Skip to main content

আল মাহমুদের সাক্ষাৎকার

 নোটঃ পশ্চিমবঙ্গের একটি ঐতিহ্যবাহী লিটলম্যাগ কৌরব-এর অনুরোধে আমি কবি আমাহমুদের এই সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করি। যতদূর মনে পড়ে এটা ছিল ২০০৬ সালের কথা। আমি মনে করি এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি সাক্ষাৎকার। যারা বাংলা কবিতার পাঠক/কবি তাঁদের ভাল লাগবে মনে করে এটি আমার ব্লগে প্রকাশ করলাম। 

 

৭১ প্রশ্নের মুখোমুখি আল মাহমুদ

[পঞ্চাশের অন্যতম প্রধান কবি আল মাহমুদ। আজও তিনি অবিরাম লিখে চলেছেন দুই হাতে। কী গদ্য কী পদ্য দুটোতেই তার সমান দক্ষতাসমান জনপ্রিয় তিনি দুই ভুবনের পাঠকের কাছেই। কবি আল মাহমুদের সাথে এক দীর্ঘ আলাপচারিতায় মুখোমুখি হন আশির দশকের কবি কাজী জহিরুল ইসলাম। নিচে কথোপকথনটি উপস্থাপন করা হলো।]

কাজী জহিরুল ইসলাম : ১৯৭০/৭১ সালে আপনি যখন কলকাতায় যেতেন, ওখানকার বাঙালি কবিদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ হতোসেই আন্তক্রিয়া কি আপনাকে অনুপ্রাণিত করে?

আল মাহমুদ : যেতাম না১৯৭১-এ আমি ওখানে ছিলাম। প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলাম আমি। আমার কাজটা ছিল বাংলা ভাষার লেখক/কবিদের বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপক্ষে সংগঠিত করা, মটিভেট করা। আই ওয়াজ বেসিক্যালি এ মটিভেটর। কাজটি ছিল অনেকটা কেমপেইনিং-এর মতো। তো এ কাজ করতে গিয়ে ওখানকার অনেক কবির সাথেই সখ্য গড়ে ওঠে। তবে ওখানকার কবি-সাহিত্যিকদের সাথে আমার পরিচয় ঘটে আরও অনেক আগেইমিড ফিফটিজে। তখন আমি নতুন সাহিত্যচতুরঙ্গ, কৃত্তিবাস প্রভৃতি পত্রিকায় লিখতাম। ৫৭/৫৮ সালের দিকে বুদ্ধদেব বসুর কবিতা পত্রিকায় লিখতে শুরু করি। একথা ঠিক যেওখানকার সব বড়ো কবির সাথে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে আমার সরাসরি দেখা হয় এবং কারো কারো সাথে বন্ধুত্বও হয়। অবশ্যই এই বন্ধুত্ব পরবর্তী জীবনে আমাকে নানান সময়ে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে।

জহিরুল : পশ্চিমবঙ্গের কোন কোন কবির সঙ্গে আপনার সেই সময় সখ্য গড়ে ওঠে?

মাহমুদ: অনেকের সঙ্গেই সখ্য হয়শক্তি চট্টোপাধ্যায় তাদের মধ্যে অন্যতম। এছাড়া রয়েছে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়শরৎ মুখোপাধ্যায়। ওখানকার কম্যুনিস্ট পত্রিকা পরিচয়’-এর কবিদের মধ্যে অমিতাভ দাশগুপ্তের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করতে চাই। এছাড়া কবিতা সিংহের বাড়িতে গিয়ে মাঝে মাঝে থাকতাম। কবিতার অভিনেত্রী কন্যা এবং জামাতা বেশ সমাদর করতেন।

জহিরুল: বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের কথা কিছু বলুন।

মাহমুদ: তখন আমি যেমন কাগজে কাজ করতামআমার সমসাময়িকদের মধ্যে শামসুর রাহমানআহমেদ হুমায়ূনহাসান হাফিজুর রহমানফজল শাহাবুদ্দিনও খবরের কাগজেরই লোক ছিলেনদৈনিক পাকিস্তানে কাজ করতেন। তারা কেউ কিন্তু আমার মতো মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার জন্য ভারতে পালিয়ে যান নি। সরাসরি বাংলাদেশের প্রবাসী সরকারের সাথে কাজও করেন নি। অথচ দুঃখজনক হলেও সত্যি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সম্পাদনা করেন তাদেরই কেউ কেউ। বাম বুদ্ধিজীবীরা কিন্তু মুক্তিযুদ্ধেছয় দফার প্রবর্তকশেখ মুজিবুর রহমানকে সমর্থন করেন নি। বরং তারা আগাগোড়াই শেখ মুজিবের বিরোধিতা করেছেন। শেখ মুজিবের নেতৃত্বকেই আপামর জনসাধারণ সমর্থন দিলমুক্তিযুদ্ধ তাঁর নেতৃত্বেই সফল হলো। বাম বুদ্ধিজীবীরা কেউ পালিয়েছেকেউ মরেছেপরবর্তীতে নানান লেবাস পরে কেউ কেউ পুনর্বাসিতও হয়েছে। সেই সময় পার্বত্য চট্টগ্রামের ডেপুটি কমিশনার ছিলেন আমার এক আত্মীয়, এইচ টি ইমাম। এক্সাইল সরকার গঠিত হলে তিনি এর মুখ্য সরকারি কর্মকর্তার দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। তার সঙ্গে আমি আগরতলায় দেখা করি। তারপর ওখান থেকে গোহাটি হয়ে কলকাতায় চলে যাই। এরপর শুরু হয় আমার মুক্তিযুদ্ধ জীবন।

জহিরুল: আর লেখালেখিএকেবারে বন্ধ হয়ে গেল!

মাহমুদ: এর মধ্যে কি আর লেখালেখি চালিয়ে যাওয়া সম্ভব! আমি চেষ্টাও করিনি। তখন তো একটাই স্বপ্নস্বাধীনতা। পুরো মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে আমি একটিমাত্র কবিতা লিখেছিকবিতাটির নাম ক্যামোফ্লেজ

জহিরুল: ১৯৭১-এর ২৫ শে মার্চ আপনি কোথায় ছিলেনসেই দিনটির কথা আপনার মুখে শুনতে চাই।

মাহমুদ: ঢাকায়ই ছিলাম। তখন আমি ইত্তেফাকে চাকরি করি। রাত প্রায় নয়টা পর্যন্ত অফিসে ছিলাম। আমার এক আত্মীয় (তিনিও ইত্তেফাকে ছিলেন) ইশারা করলেনবাড়ি চলে যাওয়ার জন্য। তখন ঢাকার খিলগাঁওয়ে আমার বাসা। আমি বাসায় চলে আসি। খেয়ে শুয়ে পড়েছি। হঠাৎ প্রচণ্ড শব্দে কেঁপে উঠি। কানে তালা লাগানো শব্দ। মনে হচ্ছিল খাট থেকে ছিটকে পড়ে যাব। বুঝতে পারছিলাম বাঙালি নিধন শুরু হয়ে গেছে। সে এক দুঃস্বপ্নের রাত।

জহিরুল: বাংলাদেশের কবিতা গত পঁয়ত্রিশ বছরে কীভাবে বদলেছে বলে আপনার মনে হয়?

