Skip to main content

প্রবাসী লেখকেরা ঊনলেখক?

 ঊনবাঙাল

|| কাজী জহিরুল ইসলাম || 

  

উড়ে উড়ে স্বপ্নের ডানা কেবল বিস্তৃতই করেছি। পূর্ব ইউরোপ থেকে এশিয়া, এরপর পশ্চিম আফ্রিকা, আবার সেখান থেকে পূর্ব আফ্রিকা, মাঝখানে বেশ ক’বছর পশ্চিম ইউরোপ। রঙিন সুতোয় কতোবার গোল ভূগোলকে যে বাঁধতে চাইলাম। ডানারওতো ক্লান্তি আছে। এবার ডানা গুটিয়ে বসার দিন। দারফুর থেকে খার্তুম, এরপর লন্ডন, স্ত্রী-সন্তানের সাথে একটি রাত কাটিয়েই ফের উড়াল, অতলান্তিক পাড়ি দিয়ে নিউ ইয়র্কে এসে নামি ২০১১ সালের নভেম্বরে। দারফুরের ধুসর মরু থেকে উঠে আসা আদিম মানব এই কসমোপলিটন শহরে বড়ই বেমানান। নাহলে নভেম্বরের শীতে অমন হালকা কোট পরে কেউ হাঁটে? এক সহকর্মী ক্রিসমাসে উপহার দিলো একটি বই, ওতে নিউ ইয়র্কের দু’শ খাবারের দোকানের ঠিকানা আর মেন্যু। এন্ডি হয়ত ভেবে থাকবে দারফুরের মরুতে কিছুই খেতে পায়নি এই আদিম মানব। 


নাহ, নানান দেশের সহকর্মীদের সাথে কাজের গল্প আর কত ভালো লাগে। বাংলায় কথা বলতে চাই। খুঁজতে খুঁজতে বের করতে থাকি বাঙালি সহকর্মীদের। দুপুর বারোটা বাজতে না বাজতেই সবাইকে ফোন করতে থাকি, চলুন একসাথে লাঞ্চে যাই। কেউ বলে, কাজী ভাই, আমি তো বাসা থেকে খাবার নিয়ে আসি। আবার কেউ বলে, আজ আমার অমুকের সাথে বিজনেস লাঞ্চ আছে। দু’জন এগিয়ে এলেন আমার ডাকে, একজন বাহারুল আলম (বাংলাদেশ পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক) অন্যজন তোফায়েল আহমেদ (তখন লে. কর্নেল, এখন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল)। আমরা তিনজন রোজ একসাথে লাঞ্চে যাই। ম্যানহাটনের প্রায় সব রেস্তোরাঁয়ই আমাদের খাওয়া হয়ে গেছে। এখন দূর-দূরান্তে ছুটি, ডাউন-টাউন, আপ-টাউন, নদীর ওপার। আর আমাদের দলও ক্রমশ ভারী হচ্ছে। এখন আর আমরা তিনজন নই, সাত আটজন তো হয়ই, মাঝে মাঝে ১৩/১৪ জনও হয়ে যায়। 

