Skip to main content

বেলাল চৌধুরীর কবিতা নিয়ে আমার গদ্য

জীবন খোঁজো শিল্পের তরী বেয়ে 

কাজী জহিরুল ইসলাম 

 

শিল্পের জন্য শিল্প না জীবনের জন্য শিল্প’ এই বিতর্ক আজ আর অমীমাংসিত কোনো বিষয় নয়। যে শিল্প শুধু শিল্পের জন্য তাওতো জীবনকে আনন্দ দেবার জন্যেউজ্জীবিত করার জন্যেইশেষমেষ তারও লক্ষ্য জীবন। কাজেই শিল্পএবং শিল্পের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম কবিতাজীবনেরই জন্য। ষাটের দশকের গুরুত্বপূর্ণ কবি বেলাল চৌধুরীও তার কবিতায় জীবনেরই বিভাস রচনা করেছেন। 




এক সঙ্গে দুজন মানুষ হাতে হাত, /মাথার মধ্যে লক্ষ লক্ষ ভুলের ভ্রমর গুঞ্জন-/ হুল ফোটানো ব্যথায় কাতর শরীর/ চোখে নিরঙ্কুশ নীলাঞ্জনলালাতে পরাগ গন্ধ/ ভোরের কোমল অভ্রফুল।/ লেলিহান আগুনের আঁচে/ তেতে ওঠা দুজন মানুষ, /গনগনে লাল লোহার শরীর / তরঙ্গ চূড়ায় উঠে আবার আছড়ে পড়ে তটে (কবিতাঃ নীলিমায় বিলীন একটি দৃশ্য)।  এই ছোট্ট কবিতাটিতে তিনি মানব-মানবীর মিলন দৃশ্যের যে শৈল্পিক বর্ণনা করেছেন তাঁর চূড়ান্ত লক্ষ্য জীবনের বিস্তারএর মধ্যে লক্ষ লক্ষ ভুলের ভ্রমর গুঞ্জন’ যেমন জীবনের টানাপোড়েনের ইঙ্গিত দিচ্ছে আবার ভোরের কোমল অভ্রফুল’ জানিয়ে দেয় ভালোবাসার কথাস্বপ্নের কথাযা দুজন মানুষকে পোড়ায় লেলিহান আগুনের আঁচে/ তেতে ওঠে দুজন মানুষ’ আর তখন গণগনে লাল লোহার শরীর/ তরঙ্গ চূড়ায় উঠে আবার আছড়ে পড়ে তটে।’ জীবন থেকে উৎসারিত প্রেম দুজন মানুষকে মিলনের সরোবরে নিয়ে যায়এটাই চূড়ান্ত লক্ষ্য কিন্তু যাত্রাপথের কঙ্কর বিছানো পথাভিঘাতই যে এই লক্ষ্যকে আরও মহিমান্বিত করে তোলে তা কবি বেলাল চৌধুরী অল্প কয়েকটি শব্দে পাঠকের কাছে স্পষ্ট করেছেন। এটিই একজন কবির শক্তিকবি বেলাল চৌধুরীর শক্তি। 


কবিতা নিয়ে অনেক কথাঅনেক বিতর্ক আছে। আছে নানা মতবাদ। বেলাল চৌধুরী এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘কবিতা অমীমাংসিত শিল্প। একটি সুন্দর ও সার্থক কবিতার জন্য থিম খুব দরকারি। কবি বা কবিতার কাছে আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের অনেক কিছু পাওয়ার আছে। সেটা দেবার জন্য মৌলিক চিন্তা অবশ্যই দরকার। তার কবিতায় এই চিন্তার প্রতিফলন তিনি সার্থকভাবেই ঘটিয়েছেন। যদিও আজকের কবিরা থিমকে ভেঙে ফেলতে চানপঙক্তির পারস্পরিক পারম্পর্য ভেঙে ফেলতে চান। পঞ্চাশের কবি শহীদ কাদরী বলেছেন, ‘আধুনিক মানুষের চিন্তা জটিল। একই সঙ্গে মানুষের মধ্যে বিপরীত বোধ কাজ করে। কবিতায় এর প্রতিফলন ঘটে। মাঝে মাঝে দেখা যায় পরপর দুলাইনে পরস্পর বিরোধী বক্তব্য। একই কবিতায় এমন পরস্পর বিরোধী বক্তব্যের সমাহার বেশি ঘটলে তখন তাকে উদ্দেশ্যহীন বা থিমহীন বলে অভিহিত করার সুযোগ সৃষ্টি হয় বটে কিন্তু সেটা আধুনিক কবিতারই একটি বৈশিষ্ট্য। 

