[১৯৪২ সালের ১৪ আগস্ট শহীদ কাদরী জন্মগ্রহণ করেন, ২০১৬-র ২৮ আগস্ট তিনি মৃত্যুবরণ করেন। আগস্ট কাদরী চর্চার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সময়। তাই তাকে নিয়ে আমার লেখাগুলো এই মাসেই ব্লগে তুলে দিচ্ছি।]
শহীদ কাদরীর ছেলেবেলা (একটি সাক্ষাৎকার)
কাজী জহিরুল ইসলাম
দাদা ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট আমিরুদ্দিন আহমাদ কাদরী, পিতা স্টার অব ইন্ডিয়া পত্রিকার সম্পাদক, পরবর্তিতে ইন্ডিয়ান সেন্ট্রাল জুট কমিটির এসিস্ট্যান্ট ডাইরেক্টর জেনারেল, খালেদ ইবনে আহমাদ কাদরী। এইরকম পারিবারিক ঐতিহ্য ললাটে নিয়ে কোলকাতার পার্কসার্কাসের একটি তিনতলা বাড়িতে ১৯৪২ সালের ১৪ আগস্ট জন্মগ্রহন করেন বাংলাভাষায় অন্যতম প্রধান কবি শহীদ কাদরী। এই বাড়িটিতেই হাঁটি হাঁটি পা পা করে পরিপুষ্ট হতে থাকে তার শৈশব। রাশভারী পিতার অনুশাসন ফাকি দিয়ে, মা এবং দাদীর প্রশ্রয়ে বেড়ে ওঠা বর্ণিল দিনগুলোর কথা বলতে গিয়ে কবি নস্টালজিক হয়ে পড়েন, হারিয়ে যান শৈশবের সেই দিনগুলোতে।
-বুঝলা জহির, খুব শান-শওকত ছিল। আর্দালি, কাজের লোক, ড্রাইভার, বাড়িতে প্রচুর লোকজনের আসা-যাওয়া, সব মিলিয়ে একটা এলাহী কান্ড। আমার বড় ভাই শাহেদ কাদরী ছিলেন চার বছরের বড়, ছোট বোনের নাম নাজিফা কাদরী। তিন ভাই-বোনের মধ্যে আমি ছিলাম খুব ডানপিটে। আমাদের দু’জন গৃহশিক্ষক ছিলেন। দু’জনই আব্বার অফিসে চাকরী করতেন। একজন কুমিল্লার আব্দুল গণি সাহেব, অন্যজন খুলনার আব্দুর রহিম সাহেব। এই দূর দেশে চাকরী করতে এসে তারা কোথায় থাকবেন? আব্বা নিয়ে এলেন আমাদের বাড়িতে। আমাদেরতো নিজেদের তিনতলা বাড়ি, ওপর তলায় থাকতেন আমার ফাহমিদা ফুফু, বাকী পুরো বাড়িটাতেই আমরা থাকতাম।
-আপনার আম্মার নামটা যদি বলেন, উনার সম্পর্কেও কিছু জানতে চাই।
- আম্মা ছিলেন বর্ধমানের মেয়ে, মাহমুদা খাতুন। গায়ের রঙ ছিল কালো। এই যে দেখ না আমি কালো আর বোঁচা নাক, আম্মার কাছ থেকে পেয়েছি। আব্বাতো ছিলেন বিরাট লম্বা আর সুদর্শন। বুঝলা, আব্বারে ঠকাইছিল। তখনতো বিয়ের আগে মেয়ে দেখা যেত না। আমার মামা ছিলেন খুব সুদর্শন। টিকালো নাক, দুধে-আলতা গায়ের রঙ, সোনালী চুল, নীলাভ চোখ। আব্বাতো মামারে দেইখাই কাবু। ভাবছিলেন, তার বোনতো তার মতোই হবে। বিয়ের আগে ছবিটাও দেখায় নাই। সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের পরহেজগার মেয়ে, ছবি তোলা যাবে না। ছবি দেখতে পারলে কি আর আব্বা এই বিয়ে করতেন? আব্বার মনে এ নিয়ে কষ্ট ছিল।
- ফুফুর পরিবারে কে কে ছিলেন? সমবয়সী ফুফাত ভাই-বোন?
- না না, উনারা আমার অনেক বড় ছিলেন। ফুফাত ভাই, যাকে ভাই সাহেব বলে ডাকতাম, তিনি তখন বিবাহিত। ফুফাত বোন ছিলেন একজন, তিনিও বিবাহিতা। ফুফুর আদর-ভালবাসাও আমি আর আমার ভাই-বোনই পেতাম। ফুফুরা খুব ধনী ছিলেন। আসামে তাদের চা বাগান ছিল। আমার চাচাদেরও আসামে চা বাগান ছিল। দেশ ভাগের পর যখন তারা পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন তখন অদল-বদল করে ওরা সিলেটের কিছু চা বাগান পান।
- আপনার আব্বাতো খুব রাশভারী লোক ছিলেন?
