Skip to main content

ট্রুডি বলেন, পুরুষ পারলে নারীও পারবে

 জলকন্যা

|| কাজী জহিরুল ইসলাম || 


ডাক্তার বলেছিল
পানিতে যেওনা মেয়েটি সারাজীবন পানিতেই থাকলো বন্ধুরা ডাকে ট্রুডিআর ভক্তরা বলে গার্টিওর পুরো নাম গারট্রুড এডারলি এই শহরেরই মেয়েজন্ম ম্যানহাটনেঅনেকদিন থেকেছেন কুইন্সের ফ্লাশিংয়ে আমাদের খুব কাছের প্রতিবেশীঅথচ আমরা অনেকে হয়ত জানিই না এই মেয়েটিই একদিন বিশ্ব জয় করেছিল

ট্রুডির বাবা-মা জার্মান ইমিগ্র্যান্ট মায়ের নাম এনা আর বাবা হেনরি। আপার ম্যানহাটনের আমস্টারডাম এভেনিউতে একটি গোশতের দোকান খুলে বসেন হেনরি। কঠোর পরিশ্রম করে কসাই হেনরি ভালোই টাকা পয়সা আয় করেন। দিনটি ছিল সোমবার, ২৩ অক্টোবর ১৯০৫। ১১০ স্ট্রিটের সেইন্ট জন দ্য ডিভাইন গির্জা থেকে ভেসে আসছে সন্ধ্যার ঘণ্টাধ্বনি, আর তখনই বৈদ্যুতিক বাতির আলোকোজ্জ্বল শহর ম্যানহাটনে চোখ মেলে ট্রুডি। খেলাপ্রিয় এবং সৌখিন হেনরি কিছু টাকা জমিয়ে নিউ জার্সির হাইল্যান্ডে পুলসহ একটি কটেজ কিনে ফেলেন ছুটির দিনগুলোতে ছুটে যান সেখানে। তিন বছর বয়সেই ট্রুডির কোমরে দড়ি বেঁধে ওকে নামিয়ে দেন সুইমিং পুলে। মেয়েকে সাঁতার শেখাবেন। ট্রুডিও বুঝে গেল বাবার ইচ্ছে সেই তিন বছর বয়সেই নিখুঁত ছন্দে হাত-পা ছুঁড়তে শুরু করে জলের বুকে।

ক’দিনের মধ্যেই অসুস্থ হয়ে পড়ে ট্রুডি। ভয়ানক হাম ওঠে। সারা গায়ে রাশ, জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে শরীর। মরতে মরতে সে যাত্রা বেঁচে যায় মেয়েটি। কিন্তু প্রচন্ড জ্বরে কমে যায় শ্রবণশক্তি। ডাক্তারের কড়া নিষেধ খবরদার জলে যেওনা, তাহলে চিরদিনের মতো কালা হয়ে যাবে। কিন্তু জল যে ওকে নেশার মতো টানে। যে মেয়ে জলেই বেঁধেছে ঘর, কি করে সে জলকে করে পর?

মাত্র বারো বছর বয়সেই ৮৮০ গজ সাঁতারে নতুন বিশ্বরেকর্ড করে সারা দুনিয়াতে হৈ চৈ ফেলে দেয় ট্রুডি। ট্রুডিই সাঁতারে পৃথিবীর কনিষ্ঠতম বিশ্বরেকর্ডধারীর সম্মান অর্জন করে, যে রেকর্ড আজ অবধি কেউ ভাঙতে পারেনি। এরপর ক্রমাগত এই মেয়ে রেকর্ডের পাহাড় গড়ে তোলে।



ভীষণ জেদি আর লক্ষ্যভেদি মেয়ে ট্রুডি। ফ্রান্স আর ইংল্যান্ডের মাঝখানে শুয়ে থাকা ওই এক চিলতে সমুদ্রকে আজ অবধি জয় করতে পারেনি কোনো নারী। এ হতেই পারে না। পুরুষ পারলে নারীও পারবে। আমিই হবো সেই নারী। যেই কথা সেই কাজ। শুরু হয়ে যায় প্রশিক্ষণ। ইতোমধ্যেই তার ঝুলিতে জমা হয়ে গেছে ২৭টি দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক রেকর্ড, যার মধ্যে ৭টিই বিশ্ব রেকর্ড। একে একে নামগুলো পড়তে থাকে ট্রুডি, ম্যাথু ওয়েব, ব্রিটিশ নাগরিক, ১৮৭৫ সাল, সময় নিয়েছেন ২১ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট। ৩৬ বছর পরে ১৯১১ সালে আরেক ব্রিটিশ নাগরিক থমাস উইলিয়ামস বারগেস, তিনি সময় নেন আরো বেশি, ২২ ঘণ্টা ৩৫ মিনিট। এরপর কেটে যায় এক যুগ, ১৯২৩ সালে প্রথম আমেরিকান সাতারু পার হন ইংলিশ চ্যানেল, তিনি সময় নেন ২৬ ঘণ্টা ৫০ মিনিট। চতুর্থজন ফরাসি নাগরিক এনরিক তিরাবুচি, একই বছর পাড়ি দেন এই উত্তাল সমুদ্র, তিনি ১৬ ঘণ্টা ৩৩ মিনিট সময় নিয়ে নতুন রেকর্ড গড়েন। একই বছর পঞ্চম ব্যক্তি পাড়ি দেন ইংলিশ চ্যানেল, আবারো আমেরিকান নাগরিক, চার্লস টথ, তিনি সময় নেন ১৬ ঘণ্টা ৫৮ মিনিট। এরপর পেরিয়ে গেছে তিন বছর, আর কেউ সেই উত্তাল তরঙ্গে ঝাঁপ দিয়ে বিজয়ীর শিরোপা ধারণ করার সৌভাগ্য অর্জন করেননি।  

