Skip to main content

ফ্রাঙ্কফুর্ট টু বুদাপেস্ট


ফ্রাঙ্কফুর্ট টু বুদাপেস্ট

কাজী জহিরুল ইসলাম


আকাশে ধাতব ডানা মেলে দিয়েছে লুফথানসার রূপালি ঈগল। শন পাপড়ির মতো নরোম মেঘ কাচের জানালা ছুঁয়ে ছুয়ে ফিরে যাচ্ছে, পায়ের নিচে ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে ফ্রাঙ্কফুর্ট। রাও প্লেনের জানালায় উঁকি দিয়ে বলে, অফ ইডাজিয়েন ফ্রাঙ্কফুর্ট। আমি বলি অফ ইডাজিয়েন মারিনো। 

দেড় ঘন্টার ফ্লাইট। নীল ইউনিফর্ম পরা ক্রুরা বেশ দ্রুত গতিতে কাজ করছে। এই সময়ের মধ্যেই খাবার এবং পানীয় সার্ভ করতে হবে। একজন বয়স্কা জার্মান নারী, যার ছোটো চুল সজারুর কাটার মতো কপাল থেকে ঘাড় অবধি একটি সাঁকো তৈরি করে মাথাটাকে নদীর মতো দুভাগ করে দিয়েছে, তিনি রাগী রাগী মুখে অদ্ভুত এক হাসি ধরে রেখে হাঁটাহাঁটি করছেন। মাথার দু'পাশের চুল প্রায় কামানো। আঁটোসাটো পোশাক পরা ক্ষিনাঙ্গী নারী রোবটের মতো প্লেনের এমাথা- ওমাথা হাঁটছেন আর অন্য দুজন, যারা বয়সে তরুণ, একজন নারী আর একজন পুরুষ, ভয়ে তটস্থ। বুঝতে পারছি ছিপছিপে বুড়িটিই ওদের প্রধান।

একটা বিয়ার আর স্যান্ডুইচ খেতে খেতেই ক্যাপ্টেনের কন্ঠ শোনা গেল। দেড় ঘন্টার ফ্লাইট অবতরণের সময় এসে গেছে। স্মুথ ল্যান্ডিং। জার্মান পাইলটের তারিফ করতেই হয়। সাধারণত ছোটো প্লেনগুলোর ল্যান্ডিং খুব বাজে হয়।

ব্রিজ পেরিয়ে হাঙ্গেরি সীমান্তে পা রাখতেই ঝুপ করে বিদ্যুৎ চলে গেল। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। আমাদের সামনে যে দু'চারজন যাত্রী কিছুটা এগিয়ে গিয়েছিল ওরা ভূত দেখার মতো চিৎকার করে ফিরে এলো। সবাই মুহূর্তের মধ্যেই থমকে দাঁড়ালো, যেন এক পা এগুলেই "করোনা" দানব গায়ের ওপর হামলে পড়বে। এক লোকের নারী সঙ্গী ভিড় এড়াতে কিছুটা এগিয়ে সামনে দাঁড়াতে চাইলে লোকটি তৃতীয় বৈশ্বিক পুরুষের মতো খেকিয়ে ওঠে। আমি বেশ গলা চড়িয়ে একটি নৈর্ব্যক্তিক সংলাপ ছেড়ে দিই, "এভাবেই বুঝি তোমরা অতিথিদের স্বাগত জানাও!"

