Skip to main content

তিনি একজন ভালো মানুষও


পূরবী দি, একজন ভালো বন্ধু

|| কাজী জহিরুল ইসলাম ||



আমার কেনো এই ধারণা হল জানি না, পূরবী বসু খুব রাগী মানুষ। তাই বিভিন্ন জায়গায় দেখা সাক্ষাৎ হওয়া সত্বেও দিদির সঙ্গে প্রাণ খুলে কথা বলা বা ঘনিষ্ঠ হওয়া হয়ে ওঠেনি। একদিন শামীম আল আমিন তাঁর একাত্তর জার্নাল-এর গল্প বলতে গিয়ে জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত এবং পূরবী বসু দম্পতির কথা বলেন, এবং বলেন যে তাঁরা অত্যন্ত ভালো মানুষ, খুব নরম মনের মানুষ। এর কিছুদিন পরেই সম্ভবত ফেইসবুকে আমার কোনো লেখায় দিদি কমেন্ট করেছিলেন, এবং এরপর ইনবক্সে কিছু কথা হয় এবং আমার সহজ হয়ে ওঠা শুরু। নিউ ইয়র্ক ভিত্তিক টেলিভিশন টিবিএন২৪ বইমেলা নিয়ে একটি লাইভ টক শো করে গতবছর, সঞ্চালক শামীম আল আমিন, আমি ছিলাম অতিথি, ফোনে দূর থেকে যোগ দিয়েছিলেন পূরবী দি। প্রবাসী লেখকদের একাডেমী পুরষ্কারের চেয়ে অপেক্ষাকৃত কম অর্থমূল্যমানের যে সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ পুরস্কার দেইয়া হয় বাংলা একাডেমী থেকে আমি তার বিরোধীতা করি, আমি মনে করি না শান্তনা পুরষ্কারের মতো প্রবাসী লেখকদের জন্য আলাদা একটি পুরস্কার প্রবর্তনের কোনো প্রয়োজন আছে। পূরবী দিও আমার বক্তব্যকে সমর্থন করেন। তখন তাঁকে আমার খুব কাছের মানুষ মনে হয়। এরপর একদিন ভয়ে ভয়ে ফোন করি। প্রথম দিন খুব স্বাভাবিক হতে পারিনি, যদিও দিদির কথা খুব বন্ধুসুলভ ছিল। ওই যে মাথায় ঢুকে গেছে, তিনি খুব রাগী মানুষ। এক পর্যায়ে জানতে পারি তিনি ব্র্যাক-এ কাজ করেছেন, উপ-আনুষ্ঠানিক প্রাথমিক শিক্ষা কর্মসূচীর পরিচালক ছিলেন। এটা জানার পর তাঁকে আরেক দফা কাছের মানুষ মনে হয়। কারণ আমিও একসময় ব্র্যাক-এ কাজ করেছি। জানতে চেয়েছিলাম মাঝে মাঝে ফোন করলে বিরক্ত হবেন কিনা এবং কোন সময় ফোন করলে ভালো হয়। উত্তরে তিনি বলেন, বিরক্ত হওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না, বরং খুব খুশি হবো, আর যখন খুশি ফোন করবেন, আমি এবং জ্যোতি সব সময় ফ্রি থাকি। কী আশ্চর্য, এমন একজন মানুষ সম্পর্কে আমার এই ‘রাগী মানুষ’ জাতীয় ভুল ধারণা কেমন করে হলো। সেই থেকে পূরবী দি হয়ে ওঠেন আমার শিল্প-সাহিত্যের একজন আপনজন। আমরা প্রায় রোজই ফোনে কথা বলতে শুরু করি। দিদি ফোন করেই জিজ্ঞেস করেন, নতুন কি লিখলেন? এই প্রশ্নটি একজন অগ্রজ লেখকের কাছ থেকে আসা যে কতখানি গুরুত্বপূর্ণ তা লেখক মাত্রই বুঝবেন। পরদিন ফোন করার আগে কিছু একটা লিখতে হবে এই তাগিদ আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। আমি নতুন কিছু লিখেই দিদিকে ইমেইলে পাঠিয়ে দিই, তিনি তা পড়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে মন্তব্য লিখে পাঠান। একদিন মন্তব্য দিতে দেরী হয়েছিল, তিনি তাঁর গুরুতর অসুস্থ ভগ্নীপতিকে দেখতে হাসপাতালে গিয়েছিলেন, সেখান থেকে আমাকে ফোন করে জানালেন, আমি হাসপাতালে তাই মন্তব্য লিখতে দেরী হচ্ছে, আমি পড়েছি লেখাটা। লেখার কমেন্ট দেয়া বা ইমেইলের জবাব দেয়ার এই যে দায়িত্বশীলতা তিনি অনুভব করেন, এটা আমাকে বিস্মিত করে।
 

