চিম পাশ দিয়ে টিলার কোল-ঘেঁষে বেশ প্রশস্ত খাল, দক্ষিণ-পশ্চিম কোনায় একটি বড়সড় বিল, যার নাম ‘কালিদহ’ সাগর। এটিকে কেন্দ্র করে আমরা ছেলেবেলা থেকেই বেহুলা-লখিন্দরের কাহিনি শুনতে শুনতে বড় হয়েছি। প্রথম টিলার পর দ্বিতীয় টিলার অস্তিত্বও দেখেছি গ্রামের প্রায় অর্ধেকটা তখনো বেষ্টন করে ছিল। বাকি অর্ধেক সমতলভূমিতে পরিণত হয়েছে। তৃতীয় একটি টিলার অংশবিশেষও দেখেছি আমরা। শুনেছি একজন শাসক ছিলেন, যিনি তার নিরাপত্তা ব্যবস্থা অভেদ্য করার জন্য এভাবে সাত স্তরে মাটির টিলা ও পরিখা খনন করেছিলেন। আমাদের গ্রামের বিভিন্ন স্থানে পুরোনো আমলের অনেক ইট এবং মাটির নিচে অর্ধেকটা দেবে যাওয়া একটি নির্মাণাধীন অট্টালিকার সাথে জড়িত নানা কাহিনি আমার জন্য রূপকথা ও ইতিহাসের আদি পাঠ ছিল।
আমাদের পরিবার ধর্মীয় দিক থেকে রক্ষণশীল ছিল। তবে গোঁড়া ছিল না। দাদা চাইতেন সকলেই আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হোক, কিন্তু ধর্ম চর্চা ঠিকমতো করুক। তিনি তার পরিবারের কাউকে মাদ্রাসা শিক্ষা গ্রহণের দিকে ঠেলে দেননি। সে কারণে আমাদের বৃহত্তর পরিবারে মাদ্রাসা পড়ুয়া কেউ নেই। অন্য কোনো ওয়াক্তের নামাজ পড়ি আর না পড়ি, সন্ধ্যার আগে বাড়ি এসে মাগরিবের নামাজ পড়া অনেকটা বাধ্যতামূলক ছিল। নামাজের সময়ের আগে বাড়িতে থাকলে আমাকে অথবা আমার বড় ভাইকে মাগরিবের আজানও দিতে হতো। মামাদের পরিবার রক্ষণশীল ছিল না, আধুনিক শিক্ষার কদর বেশি ছিল। কৃষির দিকে তারা মনোযোগ দেননি কখনো। আমরা এই দু’য়ের সমন্বয়ে বেড়ে উঠি। আমার বড় মামার ছেলে ডা: আবু মালেক (লেবু ভাই) এবং ছোট মামার মেয়ে শেফালি বু’ আমাদের কাছে আদর্শ ছিলেন। আম্মা সবসময় এই দু’জনের গল্প বলতেন। লেবু ভাই ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে পড়াশোনা করে সত্তরের দশকে ইংল্যাণ্ডে চলে যান। বর্তমানে বার্মিংহামে আছেন। শেফালি বু’ সরকারি হাইস্কুলে শিক্ষকতা করে অবসর নিয়েছেন।
আমাদের গ্রামে সংস্কৃতি চর্চার কোনো সুযোগ ছিল না। গ্রামের কারো বাড়িতে গ্রামোফোন বা কলের গান পর্যন্ত ছিল না। বাড়ির পেছনের দিকে কয়েক ঘর জেলে ছিল, একবার তারা কলের গান ভাড়া করে আনে রূপবানের কাহিনি ও গান শোনার জন্য। আমি তখন ক্লাস টু’তে পড়ি। পাঁচটি বা ছয়টি রেকর্ডে পুরো কাহিনি ছিল। জেলে বাড়িতে যাওয়ার অনুমতি ছিল না আমাদের। রূপবান শোনার জন্য দাদি বিশেষ অনুমতি নিয়ে কারো সঙ্গে যেতে দেন। মহাবিস্ময়ে কলের গান দেখি ও রূপবান শুনি। আরেকটি অনুষ্ঠানে যাওয়ার অনুমতি ছিল, সেটি কালিহদ সাগরের দক্ষিণ পাশে আয়োজিত চৈত্র-সংক্রান্তি মেলা। আমাদের গ্রামে কোনো হিন্দু নেই। কিন্তু কালিদহের পাশে চৈত্র সংক্রান্তি মেলায় দূরদূরান্ত থেকে হিন্দুরা আসতো স্নান করতে এবং অন্যান্য ধর্মীয় আচার পালন করতে। আমরা মেলায় গিয়ে বাঁশি, বেলুন, আম কাটার জন্য চাকু, বাতাসা, চিনি ও গুড়ের সাজ ও মুড়কি কিনে সন্ধ্যায় মহানন্দে বাঁশি বাজাতে বাজাতে বাড়ি ফিরতাম। পহেলা বৈশাখের কোনো অনুষ্ঠান না হলেও ওইদিন বিশেষ কিছু খাবার রান্না করা হতো। যার মধ্যে কয়েকটি আইটেম হতো তিতা স্বাদের – করলা পাতা, নিম পাতা সহযোগে বানানো হতো। বছরের দুই ঈদের প্রভাব আমাদের ওপর বেশি ছিল। সারা বছর অপেক্ষা করতাম, কখন রোজার মাস আসবে।
