আহমদ ছফা বাংলা একাডেমী পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছিলেন
- মাহবুব হাসান
[সাত-এর দশকের কবি মাহবুব হাসান কাদেরিয়া বাহিনীর একজন সক্রিয় মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। বাংলাসাহিত্যে পিএইচডি করেছেন, সংবাদপত্রের সম্পাদনা বিভাগের সঙ্গে জড়িত ছিলেন দীর্ঘদিন। প্রকাশিত গ্রন্থ সংখ্যা ৫৮টি। তার এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন কাজী জহিরুল ইসলাম। এই ব্লগে সেটি ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করা হবে। আজ দ্বিতীয় কিস্তি প্রকাশ করা হল। প্রিয় পাঠক, চাইলে আপনিও প্রশ্ন রাখতে পারেন, পরের কিস্তিতে আপনার প্রশ্নের উত্তর পত্রস্থ করার চেষ্টা করা হবে। ]
জহিরুলঃ উত্তর প্রজন্মের কবিদের মধ্যে কাকে বা কাদেরকে উল্লেখযোগ্য মনে হয়? কি বৈশিষ্ট্যের বা কন্ট্রিবিউশনের কারণে উল্লেখযোগ্য মনে হয়?
মাহবুবঃ উত্তরপ্রজন্মের অনেক কবিকেই আমার কাছে ভালো মনে হয়। ‘কবি’ শব্দটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর, এই খ্যাতির আশায় বুক বাঁধেন অনেকে, কিন্তু সেই অভিধাটি কি তিনি বা তারা পান? পান না। কালের বিচারে তারা হারিয়ে যান। কখনো কোনো উপলক্ষেহয়তো কেউ একজন তাকে মনে করেন। তার মানে এই নয় যে তিনি ভালো কবি, বা তিনি কবি। কুসুমকুমারী দাশকে অনেকেই ‘আহা তিনি অসাধারণ লিখেছেন বলে এমন ঢং করেন যে তারই কারণে পুত্রটি কবি হতে পেরেছেন। ‘ আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে/ কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে’ তিনি লিখেছেন। কিন্তু এই দুটি পঙক্তি কি কবিতা? আসলে লাইন দুটি উক্তি। উক্তি আর কবিতা আলাদা জিনিস। এটা আমাদের কবিদের ৯০ শতাংশই বোঝেন বলে আমার মনে হয় না। আমার মত এটাই। তবে সত্যই যদি বলি তাহলে যারা আমাকে আকর্ষণ করেছিলো তাদের কবিতা দিয়ে, তারা পরবর্তীকালে কবিতাযাত্রায় আছে কি ক্ষান্ত দিয়েছে, তা আমি জানি না। তাদের কয়েকজনের নাম আমি বলতে পারি। সেই তালিকা দীর্ঘ নয়। শামসেত তাবরেজী, কাজল শাহনেওয়াজ, রিফাত চৌধুরী, সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ, আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ, মাসুদ খান,আহমেদ মুজিব, মজিদ মাহমুদকে আমার ভিন্নরকম মনে হয়েছিলো। ঠিক কি কি বৈশিষ্ট্যের কারণে ওদের কবিতা আমার ভালো লেগেছিলো, তার ব্যাখ্যা তো দিতে পারবো না। তাদের কবিতা ঠিক আমাদের প্রচলিত মননের সাথে খাপ-খাওয়ার মতো নয়। হাতের কাছে ওদের কারো বই নেই, তাই উদ্ধৃতি দিয়ে বোঝাতে পারলাম না। ওরা জীবনের গদ্যময় নাটবল্টুসমেত উঠে এসেছে কবিতা নিয়ে। বলার ধরনটাই