তিনি নতুন কিছু লিখলেও আমাকে ইমেইলে পাঠিয়ে দেন, আমিও আমার মতামত জানিয়ে তাঁকে ইমেইল পাঠাই। আমাদের এই ইমেইল বিনিময় নিয়মিত চলতে থাকে এবং এখনও চলছে। এই যে আমরা পরস্পরের লেখা নিয়ে মন্তব্য করি এ-শুধু উৎসাহমূলক নয়, শুধু প্রশংসামূলক নয়, সাহিত্যের প্রকৃত আলোচনা যা হওয়া উচিত ঠিক সেটাই আমরা করি। দিদি যেমন নির্মম এবং নির্মোহ থেকে আমার লেখার সমালোচনা করেন, আমিও তাঁকে অনুসরণ করি। এতে করে আমাদের মধ্যে সাহিত্যিক-বন্ধুত্ব ক্রমশ প্রগাঢ় হতে থাকে। গত বইমেলায় আমি হুমায়ূন আহমেদের ভাষায় একটি উপন্যাস লিখি, থাবড়া হামিদ। প্রকাশককে পাঠানোর আগেই আমি পূরবী দি-কে পড়তে দিই, তিনি শুধু পড়েনই না বই ছাপা হওয়ার আগেই এর রিভিউ লিখে ফেলেন। পরে, বইটি ছাপা হয়ে গেলে, লেখাটি বিডিনিউজে তিনি ছাপতে দেন।



পূরবী দি-কে আমি যতটুকু চিনেছি তিনি একজন নারীবাদী মানুষ। নারীর অধিকারের বিষয়ে ভীষণ সচেতন। সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেক অচেনা নারীর পক্ষ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি অনেকের গালাগাল খেয়েছেন কিন্তু তার অবস্থান থেকে সরে দাঁড়াননি। আমি সব সময় বলি, ধর্মকে বাতিল করে দিয়ে সেক্যুলারিজম হয় না। সকল কিছুকে ধারণ করতে পারাই সেক্যুলারিজম। পুরবী দিকেও দেখি কাউকেই তিনি বাতিল করে দেন না। মতের অমিল তো হবেই এবং এই অমিল তিনি খুব স্পষ্ট করে প্রকাশও করেন কিন্তু ব্যক্তিগত সম্পর্কের কোনো ক্ষতি এতে হয় না, অন্তত তাঁর দিক থেকে। এই হচ্ছে পূরবী দি এবং আমিও তাই। কাজেই নানান বিষয়ে মতের অমিল নিয়ে তাঁর সঙ্গে খুব খোলামেলা আলোচনা করতে পারি। আমার জন্য এমন একজন মানুষের সান্নিধ্য পাওয়া খুব বড় সৌভাগ্য। কারণ আমি সত্য প্রকাশে অকপট থাকতে চাই। কিন্তু বন্ধু হারাতে চাই না। অথচ সেই পরিবেশ বিরল। 