মঞ্জুঃ আগেই বলেছি ঢাকায় বলতে গেলে স্থায়ীভাবে এসেছি ১৯৭৪ সালে। প্রথম ঢাকায় এসেছিলাম ১৯৬৬ সালে আব্বার সাথে। এরপর প্রায় প্রতিবছর অন্তত একবার করে আসা হতো। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস অর্থাৎ ওই বছরের মার্চ ও এ্প্রিল মাসের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত শেরপুর শহরের বাড়িতে ছিলাম। এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে পাকিস্তানি বাহিনী শেরপুর প্রবেশ করে। তখন আমরা শহর থেকে ৬ মাইল দূরে গ্রামের বাড়িতে ছিলাম। আমার উদ্বেগ ছিল আমার বই নিয়ে। শহরের বাড়িতে আমার পাঁচ শতাধিক বই, ম্যাগাজিন ছিল। গ্রামের বাড়িতে বই স্থানান্তর করা কঠিন ছিল। বই বলে নয়, যে কোনো কিছু। সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ শহর থেকে বের হওয়ায় প্রতিটি পয়েন্টে প্রহরা বসিয়েছিল কেউ যাতে পাকিস্তানি বাহিনীর আগমণের খবর শুনে আতঙ্কিত না হয়। তারা প্রতিদিন ঘোষণা করছিল যে, শহর থেকেই প্রতিরোধ করা হবে। তাদের ঘোষণায় কেউ আশ্বস্ত হতে পারছিল না। আমিও না। লোকজন যার যার মতো রাতের অন্ধকারে পালিয়ে যাচ্ছিল। আমি সাইকেলের হ্যাণ্ডেলে, ক্যারিয়ারে ঝুলিয়ে প্রহরা এড়িয়ে আলপথে সাইকেল ঠেলে দিনে দু’বার তিনবার করে বই পরিবহন করি টানা ১০ দিন।
এপ্রিলের ২৯ বা ত্রিশ তারিখে জামালপুর থেকে আমার চাচার শ্যালক সিরাজুল হক (১৯৯১ সালে বিএনপির সংসদ সদস্য ও স্বাস্থ্য উপমন্ত্রী) তার দুই বন্ধুসহ আমাদের বাড়িতে আসেন। একদিন আগে জামালপুরে পাকিস্তানিবাহিনী এসেছে। বাড়িঘর জ্বালাচ্ছে। যুবকদের পেলেই ধরে ধরে গুলি করছে। তারা ভারতে যাবেন। রাতের বেলায় গ্রামের আরো লোকজন আসে তাদের কাছে খবর শোনার জন্য। শোনার পর সকলে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। আমিও সিদ্ধান্ত নেই পরদিন তাদের সাথে ভারতের উদ্দেশে রওয়ানা হবো। সকালে উঠে খাওয়া-দাওয়ার পর একটা বোচকা বেঁধে প্রস্তুত হই। আম্মা ১১৬ টাকা দেন। আল্লাহর নামে বের হয়ে পড়ি। পেছনে বাড়ির ও পাড়াপড়শি মহিলাদের ভিড়। দশ মাইল রাস্তা অতিক্রম করার পর ভারত-সীমান্তের পাঁচ মাইলের মধ্যে আমাদের এক ফুপার বাড়ি। শরীফ উদ্দিন। তিনি স্থানীয় আওয়ামী লীগের সেক্রেটারী। আকলিমা ফুপু আমাদের চার জনকে যত্ন করে খাওয়ান। বিকেলে ফুপা আমাদের নিয়ে সীমান্তের উদ্দেশে রওয়ানা হন। পৌঁছাতে সন্ধ্যা হয়ে গেছে। সকাল না হলে সীমান্ত অতিক্রম করতে দেয়া হবে না। রাত কাটাই ইপিআর ক্যাম্পে। রাতে ক্যাম্পে থাকতে দিলেও তারা খেতে দেয়নি। পরদিন সকালেও তারা কিছু খেতে দেয় না। পাহাড়ের মধ্যে দোকানও নেই যে খাবার পাওয়া যাবে। এ সময়ে শেরপুরের ন্যাপ নেতা কাশেম ভাই এলেন। উনি জানতে চাইলেন কিছু খেয়েছি কিনা। খাইনি শুনে সাথে নিয়ে উত্তরদিকে হাঁটা দিলেন। সীমান্ত ঘেঁষা জায়গায় একটি কুড়েঘর। প্রায় বিশজন তরুণ। সবাই পরিচিত। ছাত্র ইউনিয়নের নেতাকর্মী। আমার বড় ভাই ছাত্র ইউনিয়নের নেতা। ওই সময় সেখানে না থাকলেও কিছুক্ষণ পর সেখানে আসে। ততক্ষণে আমি খেসারির ডাল দিয়ে ভাত খেয়েছি। বিশ ঘন্টা অভুক্ত থাকার পর ওটাই অমৃত ছিল।