- হ্যাঁ, আর খুব রাগী ছিলেন। আব্বা ছিলেন ভীষণ মাতৃভক্ত এবং ধার্মিক। তিনি কিছুতেই চিন্তা করতে পারতেন না তার মা একদিন মারা যাবেন। তার ইচ্ছে পূরণও হয়েছিল। আমার দাদী আব্বার অনেক পরে মারা যান। প্রথমেতো আব্বা স্টার অব ইন্ডিয়ায় ছিলেন, সম্পাদক। খাজা নাজিমুদ্দিনের পত্রিকা। চার বছর পরে ইন্ডিয়ান সেন্ট্রাল জুট কমিটির এসিস্ট্যান্ট ডাইরেক্টর জেনারেল হিসাবে ব্রিটিশ সরকারের চাকরীতে যোগ দেন। দীর্ঘদেহী সুপুরুষ যাকে বলে, আব্বা ছিলেন তাই। আর কি ভীষণ ব্যক্তিত্ব।
- শহীদ ভাই, কত ছোটবেলার কথা আপনার মনে আছে?
- আমারতো মনে আছে অনেক দূর পর্যন্ত। তুমি কি জানতে চাও বলো।
- স্কুল দিয়েই শুরু করি, প্রথম স্কুল কোনটি?
- লিটল ফ্লাওয়ার ডে স্কুল। এই স্কুলে আমি পড়ি ফোর্থ গ্রেড পর্যন্ত।
- এরপর?
- এরপর সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ।
- ফোর থেকে এক লাফে কলেজে?
- হা হা হা। সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুল শাখা থাকলেও সবাই সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজই বলতো। আসলেতো ওটা কলেজই।
- সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজেতো ভারতের অনেক বিখ্যাত মানুষ পড়েছেন, না?
- অবশ্যই। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ সাহেব এই কলেজের ছাত্র ছিলেন, দিলীপ কুমার, রাজকাপুরসহ আরো অনেক নামী-দামী লোকই এই কলেজের ছাত্র ছিলেন।
- এবং কবি শহীদ কাদরী। ওটা কি শুধু ছেলেদের স্কুল বা কলেজ ছিল, মেয়েরা পড়তো না?
- তখনোতো কো-এডুকেশন চালু হয় নাই মিয়া। এই দুঃখের কথা আর কি বলি। তখন কোলকাতার অবস্থা ছিল, “বধূরে আমার দেখিনি এখনো, শুনেছি তার রূপ নাকি ভারী চমৎকার”। পরে কোলকাতা এতোই ওপেন হয়ে গেল যে, একদিন বালিগঞ্জ দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে শুনি ক’জন ছেলে মেয়েদের ডেকে বলছে, “আমাদের মধ্য থেকে কার কাকে পছন্দ, আপনারাই বেছে নেন”।
আলোচনার এ পর্যায়ে কবি শহীদ কাদরীর স্ত্রী নীরা কাদরী লিভিং রুমে প্রবেশ করেন। চায়ের কাপ নামিয়ে রেখে সামনের একটি সোফায় বসেন। এরপর কবির দিকে তাকিয়ে খুব ঠান্ডা গলায় বলেন, তখন তোমার কতো বয়স, যে এতো আফসোস?
- আপনিতো ডানপিটে ছিলেন, কি কি দুষ্টামি করতেন?
- সিগারেট খেতাম। আমার কয়েকজন সহপাঠী ছিল, আমারই মতো দুষ্টু।
- সিগারেট খাওয়ার টাকা পেতেন কোথায়?
- সিগারেট কেনার ঘটনাটা তোমাকে খুলেই বলি। মোড়ের দোকান থেকে যাবতীয় কেনাকাটার জন্য বড় ভাই শাহেদ কাদরীকে আব্বা অথরিটি দিয়ে রেখেছিলেন। ভাই স্লিপ দিয়ে দিতেন, আমি গিয়ে এটা-সেটা কিনে আনতাম। কিন্তু সিগারেটের স্লিপতো আর ভাইয়ের কাছে চাইতে পারি না। একদিন আমার হাম হলো, আর খুব জ্বর। তখন আব্বাকে ধরলাম, আমার জন্যও এই ব্যবস্থা করা হোক। আব্বা তখন কাজের ছেলে ফজলুকে বলে দিলেন, যা দোকানে বলে আয় ছোট সাহেবের জন্যও একই ব্যবস্থা। তখন এক প্যাকেট ক্যাটবেরি চকলেট আর এক প্যাকেট ক্যাপস্ট্যান সিগারেটের একই দাম ছিল, আট আনা। আমি ক্যাটবেরির স্লিপ দিয়ে ক্যাপস্ট্যান সিগারেট কিনতাম। মাস শেষে আব্বা দেখেন খালি ক্যাটবেরির স্লিপ। আমাকে বলেন, ‘এতো চকলেট খাস? তোর পেটেতো কৃমি হবেরে’। আমার ভাই সব জানতেন। তিনি দূরে দাঁড়িয়ে মুচকি মুচকি হাসতেন।
- এই ছোট বয়সে সিগারেট খেতেন। ধরা পরার ভয় পেতেন না? কোথায় খেতেন, আর দলে-বলে খেতেন নিশ্চয়ই?