দিদি খুব সুন্দর করে গুছিয়ে কথা বলেন অথচ সব সময় বলেন, আমাকে মঞ্চে ডাকবেন না, আমি কথা বলতে পারি না। আমরা দুমাস আগে পাঠকের পাতায় জ্যোতি দা’র ছোটো উপন্যাস নিয়ে আলোচনা করেছি। সেই অনুষ্ঠানে দিদি এতো সুন্দর করে গুছিয়ে কথা বলেছেন, আমার মনে হয়েছে সেটিই ছিল ওই অনুষ্ঠানের সবচেয়ে শ্রুতিমধুর বক্তব্য। 

বাংলা সাহিত্যে তাঁর অনেক গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। ‘কিংবদন্তীর খনা ও খনার বচন’ নামে তিনি যে বইটা লিখেছেন সেটি খুব উল্লেখযোগ্য একটি কাজ। এছাড়া ‘আত্মপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামে বাংলার নারী’, ‘প্রাচ্যে পুরাতন নারী’, ‘সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী নারী’ ‘ছোটদের বেগম রোকেয়া’ ‘নারী ভাবনা’ প্রভৃতি মননশীল সাহিত্য তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদান। এ ছাড়াও তিনি বেশ কিছু গল্প লিখেছেন। তাঁর ভাষা সহজ কিন্তু সেই সহজ ভাষা ঢুকে পড়ে জীবনের খুব গভীরে। সাহিত্যের ভাষা নির্বাচনে তাঁর অবস্থান জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের পুরো বিপরীতে। জ্যোতি দা’র গদ্য যেমন দূর্ভেদ্য প্রাচীর দিয়ে ঘেরা, পুরবী দি’র গদ্য এক খোলা দরোজা, অনুপ্রবেশের আমন্ত্রণ। ড. পূরবী বসু নিজেই বলেন, আমি আপ্রাণ চেষ্টা করি আমার সাহিত্য যেন সাধারণ মানুষের কাছে সহজবোধ্য হয়ে ওঠে, যেনো সকলেই পড়তে পারে, বুঝতে পারে। 

পূরবী দি শুধু একজন ভালো লেখকই নন, আমার দেখা একজন ভালো মানুষ, একজন ভালো বন্ধু।             

Comments

Popular posts from this blog

অসাধারণ এই শিল্পীর জীবনের গল্প বড় করুণ

  [এই সময়ের অত্যন্ত প্রতিভাবান শিল্পী সারফুদ্দিন আহমেদ। বাড়ি পশ্চিমবঙ্গে। আর্ট কলেজে খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করেন ,  আর শুধু ছবি আঁকেন। নানান মাধ্যমে ,  নানান বিষয়ের ছবি। সারফুদ্দিন আহমেদের ছবি থেকে চোখ ফেরানো যায় না ,  আপনাতেই ওঁর নান্দনিক সৃষ্টিকর্মে দৃষ্টি আটকে যায় ,  কী জল রঙ ,  কী অ্যাক্রিলিক ,  কিংবা স্রেফ পেন্সিলের ড্রয়িং। এই গুণী শিল্পীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কবি কাজী জহিরুল ইসলাম। সাক্ষাৎকারটি এখানে উপস্থাপন করা হলো।]       ভারত আমাকে চোখ দিয়েছে ,  বাংলাদেশ দিয়েছে দৃষ্টি -     সারফুদ্দিন আহমেদ     কাজী জহিরুল ইসলামঃ  ব্যাক গ্রাউন্ডে তবলা বাজছে আপনি ছবি আঁকছেন কাচের ওপর।    এই যে বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে ছবি আঁকা, এই ছন্দটা ছবিতে কিভাবে ধরেন? আর কোনো শিল্পী ছবি  আঁ কার সময় যন্ত্রানুসঙ্গ ব্যবহার করেছেন?   সারফুদ্দিন আহমেদঃ   কাঁচ নয়,   এটি এক বিশেষ ধরনের কাপড়-নেট। এই নেটের উপরে বর্তমানে আমার এক্সপেরিমেন্ট চলছে।    জহিরুলঃ ও ,  ফেইসবুকে যখন ছবিটি দেখি কাচের মতো ...