আলাদা গোছের। আমার মনে হয় কবিতায় কন্ট্রিবিউশন শব্দটি অনেক ব্যাপক এলাকা জুড়ে কাজের পরিধিকে ধারণ করে। ওদের সূচনাকালে আমার মনে এমনটাই বোধ জন্মেছিলো। আহমেদ মুজিব, প্রেস ও প্রেসের উপকরণ নিয়ে কবিতা সাজিয়ে ছিলেন। আমি আগে ওই উপকরণের ব্যবহার কবিতায় দেখিনি। সে জন্য যেমন, তেমনি, তা দিয়ে যে একটি সমাজের অন্তরের একটি ক্ষুদ্র কিন্তু অনিবার্য রূপ তুলে আনা যায়, সেটাই ছিলো বিস্ময়কর, অন্তত আমার কাছে। যেমন মজিদ মাহমুদ যখন লেখেন, তার প্রেমিকাকে পাঠ করেন তিনি তসবির দানায়, বা দানার মতো তখন, তসবির দানাগুলো আল্লাহর নামের বদলে প্রেমিকার নাম হয়ে ওঠে। অথবা তার প্রেম যেন আল্লাহর নামজপের মতোই বাজতে থাকে । বাংলা কবিতায় এটা আগে লেখা হয়েছে কিনা, জানা নেই। আমি তখন মুগ্ধ হয়েছিলাম। এখন সেই কবিতা অনেকের মনে দোলা নাও দিতে পারে। আবদুল মান্নান সৈয়দের ‘জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ’ ষাটের দশকে যে ঝড় তুলেছিলো তার কাব্য ভাষা ও বৌদ্ধিক কারণে, কিম্ভূত চিত্রকল্প ও উপমাসংরাগের ফলে, যা অবাস্তব ও অকল্পনীয় বলে অনেকের কাছে মনে হয়েছিলো, আজ তাই কিন্তু সুররিআলিস্টিক প্রণোদনা বলে ধরা হয়। আমি যাদের নাম বলেছি, ওদের বাইরেও অনেকে ভালো কবিতা লিখেছেন। সরকার মাসুদ, , সরকার আমিন, শাহনাজ মুন্নী, শান্তা মারিয়া, শাহীন রেজা, রেজাউদ্দিন স্টালিন, আশরাফ হোসেন, চঞ্চল আশরাফ, রাজু আলাউদ্দিন, আরো অনেকেই ভালো, পাঠযোগ্য কবিতা লেখেন। তার মানে এই নয় যে তারা পরবর্তী জীবনে ভালো কবিতা লিখেছেন বা উত্তরপ্রজন্মের কবি বা পাঠকরা তাদের পাঠ করবেন। আমি একটি উদাহরন দিই। পাঁচের দশকের আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, প্রথমাবধিই ভিন্ন কণ্ঠস্বরের কবি। মাঝে বেশ জনপ্রিয়তাও তিনি অর্জন করেছিলেন। তার কাব্য ভাষাও পাঁচের অন্যদের থেকে আলাদা। তিনি পাঠকের মনোযোগ পেয়েছেন বা উত্তরপ্রজন্ম তাকে শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদ বা শহীদ কাদরীর কবিতা পাঠের তুলনায় তার কবিতা পাঠ করেন না। অবশ্যই আবুবকর সিদ্দিক, আবু হেনা মোস্তাফা কামাল, ফজল শাহাবুদ্দিন সেই যোগ্যতায় পঠিত নন, অথচ ‘ভালো’ কবি হিসেবে আমরা তাদের গণ্য করি। আপনাকে ধরেই আমি আরো একটি উদাহরণ টানতে পারি। আপনার কিছু কবিতা তো ঈর্ষণীয় স্তরের, ভালো কবিতার তালিকায় আপনার অনেক কবিতাই আছে, যা আমি পাঠ করেছি। আমার ভালো লাগার কথা জেনেও বেশ কয়েকজন আপনার কবিতা তেমন ভালো নয় বলে ব্যক্তিগতভাবে বলেছেন আমাকে। যদি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ থাকতে পারে। অনেকেই মনে করেন, আপনি অনেক লেখেন। এটা দোষণীয় তাদের