Skip to main content

এক সঙ্গে গাঁজা খেতে খেতে রাজা হয়ে উঠছিলাম

পিয়াল ও অন্যান্য বন্ধু

|| কাজী জহিরুল ইসলাম || 


 

 

৩৫ বছর পর টেলিফোনে বাদলের কণ্ঠ শুনে চমকে উঠি

পেনফ্রেণ্ড ধারণাটি ও-ই আমাকে দিয়েছিল

ওর জার্মান মেয়েবন্ধুরা কী দারুণ সব কার্ড পাঠাতো ওকে!

বাদল জানায়আমাদের বন্ধু পিয়াল এখন অন্ধ

দূরারোগ্য গ্লুকোমার অসুখে ওর দুটো চোখই নষ্ট হয়ে গেছে।

 

বিকেলের লাল আকাশকে ব্যাকড্রপের মতো পেছনে রেখে 

সন্ধ্যারেখার ওপর দাঁড়িয়ে শার্ল বোদলেয়ার পড়তে পড়তে 

আশির দশকে কী তরঙ্গই না তুলেছিল পিয়াল।

ওর সৌম্যকান্তি মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবতাম,

ফরাসিরা কী এর চেয়ে ভালো উচ্চারণে বোদলেয়ার পড়ে!

 

আমরা এক সঙ্গে গাঁজা খেতে খেতে রাজা হয়ে উঠছিলাম 

আর পরিণত যৌবনের দিকে হাঁটছিলাম

টিটুপিয়ালমুজিববুলবুল আরো ক'জন। 

বুলবুল ঠিকই রাজা হয়ে গেলও এখন গানের রাজাবাদশাহ বুলবুল,

শাহজাদা যেত ভিন্ন গাঁজার আসরে 

ওর বাবা কবি আমিনুল হক আনওয়ার আমাদের বন্ধু ছিলেন বলেই 

আমাদের সাথে বসতো না।

 

কিছুদিনের মধ্যেই গাঁজা ছেড়ে ফেনসিডিলের বাদশাহ হয়ে ওঠে শাহজাদা,

কতটা ফেনসিডিল ও গিলেছিল কে জানে

কিন্তু ফেনসিডিল ওকে পুরোপুরিই গিলে ফেলে

এবং একদিন শাহজাদা দূরের নক্ষত্র হয়ে যায়...

 

গাঁজার ধোঁয়ার ভেতর মুজিবের শুষ্ক ঠোঁটজোড়া হঠাৎ নড়ে ওঠতো,

"কি করি বলো তোবিপাশা এবং শমী দুজনই পাগল হয়ে গেছে

আমি তো কাউকেই কষ্ট দিতে পারবো না"

ধীরে ধীরে শো বিজের সব সেলিব্রিটি নায়িকাই 

আমাদের গাঁজার আসরে ছুটে আসে

মুজিবকে জড়িয়ে ধরেচুমু খায়...

এরপর ও পাড়ি দেয় কাঁটাতার

মাধুরি দিক্ষিতের ডাকে ছুটে যায় মুম্বাই

আর ফিরে আসেনি মুজিব

গাঁজার আসরের বিশ্বপ্রেমিক,

আমাদের বন্ধু মুজিব 

চিরকালের মতো হারিয়ে গেল...

 

একদিন হঠাৎ টিএসসিতে দাঁড়িয়ে 

হ্যান্ডশেক করার জন্য আমার দিকে হাত বাড়ায় পিয়াল

আমি ওর হাত ধরতেই বলে, "জ্যঁ সুই আহা পিয়াল।"

আমি ফ্যালফ্যাল করে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি।

পিয়াল বলেবুঝলি নাআহসান হাবীব পিয়ালসংক্ষেপে আহা পিয়াল।

আমি বার দুয়েক মন্ত্রের মতো উচ্চারণ করিআহা পিয়াল।

 

'বুদ্ধদেব বসুর অনুবাদগুলো ভুলে ভরা'

এ-কথা বলেই পিয়াল ওর নিজের বাংলায় বোদলেয়ার পড়তে থাকে

আর বোদলেয়ারকেই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কবি বলে ঘোষণা করে।

যেদিন গুলশান লেককে পেছনে ফেলে বাড্ডায়

জিয়াউদ্দিন সাহেবের গলির মোড়েপান-সিগারেটের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে 

