Skip to main content

শিহাব সরকারের কবিতা নিয়ে আমার প্রবন্ধ

বনগহনের নিবিড় হাতছানি  

কাজী জহিরুল ইসলাম 

 

বাংলা কবিতায় ব্যাপকভাবে স্লোগানের অনুপ্রবেশ ঘটেছে সত্তুরের দশকে। এই দশককে উচ্চকিতকেউ কেউ আরো একধাপ এগিয়েস্লোগান সর্বস্ব কবিতার দশক হিশেবেও সনাক্ত করেছেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এই দশকে স্লোগানসর্বস্ব কবিতা যা লেখা হয়েছে তার অধিকাংশই লিখেছেন পঞ্চাশ এবং ষাটের কবিরা। কবিতায় স্লোগান কতটা গ্রহণযোগ্য সে এক অন্য বিতর্কআজ সেই বিতর্কে না গিয়ে এই দশকের কজন প্রধান কবির একজন কবি শিহাব সরকারের কবিতা নিয়ে আলোচনা করবোতার কবিতায় স্লোগান কতোটা এসেছে তা দেখার চেষ্টা করবো এবং তার কবিতার বৈশিষ্ট্য শনাক্তকরনে সচেষ্ট হবো। হেলাল হাফিজরুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ এবং দাউদ হায়দার এই দশকের কবি হলেও এই তিনজন কবিকে সত্তুরের কবি হিশেবে যতোটা না দেখা হয় তার চেয়ে বেশী দেখা হয়আলোচনা/সমালোচনা করা হয়তাদের অন্য বৈশিষ্ট্যের কারণে। সত্তুরের কবি কে কেএই প্রশ্নের জবাবেবাংলা কবিতার দশকওয়ারী খোঁজখবর যারা রাখেন তাদের মুখেপ্রথমেই যে দুটি নাম উচ্চারিত হয় তারা হচ্ছেন আবিদ আজাদ এবং শিহাব সরকার।  



 

সত্তুরের কবিতার মূল সুর থেকে শিহাব সরকার বিচ্ছিন্ন থেকেছেনসম্ভবত সচেতনভাবেই। অর্থাৎ শিহাব সরকারের কবিতা উচ্চকিত তো নয়ইবরং খানিকটা যেন বেশিমাত্রায় ম্রিয়মান। তিনি মূলত রোমান্টিক ধারার কবি। এক ধরণের মুগ্ধতার ঘোরে আচ্ছন্ন তার কবিতা। ভাষাটি সাবলীল কিন্তু নিস্তরঙ্গ। 

 

হাইরাইজ উঠে গেলোকোথায় মাটিগাছতলা

আমাদের গলির মুখে ট্রাক থেকে

নামে ইট কাঠ লোহা বালু  

উঠছে ছতলা শপিং কমপ্লেক্স

হলুদ বাড়িটা ভাঙা হয়ে গেছে

নন্দী কুটিরের নাম মুছে যাবে পাড়ায়,

কোন সালে উঠেছিলো এ বাড়ি

জানা যেতো বরুণ নন্দীর কাছে

তাঁর ছেলেরা আছে কলকাতাশিলিগুড়ি

 

শ্যাওলা-ভেজা প্রাচীন ইটের স্তূপ সুরকি।

বাড়ি ভাঙা হয়ে গেছে

ফটকে বকুল গাছ লাল ধুলোতে ছাওয়া

দীর্ঘশ্বাস চাপে তরুণ স্থপতি-

দালান না ভেঙ্গেও দালান তোলা যায়

শতাব্দীর ধ্বনি লেগে ছিলো বাড়িটার গায়ে

 

কোনো বাড়ি থাকে না চিরতরে

বৃষ্টি রৌদ্র হাওয়ার নুন বুনো গুল্মলতা

আর সময়ের ক্ষুধার কাছে দালানের

স্পর্ধা ও যৌবন নিভে আসে

 

(কবিতাঃ এইসব বাড়িকাব্যগ্রন্থঃ মেরিলিন ঐ যে গুহা)

 