কাছে। আমার কাছে এটা দোষণীয় মনে না হলেও আমি চাই আরো ধীরে-সুস্থে লিখুন। কিন্তু আমি সেটা আপনাকে বলি না। কারণ আপনি যথেষ্ট ম্যাচিউর্ড। আপনাকে পরামর্শ দেয়া উচিৎ নয়। আপনার অনেক লেখাই স্পন্টেনিউয়াস, ফলে অনেকের কাছেই তার ব্যঞ্জনা ব্যাহত বলে মনে হতে পারে। এখন আমার কাছে কার কবিতা ভালো লাগলো কি লাগলো না, তাতে কার কি এসে যায়? মনে রাখতে হবে আমি একজন পাঠক হিসেবে পাঠ করি। পাঠকের মানসিকতা আমার ধ্যান ধারণার সাথে না মিললেও আপনি বা মান্নান সৈয়দ বা কাজল, রিফাত বা মুজিব, মজিদ, মাসুদ খান বা আবু সাঈদ ওবায়দুলাহ,সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ ভালো কবি বা ভালো কবি নন, এটা প্রত্যেকে তার নিজের মত করেই ভেবে নেবে বা নেয়। যারা আমার মত নিয়ে বলবেন যে ওরা ভালো কবি নয়, তারা অন্যের জিহ্বায় কবিতার স্বাদ চেটে দেখেন, তাতে মসল্লা ঠিক আছে কি না। নিজে পড়ুন, নিজে বিচার করুন এবং নিজে রায় দিন কে কবি আর কাকে ভালো লাগে। ভালো লাগলেই যে সে বা তিনি সবার কাছে ভালো বা বড় কবি এমন তো নয়।
জহিরুলঃ অনেক বড় কবিকেই দেখেছি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ভাসা ভাসা মন্তব্য করেন, কারো নাম বলতে ভয় পান, পাছে অন্যরা নাখোস হন, এটা কি দুর্বল ব্যক্তিত্বের বহিপ্রকাশ নয়? এই যে আপনি আপনার দশকের বা আগের দশকের কারো নাম বললেন না এতে কি এটা প্রতীয়মান হয় না যে, হয় আপনার নিবিড় পাঠ নেই অথবা নিজের কাব্যমুল্যায়নের প্রতি আস্থা নেই?
মাহবুবঃ তার কারণ অনেক। প্রথমত, কেউ কারো বিরুদ্ধে, মানে কবিতার বিষয়ে অবমূল্যায়ন করলেই তার পেছনে লোক লেগে যায়। রাজনৈতিক প্রভাব-বলয় তৈরি করে একঘরে করে ফেলে। অকবিদের দাপটে বাংলাদেশের অবস্থা এখন এমনটাই। সে-কারণেই কেউ প্রকৃত সত্য উচ্চারণ করেন না। এটা দুর্বল ব্যক্তিত্বের বহি:প্রকাশ নয়। আত্মসম্মান রক্ষার কৌশল হিসেবে তারা ভাসা ভাসা উত্তর দেন। কেউ কেউ অবশ্য যাকে খুশি করা প্রয়োজন মনে করেন, তাকে বা তাদের উচ্চকণ্ঠে গীত গায়। আমি আমার দশকের কারো নাম নিইনি অন্য কারণে। সবাই বন্ধু বলে কাউকে খাটো করতে চাই না। তারা সবাই ভালো কবি। কিন্তু তারা গড় কবি। কাউকেই আপনি আবিদ আজাদের স্তরে ওঠাতে পারবেন না। তবে সবার কবিতাতেই সাতের দশককালের সময়, রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক পরিচয় পাওয়া যায়, যাকে আমি সমকালীন কবিতার অভিমুখ বলতে চাই। এই সম্মিলিত কাব্যস্রোত আমাদের রাজনীতিশাসিত কবিতার রূপারূপ নির্মাণ করেছে। তাদের কবিতার উপকরণের রগে-রেষায় ফুল্ল হয়ে উঠেছে জীবনের মৌল প্রত্যাশা, যা রাজনৈতিক সরকারের পক্ষে মেটানো সম্ভব হয়নি। পোস্ট কলোনিয়াল কবিতার