Skip to main content

ওরা আমাদের কেন বাঙালি মনে করে না?

 বাঙালির জাত্যভিমান

|| কাজী জহিরুল ইসলাম || 


আমরা যতোই বাঙা
লি বাঙালি বলে চেচাইযাদের জন্য আমাদের এই মরাকান্নাতারা কিন্তু জাত্যভিমানের আত্মম্ভরিতায় আমাদেরকে বাংলাদেশিই বলেন। কোথায় যেন ওদের একটু বাঁধে ভাবটা এমনবাঙালদের দুচারজন হয়ত কিছুটা বাঙালি হয়ে উঠেছে। 

আমরা তো গর্ব করেই বলি চারজন বাঙালি নোবেল পেয়েছেন কিন্তু ব্র্যান্ডেড বাঙালিরা চট করেই তা বলেন না। প্রথমে বলেন তিনজনতারপর একটু থেমেকেউ ভুলটা ধরিয়ে দিলেও হ্যাঁভুলেই গিয়েছিলামপ্রতিবেশি দেশের হলেও ওতো বাঙালিইহ্যাঁ চারজন। পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের এই জাত্যভিমান দূর করা আমাদের কাজ নয়আমাদের শুধু নিজেদেরকে ভালো করে চিনতে হবে। দীর্ঘ সংগ্রাম এবং মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ আমরা অর্জন করেছিযার ভিত্তিতে আমাদের একটি জাতীয়তা তৈরী হয়েছেতাকে ছোটো করা আত্মঘাতী কর্ম ছাড়া আর কিছুই নয়। হ্যাঁআমরা বাঙালি তো বটেইতার চেয়েও বড় পরিচয় আমরা একটি স্বাধীন দেশের নাগরিকআমরা বাংলাদেশি। মাওলানা ভাষানী ইউরোপ ঘুরে এসে বলেন, ওদের স্বাদেশিকতা এবং পরের ধনের প্রতি ঘৃণা (মানে কিছুতেই অন্যের অর্থবিত্ত গ্রহন করবে না) ওদেরকে খুব দ্রুত উন্নয়নের শিখরে নিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশিদের মধ্যে এই দুটোরই খুব অভাব।  

বৃহৎ ভারতে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য বাঙালি পরিচয় 

পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। যেমন 

বাংলাদেশের আদিবাসীদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ তাদের এথনিক 

পরিচয়কে ধারণ করা। ভারতের বাঙালিরা যে আমাদের বাঙালি 

হিসেবে মেনে নিতে কিছুটা দ্বিধায় ভোগেন তা ২ নভেম্বর ২০১৯ 

তারিখের দেশ পত্রিকার সম্পাদকীয় পড়লেই পরিস্কার বোঝা যায়। 

আমি কোট করছি, 'আক্ষরিক অর্থে বাঙালি নোবেল প্রাপক এখনও 

পর্যন্ত তিনজন। উদারচেতা বাঙালি যদিও সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়েছে