সময়ের ক্ষুধার কাছে দালানের/ স্পর্ধা ও যৌবন নিভে আসে’ এই পঙক্তিদ্বয়ের মধ্য দিয়ে কবিতাটি পৌঁছে যায় এক ভিন্ন উচ্চতায়। তিনি পাঠকের বোধে  প্রচন্ড নাড়া দিয়ে শুনিয়ে দেন নির্মম সময়ের ঘণ্টাধ্বনি। সকল স্পর্ধাই শেষ পর্যন্ত সময়ের কাছে অসহায়নতজানু। একই গ্রন্থের অন্য একটি কবিতায়ও তিনি সময়কে টেনেছেন নির্মমতার চালিকা শক্তি হিশেবে। অবশেষে স্মৃতি সব খায়যদিও/ থাকে চকিত মুখগানের কলিঅন্ধকার নদীও/ সহজ ঘুমের রাত্রিকে খুব টালমাটাল করে,/ ধুসর ক্যানভাসে অবিরল পাতা ঝরে/ মধ্যরাতে ঘুমুবার আগে শুভ্র রুমালে হলুদ/ স্মৃতির নিঃশ্বাস পড়েছেবুকে কোথাও বুদবুদ,/ দাগ থেকে যায়তিন যুগ পরেও মুছবে না?/ স্মৃতির ভিতরে পরম বাঁচাভাঁড়েরা তা বুঝবে না’ (ক্রিসেন্থিমাম)। কবিতাটির শেষ শব্দগুচ্ছ, ‘ভাঁড়েরা তা বুঝবে না অভিব্যক্তিটি  বাহুল্যঅনভিপ্রেত। এই শব্দগুচ্ছে কবির অসহিষ্ণু ব্যক্তিচরিত্রের প্রকাশ ঘটেছে। অন্তমিলের স্বার্থে অনেক কবিই এমন অপরিমিতিবোধের পরিচয় দিয়েছেন একজন প্রকৃত কবিকে এইসব বিষয়ে সচেতন থাকতে হয়।     

 

তিয়াত্তুর সাল থেকে বিরাশি সাল পর্যন্ত রচিত কবিতাগুলো নিয়ে বেরিয়েছে শিহাব সরকারের প্রথম কাব্যগ্রন্থ লাল যৌবন দিন। এই গ্রন্থটিই মূলত আমাদের সাহায্য করে খুঁজে পেতে সত্তুরের শিহাব সরকারকে। গ্রন্থটির শিরোনামে সত্তুর পুরোপুরি উপস্থিত। সদ্য স্বাধীন দেশের কুড়ি উত্তীর্ণ এক টগবগে তরুণের কাব্যগ্রন্থের শিরোনামে লাল যৌবন’ খুবই সঙ্গত এবং তাৎপর্যপূর্ণ। কিন্তু কাব্যগ্রন্থটির অভ্যন্তরে প্রবেশ করার সাথে সাথেই লাল যৌবন’ কোথাও হারিয়ে যায়সেখানে ভেসে ওঠে শান্তস্নিগ্ধধীর-স্থির এবং বেশ খানিকটা পরিণত কবির অবয়ব। 

 

নদীর ধারে যেতে যেতে মনে হয় যাচ্ছি জলভ্রমণে

বহতা স্রোতের প্রতি তোমার কী অদ্ভুত গাঢ় টান,

নদী একদিন পাহাড় তছনছ করে ছুটে এসেছে

আমাদের লোকালয়ে

তার দুধারে সমাহিত নিগুঢ় জনপদ।

দেখে আমরা চিত্তে খুব সুখ পাই

 

মানুষের পদ্মা ভোলগা দানিয়ুব ইত্যাদি প্রচুর

টলটলে উদ্দাম নদী আছে

জল আমাদের পূর্বপুরুষের ধমনীতে

কামনার ঝড় তুলেছিলো

এক সঙ্গে অনেক জল দেখে উদাস হয়ে পড়ি

বুকের ভিতরে এমন করে!