মাহমুদ: বাংলাদেশের কবিতা মানেই তো স্বাধীনতাউত্তরকালের কবিতা। এই সময়ে কবিতার যে উত্তরণতা ঘটেছে পঞ্চাশের কবিদের হাতেই। শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ আর শহীদ কাদরীবাংলাদেশের কবিতা মানেই তো এই তিনজন। আরও কেউ কেউ লিখতেনকিন্তু টিকে থাকতে পারেননি। অধিকাংশেরই কবিতা লেখা স্বাধীনতার পর বন্ধ হয়ে গেছে।

জহিরুল: ষাটসত্তরআশি কিংবা নব্বইয়ের দশকের এমন কেউ কি নেই যারা এই উত্তরণের ধারাবাহিকতায় কন্ট্রিবিউট করেছেন?

মাহমুদ: ষাটের কবিদের মধ্যে আমি নির্মলেন্দু গুণের নাম উল্লেখ করতে চাই, সত্তরের আবিদ আজাদ আর আশির খোন্দকার আশরাফ হোসেন। নব্বইয়ের কবিরা এখনও পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যে আছেআমি এই দশকের কারও নাম উল্লেখ করে বিপদগ্রস্ত হতে চাই না।

জহিরুল: এই পঁয়ত্রিশ বছরের কবিতায় আঙ্গিকগত যে পরিবর্তন এসেছে, এটাকে আপনি কীভাবে দেখেন?

মাহমুদ: জহিরএকথা তোমাকে আমি আগেও বলেছিআবারও বলছি, কবিতার আঙ্গিক নির্ভর করে এর বিষয়ের ওপর। বিষয়ই বলে দেয় আঙ্গিকটা কেমন হবে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে এবং এর অব্যবহিত পরে আমাদের কবিতায় এসেছে বারুদমৃত্যুপরাজয়বিশ্বাসঘাতকতা। এই বিষয়গুলোর জন্য এক ধরনের আঙ্গিক অপরিহার্য ছিলো। এখন বিষয় বদলাচ্ছেআঙ্গিকও বদলাচ্ছে। বিষয় নতুন না হলে আঙ্গিক নড়ে না।

জহিরুল: সোনালী কাবিন’ রচনার সময়টার কথা বলুন। অনেকে বলেন ওটাই আপনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বই। সবচেয়ে স্বতন্ত্র বই। কবিতা নিয়ে একটা নির্দিষ্ট ভাবনা কি সেই সময়ে আপনার মনের মধ্যে ছিল?

মাহমুদ: আমি সোনালী কাবিন’-এর কবিতাগুলো লিখেছি ঊনসত্তরের গণআন্দোলনের সময়। ইত্তেফাক’ তখন বন্ধ হয়ে যায়। আমি চট্টগ্রামে চলে যাই। ওখানকার আর্ট প্রেস’-এ একটা চাকরি নেই। ওদেরই বইঘর প্রকাশনী’ থেকে বাচ্চাদের একটা কাগজ বেরোতযেটার নাম ছিল টাপুর টুপুর। ঠিক সেই সময়টাতে আমি সোনালী কাবিন’ কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো রচনা করি। তবে সোনালী কাবিন’ আমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বই এটা আমি স্বীকার করি না। আমি মনে করি আমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বই মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো

জহিরুল: কবিতাভাবনার উৎস কোথায়কোথায় থাকে কবিতাকীভাবে ঘটে তার উদ্ধারকার্য?

মাহমুদ: কবিতা একটি রহস্যজনক ব্যাপার। মানুষ তার উৎপত্তিকাল থেকেই স্বপ্ন দেখেঘুমিয়ে নাজেগে জেগে স্বপ্ন দেখে। সব ধর্মগ্রন্থের প্রারম্ভেই আদম এবং ঈভের কথা আছে। তারা সুখে-শান্তিতে স্বর্গের ইডেন গার্ডেনে বসবাস করতেন। একদিন স্রষ্টা অনুভর করলেন আদমের নিঃসঙ্গতা। তখন তিনি আদমের বাঁ দিকটা কেটে ঈভকে তৈরি করলেন। অচেতন আদম জ্ঞান ফিরে পেয়েই ঈভকে আলিঙ্গন করতে চাইলেনজড়িয়ে ধরতে চাইলেন। কারণ ঈভ তারই শরীরের অংশ কিন্তু ঈভ তা মেনে নিতে পারেননিতিনি নিজেকে স্বতন্ত্র ঘোষণা করলেন। এই যে জড়িয়ে ধরার আকাংখা এটাই প্রেম। শয়তানের প্রলোভনে যখন আদম এবং ঈভ গন্দম খেল তখনি তাদের মধ্যে জ্ঞানের উন্মেষ ঘটে। তখনি তারা বুঝতে পারেতাদের নগ্নতার লজ্জা। তাদের মধ্যে জেগে ওঠে কামক্রোধক্ষুধাতৃষ্ণা। ইডেন থেকে বিতাড়িত হয়ে তারা নেমে আসেন পৃথিবীতে। তখন থেকেই শুরু হয় ড্রিমস্বপ্ন দেখা। ইডেনে ফিরে যাবার স্বপ্ন। এই স্বপ্নই হলো কবিতা।

জহিরুল: আর ওই যেআদম হাওয়াকে জড়িয়ে ধরতে চাইলতুমি আমার বলে। আর হাওয়া বললনাআমি স্বতন্ত্র। ওখান থেকেই কি শুরু হলো নারীপুরুষের ব্যক্তিত্বের অনিবার্য দ্বন্দ্বপুরুষ চিরকাল নারীকে আমার’ বলে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়আর নারী খোঁজে তার স্বাতন্ত্র?

মাহমুদ: ঠিক ধরেছ।

জহিরুল: আমার তো মনে হয়চাইলেই কবিতা লেখা যায় না। কবিতা আসতে হয়অনেকটা নাজেল হওয়ার মতোআপনি কী বলেন?

মাহমুদ: তুমি আগেও আমাকে বলেছিলে কবিতা ওহির মতো নাজেল হয়। এটা আমি মানি না। তবে হ্যাঁএকথা মানি যে চাইলেই কবিতা লেখা যায় না।

জহিরুল: অন্য ভাষার কবিতা আপনাকে কখনো আলোড়িত করেছেকারো নাম বলবেন কী?

মাহমুদ: অবশ্যই। ইংরেজি কবিতাফরাসি কবিতা আমাকে আলোড়িত করেছে। কীটসশেলীশেক্সপীয়রবায়রনএলিয়টইয়েটস পড়েছিঅনুপ্রাণিত হয়েছি। বদলেয়ার এক অসাধারণ কবি। র‍্যাবোঁ পড়েছিআমার ভালো লেগেছে।

জহিরুল: ধর্ম’ শব্দটি আপনার কাছে কীআপনি কি এমন একটি পৃথিবীর স্বপ্ন দেখেন না যেখানে সব মানুষের ধর্ম এক। অথবা কোনো মানুষেরই নির্দিষ্ট কোনো ধর্ম নেইমনুষ্যত্ব ছাড়া?