চতুর্থ এক বাঙালিও এ তালিকায় আছেন! ভৌগোলিকভাবে তিনি 

প্রতিবেশী রাষ্ট্রেরকিন্তু বাঙালিই।মুহাম্মদ ইউনুসকে অনেকটা 

দ্বিধা নিয়ে বাঙালি হিসেবে মেনে নিল দেশ পত্রিকা।

আমি অবশ্য ব্যক্তিগতভাবে এথনিসিটি এবং জাতীয়তা এর কোনোটা নিয়েই বড়াই করার বিপক্ষে। বড়াই থেকেই সাম্প্রদায়িকতা এবং হানাহানির জন্ম হয়। হিটলার তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। আগেও একথা বলতে গিয়ে বিপদগ্রস্ত হয়েছি। আমাকে লোকে এই বলে গালমন্দ করেছেন যে আমার দেশপ্রেম নেইআমি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোক নই। কিন্তু তাদের মধ্যে এই বোধ জেগে ওঠেনিপ্রেম আর দম্ভ এক জিনিস নয়। বাংলাদেশের যে গ্রামে আমার জন্ম হয়েছে আমি সেই জন্মগ্রামকে আমার জন্মদাগের মতো বহন করি কিন্তু পাশের গ্রামের লোকের সাথে সেই গ্রামের লোকদের মারামারি বেঁধে গেলে আমি কখনোই আমার জন্মগ্রামের পক্ষ নিয়ে মারামারিকে উস্কে দেই না। ঠিক তেমনি আমি বাঙালি হিসেবেবাংলাদেশি হিসেবেগর্ব করিহৃদয়ের গভীরে তা প্রোথিত কিন্তু গর্ব থেকে আমার এমন কোনো দম্ভ তৈরী হয় না যা আমাকে অন্য কোনো দেশ বা জাতিকে আক্রমণ করতে বা আক্রমণকারীকে সমর্থন করতে উদ্বুদ্ধ করে। একবার বলেছিলাম মাত্রাতিরিক্ত দেশপ্রেম মানুষকে সাম্প্রদায়িক করে তোলে। সাথে সাথেই সহস্র বাক্যবর্শা আমার দিকে নিক্ষিপ্ত হয়েছিল। আমি অবশ্য তা হাসিমুখেই গ্রহন করেছিলাম। কারণ প্রত্যাঘাত আমার কাজ নয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমি বরং আক্রমণকারীদের সমর্থনই করি। সমর্থন করি এজন্য যে এর মধ্য দিয়েই সমাজের ভারসাম্য ঠিক থাকে। আমি একজন আত্মবিশ্বাসী মানুষ। আমি জানি আমি কী করিআমি জানি আমি কী বলি। এও জানি সমালোচনা থেকে কতটুকু গ্রহন করতে হয়। আমার যেমন বলার স্বাধীনতা আছেসমালোচকদেরও সমালোচনা করার স্বাধীনতা আছে। সমালোচনার যেটুকু আবর্জনা তা আমি ফেলে দিই। প্রতিটি মানুষ তার কথা ও কর্ম দিয়ে নিজের পোর্ট্রেটই আঁকে। কে কি বললো তার দায় তার এ নিয়ে আমার মাথাব্যাথা নেই।

আমি বিশ্বাস করি সকল মানুষসকল জাতি এককভাবে ভগ্নাংশমাত্র। সকলে মিলেই একটি পূর্ণ স্বত্বা। আমি পূর্ণাঙ্গতার জয়গান করি। তবে পূর্ণাঙ্গ হতে হলে নিজেকে ভালো করে চিনতে হয়। নিজের জাতিধর্মকে ভালোবাসতে হয় এবং মনের দরোজা জানালা খোলা রাখতে হয় অন্যকে ভালোবেসে গ্রহন করার জন্য।

 

হলিসউডনিউইয়র্ক। ৭ ডিসেম্বর ২০১৯

Comments

Popular posts from this blog

অসাধারণ এই শিল্পীর জীবনের গল্প বড় করুণ

  [এই সময়ের অত্যন্ত প্রতিভাবান শিল্পী সারফুদ্দিন আহমেদ। বাড়ি পশ্চিমবঙ্গে। আর্ট কলেজে খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করেন ,  আর শুধু ছবি আঁকেন। নানান মাধ্যমে ,  নানান বিষয়ের ছবি। সারফুদ্দিন আহমেদের ছবি থেকে চোখ ফেরানো যায় না ,  আপনাতেই ওঁর নান্দনিক সৃষ্টিকর্মে দৃষ্টি আটকে যায় ,  কী জল রঙ ,  কী অ্যাক্রিলিক ,  কিংবা স্রেফ পেন্সিলের ড্রয়িং। এই গুণী শিল্পীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কবি কাজী জহিরুল ইসলাম। সাক্ষাৎকারটি এখানে উপস্থাপন করা হলো।]       ভারত আমাকে চোখ দিয়েছে ,  বাংলাদেশ দিয়েছে দৃষ্টি -     সারফুদ্দিন আহমেদ     কাজী জহিরুল ইসলামঃ  ব্যাক গ্রাউন্ডে তবলা বাজছে আপনি ছবি আঁকছেন কাচের ওপর।    এই যে বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে ছবি আঁকা, এই ছন্দটা ছবিতে কিভাবে ধরেন? আর কোনো শিল্পী ছবি  আঁ কার সময় যন্ত্রানুসঙ্গ ব্যবহার করেছেন?   সারফুদ্দিন আহমেদঃ   কাঁচ নয়,   এটি এক বিশেষ ধরনের কাপড়-নেট। এই নেটের উপরে বর্তমানে আমার এক্সপেরিমেন্ট চলছে।    জহিরুলঃ ও ,  ফেইসবুকে যখন ছবিটি দেখি কাচের মতো ...

