পূরবী দি, একজন ভালো বন্ধু
|| কাজী জহিরুল ইসলাম ||
তিনি নতুন কিছু লিখলেও আমাকে ইমেইলে পাঠিয়ে দেন, আমিও আমার মতামত জানিয়ে তাঁকে ইমেইল পাঠাই। আমাদের এই ইমেইল বিনিময় নিয়মিত চলতে থাকে এবং এখনও চলছে। এই যে আমরা পরস্পরের লেখা নিয়ে মন্তব্য করি এ-শুধু উৎসাহমূলক নয়, শুধু প্রশংসামূলক নয়, সাহিত্যের প্রকৃত আলোচনা যা হওয়া উচিত ঠিক সেটাই আমরা করি। দিদি যেমন নির্মম এবং নির্মোহ থেকে আমার লেখার সমালোচনা করেন, আমিও তাঁকে অনুসরণ করি। এতে করে আমাদের মধ্যে সাহিত্যিক-বন্ধুত্ব ক্রমশ প্রগাঢ় হতে থাকে। গত বইমেলায় আমি হুমায়ূন আহমেদের ভাষায় একটি উপন্যাস লিখি, থাবড়া হামিদ। প্রকাশককে পাঠানোর আগেই আমি পূরবী দি-কে পড়তে দিই, তিনি শুধু পড়েনই না বই ছাপা হওয়ার আগেই এর রিভিউ লিখে ফেলেন। পরে, বইটি ছাপা হয়ে গেলে, লেখাটি বিডিনিউজে তিনি ছাপতে দেন।
পূরবী দি-কে আমি যতটুকু চিনেছি তিনি একজন নারীবাদী মানুষ। নারীর অধিকারের বিষয়ে ভীষণ সচেতন। সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেক অচেনা নারীর পক্ষ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি অনেকের গালাগাল খেয়েছেন কিন্তু তার অবস্থান থেকে সরে দাঁড়াননি। আমি সব সময় বলি, ধর্মকে বাতিল করে দিয়ে সেক্যুলারিজম হয় না। সকল কিছুকে ধারণ করতে পারাই সেক্যুলারিজম। পুরবী দিকেও দেখি কাউকেই তিনি বাতিল করে দেন না। মতের অমিল তো হবেই এবং এই অমিল তিনি খুব স্পষ্ট করে প্রকাশও করেন কিন্তু ব্যক্তিগত সম্পর্কের কোনো ক্ষতি এতে হয় না, অন্তত তাঁর দিক থেকে। এই হচ্ছে পূরবী দি এবং আমিও তাই। কাজেই নানান বিষয়ে মতের অমিল নিয়ে তাঁর সঙ্গে খুব খোলামেলা আলোচনা করতে পারি। আমার জন্য এমন একজন মানুষের সান্নিধ্য পাওয়া খুব বড় সৌভাগ্য। কারণ আমি সত্য প্রকাশে অকপট থাকতে চাই। কিন্তু বন্ধু হারাতে চাই না। অথচ সেই পরিবেশ বিরল।
দিদি খুব সুন্দর করে গুছিয়ে কথা বলেন অথচ সব সময় বলেন, আমাকে মঞ্চে ডাকবেন না, আমি কথা বলতে পারি না। আমরা দুমাস আগে পাঠকের পাতায় জ্যোতি দা’র ছোটো উপন্যাস নিয়ে আলোচনা করেছি। সেই অনুষ্ঠানে দিদি এতো সুন্দর করে গুছিয়ে কথা বলেছেন, আমার মনে হয়েছে সেটিই ছিল ওই অনুষ্ঠানের সবচেয়ে শ্রুতিমধুর বক্তব্য।
বাংলা সাহিত্যে তাঁর অনেক গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। ‘কিংবদন্তীর খনা ও খনার বচন’ নামে তিনি যে বইটা লিখেছেন সেটি খুব উল্লেখযোগ্য একটি কাজ। এছাড়া ‘আত্মপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামে বাংলার নারী’, ‘প্রাচ্যে পুরাতন নারী’, ‘সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী নারী’ ‘ছোটদের বেগম রোকেয়া’ ‘নারী ভাবনা’ প্রভৃতি মননশীল সাহিত্য তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদান। এ ছাড়াও তিনি বেশ কিছু গল্প লিখেছেন। তাঁর ভাষা সহজ কিন্তু সেই সহজ ভাষা ঢুকে পড়ে জীবনের খুব গভীরে। সাহিত্যের ভাষা নির্বাচনে তাঁর অবস্থান জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের পুরো বিপরীতে। জ্যোতি দা’র গদ্য যেমন দূর্ভেদ্য প্রাচীর দিয়ে ঘেরা, পুরবী দি’র গদ্য এক খোলা দরোজা, অনুপ্রবেশের আমন্ত্রণ। ড. পূরবী বসু নিজেই বলেন, আমি আপ্রাণ চেষ্টা করি আমার সাহিত্য যেন সাধারণ মানুষের কাছে সহজবোধ্য হয়ে ওঠে, যেনো সকলেই পড়তে পারে, বুঝতে পারে।
পূরবী দি শুধু একজন ভালো লেখকই নন, আমার দেখা একজন ভালো মানুষ, একজন ভালো বন্ধু।


Comments
Post a Comment