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জুর সাক্ষাৎকার || অষ্টম পর্ব ||

[লেখক, সাংবাদিক, অনুবাদক আনোয়ার হোসেইন মঞ্জুর সাক্ষাৎকারের অষ্টম  পর্ব আজ প্রকাশ করা হলো। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কবি কাজী জহিরুল ইসলাম।]          দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ বাসস - কে অকার্যকর করেছে  – মঞ্জু    জহিরুলঃ  আপনি ফেলোশিপ নিয়ে দিল্লীতে ছয়মাস ছিলেন, ব্যক্তিগত আগ্রহ এবং পেশাগত অভ্যাসের কারণে কাছে থেকে দেখার/বোঝার চেষ্টা করেছেন ভারতের এবং উপমহাদেশের রাজনীতি। আমরা দেখি ভারতের রাজনীতিতে গায়ক, নায়ক, লেখক, সাংবাদিকের আবির্ভাব ঘটে সব সময়ই এবং তারা রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও রাখেন। বাংলাদেশে এই ধারা খুব সম্প্রতি শুরু হলেও আমাদের জনপ্রিয় খেলোয়াড়, শিল্পীরা নিজেদের অর্থনীতি সমৃদ্ধ করা ছাড়া রাজনীতিতে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেন না। এমন কি ধর্ষণ, অন্যদেশকে ট্রানজিট প্রদান, উপর্যুপরি সড়ক দূর্ঘটনা, পরিবেশ ধ্বংসকারী কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্প ইত্যাদি ইস্যুতেও তারা নীরব। অথচ তাদের জনপ্রিয়তা এবং রাজনীতি সম্পৃক্ততা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত, যা ভারতে দেখা যায়। বিষয়টি যদি আপনার মতো করে ব্যাখ্যা করেন।  মঞ্জুঃ   দিল্লিতে আমার অবস্থানকালকে আমি নানা দিক থ...

কানের কাছে নারী কন্ঠ

  স্বপ্নের ঐশ্বর্য   || কাজী জহিরুল ইসলাম ||   ছুটির দিন। লম্বা সময় ধরে ঘুমাবো। কিন্তু তার আর উপায় নেই। কানের কাছে নারী কন্ঠ। বেশ আত্মবিশ্বাসী কন্ঠ। ক্রমাগ ত  কথা বলে যাচ্ছেন এক অপরিচিতা। আমি লাফ দিয়ে উঠি। কে তিনি ?  আমার স্ত্রী বলেন ,  রুবানা হক ,  শোনো কী বলছেন। রুবানা হক প্রয়াত ব্যবসায়ী আনিসুল হকের স্ত্রী। আমাদের কৈশোর-উত্তীর্ণ কালে আনিসুল হক ছিলেন আমাদের হিরো। টিভি উপস্থাপনায় অন্য এক আধুনিকতা নিয়ে হাজির হন তিনি। এরপর আমরা ধীরে ধীরে তার ব্যবসায়ীক সাফল্য ,  সাংগঠনিক সাফল্য দেখতে দেখতে বড় হই। খুব সাম্প্রতিককালে ,  আনিসুল হকের মৃত্যুর পর ,  কেউ একজন বলেছিলেন ,  তার স্ত্রী রুবানা হকও খুব ভালো কথা বলেন। কিন্তু রুবানা হকের কথা শোনার সৌভাগ্য আমার হয়নি। দুই যুগ ধরে দেশের বাইরে থাকার কারণে এই সময়ে স্টার হয়ে ওঠা অনেকের সম্পর্কেই আমার ভালো ধারণা নেই।  তার কথায় এমন কিছু ছিল যে আমার পক্ষে ঘুমিয়ে থাকা সম্ভব হয়নি। আমি মুক্তিকে বলি ,  প্রথম থেকে দাও ,  পুরো বক্তৃতাটা আমি শুনতে চাই। আমি পরপর দুইবার তার পুরো বক্তব্যটা শুনি ,  ফ...