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জুর সাক্ষাৎকার || অষ্টম পর্ব ||

[লেখক, সাংবাদিক, অনুবাদক আনোয়ার হোসেইন মঞ্জুর সাক্ষাৎকারের অষ্টম  পর্ব আজ প্রকাশ করা হলো। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কবি কাজী জহিরুল ইসলাম।]          দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ বাসস - কে অকার্যকর করেছে  – মঞ্জু    জহিরুলঃ  আপনি ফেলোশিপ নিয়ে দিল্লীতে ছয়মাস ছিলেন, ব্যক্তিগত আগ্রহ এবং পেশাগত অভ্যাসের কারণে কাছে থেকে দেখার/বোঝার চেষ্টা করেছেন ভারতের এবং উপমহাদেশের রাজনীতি। আমরা দেখি ভারতের রাজনীতিতে গায়ক, নায়ক, লেখক, সাংবাদিকের আবির্ভাব ঘটে সব সময়ই এবং তারা রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও রাখেন। বাংলাদেশে এই ধারা খুব সম্প্রতি শুরু হলেও আমাদের জনপ্রিয় খেলোয়াড়, শিল্পীরা নিজেদের অর্থনীতি সমৃদ্ধ করা ছাড়া রাজনীতিতে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেন না। এমন কি ধর্ষণ, অন্যদেশকে ট্রানজিট প্রদান, উপর্যুপরি সড়ক দূর্ঘটনা, পরিবেশ ধ্বংসকারী কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্প ইত্যাদি ইস্যুতেও তারা নীরব। অথচ তাদের জনপ্রিয়তা এবং রাজনীতি সম্পৃক্ততা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত, যা ভারতে দেখা যায়। বিষয়টি যদি আপনার মতো করে ব্যাখ্যা করেন।  মঞ্জুঃ   দিল্লিতে আমার অবস্থানকালকে আমি নানা দিক থ...

কানের কাছে নারী কন্ঠ

  স্বপ্নের ঐশ্বর্য   || কাজী জহিরুল ইসলাম ||   ছুটির দিন। লম্বা সময় ধরে ঘুমাবো। কিন্তু তার আর উপায় নেই। কানের কাছে নারী কন্ঠ। বেশ আত্মবিশ্বাসী কন্ঠ। ক্রমাগ ত  কথা বলে যাচ্ছেন এক অপরিচিতা। আমি লাফ দিয়ে উঠি। কে তিনি ?  আমার স্ত্রী বলেন ,  রুবানা হক ,  শোনো কী বলছেন। রুবানা হক প্রয়াত ব্যবসায়ী আনিসুল হকের স্ত্রী। আমাদের কৈশোর-উত্তীর্ণ কালে আনিসুল হক ছিলেন আমাদের হিরো। টিভি উপস্থাপনায় অন্য এক আধুনিকতা নিয়ে হাজির হন তিনি। এরপর আমরা ধীরে ধীরে তার ব্যবসায়ীক সাফল্য ,  সাংগঠনিক সাফল্য দেখতে দেখতে বড় হই। খুব সাম্প্রতিককালে ,  আনিসুল হকের মৃত্যুর পর ,  কেউ একজন বলেছিলেন ,  তার স্ত্রী রুবানা হকও খুব ভালো কথা বলেন। কিন্তু রুবানা হকের কথা শোনার সৌভাগ্য আমার হয়নি। দুই যুগ ধরে দেশের বাইরে থাকার কারণে এই সময়ে স্টার হয়ে ওঠা অনেকের সম্পর্কেই আমার ভালো ধারণা নেই।  তার কথায় এমন কিছু ছিল যে আমার পক্ষে ঘুমিয়ে থাকা সম্ভব হয়নি। আমি মুক্তিকে বলি ,  প্রথম থেকে দাও ,  পুরো বক্তৃতাটা আমি শুনতে চাই। আমি পরপর দুইবার তার পুরো বক্তব্যটা শুনি ,  ফ...