আমার ভাইয়ের সাথে দেখা না হলেই বোধ হয় ভালো হতো। খাওয়ার পর আমাকে বলে, “তুই বাড়ি চলে যা। আব্বা আম্মাকে দেখ। দুই জনের একসাথে বাইরে থাকা ঠিক হবে না”। ছোট থেকেই বড় ভাইয়ের সাথে কোনো কিছুতে আমার মিল নেই। কিন্তু কখনো ভাইয়ের কথা অগ্রাহ্য করিনি। আমার কাছে টাকা আছে কিনা জানতে চাইলে আমি আম্মার দেয়া ১১৬ টাকা তাকে দিয়ে বাড়ির পথ ধরি। সিরাজ চাচার সাথে যে দু’জন ছিল তাদের একজন, জালালও, সিদ্ধান্ত পাল্টে আমার সাথে ফিরে আসে।
দু’দিন পর পাকিস্তানি বাহিনীর সীমান্তের দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় ওই পথের দু’এক মাইলের মধ্যে আমাদের যেসব আত্মীয়ের বাড়ি, তাদের মধ্যে বড় মামা ও শেফালি বু’র পরিবার আমাদের বাড়ি চলে আসে। তখন আমাদের বাড়িটি ছিল বিরাট, দোতলা ঘর ছাড়া পৃথক একটি বড় ঘর এবং বাইরে একটি খানকাহ ঘর ছিল। থাকার কোনো সমস্যা ছিল না। তবে এতোগুলো মানুষের রান্না করার জন্য বাড়ির মহিলাদের প্রায় দিনরাত রান্নাঘরেই কাটাতে হতো। মাস খানেক পর পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল মনে হলে সবাই যার যার বাড়ি চলে যান। কিন্তু আমরা শেরপুরের বাড়িতে যাচ্ছিলাম না। শহর থেকে শুধু লুটপাট, বাড়িতে আগুন দেয়ার খবর শুনি। ভাবনায় অস্থির থাকেন আব্বা আম্মা শেরপুর ফিরে গেলে সবকিছু ঠিকঠাক পাওয়া যাবে কিনা। আব্বাই প্রথম যান। একরাত শেরপুরের বাড়িতে কাটান। গ্রামের বাড়িতে ফিরে বলেন, শহর নিস্তব্ধ, যাকে বলে “শহরে খামোশান”। আমাদের বেশ কিছু জিনিস লুণ্ঠিত হয়েছে। সকালে ফজরের আজান শোনেননি। তার অফিসে দু’একজন লোক ফিরেছে। দুই মামার পরিবার তখনো শহরের বাড়িতে ওঠেননি। তারা গেলেই আম্মাও যাবেন। সম্ভবত জুন মাসের শেষ দিকে শেরপুর যাই। কারণ এইচএসসি পরীক্ষার তারিখ দেওয়া হযেছে। ফরম পূরণ করতে হবে। যাই হোক প্রস্তুতি নিতে হবে পরীক্ষার। জুলাই বা আগষ্ট মাসে পরীক্ষা হয়। অর্ধেকের মতো ছাত্র পরীক্ষা দিচ্ছিল। ক্লাস হয়নি, পড়াশোনা হয়নি। যেন তেন পরীক্ষা দেই। এরপর ডিসেম্বর পর্যন্ত কখনো গ্রামের বাড়ি কখনো শহরের বাড়িতে কাটাই। আম্মার কাছে বড় ভাইয়ের খবর মাঝে মাঝে আসতো। পরীক্ষার ফলাফল যা হওয়ার তাই হয়েছিল, তৃতীয় বিভাগ। এভাবে ডিসেম্বর চলে আসে। শেরপুর পাকিস্তানী বাহিনীর পতন ঘটে ৭ ডিসেম্বর। বিকেলে শহর পরিণত হয় জনারণ্যে। জানতে পারি, ইস্টার্ন কমান্ডের প্রধান জগজিৎ সিং অরোরা হেলিকপ্টারে নামবেন স্থানীয় পার্কের মাঠে। বন্ধুবান্ধবের সাথে আমিও যাই। অরোরা আসেন, সামান্য বক্তব্য রাখেন এবং চলে যান। রাতের মধ্যে শহর ছেয়ে যায় ভারতীয় সৈন্য ও মুক্তিযোদ্ধায়। তবে সবাই সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল। লক্ষ্য ঢাকা। আমার ভাইয়ের খবর না পেয়ে আম্মা চিন্তিত। পরে জানা যায়, উনার ইউনিট ময়মনসিংহ শহরে আছে। আম্মা নিশ্চিন্ত হন।
জহিরুলঃ সাংবাদিক তা ছাড়া আর কোনো পেশা গ্রহন করেছেন কখনো?