সুনির্দিষ্ট থিমের ওপর একটি কবিতাকে দাঁড় করানোর প্রত্যয় তার কবিতা থেকেই উৎসারিত। এর প্রমাণ আমরা বেলাল চৌধুরীর কবিতায় পাই। 

 

সারাদিন আমি গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ঘুরে ঘুরে/ কী দেখছিলামভাট ফুলআকন্দের ঝোপঝাপ/মাছরাঙাদের অকারণ খিটিমিটি?/ গ্রামীণ ছবিতে আজ আর নেই সেই কিংবদন্তীখ্যাত/ মসলিননকশিকাঁথার দিন।/ গোলাভরা ধানগোয়াল ভরা গরুপুকুর ভরা মাছ/ এ জাতীয় কথারা আজ সেরেফ কথার কথামালা/ গ্রামগুলি হতশ্রীএমন কি প্রগাঢ় সবুজও উধাও/ অথচ মানুষের সংখ্যা অগুনতিঅনেক মানুষ/ মিলিয়ে যে-মানুষের ছবি চোখের সামনে জেগে ওঠে/ তার মত হতকুচ্ছিত প্রাণী যেন আর কিছুই হয় না-/ লিকলিকে সরু পারোগা কাঠাম আর ডিগডিগে পেট,/ চোখেমুখে ঘোলাটে নির্বোধ শূন্যতা- তবু ঐ সব মানুষের ভিড়ে/ একজন মানুষের খোঁজে হাঁটছিলুম আমি আপন মনে/ তখন না বিকেল না-সন্ধ্যা এমন একটা আলগা সময়/ পাখিরা কুলায়ের পথে কূজন মুখর/ ঠিক আমার বাঁ পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে একটি শীর্ণতোয়া রোগা দুঃখী নদী,/ কুলুকুলু শব্দ বাঁ গোরুর খুরে ধুলো ওড়া কাব্যিক গোধুলী/ কিন্তু তার ধারে কাছে কোথাও পড়লো না চোখে,/ বরং দেখলুম বাঁশের খুঁটিতে আড়াআড়ি টানা/ দড়ির ওপর শুকোতে দেয়া ঝুলন্ত জালের গায়ে/ লেগে থাকা মৃত কিছু মাছের সাদা পেটআঁশ;-/ তার অন্য পাশে ছিল পথের লাগোয়া একটি প্রাচীন মসজিদ/ আগাছা শ্যাওলা ও খরখরে গুল্মের জরাজীর্ণ/ দেওয়ালের গাঁ ফুঁড়ে বেরিয়ে আসা অশ্বত্থের একটি ডাগর চারা/ নদী থেকে ভেসে আসা ঝিরঝিরে হাওয়ার লাবণ্যে/ মুখ বাড়িয়ে যেন দেখছিল নদীটিকে/ এই দুই ভিন্ন প্রেক্ষিতের মাঝখানে একাকী দাঁড়িয়ে/ হঠাৎ আমার মনে হলঃ এই বিংশ শতাব্দীর একজন নিঃস্ব নিঃসঙ্গ মানুষ আমি/ ভান করি স্বেচ্ছা-নির্বাসিতেরঅনিকেত বলতে উদ্বাহু হয়ে উঠি/ অথচ জন্মেছি এই সব অখ্যাত গ্রাম গঞ্জেই,/ পূর্বপুরুষেরা ছিলেন কৃষিকর্মী;/ অধুনা আত্মপ্রতারণায় নগরনিবাসী আমি/ আর কতকাল এমন করে নিজেকেই নিজের চোখ ঠাওরাব।”  (কবিতাঃ আত্মপ্রতিকৃতি)


