Skip to main content

মতিন বৈরাগীর কবিতা

আগুন-জলের বৈপরীত্যে অনিবার্য বিপ্লব

কাজী জহিরুল ইসলাম 

 

পারস্পরিক পারম্পর্য ভেঙ্গে যায়তৈরী হয় নতুন দ্যোতনাপঙক্তির পর পঙক্তি এভাবেই আমাদের ভাবনাকে ছিন্ন-বিছিন্ন করে দিয়ে চেতনায় বুনে দেয় নতুন ভাবনার বীজ। সত্তুরের অন্য কবিদের থেকে এখানেই মতিন বৈরাগীর স্বাতন্ত্র। তিনি যখন বলেন, ‘মিহিন জলের শরীরস্তব্ধ বৃক্ষরাজিপাখিরা নিশ্চুপ’ আমরা এক মৌণ প্রকৃতির গভীরে অবগাহন করি। কেউ কেউ নস্টালজিক হয়ে পড়িফিরে যাই দূরের শৈশবেনিস্তরঙ্গ পুকুর পাড়েকোন এক নির্জন আমতলায়। কিন্তু এই নির্জনতা মুহূর্তেই ভেঙ্গে খান খান হয়ে যায় যখন পরের পঙক্তিতে তিনি বলেন, ‘একটা বেজি দৌড়ে গেলো একটা আকাশ এলোমেলো। এখানেও কিন্তু স্থির থাকেন নি কবিএরপর বলেন, ‘উদ্ভ্রান্ত দিনের শেষের আলোটুকু চুইয়ে পড়লো জলে/ কারো গলার আওয়াজ থমকে থাকল পাতার সবুজে। এভাবে তিনি নির্মাণ করেন ভিন্ন ভিন্ন ইমেজএলোমেলো করে দেন পাঠকের ভাবনাকে।   

অসহায় মুহূর্ত” কবিতায় আমরা তাকে পাই এভাবেঃ

 

সারাদিন মিস কল সারাদিন একলা আকাশ

ঝরে যায় সবটুকু রঙ ভাসে কান্নার ধ্বনি 

সারাদিন কে এক তুমি বসে থাক পাশে

তারকারা ওড়ে জোনাকির পাখায় ক্লান্তিকে ছোঁয়

তবু দেয়াল ভাঙ্গার গান কে গায়কে বাঁধে!

 

প্রতিটি পঙক্তি তৈরী করে স্বতন্ত্র ইমেজপঙক্তিগুলোর মধ্যে এই পারম্পর্যহীনতা কবিতার ব্যাপ্তিকে ছড়িয়ে দেয় এক বিশাল ক্যানভাসে এবং শেষ পর্যন্ত ছোট ছোট অসংখ্য ইমেজ মিলে তৈরী করে এক সুবৃহৎ ইমেজযা হয়ে ওঠে এক সার্থক কবিতা। কোন না কোন ভাবে মতিন বৈরাগীর কবিতায় উচ্চকিত হয়েছে গণমানুষের মুক্তির গান। আগুন-জলের পারস্পরিক বৈপরীত্যও তার কবিতায় সমার্থকগণমানুষের মুক্তির হুঙ্কারঅনিবার্য উপমা। এমন কি অন্ধকারও হয়ে ওঠে বিপ্লবের  হাতিয়ার। তুমি অগ্নিদেব ত্রিলোকের – যমের আগুন/খেয়ে নাও এই লাশ আজসকলে খেয়েছে ঢের/যখন সে বেঁচেছিল। (সেই থেকে আগুন হয়েছে সর্বভুক)। তারপর যদি আগুনের লেলিহান ভেদ করে জানালার কাচ এবং/এক হিংস্র আলোক ছিটকে পড়ে/তখন ঘরের ইতর প্রাণীরা কাঁপেচুপটি করে লুকায় এখানে-সেখানে-/তখন আরও বেশী অন্ধকার চাইঅন্ধকার আমাদের খুব প্রয়োজন। (নানা রকম গল্প-১) হাঁটতে হাঁটতে যখন ক্লান্ত খুবএকটু বিশ্রাম একটু জল/ঠিক কখন যে আমি নদীটার কাছে পৌছলাম!/দেখি শীতের রাত কেউ যেন বসে আছে/জিজ্ঞেস করতেই সে বললোঃ আমি নদীজল নেই তাই বসে আছি-/জল এলে তবে স্রোতধারাগতি/ হঠাৎ পাতাগুলো ফরফর করে উঠলো দূরে বেদনার জোছনায় বালুগুলো/উড়ছেপায়ে হেঁটে সেই নদী পারাপার/স্থবির একটু জল তার শিরায়/আমি মুখে তুলতেই সে বললোঃ-এইটুকু-/ঝাউগাছগুলো মরে গেছে আর ছড়িয়ে আছে পাখির পালক/থমকে আছে সময় নদীটার মাঝে/যে রকম আমরা থমকে গেছি এক অদৃশ্য ইচ্ছের কাছে। (অদৃশ্য ইচ্ছের কাছে)