মঞ্জুঃ জি না, সাংবাদিকতা ছাড়া আমি অন্য পেশা গ্রহণ করিনি। তবে ২০০১ সালের মে মাসে দৈনিক বাংলার বাণী বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ২০০২ সালের অক্টোবর বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থায় (বাসস) যোগ দেয়ার পূর্ব পর্যন্ত ষোলো মাস আমি সাংবাদিকতার বাইরে ছিলাম। একেবারে সাংবাদিকতার বাইরেও বলবো না। এ সময় ইউএনডিপি’র অর্থায়নে পরিচালিত সাংবাদিকদের একটি এডভোকেসি গ্রুপে কাজ করেছি। অধিক অর্থাগম ও নিয়মিত বিদেশ সফরের সুযোগ থাকা সত্বেও কাজটিতে মন বসাতে পারিনি। নিউ ইয়র্কে আসার পর তিন মাস একটি ফার্মেসিতে কাজ করেছি। সাংবাদিকতার বাইরে এই সামান্য ব্যতিক্রম ছাড়া আমি কখনো অন্য কোনো পেশা গ্রহণ করিনি।
জহিরুলঃ সাংবাদিকতা জীবনের ধারাবাহিক গল্পটা শুনতে চাই।
মঞ্জুঃ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর আমি অনিয়মিতভাবে বিভিন্ন ম্যাগাজিনে লিখছিলাম। ইতোমধ্যে রাজনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে যায়। সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী বা সোজা কথায় একদলীয় শাসন বা বাকশাল প্রতিষ্ঠার কারণে রাজনৈতিক দলের উপর ও সংবাদপত্র প্রকাশনার ওপর যে নিষেধাজ্ঞা ছিল ১৯৭৬ সালে তা প্রত্যাহার করা হয়। যেসব সংবাদপত্র বন্ধ করা হয়েছিল সেগুলো পুনরায় প্রকাশের উপর থেকে বিধিনিষেধ উঠে গেলে আবারও পত্রপত্রিকাগুলো প্রকাশিত হতে থাকে। জানতে পারি যে, দৈনিক সংগ্রাম পুন:প্রকাশের জন্যও আবেদন করা হয়েছে। সংগ্রামের প্রকাশনা বন্ধ হয়েছিল অনেক আগে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রকাশের অনুমতি লাভ করে। আমার যেহেতু মফস্বল সংবাদদাতা হিসেবে পত্রিকাটির সঙ্গে সাবেক যোগসূত্র ছিল, সেই সুবাদে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদদাতা হিসেবে নিয়োগ লাভের আবেদন করি এবং তা মঞ্জুর হলে আমি কাজ শুরু করি ১৯৭৭ সালের জানুয়ারী মাসে পুন:প্রকাশের দিন থেকে। এক বছরের মধ্যে আমি স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে ফুলটাইম সাংবাদিকতায় নিয়োজিত হই। আর পেছনে তাকাইনি। ১৯৮৩ সালে সাংবাদিকতায় ডিপ্লোমা করার জন্য একটি বৃত্তি পেয়ে জার্মানির বার্লিনে ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউটে যাই। এরপর ১৯৮৮ সালে রয়টার্সের একটি বৃত্তি লাভ করে ক্যালিফোর্নিয়ার স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে ১৯৮৮-৮৯ সালে জন এস নাইট ফেলোশিপ প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করি। এটি আমার জন্য একটি বড় পুরস্কার ছিল। প্রোগ্রাম শেষে দেশে ফিরে গিয়ে দেখি সংগ্রামে আমার অবস্থান নড়বড়ে হয়ে গেছে। যদিও তখন আমাকে বার্তা সম্পদক হিসেবে পদোন্নতি দেয়া হয়েছিল এবং ঢাকায় আমি সবচেয়ে কম বয়সী বার্তা সম্পাদক হয়েছিলাম, আমার প্রতি ঈর্ষাকাতরদের যন্ত্রণায় দায়িত্ব পালন করা কষ্টকর হয়ে উঠেছিল। আমার বিরুদ্ধে স্বয়ং সম্পাদক খড়গহস্ত হয়েছিলেন। তার কোনো সহযোগিতা পাচ্ছিলাম না। ওই সময়ে ব্রিটিশ হাইকমিশনে ইনফরমেশন অফিসারের একটি ওপেনিং দেখে আবেদন করি, ইন্টারভিউ হয় এবং আমি নির্বাচিত হই। কিন্তু শেষ মুহূর্তে তাদেরকে