এই দীর্ঘ কবিতাটির শিরোনামে যখন চোখ বুলাই কবিতার থিমটি আন্দাজ করতে পারি এবং শেষ পর্যন্ত তিনি এতেই কন্সিস্টেন্ট থেকেছেন। এটি ষাটের দশকের বাংলা কবিতার একটি বৈশিষ্ট্যতিনি সেই দিক থেকে তার দশককে সফলভাবে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। আত্মপ্রতিকৃতি” কবিতায় দুই সময়ের বৈসাদৃশ্য তুলে ধরেছেনএবং ক্রমাবনতি কবিকে আহত করেছে। এর মধ্য দিয়ে তিনি তার সামাজিক দায়িত্বটি পালন করেছেন। এই কবিতায় খুব স্বাভাবিকভাবে কিছু মেটাফোরিক বিষয় এসেছে যা পাঠককে উপলব্ধির গভীরে নিয়ে যায়। যখন তিনি বলেন, “আমার বাঁ পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে একটি শীর্ণতোয়া রোগা দুঃখী নদী” তখন আমরা কোনো এক অসহায় গ্রাম্যবধুর করুন মুখটি দেখতে পাই। তিনি ছন্দ সচেতন একজন কবি। অক্ষর বৃত্তের পয়ার রচনায় সিদ্ধহস্ত। ছন্দের প্রয়োজনে তিনি শব্দকে ভেঙ্গেছেন-জুড়েছেনযা কখনো কখনো সমালোচনার ক্ষেত্রও তৈরী করে দিয়েছে। যেমন তিনি লিখেছেন, “সেরেফ কথার কথামালা। তিন মাত্রার প্রয়োজনে স্রেফ’ শব্দটিকে ভেঙে সেরেফ’ করেছেনযা দৃষ্টিকটু লাগে।


কবি বেলাল চৌধুরী বাংলাদেশের ফেনীতে জন্মগ্রহণ করলেও জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় কাটিয়েছেন কোলকাতায়। যদিও তিনি বলেছেনঢাকা এবং কোলকাতার ভাষা ভিন্ন এবং ঢাকাই বেশি শক্তিশালী। কিন্তু তার লেখাতে কোলকাতার ভাষাপ্রভাবই বেশি পরিলক্ষিত হয়। হাঁটছিলুম”, “দেখলুম”, “হুট করে এসেই যাবি চলেসি কি র‍্যা!”, “নিকুচি” “চটি” ইত্যাদি শব্দ ও বাক্যের ব্যবহার কোলকাতার ভাষারীতির কথাই মনে করিয়ে দেয়। তিনি প্রায়শই তদ্ভব শব্দের ব্যবহার করেন কবিতায়যেমনঃ হতকুচ্ছিত ইত্যাদি। 


মধ্য ষাট থেকে তিনি নিয়মিত কবিতা লিখে চলেছেন। প্রথম কাব্যগ্রন্থ নিষাদ প্রদেশে” প্রকাশিত হয় ১৯৬৬ সালে। বেলাল চৌধুরীর কবিতা উচ্চকন্ঠ নয় কিন্তু সুদৃঢ়। তিনি প্রকৃতি ও একান্ত নিজস্ব পরিবেশ থেকে তুলে এনেছেন শব্দ এবং কবিতার অনুষঙ্গযা দিয়ে নির্মাণ করেছেন বোধের ইমারত। সেখানে আছে সুগভীর জীবনবোধ এবং সুস্পষ্ট সামাজিক দায়।