মাহমুদ: আমি সুনির্দিষ্ট ধর্মে বিশ্বাস করি। যদিও সকল ধর্মগ্রন্থই মানুষকে শিক্ষিত করার জন্য এসেছে কিন্তু আমি বিশ্বাস করি আমারটি শ্রেষ্ঠআর এজন্যই আমি এই ধর্মের অনুসারী। আমার ধর্মগ্রন্থে আছেআগের ধর্মগ্রন্থের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের কথাআমি সব ধর্মগ্রন্থকেই সম্মান করি। পৃথিবীর সব মানুষ একটি ধর্মের অনুসারী হবেএটা তো একটা স্বপ্নের কথা। এই স্বপ্ন আমিও দেখতাম।

জহিরুল: সেই স্বপ্নের ভিত্তিটা কী ছিলমানবতানা ইসলামএখন সেই স্বপ্নটি দেখেন না?

মাহমুদ: এখনও দেখি। তবে এটা বিশ্বাস করার মতো কোনো ভিত্তি খুঁজে পাই না যেমানবতার ভিত্তিতে এই একত্রায়ন হবে। এখন আমি বিশ্বাস করি আধ্যাত্মিকতার ভিত্তিতে বা কোনো অলৌকিক ঘটনার দ্বারা হয়তো একদিন পৃথিবীর সব মানুষ একটি অভিন্ন ধর্মের কথাই বলবে। তবে আমি মনুষ্যত্বের ওপর এখনও নির্ভর করি। মনুষ্যত্বের ভিত্তিতে বিশ্ববাসীর অভিন্ন কণ্ঠস্বর আজও শুনতে না পাওয়ার আক্ষেপ আমার আছে।

জহিরুল: আবার কবিতায় ফিরে আসিরবার্ট ফ্রস্ট বলেছেনকোনোকিছু না বুঝেই যা ভালো লাগেতা-ই কবিতা। আপনার কাছে কবিতা কী?

মাহমুদ: আমি এর সাথে একমত না। আমি মনে করি যা কমিউনিকেট করে নাতা কবিতা না। কবিতায় রহস্য থাকবেতবে পাঠকের বোধে ধরা পড়বার মতো অবকাশ তাতে থাকতে হবে।

জহিরুল: এখন তরুণ কবিরা বলছেনকবিতায় বিষয়দর্শনবক্তব্য এসবের কিছুই প্রয়োজন নেই। কেবল ভালোলাগাই কবিতা। তরুণদের এই বোধকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

মাহমুদ: দর্শন থাকার প্রয়োজন নেইমানি। কিন্তু কবিতা পাঠককে কিছু বলবে নাএটা মানি না। আমি মনে করি কবিতায় সহস্য থাকা জরুরি।

জহিরুল: সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছেন, ‘গভীর প্রত্যয়ের কথা লিখতে গিয়েও আল মাহমুদকে কখনো চেঁচামিচি করতে হয়নিকোনো জঙ্গি মনোভাব দেখাতে হয়নি। এই যে গভীর প্রত্যয়এর মূলে কী আপনার ধর্মবোধ?

মাহমুদ: ধর্মবোধই বলতে পার। তবে আমি সুফি মানুষ। প্রচলিত ধর্মবোধের বাইরেও আমি একটু বিচরণ করি। সুফিরা প্রচলিত ধর্মচর্চার বাইরেও নানা পদ্ধতিতে ধর্মপালন করেছেন।

জহিরুল: আপনি কোন পদ্ধতিতে করেন?

মাহমুদ: দেখো এটা একান্তই নিজস্ব ব্যাপারআমি বলতে চাচ্ছি না। এসব কথা কেন জানতে চাও (কিছুটা উত্তেজিত)?

জহিরুল: এতে করে আপনার পাঠকেরা আপনাকে আরো স্পষ্ট করে জানবে, নিজেকে মেলে ধরতে অসুবিধা কী?

মাহমুদ: ঠিক আছে লেখ। কিন্তু লেখবা না-তো খামাখা জিজ্ঞেস করছ।

জহিরুল: অবশ্যই লিখবআপনি বলেন মাহমুদ ভাই।

মাহমুদ: আমার একজন ধর্মগুরু আছেন। তিনি আমাকে বলেছেন নিয়মিত জিকির করতেআমি জিকির করি।

জহিরুল: ধর্মগুরুর নামটা জানতে পারি?

মাহমুদ: কী দরকারখালি ঝামেলায় ফালাও। ঠিক আছে লেখ। তাঁর নাম মৌলানা শাহ সুফি আব্দুল জব্বার। আমি হঠাৎ একদিন তাঁর এক মজলিশে গিয়ে হাজির। তিনি কোরানের মর্মার্থ বর্ণনা করছিলেন। আমি ঢুকতেই তিনি এমনভাবে আমার

দিকে তাকালেনমনে হলো দুটো দৃষ্টির বল্লম আমাকে মাছের মতো গেঁথে ফেলল। আমি ছটফট করতে করতে একেবারে সামনেতাঁর কাছে পৌঁছে গেলাম। আর আশ্চর্য ব্যাপার সবাই দুপাশ থেকে আমার জন্য পথ ছেড়ে দিল। আমি গিয়ে তাঁর হাত ধরলাম। তিনি আমাকে মাত্র তিনটি কথা বললেন। (এরপর তিনি চুপ হয়ে রইলেন)

জহিরুল: কথা তিনটি কী?

মাহমুদ: তিনি বললেনঅহংকার ত্যাগ করতে হবে। সব ঢেলে দেবার মতো সেজদাহ করবে। আর জিকির করবে।

জহিরুল: আপনি লিখেছেন কেবলই আমার মধ্যে যেন এক/শিশু আর পশুর বিরোধ। এই বিরোধ কি আপনার আত্মাকে বিক্ষত করেআপনার সাহিত্যকে সক্ষম করে তোলেদুটোই একসঙ্গে করে?

মাহমুদ: এই বিরোধ প্রতি মুহূর্তে আমাকে ক্ষত করেবিক্ষত করে। এই বিরোধই আবার আমার সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে। একজন কবির এই অস্থিরতা থাকা খুবই জরুরিএই বিরোধ সৃজনশীলতার সহায়ক।

জহিরুল: আপনার কি মনে হয় বাংলাদেশের এবং পশ্চিমবঙ্গের বাংলা ভাষা একে অন্যের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে?

মাহমুদ: স্বাধীনতার আগে একটা চেষ্টা ছিল দুই বাংলার সাহিত্যভাষাটাকে এক করে তোলার। কিন্তু বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর থেকে কেবলই তা দূরে সরে যাচ্ছে। দুই বাংলার ভাষা এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন।

জহিরুল: পশ্চিমবঙ্গের তরুণ কবিদের কবিতা পড়ার অবকাশ হয়েছেচমকে দেবার মতো কোনো কবিতা কি চোখে পড়েছে?