 

ফ্রেদেরিক লোরকা এবং পাবলো নেরুদাকে যৌবনে খেয়েছেন কবিএ তার কবিতার শরীর ছুঁলেই বোঝা যায়। আঙ্গিক নির্মাণের ক্ষেত্রেও কবি মতিন বৈরাগী বৈচিত্রের সাক্ষর রেখেছেন। কখনো অক্ষরবৃত্তকখনো মাত্রাবৃত্ত আবার কখনো দেখি টানা গদ্যে লিখে চলেছেন তিনি। আঙ্গিক যা-ই হোক না কেন বিষয়বস্তু নির্বাচনের ক্ষেত্রে তাকে খুব কমই আপোষ করতে দেখিবিপ্লববিপ্লব এবং বিপ্লব। এই শব্দটি মন্ত্রের মতো প্রোথিত মতিন বৈরাগীর কবিতায়। 

 

জগৎটা দাঁড়িয়ে আছে না-কি শেষ হয়ে গেছেএখন তুমি লাশপড়ে আছ সড়কে। হাওয়া উড়ছেধুলোবুটের শব্দ-তুমি কি ঘুমিয়ে গেছো উদোম সড়কে! মাত্র কয়েক মুহূর্তহৈ চৈ ভাংচূরচিৎকার স্লোগানমানিনার তারস্বরতারপর এক মৃত পাখি। তির তির করে কাঁপছিল চোখের তারা। কী চাইছিলেকেউ তোমাকে তুলুকনামধাম-হাসপাতাল-কেউ আসেনি। তুমি পড়ে আছো মুখ গুঁজে ইদুরের মতো-হিম অন্ধকারে। মুছে গেছে চোখের আলো-কার প্রয়োজনে?’

 

আবার যখন তিনি পাঁচ মাত্রার মাত্রাবৃত্তে সরব হয়ে ওঠেন তখনো দেখি গাইছেন সেই একই বিপ্লবের গানঃ

 

দিন ছিল না জীবন ভর রাতটা ছিল কাছে

রোদ ছিল না শরীর জুড়ে দুখের ছোঁয়া আছে

মলিন ছিল স্বপ্নগুলো আশা আলোকহীন

ভাবনাগুলো ছেঁড়া শরীর হয়েছে আজ ক্ষীণ

উড়ছিল না পাখিরা সব ছবির মতো চোখে

অন্ধকারে প্রকাশগুলো জীবনগতি রোখে

যাত্রাদিনে পথ ছিল না আশার আলো সম

ক্লান্তিরা যে লেগেই ছিল হৃদয় জুড়ে মম 

  

(দিন ছিল না)

 

এই কবিতায় আমরা যে হতাশা দেখতে পাই এটাই বিপ্লবের আঁতুড়ঘর। 



 

বৈপ্লবিক চেতনার এক সুদীর্ঘ সাঁকো পেরিয়ে এসেঅতি সম্প্রতি২০১৪ সালের ১৩ নভেম্বর আমারই অন্য নাম?’ প্রশ্নের বিভায় তিনি খোঁজেন এক অমোঘ উত্তরনিজেরই কাছে। 

 

তুমিহাজার নামের দারুণ শক্তিমান কোথায় না তুমি আছ?