(চাঁদের আশ্চর্য ভূত) 

 

মধ্যদুপুরে এইসব মিশ্র তৎপরতা দেখে

আমার পায়ের ডিম শক্ত হয় ক্রমশ

উদ্ধত হয়ে ওঠে শিরদাঁড়া

চিৎকার করে বলিআমার কোনো স্মৃতি নেই দাহ নেই

আমি শুধু বাঁচবো।

বন্ধু পরমাত্মীয় থেকে রক্তবৈরী

যেখানে যাই খুব ভালোবাসা-টান মমতা-টান

তারপর সন্ধ্যা হয়রাত যত বাড়ে

আকাশ কেবলি উঁচুতে উঠতে থাকে

(রাত যত বাড়ে)

 

মোমবাতি জ্বেলে তুমি বসে আছোআমাকে

গতরাতের উল্টানো ইজেলতছনছ দোপাটি বাগান

দেখাবে বলে আলো উঁচু করে ধরেছিলে

চেতনা চৌচির করে কেন

এইসব আশ্লীলতারক্তজালিয়াতি

 

তাঁর চেয়ে ওষ্ঠে বিষ ছোঁয়ালে না কেন?’

(অন্ধকারে হরিৎ প্লাবনে)   

 

প্রথম কবিতাটিতে কবি নদীপ্রসঙ্গে মানুষের ভেতরের নদীর উদ্দামতাকে তুলে এনেছেন। মানুষের পদ্মা ভোলগা দানিয়ুব ইত্যাদি প্রচুর/ টলটলে উদ্দাম নদী আছে। সেই নদীতে ঢেউ ওঠেকখনো উথাল-পাথাল ঢেউসেই ঢেউয়ে পাড় ভাঙেমন ভাঙে আবার জেগে ওঠে প্রত্যাশার নতুন চর। নদী যেমন ভাসিয়ে নিয়ে যায়আবার আমাদের ফসলের/প্রত্যাশার ভূমিকে করে তোলে উর্বরানদীতে জেগে ওঠা নতুন চরে নতুন জীবনের উন্মেষ ঘটে। কবিতাটি পাঠককে এমন অনেক ভাবনার গভীরে নিয়ে যায়এলোমেলো করে দেয়। তবে কবিতায় ইত্যাদি’ শব্দটি খানিকটা অকাব্যিক প্রয়োগ হিশেবে প্রতীয়মান হয়েছে। রাত যত বাড়ে’ কবিতাটির কয়েক ছত্রে খানিকটা বিপ্লবের আভাস দেখা গেলেও তা মোমের স্নিগ্ধ আলোর মতোই রোমান্টিক। আমার কোনো স্মৃতি নেই দাহ নেই/ আমি শুধু বাঁচবো।/ বন্ধু পরমাত্মীয় থেকে রক্তবৈরী/ যেখানে যাই খুব ভালোবাসা-টান মমতা-টান/ তারপর সন্ধ্যা হয়রাত যত বাড়ে/ আকাশ কেবলি উঁচুতে উঠতে থাকে’ পঙক্তিগুচ্ছেযেন পূর্বনির্ধারিত এবং অবধারিতনিয়মের টানেই মুখ থুবড়ে নেতিয়ে পড়ে বিপ্লবসমর্পিত হয় প্রেমে। কখনো কখনো প্রেমেও মানুষ হয়ে ওঠে বিপ্লবীহয়ে ওঠে আগ্রাসী। অন্ধকারে হরিৎ প্লাবনে’ কবিতায় সেই আভাস জেগে উঠলেও তা চেতনা চৌচির করে কেন/ এইসব অশ্লীলতারক্তজালিয়াতি…’ প্রশ্নের ঘায়ে যেন আত্মহননের পথই বেছে নেয়।

 

সত্তুরের দশকের এই কবি বিপ্লবের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেন, ‘বিপ্লব ও ক্লোরোফরমে’ কবিতাটি লিখে। আমাদের মাঝখানে আর কখনো ছিল না এমন মসৃণ সেতু/ পুরুষ তার নারীকে নিয়ে যাচ্ছে গহীন মধুচন্দ্রিমার তীরে/ এসব আবোল তাবোল বশীকরণের চাপে/ রক্তে জমে গিয়েছে অনেক চোলাই মদ/ তুমি কি জানো বিপ্লব ও ক্লোরোফরমে দূরত্ব খুব বেশী নয়?’ এরপর ক্লোরোফরমের প্রভাবে কবি শিহাব সরকারের বিপ্লব ঘুমিয়ে পড়ে চিরদিনের মতো।

 