মাহমুদ: চমকে দেবার মতো কবিতা নিশ্চয়ই ওখানকার তরুণরা লিখছেন। কিন্তু আমার অধ্যয়ন সীমিত বলে আমি এ সম্পর্কে মন্তব্য করতে পারছি না। তবে আমি নিশ্চিত ওরা খুব ভালো কবিতা লিখছেন।

জহিরুল: বাংলাদেশের এই মুহূর্তের কবিতা আপনাকে কতটুকু আন্দোলিত করে। আজকাল তো বেশ অন্যরকম কবিতা লেখা হচ্ছেআল মাহমুদের কবিতা থেকে আলাদা।

মাহমুদ: আমাকে মোটেও আন্দোলিত করছে না। বলতে পারআমার ভালো লাগে না । হ্যাঁনব্বইয়ের দশকের কয়েকজন অভ্যাসের বাইরে কিছু পংক্তি রচনা করেছে। আমাকে কিছুটা আলোড়িত করেছে।

জহিরুল: অভ্যাসের বাইরে মানে কীআঙ্গিকগতবিষয়বস্তুর দিক থেকেনা কি অপ্রচলিত শব্দ ব্যবহারের দিক থেকেনাকি রাজনীতির ডান-বামের কথা বলছেন?

মাহমুদ: আমি এদেরকে আস্তিক কিংবা নাস্তিক কোনোভাবেই দেখছি না। কবিতার রহস্যই আমাকে আন্দোলিত করেছে।

জহিরুল: নব্বইয়ের এই যে কয়েকজনের কবিতা আপনার ভালো লাগলএরা কারানাম বলবেন কি?

মাহমুদ: কারও নাম উল্লেখ করে বিপদে পড়তে চাই না।

জহিরুল: আপনি লিখেছেন, ‘ভেবেছি তো অন্ধকারে আমি হব রাতের পুরুত/আদিম মন্দিরে একা। তুমি এসো নগ্নতার দেবী। মনে হয় আপনার কবিতায় প্রেম’, ‘প্রকৃতি’, ‘নারী’ ও মানবিকতা’ সব সমার্থক এবং তীব্রভাবে শারীরিক। এ সম্বন্ধে কিছু বলেন।


মাহমুদ: আমি তো ধারাবাহিকতার বাহক। বাংলা আদি সাহিত্য মূলত নরনারীর শারীরিক সম্পর্কের ব্যাপারে খুবই খোলামেলাঅশ্লীলও বলতে পার। আমি আদি সাহিত্য থেকেই সংগ্রহ করেছিআমার পূর্বপুরুষের ধারাবাহিকতা বহন করব না?

জহিরুল: প্রেমিকস্বামীবাবা এবং কবি। কোন ক্ষেত্রে নিজেকে সফল মনে করেন?

মাহমুদ: আমি আসলে কবিতায়ই পারঙ্গম। স্বামী হিসাবে নিজেকে খুব সফল মনে করি না। আজ পঞ্চাশ বছর একসঙ্গে আছিএটা তারই কৃতিত্বতারই গুণে। আমি প্রকৃতপক্ষে আমার স্ত্রীর ওপর খুবই নির্ভরশীল। তাকে ছাড়া আমার একদিনও চলবে না। আমার নখ কাটা থেকে শুরু করে বলা যায় প্রায় ব্যক্তিগত সবকিছুর জন্যই তার ওপর আমাকে নির্ভর করতে হয়।

জহিরুল: কবছর বয়সে লিখতে শুরু করেনপ্রথম কবিতাটির কথা মনে আছে?

মাহমুদ: মনে আছে তখন আমি ক্লাস সেভেনে পড়ি। কবি নজরুল ইসলামের কবিতায় উদ্বুদ্ধ হয়ে তাঁর কবিতার মতো একটি কবিতা লিখেছিলাম। আজ এত বছর পর আর সেই কবিতার নাম বা কোনো চরণ মনে করতে বলো নাআমি পারব না।

জহিরুল: হতে পারতেন ডাক্তারউকিলঅভিনেতা কত কিছুকবি হলেন কেন?

মাহমুদ: যেহেতু অন্য কোনো কাজের দক্ষতা আমার মধ্যে জন্মায়নি।

জহিরুল: পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রএরপর পশ্চিমা বিশ্ব বনাম ইসলামএই যে দ্বিধা-বিভক্তিঅস্থিরতাযার ফলাফল দু-দুটো বিশ্বযুদ্ধ। ইরাকআফগানিস্তান এবং ভিয়েতনাম যুদ্ধ। এ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কীএ থেকে পরিত্রাণের উপায় কী বলে আপনি মনে করেন?

মাহমুদ: সমাজতন্ত্রের নেতারা এখন আর পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে না। লড়াই করছে ইসলামপন্থিরা। ইসলাম কেন পুঁজিবাদের শত্রু? এজন্য যেইসলামে সুদ হারাম। আর সুদ না থাকলে পুঁজিবাদ শেষ। বিশ্বায়নের পাঁয়তারা হলো তৃতীয় বিশ্বকে আরও সহজে শোষণ করার একটা কৌশল। তবে আমেরিকাকে কাউন্টার করার জন্য এক ঘুমন্ত দানব জেগে উঠছেতার নাম চায়না। যুদ্ধ থামবে না। আমি মনে করি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ সমাসন্ন। পারমাণবিক ধ্বংসযজ্ঞ অবধারিত। এরপর মানব সভ্যতা টিকে থাকবে না। যদি কোনো কারণে টিকে থাকেতখন একটি ধর্ম লাগবে। সেই ধর্ম হলো ইসলাম। ইসলামই শান্তি প্রতিষ্ঠা করবে।

জহিরুল: কিন্তু আমি জানতে চাচ্ছিলাম এই অনিবার্য’ ধ্বংসযজ্ঞের হাত থেকে বাঁচার উপায় কী?

মাহমুদ: কোনো উপায় নেই। এজন্য যে আমেরিকা কারও কথা শুনবে না।

জহিরুল: মাতৃভূমি যখন বিপন্ন তখন মানুষ নিজের জীবন দিতে দ্বিধা করে না। দেখেছি প্যালেস্টাইনেদেখেছি ইরাকে, সুইসাইড স্কোয়াডের সদস্যরা অবলীলায় প্রাণ বিসর্জন দিচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশে তো অমন সমস্যা নেইএখানে সুইসাইড স্কোয়াড কেন?

মাহমুদ: এই বিষয়ে আমি কোনো কমেন্ট করতে চাই না।

জহিরুল: অনেক বড়ো কবিকে দেখেছি সুনির্দিষ্ট কোনো নারীর নাম নিয়েছেন কবিতায়কখনো বারবারঅনেকবার। আপনি অনেক প্রেমের কবিতা লিখেছেন। আপনার কবিতায় প্রেমনারী, যৌনতা এই বিষয়গুলো বারবারই এসেছে কিন্তু আপনি কখনোই সুনির্দিষ্ট কোনো নারীর নাম করেন নি কবিতায়যেমন সুনীলের নীরাজীবনানন্দের বনলতা। বিষয়টি কি আপনি সচেতনভাবে এড়িয়ে গেছেননাকি তেমন কোনো অনুপ্রেরণা ছিল না?