জলে-স্থলে অন্তরীক্ষে ধ্যানে-জ্ঞানে প্রেম-প্রতারণায় হত্যায় ধ্বংসযজ্ঞে

ধর্ষণে-মঙ্গলে হর্ষহুল্লোড়ে বিষাদে নির্জনে

মহাকাশ নক্ষত্রপুঞ্জে বিশব্রহ্মান্ডে চেতনায় স্বপ্ন-জাগরণে

ধর্মে-অধর্মে জেহাদে লুট-চুরি-পাচারে

তুমিও কি নেশার ধোঁয়ায় উড়ছ!

ওহে অনড় বিশ্বাসের মায়াবৃক্ষ আমি বুঝিনা-বলোঃ

তুমি যদি নিয়মের নাম তাহলে অনিয়ম কেন?

 

হে তুমি দেখাও তোমার তুমিত্ব’ একবার

যা নিয়ে বিশেষ হয়েছ। তুমি কি আমি?

আমারই অন্য কোন নাম! জলতলে গড়িয়ে যাওয়া অলিক পাথর?

(আমারই অন্য নাম?)

 

এ এক জটিল প্রশ্ন বটে। দেয়াল ঘড়ির দোলকের মতো দুলে ওঠে কবির বিশ্বাসের ভিত। এই কবিতায় আমরা কবিকে কিছুটা সংশয়বাদীর ভূমিকায় দেখতে পাই।  এই প্রশ্নের মধ্য দিয়ে কবি সকল অনিয়মঅসাম্যের সমাধান প্রত্যাশা করেছেন কোন এক তুমির কাছে। কবি মতিন বৈরাগীর চৈতন্যের এক ইউ টার্ন আমরা দেখি এই কবিতায়। আধ্যাত্মিকতার এক নিবিড় ঘোর আমরা দেখতে পাই এই পঙক্তিগুচ্ছে। আমরা অপেক্ষা করবো কবি শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে স্থির হন তা দেখার জন্য। সেই সাথে প্রত্যাশা রাখছি দীর্ঘ অভিজ্ঞতার আলোয় স্নাত নতুন কিছু কবিতা যা বাংলা কবিতার অঙ্গনকে করবে আলোকিতসমৃদ্ধ। 

 

(বাংলা নিউজ টুয়েন্টিফোর ডট কম এ প্রকাশিত)

Comments

  1. শ্রদ্ধেয় কবি মতিন বৈরাগী এবং তার কবিতা নিয়ে খুব সুন্দর লিখেছেন ভাই। অসংখ্য ধন্যবাদ।

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

অসাধারণ এই শিল্পীর জীবনের গল্প বড় করুণ

  [এই সময়ের অত্যন্ত প্রতিভাবান শিল্পী সারফুদ্দিন আহমেদ। বাড়ি পশ্চিমবঙ্গে। আর্ট কলেজে খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করেন ,  আর শুধু ছবি আঁকেন। নানান মাধ্যমে ,  নানান বিষয়ের ছবি। সারফুদ্দিন আহমেদের ছবি থেকে চোখ ফেরানো যায় না ,  আপনাতেই ওঁর নান্দনিক সৃষ্টিকর্মে দৃষ্টি আটকে যায় ,  কী জল রঙ ,  কী অ্যাক্রিলিক ,  কিংবা স্রেফ পেন্সিলের ড্রয়িং। এই গুণী শিল্পীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কবি কাজী জহিরুল ইসলাম। সাক্ষাৎকারটি এখানে উপস্থাপন করা হলো।]       ভারত আমাকে চোখ দিয়েছে ,  বাংলাদেশ দিয়েছে দৃষ্টি -     সারফুদ্দিন আহমেদ     কাজী জহিরুল ইসলামঃ  ব্যাক গ্রাউন্ডে তবলা বাজছে আপনি ছবি আঁকছেন কাচের ওপর।    এই যে বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে ছবি আঁকা, এই ছন্দটা ছবিতে কিভাবে ধরেন? আর কোনো শিল্পী ছবি  আঁ কার সময় যন্ত্রানুসঙ্গ ব্যবহার করেছেন?   সারফুদ্দিন আহমেদঃ   কাঁচ নয়,   এটি এক বিশেষ ধরনের কাপড়-নেট। এই নেটের উপরে বর্তমানে আমার এক্সপেরিমেন্ট চলছে।    জহিরুলঃ ও ,  ফেইসবুকে যখন ছবিটি দেখি কাচের মতো ...