মিনিট খানেকের মধ্যেই আলো জ্বলে উঠলে সকলের মধ্যে চাঞ্চল্য তৈরি হয়। কোনো এস্কেলেটর বা লিফট নেই। সিঁড়ি ভেঙেই আমাদের নিচে নামতে হলো। ইলেকট্রনিক বোর্ডে বেল্ট নাম্বার দেখে নিচ্ছে রাও। আমার কোনো চেক ইন লাগেজ নেই। হ্যান্ডলাগেজ রাওয়ের জিম্মায় রেখে টয়লেট খুঁজতে ছুটে যাই। এতো পরিচ্ছন্ন টয়লেট এবং ফিডব্যাক বাটন দেখে সত্যিই অবাক হই। টয়লেটের দরোজায় বিশাল কন্টেইনার ভর্তি হ্যান্ড-স্যানিটাইজার। এই ব্যবস্থা ফ্রাঙ্কফুর্টেও দেখেছি। বাইরে হ্যান্ড-স্যানিটাইজার আর ভেতরে একটি ইলেকট্রনিক প্যানেল। ওতে তিনটি বুতাম। সবুজ, হলুদ আর লাল। সবুজ বুতামে হাসি, হলুদে স্বাভাবিক আর লালে গোমরা মুখের ইমোজি। আমার ইচ্ছে হলো তিনবার সবুজ বুতাম চাপি। প্রথমবার এতো পরিচ্ছন্ন টয়লেটের জন্য, দ্বিতীয়বার করোনার জন্য, তৃতীয়বার বাংলাদেশের পাবলিক টয়লেটগুলো এতো নোংরা কেন, সেই দুঃখে। 

খুব দ্রুত লাগেজ পেয়ে গেল রাও। ফর্শা গায়ে কালো পোশাক পরা এক উর্বশী হাতে একটি বিজ্ঞাপনের বোর্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ওতে লেখা ট্যাক্সি। মেয়েটি আমাদের দিকে এগুতে এগুতে প্রায় গায়ের ওপরই উঠে যাচ্ছিল। আমি সাধারণত এসব ফাঁদে পা দেই না। আজ দিলাম। ওকে এড়ানোর কোনো সাধ্য ছিল না। এবং আমরা এতে ঠকিনি একটুও। দুজনের জন্য মাত্র ত্রিশ ডলার ভাড়া। মেয়েটি আমাদের বেশ ভালোই পটাতে পেরেছে। শুধু হোটেলে যাওয়ার ট্যাক্সিই না, ওর কাছ থেকে আরো ৭০ ডলার দিয়ে দুটো "হপ অন হপ অফ" বাসের টিকেটও কিনে নিই।

বিশেষভাবে নির্মিত খুব সুন্দর একটি মিনিভ্যানে চড়ে ত্রিশ মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে যাই দানিয়ুব নদীর পাড়ে অবস্থিত আর্ট হোটেলে। পথে আমরা দুবার হেসেছি। একবার এস্টোরিয়া এবং অন্যবার নিউইয়র্ক ক্যাফে দেখে। পরে জেনে নিয়েছি নিউইয়র্ক ক্যাফে পৃথিবীর সবচেয়ে ডেকোরেটেড ক্যাফে। এখানে অনেক বিখ্যাত মানুষ এসেছেন, তাদের একজন দালাইলামা। এটি চালু হয়েছে ১৮৯৪ সালে।


Comments

Popular posts from this blog

অসাধারণ এই শিল্পীর জীবনের গল্প বড় করুণ

  [এই সময়ের অত্যন্ত প্রতিভাবান শিল্পী সারফুদ্দিন আহমেদ। বাড়ি পশ্চিমবঙ্গে। আর্ট কলেজে খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করেন ,  আর শুধু ছবি আঁকেন। নানান মাধ্যমে ,  নানান বিষয়ের ছবি। সারফুদ্দিন আহমেদের ছবি থেকে চোখ ফেরানো যায় না ,  আপনাতেই ওঁর নান্দনিক সৃষ্টিকর্মে দৃষ্টি আটকে যায় ,  কী জল রঙ ,  কী অ্যাক্রিলিক ,  কিংবা স্রেফ পেন্সিলের ড্রয়িং। এই গুণী শিল্পীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কবি কাজী জহিরুল ইসলাম। সাক্ষাৎকারটি এখানে উপস্থাপন করা হলো।]       ভারত আমাকে চোখ দিয়েছে ,  বাংলাদেশ দিয়েছে দৃষ্টি -     সারফুদ্দিন আহমেদ     কাজী জহিরুল ইসলামঃ  ব্যাক গ্রাউন্ডে তবলা বাজছে আপনি ছবি আঁকছেন কাচের ওপর।    এই যে বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে ছবি আঁকা, এই ছন্দটা ছবিতে কিভাবে ধরেন? আর কোনো শিল্পী ছবি  আঁ কার সময় যন্ত্রানুসঙ্গ ব্যবহার করেছেন?   সারফুদ্দিন আহমেদঃ   কাঁচ নয়,   এটি এক বিশেষ ধরনের কাপড়-নেট। এই নেটের উপরে বর্তমানে আমার এক্সপেরিমেন্ট চলছে।    জহিরুলঃ ও ,  ফেইসবুকে যখন ছবিটি দেখি কাচের মতো ...