মাহমুদ: আমি তো সমস্ত কবিতায় একটি মেয়ের কথাই বলেছি। একটি শ্যামলা মেয়ের রূপের বর্ণনা করেছি সর্বত্র কিন্তু সেটা বাই নেমে আসেনি। আমি মনে করি নাম উল্লেখ করা ঠিক নাআমি সচেতনভাবেই নাম এড়িয়ে গেছি।

জহিরুল: ত্রিশের দশকেই মূলত আধুনিক বাংলা কবিতা সাবালক হয়ে ওঠে। পঞ্চাশের শামসুর রাহমানআল মাহমুদশক্তি চট্টোপাধ্যায়রা একে দান করে পূর্ণ যৌবন। ষাটসত্তরআশি এর ধারাবাহিকতা মাত্র। নব্বইয়ের তরুণরা কিংবা নতুন সহস্রাব্দের অতি-তরুণরা বদলাতে চাচ্ছে কবিতার গতি-প্রকৃতি। চলছে নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষা। এই ধারাবাহিকতার সূত্র ধরে ২১০০ সালের কবিতা কেমন হবে বলে আপনি মনে করেন?

মাহমুদ: তখনও কবিতায় স্বপ্ন থাকবেইঙ্গিত থাকবেপ্রেম থাকবেযৌনতা থাকবে এবং আমার মনে হয় পয়ারও থাকবে। তবে তখন কবিরা চাঁদের রেস্টুরেন্টে বসে আড্ডা দেবে আর মঙ্গলের মাটির নিচে বানানো প্রাসাদে ঘুমাবেএ বিষয়ে আমি নিশ্চিত।

জহিরুল: পয়ারের প্রতি আপনার বেশ দুর্বলতা আছে লক্ষ করেছিআপনি ব্যক্তিগতভাবে কোন ছন্দে লিখতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন?

মাহমুদ: মাত্রাবৃত্ত আমার খুবই প্রিয় ছন্দ। আমি মাত্রাবৃত্তে লিখতে বেশি পছন্দ করি। তবে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি অক্ষরবৃত্তে।

জহিরুল: আজ সত্তর পেরিয়ে একবার পেছনে তাকান তোএই যে পর্বতপ্রমাণ সাফল্য, এত এত গ্রন্থজনপ্রিয়তাসম্মাননাপদক, কখনো কি মনে হয় যদি কবি না হয়ে অন্য কিছু হতেনতাহলে বড়ো ভুল হয়ে যেত?

মাহমুদ: খুব ছোটোবেলায় মনে হতো প্রত্নতাত্ত্বিক হবো। ইতিহাসের অনুসন্ধানে মাটি খুঁড়ব। কিন্তু কিছুকাল পরেই বুঝতে পারলাম আমাকে লেখকই হতে হবে। আমি আসলে যা হতে চেয়েছিলামতাই হয়েছি।

জহিরুল: আপনি যখন গণকণ্ঠের সম্পাদক ছিলেনসাংবাদিকতার কারণে আপনাকে জেল খাটতে হয়েছে। কেমন ছিল জেল জীবন?

মাহমুদ: জেল খুব খারাপ জায়গা। জেল আমার কোনো উপকার করেনি। ভীষণ ক্ষতি করেছে। তবে ওই একটি বছর কোনো কাজ ছিল না বলে বেশ কিছু বই পড়তে পেরেছি। রামায়ণমহাভারতউপনিষদগীতাত্রিপিটক এইসব বই পড়েছি। জেল খুব কষ্টকরমানুষকে শেষ করে দেয়।

জহিরুল: কবিতার জন্য সংবর্ধিত হয়েছেন বহুবারকখনো কি নিগৃহীত হয়েছেন? মাহমুদ : তেমন অর্থে এই দুর্ভাগ্য আমার হয়নি। একবার একটি ধর্মীয় গোষ্ঠী আমাকে লাঞ্ছনা দিতে চেষ্টা করেছিল। অন্য একদল মুক্তিবুদ্ধির মানুষের জন্য তা করতে পারে নি। স্পেনের কুইভাল নদীর পাড় ধরে হাঁটবআমার এই স্বপ্নভঙ্গ হয়েছিল।

জহিরুল: এক কবিতায় আপনি বিশ্ববিদ্যালয়কে ডাকাতদের গ্রাম’ বলার পরে অনেক লেখালেখি হয়েছিলঅনেকে ব্যক্তিগতভাবেও অপদস্ত করতে চেয়েছিল।

মাহমুদ: ওই কবিতাটি আমি কেন লিখেছি তা হলে শোনোআমি তখন শিল্পকলা একাডেমির ডিরেক্টর। আমার অফিসের একটি মেয়েমাত্র কদিন আগে বিয়ে হয়েছেগহনা পরে বিয়ের অনুষ্ঠানে যাচ্ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশ দিয়ে। ওকে টেনে-ছিঁড়ে ফেলল ডাকাত ছেলেগুলো। ওর সব গহনাগাটি ছিনিয়ে নিল। মেয়েটি অফিসে এসে পরদিন আমার কাছে উপুড় হয়ে পড়ল। ওই কবিতা লেখার পর দেশের একজন বড়ো কবির নেতৃত্বে আমার বিরুদ্ধে একটি মিছিল বের হবার কথা ছিল। কিন্তু তা হয়নি। কারণ ওই রাতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হলে প্রচুর অস্ত্র ধরা পড়ে।

জহিরুল: জীবনের কোনো মুহূর্তে কি মনে হয়েছে কবি হয়েছেন বলে স্ত্রী, সন্তানআত্মীয়-স্বজনবন্ধুসমাজ আপনার দিকে বাঁকা দৃষ্টিতে তাকিয়েছে?

মাহমুদ: মনে হয়নি। বরং কবি হয়েছি বলে আমার দিকে সবাই সুদৃষ্টিতেই তাকিয়েছে। এ জীবনে যা কিছু অর্জন তা-তো কবিতার জন্যই।

জহিরুল: আপনার এই দীর্ঘ কবি জীবনের ধারাবাহিকতা অক্ষত রাখার ক্ষেত্রে ভাবীর অবদান কতখানিঅর্থনৈতিক অস্বচ্ছলতার দিনে কখনো কি স্ত্রীর কটুবাক্য শুনতে হয়েছেকারণ আপনি কবি?

মাহমুদ: আমি আমার স্ত্রীকে খুব ভালোবাসি। তাকে আমি পুরোটাই উজাড় করে দিয়েছিস্ত্রী হিসেবে তার যা তৃষ্ণা আমি তা মিটিয়েছি ষোলোআনা। আমি কখনো ড্রেনের পানির দিকে মুখ বাড়াইনিকারণ আমার ফ্রিজ ভরা ঠান্ডা পানি। বিবাহিত জীবনের প্রথমদিকে বেশ অনেককাল অর্থনৈতিক অস্বচ্ছলতা ছিল। পরবর্তী জীবনেও মাঝে মাঝে চাকরি ছিল না। সেই সব দুর্দিনে সে তার বাপের বাড়ি থেকে অনেক এনেছে কিন্তু কখনো আমাকে ব্লেইম করেনি।

জহিরুল: আপনার একটি অসামান্য উপন্যাস উষ্ণ কর্দমের চর। এই উপন্যাসে বর্ণিত কৈবর্ত্য সম্প্রদায়ের সাথে আপনার বাস্তব সম্পৃক্ততা কতখানি?