- দলে–বলেতো অবশ্যই। এসব কাজ একা করে কি আর কোন মজা আছে? তিন/চারজন বন্ধু ছিল যারা আমার সকল অপকর্মের সাথী। সৈয়দ আসিফ আলী (ববি), ফজলে রাব্বী (শামীম), আল আমীন এবং আরেকজন ছিল কারিম। এই ক’জন মিলে সিগারেট খেতাম। বেশীর ভাগ সময় আমাদের ছাদের ওপর, কখনো কখনো কারিমের বাবা-মা বাসায় না থাকলে ওদের ড্রয়িং রুমে বসে খেতাম। একবার কোথাও জায়গা পাই না। ববি খোঁজ-খবর নিয়ে জানালো হাওড়া স্টেশন থেকে ট্রেনে চড়ে মধ্যমগ্রামে গিয়ে খেতের আলপথে বসে ডাঁটে সিগারেট খাওয়া যাবে। চেনা-জানা কেউ দেখবে না । ও আরো জানালো আমাদের ট্রেনের টিকেটও কিনতে হবে না। কারণ মধ্যমগ্রামের আগে টিকিট চেকার ওঠে না। ব্যাস যেই কথা সেই কাজ। হাওড়া স্টেশন থেকে ট্রেনে চড়ে চলে গেলাম মধ্যমগ্রামে। গেন্ডারি খেতের আল পথে বসে ডাঁটে সিগারেট খাই, খেত থেকে গেন্ডারি ভেঙে গেন্ডারি খাই। তখন বয়সটা এমন যে কোন একটা অনিয়ম করতেই হবে, কোন একটা নিষিদ্ধসীমা লঙ্ঘন করতেই হবে। মধ্যমগ্রাম সম্পর্কে একটি তথ্য দিই, মাটির রাস্তা-ঘাট ছিল, প্রচুর খোলা জায়গা ছিল, খেত-খামার, হাঁস-মুরগি ছিল প্রচুর। প্রকৃত গ্রাম যাকে বলে কিন্তু শহরের সব ধনী লোকের একটি করে বাড়ি ছিল ওখানে। সুন্দর সুন্দর সব বাড়ি।
- সিগারেট খেতে গিয়ে কখনো ধরা পড়েন নি?
- পড়েছি। পার্ক সার্কাসে একটা মুসলমানদের কবরস্থান আছে। গোবরা কবরখানা। আমরা মাঝে মাঝে সেই কবরখানায় ঢুকে সিগারেট খেতাম। একবার কবরখানায় বসে সিগারেট ফুকছি, আল আমীন বলে, ওই যে তোর মাষ্টার সাহেব আসছে। আমি পিছন দিকে না তাকিয়ে নাক দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে বলি, ধুর ব্যাটা, মাষ্টার গেছে কুমিল্লা। হঠাৎ আল আমীন উঠে দৌড়। আমার আর শামীমের কানে দুই হাত। ঘাড় ফিরিয়ে দেখি মাষ্টার সাহেব। কিছুদূর কানে ধরে নিয়ে গিয়ে মাষ্টার সাহেব বলেন, যাও বাড়ি যাও। অনেক পরে মাষ্টার সাহেবকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনি কি দেশে যাওয়া বাদ দিয়ে আমাকে খুঁজতে গোবরা করবখানায় গিয়েছিলেন? তিনি বলেন, ‘বেকার হোস্টেলে আমাদের বাসের এক সহযাত্রী মারা যায়। তাকে দাফন করতে গিয়ে তোমাদের দেখি’।
- সিগারেট খাওয়া ছাড়া আর কিছু করতেন না, এই যেমন স্কুল পালিয়ে সিনেমা দেখা?