মতোই স্বাধীনতা-উত্তর সাতের দশকের কবিতার মনন ও সৃজনভূমি ক্ষতাক্ত আশার অপমৃত্যুতে। সম্মিলিতভাবে সাতের কবিতার স্রোত যে ধারা সৃষ্টি করেছে, তারই সংহত রূপ আমরা আটের দশকে লক্ষ্য করি, সাতের ও আটের কবিদের মধ্যে। পাঁচের সাথে ছয়ের দশক যেমন কড়ি-বর্গার মতো মেলবন্ধন জুড়ে নিয়ে এগিয়েছে, তেমনি ছয়ের তাপ আর অনুতাপ নিয়ে সাতের কবিতার যাত্রা হলেও তারা স্বাধীন দেশের ‘পরাধীন চেতনা’-আলোকে মর্মাহত হয়েছে। আমি যা বলি তার পেছনে আমার পাঠের অভিজ্ঞতা থেকেই তা জাত। আপনি যতোই আমাকে খুঁচান না কেন, আমার চেতনার বর্ণমালা পাঠ করলে তা বুঝতে পারবেন। তবে, এটা মনে রাখবেন, মানুষ মাত্রই যেখানে মানসিকভাবে বিবর্তনশীল, সেখানে কবির চিন্তার বিবর্তনের গতি তো আরো তীব্র ও ব্যাপক। ধরুন, আটের দশকে যে বিচার আমার লেখায় আছে, ২০০০ সালে তার রূপ অনেকটাই বদলেছে। কারণ পাঠকের পাঠের অভিজ্ঞতা তাকে নতুন নতুন সমীক্ষার অনুবর্তী করে তোলে। আমারই চিন্তার, ধারণার নৌপথ পাল্টে গেছে। এবং যাচ্ছে। আমার কবিতা পড়লেও তা অনুভব করা যাবে।
জহিরুলঃ দুই বাংলার কবিতার গতিধারা সম্পর্কে আপনার পর্যবেক্ষণ কি?
মাহবুবঃ আমি তেমনভাবে বলতে পারবো না পশ্চিম বাংলার কবিতা বিষয়ে। আমার দশকের যারা ওখানে লিখছেন তাদের কয়েকজনের নাম বলতে পারি যাদের আসলেই আমার কাছে ভালো কবি বলে মনে হয়েছে। তাদের মধ্যে অমিতাভ গুপ্ত, সুব্রত রুদ্র, সৈয়দ কওসর জামাল, গৌরশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় , জয় গোস্বামী, মৃদুল দাশগুপ্ত, রামকিশোর ভট্টাচার্য, সুবোধ সরকার, সৈয়দ হাসমত জালাল, রফিক উল ইসলামকে মনে পড়ছে। এখন নাম মনে করতে পারছি না আরো যাদের কবিতা পাঠ করে আমার ভালো লেগেছিলো। গতি তো প্রগতিরই অনুবর্তী। প্রগতি চলছে ইউরো-কালচারের হেগেমনি নিয়ে। অতএব বিবেচনাটি সেই পথেই হবে। আমিও সেই পথেরই অনুবর্তী ছিলাম, কিন্তু এখন আমি সেই চিন্তার ধারাস্রোত থেকে বাইরে চলে এসেছি। কিন্তু পুরোপুরি পাল্টে নিতে পারিনি নিজের চিন্তার স্ট্রাকচারাল ফর্মকে। কারণ আমি যে শিক্ষায় শিক্ষিত তা ইউরোজাত। সেখান থেকে আমাকে ওরিয়েন্টালে ফিরতে হবে। আরো খোলাসা করে বললে বলতে হবে আমাকে, নিজের সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের যে গভীর পৃথিবী আছে, সেই ছাদের নিচে আসতে হবে। বাংলা কবিতাকে নিজের দিকে ফিরে আসতে হবে। এ-ছাড়া আমরা অন্য সংস্কৃতির সৃষ্টিশীলদের নজর কাড়তে পারবো না।
জহিরুলঃ উত্তর-আধুনিক কবিতার একটি সুস্পষ্ট সংজ্ঞা চাই আপনার কাছে। আমার লেখা ক্রিয়াপদহীন কবিতার বইটি নিয়ে আপনি একটি নিবন্ধ লিখেছেন, এটাকে কি বাংলা কবিতার নতুন কোনো ধারা বা নতুন কোনো সংযোজন বলা যায়?