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জুর সাক্ষাৎকার || অষ্টম পর্ব ||

[লেখক, সাংবাদিক, অনুবাদক আনোয়ার হোসেইন মঞ্জুর সাক্ষাৎকারের অষ্টম  পর্ব আজ প্রকাশ করা হলো। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কবি কাজী জহিরুল ইসলাম।]          দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ বাসস - কে অকার্যকর করেছে  – মঞ্জু    জহিরুলঃ  আপনি ফেলোশিপ নিয়ে দিল্লীতে ছয়মাস ছিলেন, ব্যক্তিগত আগ্রহ এবং পেশাগত অভ্যাসের কারণে কাছে থেকে দেখার/বোঝার চেষ্টা করেছেন ভারতের এবং উপমহাদেশের রাজনীতি। আমরা দেখি ভারতের রাজনীতিতে গায়ক, নায়ক, লেখক, সাংবাদিকের আবির্ভাব ঘটে সব সময়ই এবং তারা রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও রাখেন। বাংলাদেশে এই ধারা খুব সম্প্রতি শুরু হলেও আমাদের জনপ্রিয় খেলোয়াড়, শিল্পীরা নিজেদের অর্থনীতি সমৃদ্ধ করা ছাড়া রাজনীতিতে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেন না। এমন কি ধর্ষণ, অন্যদেশকে ট্রানজিট প্রদান, উপর্যুপরি সড়ক দূর্ঘটনা, পরিবেশ ধ্বংসকারী কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্প ইত্যাদি ইস্যুতেও তারা নীরব। অথচ তাদের জনপ্রিয়তা এবং রাজনীতি সম্পৃক্ততা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত, যা ভারতে দেখা যায়। বিষয়টি যদি আপনার মতো করে ব্যাখ্যা করেন।  মঞ্জুঃ   দিল্লিতে আমার অবস্থানকালকে আমি নানা দিক থ...

কানের কাছে নারী কন্ঠ

  স্বপ্নের ঐশ্বর্য   || কাজী জহিরুল ইসলাম ||   ছুটির দিন। লম্বা সময় ধরে ঘুমাবো। কিন্তু তার আর উপায় নেই। কানের কাছে নারী কন্ঠ। বেশ আত্মবিশ্বাসী কন্ঠ। ক্রমাগ ত  কথা বলে যাচ্ছেন এক অপরিচিতা। আমি লাফ দিয়ে উঠি। কে তিনি ?  আমার স্ত্রী বলেন ,  রুবানা হক ,  শোনো কী বলছেন। রুবানা হক প্রয়াত ব্যবসায়ী আনিসুল হকের স্ত্রী। আমাদের কৈশোর-উত্তীর্ণ কালে আনিসুল হক ছিলেন আমাদের হিরো। টিভি উপস্থাপনায় অন্য এক আধুনিকতা নিয়ে হাজির হন তিনি। এরপর আমরা ধীরে ধীরে তার ব্যবসায়ীক সাফল্য ,  সাংগঠনিক সাফল্য দেখতে দেখতে বড় হই। খুব সাম্প্রতিককালে ,  আনিসুল হকের মৃত্যুর পর ,  কেউ একজন বলেছিলেন ,  তার স্ত্রী রুবানা হকও খুব ভালো কথা বলেন। কিন্তু রুবানা হকের কথা শোনার সৌভাগ্য আমার হয়নি। দুই যুগ ধরে দেশের বাইরে থাকার কারণে এই সময়ে স্টার হয়ে ওঠা অনেকের সম্পর্কেই আমার ভালো ধারণা নেই।  তার কথায় এমন কিছু ছিল যে আমার পক্ষে ঘুমিয়ে থাকা সম্ভব হয়নি। আমি মুক্তিকে বলি ,  প্রথম থেকে দাও ,  পুরো বক্তৃতাটা আমি শুনতে চাই। আমি পরপর দুইবার তার পুরো বক্তব্যটা শুনি ,  ফ...