জানিয়ে দেই আমি যোগ দেব না। শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা কাটানোর জন্য আমি ভারতীয় পার্লামেন্টের ইন্সটিটিউট অফ পার্লামেন্টারি এন্ড কন্সটিটিউশনাল স্টাডিজ এ একটি ফেলোশিপের জন্য আবেদন করি। এটির তহবিল দাতা ছিল কমনওয়েলথ টেকনিক্যাল অ্যাসিষ্ট্যান্স প্রোগ্রাম। আমি নির্বাচিত হয়ে ১৯৯২ সালের নভেম্বরে দিল্লি চলে যাই। কর্মসূচি শেষে ১৯৯৩ সালের জুন বা জুলাই মাসে ফিরে আসি। তখন আমার বার্তা সম্পাদকের পদ আর আমার নেই। আমাকে বলা হয় সম্পাদকীয় বিভাগে যোগ দিতে। আমি অস্বীকার করলে আমাকে বিশেষ সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করতে বলা হয়। কিন্তু আমার কোনো রিপোর্ট প্রকাশ করা হচ্ছিল না। অত্যন্ত অপমানবোধ করছিলাম। ভারতে যাওয়ার কারণে আমাকে রীতিমতো ভারতীয় এজেন্ট হিসেবে চিহ্নিত করা শুরু হয়েছিল্। আমি পরবর্তী তিনটি বছর শুধু অফিসে গেছি আর বাসায় ফিরে এসেছি। বেতন ঠিকই দেয়া হচ্ছিল। আমার মনে হচ্ছিল, ভালো মানুষগুলোর আসল চেহারা না দেখা পর্যন্ত এভাবেই থাকবো।
১৯৮৭ সালের এপ্রিলে আমি নতুন ঢাকা ডাইজেস্ট নামে একটি মাসিক ম্যাগাজিন প্রকাশ করি। সাথে আমার তিন সহকর্মী ছিলেন। অল্পদিনেই বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল ঢাকা ডাইজেস্ট। এটিও আমার বিরুদ্ধে ইর্ষা ও অপপ্রচারের একটি কারণ ছিল। ১৯৯৬ সালের জুনে জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর আসন সংখ্যা পূর্ববর্তী ১০ আসনের স্থলে ৩টিতে নেমে আসে। নির্বাচন বিশ্লেষণ করে আমি ঢাকা ডাইজেস্টে একটি নিবন্ধ লিখি, যার শিরোনাম ছিল: “ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ: জামায়াতের রাজনৈতিক বালখিল্যতা।” এটি ভীমরুলের চাকে ঢিল ছোঁড়ার মতো ছিল। এটি প্রকাশিত হওয়ার তিন মাস পর অক্টোবর মাসে আমাকে দৈনিক সংগ্রাম থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। পরের মাসেই আমি মতিউর রহমান চৌধুরীর সম্পাদনায় দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকার ফিচার এডিটর হিসেবে যোগ দেই। এক বছর পর মতিউর রহমান চৌধুরী দৈনিক মানবজমিন প্রকাশের উদ্যোগ নিলে তার সাথে বাংলাবাজার পত্রিকা ত্যাগ করি। মানবজমিনে কাজ করি এক বছর। এসময় বাংলাবাজার পত্রিকায় কোনো বার্তা সম্পাদক ছিলেন না। সেখান থেকে আমাকে ডাকা হলে আমি দ্বিতীয় বারের মতো বাংলাবাজার পত্রিকায় যোগ দেই। বছর খানেক পর দৈনিক বাংলার বাণীর পক্ষ থেকে আমার সাথে যোগাযোগ করা হয় তাদের বার্তা সম্পাদক হিসেবে যোগ দেয়ার জন্য। বাংলাবাজার পত্রিকার কোনো সম্ভাবনা ছিল না, বাংলার বাণীর সার্কুলেশন বেশি না হলেও মূলধারার সংবাদপত্র এবং আওয়ামী লীগ তখন ক্ষমতায়। আমি ১৯৯৯ সালের জুলাই মাসে বাংলার বাণীর বার্তা সম্পাদক হিসেবে যোগ দেই। কিন্তু ২০০১ সালে কর্তৃপক্ষ বাংলার বাণী বন্ধ করে দেয়। কেউ ধারণাও করতে পারেনি যে বাংলার বাণীর মতো একটি পুরোনো দৈনিক বন্ধ হয়ে যেতে পারে। আমি পরিবেশ সাংবাদিক ফোরামের ভাইস চেয়ারম্যান ছিলাম। সেখানেই পুরো সময় দিতে থাকি। এ সময় এটিএন বাংলার হেড অফ নিউজ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন এখনকার বাংলাদেশ প্রতিদিন এর সম্পাদক নঈম নিজাম। আমাকে