মাহবুবঃ আমি সংজ্ঞায় বিশ্বাস করি না। সংজ্ঞা ধরে কেউ কবিতা লেখেন না। কবিতা সৃষ্টির পর সংজ্ঞা সৃষ্টি করা হয়েছে। পোস্ট-মডার্ন কবিতার পর অনেক রকম কবিতা সৃষ্টি হয়েছে, যার নানা রকম নাম আমরা জানি। ডাডাইজম ও সুররিআলিজমের পর আসলে চিন্তার ক্ষেত্রে তেমন একটা আলোড়ন তোলা ইজম বা মতবাদ উঠে আসেনি। এন্টি পোয়েম বা প্রতিকবিতা নামেও একটি ধারা চালু হয়েছিলো। কবিতায় জাদুবাস্তবতার একটা নিশান দেখেছি আমি, যা মূলত আমাদের লোকগল্পে শত শত বছর আগেই লক্ষ্য করেছি। আসলে কবিদের মৌল শক্তি তার কল্পনাশক্তি। যাকে বলে ইমাজিনেশন পাওয়ার। এই ইমাজিনেশন পাওয়ারের একটি ক্ষুদ্র বাস্তব রূপ হচ্ছে পরমাণুশক্তি বা নিউক্লিয়ার পাওয়ার। উইপনের ক্ষেত্রে এর চেয়েও এখন শক্তিশালী হচ্ছে জীবানু-অস্ত্র। আর সেই জীবানু-অস্ত্রের মহড়াটি এখন চলছে বিশ্ব জুড়ে। আপনার ক্রিয়াপদহীন কবিতা কোনো নতুন কিছু নয়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কোনো এক বইয়ে আমি ক্রিয়াপদহীন গদ্য পড়েছি, তাও ২৫/৩০ বছর আগে। ক্রিয়াপদ বাদ দিয়ে গদ্য বা পদ্য যদি চলতো তাহলে তো ওই পথেই নিজেকে নির্মান করতেন আপনি। যদি আপনি মনে করেন যে এটা একটি নতুন ধারা তাহলে কেন ফিরে এলেন ক্রিয়াপদে? তার মানে আপনি নিজেও কনফিউজড, ওই ধারাটি কোনো ধারা বা পথ তৈরি করেনি বাংলা কবিতায়। ধরুন, বাংলা কবিতা তার মিল সর্বস্ব, অন্ত্যমিল সর্বস্ব গীতি কবিতার পথ থেকে সরে এলো আধুনিকতায়। আবার আধুনিকতাকে পেছনে ঠেলে দিয়ে এলো উত্তর আধুনিকতায়।এলো অধিবাস্তব কবিতার ধারা। লক্ষ্য করবেন, কোনোটাই কিন্তু বাংলা কবিতাকে তার মৌলিক মোহ, রোমান্টিকতার সুরমুক্ত হয়ে বাঁচতে পারেনি। রোমান্টিকতা এবং তার সাথে গীতলতার একটি উৎস সম্পর্ক আছে, তাকে পরিহার করতে পারেনি বাংলা কবিতা। এমন কি, পারম্পর্য ভেঙে কবিতায় আনতে চেয়েছিলো যারা নতুন ঢং তাও কিন্তু আমাদের মনোযোগ পায়নি। তার মানে আমাদের মূল চেতনা, এই দেশ ও চেতনার, আবহাওয়ার ও প্রতিবেশের প্রভাব মুক্ত হতে পারেনি। আমি ক্রিয়াপদহীন কবিতা নিয়ে লিখেছি ক্রিয়াপদহীনতা নিয়ে উজ্জীবিত হয়ে নয়, পাঠ করে কবিতাগুলোর চেতনার সম্পদ দেখে।
জহিরুলঃ দীর্ঘদিন সংবাদপত্রের সম্পাদনার সাথে জড়িত ছিলেন, এতে সৃজনশীল কাজের ক্ষেত্রে কি উপকার হয়েছে আর কি ক্ষতি হয়েছে?
মাহবুবঃ আপনি ভুল করেছেন, সম্পাদনা নয়, আমি সম্পাদকীয় বিভাগের একজন সহকারী সম্পাদক ছিলাম। আমাদের সম্পাদকীয় নীতির আলোকেলেখা সংস্কার (এডিট)করে তা ছাপতাম। হ্যাঁ, তা বলতেই পারেন যে এতে সৃষ্টিশীল কাজ ব্যহত হয়। আবার এটাও মানতে হবে যে সংবাদপত্র এমন এক উৎস যা ইনফরমেশনের ডিপো। এই ডিপো কবি/সাহিত্যিকদের নানা রকম কাজে লাগে।
জহিরুলঃ অনেকেই বলেন, আহসান হাবীবের পরে আর তেমন সৎ ও বড় মাপের সাহিত্য সম্পাদক আমরা পাইনি। আপনি নিজেও সাহিত্য সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন, এই নিরিখে নিজের অবস্থান কিভাবে শনাক্ত করেন?
