তাইওয়ানের কষ্ট
|| কাজী জহিরুল ইসলাম ||
নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটন। ৪৭ নম্বর সড়কের যে অংশটি প্রথম এবং দ্বিতীয় অ্যাভেনিউকে যুক্ত করেছে, এর নাম দ্যাগ হ্যামারশোল্ড প্লাজা। এটিকে মিনি ট্রাফেল্গার স্কয়ারও বলা যায়। পৃথিবীর সকল স্বাধীনতাকামী মানুষ এসে জড়ো হয় এই জায়গাটিতে। সামনেই জাতিসংঘ সদর দফতর, নির্বাক দাঁড়িয়ে আছে ইস্ট নদীর পাড়ে। ম্যাচবাক্সের মতো উঁচু দালানটির দিকে মুখ করে রোজই কোনো না কোনো পরাধীন জাতি মুষ্ঠি ছুঁড়ে চিৎকার করতে থাকে। সকলেই যে আক্ষরিক অর্থে পরাধীন তা নয়, কেউ কেউ স্বাধীন দেশে পরাধীন জীবন যাপন করছেন কোনো সামরিক জান্তার অধীনে, কেউ হচ্ছেন সাম্প্রদায়িক সহিংসতার শিকার। আজ ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, শুক্রবার, এখানে জড়ো হয়েছে তাইওয়ানের একদল মধ্যবয়স্ক মানুষ। চীনে ভাষায় গান গাইছেন এক হেলে পড়া বিকেল-পুরুষ, সামনে ৫০/৬০ জন, সকলেই ষাটোর্ধ, নিস্প্রভ চোখ, প্রত্যেকের হাতে হাতে জাতিসংঘের নীল পতাকা, দুলছে ছন্দের তালে তালে। পতাকায় লেখা ‘তাইওয়ানের পক্ষে জাতিসংঘ’। অর্থাৎ, তাইওয়ানের দিকে তাকাও জাতিসংঘ, দেখো, পূর্ণ স্বাধীন দেশের মর্যাদার জন্য আমরা আমাদের দীর্ঘ জীবনকে বার্ধক্যের ঘাটে এনে বেঁধেছি। জানি না কি বুঝলেন, আমি এগিয়ে যেতেই আয়োজকদের একজন দৌড়ে ছুটে এলেন, একজন একটি কাগজ ধরিয়ে দিলেন, যিনি কিছুটা ইংরেজি জানেন, অতি বিনয়ের সাথে ওদের এখানে উপস্থিত হবার কারণ ব্যাখ্যা করতে লাগলেন। ছয় পৃষ্ঠার যে ফ্লায়ারটি আমার হাতে তুলে দিলেন, ওর প্রথম পাতায় বড় করে লেখা, জাতিসংঘে যোগ দিতে চায় তাইওয়ান। কি সুন্দর শৈল্পিকভাবে চীনের কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে তাঁদের সত্যিকারের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছে। জাতিসংঘে যোগ দিতে চায় অর্থই হচ্ছে চীনের রাহুগ্রাস থেকে মুক্তি চায়, কারণ স্বাধীন দেশ ছাড়া কেউ জাতিসংঘের সদস্য হতে পারে না।
সুনির্দিষ্ট পাঁচটি পয়েন্ট লিখে তাইওয়ানের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির দাবী তুলে ধরা হয়েছে ফ্লায়ারে। পয়েন্টগুলো হচ্ছে, ১. তাইওয়ান একটি গণতন্ত্রমনা স্বাধীন দেশ, যার মাথাপিছু আয় পৃথিবীর সর্বোচ্চ ২২ তম, $২৪,৩৩৭ ডলার এবং আমাদের রয়েছে পৃথিবীর সেরা ২০০ টি হাসপাতাল। ২. তাইওয়ানের মানুষ বিশ্বমানবিক কর্মকান্ডে অবদান রাখতে চায়। তাইওয়ানের জনগণ জাতিসংঘে যোগ দিতে চায়, বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থায় যোগ দিতে চায়, বিশ্বের আর্তপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়াতে চায়। ৩. তাইওয়ানের ৮৪.৮% মানুষ চায় তাইওয়ান জাতিসংঘের সদস্য হোক এবং ৭৬.৬% মানুষ চায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় যোগ দিয়ে মানুষের সেবা করুক। ৪. তাইওয়ানের মানুষ নিজেদের তাইওয়ানিজ মনে করে, তাঁরা নিজেদের চায়নিজ মনে করে না। সুতরাং চায়না তাইওয়ানকে প্রতিনিধিত্ব করতে পারে না। ৫. গণতন্ত্র, স্বাধীনতা এবং মানবাধিকারের প্রতি গুরুত্ব দিয়ে তাইওয়ানকে স্বাধীন দেশ হিশেবে স্বীকৃতি দেওয়া হোক এবং তাইওয়ানকে জাতিসংঘের সদস্য করা হোক।