গোল্ডলিফের ফিল্টারে নাক ঘষে ঘ্রাণ শুকছিল,

আর দোকানি ছেলেটিকে বলছিল

"তোমাদের জন্য করুণা হয়তোমরা রাজার কাছে সিগারেটের পয়সা চাও"

তখনই টের পাইপিয়াল রাজা হয়ে গেছে।

 

বেশ ক'বছর পিয়ালকে পাবনায়ও থাকতে হয়

নীপা নামের একটি মেয়ের প্রেমে পড়ে ওমেয়েটি উত্তরায় থাকতো

নীপাকে ও একদিন জসীম উদদীন পরিষদের সাহিত্য সভায়ও নিয়ে আসে

অন্য একদিন নিয়ে আসে ওর বন্ধু মাহিদুল ইসলামকে।

মাহী এখন মস্ত বড় এক আবৃত্তিশিল্পীকত কত ফ্যান ওর;

নীপা ইওরোপেটেমসের তীরে দীঘল কেশগুচ্ছ উড়িয়ে হাঁটছে কারো হাত ধরে

যে চুলের জন্য একদা পিয়াল আওড়াত 

'এশিয়ার শ্লথবিলাসদীপ্তি আফ্রিকার/ সুদূর জগৎ অনুপস্থিতলুপ্তপ্রায়/ 

গন্ধগহন সেই অরণ্যে প্রাণ আমার'

 

আমার বন্ধু পিয়াল রাজা হতে চেয়েছিল,

খুব ঘটা করে অভিষেক হবে রাজারজন মেজর আসবেআসবে বুশগর্বাচেভ

কত কত পরিকল্পণা ওর…  

 

অন্ধ পিয়াল এখন নির্জন প্রকোষ্ঠের দেয়াল হাতড়ে খোঁজে ওর রাজ্যের সীমানা।

 

একদিন মানসিক হাসপাতালে পিয়ালকে দেখতে যায় ওর মা,

রাজমাতাকে কুর্নিশ জানাতে স্রোতের মতো ছুটে আসে পাগলের দল

পাশে দাঁড়ানো জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার দিকে আঙুল তুলে হাসতে হাসতে বলে পিয়াল,

'তোমাদের রাজভ্রাতার সম্মান দিতে চেয়েছিলামতোমরা তা নিলে না'

তখন

শেষ আশির সেই দিনগুলোতে 

ওর রাসপুটিনের মতো লম্বা দাড়ির দিকে তাকিয়ে 

কতো হেসেছি আমরা,

'শালানিপাকে না পেয়ে ভং ধরেছিস?' 

পিয়াল তখন গলাটাকে খাদে নামিয়ে আওড়াত

'সিসিফাসতোর সাহসের সর্বস্ব হার মানে এই বিরাট বোঝার কাছে!'

 

জীবন এখন এক বিরাট বোঝা

পৃথিবীর সব আলো নিভে গেছে

এই দিনের জন্যই কি 

তুই আমাদের আগে ভাগেই শিখিয়ে দিয়েছিলি তোর নতুন নাম

আহা পিয়াল?

 

হলিসউডনিউইয়র্ক। ১৯ আগস্ট ২০২০।

Comments

Popular posts from this blog

অসাধারণ এই শিল্পীর জীবনের গল্প বড় করুণ

  [এই সময়ের অত্যন্ত প্রতিভাবান শিল্পী সারফুদ্দিন আহমেদ। বাড়ি পশ্চিমবঙ্গে। আর্ট কলেজে খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করেন ,  আর শুধু ছবি আঁকেন। নানান মাধ্যমে ,  নানান বিষয়ের ছবি। সারফুদ্দিন আহমেদের ছবি থেকে চোখ ফেরানো যায় না ,  আপনাতেই ওঁর নান্দনিক সৃষ্টিকর্মে দৃষ্টি আটকে যায় ,  কী জল রঙ ,  কী অ্যাক্রিলিক ,  কিংবা স্রেফ পেন্সিলের ড্রয়িং। এই গুণী শিল্পীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কবি কাজী জহিরুল ইসলাম। সাক্ষাৎকারটি এখানে উপস্থাপন করা হলো।]       ভারত আমাকে চোখ দিয়েছে ,  বাংলাদেশ দিয়েছে দৃষ্টি -     সারফুদ্দিন আহমেদ     কাজী জহিরুল ইসলামঃ  ব্যাক গ্রাউন্ডে তবলা বাজছে আপনি ছবি আঁকছেন কাচের ওপর।    এই যে বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে ছবি আঁকা, এই ছন্দটা ছবিতে কিভাবে ধরেন? আর কোনো শিল্পী ছবি  আঁ কার সময় যন্ত্রানুসঙ্গ ব্যবহার করেছেন?   সারফুদ্দিন আহমেদঃ   কাঁচ নয়,   এটি এক বিশেষ ধরনের কাপড়-নেট। এই নেটের উপরে বর্তমানে আমার এক্সপেরিমেন্ট চলছে।    জহিরুলঃ ও ,  ফেইসবুকে যখন ছবিটি দেখি কাচের মতো ...