- হ্যাঁ, সিনেমা দেখতাম। আমাদের স্কুলের একটি সিনেমা হল ছিল। ওটাতে প্রায়শই সিনেমা দেখতাম। চার আনা দিয়ে সিনেমা দেখা যেত ওখানে।
- কি ধরণের সিনেমা দেখতেন, মনে আছে?
- ইংলিশ সিনেমাই চালাতো ওই হলে। লা মিজারেবল, ব্লাক বিউটি, টেল অব টু সিটি, সাউন্ড অব মিউজিক এইসব সিনেমা দেখতাম।
- আমার মনে আছে আপনি একবার বলেছিলেন, আপনাদের একটি কিশোর গ্যাং ছিল। সেই গ্যাংটি সম্পর্কে কিছু শুনতে চাই।
- চাইলেতো বলতেই হবে। আমরা এই ক’জনই সিদ্ধান্ত নিলাম একটা গ্যাং গড়ে তুলবো। বড় ভাইকে বললাম, আমাদের গ্যাং এর একটা নাম দিয়ে দাও। তিনি বললেন, তোদের গ্যাংয়ের নাম দে হ্যাচেট গ্যাং। ব্যাস, হ্যাচেট গ্যাং তৈরী হয়ে গেল।
-কি কি অপারেশন করলো হ্যাচেট গ্যাং?
- সিদ্ধান্ত হলো হ্যাচেট গ্যাংয়ের প্রথম অপারেশন হবে কোলকাতা নিউমার্কেট রবিং। আমি, শামীম আর ববি ডাকাতির প্লানিংটা আগে থেকেই করে নিলাম। খুঁজে খুঁজে এমন একটা স্টোরে ঢুকলাম যেখানে একজন মাত্র সেলসম্যান। আমরা ঢুকেই দোকানীকে ব্যতিব্যাস্ত করে ফেললাম। ববি বলে রঙ পেন্সিল, আমি বলি ইও ইও, শামীম বলে চকলেট। বেচারা এটা-সেটা আমাদের দেখাতে গিয়ে দিশেহারা। এই ফাঁকে আমরা এক বাক্স রঙ পেন্সিল আর একটি ইওইও নিয়ে কেটে পড়ি। আসলে ওটা ডাকাতি ছিল না, ছিল চুরি। পরের অপারেশনটা আমার এক বন্ধু আজিজের বাড়িতে। ওদের বাড়িতে ঢুকে দেখি খুব দামী একটি গোল্ডক্যাপ পার্কার কলম। কলমটি তুলেই বাড়ি মেরে নিবটা ভেঙে ফেলি। ভেঙে ওটা আবার জায়গামতো রেখে দিই। এরপর হেঁটে চলে আসি।
- আপনার সেই সব বন্ধুরা এখন কে কোথায় আছে জানেন?
- কিছু কিছু জানি। আজিজ পাকিস্তান এয়ারফোর্সে যোগ দিয়েছিল। ববিকে চা বাগানের কুলিরা মেরে ফেলে।
- আপনার এই ডানপিটে কৈশোর কি নিরবচ্ছিন্ন ছিল না ছেদ পড়ে?
- ছেদতো পড়তেই হবে। এটাই প্রকৃতির নিয়ম। দেশ বিভাগের সময় আব্বা ইন্ডিয়ায় থেকে যাওয়ার অপশন দেন। আমার ফুফু-চাচারা পাকিস্তানে চলে যাওয়ার অপশন দেন। উনারা সবাই চলে যান পূর্ব পাকিস্তানে। আমরা থেকে যাই। কিছুদিনের মধ্যেই আব্বা অসুস্থ হয়ে পড়েন। দু’বছর বিছানায় কাটিয়ে ১৯৫০ সালে আব্বা মারা যান। তখন কোলকাতা ছেড়ে আসা ছাড়া আমাদের আর কোন অপশন থাকে না। ১৯৫২ সালে আমরা কোলকাতার পার্কসার্কাস ছেড়ে ঢাকায় চলে আসি। এভাবেই আমার কোলকাতার ডানপিটে জীবনের অবসান ঘটে।
- তখন আপনি কোন ক্লাসে পড়েন? উনি যখন অসুস্থ ছিলেন তখন কি পড়াশুনার ক্ষতি হয়?
- আব্বা যখন মারা যান তখন আমি ক্লাস ফোরে পড়ি। বড় ভাই পড়তেন সেভেনে। হ্যাঁ ক্ষতিতো হয়ই, আব্বা মারা যাওয়ার পরে অনেকদিন স্কুলে যেতে পারি নি। পরের দুই বছরতো পড়াশুনা বন্ধই ছিল।
- ঢাকায় এসে কোথায় ওঠেন। অর্থনৈতিক কোন টানাপড়েনে পড়তে হয়েছিল পরিবারকে?