আমরা সবাই জানি এক বিশাল দানব চায়না তাইওয়ানের মানুষের স্বাধীনতা ছিনিয়ে নিয়েছে এবং সব থাকা সত্বেও তাইওয়ানিজরা বহির্বিশ্বে স্বাধীন জাতি হিশেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারছে না। রিপাবলিক অব চায়না এবং পিপলস রিপাবলিক অব চায়নার যাঁতাকলে পড়ে স্বাধীনতা হারিয়েছে তাইওয়ান। আমাদের ছেলেবেলায় শিল্পোন্নয়নে তাইওয়ানের জয় জয়কার দেখেছি। বাংলাদেশে কত কিছু যে আসতো, মেইড ইন তাইওয়ান। সেই জৌলুস কমতে কমতে আজ একেবারে মিইয়ে গেছে, তাইওয়ানের নাম-ধাম আর তেমন শোনা যায় না। চায়নার বাঁধার কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে ধীরে ধীরে তাইওয়ানের নাম মুছেই যাচ্ছে।
তাইওয়ানের আদি নাম ফরমোজা দ্বীপ। সপ্তদশ শতকের আগে এই দ্বীপে আদিবাসীরা বাস করতো। ডাচ এবং পর্তুগিজরা কিছুকাল এটিকে তাদের কলোনি বানিয়ে রেখেছিল। চীনের চিং সাম্রাজ্য মূল ভূখন্ডের সাথে ফরমোজা দ্বীপকে যুক্ত করলেও জাপানের সাথে যুদ্ধে হেরে গিয়ে দ্বীপটিকে ওরা জাপানিদের কাছে ছেড়ে দেয় ১৮৯৫ সালে। চিং সাম্রাজ্যের, মানে রাজতন্ত্রের, পতনের পর রিপাবলিক অব চায়না গঠিত হয় ১৯১২ সালে, তখন তাইওয়ান জাপানিদের দখলে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপান হেরে গেলে রিপাবলিক অব চায়না তাইওয়ানের দখল নিয়ে নেয়। সমগ্র চায়না তখন রিপাবলিক অব চায়না। ১৯৪৯ সালে চীনে গৃহযুদ্ধ শুরু হলে কমিউনিস্টরা পুরো দেশের দখল নিয়ে নেয় কিন্তু রিপাবলিক অব চায়না সরকার পালিয়ে তাইওয়ান চলে আসে। কমিউনিস্ট চায়নার নতুন নাম হয় পিপলস রিপাবলিক অব চায়না। রিপাবলিক অব চায়না বলে যে অংশটি বেঁচে থাকে সেটি তাইওয়ান। জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য রাষ্ট্রগুলোর একটি রিপাবলিক অব চায়না, যা ১৯৭১ সাল পর্যন্ত চীনকে জাতিসংঘে প্রতিনিধিত্ব করে। এরপর ধীরে ধীরে কমিউনিস্ট চায়না বা পিপলস রিপাবলিক অব চায়নার আগ্রাসনের কাছে ছোট্ট ফরমোজা দ্বীপটি পৃথিবীর মানুষের কাছে ক্রমাগত কেবল ছোট হয়েই আসছে।
তাইওয়ানের নিজস্ব পাসপোর্ট আছে, পতাকা আছে, সীমানা আছে, আছে নিজেদের একটি দেশ। কিন্তু চায়নার কানে কথাটা গেলেই হল, অমনি তেড়ে আসবে, কখখনো নয়, তাইওয়ান কোনো স্বাধীন দেশ নয়, এটি চীনেরই একটি অংশমাত্র। ক্ষমতাধর চীনের সেই ধমকে চুপ করে আছে বিশ্বসংস্থা, না বাপু, তোমাদের কোনো দেশ নেই।
মধ্যবয়স্ক একদল তাইওয়ানিজ নারী-পুরুষ গান গেয়ে গেয়ে তাঁদের সেই কষ্টের কথাই এখন জানাচ্ছেন জাতিসংঘকে। এমনি হাজারো কষ্টের গল্প শুনে শুনে ইস্ট নদীর জল নীল হয়ে উঠলেও জাতিসংঘের পাষাণ-প্রাচীর খুব কমই কেঁপে ওঠে।


Comments
Post a Comment