মাহবুবঃ সাহিত্য পাতার সম্পাদকের নিজস্ব ওজনের মাপে যে কবিতা বা গল্প বা প্রবন্ধ ভালো বিবেচিত হবে, তাই তিনি ছাপেন। সেই বিবেচনায় কবি আহসান হাবীব অতুলনীয়। তিনি ভালো কবি এবং নিজেকে আমৃত্যু সমকালীন চিন্তার বাতাবরণে রেখেছিলেন। তার হাতেই আমার এবং আমাদের কবিতার যাত্রা বলতে পারেন। শামসুর রাহমান থেকে শুরু করে সাতের প্রত্যেক কবি তার শ্রেষ্ঠ কবিতা হাবীব ভাইকে দিতেন। তারপরও হাবীব ভাইয়ে অভিযোগ ছিলো আমার ওপর। অন্যদের কথা বলতে পারবো না। একবার বললেন, রোববারে তোমার কবিতাটি খুব ভালো হয়েছে। আমি হেসে বললাম, হাবীব ভাই, আপনাকে ওই কবিতা ভয়ে দিইনি। আসলেও ঘটনাটি সত্য। ভয়ে দিইনি যে এটা হাবীব ভাইয়ের ভালো লাগবে না। আমি সেটা নিযে গেছিলাম আমার প্রিয় কবি রফিক আজাদের কাছে। তিনি পড়ে বললেন, এ-সপ্তাহেই এটি ছাপছি। সংবাদে যখন আমার বন্ধু দাউদ হায়দার সাহিত্য দেখতেন, তখন কিছু কবিতা লিখেছি। আমরা ঢাকা কলেজ থেকেই ক্লাসফ্রেন্ড, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও। কিন্তু পরে যখন হাসনাত ভাই সংবাদের সাহিত্য দেখতেন, তখন তাকে লেখা দিয়েই চলে আসতে হতো। কারণ তার সামনে কোনো চেয়ার থাকতো না। আর তিনি বসতেও বলতেন না আমাকে। তার ওখানেও আমার ভালো লেখাগুলো ছাপা হয়েছে। সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে তিনিও অগ্রগণ্য আমার চোখে। তিনি কেবল ভালো মানুষ নন, একজন মানবিক মানুষও। নিউ ইয়র্কে দেখা হলেও বলেছেন মাহবুব লেখা পাঠাবে। আমি লজ্জিত হয়েছি এই ভেবে যে লিখি, কিন্তু হাসনাত ভাইকে তা পাঠানো হয়ে ওঠে না।
হ্যাঁ, আমি নিজেও সাহিত্যের পাতা সম্পাদনা করেছি দীর্ঘকাল। ভালো সম্পাদক হতে পারিনি। অনেক কমপ্রোমাইজ করতে হয় ওই পাতাগুলোর দায়িত্বে থাকলে। সেটা করতে হয়নি কখনোই আহসান হাবীবকে।
জহিরুলঃ সরকারী-বেসরকারী অনেক সাহিত্য পুরস্কার আছে বাংলাদেশে। এইসব পুরস্কার বা স্বীকৃতিকে আপনি কিভাবে দেখেন?