- ঢাকায় এসে আমরা সোজা আমার ফুফুর বাড়িতে উঠি। ৩৪ শ্রীশ দাস লেন। ফুফুদের গেন্ডারিয়ায় আরো একটি বাড়ি ছিল। উনারা গেন্ডারিয়ায় চলে যান। না কোনো টানাপড়েনে পড়িনি। কারণ আমার ফুফুরা ধনী ছিলেন, তারাই আমাদের দায়দায়িত্ব নিয়ে নেন। বরং আমরা যখন কোলকাতায় ছিলাম ফুফুই আম্মাকে তাগাদা দিচ্ছিলেন ঢাকায় চলে আসার জন্য। তিনি আম্মাকে বলতেন, আমার ভাইয়ের সন্তানদের হিন্দুরা মেরে ফেলবে, আপনার কোন রাইট নেই ওদেরকে মৃত্যুর ঝুঁকিতে রাখার।
- ঢাকায় এসে কোন স্কুলে এবং কোন শ্রেণীতে ভর্তি হন?
- ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে সপ্তম স্রেণীতে ভর্তি হই।
- ভিন্ন পরিবেশ আবার ভিন্ন মিডিয়াম, স্কুলে কি কোন অসুবিধা হচ্ছিলো?
- হচ্ছিলো। বাংলাতো শিখিনি। ইংরেজী আর উর্দু জানতাম। সবাই বুঝে গেল, আমাকে দিয়ে বাংলা ভাষা শেখা হবে না। তাই পরীক্ষা দিতে পাঠিয়ে দিল কোলকাতায়। ওখান থেকে জুনিয়র ক্যামব্রিজ এবং সিনিয়র ক্যামব্রিজ পরীক্ষা দিয়ে আসি।
- শেষ পর্যন্ত তো বাংলা ভাষা শিখলেন এবং বাংলা ভাষার একজন কবি হয়ে গেলেন। এটা কিভাবে সম্ভব হলো?
- আমার ফুফাত ভাই আবুল হায়াত ভাইয়ার বাংলা সাহিত্যের প্রতি খুব আগ্রহ ছিল। তিনি বিষ্ণু দে’র কবিতা আবৃত্তি করে শোনাতেন। তখনই আমার মধ্যে বাংলা ভাষার প্রতি আগ্রহ তৈরী হয়। আবুল হায়াত ভাইয়া কোলকাতায় যেতেন, গিয়ে বিষ্ণু দে, বুদ্ধদেব বসু, সমর সেন, নরেশ গুহ, জীবনানন্দ দাশ এদের বই নিয়ে আসতেন। আমিও পড়তে শুরু করি।
- এই পাঠাভ্যাসই কি আপনাকে কবিতা লিখতে অনুপ্রাণিত করে?
- বলা যায়। তবে আমার কোনোদিনই কবি হওয়ার কোনো ইচ্ছে ছিল না। একদিন একটি কবিতা লিখে ফেলি। কবিতার নাম ‘পরিক্রমা’। লিখে মহিউদ্দিন আহমদ সম্পাদিত ‘স্পন্দন’ পত্রিকায় পাঠিয়ে দিই।
- আধুনিক কবিতা নিশ্চয়ই, তখন আপনার বয়স কত?
- হ্যাঁ, অবশ্যই আধুনিক কবিতা। এগার/বারো বছর বয়স তখন। এটা তোমার ৫৩ সালের কথা।
- এতো কম বয়সেই আধুনিক কবিতা লিখে ফেলেছেন, এটা নিঃসন্দেহে একটি বিরল ঘটনা। তারপর সেটা কি স্পন্দনে ছাপা হলো?
- ছাপা না হলেতো আমি আর লিখতামইনা মিয়া। বাংলা সাহিত্যের দুর্ভাগ্য যে ওটা ছাপা হয়ে গেল। এবং আমি আরো একটি কবিতা লিখে ফেললাম, ‘জলকন্যার জন্যে’ শিরোনামে।
- এটা কোথায় পাঠালেন?
- ‘স্পন্দন’ পত্রিকায়ই। এবং যথারীতি এটাও ছাপা হলো। এরপর গোলাম কুদ্দুসের ‘বিদীর্ণ’ পত্রিকায় ছাপা হয় আরো একটি। আমাদের এক প্রতিবেশী ছিলেন মুসলেহ উদ্দীন আহমেদ। তিনিও কবিতা লিখতেন। তার সঙ্গে পরিচয় হয়, কবিতা নিয়ে কথা হয়,আড্ডা হয়। এরপর নতুন সাহিত্য, চতুস্কোন এইসব পত্রিকায় কবিতা লিখতে শুরু করি।
- সেই থেকেই কবিতার ঘোর আপনাকে পেয়ে বসে?