ঠিক করলাম জাতিসংঘ সদর দফতরে যত বাঙালি কাজ করে সবাই মিলে সপ্তাহে একদিন লাঞ্চ করতে যাবো। প্রথমে বৃহস্পতিবারে, পরে কেউ কেউ ফরাসি ভাষা শেখার ক্লাসে যায় বলে, বুধবারে। বুধবার দুপুরে আমরা দল বেঁধে বুধভাত খেতে যাই। টের পাচ্ছি ক্রমশ আমরা সকলেই এই দিনটির জন্য অপেক্ষা করি। আমাদের এই মধ্যহ্নভোজনের বিষয়টি ধীরে ধীরে একটি সাংগঠনিক কাঠামো পাচ্ছে। কেউ একজন বলেই ফেললো কাজী ভাই, এর একটা নাম দেওয়া দরকার। আরো কিছুদিন কেটে গেল এভাবে। এখন আমরা নতুন কেউ এলে তাকে স্বাগত জানাই, কেউ চলে গেলে তার বিদায় অনুষ্ঠান করি। কারো কোনো সাহায্য দরকার হলে সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ি তাকে সাহায্য করতে। এবং এক পর্যায়ে আমার উদ্যোগেই, আমাদের এই বন্ধনের বৃত্ত আরো বড় হয়, ম্যানহাটন থেকে তা টেনে নিয়ে সকলের গৃহ অব্দি পৌঁছে দিই। আমিই একা, আর সকলের তো পরিবার পরিজন নিয়ে সুখের সংসার এখানে। মাঝে মাঝে আমার পরিবার লন্ডন থেকে বেড়াতে আসে, তখন আমাদের পারিবারিক আড্ডাগুলো আরো জমে ওঠে। কি নাম হতে পারে আমাদের এই বন্ধনের। মনে মনে অনেকদিন ভেবে ঠিক করি এর নাম হবে ঊনবাঙাল। বাংলা এবং ইংরেজি, দু’ভাষাতেই এর একটা দারুণ অর্থ আছে। UNOBANGAL মানে হচ্ছে ইউনাইটেড নেশনস অর্গানাইজেশনে যেসব বাঙাল কাজ করে তারা। আর ঊনবাঙাল মানে হচ্ছে যারা একটু কম বাঙাল। কথাটা বিনয় করেই বলা। আমরা ক’জনই বা পুরোপুরি বাঙালি হতে পেরেছি। দু’লাইন লিখতে গেলে ডিকশনারি লাগে, তিনটি বাক্য বলার পরেই সঠিক বাংলা শব্দ খুঁজে পাওয়ার জন্য অন্ধকারে হাতড়াতে থাকি। বেশ ক’বছর পরে, ঊনবাঙাল যখন নিউ ইয়র্কের একটি প্রতিষ্ঠিত সাংস্কৃতিক সংগঠন, বাঙালী পত্রিকার সম্পাদক কৌশিক আহমেদ ভরা মজলিশে এই শব্দটির উচ্ছসিত প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, আমি কত বোকা এবং কত উদ্ধত, পত্রিকার নাম রেখেছি বাঙালি। আর কাজী জহিরুল ইসলাম কত বিনয়ী এবং উদার, নিজেকে বলছেন ঊনবাঙাল। শব্দটি পছন্দ করেন আরো অনেকে। এর মধ্যে বিনয় যেমন আছে, উষ্মাও আছে। বাংলাদেশের প্রায় সকল প্রিন্ট-মিডিয়াই প্রবাসীদের খবরগুলো গুরুত্বহীনভাবে ভেতরের পাতায়, এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়াগুলো সকলে ঘুমিয়ে গেলে মধ্যরাতের পরে, প্রচার করে। বাংলা একাডেমি প্রবাসী লেখকদের জন্য কম মূল্যমানের সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ পুরষ্কারের প্রবর্তন করে নিশ্চিত করেছে প্রাবসী লেখকেরা ঊনলেখক, তো আমরা সেই উষ্মা থেকেই নিজেদের ঊনবাঙাল বলতেই পারি। তবে যারা বোঝার তারা ঠিকই বোঝেন পচা সাবানে কাপড় ভালোই পরিষ্কার হয়। 

Comments

Popular posts from this blog

অসাধারণ এই শিল্পীর জীবনের গল্প বড় করুণ

  [এই সময়ের অত্যন্ত প্রতিভাবান শিল্পী সারফুদ্দিন আহমেদ। বাড়ি পশ্চিমবঙ্গে। আর্ট কলেজে খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করেন ,  আর শুধু ছবি আঁকেন। নানান মাধ্যমে ,  নানান বিষয়ের ছবি। সারফুদ্দিন আহমেদের ছবি থেকে চোখ ফেরানো যায় না ,  আপনাতেই ওঁর নান্দনিক সৃষ্টিকর্মে দৃষ্টি আটকে যায় ,  কী জল রঙ ,  কী অ্যাক্রিলিক ,  কিংবা স্রেফ পেন্সিলের ড্রয়িং। এই গুণী শিল্পীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কবি কাজী জহিরুল ইসলাম। সাক্ষাৎকারটি এখানে উপস্থাপন করা হলো।]       ভারত আমাকে চোখ দিয়েছে ,  বাংলাদেশ দিয়েছে দৃষ্টি -     সারফুদ্দিন আহমেদ     কাজী জহিরুল ইসলামঃ  ব্যাক গ্রাউন্ডে তবলা বাজছে আপনি ছবি আঁকছেন কাচের ওপর।    এই যে বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে ছবি আঁকা, এই ছন্দটা ছবিতে কিভাবে ধরেন? আর কোনো শিল্পী ছবি  আঁ কার সময় যন্ত্রানুসঙ্গ ব্যবহার করেছেন?   সারফুদ্দিন আহমেদঃ   কাঁচ নয়,   এটি এক বিশেষ ধরনের কাপড়-নেট। এই নেটের উপরে বর্তমানে আমার এক্সপেরিমেন্ট চলছে।    জহিরুলঃ ও ,  ফেইসবুকে যখন ছবিটি দেখি কাচের মতো ...