মাহবুবঃ আসলে এ-ব্যাপারে কথা বললে অনেকেই ভাববেন যে, তিনি পুরস্কার পাননি বলে এমনটা বলছেন। আসলে তা নয়। আমি জীবনেও ভাবিনি যে পুরস্কার পেতে হবে আমাকে। তবে এ-রোগ আমিসহ সবার মধ্যেইে আছে। অন্তত দুইবার আমাকে নমিনেশন দিয়েছিলেন দুজন, এখন দুজনই প্রয়াত। আমাকে ভালোবাসতেন, সেজন্যই দিয়েছিলেন। ফখরুজ্জামান চৌধুরী ও অন্যজনের নাম মনে করতে পারছি না। তারাই আমাকে জানিয়েছিলেন কথাটা। সে সময়তক আমার মনেও যে বাংলা একাডেমির পুরস্কারের লোভ ছিলো না, তা নয়। পরে যখন দেখলাম, শুদ্ধ করে বাংলা লিখতে পারে না, কবিতা তো দূরে থাক, তারাও পুরস্কার পাচ্ছেন,তখন সখ মিটে পানি হয়ে গেছে। আবিদ আজাদের জন্য বেশ কয়েকজনই নমিনেশন দিয়েছেন, মান্নান সৈয়দ, আল মাহমুদসহ আরো অনেকে, তারপরও তাকে পুরস্কৃত করা হয়নি। এখন খুব বাজে চোখে দেখি ওই সব পুরস্কারকে। বিশেষ করে একুশে পদকের জন্য নাকি প্রাপককে নিজের কৃতী সম্পর্কে লিখিত দিয়ে আবেদন জানাতে হয়, আমাকে পদক দিন। এ-কাজ তৃতীয় ব্যক্তিও নাকি করতে পারেন। কিন্তু প্রশ্নটি হলো, একজন মুক্তিযোদ্ধা, যার অবদানে দেশ স্বাধীন হয়েছে, তাকে কেন নিজের সম্পর্কে লিখে আবেদন জানাতে হবে? যারা এই নীতি-রীতি চালু করেছেন তারা যে মানসিকভাবে পরাধীন, এই ব্যবস্থাই তার প্রমাণ। ওই পুরস্কারের যোগ্য হচ্ছেন মুক্তিযোদ্ধরা। তার পরে যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন এমন কবি-সাহিত্যিক-সাংবাদিক। এর বাইরে আমলা-জামলা-কামলাদের জন্য এই পুরস্কার নয়। এদের জন্য আলাদা পুরস্কারের ব্যবস্থা করতে পারে সরকার, কিন্তু একুশের পদক নয়। ভাষা শহীদের নামে যে পদক, তা দেশের লুটেরা-বাটপারশ্রেণির হাতে তুলে দেয়াটা অরপাধের সামিল। আর বেসরকারি পুরস্কারগুলোর ঝুলি খোলাই হয়েছে স্বার্থ উদ্ধারের জন্য। সেগুলোর কোনো মান আছে বলে মনে করি না।
জহিরুলঃ প্রবাসী লেখকদের জন্য বাংলাদেশ সরকার/বাংলা একাডেমি কর্তৃক প্রবর্তিত সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ পুরস্কার সম্পর্কে আপনার অভিমত কি? লেখকের ভৌগোলিক অবস্থানের ভিত্তিতে পুরস্কার প্রবর্তন কি এক ধরনের সাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টি নয়?
মাহবুবঃ জহির এটা সাম্প্রদায়িকতা নয়, কবি-সাহিত্যিকরা কখনো সম্প্রদায়ভুক্ত নন, তারা সৃষ্টিশীল প্রাণী, এর বাইরে তার ধর্মগত পরিচয় হতে পারে না। এটাকে আমি ডিস্ক্রিমিনেশন বলি। এটা চরম বৈষম্য? এর মধ্যেই সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ পুরস্কার পেয়েছেন আমার দুই বন্ধু। শিল্পী সৈয়দ ইকবাল ও কবি ইকবাল হাসান। কেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার দেয়া হলো না তাদের? তাদের অপরাধ তারা সুদূর কানাডায় বাস করেন বলে তারা দ্বিতীয় শ্রেণির সৃষ্টিশীল? আমি তো দেখছি বাংলা একাডেমির সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছে এমন বহু নিকৃষ্টমানের কবি/সাহিত্যিক আছেন, তারা কেউ ইকবালের চেয়ে ভালো নন কবি হিসেবে, সাহিত্যক নন সৈয়দের চেয়ে। বলতে গেলে স্বাধীনতা-উত্তরকাল থেকে যারা পুরস্কৃত হয়েছেন তার ৮০ শতাংশই ফর্মায় ফেলে লেখা কবি। ইট বানানোর ফর্মায় যেমন ইট বানানো হয়, এদের কাব্যিক স্ট্যান্ডার্ড সেই মাপের। তো, তারা তো পেয়েছেন, কিন্তু একজন মৌলিক চিত্রকল্পময় কবি আবিদ আজাদকে পুরস্কার দেয়া হয়নি। আবুল হাসানকেও পুরস্কার দেয়া হয়নি। আমার যতটা মনে পড়ছে আহমদ ছফা পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছিলেন কবি জসীমউদদীন। যারা পেয়েছেন বাংলা একাডেমির পুরস্কার এই তিনের চেয়ে কি ভালো গুণধর?
