Skip to main content

ভাত


 ভাত

কাজী জহিরুল ইসলাম 


ছেলেটির নাম কালিকান্ত

ক'দিন আগেই মাত্র যোগ দিয়েছে মারিয়াদের

প্রশাসনিক দপ্তরে।


ফোনের ওপাশে আর্য রমনীর রসঘন কণ্ঠস্বর,

আমি যদি ভুলে গিয়ে না থাকি তোমার বাড়ি বাংলাদেশে?


আমি সম্মতিসূচক শব্দ করতেই

মারিয়ার স্প্রিঙ্কলার খুলে যায়।


হেই, ইওর কান্ট্রিম্যান, ক্যালিকান্ট, 

আমাদের দপ্তরে ক'দিন আগে জয়েন করেছে

লোকটি তোমাকে সর্বত্র খুঁজছে পাগলের মতো।


'আমাকে খুঁজছে?'

হি হি করে হাসে শ্বেতাঙ্গিনী

জাস্ট কিডিং ম্যান,

ও খুঁজছে দেশি কাউকে, কী সমস্যা বলছে না কিছুই,

তোমার আপত্তি না থাকলে

এক্ষুণি তোমার অফিসে পাঠিয়ে দিই।


'অবশ্যই'


দশ মিনিটের মাথায় দরোজা ঠেলে আমার অফিস কক্ষে ঢোকে

শরিয়তপুরের ধুলিকাদার নিচ থেকে উঠে আসা একজন কালিকান্ত।


নির্জন সোফায় দেহটিকে ছেড়ে দিয়ে 

কোনো রকম ভণিতা ছাড়াই বলে ফেলে,

দাদা, আপনার পায়ে পড়ি

আমাকে এখন এক থালা ভাত খাওয়ানোর ব্যবস্থা করেন

গরম গরম ভাত, মশুরির ডাল দিয়ে,

একটি কাচামরিচ হলে ভালো হয়,

না হলেও হবে।


তেমন গরম ভাত যদি না-ই থাকে 

ঠাণ্ডা হলেও ক্ষতি নেই কিছু, বাসি কিংবা পান্তাতেও আপত্তি করবো না মোটেও, শুধু ভাত হলেই চলবে,

কত দিন ভাত খাই না।


আমি ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকি

কালিকান্তের নিস্প্রভ করুণ চোখের দিকে

ভয়াবহ ভাতজ্বরে কাতর ফ্যাকাশে দুটি চোখ।


এই দূর দেশে, এই বিদেশ-বিভুঁইয়ে 

আর কিছু চায় না সে

শুধু একথালা ভাত

ভাতের সহজ চাহিদার কাছে অন্য সব কিছু ম্লান আজ,

না বিত্ত, না নারী, না বিলাস বহুল গাড়ি

শুধু এক থালা ভাত

পান্তা, বাসী কিংবা ধুমায়িত।


আমার নীরবতায় কালিকান্ত ভীষণ অস্থির হয়ে ওঠে।


ভাই, হবে না? হবে না দাদা? 

এক থালা না হোক 

শুধু দুটি লোকমা 

ডাল যদি না পাওয়া যায় ক্ষতি নেই

একটু নুন মেখে খেয়ে নেব, হবে না ভাই, শুধু দু'মুঠো ভাত?


কালিকান্তের মুখের দিকে তাকিয়েই

ফোনের বোতাম টিপি,

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাপোর্ট কোম্পানি।


কর্নেল মমিন ফোন তুলে কুশলাদি জানতে চাইলে

আমি তা এড়িয়ে সরাসরি ভাতের প্রসঙ্গ তুলি

গরম গরম ভাত

মোটা ইরি বা চিকন বাঁশমতি চাল

আর এক বাটি ঘন ডাল, হবে?

হবে না মমিন ভাই?


আদ্যোপান্ত শোনেন জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের কমান্ডার,

একঘন্টা পর অফিসার্স মেসের ডায়নিংয়ে চলে আসুন।


কালিকান্ত অফিসার্স মেসের সকল নিয়ম ভেঙে 

ঝাঁপ দেয় শুভ্র ভাতের সমুদ্রে

ফর্ক অ্যান্ড নাইফের সভ্যতা ওর মহাগ্রাসী ভাতের ক্ষুধার কাছে অসহায়

হাত ডুবিয়ে সে গোগ্রাসে ভক্ষণ করে ধুমায়িত ভাত।


ক'জন তরুণ অফিসার জীবনের সীমিত অভিজ্ঞতার ওপর দাঁড়িয়ে হাসে,

দেখে এক হাভাতে বাঙালির কী বিচিত্র কাণ্ডকারখানা। 


আমি আর কমান্ডার মমিন পাশাপাশি বসে

দেখি পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য,

অণ্নতৃপ্ত কালিকান্তের প্রসন্ন মুখ।


করতলে ধুমায়িত ভাত

কালিকান্তের ধুসর চোখে 

আনন্দের কী তুমুল বৃষ্টিপাত।


হলিসউড, নিউইয়র্ক। ১৭ জুলাই ২০২০।


[এই কবিতার ঘটনা ও চরিত্র কাল্পনিক নয়] 


Comments