একদিন ফোন করে এটিএন বাংলায় যোগ দিতে বলেন। চেয়াম্যান মাহফুজুর রহমান ও উপদেষ্টা সাইফুল বারীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। কবে থেকে যোগ দেব জানতে চান চেয়ারম্যান। আমি সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য সময় চেয়ে নেই। কারণ তখন বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থায় (বাসস) নিয়োগের একটি প্রক্রিয়া চলছিল এবং আমার নিয়োগ বিবেচনাধীন ছিল। তথ্যমন্ত্রী তরিকুল ইসলামের সঙ্গে আমার বেশ খাতির ছিল। উনিই চাইছিলেন আমি যাতে বাসস-এ যোগ দেই। কিন্তু বাসস এর প্রধান সম্পাদক ও এমডি আমানুল্লাহ কবীর টালবাহানা করছিলেন। তথ্য মন্ত্রণালয়ের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা খোন্দকার মনিরুল আলম ফোন করে বলেন, আমি যাতে অন্য কোথাও যোগ না দেই। তথ্যমন্ত্রী আমানুল্লাহ কবীরের কাছে আপনার নামসহ আটজনকে নিয়োগ দেয়ার নির্দেশ দিয়েছে। ক’দিন অপেক্ষা করুন। আমি অপেক্ষা করি। এটিএন বাংলা থেকে সাইফুল বারী ফোন করেন, আপনি জয়েন করছেন না কেন? আমি তাকে জানাই, এসে কথা বলি। তার সাথে সাক্ষাৎ করে ঘটনা বলি। তিনিও বলেন বাসস-এ চাকুরি হলে এটিএন বাংলায় যোগ দেয়ার প্রয়োজন নেই। ২০০২ সালের অক্টোবরে বাসস এর ইংরেজি সেকশনে বার্তা সম্পাদক হিসেবে যোগ দেই। আমানুল্লাহ কবীরের চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে বাসস এর প্রধান সম্পাদক হিসেবে আসেন গাজীউল হাসান খান্। তিনি আমাকে উপ-প্রধান বার্তা সম্পদক হিসেবে পদোন্নতি দিয়ে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে চিফ রিপোর্টারের দায়িত্বও দেন। তার দুই বছরের চুক্তি শেষ হয় ২০০৭ সালের শুরুতে কেয়াটেকার সরকারের সময়। প্রধান সম্পাদক হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন জগলুল আলম চৌধুরী। তিনি আমার উপর আস্থা রাখতেন এবং চিফ রিপোর্টার পদে বহাল রাখেন। কিন্তু ওই সময়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি পন্থী রিপোর্টারদের ঠেলাঠেলি ও আমার উপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করায় আমি চিফ রিপোর্টারের দায়িত্ব ছেড়ে দেই এবং উপ-প্রধান বার্তা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে থাকি। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং ৬ জানুয়ারী আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। প্রধান সম্পাদক হিসেবে আসেন ইহসানুল করিম হেলাল। উনি বাসস-এর সিনিয়র সাংবাদিক এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রিয়ভাজন। এসময়ে বিএনপি আমলে নিয়োগপ্রাপ্তদের ডেকে ডেকে পদত্যাগ করতে বলা হচ্ছিল। বিশেষত যাদের শিক্ষাগত যোগ্যতার সার্টিফিকেটে ত্রুটি ছিল। ২০০৯ ও ২০১০ ভালোভাবেই কাটে। আমি এক মাসের বিনোদন ছুটি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আসি। এখানে আমার মেয়ে একা অবস্থান করছিল। ছুটি শেষ হওয়ার আগে আমি আরো এক মাস ছুটি বাড়ানোর আবেদন করি। কিন্তু নভেম্বর মাসে আমার স্ত্রী ঢাকা থেকে জানায় বাসস থেকে চাকুরিচ্যুতির নোটিশ বাসায় গেছে। আমি আফসোস না করে আলহামদুলিল্লাহ বলে আমার স্ত্রীকে বলি অফিসে আমার ডেস্ক ও