রোমান্টিক ধারার এই কবি পয়ার রচনায় দক্ষতা অর্জন করেছেন একেবারে গোড়া থেকেই। অক্ষরবৃত্ত এবং মুক্ত ছন্দেই তিনি লিখেছেন তার আধিকাংশ কবিতা। আঙ্গিকগত বৈচিত্রহীনতা কবি শিহাব সরকারের একটি দুর্বল দিক। গদ্যছন্দে পয়ার রচনা করতে গিয়েও তিনি তাঁর নিজস্ব একটি কাব্যভাষা নির্মাণ করতে পারেন নি। তাই তাকে একজন স্বতন্ত্র কবি হিশেবে শনাক্ত করা উত্তর প্রজন্মের জন্য কষ্টসাধ্য হবে। ত্রিশের এবং পঞ্চাশের কবিদের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে তার কবিতায়। রয়েছে ঔপনিবেশিক শব্দপ্রীতি। 

 

কদাচিৎ দেখি তিনি তার নিজস্ব আঙ্গিনা থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করেছেনতবে সে চেষ্টা খুব সফল হয়নি।  অল্প কিছু সমিল পঙক্তি রচনার চেষ্টা করেছেন সেখানেও নবিশসুলভ ভুল রয়ে গেছে। এরকম কিছু উদ্ধৃতি দেওয়া যেতে পারে।

 

মুক্তধারা থেকে প্রকাশিত জয় হবে দীর্ঘশ্বাসে’ কাব্যগ্রন্থের দেখতে দেখতে’ কবিতায় তিনি মেঘের সাথে চেখে’ এবং দীঘির সাথে লিখি’ অন্তমিল ব্যবহার করেছেন। বসন্ত বাছে মানুষ’ কবিতায় ডাকি না’ এর সাথে তিনি অন্তমিল দিয়েছেন, ‘মাছিকে না। স্যুভেনির’ কবিতায় তিনি নীরব মৃত্যুর সাথে আমারও মৃত্যু’ অন্তমিল দিয়েছেন। শান্তি যা তা বনগহনে’ কবিতায় তিনি কুশলীর সাথে বুলি’ এবং পাতা ঝরা’ র সাথে মিল দিয়েছেন সালোমেরা’ শব্দের। 

 

শিল্পতরু থেকে প্রকাশিত করো গান বন জ্যোৎস্নার’ কাব্যগ্রন্থের এ মুকুটে’ কবিতায় যখন তিনি দাড়ান রাজা’ র সাথে মানায় রাজা’ মিল দেন তখন এটাই স্পস্ট হয়ে ওঠে যে অন্তমিল নির্মাণে এই কবি একেবারেই আনাড়ি।  

 

যে গদ্যছন্দ পঞ্চাশের কবিদের বিচরণক্ষেত্র তাকেই আরাধ্য হিশেবে বেছে নিয়েছেন শিহাব সরকার। সেখানেই তিনি স্বচ্ছন্দ। গদ্যছন্দের ভুবন থেকে বেরিয়ে এসে আঙ্গিকগত বৈচিত্র নির্মাণের প্রয়াসে তিনি খানিকটা সফলতা অর্জন করেছেন এই কবিতাটিতে-  

 

সহসা আমার ইচ্ছে হলো এক লহমা থামি

ফণীমনসায় রক্তাক্তজানেন অন্তর্যামী

ভুল বুঝবার অবকাশে রাত্রি দীর্ঘ হয়

ফুল থেকে দূরত্ব বাড়েখারাপ হাওয়া বয়।

 

এই বিরতি ভুডু নৃত্যেরখুলিতে মদ খাওয়ার

তড়িতি ওকে ত্যাজ্য করোসব নগ্ন-অনাচার’,

 

কথায় কথায়ভ্রমণে বা রুদ্ধদ্বার বৈঠকে

ঝরায় ওরা মরিচগুড়ো পতিতজনের ত্বকে

এমন হবে জেনেই খুঁজি অমাবশ্যার কোল

তেমন পাপ করেছি কইঅযথা কল্লোল।

 

বিস্মরণের মুহূর্তগুলো কোন নদীতে যায়?

