Skip to main content

জেনেভার পথে

জেনেভার পথে

কাজী জহিরুল ইসলাম


জাতিসংঘ অফিসের পায়ের কাছে এসে থামলো একটি বিশেষ বাস, যাবে ভিয়েনা ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে। আমি এবং রাও লাফ দিয়ে উঠে পড়ি। আর কেউ নেই। যাত্রী আমরা দুজনই। দানিয়ুব নদীর ওপর বিশাল ব্রিজ। ব্রিজে ওঠের আগে একটি গোল চত্বর প্রদক্ষিণ করলো বাসটি। তখনই লক্ষ্য করি, চত্বরের ভেতরে একটি ভাঙা টেবিলের ওপর ঝুঁকে পড়ে গোধূলী সন্ধ্যার আধো অন্ধকারে একজন মাঝবয়েসী লোক কি যেন খুঁজছে। ওর হাতে একটি মলিন কাগজ, পরনে কোড়া কাগজের মতো মলিন এবং ছেড়া শার্ট। নোংরা প্যান্ট। লোকটির মাথার চুল শীতের ন্যাড়া ডালপালার মতো ধুসর, দুপাশের কান ঢেকে নেমে এসেছে টেবিলের ওপর। রাও দেখেনি, আমি ওকে ডেকে দেখাই।

যখন আমরা দানিয়ুবের মাঝখানে, হঠাৎ দার্শনিকের মতো রাও বলে ওঠে, 

জাতি না পুছো সাধু কি

পুছ লি জিয়ে গ্নান

মোল কারো তালওয়ারি কা 

পাঢ়া রাহো দো মিয়ান। 

বোধ হয় গোল চত্ত্বরের, আপাত দৃষ্টিতে, অস্বাভাবিক লোকটিকে দেখে রাওয়ের কাছে সাধু-সন্ত কেউ মনে হয়েছে। আমি বলি এর অর্থ কি? ও ইংরেজিতে যা বলে তা বাংলা করলে দাঁড়ায়, সাধুর কি জাত তা জানতে চেয়ো না বরং তার জ্ঞানের খবর নাও। তরবারি কিসের তৈরি তা জানার চেয়ে জানো তরবারি কতটা ধারাল।

এই পঙ্কক্তিগুচ্ছ লিখেছেন মধ্যযুগের হিন্দী ভাষার কবি কাবীর দাস। কাবীর মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করলেও হিন্দুদর্শন দ্বারাই বেশি প্রভাবিত ছিলেন। তার কবিতা রহস্যে পূর্ণ। চার লাইনের প্রচুর স্লোক তিনি লিখেছেন। ভারতের হিন্দুদের কাছে তিনি শুধু কবিই না, দেবতাতূল্য একজন মানুষ। কাবীরের সকল কবিতার মূল সুর হচ্ছে ভালোবাসা। তিনি বলেন, কবি তো সে-ই যে বিশ্বাস করে শত্রুতা দিয়ে শত্রু নিধন করা যায় না।

কাটখোট্টা আইটি পেশার লোক রাও হঠাৎ কবিতা, দর্শন, ধর্ম এসব নিয়ে আলোচনা শুরু করে দিয়েছে। ওর হয়েছে কি? সঙ্গ দোষে লোহা ভাসে? মুক্তি প্রায়শই বলে, তোমার সংস্পর্শে এলেই লোকজন কবিতা লিখতে শুরু করে, রাওও কি নিউ ইয়র্কে গিয়ে কবিতা লিখতে শুরু করবে?

করোনা আতঙ্কে ভুগছে ইওরোপ। একটি পুরো বাসে আমরা দুজন মাত্র যাত্রী। ভিয়েনা এয়ারপোর্ট ফাঁকা। চেক-ইনের কোনো লাইন নেই, অস্ট্রিয়ান এয়ারওয়েজের তিনজন গ্রাউন্ড স্টাফ হাত বাড়ালো আমাদের দিকে। তৃতীয় জনকে হতাশই হতে হলো। আমরা আমাদের পাসপোর্ট তুলে দিলাম একজন নারী আর একজন পুরুষ কর্মীর কাছে। বোর্ডিং পাসের বারকোড ছোঁয়াতেই একটি গেইট খুলে গেলো। ওমা, ওপাশে সিকিউরিটি চেক এর সারি সারি বেল্ট ফাকা, নিরাপত্তা কর্মীরা একটি ভুতুড়ে বিমান বন্দরে দাঁড়িয়ে আছে কোনো এক জুজুর ভয়ে। একজনও যাত্রী নেই। দুজন এশিয়ান যাত্রীর দিকে ওরা সন্দেহের চোখে তাকাচ্ছে যদিও কিন্তু যথেষ্ঠ সম্মানজনক ব্যবহারই করলো।

সিকিউরিটি পেরিয়ে আমরা ডিউটি ফ্রি শপগুলোর ভেতর দিয়ে বোর্ডিং গেইটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। শুধু বিক্রয়কর্মীরা ছাড়া আর কোনো লোক নেই। করোনা বিষয়ে আমার কোনো ভীতি নেই কিন্তু এই নির্জনতা আমার মধ্যে কিছুটা ভীতি সঞ্চার করছে। মনে হচ্ছে মুভিতে দেখা দৃশ্যের মতো এক পরিত্যক্ত বিমান বন্দরে আমরা পথ ভুলে এসে পড়েছি। যে কোনো সময় ভয়ঙ্কর একটা কিছু ঘটে যাবে।