মাহমুদ: ছোটোবেলা থেকেই আমি কৈবর্ত্য সম্প্রদায়ের ছেলেমেয়েদের সাথে পড়েছি। ওদের ঘরে গেছিথেকেছিখেয়েছি। ওদের সাথে আমার নিবিড় সম্পর্ক ছিল এবং এখনও আছে। কৈবর্ত্য মেয়েরা অত্যন্ত দুঃসাহসীপ্রেমে এবং কর্মে। আমার দেখা ওই বিশেষ কৈবর্ত্য শ্রেণীর মেয়েদের গায়ের রং কালোপেটানো স্বাস্থ্য এবং দীর্ঘাঙ্গিনীছয় ফুট লম্বা একেকটি মেয়ে।

জহিরুল: আপনার লেখালেখিতে প্রায়ই কালো নারীর রূপের বর্ণনা আসে। মনে হয় কোনো বিশেষ কারণে আপনি কৃষ্ণবর্ণের নারীদের প্রতি দুর্বল। কারণটা কী?

মাহমুদ: আমি নিজেও এ নিয়ে ভাবি। কারণটা মনে হয় এই যেআমি যে নারীর কাছে মানুষ হয়েছিঅর্থাৎ যে নারী আমাকে লালন-পালন করে বড়ো করেছেন তিনি ছিলেন শ্যামবর্ণকালোও বলতে পার। শৈশবের সেই ভালো লাগাই হয়তো আমার রচনাতে বারবারই ঘুরে-ফিরে এসেছে।

জহিরুল: শিল্পের জন্য শিল্প’ আপনি এই স্লোগানকে কীভাবে দেখেন?

মাহমুদ: আমি তা মানি না। আমি জীবনের তরঙ্গ থেকে বের হয়ে আসা কবি। আমি দৃঢ়ভাবে বলতে চাইশিল্প সর্বতোভাবে জীবনের জন্য।

জহিরুল: স্বাধীনতাপূর্ব এবং স্বাধীনতাউত্তরকালের বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা আপনার কবি জীবনকে কতখানি প্রভাবিত করেছে?

মাহমুদ: একজন কবিকে রাজনীতি ভীষণভাবে প্রভাবিত করে। রাজনীতি আমার ব্যক্তিজীবনকে সরাসরি প্রভাবিত করেছে। জেল খেটেছিআবার পুরস্কৃতও হয়েছি। আমাকে দুভাবেই প্রভাবিত করেছে।

জহিরুল: একজন কবির কি রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা থাকা উচিতআপনি কি কখনো কোনো দলীয় রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন বা আছেন?

মাহমুদ: আমি কবিদের রাজনীতি থেকে দূরে থাকতে পরামর্শ দিই। রাজনীতি দুঃখ ছাড়া আর কিছুই দেয় না। রাজনীতি মানুষকে বুর্জোয়ামানসিক করে তোলে, প্রতারণা এবং চতুরতা শেখায়। কাব্য সৌন্দর্যের বিষয়। কবিদের এজন্য রাজনীতির কদর্যতা থেকে দূরে থাকা উচিত।

জহিরুল: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজে আপনাকে শিল্পকলা একাডেমীর একটি সম্মানজনক পদে চাকরি দিয়েছিলেন। তিনি কেন এটা করেছিলেন?

মাহমুদ: অন্যায়ভাবে তিনি আমাকে জেল খাটিয়েছিলেন। পরে তিনি সেটা রিয়েলাইজ করতে পেরেছিলেন। আমি কৃতজ্ঞ যে দেরিতে হলেও তাঁর বোধোদয় ঘটেছিল। তিনি তৎকালীন সাংস্কৃতিক মন্ত্রীকে নির্দেশ দিয়েছিলেন আমাকে যেন এই চাকরিটা দেওয়া হয়।

জহিরুল: শেখ মুজিব আপনাকে জেল খাটাল আবার চাকরিও দিলপ্রেসিডেন্ট জিয়ার সাথেও আপনার সুসম্পর্ক ছিলপ্রেসিডেন্ট এরশাদ আপনাকেশামসুর রাহমানফজল শাহাবুদ্দীনসহ আরও অনেককে জমি দিয়েছেন। মোটামুটি সব সরকার প্রধানের সাথেই আপনার একটা সম্পর্ক ছিল। এই তিন পুরুষ সম্পর্কে কিছু মন্তব্য করেনকেমন ছিলেন তারা?

মাহমুদ: এই কাজটা আমি করতে চাই না। 

জহিরুল: ঠিক আছে নেগেটিভ কিছু না বলেনপজেটিভ কিছু বলেন। তাদের নিশ্চয়ই অনেক ভালো গুণও ছিল।

মাহমুদ: শেখ মুজিব ছিলেন এক বিশাল হৃদয়ের মানুষলায়ন হার্টেড ম্যান। জিয়া ছিলেন সাহসী যোদ্ধা এবং খাঁটি দেশপ্রেমিক। আর এরশাদহা হা হা...তিনি একজন রোমান্টিক মানুষ। সুন্দরীদের এবং কবিদের তিনি খুব ভালোবাসেন।

জহিরুল: আপনি প্রায়শই বলেনএকজন কবিকে স্বার্থপর হতে হয়। এই স্বার্থপরতার স্বরূপ কেমন?

মাহমুদ: আড্ডাবাজি কমাতে হবে। স্বার্থপরের মতো আড্ডা থেকে উঠে আসতে হবে। লেখায় বসে যেতে হবে। একজন কবিকে কবিতা লিখতে হবে। আড্ডাবাজি করে কবি হওয়া যায় না। কবি হতে হয় কবিতা লিখে।

জহিরুল: অনেক বড়ো কবি/লেখককে দেখা যায় তারা ছবি আঁকেনগান করেনচলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। যেমনঃ রবীন্দ্রনাথনজরুলসত্যজিৎহুমায়ূন আহমেদ। আপনি এ কাজগুলো করেননিএজন্য কি আক্ষেপ হয়?

মাহমুদ: ছবি বানাবার ভারি শখ ছিল। আসলে সময় পাইনি। কবিতাতেই বেশি জোর দিয়েছি। তবে এজন্য কোনো আক্ষেপ নেই।

জহিরুল: যা যা হয়েছেন বা করেছেনএর বাইরে আর কী না করতে পারার অতৃপ্তি রয়েছে আপনার?