বনগহনের হাতছানিতে যুবতী নিরুপায়।

 

এ ধরণের রহস্য কিছু থাকুক ধমনীতে

মনপবনের নাও ছুটেছে প্রলয় রজনীতে।

 

এমনও হতে পারে কিন্তুফিরে আসবো না

সে মনও মরেশখ ছিলো যার নির্জনে জাল বোনা।

 

(প্রলয় রজনীতেকাব্যগ্রন্থঃ ব্যাবিলন এক্সপ্রেস)

 

অন্য অনেকের মতো তিনিও অগ্রজ কবিদের নিয়ে বেশ কিছু কবিতা লিখেছেনএটি তাঁর অগ্রজের প্রতি শ্রদ্ধাবোধেরই বহিপ্রকাশ যা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবী রাখে। তিনি পঞ্চাশের দুই প্রধান কবি শহীদ কাদরী এবং শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে লিখেছেন যথাক্রমে, ‘টেলিফোনে শহীদ কাদরী’ এবং চলি হেচলি কোলকাতাচলি কৃত্তিবাস। তিনি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়েও একটি কবিতা লিখেছেন, ‘আজ বর্ষবরণের যত উৎসব। তিনটি কবিতাই সংকলিত হয়েছে তাঁর ব্যাবিলন এক্সপ্রেস’  কাব্যগ্রন্থে। 

 

নতুন ধরণের উপমাউতপ্রেক্ষানতুন ধরণের শব্দবিন্যাস শিহাব সরকারের কবিতায় তেমন পরিলক্ষিত হয় না। বরং তিনি কিছু বিদেশী শব্দ এবং বিদেশী নাম ব্যবহার করে আধুনিকতার জানান দিতে চেয়েছেন বলেই মনে হয়েছেযা ত্রিশের এবং পঞ্চাশের কবিদের একটি বৈশিষ্ট্য ছিল। ভাল কবিতায় পঙক্তির যে শক্তি থাকে যা পাঠকের বোধকে প্রচন্ডভাবে নাড়া দেয়স্যামুয়েল কোলরিজের ভাষায়, ‘শ্রেষ্ঠতম শব্দের শ্রেষ্ঠতম বিন্যাস’, তা শিহাব সরকারের কবিতায় বিরল হলেও একেবারে অনুপস্থিত নয়। তোমার ক্ষত্রিয়’ কাব্যগ্রন্থের চলে এসো মঞ্চের পেছনে’ কবিতাটির ভিন্ন উপস্থাপন পাঠককে আন্দোলিত করে-

 

তুমি যেখানেই থাকো নমিতা

এলোমেলো সাজঘরে প্যান্ডেলের মাঝখানে লোলুপ জটলায়

এক্ষুণি চলে এসো মঞ্চের পেছনে

তোমার জন্য পৃথিবীর সমস্ত ঘড়ি

এগারোটা ঊনষাট মিনিটে স্থির হয়ে আছে

তোমার জন্য আমরা আজ ঘুমুতে পারছি না

 

গাছ ও পাখিদের আরো একদিন আয়ু কমে গেলো

বুড়ো হয়ে এলো বামন

খঞ্জ বদমাশতুচ্ছ ও মহামানবেরা

পৃথিবী ও তারাপুঞ্জের বলয়ে বৃত্তাকার ঘুরে ঘুরে

লক্ষ কোটি আলোকবর্ষের একটি মুহূর্তে

আরো কিছুটা ম্লান হয়ে এলো চাঁদ

 

তুমি কেন এই ভৌতিক মুখোশের নাচে

নৃত্যপটীয়সী অমোঘ নায়িকার ভূমিকায় ডুবে আছো

এইসব বিচলিত যৌনকাতর যুবকেরা

ভোরবেলা তোমার ছিন্নভিন্ন শরীরের ছাইঘৃণা ও বমন থেকে

তুলে আনবে বিনাশী পদ্মের প্রতীক,

আমাদের শৈশবের বুক ফেটে যাচ্ছে

তোমার মা ও মাতামহীদের অভিশপ্ত জারজ ফুলের ঘ্রাণে

 

আমরা তোমাকে মধুর মৃত্যুর মতো চাই সাধারণ বাঙালী নারী

তোমার জন্য নমিতাশুধু তোমার জন্য

পৃথিবীর সমস্ত ঘড়ি...