Comments

Popular posts from this blog

অসাধারণ এই শিল্পীর জীবনের গল্প বড় করুণ

  [এই সময়ের অত্যন্ত প্রতিভাবান শিল্পী সারফুদ্দিন আহমেদ। বাড়ি পশ্চিমবঙ্গে। আর্ট কলেজে খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করেন ,  আর শুধু ছবি আঁকেন। নানান মাধ্যমে ,  নানান বিষয়ের ছবি। সারফুদ্দিন আহমেদের ছবি থেকে চোখ ফেরানো যায় না ,  আপনাতেই ওঁর নান্দনিক সৃষ্টিকর্মে দৃষ্টি আটকে যায় ,  কী জল রঙ ,  কী অ্যাক্রিলিক ,  কিংবা স্রেফ পেন্সিলের ড্রয়িং। এই গুণী শিল্পীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কবি কাজী জহিরুল ইসলাম। সাক্ষাৎকারটি এখানে উপস্থাপন করা হলো।]       ভারত আমাকে চোখ দিয়েছে ,  বাংলাদেশ দিয়েছে দৃষ্টি -     সারফুদ্দিন আহমেদ     কাজী জহিরুল ইসলামঃ  ব্যাক গ্রাউন্ডে তবলা বাজছে আপনি ছবি আঁকছেন কাচের ওপর।    এই যে বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে ছবি আঁকা, এই ছন্দটা ছবিতে কিভাবে ধরেন? আর কোনো শিল্পী ছবি  আঁ কার সময় যন্ত্রানুসঙ্গ ব্যবহার করেছেন?   সারফুদ্দিন আহমেদঃ   কাঁচ নয়,   এটি এক বিশেষ ধরনের কাপড়-নেট। এই নেটের উপরে বর্তমানে আমার এক্সপেরিমেন্ট চলছে।    জহিরুলঃ ও ,  ফেইসবুকে যখন ছবিটি দেখি কাচের মতো ...

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জুর সাক্ষাৎকার || অষ্টম পর্ব ||

[লেখক, সাংবাদিক, অনুবাদক আনোয়ার হোসেইন মঞ্জুর সাক্ষাৎকারের অষ্টম  পর্ব আজ প্রকাশ করা হলো। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কবি কাজী জহিরুল ইসলাম।]          দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ বাসস - কে অকার্যকর করেছে  – মঞ্জু    জহিরুলঃ  আপনি ফেলোশিপ নিয়ে দিল্লীতে ছয়মাস ছিলেন, ব্যক্তিগত আগ্রহ এবং পেশাগত অভ্যাসের কারণে কাছে থেকে দেখার/বোঝার চেষ্টা করেছেন ভারতের এবং উপমহাদেশের রাজনীতি। আমরা দেখি ভারতের রাজনীতিতে গায়ক, নায়ক, লেখক, সাংবাদিকের আবির্ভাব ঘটে সব সময়ই এবং তারা রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও রাখেন। বাংলাদেশে এই ধারা খুব সম্প্রতি শুরু হলেও আমাদের জনপ্রিয় খেলোয়াড়, শিল্পীরা নিজেদের অর্থনীতি সমৃদ্ধ করা ছাড়া রাজনীতিতে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেন না। এমন কি ধর্ষণ, অন্যদেশকে ট্রানজিট প্রদান, উপর্যুপরি সড়ক দূর্ঘটনা, পরিবেশ ধ্বংসকারী কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্প ইত্যাদি ইস্যুতেও তারা নীরব। অথচ তাদের জনপ্রিয়তা এবং রাজনীতি সম্পৃক্ততা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত, যা ভারতে দেখা যায়। বিষয়টি যদি আপনার মতো করে ব্যাখ্যা করেন।  মঞ্জুঃ   দিল্লিতে আমার অবস্থানকালকে আমি নানা দিক থ...

শিল্প কী?

  আমার শিল্পভাবনা || কাজী জহিরুল ইসলাম ||   যখন থেকে, জেনে বা না জেনে, লেখালেখির সঙ্গে জড়িয়েছি, তখন থেকেই এই বিতর্কের সঙ্গেও জড়িয়ে গেছি, শিল্পের জন্য শিল্প না-কী জীবনের জন্য শিল্প। এই বিতর্কের অবসান ঘটাতে হলে শিল্প কী তা উপলব্ধি করা দরকার। আমি খুব সতর্কতার সাথে  ‘ উপলব্ধি ’  শব্দটি ব্যবহার করছি,  ‘ জানা ’  দরকার বলছি না। আমি সাধারণত বিখ্যাত মানুষের উদ্ধৃতি দিয়ে কোনো ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই না। প্রবন্ধ লেখার প্রচলিত ধারা হচ্ছে তথ্য-উপাত্ত এবং বিখ্যাতদের সংজ্ঞার আলোকে কোনো ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করা। আমি এই ধারা থেকে বের হয়েই কিছু লিখতে চাই। আমি শুধু লিখতে চাই আমার উপলব্ধির কথা। এবং এ-ও বলি, আমার উপলব্ধির যেটুকু আপনার ভালো লাগে সেটুকুই আপনি নেবেন, আমি কোনো সংজ্ঞা তৈরী করতে চাই না যা অন্যদের গ্রহন করতে হবে। তবে আমি সকল বিখ্যাত মানুষের কথাই জানতে চাই, পড়তে চাই। তারা কী লিখেছেন, বলেছেন তা জানার আগ্রহ আমার রয়েছে। আরো সুস্পস্ট করে যদি বলি, আমি সকলকেই গ্রহণ করতে চাই, কিন্তু দেবার সময় শুধু আমারটাই দেব, আমার মত করে।  মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক (সৃজনশীল এবং মননশীল) ক্...