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জুর সাক্ষাৎকার || অষ্টম পর্ব ||

[লেখক, সাংবাদিক, অনুবাদক আনোয়ার হোসেইন মঞ্জুর সাক্ষাৎকারের অষ্টম  পর্ব আজ প্রকাশ করা হলো। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কবি কাজী জহিরুল ইসলাম।]          দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ বাসস - কে অকার্যকর করেছে  – মঞ্জু    জহিরুলঃ  আপনি ফেলোশিপ নিয়ে দিল্লীতে ছয়মাস ছিলেন, ব্যক্তিগত আগ্রহ এবং পেশাগত অভ্যাসের কারণে কাছে থেকে দেখার/বোঝার চেষ্টা করেছেন ভারতের এবং উপমহাদেশের রাজনীতি। আমরা দেখি ভারতের রাজনীতিতে গায়ক, নায়ক, লেখক, সাংবাদিকের আবির্ভাব ঘটে সব সময়ই এবং তারা রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও রাখেন। বাংলাদেশে এই ধারা খুব সম্প্রতি শুরু হলেও আমাদের জনপ্রিয় খেলোয়াড়, শিল্পীরা নিজেদের অর্থনীতি সমৃদ্ধ করা ছাড়া রাজনীতিতে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেন না। এমন কি ধর্ষণ, অন্যদেশকে ট্রানজিট প্রদান, উপর্যুপরি সড়ক দূর্ঘটনা, পরিবেশ ধ্বংসকারী কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্প ইত্যাদি ইস্যুতেও তারা নীরব। অথচ তাদের জনপ্রিয়তা এবং রাজনীতি সম্পৃক্ততা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত, যা ভারতে দেখা যায়। বিষয়টি যদি আপনার মতো করে ব্যাখ্যা করেন।  মঞ্জুঃ   দিল্লিতে আমার অবস্থানকালকে আমি নানা দিক থ...

শিল্পী কাজী রকিবের সাক্ষাৎকার || পর্ব ২ ||

 'কাজের ছেলে মন্তাজ ছিলো আমার প্রথম আর্ট শিক্ষক'   [কাজী রকিব বাংলাদেশের একজন গুণী শিল্পী। রাজশাহী আর্ট কলেজের একজন প্রতিষ্ঠাতা-শিক্ষক। কলেজের প্রথম ক্লাসটি নেবার কৃতিত্বও তার। নিরন্তর ছবি আঁকেন। নানান মাধ্যমে ,  নানান ভাবনার ছবি। বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউয়য়র্কে সস্ত্রীক বসবাস। তার স্ত্রী মাসুদা কাজীও একজন গুণী শিল্পী। বৈচিত্রপ্রিয় এই শিল্পীর একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন কবি কাজী জহিরুল ইসলাম। ধারাবাহিকভাবে তা এখানে প্রকাশ করা হবে। আজ উপস্থাপন করা হলো দ্বিতীয় পর্ব।] পর্ব – ২    জহিরুলঃ  আপনার জন্ম এবং বেড়ে ওঠার গল্প শুনতে চাই। পারিবারিক ,  প্রাকৃতিক ,  সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশ কেমন ছিল ,  শৈশব-কৈশোরে ? রকিবঃ   আমার জন্ম চট্টগ্রামের আসকার দীঘির পূব-দখিন পাড়ে ,  ৮৮ হেমসেন লেনে। বাঁশের বেড়ার ঘর উপরে টিনের চালা। দুই কামড়ার ঘর ,  সামনে বারান্দা এক চিলতে। পেছনে একটু ফাঁকা জায়গা তারপর রান্নাঘর। ঐ একটু ফাঁকা জায়গা ছোট বেলায় উঠান মনে হতো। সকালে মা রুটি বানাতেন ,  আব্বা রুটি ছি ঁ ড়ে কাককে খাওয়াতেন ,  কিছু কাক বারবা...