এই মাটিরএই ভূ-খন্ডের রাজনীতির অনৈতিকতা এক সুগভীর মর্মবেদনা থেকেই উঠে এসেছে বেলাল চৌধুরীর কবিতার শব্দ ও চিত্রকল্প। বাঙালি ও বাংলাদেশের ইতিহাস খুঁজতে গেলে/ যেতে হবে বত্রিশ নম্বর/ বাংলাদেশ ও বাঙালির গৌরবগাথা দেখতে হলে/ যেতে হবে বত্রিশ নম্বর/ বাঙালি ও বাংলাদেশের স্থাপত্য ইতিহাস জানতে হলে পাতা উল্টে দেখতে হবে বত্রিশ নম্বর/ বাংলাদেশ ও বাঙালির কলঙ্কচিহ্ন দেখতেও যেতে হবে বত্রিশ নম্বর;/ বত্রিশ বলতে একটি সড়ক মাত্র নয়নয় খালি একটি প্রতীকী সংখ্যা/ শুধু একটি সংখ্যাবাচকেই সীমাবদ্ধ নয় এ বাড়ি/...’ (কবিতা: বত্রিশ নম্বর)


তিনি এই সময়ের তরুণ কবিদের আত্মমগ্ন হতে বারণ করেছেনঅর্থাৎ নার্সিসিস্ট সিনড্রোম থেকে দূরে থাকতে বলেছেন। এই রোগে আচ্ছন্ন হয়ে পড়লে এগুবার পথটি ক্রমশ সরু হয়ে আসে। কিন্তু আত্মোপলব্ধি বা আত্ম-অন্বেষণ থেকে বিচ্যুত হতে বলেন নি। প্রকৃতপক্ষে আত্মোনুসন্ধ্যান একজন কবির গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হয়ে ওঠাই স্বাভাবিক। যেমন তিনি নিজেই বলেছেন-


শহরতলি ছাড়িয়ে শোকালয়কে বহুদূরের ধু-ধু/ বুক ভরে টাটকা সতেজ সবুজ নিশ্বাস নিতে নিতে/ গহীন বনের কিনারায় এসে দেখি তাকে,/ গৈরিক বসনাবৃত পরম নিবিষ্টচিত্ত একা একা বসে,/ কে তিনি,পথিক না পরিব্রাজক?/ প্রকট নৈরাজ্যের মাঝে রৌদ্রের দৌরাত্ম্য,/ পেছনে দাঁড়িয়ে কৌতূহলভরে ছায়া ফেলে ঘাড়ে/ চাক্ষুষ হয়,কী এক আশ্চর্য্য তৎপরতায় এ-ফোঁড় ও-ফোঁড়/ সেলাই করে চলেছেন অদৃশ্য কোন আচ্ছাদন,/ বুকে যেন তার উদভ্রান্ত অস্থির প্রতিবিম্বের ঝিরঝির নড়াচড়া/ পেছনে দাঁড়িয়ে মুচকি হাসির তাচ্ছিল্য ছিটিয়ে ভাবি/ লোকটা কি পাগল না অন্য কিছু!/ পা বাড়াতেই হ্যাঁচকা টানে হুমড়ি খেয়ে পড়ার দশা,/ এ আবার কোন গেরোরে বাবা,অযথা জড়িয়ে পড়লুম কি-সে না কি-সে!/ কোন কিছু বুঝে ওঠার আগেই বেজে ওঠে গমগমে স্বর:/ বোস,সেলাই হয়ে গেছ তুমি,তোমার ছায়া/ জরাজীর্ণ আমার এ কাঁথার সঙ্গে অচ্ছেদ্য বন্ধন তার,/ এখন থেকে আমরা পরস্পরের বংশবদ ও সখা;/ কাহিনীর নটে গাছটি মুড়িয়ে তাঁর চোখে চোখ রেখে দেখি/ নির্নিমেষ তিনি আমারই দিকে,মাঝখানে নিতলনিথর হিমবাহ এক! (কবিতাঃ সেলাই-করা ছায়া)