- মাঝে মাঝে খুব একাকীত্ব অনুভব করতাম। এই অনুভূতিটা কবিতা লিখতে সাহায্য করতো। আর পড়তাম খুব। খান মজলিশের বুক স্টল থেকে ম্যাগাজিন কিনতাম, কবিতার বই কিনতাম। মার্ক্স খুব পড়তাম, মার্ক্সবাদী লেখা রাত জেগে জেগে পড়তাম। এই বোধ খুব প্রবলভাবে কাজ করতো যে মার্ক্সবাদী কবিতা লিখতে হবে।
- কবি শামসুর রাহমানের সাথে আপনার কি ঠিক এই সময়টাতেই পরিচয় ঘটে?
- হ্যাঁ, তখনি। বড় ভাইয়ের এক বন্ধু ছিল, খোকন। খোকনের ভগ্নিপতির নাম ছিল মোশতাক। মোশতাকের বন্ধু ছিল বাচ্চু ভাই, মানে কবি শামসুর রাহমান। একদিন খোকন আমাদের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ‘শাহেদ, শাহেদ’ বলে চিৎকার করছে। আমার ভাই বেরিয়ে বলে, ‘শহীদতো কবিতা লেখে’। খোকন আমার কবিতার খাতা ঘেঁটে-টেটে বলে, ‘তুই বাচ্চু ভাইয়ের কবিতা পড়িস? দেশ পত্রিকা পড়িস? দেশ-এ তো প্রতি সপ্তাহেই বাচ্চু ভাইয়ের কবিতা ছাপা হয়। দেখেছিস? শোন, শামসুর রাহমান খুব বড় কবি। তোর সাথে আলাপ করিয়ে দেব’। ততদিনে আমার দ্বিতীয় কবিতা, ‘জলকন্যার জন্যে’ স্পন্দনে ছাপা হয়ে গেছে। এর কিছুদিন পরেই শামসুর রাহমানের সাথে আমার পরিচয় হয়। পরিচয়টা কিন্তু খোকন বা মুশতাকের মাধ্যমে হয় নি। পরিচয়টা হয় বেশ আকস্মিক এবং নাটকীয়ভাবে। একদিন খান মজলিশের বইয়ের দোকানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শামসুর রাহমান স্পন্দনে ছাপা হওয়া আমার কবিতা “জল কন্যার জন্যে” পড়ছিলেন। আমি পেছনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম। তিনি যখন নোটিশ করলেন কেউ তার পেছনে দাঁড়িয়ে দেখছে, তখন ঘুরেই বলেন, আপনি কি শহীদ কাদরী? আমিতো অবাক। তিনি নিজের পরিচয় দিয়ে বলেন, ‘আমার নাম শামসুর রাহমান। খোকন আমাকে আপনার কথা বলেছে’। এভাবেই বেশ একটা নাটকীয় ঘটনার মধ্য দিয়ে শামসুর রাহমানের সাথে আমার পরিচয় হয়। পরদিন তিনি আমার বাসায় আসেন। শামসুর রাহমানরা থাকতেন মাহুতটুলিতে। খুব রক্ষণশীল পরিবার। কোন পুরুষ মানুষ বাড়ির ভেরতে ঢুকতে পারতো না। আমি ছোট ছিলাম বলে আমার কোন বাঁধা ছিল না। ভেতরে ঢুকে যেতাম। নিয়মিতই যেতাম, আড্ডা দিতাম।
- বুদ্ধদেব বসুর ‘কবিতা’ পত্রিকা তখনতো বাংলা ভাষার কবিদের তীর্থ ছিল। ওখানে ছাপা হলেই কবিরা বর্তে যেত, বলা যায় কবি হয়ে ওঠার স্বীকৃতি। আপনি কি শামসুর রাহমানের সংস্পর্শে এসেই কবিতা পত্রিকায় লেখা পাঠাতে উদ্বুদ্ধ হন?