আলমারির চাবি নিয়ে কাগজপত্রগুলো বুঝিয়ে দিয়ে আসতে। সে যায় এবং সব বুঝিয়ে দিয়ে আসে। অফিসে কিছু পাওনা ছিল। আমার সহকর্মীরা তাকে সহযোগিতা করে টাকা তুলে নিতে। প্রধান সম্পাদক তার অফিসে ডেকে কফি খাওয়ায় এবং উপরের নির্দেশে তাকে আমার চাকুরিচ্যুতির নোটিশে স্বাক্ষর করতে হয়েছে বলে দু:খ প্রকাশও করেন। আমি দেশে গিয়ে কোথায় কারও কাছে নতুন করে চাকুরির জন্য নিবেদন করবো – এমন ভাবনা কষ্টকর ছিল বলে দেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত পরিহার করি এবং নিউইয়র্কে কমিউনিটি সংবাদপত্র সাপ্তাহিক বাংলাদেশ এর উপদেষ্টা সম্পাদক হিসেবে যোগ দেই।
জহিরুলঃ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে সাংবাদিকেরা বেশ অনৈতিক ক্ষমতা ভোগ করে, এ ধরনের ক্ষমতার স্বাদ পেয়েছেন কখনো?
মঞ্জুঃ আমি যখন সাংবাদিকতা শুরু করেছি তখন খুব কম সংখ্যক সাংবাদিককে অনৈতিক কর্মকান্ডে জড়িত দেখেছি। দু’এক জন ছিল, কিন্তু তাদেরকে সাংবাদিকরাও পছন্দ করতো না। সংবাদপত্রের সংখ্যা কম ছিল, সাংবাদিকের সংখ্যাও কম ছিল। কে কি করলো তা সহজে জানা যেতো। সাংবাদিকরা যদি অনৈতিক কাজে জড়িত হন, তাহলে সেটি ঘটে মূলত ক্ষমতায় যারা থাকেন, তারা অবৈধ সুবিধা দিয়ে তাদেরকে দুর্নীতিগ্রস্থ করার কারণে। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে সংবাদপত্র প্রকাশের উপর নিয়ন্ত্রণ শিথিল হওয়ায় এবং নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে বেসরকারি টেলিভিশন অনুমোদন পাওয়ার পর থেকে বাংলাদেশে সাংবাদিকদের একটি অংশের মধ্যে দ্রুত উপরে উঠার প্রবণতা কাজ করতে শুরু করে। তারা ক্ষমতাসীনদের ব্যবহার করে অথবা ব্যবহৃত হয়। আমি সবসময় সাংবাদিকতা পেশার মর্যাদার সাথে নিজের মর্যাদার কথা ভেবেছি। তা না হলে আমার পক্ষে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানে সম্মান নিয়ে দায়িত্ব পালন করা সম্ভব হতো না।
জহিরুলঃ সংগ্রাম এবং বাংলার বাণী, দুই মেরুর দুই কাগজ, দুটোতেই আপনি কাজ করেছেন, কিভাবে ম্যানেজ করেছেন?
মঞ্জুঃ কোনো বিশেষ দল বা মতের প্রতি আমার কোনো পক্ষপাতিত্ব ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয়েও কোনো ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে জড়িত হইনি। আমার রাজনৈতিক চিন্তা ও পক্ষপাতিত্ব সবসময় আমার নিজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। সবসময় বস্তুনিষ্ঠতাকে প্রাধান্য দিয়েছি। আমার সাথে যারা কাজ করেছে, তাদেরকেও একই কথা বলেছি। বলতে পারেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতির মতো ছিল আমার নীতি, “ফ্রেণ্ডশিপ টু অল, ম্যালিস টু নান” (সকলের প্রতি বন্ধুত্ব, কারো প্রতি বিদ্বেষ নয়)। সেজন্য একজন সাধারণ পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে সকল রাজনৈতিক মতধারার সাংবাদিকদের কাছে আমি কমবেশি গ্রহণযোগ্য ছিলাম। বাংলার বাণীতে আমি মালিক থেকে সহকর্মী পর্যন্ত সকলের সহযোগিতা পেয়েছি। বার্তা সম্পাদক হিসেবে আমার সিদ্ধান্তে সম্পাদকও হস্তক্ষেপ করেননি।
জহিরুলঃ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে রাজনীতি মিডিয়াকে খুব প্রভাবিত করে, এক্ষেত্রে আপনার অভিজ্ঞতা কেমন?