অসাধারণ এক শৈল্পিক বর্ণনাযেন প্রবহমান প্রস্রবণের মতো ছুটে চলেছে সুনির্দিষ্ট যাত্রাপথেততোধিক সুনির্দিষ্ট এক লক্ষ্যের দিকে। দুধরণের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তৈরী হয় কবিতা। কেউ বিশ্বাস করেন কবিতা নাজেল হয়। এর ওপর কবির তেমন হাত নেই। অর্থাৎ কবিতা কবির নিয়ন্ত্রণাধীন নয়। আবার কেউ কেউ পূর্ব নির্ধারিত বিষয়ের ওপর লিখতে শুরু করেন। কখনো কখনো কোনো এক পর্যায়ে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেনকবিতা তখন ছুটে চলে তার নিজস্ব গতিতেকবির চিন্তাকে ছাড়িয়ে। কিন্তু কেউ কেউ শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ করেন কবিতাকেকিছুতেই তা কবির চিন্তাকে অতিক্রম করতে পারে না। কবি বেলাল চৌধুরীর কবিতা-পাঠ আমাকে এই ধারণা দিয়েছে যে তিনি আঁটঘাট বেঁধেই লিখতে বসেনতিনি জানেন তিনি কি লিখছেন। এমন কবিতাতো জীবনের কথাই বলবেবাঙময় হয়ে উঠবে জীবনের কথকতায়। সেলাই করা ছায়া” –ও এর ব্যতিক্রম নয়। যে ছায়ার সঙ্গে তার দেখা হয় সে তারই অতীতযাকে তিনি খুঁজে পান বুক ভরে টাটকা সতেজ সবুজ নিশ্বাস নিতে নিতে/ গহীন বনের কিনারায়’, যেখানে কেটেছে তার দূরের শৈশব। অবচেতন কবির একটি সত্তাকে প্রায়শই নিয়ে যায় সেখানেযেখানে যাবার আকাঙ্ক্ষা তার আজন্ম। আর সেই আকাঙ্ক্ষা থেকেই জন্ম নেয় সেলাই করা ছায়া” যা নিজেরই প্রতিবিম্ব। 


দিন ফুরোবার আগেই কোথায় গেলে তুমি দিবাদশী/ সূয্যমুখী,-খুঁজছি তোমায় তন্নতন্ন/ রাঙামাটির পথের বাঁকে,তুমি তখন গভীর তন্দ্রাচ্ছন্ন/  ঝুরঝুর একরাশ স্মৃতির রেণু পড়লো ঝরে ভূমিস্পর্শী/ ও কি! কাজল মেঘ ঢেকে গেছে বৃহস্পতি,/ হঠাৎ আকাশ ওঠে বিষম দমকা হাওয়া/  হাত বাড়াতেই হড়কে যাওয়া/ পলকমাত্র লুটিয়ে পড়ল বৃহৎ বনস্পতি!/ স্বপ্নবাড়ির সিঁড়ির গোড়ায় দম দমাদ্দম/ হুমড়ি খেয়ে পড়ছে কত উল্কাপিন্ড জলজ্যান্ত,/ ঝলসে যাচ্ছে দশ দিগন্ত আদ্যোপান্ত,/ মধ্যিখানে দাঁড়িয়ে আছে ঠায় বজ্রাহত বৃক্ষ এক জ্বলন্ত হতোদ্যম (কবিতাঃ স্বপ্নবাড়ি)।