মাহমুদ: আমার জীবনে দ্বিতীয় নারীর সাথে সঙ্গম করার কোনো অভিজ্ঞতা নেইএইটা একটা অতৃপ্তিহা হা হা হা...।

জহিরুল: প্রতি বছর ঈদসংখ্যার জন্য বেশ তাড়াহুড়ো করে লেখকদেরকে, আপনাকেও বেশ অনেকগুলো লেখা তৈরি করতে হয়। বিশেষ করে উপন্যাস। আপনার কি মনে হয় না একজন লেখক এই সময়টাতে তার স্বাভাবিক ক্যাপাসিটির চেয়ে বেশি লিখেন বলে কোয়ালিটি ফল করে?

মাহমুদ: আমি তো মনে করি আমি কোথাও ফেইল করিনি। কোয়ালিটিও ফল করে নি। এই ঈদে একটি উপন্যাস লিখেছিযমুনাবতীবাংলা ভাষায় এরকম বর্ণনামূলক উপন্যাস আর কটা আছে দেখাও। যা লিখেছিআমি মনে করি না আমার ক্যাপাসিটি এর চেয়ে কম ছিল।

জহিরুল: নতুন ধরনের কোনো কাজ করার পরিকল্পনা আছে কিএ যাবৎ যা করেছেন তার বাইরে কোনো কিছু?

মাহমুদ: দুটো কাজ করার পরিকল্পনা আছে। একটি কাব্যনাট্য লিখতে চাই। আর একটি দীর্ঘ কবিতা লিখবসমিল ছন্দে। একটি কবিতা-ই একটি বই হবে।

জহিরুল: কেউ কেউ বলেনআপনি দলবাজিতে অপটু। তাই শামসুর রাহমানের চেয়ে পিছিয়ে আছেন। এই অভিযোগকে আপনি কীভাবে দেখেন?

মাহমুদ: হয়তো তারা ঠিকই বলে।

জহিরুল: শামসুর রাহমান তাঁর ভক্ত তরুণ লেখকদের নানান উপকার করেন কিন্তু আপনি তা করেন নাকথাটা কি ঠিক?

মাহমুদ: আমি একজন উদার মানুষ। এই অভিযোগটা ঠিক না।

জহিরুল: আপনাকে খুব অল্প দামে কিনে ফেলতে পারে প্রকাশকরা, কাগজওয়ালারা। কথাটা কি ঠিক?

মাহমুদ: ঠিকই বোধ হয়। দরিদ্র লোকটাকার লোভ সামলাতে পারি না। যে যা বলেঅমনি রাজি হয়ে যাইদরকষাকষি করি না।

জহিরুল: আপনি নাকি জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের উপদেষ্টা ছিলেন?

মাহমুদ: ডাঁহা মিথ্যা কথা (কিছুটা উত্তেজিত)। জামাতের রাজনীতির ধরন জানো না? ওদের মেম্বারশীপের নানান স্টেজ আছে। জামাতের রাজনীতিতে ঢোকা বা কাউকে ঢোকানো বেশ কঠিন ব্যাপার। আর তাছাড়া আমি ওদের উপদেষ্টা হতে যাবই বা কেনআমি মনে করি না একজন কবির সরাসরি রাজনীতি করা উচিত।

জহিরুল : এপার বাংলা ওপার বাংলা এক হওয়ার স্বপ্নকে আপনি কীভাবে দেখেন?

মাহমুদ : এটা বারো ভূঁইয়াদের দেশ। এই স্বপ্ন কখনোই পূরণ হবে না।

জহিরুল : আপনি কবিতীর্থ’-র সাথে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেনসুনীলের কবিতা তেমন কিছুই হয়নি তবে তার গদ্য বেশ ভালো। পরবর্তীতে আবার নকশিকাঁথার সাথে বলেছেনসুনীলের গদ্য তেমন ভালো না তবে তার কবিতা ভালো। এটা কি পরস্পরবিরোধী বক্তব্য হয়ে গেল না?

মাহমুদ: তাহলে এখন কী বলি শোনোসুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের গদ্য কিংবা পদ্য কোনোটাই আমার ভালো লাগে না। ওপারের প্রধান কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়, একথা আমি আগেও বলেছি, আবারও বলছি। সুনীলের শ্রেষ্ঠ রচনাটির নাম অর্জুন। এটি একটি বিশুদ্ধ সাম্প্রদায়িক বই। সে প্রাণ খুলে ওটা লিখেছে। আমি এতে তেমন কোনো দোষ দেখি না।

জহিরুল: এখন তো সময় এসেছে ষাটের প্রধান কবি খুঁজে বের করার। আর এ কাজটা আপনাদেরমানে পঞ্চাশের কবিদেরই করতে হবে। আপনার দৃষ্টিতে ষাটের প্রধান কবি কে?

মাহমুদ: গুণনির্মলেন্দু গুণ-ই ষাটের প্রধান কবি। তবে রফিক আজাদও ষাটের একজন গুরুত্বপূর্ণ কবি।

জহিরুল: তার মানে কি এই দাঁড়ালপঞ্চাশের কথা উঠলেই আমরা যেমন বলিশামসুর রাহমানআল মাহমুদ। ঠিক তেমনিষাট মানেই নির্মলেন্দু গুণ আর রফিক আজাদ?

মাহমুদ: বলতে পার।

জহিরুল: নিজের মৃত্যু নিয়ে কখনো ভাবেনশামসুর রাহমান বলেছিলেন, একজন কবির ৪০০ বছর বাঁচা উচিত’ আপনি কী মনে করেন?

মাহমুদ: নিজের মৃত্যু নিয়ে আমি সব সময় ভাবি। আমি মনে করি কবির দীর্ঘায়ু হওয়া উচিত।

জহিরুল: মানে কত বছর?

মাহমুদ: আশি বছর।

জহিরুল: লেখার সংখ্যা এবং মানএই দুটোর মধ্যে কোনটিকে আপনি প্রেফার করেন?

মাহমুদ: মানকেই আমি সব সময় গুরুত্ব দেই। তবে সংখ্যাও একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার।

জহিরুল: ক্রোধঘৃণাপ্রেম এই বিষয়গুলোর প্রতি আপনি কতটা সংবেদনশীল?

মাহমুদ: আমার ক্রোধ নেইকিছুটা থাকলেও সেটা আমার নিয়ন্ত্রণের মধ্যে। তেমন তীব্র ঘৃণাও নেই আমার। তবে কামস্পৃহা খুব তীব্র। আমি এটা কন্ট্রোল করতে পারি না। সবসময় প্রার্থনা করি কাম নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা অর্জনের জন্য। তবে কাম প্রবৃত্তিই হয়তো কবিতা হয়ে বেরিয়ে এসে আমাকে প্রশমিত করে।

জহিরুল: এটাই শেষ প্রশ্ন, ‘যেভাবে বেড়ে উঠিতে আমরা দেখেছি আপনার শৈশব-কৈশোরের দুরন্তপনা। বেড়ে ওঠার পরের ঘটনা আপনার পাঠকদেরকে জানাচ্ছেন না কেন?

মাহমুদ: হে হে হে হে...অনেকেই তো এখন বড়ো বড়ো নেত্রী হয়েছেন। ওদের ঘর ভাঙতে বলো আমাকে?