অবশেষে এলো সেই মহেন্দ্রক্ষণ। ১৯২৬ সালের ৬ আগস্ট। পৃথিবীর ষষ্ঠ সাঁতারু এবং প্রথম নারী সাঁতারু হিশেবে ফ্রান্সের গ্রি নে থেকে ট্রুডি শুরু করেন তার ঐতিহাসিক যাত্রা। সকাল সাতটা পাঁচ মিনিট। একটু একটু করে বেলা বাড়ছে, আকাশে ক্রমশ মেঘ জমছে। প্রকৃতি আজ বৈরী কেন? প্রকৃতিও কি নারী বিদ্বেষী? সমুদ্র ক্রমশ উত্তাল হয়ে উঠেছে। বিপরীতমুখী ঢেউ এসে ওকে ছুঁড়ে দিচ্ছে পেছনের দিকে। ট্রুডি নাছোড়বান্দা, ওকে যে পারতেই হবে। একুশ বছরের দূরন্ত যৌবন, অফুরন্ত প্রাণশক্তি, লক্ষ ভেদ করার অদম্য ইচ্ছা ওকে সাহস জোগায়। ট্রুডি ক্রমশ এগুতে থাকে। ২১ মাইল জল পাড়ি দিতে ওকে সাঁতরাতে হয় ৩৫ মাইল দূরত্ব, ফুসে ওঠা বৈরী সমুদ্রের কারণে। বোটে করে যেসব নিরাপত্তাকর্মীরা ওকে অনুসরণ করছিলেন তাদের প্রায় সকলেই ঢেউয়ের দুলুনিতে অসুস্থ হয়ে পড়েন। 

১৪ ঘণ্টা ৩০ মিনিট সাঁতার কেটে ইংল্যান্ডের কেন্ট কাউন্টির কিংসডাউন সৈকতের বালু স্পর্শ করে ট্রুডি বলেন, “আমি জানতাম এটা হবে”। ট্রুডি গড়েন এক নতুন বিশ্বরেকর্ড। সারা পৃথিবীর সব মিডিয়া হুমড়ি খেয়ে পড়ে ট্রুডির ওপর। 

৩৩ বছর পর ১৯৫৯ সালে ট্রুডির রেকর্ড ভেঙে নতুন বিশ্ব রেকর্ড গড়েন যিনি তিনিও আরেক নারী সাঁতারু, ভারতীয় নাগরিক আরতি সাহা। এরই মধ্যে আরো ৭ জন ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিলেও কেউই ট্রুডির রেকর্ড ভাংতে পারেন নি। সেই সাতজনের একজন আমাদের ব্রজেন দাশও। এ পর্যন্ত সর্বমোট ২০ জন সাঁতারু ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেন।



ট্রুডি জলকে জয় করেছেন ঠিকই কিন্তু শেষ পর্যন্ত ডাক্তারের কথাই ঠিক হয়। তিনি ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ শ্রবণশক্তি হারিয়ে ফেলেন। প্রেম এবং বিয়ের অসংখ্য প্রস্তাব তিনি প্রত্যাখ্যান করে সারাজীবন একাই কাটিয়ে দেন।

ব্রংকসের উডলন সিমেট্রিতে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন ট্রুডি। ২০০৩ সালের ৩০ নভেম্বর ৯৮ বছর বয়সে তিনি না ফেরার দেশে চলে যান। 