স্মৃতির ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে খুঁজছেন স্বপ্নবাড়ি। কিন্তু দিন ফুরোবার আগেই অন্ধকার নেমে আসেকি করে এগুবেন এই অন্ধকারেদমকা হাওয়া উঠেছেঝড় শুরু হয়েছেবৃহৎ এক বনস্পতি লুটিয়ে পড়েছে কিন্তু তবুও দমে যান নি কবি, ‘হুমড়ি খেয়ে পড়ছে কত উল্কাপিন্ড জলজ্যান্ত,/ ঝলসে যাচ্ছে দশ দিগন্ত আদ্যোপান্ত,/ মধ্যিখানে দাঁড়িয়ে আছে ঠায় বজ্রাহত বৃক্ষ এক জ্বলন্ত হতোদ্যম। হতোদ্যম’ শব্দটি ব্যবহার করলেও আমরা কিন্তু তখনো উদ্যম দেখতে পাই এবং এই প্রত্যাশা করতেই পারি কবি তার স্বপ্নবাড়ি’-তে পৌঁছুবেনই। এই কবিতার মর্মবাণীতে রয়েছে এক সুদৃঢ় সোশ্যাল কমিটমেন্ট। ঝড়-ঝঞ্জায়ও খাড়া থাকতে হবেনুয়ে পড়লে চলবে না। 

 

কবি বেলাল চৌধুরীর কাব্যানুসন্ধ্যানের মূল লক্ষ্য জীবন কিন্তু উপস্থাপনায় শৈল্পিক নান্দনিকতা। এই দুইয়ের সমন্বয় তার কবিতাকে সবসময়ই শ্লোগান থেকে দূরে রেখেছে। তার কবিতা পড়তে পড়তে কেবলই মনে হয়যেন তিনি বলছেনজীবন খোঁজোরে মন শিল্পের তরী বেয়ে। 

 

(মাসিক শব্দঘর - নভেম্বর ২০১৬ সংখ্যায় প্রকাশিত) 

Comments

Popular posts from this blog

অসাধারণ এই শিল্পীর জীবনের গল্প বড় করুণ

  [এই সময়ের অত্যন্ত প্রতিভাবান শিল্পী সারফুদ্দিন আহমেদ। বাড়ি পশ্চিমবঙ্গে। আর্ট কলেজে খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করেন ,  আর শুধু ছবি আঁকেন। নানান মাধ্যমে ,  নানান বিষয়ের ছবি। সারফুদ্দিন আহমেদের ছবি থেকে চোখ ফেরানো যায় না ,  আপনাতেই ওঁর নান্দনিক সৃষ্টিকর্মে দৃষ্টি আটকে যায় ,  কী জল রঙ ,  কী অ্যাক্রিলিক ,  কিংবা স্রেফ পেন্সিলের ড্রয়িং। এই গুণী শিল্পীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কবি কাজী জহিরুল ইসলাম। সাক্ষাৎকারটি এখানে উপস্থাপন করা হলো।]       ভারত আমাকে চোখ দিয়েছে ,  বাংলাদেশ দিয়েছে দৃষ্টি -     সারফুদ্দিন আহমেদ     কাজী জহিরুল ইসলামঃ  ব্যাক গ্রাউন্ডে তবলা বাজছে আপনি ছবি আঁকছেন কাচের ওপর।    এই যে বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে ছবি আঁকা, এই ছন্দটা ছবিতে কিভাবে ধরেন? আর কোনো শিল্পী ছবি  আঁ কার সময় যন্ত্রানুসঙ্গ ব্যবহার করেছেন?   সারফুদ্দিন আহমেদঃ   কাঁচ নয়,   এটি এক বিশেষ ধরনের কাপড়-নেট। এই নেটের উপরে বর্তমানে আমার এক্সপেরিমেন্ট চলছে।    জহিরুলঃ ও ,  ফেইসবুকে যখন ছবিটি দেখি কাচের মতো ...