 

এই কবিতায় তিনি বিষয়বস্তুকে একটি গল্পের মাধ্যমে উপস্থাপন করেছেন এবং শেষের দিকে গিয়ে প্রত্যাশাটি ব্যক্ত করেছেন। কখনো কখনো কবিতায় গল্পের দাবী প্রবল হয়ে ওঠেকবি শিহাব সরকার এই বিষয়ে উদাসীন থেকেছেন আধিকাংশ সময়েই। একই কাব্যগ্রন্থের তুমি ও তোমার কাকাতুয়া’ কবিতাটিকেও তিনি একটি গল্পের মাধ্যমে উপস্থাপন করেছেন বলে তার বিবরণমূলক কবিতার ভিড়ে এটিও প্রোজ্জল হয়ে ওঠে।

 

উত্থান হয়ে গেল কাল

নতুন দেয়াল উঠছেরাস্তায় আলোকোজ্জ্বল কাতানজামদানী

জন্মদিনের মঞ্চে বিষণ্ণ হচ্ছেন কবিবড় একা

তুমি ও তোমার পোষা কাকাতুয়া

আমার পদ্যে চমৎকার উপমা হবে

 

এই গল্পের শ্লেষটি আরো তীব্র হয়ে ওঠে কবিতার শেষ অংশে গিয়ে যখন কবি বলেন-

 

শহীদ মিনারে একজন অনার্য ফুল দিতে এসেছিলো বলে

অপর আর্যরা ক্রোধে ঘৃণায় ভেঙে দিতে চায় মিনার স্তম্ভ

দীঘির নীচে পড়ে থাকা শিল্পকলার গৌরব

একদিন ভোরে উঠে আসবেই

বসে থাকতে থাকতে একশ পেরুলো বোকা প্রত্নতত্ত্ববিদ

কাঁচাসোনা রোদে তোমার ও আমার রাষ্ট্রদ্রোহিতা আশ্চর্য স্বাভাবিক

 

বনগহনের এক নিবিড় হাতছানি তার কবিতার শরীরজুড়ে বসন্তের হাওয়ার মতো দুলতে দুলতে প্রবাহিত হচ্ছেএকই তালেএকই লয়ে। স্নিগ্ধতার এই ঘোর পাঠককে সহজেই কাছে টানেনিমগ্নতার আবেশ তৈরী করে কিন্তু বৈচিত্রহীনতার কারণে তা পাঠককে দীর্ঘ সময় ধরে রাখতে পারে না। এই নিস্তরঙ্গ সুন্দর একসময় একঘেয়ে হয়ে আসে। 

 

(বাংলা নিউজ টুয়েন্টিফোর ডট কম এ প্রকাশিত)

Comments

Popular posts from this blog

অসাধারণ এই শিল্পীর জীবনের গল্প বড় করুণ

  [এই সময়ের অত্যন্ত প্রতিভাবান শিল্পী সারফুদ্দিন আহমেদ। বাড়ি পশ্চিমবঙ্গে। আর্ট কলেজে খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করেন ,  আর শুধু ছবি আঁকেন। নানান মাধ্যমে ,  নানান বিষয়ের ছবি। সারফুদ্দিন আহমেদের ছবি থেকে চোখ ফেরানো যায় না ,  আপনাতেই ওঁর নান্দনিক সৃষ্টিকর্মে দৃষ্টি আটকে যায় ,  কী জল রঙ ,  কী অ্যাক্রিলিক ,  কিংবা স্রেফ পেন্সিলের ড্রয়িং। এই গুণী শিল্পীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কবি কাজী জহিরুল ইসলাম। সাক্ষাৎকারটি এখানে উপস্থাপন করা হলো।]       ভারত আমাকে চোখ দিয়েছে ,  বাংলাদেশ দিয়েছে দৃষ্টি -     সারফুদ্দিন আহমেদ     কাজী জহিরুল ইসলামঃ  ব্যাক গ্রাউন্ডে তবলা বাজছে আপনি ছবি আঁকছেন কাচের ওপর।    এই যে বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে ছবি আঁকা, এই ছন্দটা ছবিতে কিভাবে ধরেন? আর কোনো শিল্পী ছবি  আঁ কার সময় যন্ত্রানুসঙ্গ ব্যবহার করেছেন?   সারফুদ্দিন আহমেদঃ   কাঁচ নয়,   এটি এক বিশেষ ধরনের কাপড়-নেট। এই নেটের উপরে বর্তমানে আমার এক্সপেরিমেন্ট চলছে।    জহিরুলঃ ও ,  ফেইসবুকে যখন ছবিটি দেখি কাচের মতো ...