Comments

  1. সাক্ষাৎকারটি পড়ে খুবই ভালো লেগেছে। আমার মনে হয়, কবি আল মাহমুদকে নিয়ে এই মানের সাক্ষাৎকার ইতিপূর্বে কেউ গ্রহণ করেনি।

    ReplyDelete
    Replies
    1. অনেক ধন্যবাদ কবি সোহেল মাহমুদ। ভালোবাসা নেবেন।

      Delete
  2. খুব ভালো লাগলো! পঞ্চাশের দশকে কবি আল মাহমুদ অন্যতম একজন প্রধান কবি। তাঁর সম্পর্কে আগ্রহী পাঠকদের অনেক কৌতুহল মেটাবে এই মূল্যবান সাক্ষাৎকারটি। কবি কাজী জহিরুল ইসলামকে অভিনন্দন!!

    ReplyDelete
    Replies
    1. অনেক ধন্যবাদ কবি আমীরুল আরহাম ভাই। ভালোবাসা নেবে।

      Delete
  3. খুবই ডিটেইল প্রাণবন্ত সাক্ষাৎকার হয়েছে। একজন আল মাহমুদ কে আপনি যেভাবে অবলীলায় নাড়াচাড়া করেছেন, বলতেই হয় খাঁটি রাঁধুনি আপনি!! ধন্যবাদ।

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

অসাধারণ এই শিল্পীর জীবনের গল্প বড় করুণ

  [এই সময়ের অত্যন্ত প্রতিভাবান শিল্পী সারফুদ্দিন আহমেদ। বাড়ি পশ্চিমবঙ্গে। আর্ট কলেজে খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করেন ,  আর শুধু ছবি আঁকেন। নানান মাধ্যমে ,  নানান বিষয়ের ছবি। সারফুদ্দিন আহমেদের ছবি থেকে চোখ ফেরানো যায় না ,  আপনাতেই ওঁর নান্দনিক সৃষ্টিকর্মে দৃষ্টি আটকে যায় ,  কী জল রঙ ,  কী অ্যাক্রিলিক ,  কিংবা স্রেফ পেন্সিলের ড্রয়িং। এই গুণী শিল্পীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কবি কাজী জহিরুল ইসলাম। সাক্ষাৎকারটি এখানে উপস্থাপন করা হলো।]       ভারত আমাকে চোখ দিয়েছে ,  বাংলাদেশ দিয়েছে দৃষ্টি -     সারফুদ্দিন আহমেদ     কাজী জহিরুল ইসলামঃ  ব্যাক গ্রাউন্ডে তবলা বাজছে আপনি ছবি আঁকছেন কাচের ওপর।    এই যে বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে ছবি আঁকা, এই ছন্দটা ছবিতে কিভাবে ধরেন? আর কোনো শিল্পী ছবি  আঁ কার সময় যন্ত্রানুসঙ্গ ব্যবহার করেছেন?   সারফুদ্দিন আহমেদঃ   কাঁচ নয়,   এটি এক বিশেষ ধরনের কাপড়-নেট। এই নেটের উপরে বর্তমানে আমার এক্সপেরিমেন্ট চলছে।    জহিরুলঃ ও ,  ফেইসবুকে যখন ছবিটি দেখি কাচের মতো ...

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জুর সাক্ষাৎকার || অষ্টম পর্ব ||

[লেখক, সাংবাদিক, অনুবাদক আনোয়ার হোসেইন মঞ্জুর সাক্ষাৎকারের অষ্টম  পর্ব আজ প্রকাশ করা হলো। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কবি কাজী জহিরুল ইসলাম।]          দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ বাসস - কে অকার্যকর করেছে  – মঞ্জু    জহিরুলঃ  আপনি ফেলোশিপ নিয়ে দিল্লীতে ছয়মাস ছিলেন, ব্যক্তিগত আগ্রহ এবং পেশাগত অভ্যাসের কারণে কাছে থেকে দেখার/বোঝার চেষ্টা করেছেন ভারতের এবং উপমহাদেশের রাজনীতি। আমরা দেখি ভারতের রাজনীতিতে গায়ক, নায়ক, লেখক, সাংবাদিকের আবির্ভাব ঘটে সব সময়ই এবং তারা রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও রাখেন। বাংলাদেশে এই ধারা খুব সম্প্রতি শুরু হলেও আমাদের জনপ্রিয় খেলোয়াড়, শিল্পীরা নিজেদের অর্থনীতি সমৃদ্ধ করা ছাড়া রাজনীতিতে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেন না। এমন কি ধর্ষণ, অন্যদেশকে ট্রানজিট প্রদান, উপর্যুপরি সড়ক দূর্ঘটনা, পরিবেশ ধ্বংসকারী কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্প ইত্যাদি ইস্যুতেও তারা নীরব। অথচ তাদের জনপ্রিয়তা এবং রাজনীতি সম্পৃক্ততা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত, যা ভারতে দেখা যায়। বিষয়টি যদি আপনার মতো করে ব্যাখ্যা করেন।  মঞ্জুঃ   দিল্লিতে আমার অবস্থানকালকে আমি নানা দিক থ...

কানের কাছে নারী কন্ঠ

  স্বপ্নের ঐশ্বর্য   || কাজী জহিরুল ইসলাম ||   ছুটির দিন। লম্বা সময় ধরে ঘুমাবো। কিন্তু তার আর উপায় নেই। কানের কাছে নারী কন্ঠ। বেশ আত্মবিশ্বাসী কন্ঠ। ক্রমাগ ত  কথা বলে যাচ্ছেন এক অপরিচিতা। আমি লাফ দিয়ে উঠি। কে তিনি ?  আমার স্ত্রী বলেন ,  রুবানা হক ,  শোনো কী বলছেন। রুবানা হক প্রয়াত ব্যবসায়ী আনিসুল হকের স্ত্রী। আমাদের কৈশোর-উত্তীর্ণ কালে আনিসুল হক ছিলেন আমাদের হিরো। টিভি উপস্থাপনায় অন্য এক আধুনিকতা নিয়ে হাজির হন তিনি। এরপর আমরা ধীরে ধীরে তার ব্যবসায়ীক সাফল্য ,  সাংগঠনিক সাফল্য দেখতে দেখতে বড় হই। খুব সাম্প্রতিককালে ,  আনিসুল হকের মৃত্যুর পর ,  কেউ একজন বলেছিলেন ,  তার স্ত্রী রুবানা হকও খুব ভালো কথা বলেন। কিন্তু রুবানা হকের কথা শোনার সৌভাগ্য আমার হয়নি। দুই যুগ ধরে দেশের বাইরে থাকার কারণে এই সময়ে স্টার হয়ে ওঠা অনেকের সম্পর্কেই আমার ভালো ধারণা নেই।  তার কথায় এমন কিছু ছিল যে আমার পক্ষে ঘুমিয়ে থাকা সম্ভব হয়নি। আমি মুক্তিকে বলি ,  প্রথম থেকে দাও ,  পুরো বক্তৃতাটা আমি শুনতে চাই। আমি পরপর দুইবার তার পুরো বক্তব্যটা শুনি ,  ফ...