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জুর সাক্ষাৎকার || অষ্টম পর্ব ||

[লেখক, সাংবাদিক, অনুবাদক আনোয়ার হোসেইন মঞ্জুর সাক্ষাৎকারের অষ্টম  পর্ব আজ প্রকাশ করা হলো। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কবি কাজী জহিরুল ইসলাম।]          দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ বাসস - কে অকার্যকর করেছে  – মঞ্জু    জহিরুলঃ  আপনি ফেলোশিপ নিয়ে দিল্লীতে ছয়মাস ছিলেন, ব্যক্তিগত আগ্রহ এবং পেশাগত অভ্যাসের কারণে কাছে থেকে দেখার/বোঝার চেষ্টা করেছেন ভারতের এবং উপমহাদেশের রাজনীতি। আমরা দেখি ভারতের রাজনীতিতে গায়ক, নায়ক, লেখক, সাংবাদিকের আবির্ভাব ঘটে সব সময়ই এবং তারা রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও রাখেন। বাংলাদেশে এই ধারা খুব সম্প্রতি শুরু হলেও আমাদের জনপ্রিয় খেলোয়াড়, শিল্পীরা নিজেদের অর্থনীতি সমৃদ্ধ করা ছাড়া রাজনীতিতে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেন না। এমন কি ধর্ষণ, অন্যদেশকে ট্রানজিট প্রদান, উপর্যুপরি সড়ক দূর্ঘটনা, পরিবেশ ধ্বংসকারী কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্প ইত্যাদি ইস্যুতেও তারা নীরব। অথচ তাদের জনপ্রিয়তা এবং রাজনীতি সম্পৃক্ততা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত, যা ভারতে দেখা যায়। বিষয়টি যদি আপনার মতো করে ব্যাখ্যা করেন।  মঞ্জুঃ   দিল্লিতে আমার অবস্থানকালকে আমি নানা দিক থ...

কানের কাছে নারী কন্ঠ

  স্বপ্নের ঐশ্বর্য   || কাজী জহিরুল ইসলাম ||   ছুটির দিন। লম্বা সময় ধরে ঘুমাবো। কিন্তু তার আর উপায় নেই। কানের কাছে নারী কন্ঠ। বেশ আত্মবিশ্বাসী কন্ঠ। ক্রমাগ ত  কথা বলে যাচ্ছেন এক অপরিচিতা। আমি লাফ দিয়ে উঠি। কে তিনি ?  আমার স্ত্রী বলেন ,  রুবানা হক ,  শোনো কী বলছেন। রুবানা হক প্রয়াত ব্যবসায়ী আনিসুল হকের স্ত্রী। আমাদের কৈশোর-উত্তীর্ণ কালে আনিসুল হক ছিলেন আমাদের হিরো। টিভি উপস্থাপনায় অন্য এক আধুনিকতা নিয়ে হাজির হন তিনি। এরপর আমরা ধীরে ধীরে তার ব্যবসায়ীক সাফল্য ,  সাংগঠনিক সাফল্য দেখতে দেখতে বড় হই। খুব সাম্প্রতিককালে ,  আনিসুল হকের মৃত্যুর পর ,  কেউ একজন বলেছিলেন ,  তার স্ত্রী রুবানা হকও খুব ভালো কথা বলেন। কিন্তু রুবানা হকের কথা শোনার সৌভাগ্য আমার হয়নি। দুই যুগ ধরে দেশের বাইরে থাকার কারণে এই সময়ে স্টার হয়ে ওঠা অনেকের সম্পর্কেই আমার ভালো ধারণা নেই।  তার কথায় এমন কিছু ছিল যে আমার পক্ষে ঘুমিয়ে থাকা সম্ভব হয়নি। আমি মুক্তিকে বলি ,  প্রথম থেকে দাও ,  পুরো বক্তৃতাটা আমি শুনতে চাই। আমি পরপর দুইবার তার পুরো বক্তব্যটা শুনি ,  ফ...