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জুর সাক্ষাৎকার || অষ্টম পর্ব ||

[লেখক, সাংবাদিক, অনুবাদক আনোয়ার হোসেইন মঞ্জুর সাক্ষাৎকারের অষ্টম  পর্ব আজ প্রকাশ করা হলো। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কবি কাজী জহিরুল ইসলাম।]          দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ বাসস - কে অকার্যকর করেছে  – মঞ্জু    জহিরুলঃ  আপনি ফেলোশিপ নিয়ে দিল্লীতে ছয়মাস ছিলেন, ব্যক্তিগত আগ্রহ এবং পেশাগত অভ্যাসের কারণে কাছে থেকে দেখার/বোঝার চেষ্টা করেছেন ভারতের এবং উপমহাদেশের রাজনীতি। আমরা দেখি ভারতের রাজনীতিতে গায়ক, নায়ক, লেখক, সাংবাদিকের আবির্ভাব ঘটে সব সময়ই এবং তারা রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও রাখেন। বাংলাদেশে এই ধারা খুব সম্প্রতি শুরু হলেও আমাদের জনপ্রিয় খেলোয়াড়, শিল্পীরা নিজেদের অর্থনীতি সমৃদ্ধ করা ছাড়া রাজনীতিতে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেন না। এমন কি ধর্ষণ, অন্যদেশকে ট্রানজিট প্রদান, উপর্যুপরি সড়ক দূর্ঘটনা, পরিবেশ ধ্বংসকারী কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্প ইত্যাদি ইস্যুতেও তারা নীরব। অথচ তাদের জনপ্রিয়তা এবং রাজনীতি সম্পৃক্ততা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত, যা ভারতে দেখা যায়। বিষয়টি যদি আপনার মতো করে ব্যাখ্যা করেন।  মঞ্জুঃ   দিল্লিতে আমার অবস্থানকালকে আমি নানা দিক থ...

কানের কাছে নারী কন্ঠ

  স্বপ্নের ঐশ্বর্য   || কাজী জহিরুল ইসলাম ||   ছুটির দিন। লম্বা সময় ধরে ঘুমাবো। কিন্তু তার আর উপায় নেই। কানের কাছে নারী কন্ঠ। বেশ আত্মবিশ্বাসী কন্ঠ। ক্রমাগ ত  কথা বলে যাচ্ছেন এক অপরিচিতা। আমি লাফ দিয়ে উঠি। কে তিনি ?  আমার স্ত্রী বলেন ,  রুবানা হক ,  শোনো কী বলছেন। রুবানা হক প্রয়াত ব্যবসায়ী আনিসুল হকের স্ত্রী। আমাদের কৈশোর-উত্তীর্ণ কালে আনিসুল হক ছিলেন আমাদের হিরো। টিভি উপস্থাপনায় অন্য এক আধুনিকতা নিয়ে হাজির হন তিনি। এরপর আমরা ধীরে ধীরে তার ব্যবসায়ীক সাফল্য ,  সাংগঠনিক সাফল্য দেখতে দেখতে বড় হই। খুব সাম্প্রতিককালে ,  আনিসুল হকের মৃত্যুর পর ,  কেউ একজন বলেছিলেন ,  তার স্ত্রী রুবানা হকও খুব ভালো কথা বলেন। কিন্তু রুবানা হকের কথা শোনার সৌভাগ্য আমার হয়নি। দুই যুগ ধরে দেশের বাইরে থাকার কারণে এই সময়ে স্টার হয়ে ওঠা অনেকের সম্পর্কেই আমার ভালো ধারণা নেই।  তার কথায় এমন কিছু ছিল যে আমার পক্ষে ঘুমিয়ে থাকা সম্ভব হয়নি। আমি মুক্তিকে বলি ,  প্রথম থেকে দাও ,  পুরো বক্তৃতাটা আমি শুনতে চাই। আমি পরপর দুইবার তার পুরো বক্তব্যটা শুনি ,  ফ...