- ‘কবিতা’ পত্রিকায় লেখা পাঠানো আর এক মজার ঘটনা। আল মাহমুদ তখন থাকতেন নবাবপুরে। এক বুড়ির মেসে। ইতোমধ্যেই আমাদের বিউটি বোর্ডিংয়ের আড্ডা জমে উঠেছে। অনেকেই আসতে শুরু করেছেন। আল মাহমুদও এসেছেন। একদিন হাঁটতে হাঁটতে আল মাহমুদের ওখানে যাই। গিয়ে বলি, দোস্ত কি করো? আল মাহমুদ বলেন, কবিতা কপি করি, ‘কবিতা’ পত্রিকায় পাঠাবো। পরের দিন শামসুর রাহমান আমার বাসায় আসেন। বলে চলেন, বিউটি বোর্ডিংয়ে গিয়ে বসা যাক। আমি বলি, আল মাহমুদতো কবিতা পত্রিকায় লেখা পাঠাচ্ছে। ওর লেখাতো আমার আগে ছাপা হয়ে যাবে। আমি কবিতা পত্রিকায় লেখা পাঠাতে চাই। ওর আগে আমার কবিতা ছাপা হতে হবে। শামসুর রাহমান আমার খাতা থেকে দুটি কবিতা বেছে দিয়ে বলেন, এই দুটি পাঠিয়ে দিন। সাথে একটি ছোট্ট চিঠি দিবেন। মনে রাখবেন বড় চিঠি কোন সম্পাদক পড়েন না। আর কারো রেফারেন্স দিবেন না। মনে রাখবেন, আপনার লেখা ছাপা হবে লেখার মেরিটের কারণে, রেফারেন্সে নয়।
- ছাপা হয়েছিল?
- হ্যাঁ, ছাপা না হলেতো আমি আর লিখতাম না।
- বিউটি বোর্ডিংয়ের প্রসঙ্গটি যখন চলেই এলো, এই আড্ডাটির জন্মকথা একটু জানতে চাই। আমরাতো এখন বাংলাদেশের কবিতার আঁতুড়ঘর হিশেবেই বিউটিবোর্ডিংকে বিবেচনা করি। এই আঁতুড়ঘরের জন্ম কিভাবে হলো?
- আমাদের বাড়ির কাছেই একটি মন্দির ছিল। মন্দির চত্বরে বসে আড্ডা দিতাম। আমার তিনজন বন্ধু ছিল, বাচ্চু, তাহের আর জাহাঙ্গীর। আমরা এই চার বন্ধু মিলে ওখানে আড্ডা দিতাম। বাচ্চুর পুরো নাম নুরুল হক বাচ্চু। পরে বড় ফিল্ম ডাইরেক্টর হয়। অনেক ভালো ভালো সিনেমা বানায়। বিউটি বোর্ডিং তখন ছিল ‘সোনার বাংলা’ পত্রিকার অফিস। এই পত্রিকাতেই শামসুর রাহমানের প্রথম কবিতা ছাপা হয়। এক সময় ‘সোনার বাংলা’ পত্রিকা উঠে গেলে ওখানে একটি আবাসিক হোটেল হয়, বিউটি বোর্ডিং নামে। নিচতলায় ছিল একটি রেস্টুরেন্ট। শুধুমাত্র ওদের বোর্ডারদের জন্য। তো আমরা মাঝে মধ্যে যেতাম। গিয়ে চা খেতাম। আমাদেরতো আড্ডা মারাটাই মূল উদ্দেশ্য। দেখা গেল এক কাপ চা নিয়ে কয়েক ঘণ্টা বসে আছি। ওরা বিরক্ত হয়ে আমাদের চলে যেতে বলতো। আমরা ঘুরে ঘুরে আবার আসতাম। একদিন এর মালিক প্রহ্লাদ বাবু আমাদের সাথে একরকম খারাপ ব্যবহারই করেন। তার পরেও আমরা যেতাম। একদিন হিন্দু-মুসলমান মারামারি বেঁধে গেলো। একদল মুসলমান বিউটি বোর্ডিংয়ের দিকে তেড়ে আসছিলো। আমরা তখন প্রহ্লাদ বাবুদের পক্ষে দাঁড়িয়ে গেলাম, ওদেরকে বলা যায় সে যাত্রা রক্ষা করি। এরপর থেকে আমাদের আর কোনদিন বাঁধা দেয় নি। আমরা নিয়মিত ওখানে বাধাহীন আড্ডা দিতে শুরু করি।
- কে কে আসতো সেই আড্ডায়।