Comments

Popular posts from this blog

অসাধারণ এই শিল্পীর জীবনের গল্প বড় করুণ

  [এই সময়ের অত্যন্ত প্রতিভাবান শিল্পী সারফুদ্দিন আহমেদ। বাড়ি পশ্চিমবঙ্গে। আর্ট কলেজে খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করেন ,  আর শুধু ছবি আঁকেন। নানান মাধ্যমে ,  নানান বিষয়ের ছবি। সারফুদ্দিন আহমেদের ছবি থেকে চোখ ফেরানো যায় না ,  আপনাতেই ওঁর নান্দনিক সৃষ্টিকর্মে দৃষ্টি আটকে যায় ,  কী জল রঙ ,  কী অ্যাক্রিলিক ,  কিংবা স্রেফ পেন্সিলের ড্রয়িং। এই গুণী শিল্পীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কবি কাজী জহিরুল ইসলাম। সাক্ষাৎকারটি এখানে উপস্থাপন করা হলো।]       ভারত আমাকে চোখ দিয়েছে ,  বাংলাদেশ দিয়েছে দৃষ্টি -     সারফুদ্দিন আহমেদ     কাজী জহিরুল ইসলামঃ  ব্যাক গ্রাউন্ডে তবলা বাজছে আপনি ছবি আঁকছেন কাচের ওপর।    এই যে বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে ছবি আঁকা, এই ছন্দটা ছবিতে কিভাবে ধরেন? আর কোনো শিল্পী ছবি  আঁ কার সময় যন্ত্রানুসঙ্গ ব্যবহার করেছেন?   সারফুদ্দিন আহমেদঃ   কাঁচ নয়,   এটি এক বিশেষ ধরনের কাপড়-নেট। এই নেটের উপরে বর্তমানে আমার এক্সপেরিমেন্ট চলছে।    জহিরুলঃ ও ,  ফেইসবুকে যখন ছবিটি দেখি কাচের মতো ...

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জুর সাক্ষাৎকার || অষ্টম পর্ব ||

[লেখক, সাংবাদিক, অনুবাদক আনোয়ার হোসেইন মঞ্জুর সাক্ষাৎকারের অষ্টম  পর্ব আজ প্রকাশ করা হলো। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কবি কাজী জহিরুল ইসলাম।]          দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ বাসস - কে অকার্যকর করেছে  – মঞ্জু    জহিরুলঃ  আপনি ফেলোশিপ নিয়ে দিল্লীতে ছয়মাস ছিলেন, ব্যক্তিগত আগ্রহ এবং পেশাগত অভ্যাসের কারণে কাছে থেকে দেখার/বোঝার চেষ্টা করেছেন ভারতের এবং উপমহাদেশের রাজনীতি। আমরা দেখি ভারতের রাজনীতিতে গায়ক, নায়ক, লেখক, সাংবাদিকের আবির্ভাব ঘটে সব সময়ই এবং তারা রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও রাখেন। বাংলাদেশে এই ধারা খুব সম্প্রতি শুরু হলেও আমাদের জনপ্রিয় খেলোয়াড়, শিল্পীরা নিজেদের অর্থনীতি সমৃদ্ধ করা ছাড়া রাজনীতিতে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেন না। এমন কি ধর্ষণ, অন্যদেশকে ট্রানজিট প্রদান, উপর্যুপরি সড়ক দূর্ঘটনা, পরিবেশ ধ্বংসকারী কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্প ইত্যাদি ইস্যুতেও তারা নীরব। অথচ তাদের জনপ্রিয়তা এবং রাজনীতি সম্পৃক্ততা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত, যা ভারতে দেখা যায়। বিষয়টি যদি আপনার মতো করে ব্যাখ্যা করেন।  মঞ্জুঃ   দিল্লিতে আমার অবস্থানকালকে আমি নানা দিক থ...

কানের কাছে নারী কন্ঠ

  স্বপ্নের ঐশ্বর্য   || কাজী জহিরুল ইসলাম ||   ছুটির দিন। লম্বা সময় ধরে ঘুমাবো। কিন্তু তার আর উপায় নেই। কানের কাছে নারী কন্ঠ। বেশ আত্মবিশ্বাসী কন্ঠ। ক্রমাগ ত  কথা বলে যাচ্ছেন এক অপরিচিতা। আমি লাফ দিয়ে উঠি। কে তিনি ?  আমার স্ত্রী বলেন ,  রুবানা হক ,  শোনো কী বলছেন। রুবানা হক প্রয়াত ব্যবসায়ী আনিসুল হকের স্ত্রী। আমাদের কৈশোর-উত্তীর্ণ কালে আনিসুল হক ছিলেন আমাদের হিরো। টিভি উপস্থাপনায় অন্য এক আধুনিকতা নিয়ে হাজির হন তিনি। এরপর আমরা ধীরে ধীরে তার ব্যবসায়ীক সাফল্য ,  সাংগঠনিক সাফল্য দেখতে দেখতে বড় হই। খুব সাম্প্রতিককালে ,  আনিসুল হকের মৃত্যুর পর ,  কেউ একজন বলেছিলেন ,  তার স্ত্রী রুবানা হকও খুব ভালো কথা বলেন। কিন্তু রুবানা হকের কথা শোনার সৌভাগ্য আমার হয়নি। দুই যুগ ধরে দেশের বাইরে থাকার কারণে এই সময়ে স্টার হয়ে ওঠা অনেকের সম্পর্কেই আমার ভালো ধারণা নেই।  তার কথায় এমন কিছু ছিল যে আমার পক্ষে ঘুমিয়ে থাকা সম্ভব হয়নি। আমি মুক্তিকে বলি ,  প্রথম থেকে দাও ,  পুরো বক্তৃতাটা আমি শুনতে চাই। আমি পরপর দুইবার তার পুরো বক্তব্যটা শুনি ,  ফ...