মঞ্জুঃ শুধু তৃতীয় বিশ্বে নয়, উন্নত বিশ্বেও রাজনীতি মিডিয়াকে প্রভাবিত করে। অনেক ক্ষেত্রে মিডিয়াও রাজনীতিকে অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করে। মিডিয়ার পক্ষপাতিত্বের ওপর অনেক সময় রাজনীতির ব্যারোমিটার ওঠানামা করে। তৃতীয় বিশ্বে বিষয়টি নগ্নভাবে প্রকাশ পায়, উন্নত বিশ্বে সুপ্ত থাকে। তৃতীয় বিশ্বে সরকার মিডিয়ার ওপর ক্ষুব্ধ হলে সেন্সরশিপ আরোপ করে, সরকারি বিজ্ঞাপন কমিয়ে দেয়, নানা আইনে সাংবাদিকদের গ্রেফতার করে, গুম করে ফেলে, মারধোর করার জন্য মাস্তান লেলিয়ে দেয়। উন্নত বিশ্বে হয়তো তা হয় না। আমি সবসময় মধ্যপন্থা অবলম্বন করেছি বলে আমার ভূমিকার কারণে ব্যক্তিগতভাবে আমাকে, আমার অধীনস্থ কোনো সাংবাদিককে অথবা আমি যেসব সংবাদ প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছি, সেসব প্রতিষ্ঠানকে কোনো ঝুঁকির মধ্যে পড়তে হয়নি।
জহিরুলঃ ওরিয়ানা ফালাচির ইন্টারভিউ উইথ হিস্টোরি - এই গ্রন্থ অনুবাদ করার পেছনে কি কোনো রাজনৈতিক মোটিভেশন কাজ করেছে? কেন এটি অনুবাদ করলেন?
মঞ্জুঃ ওরিয়ানা ফালাচির নেয়া বিশ্ব নেতৃবৃন্দের সাক্ষাৎকারের সাথে আমার প্রথম পরিচয় ঘটে ১৯৭৯ সালে ইরান বিপ্লবের পর। তিনি আয়াতুল্লাহ খোমেনির সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন, যেটি বাংলায় প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক বিচিত্রায়। তার সাহসী ও আক্রমণাত্মক প্রশ্ন আমাকে আকৃষ্ট করে। এরপর তার একটি বই পড়ি “লেটার টু এ চাইল্ড নেভার বর্ন”। প্রফেসর আনু মুহাম্মদ এটি অনুবাদ করেছিলেন। বইটি ভালো লেগেছিল। আমি যখন স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলাম তখন বুকস্টোরে তার নেয়া সাক্ষাৎকারের একটি সংকলন পাই, “ইন্টারভিউ উইথ হিস্টরি,” । যারা সাংবাদিকতা করছেন, বিশেষ করে যারা রিপোর্টিং এ আছেন তাদেরকে প্রতিনিয়ত সাক্ষাৎকার নিতে হয়, যারা সাংবাদিকতা পড়েন, তাদেরকেও সাক্ষাৎকারের ওপর পড়ানো হয়। মূলত এজন্যই বইটি অনুবাদ করার তাগিদ অনুভব করেছি। সাক্ষাৎকারগুলো ঢাকা ডাইজেস্টে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করার কথাও ভাবি এবং একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হওয়ার পর আরেকটি সাক্ষাৎকারের জন্য অপেক্ষা করে পাঠকরা। বইটিতে শেখ মুজিবের সাক্ষাৎকার অন্তর্ভূক্ত ছিল না। অন্য কোনো সূত্র থেকে সেটি পাই। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ইন্দিরা গান্ধী, জুলফিকার আলী ভূট্টো এবং হেনরি কিসিঞ্জারের সাক্ষাৎকারের পর শেখ মুজিবুর রহমানের সাক্ষাৎকার প্রকাশ না করলে পুরো ব্যাপারটি সঙ্গতিহীন মনে হতো। তাছাড়া শেখ মুজিবুর রহমানে সাক্ষাৎকার কেন প্রকাশ করছি না, এমন চাপ ছিল পাঠকদের পক্ষ থেকে। এর পেছনে রাজনৈতিক কোনো মোটিভেশন ছিল না। বইটি সাধারণ মানুষের জানার খোরাকে ঠাসা এবং নবীন সাংবাদিকদের জন্য সবসময় শিক্ষণীয় হ্যাণ্ডবুকের মতো।




Comments
Post a Comment