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জুর সাক্ষাৎকার || অষ্টম পর্ব ||

[লেখক, সাংবাদিক, অনুবাদক আনোয়ার হোসেইন মঞ্জুর সাক্ষাৎকারের অষ্টম  পর্ব আজ প্রকাশ করা হলো। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কবি কাজী জহিরুল ইসলাম।]          দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ বাসস - কে অকার্যকর করেছে  – মঞ্জু    জহিরুলঃ  আপনি ফেলোশিপ নিয়ে দিল্লীতে ছয়মাস ছিলেন, ব্যক্তিগত আগ্রহ এবং পেশাগত অভ্যাসের কারণে কাছে থেকে দেখার/বোঝার চেষ্টা করেছেন ভারতের এবং উপমহাদেশের রাজনীতি। আমরা দেখি ভারতের রাজনীতিতে গায়ক, নায়ক, লেখক, সাংবাদিকের আবির্ভাব ঘটে সব সময়ই এবং তারা রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও রাখেন। বাংলাদেশে এই ধারা খুব সম্প্রতি শুরু হলেও আমাদের জনপ্রিয় খেলোয়াড়, শিল্পীরা নিজেদের অর্থনীতি সমৃদ্ধ করা ছাড়া রাজনীতিতে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেন না। এমন কি ধর্ষণ, অন্যদেশকে ট্রানজিট প্রদান, উপর্যুপরি সড়ক দূর্ঘটনা, পরিবেশ ধ্বংসকারী কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্প ইত্যাদি ইস্যুতেও তারা নীরব। অথচ তাদের জনপ্রিয়তা এবং রাজনীতি সম্পৃক্ততা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত, যা ভারতে দেখা যায়। বিষয়টি যদি আপনার মতো করে ব্যাখ্যা করেন।  মঞ্জুঃ   দিল্লিতে আমার অবস্থানকালকে আমি নানা দিক থ...

কানের কাছে নারী কন্ঠ

  স্বপ্নের ঐশ্বর্য   || কাজী জহিরুল ইসলাম ||   ছুটির দিন। লম্বা সময় ধরে ঘুমাবো। কিন্তু তার আর উপায় নেই। কানের কাছে নারী কন্ঠ। বেশ আত্মবিশ্বাসী কন্ঠ। ক্রমাগ ত  কথা বলে যাচ্ছেন এক অপরিচিতা। আমি লাফ দিয়ে উঠি। কে তিনি ?  আমার স্ত্রী বলেন ,  রুবানা হক ,  শোনো কী বলছেন। রুবানা হক প্রয়াত ব্যবসায়ী আনিসুল হকের স্ত্রী। আমাদের কৈশোর-উত্তীর্ণ কালে আনিসুল হক ছিলেন আমাদের হিরো। টিভি উপস্থাপনায় অন্য এক আধুনিকতা নিয়ে হাজির হন তিনি। এরপর আমরা ধীরে ধীরে তার ব্যবসায়ীক সাফল্য ,  সাংগঠনিক সাফল্য দেখতে দেখতে বড় হই। খুব সাম্প্রতিককালে ,  আনিসুল হকের মৃত্যুর পর ,  কেউ একজন বলেছিলেন ,  তার স্ত্রী রুবানা হকও খুব ভালো কথা বলেন। কিন্তু রুবানা হকের কথা শোনার সৌভাগ্য আমার হয়নি। দুই যুগ ধরে দেশের বাইরে থাকার কারণে এই সময়ে স্টার হয়ে ওঠা অনেকের সম্পর্কেই আমার ভালো ধারণা নেই।  তার কথায় এমন কিছু ছিল যে আমার পক্ষে ঘুমিয়ে থাকা সম্ভব হয়নি। আমি মুক্তিকে বলি ,  প্রথম থেকে দাও ,  পুরো বক্তৃতাটা আমি শুনতে চাই। আমি পরপর দুইবার তার পুরো বক্তব্যটা শুনি ,  ফ...