জহিরুলঃ আন্তর্জাতিক কবিতার তুলনায় বাংলা কবিতার মান বিচার করলে আমাদের অবস্থান কোথায় বলে মনে করেন?
মাহবুবঃ আন্তার্জাতিক কবিতা বলে কিছু নেই। কবিতা হচ্ছে যার যার ভাষায় লিখিত কবিতা। আর তার স্ট্যান্ডার্ড তার সাংস্কৃতিক উচ্চতার ওপর। আপনি যদি মনে করেন আমেরিকান কবিতা আমাদের কবিতার চেয়ে উঁচু মানের, তাহলে সেটাই আপনার বিচার বিবেচনা। সেটা আমার নয় বা সেটা গোটা বাংলাভাষী কবিদের নয়। কবিতা হচ্ছে ভাষিকশিল্প। যার ভাষা বাংলা সে বাংলা কবিতা পড়ে কিংবা না পড়েই ভালোবাসে বা বলে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কবিতা। কারণ তার চিন্তার অ্যারেনা, তার মাপের, তার অধিকৃত জীবনের অন্তর্গত। আসলে আমি তুলনামূলক সাহিত্য (কম্পারেটিভ লিটেরেচার) বিচার বিষয়টি পড়িনি। জানি না কেমন করে সেই তুলনাটি দেয়া হয়, এবং বিচার বা বিশ্লেষণ করা হয়। এ-কারণে এ-নিয়ে কিছু বলতে পারবো না। প্রত্যেক দেশের জীবন, সংস্কৃতি ও প্রতিবেশ তার নিজস্বপ্যাটার্নে গড়ে ওঠে। তাই সব দেশের সাহিত্যই তার আকারে স্বয়ংসম্পূর্ণ। আর কবিতা বা সাহিত্য বিচারের নানা মাপকাঠি আছে। আপনি যদি ইউরো-এনলাইটেনমেন্টের লেন্স দিয়ে বাংলা কবিতাকে মাপতে যান, তাহলে এর ফল খুব ভালো হবে না। আবার আপনি যদি ওরিয়েন্টাল আলো ফেলে ইংরেজি বা ইউরোপীয় কবিতা বিচার করতে যান, তাহলেও ভালো ফল পাবেন না। তুলনামূলক বিচারের মাপকাঠিটাও হতে হবে সব সংস্কৃতির জন্য উপযুক্ত, তাহলেই কেবল বলতে পারেন আমার কবিতার চেয়ে আমেরিকান কবিতা ভালো বা মন্দ।
জহিরুলঃ কবিতা বিষয়ক মানসম্পন্ন প্রবন্ধ বাংলাভাষায় খুব কম লেখা হয়েছে - আপনি কি একমত? কি ধরণের প্রবন্ধকে মান সম্মত প্রবন্ধ বলবেন?
মাহবুবঃ না। মানসম্পন্ন অনেক প্রবন্ধই রচিত হয়েছে যা আমরা পাঠ করিনি। বলবেন কেন করেননি? এর উত্তরে আমাদের পাঠ বিমুখতা। আমরা কবিতা বিষয়ক, দুই/চারটি গ্রন্থ পাঠ করেই জ্ঞানী হয়ে যাই। কারণ ওইটুকুই তার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু প্রকৃত জ্ঞানীর ক্ষুধা মেটাতে পারে না কোনো রচিত বই। বই কেবল একজন সৃষ্টিশীলকে ইগনাইট বা উসকে দিতে পারে। আপনার পাঠক্ষুধা যে প্রবন্ধ মেটাতে পারবে, সেটাকেই মান-সম্মত বলতে পারি। তবে মনে রাখতে হবে, মান-এর মান নির্ণয় করবে কে? আর সেই মাপযন্ত্রটি কার বা কাদের?



Comments
Post a Comment