- পরেতো সবাই আসে। তবে আড্ডাটা শুরু করি আমরা চার বন্ধু মিলে। এরপর শামসুর রাহমান, সৈয়দ সামসুল হক, আল মাহমুদ, ফজল শাহাবুদ্দীনসহ অনেকেই আসে। সৈয়দ হক থাকতেন লক্ষ্ণীবাজারে। ও তখন জগ্ননাথ কলেজে ভর্তি হয়েছেন। আমরা মন্দির চত্বরে আড্ডা দিতাম, হককে দেখতাম চপ্পল পায়ে দিয়ে গলায় টাই ঝুলিয়ে কলেজে যাচ্ছেন। ওকে দেখে আমরা সিটি বাজাতাম। ও ঘুরে তাকাতো, কিন্তু কখনো কিছু বলতো না। একবার হয়েছে কি শোনো, বিউটি বোর্ডিংয়ে আড্ডা দিচ্ছি, শামসুল হক এসে বলেন, ‘অগত্যা’ পত্রিকায় আমার গল্প ছাপা হয়েছে, পড়ে দেখবেন। আমরা পত্রিকাটি জোগাড় করে তার গল্পটি পড়লাম। সেই গল্পে ছিল, টেবিলের ওপর একটি চিনির দানা পড়ে আছে তাকে ঘিরে রেখেছে এক ঝাক মৌমাছি। পরের দিনের আড্ডায় আমরা তাকে ধরলাম, ‘এইটা কি করে হয়? এটা কি সম্ভব?’ ও কোন প্রতিবাদ না করে বা সপক্ষে যুক্তি না দিয়ে আমাদের সমালোচনা মেনে নিলো। আরেকদিন শামসুল হক শামসুর রাহমানকে বলেন, আপনি শহীদের বাসায় যান, আমার বাসাওতো কাছে, আমার বাসায়ওতো আসতে পারেন। কিন্তু শামসুর রাহমান ওর বাসায় যেতেন না, আমার এখানেই আসতেন।
- শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, ফজল শাহাবুদ্দীন আর আপনি, সেই সময়ের কবিসমাজে আপনাদের একটি গ্যাং ছিল বলা যায়।
- হ্যাঁ, আমাদের এই চারজনের মধ্যে খুব সখ্য ছিল। তখন নামকরা কবি ছিলেন হাসান হাফিজুর রহমান, বোরহানউদ্দীন খান জাহাঙ্গীর, এরা। আমরা যেখানেই যেতাম, শামসুর রাহমানকে তুলে ধরতাম। ‘শামসুর রাহমান ইস দি বেস্ট’ এটাই ছিল আমাদের শ্লোগান। এক পর্যায়েতো হাসান হাফিজুর রহমানরা ওদের কোন সভায় আমাদের ঢুকতেই দিতে চাইতো না।
- শামসুর রাহমানও কি আপনাদের তিনজনকে এভাবে তুলে ধরতেন?
- না, তিনি এটা করতেন না। তিনি যে এটা করতে চাইতেন না আমাদের মধ্যে এটা সকলের আগে আল মাহমুদ বুঝতে পারেন। একদিন শামসুর রাহমান আমাকে বলেই ফেলেন, আমি যে আপনার নাম করি না এতে কি আপনি মাইন্ড করেন? সবাই যখন করবে তখন আমি আপনার নাম করবো। এখন করলে লোকে ভাববে বন্ধু বলে স্বজনপ্রীতি করছি।
- কিশোর বয়সে অনেকেরই মদ্যপানের শখ হয়, আপনার কি হয়েছে বা করেছেন?
- মেদেনীপুরের এক ছেলে, নাম মোশাররফ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তো। ওর সাথে আমার সখ্য গড়ে ওঠে একটা সময়ে। আমি ওদের বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু কিছু আড্ডায়ও যোগ দিতাম। ওদের বাসা ছিল ওয়ারীতে। একদিন মোশাররফ আমাকে ওদের বাড়িতে দাওয়াত করে। ছাদের ওপর বড় গামলায় সব ধরণের মদের ককটেল বানায়। আমাকে বলে, এক পাত্র চলবে না কি? আমি বলি, হ্যাঁ হ্যাঁ দেখতে পারি। শেষ হলে বলে, আরো চলবে? আমি বলি, কেন নয়? এভাবে অনেক পান করে ফেলি। পরে দেখি ছাদ থেকে আর নামতে পারছি না। সেটাই ছিল আমার প্রথম মদ্যপান।
হলিসউড, নিউইয়র্ক। ১৮ এপ্রিল ২০১৬।
(দৈনিক আমাদের সময় সাহিত্য সাময়িকীতে প্রকাশিত ১৯ আগস্ট ২০১৬। এর আগে বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত “ধান-শালিকের দেশ”-এ প্রকাশিত)

শহীদ কাদরীকে নিয়ে অসাধারণ এই লেখাটি পড়ে খুবই ভালো লেগেছে।
ReplyDeleteঅনেক ধন্যবাদ কবি সোহেল মাহমুদ।
Deleteঅত্যন্ত ভালো লাগলো প্রিয় কবির এই সাক্ষাৎকার। জীবনে একটি সাধ ছিল কবির সাথে বাস্তবে দেখা করার , সেটি অপূর্ণ রয়ে গেলো ; কিন্তু যখনই উনার সাক্ষাৎকার পাই , আগ্রহ করে পড়ি।
ReplyDeleteঅনেক ধন্যবাদ । শহীদ কাদরীর আরো সাক্ষাতকা৷ স্মৃতিচারণ আসছে এই ব্লগে।
Delete