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জুর সাক্ষাৎকার || অষ্টম পর্ব ||

[লেখক, সাংবাদিক, অনুবাদক আনোয়ার হোসেইন মঞ্জুর সাক্ষাৎকারের অষ্টম  পর্ব আজ প্রকাশ করা হলো। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কবি কাজী জহিরুল ইসলাম।]          দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ বাসস - কে অকার্যকর করেছে  – মঞ্জু    জহিরুলঃ  আপনি ফেলোশিপ নিয়ে দিল্লীতে ছয়মাস ছিলেন, ব্যক্তিগত আগ্রহ এবং পেশাগত অভ্যাসের কারণে কাছে থেকে দেখার/বোঝার চেষ্টা করেছেন ভারতের এবং উপমহাদেশের রাজনীতি। আমরা দেখি ভারতের রাজনীতিতে গায়ক, নায়ক, লেখক, সাংবাদিকের আবির্ভাব ঘটে সব সময়ই এবং তারা রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও রাখেন। বাংলাদেশে এই ধারা খুব সম্প্রতি শুরু হলেও আমাদের জনপ্রিয় খেলোয়াড়, শিল্পীরা নিজেদের অর্থনীতি সমৃদ্ধ করা ছাড়া রাজনীতিতে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেন না। এমন কি ধর্ষণ, অন্যদেশকে ট্রানজিট প্রদান, উপর্যুপরি সড়ক দূর্ঘটনা, পরিবেশ ধ্বংসকারী কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্প ইত্যাদি ইস্যুতেও তারা নীরব। অথচ তাদের জনপ্রিয়তা এবং রাজনীতি সম্পৃক্ততা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত, যা ভারতে দেখা যায়। বিষয়টি যদি আপনার মতো করে ব্যাখ্যা করেন।  মঞ্জুঃ   দিল্লিতে আমার অবস্থানকালকে আমি নানা দিক থ...

শিল্পী কাজী রকিবের সাক্ষাৎকার || পর্ব ২ ||

 'কাজের ছেলে মন্তাজ ছিলো আমার প্রথম আর্ট শিক্ষক'   [কাজী রকিব বাংলাদেশের একজন গুণী শিল্পী। রাজশাহী আর্ট কলেজের একজন প্রতিষ্ঠাতা-শিক্ষক। কলেজের প্রথম ক্লাসটি নেবার কৃতিত্বও তার। নিরন্তর ছবি আঁকেন। নানান মাধ্যমে ,  নানান ভাবনার ছবি। বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউয়য়র্কে সস্ত্রীক বসবাস। তার স্ত্রী মাসুদা কাজীও একজন গুণী শিল্পী। বৈচিত্রপ্রিয় এই শিল্পীর একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন কবি কাজী জহিরুল ইসলাম। ধারাবাহিকভাবে তা এখানে প্রকাশ করা হবে। আজ উপস্থাপন করা হলো দ্বিতীয় পর্ব।] পর্ব – ২    জহিরুলঃ  আপনার জন্ম এবং বেড়ে ওঠার গল্প শুনতে চাই। পারিবারিক ,  প্রাকৃতিক ,  সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশ কেমন ছিল ,  শৈশব-কৈশোরে ? রকিবঃ   আমার জন্ম চট্টগ্রামের আসকার দীঘির পূব-দখিন পাড়ে ,  ৮৮ হেমসেন লেনে। বাঁশের বেড়ার ঘর উপরে টিনের চালা। দুই কামড়ার ঘর ,  সামনে বারান্দা এক চিলতে। পেছনে একটু ফাঁকা জায়গা তারপর রান্নাঘর। ঐ একটু ফাঁকা জায়গা ছোট বেলায় উঠান মনে হতো। সকালে মা রুটি বানাতেন ,  আব্বা রুটি ছি ঁ ড়ে কাককে খাওয়াতেন ,  কিছু কাক বারবা...